Golpo কষ্টের গল্প তুষারিণী

তুষারিণী পর্ব ৯


তুষারিণী — ৯

সানজিদাআক্তারমুন্নী

অ্যাশার ক্যাসেলের সুবিশাল ছাদ আজ নিয়ন আলো আর উদ্দাম কোলাহলে মেতে উঠেছে। ছাদে ইনফিনিটি এজ ডিজাইনের সুইমিং পুলের নীল জলরাশিতে প্রতিফলিত হচ্ছে আলোর ঝলকানি, আর তার সাথেই চলছে চরম উচ্ছৃঙ্খল এক পার্টি। রাতের খাবারের আয়োজন আজ এখানেই করা হয়েছে বলে বাধ্য হয়েই নূশাকে এই দমবন্ধ করা পরিবেশে আসতে হয়েছে। সে প্রথমে ছাদে প্রবেশ করে থমকে গিয়েছিল এই বেহায়াপনা দেখে। মাত্র দু’ঘণ্টা আগেই রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরেছে সে বাড়িতে। দুপুরে ইথান সেখানে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক দেখে বেশ শান্তভাবে চলে গিয়েছিল। ওই ছোট্ট ঘটনাটুকু নূশার মনে এক চিলতে মিথ্যে আশার জন্ম দিয়েছিল হয়তো মানুষটার ভেতর কিছুটা হলেও বদল এসেছে। কিন্তু ছাদের এই দৃশ্য সেই আশাকে মুহূর্তেই ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। শয়তান কি আর কখনো নিজের স্বভাব ছাড়ে? পুলে এখন ইথান আর এজার হাটু পর্যন্ত একটি কালো টাউজার পড়া অবস্থায় পার্টিতে মত্ত। তাদের ঘিরে রয়েছে একদল বিকিনি পরা নারী, চলছে নির্লজ্জ জলকেলি। এই চরম অশ্লীল দৃশ্য দেখে নূশার ভেতরটা ঘিনঘিন করে ওঠে। অন্তত এজারকে সে কিছুটা ভদ্র মনে করেছিল, কিন্তু আজ সেই ভুলটাও ভেঙে যায়। নূশা একবার পুলের দিকে তাকিয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয় দ্বিতীয়বার ওই দিকে তাকানোর রুচি তার নেই। এখানে আসতে চায়নি এভা জোর করে নিয়ে এসেছে। যদি এমন কিছু দেখতে হবে জানত তাহলে আসতই না। এখন গেলে তো মনে হবে ইথানের উপর নূশা রাগ করে চলে গেছে তাই নূশা এগিয়ে গিয়ে ডিনার টেবিলের এক কোণে চুপচাপ বসে খাবার গিলতে থাকে। এই বাড়ির বড় মানুষ গুলোই বা কেমন তারা এগুলো লে এনজয় বলে চালিয়ে দিচ্ছে। নাস্তিকদের মতো কার্যক্রম এদের। নূশার পুড়া কপালে যে এই পরিবারে সে এসে মরেছে। টেবিলে সামনে রাখা সুস্বাদু খাবারগুলো আজ নূশা কাছে বিস্বাদ লাগছে। কথায় আছে, ‘হারামের ভাতে আরাম মেলে না।’ নূশার বুকটা আজ অভিমানে আর কষ্টে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে নিজের স্বামী অন্য নারীদের সাথে এমন নির্লজ্জতায় মেতে আছে, আর সে কিছুই বলতে পারছে না এর চেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণা আর কী হতে পারে? তাও নূশা নিজেকে শক্ত রাখে। কোনো অভিযোগ না করে, মাথা নিচু করে নীরবে খাবার চিবোতে থাকে ।
পুলের স্বচ্ছ পানিতে গা ডুবিয়ে হাতে এক গ্লাস রেড ওয়াইন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইথান। তার তীক্ষ্ণ, ভায়োলেট রঙের পাথুরে চোখজোড়া বাঁকা দৃষ্টিতে স্থির হয়ে আছে বসে থাকা নূশার ওপর। মেয়েটার ভেতর কি বিন্দুমাত্র ঈর্ষা কাজ করছে না? আজ এই ফালতু পার্টিতে ইথানের যোগ দেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য নূশার চোখে জেলাসি দেখা। কিন্তু নূশা তো একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না! যেন ইথানের অস্তিত্বই সেখানে নেই।
ইথানের এই মরিয়া আচরণের পেছনের কারণটা এক আলাদা ভুল বোঝাবুঝি। আজ নূশা তার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি স্টোরি শেয়ার করেছে ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ইসলামিক নাশিদ বাজছে আর সাথে কিছু মুসলিম কাপলের ভিডিও। ক্যাপশনে নূশা লিখেছিল, “InshAllah, someday I’ll cherish moments with my mahram.’। আর ইথান সেটি দেখে নিয়েছে। ইথান তো ইসলামিক শব্দ বা এর অর্থ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ, সে ধরে নিয়েছে ‘মাহরাম’ নিশ্চয়ই কোনো ছেলের নাম! তার ধারণা, নূশা ওই নামের কোনো ছেলের সাথে গোপনে ডেট করছে। ইথানের মতো অহংকারী পুরুষের ইগোতে এটা বিশাল আঘাত হেনেছে। আর সেই জেদ থেকেই নূশাকে জেলাস ফিল করানোর এই আপ্রাণ চেষ্টা।
কিন্তু নূশার নির্বিকার ভঙ্গি ইথানের রাগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওয়াইনের গ্লাস রেখে পুল থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে ইথান। ওঠে আসতেই একজন গার্ড এসে একটা টাওয়াল এগিয়ে দেয় ইথান সেটা নিয়ে চুল চোখ মুখ মুছে নেয়। শরীর বেয়ে পানি ঝরছে, সেই অবস্থাতেই সোজা এসে বসে নূশার ঠিক উলটোদিকের চেয়ারটায়। সে উঠতেই দু-তিনজন নারীও সুড়সুড় করে তার আশেপাশে এসে দাঁড়ায়। রাগে নূশার গা জ্বলে যায় এ দেখে। একজন আদ্যোপান্ত চরিত্রহীন পুরুষের মুখোমুখি বসে তাকে খেতে হচ্ছে! এতকিছুর পরও সে নিজের এক্সপ্রেশন একদম শান্ত রাখে। খাবার প্লেটে নিতে নিতে ইথান চরম বিরক্তি নিয়ে পাশে দাঁড়ানো মেয়েগুলোকে বলে, “তোমাদের বসার হলে বসো, নয়তো সামনে থেকে সরো। আমি ডিনারে বসেছি।”
তার হিমশীতল কণ্ঠ শুনে মেয়েগুলো কিছুটা দূরে সরে যায় ইথানের পাশে বসে খাওয়ার সাহস তাদের নেই। ঠিক ওই মুহূর্তেই নূশা পানির জগটা ধরার জন্য হাত বাড়ায়, কিন্তু ইথান ইচ্ছে করে সেটা নিজের দিকে টেনে নেয়। এটা স্রেফ দৃষ্টি আকর্ষণের একটা সস্তা চেষ্টা। কিন্তু নূশা এতেও কোনো রিঅ্যাক্ট করে না। কোনো কথা না বলে সে চুপচাপ অন্য একটি জগ থেকে পানি ঢেলে নেয়। তার মূল প্রতিজ্ঞা ইথানের দিকে সে আজ কিছুতেই তাকাবে না। তার দৃষ্টি থাকে সম্পূর্ণ স্থির আর ভাবলেশহীন।
নূশার এই অবজ্ঞা ইথানকে পাগল করে তোলছে। শেষ অস্ত্র হিসেবে দূরে দাঁড়িয়ে নাচতে থাকা একটা মেয়েকে ইশারায় কাছে ডাকে সে। আদেশ দেয় কাঁধে মাসাজ করে দেওয়ার জন্য। মেয়েটাও গদগদ হয়ে ইথানের কাঁধে হাত রাখে, শুরু করে মালিশ। এত কিছুর পরও নূশার চোখের পলক পড়ে না। এমন একটা হাবভাব করছে যে সে এসব কিছুই দেখছে না। খাওয়া শেষ হতেই এক মুহূর্তও আর এখানে দাঁড়ায় না নূশা, দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে বেরিয়ে যায়।
দূর থেকে এই পুরো দৃশ্য দেখে এজার মনে মনে মহাখুশি। তার বদ্ধমূল ধারণা, ইথানের সংসারে আজ আগুন লেগেছে। নূশা নির্ঘাত রুমে গিয়ে এই নিয়ে তুমুল অশান্তি করবে। বেচারা এজার তো আর এই দুজনের অদ্ভুত আর জটিল সম্পর্কের আসল সমীকরণ জানে না!
অন্যদিকে, নূশা ছাদ থেকে বেরিয়ে যেতেই ইথানের চেহারার সব নাটকীয়তা উধাও হয়ে যায়। চরম বিতৃষ্ণায় সে মাসাজরত মেয়েটির হাত নিজের কাঁধ থেকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে ধমক দিয়ে বলে, “দূরে থাকো!”
নূশা চলে যাওয়ার পর এই মেকি পার্টিতে ইথানের আর কোনো আগ্রহই অবশিষ্ট নেই।

ইথান ক্ষিপ্ত মেজাজে পরনের ট্রাউজার খুলে বাথরোব জড়িয়ে ছাদ থেকে নূশার পিছু পিছু নিচে নেমে আসে। আর সহ্য হচ্ছে না তার! নূশাকে সে নিজের স্ত্রী হিসেবে না মানলেও, তার প্রতি এক তীব্র অধিকারবোধ আর ঈর্ষা কাজ করছে। মন চাইছে সেই তথাকথিত ‘মাহরাম’কে খুঁজে বের করে এক টানে গলা কেটে ফেলতে। ওদিকে নূশা ঘরে এসে সোফায় বসে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। এতক্ষণ অনেক কষ্টে সে নিজেকে সামলে রেখেছে। ইথানের বেলেল্লাপনা দেখে তার রাগ হচ্ছে ঠিকই, তবে সেটা জেলাসি থেকে নয়; বরং ইথানের নির্লজ্জ আচরণের কারণে। মনে মনে সে বলে, “শালা, তুই ক্যারেক্টারলেস আমি জানি, কিন্তু নিজের ক্যারেক্টারলেসের তকমা আমার সামনে এভাবে দেখানোর কী আছে?”
এসব ভেবে সে কিছু একটা বলতে যাবে, তখনই দেখে ইথান বাথরোব পরে চুলের পানি মুছতে মুছতে রুমে ঢুকছে। ইথানকে দেখে নূশা নিজের চেহারায় একটা শান্ত ভাব ফুটিয়ে তোলে। তারপর উঠে গিয়ে নিজের ব্ল্যাংকেটটা নেওয়ার জন্য কাবার্ডের দিকে এগোয়। ইথান আগেই জানিয়েছে আজ সে নূশার সাথে কিছু করবে না, অর্থাৎ নূশাকে আজ সোফাতেই ঘুমাতে হবে। ইথান এগিয়ে এসে নূশার ঠিক পেছনে দাঁড়ায়। নূশা তার উপস্থিতি টের পেয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে নেয়, কিন্তু পারে না। ইথান এক টানে তার বাহু ধরে পেছনে টেনে এনে কাবার্ডের সাথে চেপে ধরে। নূশার চোখে চোখ রেখে দাঁত চিবিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, “মাহরামটা কে? কে হয় সে তোমার, যে ওকে নিয়ে স্টোরি পর্যন্ত দাও?”
নূশা এই কথা শুনে ভীষণ ভড়কে যায়। কী বলছে এই লোক! মাহরাম আবার কে হবে? নূশা তো স্টোরিটা দিয়েছিল ভবিষ্যতে তার জীবনে যে আসবে, তাকে উদ্দেশ্য করে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, ইথানের সাথে তার সংসার কখনোই টিকবে না। প্রথমে বুঝতে না পারলেও একটু পর নূশা ধরে ফেলে যে ইথান আসলে ‘মাহরাম’ শব্দের অর্থই বোঝেনি। তাই নূশাও শান্ত গলায় জবাব দেয়, “আছে একজন। আপনাকে কেন বলব? আপনি কোন মেয়ের সাথে শোন, কার সাথে সময় কাটান, আমি কি কখনো সেটা জিজ্ঞেস করেছি? আপনি আমার স্টোরি, আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে প্রশ্ন করছেন। চুক্তিতে তো এমন কিছু ছিল না!”
নূশার কথায় ইথানের রাগ যেন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। রাগে তার ভেতরটা জ্বলতে থাকে। সে নূশার আরও কাছে গিয়ে উন্মাদের মতো প্রশ্ন করে, “আমার বিষয়টা আলাদা। এবার তুমি বলো, ঐ মাহরামের মাঝে এমন কী আছে যা আমার মাঝে নেই? তুমি ওর মাঝে কী পেয়েছো? ও কি আমার থেকেও বেশি সুন্দর?”
