Golpo romantic golpo দিশেহারা

দিশেহারা পর্ব ২৬


দিশেহারা (২৬)

সানা_শেখ

শ্রবণের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ বন্ধ রেখেই বিছানা হাতড়ে ফোন খোঁজে। এক হাতে তখনও সোহাকে জড়িয়ে ধরে আছে। ফোনে সময় দেখে নিয়ে ফোন আবার রেখে দেয়।

কাত থেকে চিৎ হয়ে শোয়। সোহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখার কারণে সোহা ওর বুকের উপর উঠে গেছে। সোহার ঘুম ভেঙে যায়। নিজেকে শ্রবণের বুকের উপর আবিষ্কার করে বুকের উপর থেকে নেমে যেতে চায় দ্রুত তবে শ্রবণের জন্য পারে না। শ্রবণ শক্ত করে চেপে ধরে আছে দুই হাতে।

“ছাড়ো।”

শ্রবণ ছাড়ে না, সোহাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই শোয়া থেকে উঠে বসে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহা দ্রুত আঁকড়ে ধরে শ্রবণকে। দ্রুত শ্রবণকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে নখের আঁচড় দিয়ে দিয়েছে শ্রবণের উন্মুক্ত পিঠে। ভয়ে পিঠ থেকে হাত সরিয়ে নেয় দ্রুত, নিশ্চিত বকা খাবে এখন।

শ্রবণ সোহাকে একইভাবে ধরে রেখে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। সোহা নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করেই খামচে ধরেছিল শ্রবণের হাত। শ্রবণ চেঁচিয়ে উঠেই সোহাকে ছেড়ে দেয়। বেচারি ঠাস করে পড়ে নিচে।

মেইন লাইট অন করে ডান হাতের দিকে তাকায় শ্রবণ। সোহার নখের আঁচড়ে কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। জ্বলছে এখন।

সোহা নিচ থেকে উঠে দাঁড়ায়। ব্যথা পেয়েছে। শ্রবণের দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ কটমট করে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে রাগের চোটে এখন ফেটেই যাবে।

শ্রবণ সজোরে ধমক দিয়ে বলে,

“কু/ত্তা/র বাচ্চা খুবলে খুবলে খাবি নাকী আমাকে? জীবনে মাংস খাসনি?”

সোহা নিজের নখের দিকে তাকায়। শ্রবণের হাতের চামড়া ওর নখের ভেতর ঢুকে রয়েছে। পুনরায় শ্রবণের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে,

“আমি ইচ্ছে করে করিনি, ভয় পেয়ে ধরতে গিয়ে —”

শ্রবণ ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে বলে,

“কিছুই করিনি তাতেই পিঠ, পেট, হাতের চামড়া খামচে তুলে ফেলেছিস, কিছু করলে নাজানি কী করতি। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হাতের নখ বড়ো দেখলে প্লাস দিয়ে টেনে পুরোটাই তুলে ফেলব।”

বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে ধারাম করে দরজা লাগায়। কেঁপে উঠে হাতের নখের দিকে তাকায় সোহা। নখগুলো তো ছোটো ছোটোই। ও তো কোনো কালেই হাত-পায়ের নখ বড়ো করে না। ওর হাতের নখের ধার বেশি, মাঝেমধ্যে তো ওর নিজের নখ দিয়ে নিজের চামড়াই উঠে যায়।

শ্রবণের ভয়ে নেইল কা’টা’র খুঁজতে শুরু করে কিন্তু পায় না। ওয়াশরুমের দরজায় নক করে। ভেতর থেকে শ্রবণের কর্কশ গলার স্বর ভেসে আসে।

“কী হয়েছে?”

“নেইল কা’টা’র কোথায়?”

“আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি।”

সোহা শুষ্ক ওষ্ঠ জোড়া জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে বলে,

“খুঁজে পাচ্ছি না।”

“ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে খুঁজে দেখ।”

সোহা ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। পুনরায় তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করে। অনেকক্ষণ খোঁজার পর পায়।

ফ্লোরেই ল্যাটা দিয়ে বসে হাত-পায়ের নখ কাটতে শুরু করে। দোষ করবে নিজে আর শাস্তি দেবে ওকে, বজ্জাত ছেলে। কে বলেছিল ওভাবে ধরে উঠে বসতে আর বিছানা থেকে নামতে?

সোহার নখ কা’টা হতে হতে শ্রবণ গোসল সেরে বেরিয়ে আসে।
সোহা বসা থেকে উঠে নেইল কা’টা’রটা আগের জায়গায় রেখে দেয়।
শ্রবণের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
শ্রবণের ফরসা চকচকে পিঠ লাল হয়ে আছে।

প্রায় দশ মিনিট পেরিয়ে যায়। শ্রবণ ওয়াশরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে,

“ডাইনির বাচ্চা সারাদিন কী এখন ওয়াশরুমেই বসে থাকবি নাকী? বের হচ্ছিস না কেন এখনও? কী করছিস ভেতরে?”

হঠাৎ দরজায় ধাক্কা আর শ্রবণের বাজখাঁই গলার স্বর শুনে চমকে ওঠে সোহা। শ্রবণ এখনও জিমে যায়নি?

“ম’র’লি নাকী? কথা বলছিস না কেন? নাকী আরেক ব্যাডার কথা ভাবতে ভাবতে বের হওয়ার কথা ভুলে গেছিস?”

“হয়ে গেছে, আসছি।”

দুই মিনিট পর চুলে টাওয়েল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বেরিয়ে আসে সোহা। শ্রবণের দিকে তাকিয়ে দেখে ট্রাউজার টিশার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। জিমে না গিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেই বসে,

“আজকে জিমে যাবে না?”

“না। কফি নিয়ে আয় যা।”

সোহা সোজা রুম থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরে চলে আসে।


এগারোটার পর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে শ্রবণ। বাইক নিয়ে সোজা চলে আসে বন্ধুদের কাছে। বাইরেও যেতে ইচ্ছে করছিল না আবার ফ্ল্যাটেও থাকতে ভালো লাগছিল না।

ভার্সিটির ক্যাম্পাসেই ছিল ওর বন্ধুরা।
সিফাত নামের ছেলেটি শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,

“হেলমেট খুলছিস না কেন? পর্দা শুরু করেছিস নাকী?”

পাশ থেকে রাব্বি নামের ছেলেটি হেলমেট খোলার চেষ্টা করলে শ্রবণ ঝাড়া দিয়ে ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,

“হাত দূরে রাখ।”

“হেলমেট খোল।”

শ্রবণের হেলমেটের গ্লাস উঠিয়ে বলে,

“কেন?”

হাসানের নজর পড়ে শ্রবণের ডান হাতের দিকে। লাল হয়ে ফুলে আছে একটা ছোটো ক্ষত।

“শ্রবণ, তোর হাতে কী হয়েছে?”

শ্রবণ সহ বাকিদের নজর ওর হাতের দিকে পড়ে। রাব্বি থাবা দিয়ে হাতটা ধরে বলে,

“দেখে তো মনে হচ্ছে খামচির দাগ।”

“আরে, আমাদের ভাবী খামচি দিয়েছে।”

শ্রবণ নজর হাসানের দিকে পড়তেই হাসান চোখ দিয়ে ইশারা করে। শ্রবণ কিছু না বলে রাব্বির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,

“ভাবী খামচি দিয়েছে নাকী বিলাই খামচি দিয়েছে সেটা তো তোদের জানার প্রয়োজন নেই।”

“কেন প্রয়োজন নেই? বিলাই খামচি দিলে ভ্যাকসিন দিতে হবে আর ভাবী খামচি দিলে —”

পুরো কথা শেষ না করে চোখেমুখে দুষ্টামি হাসি ফুটিয়ে তোলে। শ্রবণ বিরক্ত হয়ে বলে,

“ভালো লাগছে না? খামচি খেতে ইচ্ছে করছে?”

“ভাই, আমার বউও নেই আর বিলাইও নেই তাই খামচি খাওয়ার চান্সও নেই।”

“আমি তো আছি, আয় কোথায় কোথায় খামচি খেতে চাস দিয়ে দেই।”

“ছিঃ, অশ্লীল ব্যাডা। তোর কাছ থেকে কেন খামচি খাব তাও যেখানে সেখানে?”

“বিকজ তোর খামচি দেওয়ার কেউ নেই সেজন্য।”

হাসান বলে,

“হেলমেট খোল তো, তোর চেহারা দেখি। গতরাত থেকে তোর চেহারা দেখা হয়নি।”

শ্রবণ আগের চেয়েও বেশি বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,

“কি হেলমেট নিয়ে পড়েছিস সবাই?”

“তুই কীসের পর্দা করছিস?”

শ্রবণ হেলমেট খুলে ফেলে। ওর চেহারা দেখে কিছুক্ষণ পাঁচজন হা করে তাকিয়ে থাকে। হাসান বিস্ময় নিয়ে বলে,

“শ্রবণ, তোর গালে কী হয়েছে?”

সকলের একই প্রশ্ন। শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,

“ব্যথা পেয়েছি দেখছিসই।”

“কীভাবে পেয়েছিস সেটা জিজ্ঞেস করছি।”

সিফাত বলে,

“ভাবী কা’ম’ড় দিয়েছে নাকী?”

সাকিব সিফাতের মাথায় চাটি মেরে বলে,

“কা’ম’ড় দিলে এমন হয়? অন্য কিছু হয়েছে।”

হাসান বলে,

“তোরা থামবি নাকী? ওকে বলতে দে।”

শ্রবণ বলে না কিছু, পুনরায় হেলমেট পরে বাইকের উপর বসে থাকে। সকলের দৃষ্টি ওর দিকে স্থির।
শ্রবণ কপাল ভ্রু কুঁচকে সকলের দিকে নজর বুলিয়ে বলে,

“এভাবে দেখা বন্ধ কর সবাই।”


রাত বারোটার পর বাড়িতে ফেরে হাসান। এতক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিল।

মিসেস রিমা নিজেদের রুমের দিকে এগিয়ে যান, হাসান নিজেও নিজের রুমে চলে আসে।

ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে ওর বিছানার উপর রিতা বসে আছে। ওকে দেখেই হাসান কপাল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আলমারি থেকে দ্রুত টিশার্ট বের করে গায়ে জড়ায়।
ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে,

“এত রাতে না ঘুমিয়ে তুই এখানে কেন? যা নিজের রুমে।”

“আমি যে তোমাকে একটা জিনিস আনতে বলেছিলাম, সেটা এনেছ?”

হাসান চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলে,

“ওহ শিট, এখন এটার জন্য আমার মাথা খাবে বাচালটা।”

রিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ভুলে গেছি, আগামীকাল এনে দেব।”

রিতা গাল ফুলিয়ে বলে,

“কী? আমি সেই বিকেল থেকে অপেক্ষা করে আছি আর তুমি আনতেই ভুলে গেছ?”

“এখন গিয়ে ঘুমা, আগামীকাল এনে দেবো বলেছি তো।”

রিতা ওষ্ঠ জোড়া উল্টে বলে,

“তুমি ইচ্ছে করেই আনোনি।”

“বলছি তো ভুলে গেছি। আগামীকাল এনে দেব।”

“আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে নয়তো এখনই এনে দেবে।”

“তোকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবো না আমি।”

“এখনই এনে দাও তাহলে।”

“দোকানদাররা তো তোর জামাই আর শ্বশুর হয় তাই তোর জন্য এই মাঝরাতে দোকান খুলে বসে আছে।”

“আস্তাগফিরুল্লাহ, দোকানদাররা কেন আমার জামাই আর শ্বশুর হবে? আমার জামাই তো তুমি হবে, শ্বশুর কোথায় রয়েছে সেটা তো জানি না।”

“বাচালের বাচ্চা আরেকটা উল্টাপাল্টা কথা বলবি তো লাথি দিয়ে তোর মাজা ভেঙে দেব। বেয়াদ্দব কোথাকার, যা বের হ আমার রুম থেকে।”

“যাব না, উল্টা পাল্টা কথা কখন বললাম?”

“তোর মতো বাচালকে কে বিয়ে করবে? সারা জীবন সিঙ্গেল থাকবো তবুও তোকে বিয়ে করবো না।”

“দেখা যাবে সেটা, কাকে বিয়ে করো।”

“এই তুই বের হ আমার রুম থেকে।”

“যাব না।”

“কবে থেকে মামাকে বলছি এই আপদটাকে বিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করতে কিন্তু মামা শুনছেই না আমার কথা। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তোর জন্য পাত্র খুঁজে নিয়ে আসবো, না পেলে রাস্তা থেকে পাগল ধরে নিয়ে এসে বিয়ে দিয়ে দেবো তারপর দুই পাগল মিলে এক সঙ্গে পাগলামি করবি। এখন বের হ আমার রুম থেকে, এক কথা কতবার বলতে হয় তোকে?”

কথাগুলো বলতে বলতে রিতার কাছে এগিয়ে আসে। হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে বলে,

“যা, গিয়ে ঘুমা। আগামীকালই তোর জন্য জামাই খুঁজে নিয়ে আসবো, দু’জন মিলে এক সঙ্গে রাত জাগবি আর পাগলামি করবি।”

“আমি কী অন্যের জন্য পাগলামি করি? তোমার জন্য পাগল হয়েছি আর তোমার জন্যই পাগলামি করি।”

“তোর পাগলামি আমি সহ্য করতে পারবো না, তোর মতো পাগল না আমি।”

রিতাকে টেনে নিয়ে রুমের বাইরে বের করে দিয়ে মুখের ওপরে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়। রিতা বাইরে থেকে বলে,

“কালকে না এনে দিলে দেখে নিও কি করি আমি। যেমন ছবি দিয়েছি তেমনই যেন হয়।”

“গিয়ে ঘুমাবি নাকী বাড়ির বাইরে নিয়ে রেখে আসবো শেয়াল কু’কু’রের সঙ্গে?”

রিতা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,

“যেখানে তোমার মতো বাঘকে ভয় পাই না সেখানে সামান্য শেয়াল কু’কু’রকে কে ভয় পায়?”

একা একা বকবক করতে করতে নিজের রুমে চলে আসে। সেই বিকেল থেকে অধির আগ্রহে বসে ছিল আর এখন এসে বলছে আনেনি, ভুলে গেছে। শুধু শুধু সাধের ঘুমের বারোটা বাজালো।
বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে দিন দুনিয়া আর খেয়াল থাকে নাকী?

চলবে………….

আরও বড়ো করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু হঠাৎ করে চোখে সমস্যা হয়েছে। যেদিকে তাকাচ্ছি সব ঘোলা দেখছি। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে তো আরও কিছু দেখছি না। চোখের সমস্যা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নেক্সট পার্ট দিতে পারবো না। সবাই দোয়া করবেন আমার জন্য। ভালো থাকবেন সবাই, ধন্যবাদ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply