তোমারসঙ্গেএক_জনম (০৯)
সানা_শেখ
ডাইনিং রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল লামহা। কনা সোফা ছেড়ে উঠে এগিয়ে আসে ওর কাছে।
“ভাবী, ভেতরে আসো।”
লামহা ভেতরে প্রবেশ করে। কনা ওর জন্য খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলে,
“বোসো চেয়ারে। যখনই খিদে পাবে এসে খেয়ে নেবে নিজের হাতে বেড়ে।”
চেয়ার টেনে বসে লামহা, মুখে কিছু না বলে চুপ করে থাকে।
“ভাইয়া চলে গেছে বলে মন খারাপ?”
লামহার কপাল ভ্রু কুঁচকে যায়। মৃদু স্বরে বলে,
“না। কোথায় গেছে তোমার ভাইয়া?”
“ভাইয়া তোমাকে বলে যায়নি?”
লামহা দুদিকে মাথা নাড়ায়। কনা অবাক হয়ে বলে,
“ভাইয়া তোমাকে না বলেই চলে গেলো!”
“কোথায় গেছে?”
“হলে ফিরে গেছে।”
“ওহ।”
লামহা আর কিছু না বলে খাওয়া শুরু করে, খিদে পেয়েছে ভীষণ।
হিমেল বাড়িতে নেই ভেবেই ওর খুশি খুশি লাগছে। বেশ কিছুদিন অসভ্য লোকটাকে দেখতে হবে না, তার চ্যাটাং চ্যাটাং কথাও শুনতে হবে না। দাম্ভিক, অহংকারী, নাক উঁচু, খাটাস লোক একটা। চলে গেছে ভালোই হয়েছে।
মাঝখানে কয়েকদিন পেরিয়ে গেছে।
লামহার দিন চলছে কোনো রকমে। দিনের বেশির ভাগ সময় মন ম’রা হয়ে চুপচাপ বসে থাকে, সকলের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে।
নাজমা মির্জার ঝাঁঝালো কটু কথা শুনতে হয় রোজ। শিরিন সুলতানা এখন আর তেমন কিছু বলেন না লামহাকে। কোনো কাজও করতে বলেন না।
কনা কলেজে রয়েছে, শিশির ভার্সিটিতে। জাবির মির্জা হসপিটালে, জাকারিয়া মির্জা-ও হসপিটালে রয়েছেন। ওনারা দুই ভাই-ই ডাক্তার।
বাড়িতে এখন শুধু নারীরা রয়েছেন, জাকির-ও বাড়িতেই রয়েছে। বিয়ের ছুটি নিয়ে এসেছে বাড়িতে, ছুটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতেই থাকবে।
লামহা জোবেদা মির্জার রুম থেকে বের হয়। এতক্ষণ দাদি শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করল। হাজেরা জোবেদা মির্জার রুমেই রয়েছে এখনো।
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আসতেই দেখে জাকির সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লামহা দ্রুত উল্টো ঘুরে কোনদিকে যাবে বুঝতে না পেরে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
জাকির আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। জাকির ঠান্ডা মেজাজের শান্ত একজন মানুষ। বাবা-মা যা বলে তাই শোনে, তাদের সঙ্গে কখনো উঁচু গলায় কথা বলে না, বাবা-মাকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতে চায় না। বাবার কথায় লামহাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল, আবার বাবার কথায়-ই বিয়ের আসর থেকে উঠে এসেছিল। ওর ইদানিং মনে হয় সেদিন বাবার কথা না শুনে বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে লামহাকে বিয়ে করলেই ভালো হতো। কেন যে সেদিন বাবার কথা শুনল? এত বাধ্য সন্তান হওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? একটু অবাধ্য তো হতেই পারতো সেদিন।
“লামহা।”
জাকিরের গলার স্বর শুনে চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকায় লামহা। লামহা সবসময় চেষ্টা করে জাকিরের চোখের আড়ালে থাকতে। জাকিরকে দেখলে ওর অস্বস্তি হয়।
জাকির শান্ত গলায় বলে,
“তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”
লামহা দ্রুত উল্টো ঘুরে দাঁড়ায় আবার। কম্পিত স্বরে বলে,
“আমি আপনার সঙ্গে কোনো কথা বলতে চাই না, আর না আপনার কোনো কথা শুনতে চাই। দয়া করে আপনি যান এখান থেকে।”
“সরি।”
“—
“আমি সেদিন ভুল করেছিলাম, অন্যায় করেছি তোমার আর তোমার ফ্যামিলির সঙ্গে।”
লামহা জাকিরের দিকে না তাকিয়ে উল্টো ঘুরে থেকেই মৃদু স্বরে বলে,
“প্লীজ আপনি যান এখান থেকে। আপনি আসবেন না আমার সামনে, অস্বস্তি হয় আপনাকে দেখলে।”
“এদিকে তাকাও, আমার কথা শেষ হয়নি।”
“আমি শুনতে চাই না আপনার কোনো কথা।”
“আমি বলতে চাই। আমি শান্তি পাচ্ছি না গত কয়েকদিন ধরে, রাতে ঘুমোতে পারি না আমি, ভালো লাগে না আমার।”
“আপনি দরজার সামনে থেকে সরুন, আমাকে যেতে দিন।”
“আমি নিজের ভুল শুধরাতে চাই। আমি জানি হিমেল এই বিয়ে মানে না, হয়তো কখনো মানবেও না।”
“কি বলতে চাইছেন আপনি?”
জাকির লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে বলে,
“তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
লামহা শকড জাকিরের কথা শুনে। তড়িৎ গতিতে পেছন ফিরে দাঁড়ায় আবার। বড়ো বড়ো চোখ করে রেখেই বলে,
“আমি আপনার ছোটো ভাইয়ের বউ।”
“কিন্তু তোমার তো আমার বউ হওয়ার কথা ছিল, আমি তো তোমাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখেছিলাম সুন্দর একটা ভবিষ্যতের।”
“আপনার নিজের স্বপ্ন আপনি নিজেই ধ্বংস করেছেন, এখানে আমার কোনো হাত নেই, ছিল না।”
“আমি এই স্বপ্নকে আবার জুড়তে চাই, বাস্তবায়ন করতে চাই।”
“এটা অসম্ভব। আপনি ভাবলেন কীভাবে আমি আপনাকে বিয়ে করব? আপনারা বিয়ে ভেঙে দিবেন, আপনার ছোটো ভাই বিয়ে করবে, আপনি আবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমার কাছে মাফ চাইবেন আর আমি মাফ করে দিয়ে ছোটো ভাইকে ছেড়ে আপনাকে বিয়ে করে নেব! মস্করা পেয়েছেন? আপনার ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী আমি, সেভাবেই ট্রিট করবেন আমাকে। আপনার সামনে আসতেই আমার দম বন্ধ হয়ে যায় অস্বস্তিতে। আপনি আমার পথ ছাড়ুন, যেতে দিন আমাকে।”
জাকির লামহার দিকে এগিয়ে বলে,
“এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন?”
“খবরদার এদিকে আগাবেন না।”
“আমি তোমাকে ভুলতে পারছি না, ছোটো ভাইয়ের বউ হিসেবে মানতে পারছি না। তোমাকে চোখের সামনে দেখবো অথচ তুমি আমার না, এটা আমি মেনে নিতে পারবো না।”
“আমাকে যেতে দিন ভালোয় ভালোয়। সেদিন বিয়ের আসর ছেড়ে উঠে আসার আগে নিজের বাবাকে বলতে পারলেন না আমি বিয়ে না করে যাবো না, ওকেই বিয়ে করবো।”
“বাবা মায়ের বাধ্য সন্তান তাই বলতে পারিনি কিছু।”
“তাহলে আজকে কীভাবে বলছেন? বাবার আঙুল আর মায়ের আঁচল ধরে হাঁটুন গিয়ে, সরুন এখন সামনে থেকে।”
“তুমি হিমেলকে ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে নিয়ে চলে যাব এখান থেকে।”
“আপনাকে জাস্ট ঘেন্না হচ্ছে এখন, সরুন আমার সামনে থেকে।”
“তুমি আমার বাড়িতে থাকবে কিন্তু তুমি আমার না এটা মেনে নেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার কাছে। তুমি দূরে থাকতে, তোমাকে না দেখতাম তাহলে এমন কিছু হতো না আমার সঙ্গে।”
“না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আপনার মাথায় বোধহয় সমস্যা হয়েছে, ডাক্তার দেখান।”
“তোমার রোগে ধরেছে।”
“আমি কিন্তু এখন বাড়ির সবাইকে ডাকব।”
“ডাকো।”
“আপনি দরজার সামনে থেকে সরুন।”
“তুমি রাজি হয়ে যাও।”
“আপনার লজ্জা লাগছে না ছোটো ভাইয়ের বউকে এসব কথা বলতে?
“বউটা তো প্রথমে আমারই হওয়ার কথা ছিল।”
“হইনি তো, এখন ভুলে যান। আপনার বাবা মায়ের পছন্দের কোনো মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করুন। এখন যেতে দিন আমাকে, এক কথা কতবার বলতে হয়?”
জাকির কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ওর মায়ের বাজখাঁই গলার স্বর ভেসে আসে।
“জাকির, তুই এই মেয়ের সঙ্গে এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস? ছোটো ভাইকে বিয়ে করে আবার বড়ো ভাইকেও পটাতে চাইছো? অসভ্য মেয়ে কোথাকার।”
জাকির মায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বলে,
“এত বেশি বুঝতে বলেছে কে তোমাকে? যাও এখান থেকে।”
“বেশি বুঝি আমি? কেন যাবো এখান থেকে? তুই সর এখান থেকে। এই মেয়ের আশেপাশেও যেন তোকে না দেখি।”
জাকিরের হাত ধরে টেনে ওকে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে দেন নাজমা মির্জা। লামহার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“এই মেয়ে লজ্জাশরম কিছুই কী নেই তোমার? ভাসুরের সঙ্গে এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ?”
নাজমা মির্জার কথা শুনে ঘৃণায় গা ঘিনঘিন করে ওঠে লামহার। এমনিতেই রাগে মাথার ভেতর দপদপ করছে তখন থেকে।
“তোমার বাবা মায়েরও বলিহারি আক্কেল জ্ঞান। বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে গেছে অমনি ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। লজ্জাশরম তোমার যে কেন নেই সেটা তোমার বাপ মায়ের কান্ড দেখলেই বোঝা যায়।”
লামহা চুপ থাকতে না পেরে বলে,
“আমার আব্বু আম্মু আপনাদের ছেলের ঘাড়ে জোর করে তুলে দেয়নি আমাকে। আপনার দেবর-ই আমার আব্বু আম্মুর হাত ধরে অনুরোধ করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমাকে তার ছেলের বউ করে এনেছেন।”
“এই মেয়ে, মুখে মুখে তর্ক করছো আবার? সবাই তো যার যার রুমে, তুমি আমার ছেলের সঙ্গে এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ?”
“আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করুন।”
বলতে বলতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে লামহা। সোফার উপর চোখ পড়তেই দেখে শিরিন সুলতানা সোফায় বসে আছেন চুপচাপ।
এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। লামহার কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ান।
নাজমা মির্জা ছোটো জা-এর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“শিরিন, তোমার ছেলে তো বাড়িতে নেই তাই তুমিই তোমার ছেলের বউকে সামলে রাখো। ও যেন আমার ছেলের আশেপাশে না ঘেঁষে।”
শিরিন সুলতানা ছেলের বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“আমি আমার ছেলের বউকে সামলেই রেখেছি, ভাবী। আপনি বরং আপনার ছেলেকে সামলান। আপনার ছেলে কেন আমার ছেলের বউয়ের পেছনে ঘুরঘুর করে? আমি তো স্পষ্টই দেখলাম সিঁড়ির উপর থেকে, আপনার ছেলেকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে আমার ছেলের বউ প্রস্থান করল। আপনার ছেলে কেন আমার ছেলের বউয়ের পিছু নিয়ে এখানে এলো? সকাল থেকে কয়েকবার দেখেছি আপনার ছেলে আমার ছেলের বউয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে। চিৎকার চেঁচামেচি তো আমার করার কথা অথচ আপনি করছেন।”
“কি বলতে চাইছো তুমি? আমার ছেলে তোমার ছেলের বউয়ের পেছনে পড়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“যখন দেখেছো তখন আটকাওনি কেন আমার ছেলেকে?”
“আটকাইনি এর কারণ আছে।”
“কী কারণ?”
“লামহা আর জাকির এক বাড়িতেই থাকবে, থাকতে হবেই। এক বাড়িতে থেকে সারাজীবন তো এভাবে একে অপরকে দেখে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে পারবে না। একসঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকতে হলে নিজেদের মধ্যে সবকিছু ঠিক করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। জাকির লামহার ভাসুর, লামহা জাকিরের ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী, ওরা একে অপরকে এভাবেই ট্রিট করবে। জাকির বুদ্ধিমান ছেলে, ও হয়তো এমনটা ভেবেই লামহার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে সবকিছু ঠিক করে নেওয়ার জন্য। কি জাকির তাইতো?”
জাকির গম্ভীর থমথমে মুখে কাকির দিকে একবার তাকিয়ে লামহার দিকে তাকায়। লামহা পারছে না নিজেকে শাশুড়ি মায়ের পেছনে আড়াল করে নিতে। জাকিরের দৃষ্টি ওর গায়ে কা’টার মতো বিধছে।
চলবে…………
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৩৪
-
দিশেহারা পর্ব ৪৭
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৭
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩০