তোমারসঙ্গেএক_জনম (০৫)
সানা_শেখ
লামহাকে নিরুত্তর দেখে হিমেল আর কিছু বলে না। ওর জানারও প্রয়োজন নেই কে কল করেছিল আর লামহা ভালোভাবে কথা না বলে কল কে’টে নাম্বার কেন ডিলিট করেছে।
ফোন রেখে পুনরায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। লামহা চোরা চোখে তাকায় হিমেলের দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে আবার তাকায় হিমেলের ফোনের দিকে।
বিয়ে বাড়ির সবাই এখন কমিউনিটি সেন্টারে অবস্থান করছে। মির্জা বাড়ি থেকে জাকারিয়া মির্জা আর ওনার বউ-বাচ্চারা আসেনি সেন্টারে। জাবির মির্জা বলেছিলেন আসার জন্য ওনারা রাজি হননি।
খাওয়াদাওয়া কমপ্লিট হয়েছে সকলের। ফটোশুট, পরিচয় পর্ব সব শেষ।
লামহা নিজের পরিবারের সঙ্গে কথা বলছে। অন্যপাশে হিমেল নিজের বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। কথা বলছে বললে ভুল হবে, হিমেল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাকিরা কথা বলছে।
হিমেলের ফোন বেজে ওঠে আবার। বিরক্ত হয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে। কোন পাগলের পাল্লায় পড়ল আজ? এমনিতেই মেজাজ গরম হয়ে আছে তার উপর এই পাগলের যন্ত্রণায় আরও গরম হচ্ছে। হেঁটে এসে বন্ধুদের কাছ থেকে একটু দূরে দাঁড়ায়। ফোন রিসিভ করে কানে ধরে চুপ করে থাকে। অপর পাশ থেকে ভেসে আসে পুরুষালি গলার স্বর।
“এই হিমেলের বাচ্চা, আমার লামহা কই?”
“জাহান্নামে।”
“লামহার কাছ থেকে দূরে থাকবি সবসময়। ওকে ছোঁয়ার দুঃসাহস করবি না। ও আমার।”
হিমেল মেজাজ হারিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“ছুঁবো না মানে? ছুঁয়েছি তো গতকালই।”
“এই শা’লির বাচ্চা, কিছু করবি না ওর সঙ্গে।”
“সব করা হয়ে গেছে।”
“তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো দেশে ফিরে।”
“যেই বা/ল করতে পারিস করিস, শা’লা মাদারটোস্ট।”
কল কে’টে নাম্বার ব্লক করে দেয় হিমেল। রাগে যেন ফেটে যাবে এখনই। মুখ দিয়ে আপনাআপনি গালি বেরিয়ে আসতে চাইছে।
লামহার দিকে দৃষ্টি যেতেই দেখে লামহা-ও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। হিমেল তাকাতেই লামহা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
লামহা গুটি গুটি পায়ে বাবার পাশে এসে দাঁড়ায়। মৃদু স্বরে বলে,
“আব্বু, একটু ওদিকে চলো, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
মেয়ের কথায় সকলের মাঝখান থেকে মেয়ের সঙ্গে একপাশে আসেন লাবিব ইসলাম। লামহা মৃদু স্বরে বলে,
“ওনার ফোনে কবীর কল করেছিল।”
“কার ফোনে? হিমেলের?”
“হ্যাঁ।”
“কখন?”
“তোমরা আসার দশ পনেরো মিনিট আগে।”
“কী বলেছে?”
“আমি বেশি কথা বলিনি, কল কে’টে দিয়েছিলাম। বলেছে আমার বাপ-ভাই আর জামাইকে মে’রে ফেলবে।”
“ভয় পাস না, কিচ্ছু করতে পারবে না ওই মাতাল জু’য়াখোর। যেটা নিয়ে বেশি ভয়ে ছিলাম সেটা তো হয়ে গেছে, এখন যা করতে পারে করে নিক, তুই একটুও ভয় পাবি না।”
“যদি তোমাদের কোনো ক্ষতি করে?”
“পারবে না, তুই ভয় পাবি না।”
মাথা নাড়ায় লামহা।
জাবির মির্জা লামহার নাম ধরে ডাকতেই লামহা বাবাকে নিয়ে ওনার দিকে এগিয়ে আসে। জাবির মির্জা লামহাকে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“এই হচ্ছে আমার ছেলের বউ, আমার ছোটো আম্মা। লামহা মা, উনি তোমার আংকেল হন।”
“আসসালামু আলাইকুম, আংকেল।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো?”
“জি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
জাবির মির্জার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“তোর ছেলের বউ তো ভারী মিষ্টি, পরীর মতো দেখতে। খুঁজে খুঁজে ছেলের জন্য একটা বউ এনেছিস, ভাই।”
জাবির মির্জা হাসেন। লামহা লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে নেয়। জাবির মির্জা বেয়াইদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বন্ধুকে।
লামহাকে কনা নিজেদের কাছে নিয়ে আসে।
হিমেলের এক বন্ধু হিমেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ভাই, তোর ওটা বউ নাকি আসমানের পরী? একটা মেয়ে এত নিখুঁত সুন্দরীও হয়? এত সুন্দর বউ পেয়ে তুই মুখ এমন বানিয়ে রেখেছিস? আশ্চর্য। তোর জায়গায় আমি হলে তো মিউজিক বক্সে লুঙ্গি ডান্স গান ছেড়ে উড়াধুরা নাচতাম।”
রাতুল বলে,
“এই শা/লা প্লে বয়, ওর বউয়ের দিকে নজর দিচ্ছিস কেন?”
ছেলেটা হিমেলের পাশে দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
“ভাই, তুই ওকে না রাখলে ডিভোর্স দিয়ে দে আমি বিয়ে করে নেই।”
হিমেল রেগে তাকায় বন্ধুর মুখের দিকে।
“এত রেগে যাচ্ছিস কেন? তুই তো এই বিয়ে মানিস না বললি।”
“মুখ বন্ধ করে রাখ নয়তো সারাজীবনের জন্য সিল করে দেব।”
চিবিয়ে চিবিয়ে বলে সরে যায় হিমেল।
এমনিতেই মনে শান্তি নেই। তার উপর একজন সমান তালে কল করে হুমকি দিচ্ছে লামহাকে বিয়ে করার জন্য। এখন আবার বন্ধু বলছে উল্টাপাল্টা কথা।
বিয়ে করলে জীবনে প্যারা আসে ঠিক আছে তাই বলে এত প্যারা?
সময় গড়ায় আরও। লাবিব ইসলাম সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চান, রাত বেড়ে চলেছে।
জাবির মির্জা ছেলেকে ডাকেন নিজের কাছে। ওনার আশেপাশে এখন কেউ নেই।
“লামহার সঙ্গে এখন ওদের বাড়িতে যাবি, আমরা আগামীকাল গিয়ে নিয়ে আসব।”
হিমেল জেদ ধরে বলে,
“কোত্থাও যেতে পারবো না আমি।”
“জেদ করবি না, হিমেল।”
“বলছি তো যাব না।”
“বিয়ের নিয়ম এটা, যেতে হবে তোকে।”
“এইসব আজাইরা নিয়ম মানি না আমি।”
“তুই যাবি এটাই শেষ কথা।”
হিমেল চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ও যাবে না ওই বাড়িতে।
“আর যাই করিস আমাকে কারো সামনে ছোটো করিস না দয়া করে।”
হিমেল তবুও চুপ করে থাকে। জাবির মির্জা আবার বলেন,
“গতরাতে বিয়ের আসরে তোর চাচ্চু যা যা বলেছে সব মিথ্যে ছিল। ভাই সত্যি মিথ্যা যাচাই না করেই ওই কথাগুলো বলে ফেলেছে। অমন একটা পরিস্থিতে ওইসব কথা বলে বিয়ে ভেঙে দেওয়া একটা মেয়ে আর তার পরিবারের জন্য কতটা অপমানের সেটা একটাবারও ভেবে দেখেনি। গতকাল যদি লামহার বিয়ে না হতো তোর মনে হয় মেয়েটার আর কখনো বিয়ে হতো? কয়েকশো মানুষের কানে পৌঁছে গিয়েছিল ওই কথাগুলো। বিয়ে তো দূরের কথা মেয়েটা ওখানে আর শান্তিতে বসবাসই করতে পারতো না। যেই লাফাঙ্গা ছেলেরা ওর বিয়ে ভাঙার ষড়যন্ত্র করেছিল ওরা সফল হয়ে যেত আর ভুক্তভুগী হতো নিষ্পাপ মেয়েটা।”
“কোনো ছেলে কেন ষড়যন্ত্র করে লামহার বিয়ে ভাঙতে চাইবে?”
“লামহাদের গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যানের ছেলে লামহাকে পছন্দ করে, সেই ছেলে ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিল।”
“তাহলে সেই ছেলের কাছে বিয়ে দিলেই হয়ে যেত, এত কাহিনী হতই না।”
“ওই ছেলে নেশাখোর, জুয়াখোর, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জড়িত। গ্রামের কেউ ওই ছেলের সঙ্গে পেরে ওঠে না। ওই ছেলের উপর অতিষ্ঠ হয়েই লামহাকে এত কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লাবিব ইসলাম। লামহার অসংখ্য বিয়ে ভেঙেছে ওই ছেলে আর ওর সাঙ্গপাঙ্গরা মিলে।”
“তাহলে এই বিয়েটা কেন হতে দিল?”
“হতে কোথায় দিয়েছিল? ওরা কিছু না করলে তো জাকিরের সঙ্গেই হতো বিয়েটা।
ওই ছেলে এখন দেশের বাইরে আছে তাই নিজে বিয়ে বাড়িতে এসে কোনো ঝামেলা করতে পারেনি। ওর বন্ধুরাই ভাইয়ের কানে পৌঁছে দিয়েছিল ওই কথাগুলো।”
“তোমাকে এসব কথা কে বলল?”
“খোঁজ খবর নিয়েছি আমি। তুই কোনো ঝামেলা না করে এখন লামহার সঙ্গে ওদের বাড়িতে যাবি।”
হিমেল চুপ করে থাকে। কিছুটা হলেও এখন আন্দাজ করতে পারছে আসল কাহিনী।
জাবির মির্জা আবার বলেন,
“লামহাকে দেখেছিস নাকি এখনো ভালোভাবে তাকাসনি ওর দিকে? নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারিনী লামহা। ওর এই সৌন্দর্যই ওর জন্য কাল হয়েছে।
মেয়েকে বাঁচানোর জন্যই এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিতে চাইছিলেন লাবিব ইসলাম। তোর নির্বোধ চাচা কোনো কিছু না ভেবেই বিয়ে ভেঙে দিয়ে চলে এসেছিল। গতরাতে যা যা শুনেছিলি সব মিথ্যে, গুজব আর ষড়যন্ত্র ছিল।”
হিমেল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। জাবির মির্জা আবারও বলেন,
“আমি জেনে বুঝে কখনো তোর খারাপ করেছি? তোকে খারাপ কিছু দিয়েছি? এবারেও দেইনি। যা লামহাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘুরে আয়। তোর কোন কোন বন্ধুকে নিয়ে যাবি নিয়ে যা।”
হিমেলের ফোন আবার বেজে ওঠে। বাবার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে রিসিভ করে।
“লামহার কাছে ফোন দে।”
হিমেল রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“দেবো না।”
কবীর গালি দিয়ে বলে,
“দে বলছি নয়তো দেশে ফিরলে তোর খবর আছে।”
“আমার যেই বা/ল ছিঁড়তে পারিস ছিঁড়িস।”
“এই খা***কি—
“মুখ দিয়ে আরেকটা শব্দ বের করলে তোর ঠ্যাং ভেঙে তোরই পেছন দিয়ে ভরে দেবো অজাতের বংশ। আরেকবার আমার ফোনে কল করলে তোর নামে মামলা করবো শা/লা শু/য়ো/র।”
কল কে’টে ব্লক করে দেয় হিমেল। এত সিম কার্ড কোথায় পাচ্ছে? সিন কার্ডের কোম্পানীতে বসে বসে কল করছে বোধহয়।
“হিমেল, স্টেজের ওখানে আয়।”
“আসছি।”
বাবার পেছন পেছন স্টেজের দিকে আগায় হিমেল। নজর পড়ে চুপচাপ মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লামহার দিকে।
লামহা-ও মুখ তুলে হিমেলের দিকে তাকায়। হিমেল দৃষ্টি না সরিয়ে তাকিয়ে রইল। হিমেল যখনই তাকায় লামহা কীভাবে যেন বুঝতে পেরে যায়।
হিমেলকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লামহা নিজেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এভাবে তাকিয়ে থাকায় অস্বস্তি হচ্ছে এখন।
পরিবারের সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লামহা আর হিমেল গাড়ির দিকে আগায়। হিমেলের হাতের মুঠোয় লামহার হাত।
হিমেল হাত ধরতে চায়নি, জাবির মির্জা ছেলের হাতে ছেলের বউয়ের হাত তুলে দিয়ে বলেছেন, “যেভাবে নিয়ে যাচ্ছিস এভাবেই আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবি। আমার আম্মার চুল পরিমান ক্ষতি হলে তুই বাড়ি ফিরবি না।”
লামহাকে পেছনের সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে বসে পাশে। ওর পাশে উঠে বসে শিশির। শিশির হিমেলকে লামহার দিকে ঠেলতে ঠেলতে বলে,
“একটু ওদিকে চাপো, আমাকে বসতে দাও। নিজের সিট রেখে এই সিটে কি করছ?”
“তুই এখানে বসছিস কেন?”
“শ্বশুরবাড়ি তোমার বলে কি আমার যাওয়া নিষেধ? আমিও যাবো শ্বশুরবাড়ি, হোক সেটা নিজের বা বড়ো ভাইয়ের।”
গাড়ি চলতে শুরু করে। শিশির লামহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ভাবী।”
লামহা শিশিরের দিকে তাকায় ঘাড় কাত করে। হিমেল ভাই আর বউয়ের দিকে একবার করে তাকিয়ে আবার ফোনের স্ক্রিনে তাকায়।
শিশির হেসে বলে,
“গতরাতে তো আসার সময় গাড়িতে বসে কাঁদছিলেন, তাহলে আজকে কাঁদছেন না কেন? গাড়িতে ওঠার সময়ও যেই কাঁদা কাঁদলেন, আজকে তো কাঁদলেন না। এটা বৈষম্য হলো না? এখন কাঁদেন একটু, চোখ মোছার জন্য আজকেও আমার কাছে টিস্যু আছে। প্রয়োজনে রাস্তা থেকে আরও কিনে নেব, আপনি কাঁদতে থাকুন।”
কাঁদবে তো দূর, লামহা ফিক করে হেসে ওঠে।
“আশ্চর্য, আপনি হাসতেও পারেন? ভাইয়া, তোমার বউ দেখি কাঁদার পাশাপাশি হাসতেও জানে।”
লামহা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। সব মন খারাপ পালিয়ে গেছে এখন।
“ভাবী, এদিকে তাকান তো একটু। দেখি হাসলে আপনাকে কেমন দেখায়। গতকাল যখন গাড়িতে বসে ম’রা কান্না কাঁদছিলেন তখন তো জামাই ম’রা শা’ক’চুন্নির মতো লাগছিল, দেখি আজকে কি চুন্নির মতো লাগছে।”
হিমেল রেগে তাকায় ছোটো ভাইয়ের দিকে। শিশির মুখের সামনে হাত নাড়ায় মাছি তাড়ানোর মতো করে।
চলবে………….
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ২৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩৯