Golpo romantic golpo দিশেহারা

দিশেহারা পর্ব ৬৪


দিশেহারা (৬৪)

সানা_শেখ

শ্রবণ ঘুম থেকে উঠে দেখল সকাল আটটা বেজে গেছে। সোহা এখনো বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে আছে, ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আর ঘুম থেকে ওঠেনি।
সোহাকে ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াল।
ফ্রেশ হয়ে বড়ো একটা শপিং ব্যাগে চাদর আর মেক্সিটা ভরল। এই দুটো নিয়ে এখন ফেলে দিয়ে আসবে ডাস্টবিনে।
হাত ধুয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। চাবি হাতে নিয়ে সোহার দিকে তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

নাস্তা তৈরি করে সোহাকে ডাকতে আসলো শ্রবণ। রুমে এসে দেখল সোহা শোয়া থেকে উঠে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে আছে।
শ্রবণ জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। বাইরের আলোয় আলোকিত হলো রুমটা। ডিম লাইট অফ করে মেইন লাইট অন করল। সোহার কাছে এসে কপালে গলায় হাত ছুঁইয়ে বলল,

“এখন কেমন লাগছে?”

“ভালো।”

“মাথা ব্যথা করছে?”

“ভার ভার লাগছে।”

“ওঠ।”

শ্রবণের সাহায্যে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াল সোহা। জ্বর নেই এখন, কিন্তু পুরো শরীর ব্যথা করছে, হাতটাও ব্যথায় টনটন করছে।
সোহা ওয়াশরুমে এসে বিছানার চাদর আর ওর মেক্সি কোনোটাই দেখতে পেলো না। এগুলো তো রাতে ওয়াশরুমেই দেখেছিল। শ্রবণ ধুয়ে দিয়েছে! কখন ধুয়ে দিলো? নাকি সরিয়ে রেখেছে অন্য কোথাও? বেশি ভাবল না এসব নিয়ে, ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে শুরু করল। মুখটা তেতো হয়ে আছে।

ফ্রেশ হয়ে শ্রবণের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে এলো। শ্রবণ নিজেই চেয়ার টেনে বসাল ওকে। একটা গ্যাস্টিকের ট্যাবলেট খাইয়ে দিয়ে নিজের হাতে নাস্তা খাইয়ে দিলো।
সোহার খাওয়া শেষ হলেও চেয়ারেই বসে রইল ঝিম ধরে। ওর এখন নড়তেও ইচ্ছে করছে না। ওর এত অসুস্থতা এত খারাপ কতকাল আগে লেগেছে মনে পড়ছে না। হয়তো লাগেইনি কোনোদিন। এত দুর্বল ওর কোনোদিন লাগেনি, এত অসুস্থ ফিল কোনোদিন করেনি।
শ্রবণ নাস্তা করতে করতে বলল,

“আমরা কিছুক্ষন পর হসপিটালে যাব।”

“কেন?”

“তোকে ডাক্তার দেখাতে।”

সোহা চুপ করে রইল। শ্রবণ নাস্তা শেষ করল দ্রুত। সোহাকে ধরে রুমে নিয়ে এলো। টুলের উপর বসিয়ে চুলে তেল দিয়ে দিলো চুপচুপে করে। যত্ন নিয়ে চুলগুলো আঁচড়ে দিলো আস্তে আস্তে যেন ব্যথা না পায়। আঁচড়ানো হয়ে গেলে বিনুনী করে দিলো নিজেই। সোহাকে বিনুনী করতে দেখে দেখে বিনুনী করা শিখেছে।

সোহাকে রেডি করিয়ে নিজেও রেডি হলো দ্রুত। গাড়ির চাবি, ফোন আর ওয়ালেট নিয়ে সোহার কাছে এলো। সোহাকে ধরে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো ধীর পায়ে। শ্যু কেবিনেট থেকে সোহার জুতা বের করে নিজেই পরিয়ে দিলো সোহার পায়ে। নিজে কেডস্ পরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সোহার শরীর গরম হয়ে উঠছে আবার।

                      **********

বারোটার পর সোহাকে নিয়ে হসপিটাল থেকে বের হয় শ্রবণ। পার্কিংএ এসে সোহাকে গাড়িতে বসাল। সিট বেল্ট লাগিয়ে দিয়ে নিজে বসল ড্রাইভিং সিটে। গাড়ি স্টার্ট না দিয়ে আগে কল করল সামাদ চৌধুরীর ফোনে। রিং হতেই রিসিভ হয় কল।

“আসসালামু আলাইকুম, দাদা ভাই।”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম, দাদু ভাই। কেমন আছো?”

“ভালো, তুমি কেমন আছো?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। সোহা কেমন আছে?”

“ভালো না।”

“কেন! কী হয়েছে সোহার?”

“জ্বর।”

“কবে থেকে?”

“গতরাত থেকে।”

“এখন কেমন আছে? ডাক্তার দেখিয়েছো?”

“জ্বর এখন নেই। ডাক্তার দেখিয়ে হসপিটাল থেকে বের হলাম মাত্রই।”

“জ্বর ছাড়া আরো কিছু হয়েছে নাকি?”

“হাতে শিং মাছের কাঁটা ফুটেছে।”

“আল্লাহ! কীভাবে, কবে?”

“গতকাল এগারোটার দিকে ফুটেছিল বোধহয়। মাছ কাটতে গিয়ে হাতে কাঁটা ফুটিয়ে নিয়েছিল।”

“সোহা মাছ কাটতে পারে? তাও আবার গেছে শিং মাছ কাটতে! হাতের কী অবস্থা এখন?”

“ফুলে গেছে অনেকটা। বাড়ি থেকে একজন মেইড পাঠিয়ে দিও। মাজেদা আন্টি দেশের বাড়িতে গেছেন, দুদিন পর ফিরবেন। দুপুরে রান্না করতে হবে, দ্রুত পাঠিয়ে দিও।”

“এখন গিয়ে রান্না করতে করতে তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। বাড়িতে রান্না হয়ে গেছে দুপুরের। এখান থেকে খাবার নিয়ে যাই এখন? মেইড গিয়ে না-হয় রাতের খাবার রান্না করবে।”

“আচ্ছা, নিয়ে এসো।”

“আচ্ছা, আসছি।”

“রাখছি।”

কল কেটে দিলো শ্রবণ। সোহার দিকে তাকিয়ে দেখল সোহা ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

“কিছু বলবি?”

সোহা দুদিকে মাথা নাড়ল।

“খাবি কিছু?”

“ইচ্ছে করছে না।”

শ্রবণ গাড়ি স্টার্ট দিলো। সোহা চোখ বন্ধ করে নিল, ভালো লাগছে না।

কলিং বেলের শব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শ্রবণ। দাদা ভাই এসেছেন বোধহয়।
দরজা খুলে দেখল দরজার সামনে সামাদ চৌধুরীর সঙ্গে সিয়াম আর স্পর্শ দাঁড়িয়ে আছে। স্পর্শ বলল,

“কেমন আছো, ভাইয়া?”

“ভালো, তুমি কেমন আছো?”

“ভালো।”

“ভেতরে এসো তোমরা।”

“ভাইয়া, কেমন আছো?”

“ভালো, তুই কেমন আছিস?”

“ভালো। সোহা কোথায়?”

“বেডরুমে।”

“যাই?”

“যা।”

সিয়াম বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল সোহাকে দেখার জন্য। স্পর্শ বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চেহারা শুকনো শুকনো লাগছে, চোখজোড়া কেমন যেন হয়ে গেছে।

মেইড শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“স্যার, খাবার সার্ভ করব?”

“হ্যাঁ।”

“ওকে, স্যার।”

মেইড ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। শ্রবণ ছোটো ভাই আর দাদাকে নিয়ে বেডরুমে এলো সোহার সঙ্গে দেখা করাতে। সোহা শুয়ে শুয়ে সিয়ামের সঙ্গে কথা বলছে, চোখজোড়া পানিতে টইটম্বুর, গলার স্বর ভারী। দাদা ভাই আর স্পর্শকে দেখে উঠে বসার জন্য উদ্যত হতেই শ্রবণ ওকে ধরে তুলে হেডবোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসাল।

“কেমন আছো তোমরা?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই এখন কেমন আছিস?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

সামাদ চৌধুরী নাতনির ডান হাতটা ধরে উচুঁ করলেন। স্পর্শ হাতটার দিকে তাকিয়ে আতকে উঠল। এমন হয়ে গেছে!

“দাদু ভাই, দেখেশুনে কাজ করবে না?”

“আমি তো জানতাম না শিং মাছ এভাবে কাঁটা ফুটিয়ে দেয়।”

“অনেক ব্যথা করছে?”

“এখন কমেছে অনেক, ব্যথা হালকা আছে।”

“দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠো, দাদু ভাই।”

“দোয়া করো।”

“সবসময় করি।”

“খেতে চলো সবাই।”

শ্রবণের কথায় তিনজন দরজার দিকে পা বাড়াল। শ্রবণ আর সোহার সঙ্গে খাবে বলে বাড়ি থেকে কেউ খেয়ে আসেনি।
শ্রবণ সোহাকে ধরে নিয়ে এলো ডাইনিং টেবিলের কাছে। তিনজনকে বসতে বলে সোহাকে বসাল চেয়ার টেনে।

শ্রবণকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সোহা বলল,

“তুমি বসছো না কেন? বসো।”

শ্রবণ বসল না, তিনজনকে খাওয়া শুরু করতে বলে হাত ধুয়ে নিল। প্লেট নিজের সামনে নিয়ে ভাত মেখে সোহার মুখের সামনে ধরল। সোহা চোখ-মুখ কাচুমাচু করে শ্রবণের মুখের দিকে তাকাল। বড়ো ভাই আর দাদার সামনেই শ্রবণ ওকে খাইয়ে দেবে নাকি এখন? তিনজনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল দিনজন ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জায় আড়ষ্ট হলো সোহা। শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলল,

“কী হলো? হাঁ কর।”

“আমি হাত দিয়ে খেতে পারব এখন, তুমি খাও।”

“কোনো কথা না, হাঁ কর।”

সোহা আবার তাকাল তিনজনের দিকে, মেইডের দিকেও তাকাল। চারজনই ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহার ইচ্ছে করছে এদের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে।
শ্রবণ চারজনের দিকে তাকাতেই তিনজন দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করল, আর মেইড মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

“হাঁ কর।”

সোহা হাঁ করল। বুঝতে পেরেছে শ্রবণ নিজের হাতে না খাইয়ে ছাড়বে না। অবশ্য শ্রবণের হাতে খাবার খেতে সোহার ভীষণ ভালোই লাগে, কিন্তু এখন দুই ভাই, দাদা আর মেইডের সামনে খেতে লজ্জা লাগছে।
খাবার খাওয়ার মাঝে স্পর্শ চোখ তুলে তাকাল আবার সামনে থাকা দুজনের দিকে। শ্রবণ খুবই যত্ন সহকারে সোহাকে খাইয়ে দিচ্ছে, খাবার ভালো লাগছে কি-না বারবার জিজ্ঞেস করছে, অন্যকিছু খাবে কি-না সেটাও জিজ্ঞেস করছে। সোহা হু হা না করছে আর খাচ্ছে।
ঠোঁটের কোণে তরকারির ঝোল লাগতেই টিস্যু পেপার হাতে নিয়ে দ্রুত মুছে দিলো শ্রবণ। আলতো হাতে মুছল, যেন একটু চাপ লাগলেই সোহা ব্যথা পাবে।
সোহার নজর পড়ল স্পর্শের উপর। চোখাচোখি হলো দুজনের, সোহা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কিয়ৎক্ষণ পর আবার তাকাল স্পর্শের দিকে, স্পর্শ কেমন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে ওদের দুজনের দিকে। সোহাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে স্পর্শ মুচকি হাসি উপহার দিলো, তারপর মাথা নিচু করে খাওয়া শুরু করল।

সোহা অনেক লাকী, লাকী না হলে কী শ্রবণের মতো একজন জীবন সঙ্গী পেত? স্পর্শ কী পারত শ্রবণের মতো করে সোহাকে আগলে রাখতে? যত্নে রাখতে? ভালোবাসতে? উঁহু, একদমই পারত না। স্পর্শ বেটার হলে, শ্রবণ বেস্ট। সোহা বেটার নয় বেস্ট ডিজার্ভ করত, তাইতো সেদিন ভাগ্যের চাকা ঘুরে গিয়েছিল শেষ মুহূর্তে এসে।
ওর ভাইয়া ভালো আছে, সোহা ভালো আছে। এটাই ওর কাছে সবচেয়ে বড়ো পাওয়া, সবচেয়ে বড়ো পূর্ণতা। সোহাকে না পাওয়ার জন্য ওর বিন্দু পরিমাণ আফসোস হয় না। হতো যদি সোহা ভালো না থাকত, কিন্তু সোহা তো শুধু ভালো নেই, অনেক ভালো আছে। নিজেও ভালো আছে, আর ওর ভাইয়াকেও ভালো রেখেছে।

সোহাকে খাওয়ানো শেষ করে ঔষুধ খাইয়ে দিলো শ্রবণ, তারপর নিজে খেতে বসল।
শ্রবণ রান্না করা বা ঘরের কোনো কাজে এক্সপার্ট না, সামান্য একটা কাজ করতেও ওর অনেক সময় লেগে যায়। আর এত কাজ ও একা করে কুলিয়ে উঠতে পারবে না।

দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল। মেইড তিনমগ কফি আর এককাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলো ড্রয়িংরুমে। সামাদ চৌধুরীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে স্পর্শ আর সিয়ামের হাতে কফির মগ তুলে দিলো। শ্রবণের কফির মগটা টি টেবিলের উপর রেখে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল রাতের খাবার রান্না করতে।
কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু শ্রবণ রুম থেকে বের হচ্ছে না। স্পর্শ দুবার ডাকল শ্রবণকে, সাড়া না পেয়ে কফির মগ হাতে উঠে দাঁড়াল রুমে দিয়ে আসার জন্য।
বেডরুমের দরজার সামনে এসে পা থেমে গেল স্পর্শের। ভাইয়া বলে ডাক দিতে গিয়েও কন্ঠ রোধ হয়ে এলো। দরজা হাট করে খুলে রাখায় চোখ সরাসরি সোহা আর শ্রবণের উপর গিয়ে পড়েছে।
সোহা বিছানায় বসে আছে হেডবোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে, শ্রবণ ঝুঁকে সোহার উঁচু পেটের উপর হাত রেখে পেটের কাছে মুখ নামিয়ে কথা বলছে নিজের অনাগত সন্তানের সঙ্গে, কথা বলতে বলতে চুমুও খাচ্ছে। শ্রবণ কি কি বলছে তা স্পর্শ শুনতে পাচ্ছে না তবে সোহার হাস্যোজ্বল চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে মৃদু স্বরে কিছু বলল সোহা, তারপর শ্রবণের পরিপাটি চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিলো।

দুজনকে ডিস্টার্ব না করে সোফার কাছে এগিয়ে এলো স্পর্শ। দুজনের এত সুন্দর একটা মুহূর্তে বিঘ্ন ঘটাতে চায় না স্পর্শ। শ্রবণের কফির মগ টি টেবিলের উপর রেখে নিজে বসে পড়ল সিয়ামের পাশে। সিয়াম বলল,

“কফি না দিয়ে ফিরে এলে কেন? ঠান্ডা হয়ে গেল তো।”

“ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার বানিয়ে দিবে, তুই খা তোরটা।”

সামাদ চৌধুরী বললেন,

“শ্রবণ কী করছে?”

“সোহার সঙ্গে কথা বলছে, তোমরা নিজেদের চা কফি শেষ করো।”

                        **********

সোহার কথা মতো বরই কিনে নিয়ে এসেছে শ্রবণ, কিন্তু সোহা এই বরই খাবে না। শ্রবণ হাঁ করে তাকিয়ে আছে সোহার মুখের দিকে। এই বরই খেতে কী সমস্যা এটা ওর মাথায় ধরছে না। গাল ফুলিয়ে বসে থাকা সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“বরই খেতে চেয়েছিস, এনে দিয়েছি। এখন এই বরই খেতে কীসের সমস্যা?”

“আমি এই বরই খাব না, আমি এই বরইয়ের কথা বলিনি।”

“এই বরইয়ের কথা না বললে কোন বরইয়ের কথা বলেছিস?”

“দেশি বরইয়ের কথা বলেছি।”

“তোর কী মনে হচ্ছে, এটা বিদেশে চাষ হয়েছে?”

“জানি না আমি। আমি এই বরই খাব না। তুমি দেশি বরই নিয়ে এসো, ছোটো ছোটো টক বরই।”

“এখন এই বড়ো বড়ো মিষ্টি বরই খা, পরে ছোটো ছোটো টক বরই এনে দিব।”

“না। তুমি এখনই টক বরই এনে দিবে, আমি এই মিষ্টি বরই খাব না।”

“দেখ; সোহা, জেদ করবি না। ভার্সিটিতে ক্লাস শেষ করে এই রোদের মধ্যে বাজারে গিয়ে ঘুরে ঘুরে তোর জন্য এত সুন্দর আর ভালো বরই এনেছি, এখন এগুলো খাবি না? বলছি তো পরে এনে দিব, এখন এগুলো খা।”

“এখনই এনে দিবে, আমি এগুলো খাব না; মানে খাব না।”

“আগে বলতে পারলি না টক বরই খাবি!”

“তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছো?”

“খাবি তুই, তুই বলবি না? কল করে বরইয়ের কথা বলতে পারলি আর কোন বরই খাবি এটা বলতে পারলি না?”

“খাব না বরই, লাগবে না তোমার বরই,”

বলেই ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে মাথা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে পড়ল সোহা। শ্রবণ মাজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল দাঁতে দাঁত চেপে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই মেয়ে ওর হাড় মাংস জ্বালিয়ে শেষ করে দিচ্ছে। না পারে কিছু বলতে, আর না পারে সহ্য করতে। আগের শ্রবণ চৌধুরী হলে এতক্ষণে একটা চড় দিয়ে চোয়ালের সব দাঁত খুলে নিত। এই মেয়ের যন্ত্রণায় এখন ওর নিজের চোখ দুটোই খুলে ফেলতে ইচ্ছে করে, কান দুটো কালা বানিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। চোখ দিয়ে দেখবেও না, কান দিয়ে শুনবেও না তাহলে আর কোনো যন্ত্রণাও দিতে পারবে না এই বজ্জাত মেয়ে।

ধুপধাপ শব্দ তুলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল শ্রবণ। সোহা চুপচাপ শুয়ে রইল আগের মতোই। ও বলেছে বরই খাবে, শ্রবণ জিজ্ঞেস করবে না কোন বরই খাবে? করল না কেন? দোষ তো শ্রবণেরই, ওর উচিত ছিল না জিজ্ঞেস করা? বদ মেজাজি পুরুষ মানুষ। শুধু শুধু ওর উপর রাগ দেখায়।

ত্রিশ মিনিট পর রুমে ফিরে এলো শ্রবণ। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল সোহা বসে বসে বরই খাচ্ছে। কটমট করে তাকিয়ে বলল,

“তুই না এই বরই খাবি না? এখন খাচ্ছিস না?”

“আমার যেগুলো খেতে ইচ্ছে করছে; তুমি তো সেগুলো এনে দিচ্ছো না তাই এগুলোই খাচ্ছি।”

শ্রবণ আরো কিছুক্ষন কটমট করে তাকিয়ে থেকে হাতে থাকা বরইয়ের প্যাকেট সোহার কোলের উপর রাখল। সোহা প্যাকেট খুলে দেখল দুই রকমের বরই। বরই গুলো দেখেই সোহার চোখ জুড়িয়ে গেল, মনে শান্তি লাগল, জীবে জল চলে এলো। শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত বরই কেন?”

“একটা বেশি টক, আরেকটা কম টক। নিয়ে আসার পর আবার যেন বাহানা করতে না পারিস সেজন্যে দুটোই নিয়ে এসেছি।”

“এতগুলো খাব কীভাবে?”

“সারাদিন খাবি।”

“আগামীকাল থেকে রোযা শুরু, সারাদিন কীভাবে খাব?”

“একেবারেই খেয়ে ফেল সব, আমাকেও খেয়ে ফেল। তোর এই যন্ত্রণা আর ভাল্লাগেনা।”

“আমারো ভাল্লাগেনা।”

“ধ্যাত।”

শ্রবণ মেজাজ দেখিয়ে সোহার সামনে থেকে সরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে আবার তাকাল সোহার দিকে। সোহা হাতের ইশারায় শ্রবণকে কাছে ডাকল। ঘড়ি খুলে রেখে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে এলো সোহার কাছে। সোহা নিজের কোলের উপর থেকে বরইয়ের প্যাকেট সরিয়ে রাখল। শ্রবণকে বসতে বলল নিজের সামনে। শ্রবণ বসতেই সোহা ওর গলা জড়িয়ে ধরল। উচ্ছসিত কন্ঠে বলল,

“তুমি অনেক ভালো, বাবুর আব্বু।”

“একদম নাটক করতে আসবি না।”

“নাটক করছি না আমি, তুমি আসলেই অনেক ভালো, উম্মাহ।”

ছোটো বাচ্চাদের মতো মুখ দিয়ে উম্মাহ বলে চুমু খেলো শ্রবণের গালে। শ্রবণ হেসে ফেলল সোহার এমন কাজে। সোহাকে ধরে কোলের উপর শোয়াল। এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর থেকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,

“এত বজ্জাত হয়েছিস কবে থেকে?”

“তোমার আস্কারা পাই যবে থেকে।”

“কী বললি?”

“কিছু না।”

বিড়বিড় করে বলায় শ্রবণ শুনতে পায়নি সোহার বলা কথাগুলো। সোহা শ্রবণের দুই গালে দুটো চুমু খেয়ে সরে এলো ওর কাছ থেকে।
পুনরায় আগের জায়গায় বসে মিষ্টি বরই খেতে শুরু করল। শ্রবণ গায়ের শার্ট খুলে ফেলল। সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“ও বাবুর আব্বু, কটা টক বরই ধুয়ে এনে দাও না।”

শ্রবণ হাত বাড়িয়ে বরইয়ের প্যাকেট হাতে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“এই কদিনে এত অলস হয়েছিস যে এক গ্লাস পানি ভরে খেতেও তোর এখন কষ্ট লাগে।”

সোহা বলল না কিছু। আসলেই এখন অলস হয়ে গেছে, কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করে না।
শ্রবণ রুম থেকে বের হতে হতে বিড়বিড় করে বলল,

“আমার এত ধৈর্য হলো কীভাবে? নিজের ধৈর্য দেখে নিজেরই অবাক লাগে।”

                        **********

আসরের নামাজ আদায় করে বাবুর জন্য কাঁথা সেলাই করতে বিছানায় উঠে ঠেস দিয়ে বসল সোহা। বেশ কয়েকটা সেলাই করা হয়ে গেছে। শ্রবণ ভার্সিটিতে চলে গেলে একা একা বসে থাকত, তাই সেই সময়টুকুতেই একটু একটু করে সেলাই করত। মাজেদা আন্টিকে দিয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছু অনিয়ে নিয়েছিল। আর সেলাই করা ইউটিউব থেকে শিখেছে। বাবুর কাঁথা লাগবে এটাও ইউটিউবের একটা ভিডিও দেখে মাথায় এসেছিল তারপরই নিজ হাতে সেলাই করার ভূত ভর করে।

মাছের কাঁটা ফোটার পর আর কাঁথা সেলাই করেনি এ কদিন। আজকে সেলাই করার ইচ্ছে জেগেছে।
কফির মগ হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করল শ্রবণ। সেহরীতে খাওয়ার জন্য মাজেদা আন্টি রান্না করছেন এখন।
সুই সুতা দিয়ে সোহাকে কিছু সেলাই করতে দেখে কপাল-ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলো কাছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল,

“কী সেলাই করছিস এটা?”

সোহা শ্রবণের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সেলাই করতে করতে বলল,

“বাবুর জন্য কাঁথা সেলাই করছি।”

“কার জন্য কী সেলাই করছিস?”

“কানে কী সমস্যা হয়েছে? চোখের পাওয়ারও বোধহয় বেড়ে গেছে তাইনা? বাবুর জন্য কাঁথা সেলাই করছি।”

“কেন?”

“লাগবে তাই।”

শ্রবণ সোহার পাশে বসল। বাম হাতে ছোটো কাঁথাটা নেড়ে চেড়ে দেখল, সুন্দর ডিজাইন করে ফুল তুলেছে। কফি খেতে খেতে সোহার সেলাই করা দেখতে লাগল।

“কতদিন ধরে সেলাই করিস?”

“অনেকদিন।”

“কটা সেলাই করা হয়েছে?”

“ছয়টা বা সাতটা।”

“এতগুলো!”

“হুম।”

“কোথায় সেগুলো?”

“কাবার্ডে।”

“এতদিন আমার নজরে পড়েনি কেন?”

“তুমি দেখনি তাই।”

শ্রবণ বিছানা ছেড়ে নেমে কাবার্ডের কাছে এগিয়ে এলো। ভেতর থেকে বের করল সাতটা কাঁথা। সবগুলোর কালার ভিন্ন, নকশী ভিন্ন। সবগুলো নিয়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এলো। ভাঁজ খুলে দেখল ভালোভাবে।

“বের কর, কোলে নিব আমি।”

“কী বের করব?”

“বাবুকে।”

বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সোহা। নিজের উঁচু পেটের দিকে তাকিয়ে আবার শ্রবণের মুখের দিকে তাকাল, তারপর বলল,

“এসো, বের করো তুমি।”

“সময় যায় না কেন? কবে হবে? আর কত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করব?”

“হওয়ার সময় হতে এখনো অনেক দেরি। উল্টাপাল্টা কথা না বলে কাঁথা যেখান থেকে এনেছো সেখানে রেখে এসো।”

শ্রবণ একটা কাঁথা সোহার পেটের উপর রাখল। পেটের দুপাশে দুই হাত রেখে বলল,

“আব্বু, দ্রুত চলে এসো তো, আর ভাল্লাগেনা।”

সোহা বিড়বিড় করে বলল,

“বাবু হওয়ার পর বলবে, ‘তোদের মাও-ছাও-এর যন্ত্রণায় আর ভাল্লাগেনা’।”

“এই ডাইনির বাচ্চা, কী বললি?”

চলবে………

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply