Golpo romantic golpo তাজমহল সিজন ২

তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩১


তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড

পর্ব_৩১

প্রিমাফারনাজচৌধুরী

রওশনআরা সোজা বলে দিয়েছেন এই সম্পর্ক কিছুতেই সম্ভব না। তারউপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। কোনো কথা হবে না। তাসনুভা কাপড়চোপড় গোছগাছ করছে। ঝিমলি এসে তার সামনে বসলো।

“ননদিনী এভাবে সব শেষ হয়ে যাবে?”

তাসনুভা কপাল কুঁচকে তাকালো।

“সেটা আমি কীভাবে বলবো? আম্মুকে আমি একটা উচিত শিক্ষা দেব। আমাকে কাল থেকে বকে যাচ্ছে। বিয়ের পর আমি জীবনেও এই বাড়িতে আসবো না।”

ঝিমলি বলল,”মায়েরা সন্তানদের ভালোই চায়। কিন্তু মাঝেমধ্যে বুঝতে পারেনা। এটাই। এত রাগ করে লাভ নেই। সমাধানে আসুন।”

“মেজো ভাইয়া আর শাইনার মধ্যে মেবি ঝগড়া লেগেছে।”

“তারা তো ঝগড়া না করে থাকতে পারে না। সবাই ঝিমলি চৌধুরী আর রায়হান সিদ্দিকীর মতো নয়। তাদের সংসারটাই চলছে ঝগড়ার উপর। ঝগড়া যেদিন থেকে কমে যাবে সেদিন সংসারও আর হবে না।”

“উইয়ার্ড! আমি কখনোই ঝগড়া করবো না।”

“একদম। আমার ননদিনী বরকে সারাক্ষণ..

তাসনুভা তাকে থামিয়ে দিল,”স্টপ! কাজের কথা বলে চলে যান। আমি একা থাকতে চাই।”

ঝিমলি হাসতে হাসতে বলল,”ওকে, এখন যে ছেলেটার কথা হচ্ছে সেটা বেশ মোটা অংকের টাকা কামায়। দেখতেও বেশ। পরিবারও চমৎকার। বংশ পরিচয় লা জবাব। এখন আপনিই বলুন এটার চাইতে কম টাকাওয়ালা আনিস ভাই কেন বেটার হবে?”

“অফকোর্স বেটার।”

“হোয়াই?”

“বেশি টাকাওয়ালা দুশ্চরিত্র পুরুষ মানুষের চাইতে কম টাকাওয়ালা আনিস ভাই ভালো। কারণ তিনি কোনো মেয়ের দিকে তাকান না। এমনকি আমার দিকেও না।”

ঝিমলি হাসলো।

“আচ্ছা। সব টাকাওয়ালা ছেলেরা খারাপ হলে আপনার বাপ দাদা থেকে শুরু করে রায়হান সিদ্দিকী, তাজদার সিদ্দিকী সবাই দুশ্চরিত্র। তাদের তো বেশ হ্যানসাম স্যালারি আছে।”

“সবাই না। কিন্তু দুশ্চরিত্র হবে না তার গ্যারান্টি কি?”

“তারমানে আনিস ভাইয়ের চরিত্রের গ্যারান্টি আছে?”

“হুঁ।”

“গ্রেট!”


“কিরে তুই এখানে?”

তাজদার গম্ভীরমুখে বলল,”তাজনার কিছু জিনিস শেষ হয়ে গেছে। কিনতে এসেছি।”

আনিস বলল,”চল চা খাই।”

“আমি চা খাই না।”

আনিস জোর করলো,”চল, এক কাপ চা খেলে কিছু হবে না।”

আনিসের জোরাজোরিতে দু’জন চা খেতে ঢুকলো। চা খেতে খেতে আনিস দিনদুনিয়ার বিস্তারিত সব কথা বলতে লাগলো। যেমন আজকের টিভির শিরোনামে কি দেখানো হয়েছে। কোন অঞ্চলে কি ঘটনা ঘটেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আসল কথাটা বললো না। তাজদার এবার ফুঁস করে দাঁড়িয়ে পড়লো।

“আনিস আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। মমতাজ তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছে। তুই বোধহয় এখন ফিরবি না।”

আনিস বলল,”এখনই ফিরবো। বাইক নিয়ে এসেছি। বাইরে আছে। চল।”

“আমি একাই চলে যাই।”

“না, আমি বাড়িই ফিরছি।”

আনিসের বাইকে চড়ে বাড়ি ফিরলো সে। ঘরে আসতেই শাইনা তার হাত থেকে শপিং ব্যাগটা নিয়ে একেকটা জিনিস বের করতে লাগলো।

“সব এনেছেন তো?”

তাজদার চেয়ারে বসে আছে গম্ভীর হয়ে।

“না আনিনি। আপনি কি চোখ হাতে নিয়ে হাঁটেন?”

শাইনা তার হাবভাব দেখে বেশি ঘাঁটালো না। পুরোনো তাজদার সিদ্দিকী কামব্যাক করেছে। আচ্ছা ভাইয়া আবার কিছু বলেনি তো? যদি বলে থাকে তাহলে তো আজকে রাতের ঘুম হারাম।

শাইনা তার চেহারার দিকে তাকিয়ে ধীরেধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

“তাজদার সিদ্দিকী?”

তাজদার তার দিকে তাকালো।

“ভাইয়া কিছু বলেছে?”

“হ্যাঁ।”

“কী?”

“টিভির শিরোনামে বড়ো বড়ো করে লেখা ভূইয়া বাড়ির বড়ো ছেলের বউ মজুমদার বাড়ির ছোটো ছেলের সম্বন্ধির সাথে পালিয়েছে রাত বারোটার ট্রেনে করে।”

শাইনা শব্দ করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি চলে এল। সে হাসতে হাসতে বলল,

“আমার ভাইয়া জীবনেও এইসব কথা বলবে না। আপনি একদম মিথ্যে বলবেন না।”

তাজদার তার দিকে ক্ষোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভাইবোন সবাই মিলে তার সাথে মজা নিচ্ছে। শাইনা হাসি থামিয়ে গ্লাসে পানি ঢাললো। গলা ভিজিয়ে নিল। তাজদার দপ করে উঠে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। দরজাটাও শব্দ করে বন্ধ করলো। শাইনা আরেকটু হেসে নিল।

তাজদার মুখহাত ধুয়ে এসে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল,”তুমি কাল সকালে যাচ্ছ?”

শাইনা তার দিকে তাকালো।

“জি না।”

তাজদার শার্টটা তার কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে একটা নতুন শার্ট গায়ে চাপাতে চাপাতে বাইরে বেরিয়ে গেল। শাইনা শার্টটা হাতে নিয়ে ওয়াশিং মেশিনের দিকে ছুটলো। কিছুক্ষণ পর তাজদার সিদ্দিকীর গলার আওয়াজ শোনা গেল। শাইনা কপাল চাপড়ালো। আল্লাহ এই ঝগরুটে পুরুষ মানুষকেই শেষমেশ আমার কপালে জুটতে হলো?

তাজনাহা তার ছোটো ফুপীর কাছে। শাইনা তার হাতে মেয়েকে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। সে মাথায় কাপড়টা তুলে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল। সবার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কারো কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। আজ রাতের মধ্যেই কিছু না কিছু সমাধানে আসবে।

তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বলল,”তাজের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এখন সময় চাইছে ঠিক কিন্তু কিছুদিন পরে বলবে এটা কোনোভাবেই সম্ভব না।”

তাজদার শান্ত হয়ে সব কথা শুনছে। হঠাৎই বলে উঠলো,”আব্বু তাজেরর শ্বশুরবাড়ি কথাটা বাদ।”

রায়হান বলল,”আব্বু ওটা বাদ দিয়ে কথা বলো।”

তৌসিফ বলল,”শ্বশুরবাড়ির বদনাম নেওয়া যায় না।”

সাথে সাথে তাজদার শাইনাকে দেখলো সিঁড়ির কাছটায়। নড়েচড়ে বসে বলল,

“আমার নাম যেন উচ্চারণ না হয়। শ্বশুরবাড়ি টসুরবাড়ি এইসবে নো অবজেকশন।”

শাইনা হাসলো না। গম্ভীরমুখে তার দিকে চেয়ে রইলো। আচ্ছা?

রওশনআরা বলল,”ওরা সময় চাওয়ার সুযোগই বা পেল কেন?”

শাইনার পেছনে ঝিমলি এসে দাঁড়িয়েছে। এক বউয়ের সামনে আরেক বউয়ের বাপের বাড়ির নামে! শাইনার দিকে তাকিয়ে তাজদার বলে উঠলো,

“আম্মু ওই বাড়ির সম্পর্কে আর একটা কথাও আমি শুনতে চাই না।”

রওশনআরা তখুনি শাইনাকে খেয়াল করলো। বলল,

“তোমার বউকে তুমি বাপের বাড়িতে নাইওর যেতে বলেছিলে না? যায়নি কেন? এইসব শোনার জন্যই তো যায়নি।”

রওশনআরা এইবার কেন যেন সংযত হয়ে কথা বলতে পারছেন না। এইবার উনার অন্য রূপ দেখছে শাইনা। বড়োআম্মুকে সে ছোটো থেকে অন্যরকম ভেবে এসেছে। প্রতিবার সে যার কাছে আশা নিয়ে গিয়েছে ততবারই হতাশ হয়েছে। এইবারও। সে আর কোনোদিন কারো উপর কোনো আশা রাখবে না।

“ও যেহেতু শুনতে চাইছে শুনুক। ওর বাড়িতে মেয়ে দেওয়ার জন্য আমি বসে থাকিনি। ও একটু নিঃশ্বাস ফেলেনি এতকিছু জানার পরও।”

তাজদার সাথে সাথে বলল,”ও কিছু জানতো না। এমনকি আমিও না।”

“বড়ো বৌমা জানতে পারলে ও জানবে না কেন? আমাকে কথা শিখিওনা তাজ।”

“আমি তো বলছি ও জানতো না।”

“তুমি হঠাৎ করে বউয়ের হয়ে কথা বলছো কেন?”

তাজদার আঙুল তুললো।

“এই!”

শাইনা তাকাতেই সে ইশারা করলো চলে যেতে। শাইনা চলে গেল। তবে আড়ালে।

“তুমি সব কথায় ওকে টানবে না। এগুলো এক্সট্রা ঝামেলা বাড়াচ্ছে আম্মু।”

“এক্সট্রা ঝামেলা তুমি নিয়ে এসেছ এই বাড়িতে। তোমাকে দেখে নুভা শিখেছে। নইলে ওই বাড়ির সাথে আমাদের কী? তোমাকে এইসব কথা বউ শিখিয়ে দিয়েছে তাই না? সে তো শিখিয়ে দেওয়ার জন্যই থেকে গেছে। নইলে বাপের বাড়ি যায়নি কেন?”

তাজদার রায়হানের দিকে তাকালো। বারবার এক কথা। বারবার এককথা। সে হাত দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে কঠোরভাবে বলল,

“শাইনাকে কেন শিখিয়ে দিতে হবে? এর আগে আমি কখন এত ভালো ছিলাম?”

“সেটাই তো। সব সমস্যার মূল তো তুমি।”

“ইয়েস আইএম! আমি ওই বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে ভুল করেছি। এখন একটা বাচ্চা মেয়েও হয়েছে। আমি একটা কাজ করি। মা মেয়েকে একেবারের জন্য পাঠিয়ে দিই।”

রায়হান বলল,”শোন তাজ….

তাজদার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,”নাইওর না। একেবারের জন্য পাঠিয়ে দিলেই আম্মু শান্ত হবে। নইলে দুইদিন পরপর অশান্তি হবে। আর আমাকে আমার সব কাজবাজ ছেড়ে বউ শ্বাশুড়ির পেছনে লেগে থাকতে হবে।”

রওশনআরা বলল,”তোমার বউকে যেখানে ইচ্ছে নিয়ে চলে যাও। এটা আমার স্বামীর টাকা দিয়ে করা বাড়ি। একটা দরজা জানালায়ও কারো টাকা নেই। এই বাড়িতে তোমার বউকে রাখার দরকার নেই। তোমার বাড়িতে তোমার বউকে নিয়ে যাও।”

“তাহলে শুরুর দিকে ওকে উস্কানি কেন দিয়েছ আমার সাথে না যেতে?”

“তোমার বউ নিজেই যেতে চায়নি।”

রায়হান শাইনাকে ডাকলো,”শাইনা?”

শাইনা কিছুক্ষণ পর এল।

“জি ভাইয়া।”

সে ইশারায় তাজদারকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বললো। শাইনা তাজদারের দিকে তাকালো। তাজদার বলল,”কাল সকালেই চলে যাব।”

তাজদার একরাশ রাগ, ক্ষোভ আর মায়ের উপর তীব্র অভিমান নিয়ে গটগট পায়ে হেঁটে ঘরে চলে গেল।


দাদিমা আনোয়ারা বেগম এসে রওশনআরাকে বলল,

“আমি আজ নিশ্চিত এই ছেলে ঠিক তার মায়ের মতো হয়েছে। মায়ের কাছ থেকে শিখেছে সব।”

রওশমআরা বলল,

“এখন আপনি আমার দোষ দেখবেন জানি। বুড়ো বয়সেও আপনি আমার দোষ ধরা ছাড়লেন না। একটা ছেলেমেয়েও আমার কথা শোনে?”

“ছেলেমেয়েরা কি বলতে চায় সেটা তুমি শোনো না। আমি একসাথে তিন ছেলের বউকে রেখেছি। একটাকে আমেরিকা পাঠিয়েছি বরের সাথে। আর দুটোর সব হজম করেছি। তোমার দুটো ভালো হওয়ার পরও তুমি হজম করতে পারছো না এটা তোমার দোষ।”

রায়হান বলল,”আম্মু তাজ কি বলে গেল দেখলে?”

“শুনলাম। তুমিও শুনে রাখো। তোমার বউও যদি তিড়িংবিড়িং করে সোজা নিয়ে চলে যাবে।”

রায়হানের মন খারাপ হতে পারে ভেবে ঝিমলি হেসে ফেললো। বলল,

“আমি ননদিনীর কাজটা সহজ করে দিয়েছি। আর কিছু না। এত ঝামেলা হবে জানলে বলতাম না।”

রায়হান চিন্তিত হয়ে বলল,”এখন তাজকে কি বলবে?”

আনোয়ারা বেগম বললেন,”কিছু বলতে হবে না। চলে যাক বউ নিয়ে। এটা হওয়ারই ছিল। সবাই ছেলের বউ হজম করতে পারে না।”


শাইনা বুঝতে পারছেনা কি করবে। এখন মনে হচ্ছে তার বাড়িতে চলে যাওয়া উচিত ছিল। এখন গেলে বাড়িতে সবাই কি ভাববে। সবাই ভাববে সে আবারও ঝামেলা করছে। তার জন্যই এইসব হচ্ছে। সে এখনো বুঝে উঠতে পারছেনা সে কি এমন করেছে যার জন্য বড়োআম্মু তাকে সহ্যও করতে পারছে না।

তাজদার ব্যাগপ্যাক গোছাচ্ছে একমনে। শাইনা কোনো কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে। সে চোখের কোণা মুছে আলমারির কাছে যাওয়ার সময় তাজদার তার মুখের দিকে তাকালো ব্যাগের চেইন বন্ধ করতে করতে। শাইনা কিছু বলতে পারলো না।

দরজায় শব্দ হলো। ঝিমলি বাসন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“ভাত?”

শাইনা তাজদারের দিকে তাকালো।

তাজদার বলল,”এই বাড়ির একটা দানাপানিও খাব না। নিয়ে যাও।”

“আপনি গোরুর মাংস এনেছেন না? শাইনা ওটা রেঁধেছে নিজ হাতে। ও বেচারি এত কষ্ট করে রেঁধেবেড়ে না খেয়ে থাকবে?”

তাজদার শাইনার দিকে তাকালো। ইশারা পেয়ে শাইনা বাসনটা নিল। ঝিমলি দুজনের জন্যই ভাত মাংস দিয়েছে ভরে ভরে।

ভাতের বাসনটা টেবিলে এনে রাখলো সে। তাজদার শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিল।

তাজদার সিদ্দিকী একফোঁটা পানিও খাবে না জেনেও শাইনা তাকে ভুলিয়েভালিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করলো। হাতে হাতে কাজ করে দিতে দিতে বলল,

“আমি আপনাকে খাইয়ে..

তাজদার গর্জে উঠলো,

“তুই খা। তোর খুব খিদা শ্বশুরবাড়ির ভাত খাওয়ার জন্য।”

শাইনা চমকে উঠলো। কেঁদে ফেলবে মনে হতেই তাজদার বলল,”একদম কাঁদবি না। তুই রওশনআরার যোগ্য পুত্রবধূ। আমার কোনো কথা তোদের কানে যায় না। সবসময় আমার দোষ ধরার তালে থাকিস। যা এবার শ্বাশুড়ির পা চাট। তোর সম্মান আত্মঅসম্মান সব আমার সামনে। শ্বাশুড়ি তোকে সারাদিন অপমান করলেও তুই তার পা চাটবি। যা চাট। আসছে ভাত খাওয়াতে! এই বাড়ির একটা দানাও মুখে তুলবো না আমি। তুই খা। শ্বশুরবাড়ির ভাত খাওয়ার খুব লোভ তোর।”

শাইনা কাঁদছে।

“আবার কাঁদছে! এই দুই মহিলা শেষ করে দিল আমার জীবনটা। একজন জন্ম দিয়ে বাহাদুরি দেখায়। আরেকজন আমার বাচ্চা জন্ম দিয়ে বাহাদুরি দেখায়। কাল সকালে গিয়ে আমি গাড়ির রাস্তায় জান দিয়ে দেব। তারপর তোরা শান্তিতে থাকবি। আবার কাঁদে।”

শাইনা চোখ মুছে ফেললো। বলল,”আমি বাড়িতে একটা ফোন করবো?”

“করতে হবে না। কোথাও যেতে হবে না। দরকার পড়লে রাস্তায় গিয়ে থাকবো।”

শাইনা তাকে আর কিছু বললো না। খেতে বসে ভাত মুখে তোলার সময় কাঁদতে লাগলো।
তাজদার ব্যাগপ্যাক ফেলে চেয়ারে গিয়ে বসে আছে। তিতলি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।

“ভাইয়া বাবু ঘুম।”

তাজদার দরজা খুলে তাকে কোলে নিল। তিতলি চলে যেতেই তাজদার দরজা বন্ধ করে কটে শুইয়ে দিয়ে আবারও চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লো। শাইনা কাঁদছে দেখে মনে হতেই তার হাত ধরে টেনে তুলে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। শাইনা তার সাথে মিশে গা দুলিয়ে কাঁদতে লাগলো।


লাল শাক নিয়ে এসেছেন আফসার সাহেব। শাহিদা সেগুলো বেছে রাখছেন। সকালে কাজের শেষ থাকে না। রাতে কিছু করে রাখলে কাজ কমে আসে। সকাল হতে হতে কখন যে বেলা এগারোটা বারোটা বেজে যায় খেয়ালই হয় না।

আনিস ঘরে এল। ভাগ্নে ভাগ্নীদের দোকান থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছে। চিপস চকলেট পেয়ে তারা মহাখুশি। তাকে দেখে শারমিলা বলল,”ভাইয়া কিছু লাগবে?”

“না। আম্মাকে খুঁজছিলাম।”

“আম্মা এখানে।”

তারা দুইবোন উঠে চলে গেল। আনিস এসে মায়ের পাশে বসলো মেঝেতে। শাক বেছে দিতে দিতে বলল,

“মাছগুলো কেমন আম্মা?”

“আজকে রাঁধিনি। ফ্রিজে রেখে দিছি। কাল দুপুরে রাঁধবো। ভাবতেছি ছোটো জামাইকেও বলবো কাল দুপুরে এখানে দুটো ভাত খেতে বড়ো জামাইদের সাথে।”

“ও তো আমার উপর রাগ করছে। আসবে না বললেও।”

“কেন?”

আনিস আর কিছু বললো না। শাহিদা বেগম অবাক হয়ে গেলেন।

পরে সব মনে পড়তেই ভাবলেন জামাইটার উপর না জানি আমার কোন ঝড় আসে। মেয়েটাকেও কথা শোনাবে রায়হানের মা। এবার চিন্তা হতে লাগলো।

“তুই আর কোনো মেয়ে পেলিনা আনিস? ওই মেয়ে আমাদের বাড়িতে সংসার করবে? তোর মনে হয়? ছোটোবেলা থেকে ওই মেয়ে এমন। হাসিঠাট্টা বোঝেনা। দশজনের সাথে মিশে না।”

আনিস শাক বেছে যাচ্ছে খুব যত্ন করে।

“ওই মেয়ে গুরুজন টুরুজন তোয়াক্কা করে না।”

“সব জানি আমি।”

“ওই মেয়ে যার ঘরে যাবে তার ঘরে আগুন জ্বলবে দেখিস।”

“ওই বাড়িতে বউ তিনটেই ভালো। তারপরও আগুন জ্বলে।”

“কোন বাড়িতে?”