নূশা ব্যথায় নিজের হাত ঝাঁকি দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ, সে আপনার চেয়েও সুন্দর। আর সবচেয়ে সুন্দর হলো তার ব্যবহার। সে আমাকে আপনার মতো দাসী আর ভোগের পণ্য হিসেবে ট্রিট করে না। সে আমাকে সম্মান করে।”
কথাটি শুনে ইথান এক হাতে নূশার গাল চেপে ধরে এবং অন্য হাতে তার কোমর পেঁচিয়ে নিজের আরও কাছে টেনে নেয়। ফিসফিস করে আবার জিজ্ঞেস করে, “ও কি জানে তোমার আর আমার সম্পর্কের কথা? ও কি জানে তুমি এই ছয় মাসের জন্য আমার।
নূশা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “হ্যাঁ, ও সব জেনেও আমায় ভালোবাসে। ও জানে আমার শরীর আমি আপনার কাছে ছয় মাসের জন্য জমা রেখেছি। আর ওর এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। জানেন কেন?”
“কেন?”
“কারণ ওর কাছে শরীরটা ম্যাটার করে না, ভালোবাসাটাই সব। সে আপনার মতো নারীদেহের প্রতি আসক্ত নয় যে, যখন যার তার সাথে যা ইচ্ছে তাই করবে।”
ইথান নূশার চোখের গভীরে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “তুমি বলতে চাইছো ও এসব করে না, বরং আমি করি। তাই তো?”
“হ্যাঁ, বলছি তো! নিজের চোখেই তো দেখলাম। এবার আমাকে ছাড়ুন, আমি ঘুমাব।”
“ঘুমাতে দেব, তবে তার আগে তোমার সেই মাহরামের পিকচার দেখাও।”
এবার নূশা পড়ে যায় মহা বিপদে। রাগের মাথায় বড় বড় কথা তো বলে দিয়েছে, মিথ্যার পাহাড় সাজিয়েছে, কিন্তু এখন ছবি কোথায় পাবে? সে আমতা আমতা করে বলে, “ওর ছবি আমার ফোনে নেই, ডিলিট হয়ে গেছে।”
” না দেখালে আজ এখানেই তোমার গলা কেটে রেখে দেব, যে গলা দিয়ে ওর এত প্রশংসা করছিলে!”
নূশা ইথানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। “সরুন আমার কাছ থেকে! এত কাছে কেন আসছেন? অন্যদের সাথে তো দেখলাম বেশ লেপ্টে আছেন, তো আজকের রাতটা তাদের নিয়েই কাটান না! সরুন!”
ইথান নূশার থুতনি শক্ত করে চেপে ধরে বলে, “এত কথা না বলে এই প্রশ্নের জবাব দাও ঐ মাহরাম কি তোমায় ছুঁয়েছে?”
নূশার মেজাজ এবার পুরোপুরি বিগড়ে যায়। সে ইথানের হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে বলে, “হ্যাঁ, ছুঁয়েছে! তো কী হয়েছে? ছুঁলে ছুঁবে! আপনাকেও তো কত নারী ছোঁয়, আমি কি তার কৈফিয়ত চাই?”

একটু পর…….
“হ্যাঁ, ছুঁয়েছে, তো কী হয়েছে?”
কথাটা বলা হয়তো নূশার জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভুল। কথাটি শোনার পর ইথানের চোখের দৃষ্টি বদলে যায়। কোনো কথা না বলে সে নূশাকে টেনেহিঁচড়ে সোজা বাথরুমে নিয়ে যায়। বাথটাবের ধারে তাকে আছড়ে বসিয়ে পেছনের চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে। এরপর হ্যান্ডশাওয়ারের তীব্র জলের ধারা নূশার মুখে, গলায় আর ঘাড়ে অনবরত ছুঁড়তে থাকে সে। উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ওঠে, “বলো, কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে ও? কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে তোমায়? তুই শুধু আমার! তোকে অন্য কেউ কেন টাচ করবে? টাচ করতে পারবে না! কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে, বল!”
পানির তীব্র আঘাতে নূশা কোনো কথা বলতে পারছে না, শুধু দম নেওয়ার জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে জোরে শ্বাস টানছে। এই অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একসময় সে প্রাণপণে শাওয়ারটা চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে, “মাহরাম মানে কী, সেটা তো আগে বুঝুন! আমি মিথ্যা বলেছি! আমি তো স্টোরিতে তাকে মিন করেছি, আপনার সাথে ডিভোর্স হওয়ার পর যার সাথে আমি বাঁচব!”
নূশার কথা শুনে ইথানের ভেতরের আগুনটা এক মুহূর্তে নিভে যায়। বুকের ভেতর চেপে বসা বিশাল পাথরটা নেমে যায় নিমিষেই। ও তাড়াতাড়ি নূশাকে ওভাবেই ভেজা মেঝেতে ফেলে রেখে সে ধীরপায়ে রুমে ফিরে আসে। ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত সার্চ করে দেখে ‘মাহরাম’ শব্দটির অর্থ। অর্থটা জানার পর ইথানের মনে সূক্ষ্ম একটা অপরাধবোধ খচ করে ধরে অযথাই সে নূশার সাথে এতটা বিশ্রী আচরণ করে ফেলল! সবকিছু ঠিক হতে গিয়েও হচ্ছে না। ইথান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাবার্ড থেকে নূশার একটা ড্রেস বের করে ইথান আবার ওয়াশরুমে ফিরে যায়। নূশা শাওয়ারের নিচে হাঁটুতে মুখ গুঁজে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। ইথান যে তাকে নিছক একটা পুতুলের মতো ব্যবহার করছে, এই রূঢ় সত্যটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। ইথান কাপড়টা ভেতরে রেখে নিজের অপরাধবোধ লুকিয়ে কড়া গলায় বলে, “তুমি মিথ্যা না বললে আমিও এত রিঅ্যাক্ট করতাম না। দোষ তোমার, আমার না। তাড়াতাড়ি কাপড় পাল্টে রুমে আসো, নয়তো আজ সারারাত এখানেই যা করার করব। বুঝতেই তো পারছ, ইথান যা বলে, তা করে ছাড়ে।”
নূশা ধীরেসুস্থে মুখ তুলে তাকায়। তার দৃষ্টিতে এখন এক আকাশ সমান ঘৃণা। কোনো কথা না বলে সে শুধু ওই ঘৃণামাখা চোখেই ইথানকে দেখতে থাকে। নূশার এই নির্বাক চাহনি দেখে ইথান বাঁকা হেসে বেরিয়ে আসে।
নূশা কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থাকে। তারপর ভেজা শরীর মুছে কাপড় পাল্টে ধীরপায়ে রুমে আসে। রুমে এসে দেখে ইথান লাইট অফ করে অন্ধকারে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। নূশা নিঃশব্দে সোফার দিকে যেতে নিলেই ইথানের গলা শোনা যায়, “সোফায় কী? বিছানায় আসো, কুইক।”
নূশা কোনো প্রতিবাদ করে না। একটি প্রাণহীন, অনুভূতিশূন্য পুতুলের মতো সে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। বিছানায় উঠেই সে নিজে থেকে নিজের ওড়না সরিয়ে ফেলে, তারপর কামিজটাও খোলে নেয়। চারপাশের গাঢ় অন্ধকারে নূশা নিঃশব্দে কাঁদছে। গাল বেয়ে অঝোরে গড়াচ্ছে নোনা জল। তার কিছুই করার নেই, এই নিষ্ঠুর নিপীড়নের বেড়াজাল থেকে পালানোর কোনো পথ তার জানা নেই।
নূশাকে এমন করতে দেখে ইথান হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। নূশার গাল বেয়ে পড়া উষ্ণ জল সযত্নে মুছে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে, “আজ তোমার সাথে কিচ্ছু করব না, কথা দিয়েছিলাম তো? আর আমি কথা না রাখার মানুষ নই। তুমি কেঁদো না সুইটহার্ট। একটু আগে যা হলো, তা স্রেফ তোমার বোকামিরই ফল।”
নূশা কোনো কথা বলে না, নিশ্চল হয়ে শুয়ে থাকে। ইথান তাকে ব্ল্যাংকেট দিয়ে সযত্নে ঢেকে নিজের বুকে জড়িয়ে নেয়। নূশার উষ্ণ শ্বাস আর কান্নার গরম জলে ইথানের বুক ভিজে যায়। ইথান পরম মমতায় নূশার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “কেঁদো না সুইটহার্ট। আমিই তোমার ডেস্টিনি। তোমার দোষেই তুমি শাস্তি পেয়েছ। মিথ্যা না বললে আমি রাগও করতাম না, আর তোমার সাথে এমন বিহেভও করতাম না।”
অন্ধকারের বুক চিরে নূশা ভাঙা গলায় উচ্চারণ করে, “আ-আপনি একটা সাইকো! আপনার সাথে বিয়ে হওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।”
নূশার কথায় ইথান শব্দ করে হেসে ওঠে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “তুমি আজ সেটা বুঝতে পারলে? এটা তো তোমার বিয়ের রাতেই বোঝা উচিত ছিল!”

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply