দিশেহারা (১৫)
সানা_শেখ
বিকেলেই বাড়িতে ফিরে আসে শ্রবণ। ডাক্তার একদম স্ট্রেস নিতে নিষেধ করে দিয়েছেন। উত্তেজিত হওয়াই যাবে না।
ড্রয়িং রুমে এসে আশে পাশে নজর বুলায়। মেড ছাড়া কেউ নেই ড্রয়িং রুমে।
সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে রাগী স্বরে ডেকে ওঠে,
“অনিমা-তনিমা কু/ত্তা/র বাচ্চা নিচে আয়। শামীম রেজা জা/নো/য়া/র তুইও নিচে আয়।”
শ্রবণের ডাকার ধরন দেখে ড্রয়িং রুমে থাকা সবাই স্তব্ধ। কেমন হিংস্র শোনাচ্ছে গলার স্বর।
কিছুক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন কেউ নিচে আসে না তখন আরো রেগে গিয়ে বলে,
“নিচে আসবি নাকী আমি উপরে আসবো?”
শামীম রেজা চৌধুরী আগে আগে নেমে আসেন সিঁড়ি বেয়ে। ওনার পেছন পেছন আসছেন দুই বোন। দু’জনের পেছন পেছন আসছে সোহা। সোহা সকালেই বাড়িতে ফিরে এসেছিল।
তনিমা চৌধুরী স্বাভাবিক থাকলেও স্বাভাবিক নেই অনিমা চৌধুরী। চেহারায় কালশিটে দাগ পড়ে আছে। কপালের পাশে চামড়া ছুলে জখম হয়ে রয়েছে। ফরসা হাতে আঘাতের দাগ স্পষ্ট। দেখে বোঝাই যাচ্ছে উত্তম-মাদ্যম দেওয়া হয়েছে।
সামাদ চৌধুরী ছোটো ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“কী করেছো এসব?”
শাহীন রেজা চৌধুরী খ্যাপাটে দৃষ্টিতে অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“কী করেছি? ও যা করেছে তাতে তো ওকে গলা পর্যন্ত মাটির নিচে গেড়ে ইট পাটকেল ছুঁড়ে মা’রা উচিত।”
অনিমা চৌধুরী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। রাতে শাহীন রেজা চৌধুরী ওনাকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন যাচ্ছিলেন না তখন ভয়ংকর রকমের রেগে গিয়ে হুশ জ্ঞান হারিয়ে ইচ্ছে মতো মে’রে’ছিলেন। মা’র খাওয়ার কারণে রাত থেকেই ওনার ভীষণ জ্বর। জীবনে গায়ে ফুলের টোকাও পড়েনি, শাহীন রেজা চৌধুরী তো মনের ভুলেও কোনোদিন উঁচু গলায় কথা বলেননি ওনার সঙ্গে। সেই মানুষ গত রাতে ওনার গায়ে হাত তুলেছে। মা/র/তে মা/র/তে আধম/রা বানিয়ে ফেলেছিলেন।
শ্রবণ তিন জনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“খুব তেল জমেছে তোদের শরীরে তাইনা? তোদের তেল কীভাবে বের করতে হবে খুব ভালো করেই জানি আমি। অনেক উড়েছিস, এবার আমি তোদের উড়ার ব্যবস্থা করব। মেড।”
মেড দু’জন এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়ায়। শ্রবণ দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আজ থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য আপনাদের ছুটি। বেতন প্রত্যেক মাসে পেয়ে যাবেন। এখন ব্যাগ প্যাক করে যান এখান থেকে।”
দু’জন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শ্রবণের মুখের দিকে।
“কী বলেছি বুঝতে পারেননি?”
“জি স্যার, বুঝতে পেরেছি।”
“যান।”
দু’জন নিজেদের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
শ্রবণ দুই বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আজ থেকে বাড়ির সব কাজ তোরা দু’জন করবি। যদি কাজ না করিস তাহলে না খেয়ে থাকবি নয়তো গেট খোলা আছে সোজা বেরিয়ে যাবি।”
ঘাড় কাত করে বাবার দিকে তাকায়। ছেলের তাকানো দেখেই শুকনো ঢোঁক গিলে নেন শামীম রেজা চৌধুরী। শ্রবণ ওনার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আগামী দুই দিনের মধ্যে আমার শেয়ারের সকল হিসাব চাই আমার। এক পয়সার হিসাব গড়মিল হলেও খবর আছে তোর। আমার টাকায় খেয়ে, পরে, উড়ে বেরিয়ে অনেক তেল জমিয়েছিস। হিসাব গড়মিল হলে শরীরে এক ফোঁটাও তেল অবশিষ্ট থাকবে না। গত বিশ বছরের হিসাব পাই টু পাই চাই আমার।”
ছেলের কথা শুনে দরদর করে ঘামতে শুরু করেছেন শামীম রেজা চৌধুরী। ওর শেয়ারের হিসেব তো মিলবে না। ওর শেয়ারের অর্ধেকের বেশি টাকা মে’রে দিয়েছেন। এখন হিসাব মেলাবেন কীভাবে? এই ছেলে যে কোনোদিন নিজের শেয়ারের হিসাব চাইবে সেটা তো কোনোদিন ভাবেননি। এইসব নিয়ে তো এই ছেলের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না কোনোদিন।
অনার্স শেষ করার পর সামাদ চৌধুরী নাতিকে বলেছিলেন অফিস জয়েন করার জন্য। অফিস জয়েন করলে কাজে বিজি থাকবে তাতে অন্য চিন্তা ভাবনা মাথায় আসবে কম। মানসিক স্ট্রেস কমবে, কিন্তু শ্রবণ রাজি হয়নি। ওর এইসব অফিস বিজনেস কিছুই ভালো লাগে না। যেমন আছে সেভাবেই থাকবে।
শামীম রেজা চৌধুরী মনে মনে চাইছিলেন শ্রবণ যেন অফিস জয়েন না করে। এই ছেলে এমনিতেই ওনাকে সম্মান দেয় না, যখন তখন মান সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু করে। বাড়ির সকলের সামনে তো করেই অফিস জয়েন করলে স্টাফদের সামনেও করবে। এতবেজ্জুতি উনি হতে চাননি।
শ্রবণ বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“হিসাব না মিললে তোকে যে কি করবো তুই নিজেও জানিস না। একেবারে রাস্তায় নামিয়ে ছাড়বো, কামলা দেওয়া ছাড়া কোনো পথ খুঁজে পাবি না। হয়তো কামলা দেওয়ার জন্য বাইরেও থাকবি না।”
সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েও থেমে যায়। স্পর্শের কাঁধে চাপড় দিয়ে বলে,
“থ্যাংক ইউ ভাই।”
বলেই চলে যায়। স্পর্শ বুঝতে পারলো না শ্রবণ ওকে ধন্যবাদ দিলো কেন। ধন্যবাদ পাওয়ার মতো তো কিছু করেনি এখন।
স্পর্শ বুঝতে না পারলেও যারা বোঝার তারা ঠিকই বুঝতে পেরে গেছে।
মেড দু’জন সকলের সামনেই বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
কেউ কিছুই বলতে পারে না।
সামাদ চৌধুরী সোহাকে নিজের রুমে নিয়ে এসেছেন। সোহাকে বিছানায় বসিয়ে নিজেও বসেন পাশে। সোহার এক হাত মুঠো করে ধরে বলেন,
“শ্রবণ তোমাকে কিছু বলেছে সকালে?”
“শুধু বলেছিল সামনে না যেতে।”
“আর কিছু বলেনি?”
দু’দিকে মাথা নাড়ে সোহা। সামাদ চৌধুরী বলেন,
“শ্রবণ তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাইছে। ও তোমাকে এই কথা বললে তুমিও হয়তো রাজি হয়ে যাবে কিন্তু আমি চাইনা তোমাদের ডিভোর্স হোক।”
ডিভোর্সের কথা শুনে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে সোহার। সামাদ চৌধুরী আবার বলেন,
“শ্রবণ ছোটো থেকেই অনেক কষ্ট পেয়ে বড়ো হয়েছে। তুমি সবকিছু শুনেছোই, এখন আর কোনকিছু অজানা নেই তোমার। ওর মা মা’রা যাওয়ার পর থেকে নিঃসঙ্গ ভাবেই থেকেছে এতগুলো দিন। ওকে গত দুই বছর ধরে হাজার বার বলেও বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারিনি আমি। জেদ ধরে হোক আর যাই করে হোক অবশেষে তোমাকে বিয়ে করেছে। গত দিনগুলো তোমার সঙ্গে একসাথে থেকেছে। আমি চাই বাকী জীবনটাও তোমার সঙ্গেই থাকুক। ও একবার তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলে বাকী জীবনে নিজের সঙ্গে আর কাউকে জড়াবে না। বাকী জীবনটা একাই কাটিয়ে দেবে। ওর জীবনটা এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। তুমি একবার যখন ওর হাত ধরেছো আর ছেড়ো না। শ্রবণ ডিভোর্সের কথা বললে তুমি রাজি হবে না কিছুতেই।”
“রাজি না হলে মা’র’বে।”
“শ্রবণ তোমার গায়ে হাত তোলে?”
দু’দিকে মাথা নাড়ায় সোহা।
“তাহলে এত ভয় পাচ্ছো কেন? শ্রবণের সঙ্গী প্রয়োজন, ডাক্তার বলেছেন এভাবে একা একা থাকলে আবার মানসিক অবস্থা খারাপের দিকে যাবে। আবার স্ট্রোক করলে হয়তো ম’রেই যাবে। তুমি পারবে ওকে পরিবর্তন করতে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সোহা কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে চুপচাপ। সামাদ চৌধুরী নাতনির চুলে হাত বুলিয়ে বলেন,
“শ্রবণ অনেক কষ্ট করেছে জীবনে, আমি চাই বাকী জীবনটা তোমাকে নিয়ে সুন্দরভাবে পার করুক। তোমরা একসাথে থাকো, একে অপরকে ভালোবাসে ভালো রাখো, তোমাদের দু’জনের সুন্দর একটা সংসার হোক।”
সোহা চুপচাপ দাদার কথা শোনে মন দিয়ে। সামাদ চৌধুরী আরো অনেক কথা বলেন। সব শোনে সোহা।
সন্ধ্যার পর শ্রবণের রুমে প্রবেশ করে সোহা। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে চিৎ হয়ে। বরাবরের মতো বুকের উপর বালিশ চেপে ধরে আছে।
সোহা ধীর পায়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। দরজা লাগানোর শব্দে শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকায়। বুঝতে পারে সোহা এসেছে।
ডান হাত দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা পানি টুকু মুছে নেয়।
একটু পরেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে সোহা। হাত মুখে পানির ফোঁটা বিদ্যমান। ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলের উপর ভেজা টাওয়েল দলা করে রেখে দিয়েছে শ্রবণ। হেঁটে এগিয়ে এসে টাওয়েল হাতে তুলে নেয়। হাত মুখ মুছতে শুরু করতেই শ্রবণের গম্ভীর গলার স্বর ভেসে আসে। হঠাৎ কথা বলায় চমকে ওঠে সোহা। বিছানার দিকে তাকায়।
“তুই এই রুমে কেন?”
“কোথায় যাব?”
“তোকে নিষেধ করেছি না আমার সামনে আসবি না? এসেছিস কেন? বের হ আমার রুম থেকে।”
“তু তুমিই তো নিয়ে এসেছিলে আমাকে।”
“এখন আমি যেতে বলছি, যা। আর কোনোদিন আসবি না আমার রুমে আর আমার সামনে। খুব শীগ্রই ডিভোর্স পেয়ে যাবি তারপর যাকে খুশি তাকে বিয়ে করে নিবি। আজ থেকে তুই মুক্ত, যত খুশি, যেখানে খুশি উড়ে বেড়া।”
“ডিভোর্সই যখন দেবে তাহলে বিয়ে করেছিলে কেন জোর করে?”
শ্রবণ আগের চেয়েও রেগে তাকিয়ে থাকে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“যেতে বলেছি আমার সামনে থেকে, যা।”
“আমার সবকিছু তো এই রুমেই।”
“গুছিয়ে নিয়ে বিদায় হ আমার চোখের সামনে থেকে। তোদের সহ্য হচ্ছে না। তোকে ডিভোর্স দিতে পারলেই আমি শান্তি পাবো। তোকে দেখলেই তোর মায়ের কু’কর্মের কথা মনে পড়ে। তুইও নিশ্চই তোর মায়ের মতোই হয়েছিস। দ্রুত বিদায় হ আমার সামনে থেকে।”
চলবে………..
আজকে কী জগা খিচুড়ি লিখেছি নিজেও জানি না। কেমন হয়েছে অবশ্যই মতামত জানাবেন সবাই।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
দিশেহারা পর্ব ২৮