“রজব আলীর বাড়িতে।”

“শ্বাশুড়ি পরের মেয়েদের দেখতে না পারলে তাদের কি দায়? সারাক্ষণ খাওয়ার খোঁটা দেয়। আগুন জ্বলবে না? শাক রাঁধলেও নাকি সরিয়ে রাখে। ভাত নাকি মেপেমেপে দেয়। চা খেতে দুধ চিনি দেয় না। কিপ্টার কিপ্টে রজব আলীর ফুতের বউ।”

“সেটাই তো কথা।”

“তুমিও বউ জ্বালাবে নাকি আম্মা?”

শাহিদা বেগম রেগে গেলেন।

“তোর ভাবিকে আমি জ্বালাই?”

আনিস বলল,

“তাহলে বউ তোমাকে জ্বালাবে কেন?”

“অনেক মেয়ে আছে এমন। বাপ ভাইয়ের পয়সা থাকলে শ্বাশুড়িকে নাকের ডগায় তুলে আছাড় মারে।”

“তোমাকে নাকের ডগায় তুলে আছাড় মারলে
তুমি মাথায় তুলে আছাড় মারবে।”

“পরের মেয়ের সাথে দজ্জালগিরি আমি পারবো না বাপু। তারচেয়ে ভালো আমি একটা ভালো ঘরের মেয়ে আনবো। আমাকে কাজকাম করে খাওয়াতে হবে না। স্বভাব চরিত্রে, কথাবার্তায় মধু থাকলেই হলো। এখন তো জামাইটাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। তোর সাথে রাগ করলো বললি। তুই কিছু বলিসনি?”

“আমি কি বলবো? ওর রাগটা স্বাভাবিক। এখন কথা হচ্ছে তুমি তোমার ছোটো জামাইকে কি বলবে “

শাহিদা বেগম চুপ হয়ে গেলেন।

“তুই কিছু বলিসনি?”

“বলেছি সময় লাগবে। ভুল বলেছি বলে তো মনে হয় না। আমার তো পরিবারের সম্মতি লাগবে। হুট করে বিয়ে করে ফেলবো এমন কথা বলা যায় নাকি?”

শাহিদা বেগম চুপ করে রইলেন। কপাল কুঁচকে বললেন,”ওই মেয়ের সাথে তোর কথা হয়?”

“না।”

“তোর কি মনে হয় ওই মেয়ে তোর সাথে ভালোমতো ঘর করবে? তুই নিজেই তো বলিস ওই মেয়েটা বেয়াদব।”

আনিস শাক বাছায় মনোযোগ দিল।

“আমি অতকিছু জানিনা। ছেলেমেয়ে সুখে থাকলে সেখানে আমি কিছু বলার কে? চাকরি বাকরি করে এসে যদি দেখিস ঘরে অশান্তি তখন জীবনটা জাহান্নাম মনে হবে। আমার মেয়েরা মাসের ভেতর কয়েকবার বেড়াতে চলে আসে। বড়ো বউটা নরমতরম। তাদের সাথে যদি খারাপ ব্যবহার করে তাহলে তো আমার সোনার সংসার আগুন লাগবে। নিজের মেয়েদের কথা বাদ। বউটাকে যদি বড়ো কথা বলে ফেলে আমার মানসম্মান থাকবে না। তোরটাও থাকবে না। তোদের সুখই আমার সুখ। তুই আজ পর্যন্ত যা করেছিস আমি কি তোকে কখনো বাঁধা দিয়েছি? তোর যদি মনে হয় ওই মেয়েকে তুই শিখিয়ে পড়িয়ে দিলে আমাদের সাথে থাকতে পারবে তাহলে কর বিয়ে। না পারলে বউ নিয়ে আলাদা হয়ে যাবি। কিন্তু মনোমালিন্য আর অশান্তি আমি ভয় পাই। আমি বেঁচে থাকাকালীন তোরা ভাই ভাই কোনোদিন যাতে তর্কবিতর্কে না জড়াস, কোন্দলে না জড়াস। তোদের বউয়ের জন্য বাড়িতেও আলাদা আলাদা রান্নাঘরের ব্যবস্থা রেখেছি। দরকার পড়লে সবাই আলাদা খাবে। এই আর কি। এখন তোর যা ভালো মনে হয় কর।”

শাক বাছা শেষ হয়ে এল। আনিস উঠে গেল। সে বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে শাহিদা বেগম বলে উঠলেন,

“ওই মেয়ে এলে তো আমি আর হাঁস মুরগী পালতে পারবো না আনিস। ওইদিন বাড়ির পেছনে এসে আমাকে বললো আপনার হাঁস মুরগীগুলো ম্যানার্স জানেনা। যেখানে সেখানে পায়খানা করে। নখ কেটে দিয়েন আমাদের উঠোনের মাটি তুলে ফেলে। মাটিগুলো ওদের বাপের বাকি?”

আনিস হেসে উঠে বেরিয়ে গেল।


আনিসকে সোফায় বসতে দেখে দাদিমা আফসার সাহেবকে বললেন,”তোর ছেলে কথার জবাব দেয় না বুঝলি আফসার?”

আফসার সাহেব ছেলেদের সাথে মশকরা করেন না। ছেলেরাও বাবাকে বাবার জায়গায় রেখে সমীহ করে চলে। মায়ের কথায় সাডা দিলেন,

“আচ্ছা।”

“তো তোর ছেলে ইশারায় কথা বলে। মুখে না। ইশারায় ইশারায় কথা বলে ওই বাড়ির মেয়েকে দিওয়ানা বানাইছে।”

আনিস চুপচাপ বসে রইলো। দাদিমা বললেন,

“ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস কর ভাত পানি খাইছে নাকি।”

আনিস ফোন বাড়িয়ে দিল। দাদিমা ফোন কানের কাছে রাখলেন।

“হ্যালো! আনিস ভাই ভাইয়া কাল সকালে শাইনাকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাবে। আপনি কিছু একটা করুন।”


তাজদার চেয়ারে বসে আছে। শাইনা ডাকার পরেও উঠলো না। শাইনা তার চেহারার দিকে তাকাতে পারছেনা। তার মনে হচ্ছে সবকিছুর জন্য সে দায়ী। অথচ সে দোষ খুঁজে পাচ্ছে না। এটা সত্যি বিয়ের পর বড়োআম্মুর মন পাওয়ার সে যতটা চেষ্টা করেছে তার সিকিভাগও তাজদার সিদ্দিকীর জন্য কিছু করেনি।

আজ মনে হচ্ছে সব অপাত্রে ঢেলেছে। বড়োআম্মুর রাগের বিশাল একটা কারণ প্রতিবেশীর মেয়ে হয়ে তার এই বাড়ির বউ হয়ে আসা, এখন দ্বিতীয় কারণও যোগ হয়েছে। তাঁর ছেলেকে লন্ডন থেকে নিয়ে আসা। তাই তিনি বহুদিন পর ক্ষোভ উগরে দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে এইবারই শেষ। সে আর কখনোই বড়োআম্মুর মন পাওয়ার চেষ্টা করবে না।

তাজদার সিদ্দিকীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। হাতটা ধরে বলল,

“ওঠুন। শুয়ে পড়ুন। আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবেন?”

ঝুটঝামেলার মধ্যে দুপুরে খেয়েছে অল্পস্বল্প। সন্ধ্যায় ভারী কোনো নাশতা খায়নি। এতক্ষণে খিদে পাওয়ার কথা। কিন্তু খাবেনা যখন বলেছে তখন খাবে না। তাই সে তার রুমে থাকা ফলমূলের ঝুড়ি থেকে তিনটা আপেল আর মাল্টা কেটে নিয়েছে।

এগুলো আলাদা করে রুমে রাখা। অনেক সময় ফ্রিজ থেকে নিয়ে তার খেতে লজ্জা হয় বলে তাজদার সিদ্দিকী এনে রেখেছে।

তাজদার উঠলো না। শাইনা একটা চিপসের প্যাকেট ছিঁড়ে তার কোলে এসে বসলো। তাজদার বাধ্য হাত দিয়ে বেঁধে নিল যাতে পড়ে না যায়।

শাইনা মুখের কাছে চিপস নিয়ে গেল। তাজদার মুখ ফিরিয়ে নিল। শাইনা জোর করে তার ঠোঁটের ফাঁকে চিপস রাখলো। গাল টেনে এনে আলতো করে চুম্বন করে বলল,

“খান… কিছু অন্তত খেতে হবে। খাবারের উপর রাগ করে বসে থাকা যায় না।”

তাজদার খেতে লাগলো পাথুরে দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ করে। শাইনা একটা একটা করে তাকে চিপস খাইয়ে দিল। তারপর ফলগুলো নিয়ে এল। নিজেও খেল। তাজদার সিদ্দিকীকেও খাইয়ে দিল। খেতে খেতে বলল,

“এখন আমরা একটু ঘুমাই? কাল সকালে আপনি আমাকে যেখানে যেতে বলবেন আমি যাব। প্রমিজ! শুনুন।”

তাজদার তার মুখের দিকে তাকালো। শাইনা তার মুখের সামনে মুখ নিয়ে এসে বলল

“পাক্কা প্রমিজ। এবার আসুন। ঘুম না হলে শরীর খারাপ করবে। আমি তো পাগল হয়ে যাব। আসুন।”

তাজদার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। শাইনা কটের পাশে বসে বাবুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

“আপনি আজকে বাবুকে একটু আদরও করেননি। কি পাষাণ বাবা!”

সাথে সাথে তাজদারের উত্তর এল,

“সেরা বাবা হওয়ার জন্য সেরা সন্তান হতে হয়, সেরা ভাই হতে হয়, সেরা স্বামী হতে হয়। আমি এর কোনোটাই না। তাকেও শিখিয়ে দেবে আমার কাছে যেন কোনো এক্সপেকটেশন না রাখে।”

শাইনা অবাক চোখে তার দিকে তাকালো।

“এভাবে বলতে পারলেন?”

“পারলাম। তুমিও রেখো না। যতটুকু পেয়েছ সন্তুষ্ট থাকো। আমার আর কিছু করার নেই। আমার এই জীবনটা নিয়ে আমার নিজেরও একগাদা অভিযোগ।”


সকাল হতে না হতেই রায়হান রওশনআরাকে গিয়ে বলল,”আম্মু তাজকে আটকাও। তুমি বললেই ও থেমে যাবে। এইসবের কোনো মানে হয়।”

রওশনআরা নিজের কথায় স্থির।

“যাক। আমিও দেখতে চাই ও কতদিন থাকতে পারে।”

রায়হান যেতেই তাসনুভা এল। ভাইয়া তাকে বলেছে কোনোকিছুতে আর তাকে না জড়াতে। এরচেয়ে বড়ো কষ্ট আর কি হতে পারে?

“আম্মু তুমি ভাইয়াকে আটকাবে? বাবুকে নিয়ে আসো শাইনার কাছ থেকে। বলো যেতে দেবে না। আম্মু?”

রওশনআরা মুখ ফিরিয়ে বসে রইলেন।

তাসনুভা শক্ত কণ্ঠে বলল,”আম্মু তুমি কিছু বলবে কি বলবে না?”

রওশনআরা তার দিকে ফিরলো।

“তুমি কোন সাহসে এভাবে কথা বলছো আমার সাথে? তোমার লজ্জা করে না?”

“আমার কেন লজ্জা করবে?”

“আনিস তোমার যোগ্য কোনদিক দিয়ে?”

তাসনুভা স্তব্ধ!

“তোমার ভাইও তোমাকে ওই বাড়িতে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ভাইবোন দুটোর মাথা খেয়েছে ওই বাড়ির সবাই মিলে। কক্সবাজারে কি হয়েছে আমি কি আন্দাজ করতে পারছিনা?”

“তাই তুমি ভাইয়াকে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছ?”

রওশনআরা চুপ হয়ে গেল। তাসনুভা বলল,

“এখন ভাইয়া চলে যাচ্ছে। তুমি প্লিজ আটকাও। ভাইয়া দেশে নেই বেশিদিন। তুমি এইসব কেন করছো? আম্মু প্লীজ!”

রওশনআরা মুখ ফিরিয়ে রাখলো। তাজদার আনিস আশরাফের সাথে কথা বলছে বাইরে। গাড়ি এসেছে। আফসার সাহেব আর শাহিদা বেগমও বেরিয়ে এসেছেন। আফসার সাহেব বললেন,

“মা বাবা এমন কতকিছু বলে। তার জন্য রাগারাগি করতে নেই বাবা। ঘরে চলো।”

তাজদার চুপ করে রইলো। সে শেষপর্যন্ত দেখবে তার বউ বাচ্চা বেরিয়ে আসার সময় মা আটকায় কিনা।

কিন্তু রওশনআরা আটকায়নি। এমনকি শাইনা সালাম করতে গেলেও তিনি মুখ ফিরিয়ে বসেছিলেন। তাসনুভা শেষমুহুর্তে দৌড়ে এসে শাইনার হাত ধরে ফেললো।

“শাইনা ভাইয়াকে বোঝাও। ভাইয়া প্লীজ!”

ভাইয়ের হাতও ধরে ফেললো সে। চোখে জল টলমল করছে।

চলমান….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply