Golpo romantic golpo তোমার হাসিতে

তোমার হাসিতে পর্ব ২২


তোমার_হাসিতে

ফারহানাকবীরমানাল

২২.
বাবা বাড়িতে ছিলেন না। প্লেটে ভাত বাড়ার পরপরই ঘরে ঢুকলেন। হাতে ধরা ব্যাগটা সোফার একপাশে রেখে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলেন। ছোট চাচা বলল, “সাজ্জাদ ওর মাকে সোনার আংটি বানিয়ে দিয়েছে। চুড়ি দিয়েছে। আপনি এসবের কিছু জানেন?”

বাবা বিস্মিত চোখে তাকালেন। সরু গলায় বললেন, “এত টাকা তুমি কোথায় পেয়েছ?”

“রোজগার করেছি।”

আমার কথায় কোন প্যাঁচ নেই। জড়তা নেই। যারা সত্যি কথা বলে তাদের কথায় জড়তা-সংকোচ থাকে না। আমারও নেই। বাবা আঁড়চোখে মায়ের হাতের দিকে তাকালেন। তারপর আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “হাতে গোনা কয়েক দিনের মধ্যে এত টাকা রোজগার করলে কীভাবে?”

মা-ও বাবার কথায় সুর মেলালো। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, “সত্যিই তো! এত টাকা রোজগার করলি কীভাবে? চু’রি চামারি করিসনি তো?”

“আহ মা! তোমাদের কী নিজের ছেলের উপর এতটুকু বিশ্বাস নেই?”

“বিশ্বাস আছে। তারপরেও তুই বল। তুই এত টাকা কোথায় পেলি?”

“অসৎ কিছু করিনি। যে কাজই করেছি হালাল ভাবে করেছি। বাদশার মামার জমির ধান কে’টে’ছি। কচুর লতি বিক্রি করেছি। এক লোকের আন্ডারে হিসাব রাখার কাজ করেছি। ডিলার হিসেবেও কাজ করেছি। ধানের ডিলার। সবচেয়ে বেশি টাকা ওখান থেকেই এসেছে।”

ছোট চাচা চুপ ছিল। হঠাৎই সে কথা বলে উঠল,

“তুই যে এসব কাজ করেছিস তোর কাছে এই কাজের কোন প্রমান আছে?”

“থাকবে না কেন? সব প্রমাণ আছে। বাদশার মামার জমিতে ধান কা’টার ভিডিও আছে। তাছাড়া মামাকে জিজ্ঞেস করলেও বলবে। বাকি জায়গাগুলোতে একই কথা। খোঁজ নিলেই জানা যাবে।”

“আচ্ছা বেশ। আমি সব খোঁজ নেব। ঠিকানা দে।”

ছোট চাচা সব জায়গার ঠিকানা দিলাম। সে আমার এই কাজ কোনভাবে বিশ্বাস করতে পারছে না। বাবা আর কিছু বললেন না। চোখের পানি আড়াল করে ভাত গিলতে লাগলেন। বাবা কী খুশি হয়েছেন নাকি কষ্ট পেয়েছেন? তাকে আগে-পরে এমন করে মুখ লুকাতে দেখিনি। আজ দেখছি। মা তো সেই তখন থেকে কাঁদছে। কী অদ্ভুত!

খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে চলে এলাম। তিমুও আমার পেছনে ঘরের ভেতরে ঢুকল। বিছানায় বসতে বসতে বলল, “সাজ্জাদ ভাই, আমার অনেক ভয় করছে।”

“ভয় করছে? ভয় করবে কেন?”

“জানি না। তবে মন বলছে– তানহার বাবা ছাড়া পেয়ে যাবে। তারপর আমার ওইসব ছবি ভিডিও ওগুলো সবাইকে দেখিয়ে দেবে।”

“ভয় পাস না তিমু। এমন কিছু হবে না।”

“তবুও আমার খুব ভয় করছে। যদি হয় তাহলে আমার…”

তিমু কথা শেষ করতে পারল না। তার আগে ছোট চাচা ঘরে ঢুকল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “তিমু, এত রাতে তুই ওর ঘরে কী করছিস?”

তিমু বলল, “তেমন কিছু করছি না ছোট মামা। এমনি কীভাবে বড় মামানিকে এত দামী উপহার দিলো সেই গল্প শুনছি।”

“রাত হয়েছে। এখন আর কোন গল্প শুনতে হবে না। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়।”

“আচ্ছা।”

তিমু বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজা ভেজিয়ে দিয়ে গেল। ছোট চাচা বলল, “বয়সের হিসেবে তুই অনেক ভালো কাজ করেছিস। আমার ছেলে হলে তোকে নিয়ে গর্ব করতাম।”

তার কথার জবাব দিলাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ছোট চাচাও আর কিছু বলল না। খানিকক্ষণ বসে থেকে চলে গেল।

রাতে একটু দেরিতে ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম ভাঙল বেলায়। ঘড়িতে সকাল নয়টা। জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে রোদ এসে পড়ছে। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বাদশার সাথে দেখা করতে যাব। তারপর আবার সোনার দোকানে যেতে হবে৷ একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে।

মা টেবিলে সকালের নাস্তা সাজাচ্ছিল। দাদি তার সামনের চেয়ারটা বসলেন। নরম গলায় বললেন, “তামিমের বিয়েটা আর হলো না। ওমন মানুষের মেয়ের সাথে ছেলে বিয়ে দেওয়া যায় না।”

মা বলল, “দেশে মেয়ের অভাব নেই। খুঁজলে ঠিক পাওয়া যাবে।”

“মেয়ে আছে। সবদিক থেকে ভালো মেয়ে নেই। সবাই তো আর তোমার মতো কপাল নিয়ে জন্মায় না!”

“এ কথা কেন বলছেন?”

“ও মা! এ কথা বলব না কেন? তোমার ছেলে এই বয়সে তোমাকে সোনার গহনা গড়িয়ে দিচ্ছে। এমন কপাল ক’জনের হয়?”

মা কিছু বলল না। চুপ করে রইল৷ দাদি বললেন, “আল্লাহ আমাকেও দু’টো ছেলে দিয়েছে। এত বড় করেছি। এখন পর্যন্ত সোনা তো দূরের কথা রূপা ছুঁইয়ে দেখিনি মাকে কেমন লাগে।”

মা এবারও কিছু বলল না। সত্যি বলতে দাদির কথার জবাব আমার কাছেও নেই।

বাবা এখনো অফিসের জন্য বের হননি। তিনি আমাদের সাথে খেতে বসলেন। খাওয়ার টেবিলে ফুফু একটা প্রস্তাব করে বসল। নরম গলায় বলল, “কিছু মনে না করলে বড় ভাইয়াকে একটা কথা বলতে চাই। ভাবী তুমিও শোনো।”

বাবা বললেন, “কী কথা?”

“তোমরা কিছু মনে না করলে বলতে চাইছি তোমাদের আপত্তি না থাকলে সাজ্জাদের সাথে আমার বড় মেয়ের বিয়ে দিতে চাই। আপাতত ঘরোয়াভাবে কাবিন করিয়ে রাখলাম। পরে না হয় অনুষ্ঠান করব।”

“তুই একা সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?”

“না না ভাইয়া। একা সিদ্ধান্ত নেব কেন? ওর বাবার সাথেও কথা বলেছি। সে তো সাজ্জাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এই বয়সের ছেলে কোথায় আড্ডা দেবে, রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকবে। তা না করে এত টাকা উপার্জন করে ফেলেছে৷ তা-ও মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এমন ছেলে আর কোথায় পাওয়া যায় বলো? ওদের বাবা তো বলল– মেয়ের জামাই হিসাবে এমন কর্মট ছেলে আর পাবে না।”

বাবা কিছু বললেন না। মা-ও না। ফুফু নিজেও আর কিছু বলল না। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল। ছোট চাচা কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন আমি তার জীবন নষ্ট করে নিজের জীবন সাজিয়ে নিচ্ছি।

বলব না বলব না করেও বাদশাকে কথাটা বলে ফেললাম। ফুফু আমার সাথে তার মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছে এ কথা শোনার পর বাদশা প্রায় লাফিয়ে উঠল। উৎফুল্ল গলায় বলল, “তাহলে তুই তিমুকে বিয়ে করছিস। এইতো?”

“না। আমি তিমুকে বিয়ে করছি না।”

“মাত্রই বললি তোর ফুফু তোর সাথে উনার মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছেন।”

“তা চেয়েছেন। তবে তিমুর সাথে না। তিমু ফুফুর ছোট মেয়ে। বড় একজন আছে। তার সাথে।”

“কী বলিস! তিমুর সাথে বিয়ে হবে না?”

বাদশা খুব বিষন্ন হয়ে পড়ল। হঠাৎই আমার শরীরটা খারাপ লাগছে। মাথার ভেতরে ঘুরছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি রাস্তার মধ্যে ঘুরে পড়ে যাব। এই ঝুঁকি নিলাম না। বাদশাকে বিদায় জানিয়ে রিকশায় উঠে বসলাম।

রিকশা দুলতে দুলতে এগোচ্ছে। রোদের ঝিলিক চোখে লাগছে। রোদের তাপ আছে, অথচ শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর কেমন ধুকপুক করছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ভেতর থেকে চেপে ধরেছে। রিকশাওয়ালা বলল, “ভাই, শরীর খারাপ নাকি?”

আমি উত্তর দিলাম না। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে– স্বাভাবিক অবস্থায় বাড়ি যেতে পারব তো? বের হওয়ার সময় ছোট চাচা এক বোতল ক্লেমন দিয়েছিল। অদ্ভুত স্বাদের, তবে খেতে ভালো। এবারে পুরোটা শেষ করে ফেলেছিলাম। তবে কী? আমি আর ভাবতে পারলাম না। দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরলাম।

যেমন ভেবেছিলাম তেমন কিছু হলো না। ধীরে ধীরে খারাপ লাগা কে’টে যেতে শুরু করল। রিকশা থেকে যখন নামলাম, তখন পুরোপুরি সুস্থ। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। দাদি মায়ের এক হাত ধরে সোফায় বসে আছেন। অন্য হাতে মায়ের কাছ থেকে ফেরত নেওয়া গহনাগুলো। দাদি মায়ের হাতের উপর সব গহনা রাখলেন। কোমল গলায় বললেন, “তামিমের বিয়ে হচ্ছে না। এসব গহনা তুমি আপাতত নিজের কাছে রাখো। আমার বয়স হয়েছে। কখন কী করে ফেলি ঠিক ঠিকানা নেই।”

মা কিছু বলল না। আমার দিকে তাকালো। মায়ের মুখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। অথচ তার চোখ জ্বলছে।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply