Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ডেসটেনি

ডেস্টিনি পর্ব ৪


ডেস্টিনি [ ৪]

সুহাসিনি_মিমি

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পথে। উপরতলার করিডোরে এসে হাজির হলো মিতালী। থামল এসে ভাইয়ের কক্ষের দরজার ঠিক সামনে। নক করল দরজায়। অমনি ভেতর থেকে তাজধীরের গলা ভেসে এলো সঙ্গে সঙ্গেই,

“ইয়েস?”

“ভাইয়া, আমি। ডেকেছিলে আমায়?”

শব্দ করে দরজা খুলে ভিতরে আসতে বলল তাজধীর। ক্যাজুয়াল শার্টে পরিপাটি হচ্ছে তার ভাই। চুলগুলো এখনো ভিজা। অসময়ে শাওয়ার নিতে দেখে স্বভাবসুলব প্রশ্ন করল মিতালী,

“একুরিয়াম ক্লিন করেছিলে বুঝি? কিছুদিন আগেই তো জামাল ভাই এসে ক্লিন করে দিয়ে গেছে।”

“ওর নামে মাত্র ক্লিন করায় আমার হয়না,জানিসনা?আসে, ছুকছাক কাজ করে চলে যায়! ওর উপর ডিপেন্ড করে থাকলে একুরিয়ামে আর মাছ থাকা লাগবেনা। দেখা যাবে খালি একুরিয়ামই পরে আছে। মাছ একটাও বেঁচে নেই!”

মিতালী জানে ওর ভাইটা এমনি। একটু ছুকছুক স্বভাবের। একটু না অনেকটাই বলা চলে। ছোটবেলা তার ভাই যে কতকিছুতে ওর দোষ ধরত। তাজধীর তোয়ালে দিয়ে চুলগুলো ভালো করে মুছতে মুছতে জিজ্ঞাসা করল,

“তো তোদের কী অবস্থা বল তো? সংসার লাইফ কেমন চলছে? কোনো সমস্যা তো নেই?”

মিতালী হেসে মাথা নাড়ল। প্রত্তুত্তর করল খুস মেজাজে,

“আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া… সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে!”

তাজধীর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,

“ঘুরতে যাসনি কোথাও? বিয়ের পর তোকে কোথাও নিয়ে যায়নি পাগলটা?”

মিতালী লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলল। তাকাল না চোখ তুলে। পাবেলের সঙ্গে দীর্ঘ তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক ওদের। সেই সম্পর্কের জোড় ধরেই বিয়ে। এরপর ১৫ দিনের সংসার। বোনের লাজুকতা টের পেয়ে তাজধীর গলা খাকারী দিলো। মিতালী নিচু গলায় উত্তর করল কেবল,

“ওর তো কাজের প্রেসার ভাইয়া, তাই আপাতত কোথাও যাওয়া হয়নি তেমন করে।”

“প্রেসার-ট্রেসার আমি শুনতে চাইনি। নতুন বিয়ে হয়েছে কোথাও আলাদা টাইম স্পেন্ড করবিনা? শোন তোদের জন্য একটা ট্রিপ প্ল্যান করেছি আমি। কক্সবাজার যাচ্ছিস তোরা আগামীকাল রাতে। সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। পাবেল কে জানিয়ে দিস।”

মিতালী চোখ বড় বড় করে আওড়াল,

“কক্সবাজার?”

তারপর একটু থেমে বলল,

“ভাইয়া… কক্সবাজার না। অন্য কোথাও।”

তাজধীর ভ্রু কুঁচকে তাকাল। প্রশ্ন করল,

“কেন? কক্সবাজারে কী সমস্যা?”

“আছে এক সমস্যা। ওখানে পাবেল যেতে রাজি হবেনা বোধহয়।”

“তাহলে কোথায় যেতে চাচ্ছিস?”

“আসলে ভাইয়া আমার সিলেট যাওয়ার খুব শখ। যাওয়া হয়নি তো কখনো। ওখানে ঘুরার অনেকগুলো স্পটও আছে। তাই চাচ্ছিলাম…

“সিলেট?”

“যদি তুমি বলো।”

তাজধীর বিছানার উপর থেকে ফোন তুলে হাতে নিলো। কিছু একটা টাইপিং করল বোধহয়। সময় নিলে বলল,

“ওকে। সমস্যা নেই। তোদের দুজনের টিকিট ম্যানেজ করে দিয়েছি। আগামীকাল রাতেই রওনা দিচ্ছিস তোরা। ওকে?”

মিতালী তৎক্ষণাৎ বলল,

“দুটো না ভাইয়া, তিনটা দাও!”

তাজধীর ঘুরে তাকাল। জানতে চাইলো,

“তোরা যাচ্ছিস দুজন। তিনটা টিকিট দিয়ে কি করবি?”

“প্রিয়ন্তীকেও সাথে নেব ভাইয়া। পাভেল ওকে ছাড়া কোথাও যায়নিতো। আর বোনকে ছাড়া যেতে রাজিও হবেনা।”

তাজধীর গম্ভীর হলো।মুখোভঙ্গি কঠোর করে আওড়াল,

“তোদের মাঝে ও গিয়ে কী করবে? ওর কি হাসবেন্ড আছে?”

“এভাবে বলো না ভাইয়া। ছোট থেকেই তো পাভেলই ওকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। যেখানে যায় বোনকে সঙ্গে নিয়েই তবে যায়। চোখের আড়াল হতে দেয়না ওকে। খুব আদর করে। আর তাছাড়া প্রিয়ন্তীকে ছাড়া আমারও ভালো লাগবে না একা একা। “

কিঞ্চিৎ নীরবতা নেমে এল ঘুরজুরে। তাজধীর জানালার দিকে তাকাল। দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর বলল,

“আচ্ছা। ঠিক আছে। তিনটা টিকিটই হবে।”


টেবিলে রাতের খাবার পরিবেশন করছেন মোহনা বেগম। তাজধীর ছাড়া আপাতত বাড়ির সকলেই আছে সেখানে। প্রিয়ন্তী নিজের রুমে গুটিশুটি মেরে বসেছিল সারাটাক্ষণ। দুপুরে খেতে অব্দি নামেনি। ছাদে যেটা হয়েছে, তার পর থেকে ইচ্ছে করেই আর রুম ছেড়ে বাইরে বের হয়নি মেয়েটা। বের হলেই যদি লোকটা ওর সামনে পড়ে যায়? একবার তো ঠিকই করেছিল, ভাইয়ার কাছে বলবে আজই দাদিকে নিয়ে বাসায় চলে যাবে বলে। ওর ভাই থাকলে থাকুক। এই নিয়ে রাতে ডিনারের পর একান্তে কথাও বলবে ভেবে রেখেছে। তখনিতো ওর ভাবি একপ্রকার জোড় করেই মেয়েটাকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে এলো। এনে বসালো সোজা ডাইনিং টেবিলে। প্রিয়ন্তী মনে মনে দোয়া করছে, আজ যেন লোকটা নিচে না আসে। শুনেছে লোকটা সন্ধ্যায় বাইরে গিয়েছিলো। তবে ফিরেছে কিনা সেটা জানেনা। তবে এবেলায় আল্লাহ বোধহয় ওর দোয়াটা কবুল করলনা। সঙ্গে সঙ্গেই সিঁড়ির দিক থেকে ভেসে এলো সেই পরিচিত পায়ের শব্দ। প্রিয়ন্তীর বুক লাফিয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে ফেলল ত্রস্ত। ঠিক করল—খেয়ে সোজা রুমে ঢুকে পড়বে। কারও দিকে তাকাবেই না। প্রিয়ন্তীর দাদি বসেছে ওর পাশে। কাজের মেয়ে প্লেট সাজিয়ে দিচ্ছে। তাজধীর এসে চেয়ার টেনে বসল নিজের জায়গায়। বসতে বসতে বোনকে জিজ্ঞাসা করল,

“ওদের বলেছিস রেডি হয়ে থাকতে?”

সারাদিনের ব্যস্ততায় পাভেল কে বললেও প্রিয়ন্তীকে বলা হয়ে উঠেনি মিতালীর। মেয়েটা রুম ছেড়ে বেরই হয়নি। বলবে কি করে? ভাইয়ের কথার পিঠে প্রিয়ন্তী কে উদ্দেশ্য করে বলল তখন,

“ কাল রাতে রেডি হয়ে থেকো। ব্যাকপ্যাক করে নিও গুছিয়ে গাছিয়ে, প্রিয়ন্তী।”

প্রিয়ন্তীর হাত মাঝপথে থেমে গেল। চামচটা প্লেটের উপর রেখে ধীরে ভাবির দিকে তাকাল ও। খুশি হলো মেয়েটা মনে মনে। হয়তো বাসায় যাওয়ার কথা বলছে ওর ভাবি। উৎফুল্লতায় জানতে চাইলো তবুও,

“বাসায় যাচ্ছি নাকি ভাবি?”

মিতালী হেসে বলল,

“না, আমরা সিলেট যাচ্ছি। আমি,তোমার ভাইয়া আর তুমি।”

প্রিয়ন্তী একবার ভাইয়ার দিকে, একবার ভাবির দিকে তাকাল। অবুঝের মত শুধাল,

“ হানিমুন নাকি? তো তোমরা দুজন যাচ্ছ ঠিক আছে। মাঝখানে আমি গিয়ে কী করব? আমি যাব না ভাবি। তোমরাই যাও।”

“তোমাকে ছাড়া তোমার ভাই যাবে না। আর আমারও ভালো লাগবে না তোমাকে ছাড়া!”

প্রিয়ন্তী মাথা নাড়ল। বলল খেতে খেতে,

“কাপলদের মাঝে আমি গিয়ে কী করব বলো? একা একা লাগবে। তার চেয়ে ভালো আমি বরং দাদিকে নিয়ে বাসায় চলে যাই। তোমরাই যাও।”

এতক্ষণ চুপ করে থাকা মোহনা বেগম এবার বললেন,

“ও তো ঠিকই বলেছে। একা গিয়ে বোরিং হবে মেয়েটা।”

তারপর ওর দাদির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তাহলে আপনিও যান না ওর সঙ্গে মাওই। একটু ঘুরেও এলেন নাহয়।”

তৎজলদি বলে থামল মিতালী,

“আচ্ছা মা আমরা সবাই মিলে যদি যাই তাহলে কেমন হয় বলোতো? এই সুযোগে ফ্যামিলির সবাই একসঙ্গে টাইম স্পেন্ড করাও হবে। ঘুরাও হবে। তাইনা ভাইয়া?”

তাজধীর ডান ভ্রু প্রসারিত করে বোনের দিকে চাইলো। বুঝালো প্রশ্নটা ওর খুব একটা পছন্দ হয়নি। প্রিয়ন্তীর দাদি তখন বললেন,

“এই বুড়া বয়সে আমি তোমগো লগে গিয়া কী করমু? তোমরা দুইটা জামাই বউ মিলা লঙ্গলীলা করবা আর আমি বইসা বইসা আমার জামাইয়ের কথা মনে কইরা কান্দমু? এই বুড়া বয়সে আমি আমার জোয়ান স্বামীর কথা মনে কইরা কানতে পারমু না। আমি বাপু গেলে সোজা বাড়ি, আর কোথাও না।”

উপস্থিত সকলে হেসে উঠল সুফিয়া বেগমের কথায়।তবে শান্ত রইলো তাজধীর। মিতালী মজা করে বলল তখন,

“এত দুঃখ পাইলে আগে বলতা,তোমার জন্যও নতুন একটা জামাই বুক করে রাখতাম, দাদি!”

মোহনা বেগম এবার বললেন,

“শোন, আমি বলিকি আমি আর মাওই নাহয়,বাসায় থাকি । আযান নাহয় তোদের সঙ্গে যাক। প্রিয়ন্তীরও আর তখন একা লাগবে না।”

তাড়াহুড়ায় চেঁচিয়ে উঠল মিতালী। উচ্ছাসিত হয়ে বলল,

“আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ না মা! প্লিজ ভাইয়া, চলো না আমাদের সঙ্গে। প্লিজ না করোনা।”

পাভেলও সায় জানাল তাতে,

“হ্যাঁ ভাইয়া, চলুন। এমন সুযোগ তো বারবার আসে না। এই সুযোগে আপনাদের ভাই-বোনদেরও আলাদা সময় কাটানো হবে। আর আমাদেরও।”

ওদিকে মনে মনে দোয়া–দুরুদ জপছে প্রিয়ন্তী। লোকটা যেন মুখ খুলেই বলে,

“আমি যাব না, তোমরাই যাও।”

ভয়ের চোটে ইতিমধ্যে দু’রাকাত নফল নামাজও মানত করে বসেছে মেয়েটা। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। মিতালীর চোখ জ্বলজ্বল করছে উত্তেজনায়। অন্যদিকে প্রিয়ন্তীর ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ। একদিকে একজন প্রখর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে ভাইয়ের মুখ থেকে হ্যা শুনতে। অন্যদিকে আরেকজন রীতিমতো দোয়া পড়তে পড়তে শেষ। এবালায়ও আল্লাহ বেচারি প্রিয়ন্তীর দোয়া কবুল করলনা। মুখ খুলল তাজধীর। জানাল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে আগামীকাল সবাই রেডি থাকিস!”

মুখটা পুরোপুরি চুপসে গেল প্রিয়ন্তীর। মলিন মুখে বসে বসে বলল নামাজ ক্যানসেল। পড়বেনা ও। আল্লাহ আজ বোধহয় ওর সঙ্গে ভারী রেগেই আছেন।
মিতালী লাফিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে,

“ভাইয়া! কিসে করে যাব আমরা? “

“স্লিপার কোচে। রাত বারোটায় বাস উঠব, ইনশাআল্লাহ সকাল সাতটার দিকে সিলেট নামব।”

‘বাস’ শব্দটা শুনেই মিতালীর মুখটা এক মুহূর্তে চুপসে গেল। মেয়েটা বাসে উঠলেই যে বমি করে এই কথা ঘরের সবাই জানে। তাজধীরও বুঝে ফেলল। তাই স্বাভাবিক গলায় আশ্বস্ত করে বলল,

“স্লিপারে বমির চান্স থাকে না। সারারাত ঘুমিয়ে যাবি। তাছাড়া বমির ওষুধ খেয়ে নিস।”

তারপর হঠাৎ চোখ তুলে প্রিয়ন্তীর দিকে তাকাল।স্বাভাবিক সরেই জিজ্ঞেস করল,

“তা মিস প্রিয়ন্তী… আপনার আবার রাস্তাঘাটে যত্রতত্র বমি করার অভ্যাস নেই তো?”

প্রিয়ন্তী মাথা নামিয়েই রইল। এই লোকটার সঙ্গে কথাই বলবে না—এই পণ করে বসেছে ও। কথা বাড়ালেই যে বিপদ। এইবারও ওর হয়ে জবাব দিল পাভেল। জানাল,

“না ভাইয়া। ওর বাসে বমি করার অভ্যাস নেই।”


পরের দিন রাত। ব্যাগট্যাগ সব আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছে মিতালী। তারপরও ভালো করে একবার চেক করে নিলো শেষবারের মত। পাভেল ইতিমধ্যে নেমে গেছে লাকেজ নিয়ে। যেতে যেতে প্রিয়ন্তীর লাকেজ ও তুলে নিয়েছে। ভাইকে কত করে বলল প্রিয়ন্তী সে যাবেনা বলে। তবে ওর ভাই শুনলে তো? জোড় করেই মেয়েটাকে সঙ্গে করে নিয়ে নিচে নামল মিতালী।
রাত সাড়ে দশটার দিকে চারজন একসাথে গাড়িতে উঠল। গন্তব্য—ঢাকা আরামবাগ। প্রিয়ন্তী চুপচাপ বসে আছে। কোলের ওপর হ্যান্ড ব্যাগটা শক্ত করে ধরে।
আরামবাগে পৌঁছে ওরা বাসে উঠবে রাত বারোটার। “ইম্পেরিয়াল এক্সপ্রেস” এর টিকেট কেটেছে তাজধীর। রাত ঠিক বারোটায় ছাড়বে বাস। বাসে ওঠার আগে মিতালীকে বমির ওষুধ খাওয়ানো হলো।
হালকা বিস্কুট, পানি, শুকনো খাবার নিলো পাভেল।
তারপর চারজন একসাথে বাসে উঠল।

মিতালী আর পাভেলের জন্য কাপল বেড বুক করেছে। আর ওদের দুজনের জন্য দুটো সিঙ্গেল সিট্। তাজধীরেরটা নিচে। আর ঠিক তার বরাবর উপরেরটা,প্রিয়ন্তীর। মিতালী আর পাভেল নিজেদের বেডে ঢুকে পড়ল। প্রিয়ন্তী একবার ওর কাছে এসে পুনরায় ভাইয়ের সিটের ওখানে নক করল একবার। ভাবীর কাছ থেকে ইয়ারপড নিলো।এরপর পা বাড়াল নিজের সিটের দিকে। তাজধীর ইতিমধ্যে নিজের সিটে ঢুকে পড়েছে। নিচের সিটের পর্দাটা একটু ফাঁক ছিল।
ভেতরে মৃদু আলোয় দৃশ্যমান অনেকটাই। সেই ফাঁকা জায়গায় দিয়ে প্রিয়ন্তীর চোখ পড়ল ভিতরে। তাজধীর নিজের টি-শার্ট বদলাচ্ছে। একটানে খুলে ফেলল গা থেকে সেটা। প্রিয়ন্তীর পা দুটো অজান্তেই থেমে এলো মাঝপথে। লোকটার শরীরটা পুরো দেখা না গেলেও আবছা আলোয় একটা স্পষ্ট অবয়ব বুঝা যাচ্ছে।
শক্তপোক্ত, বিশাল একটা দেহ। লোকটা দেখতে যেমন দৈত্তর মত লম্বা। শরীরটাও বানিয়েছে ঠিক তেমন। তবে উপর থেকে দেখে বুঝা যায়না সেসব। ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই রইলো প্রিয়ন্তী। ওর ধ্যান ভাঙলো তাজধীরের ভ্রু কুঁচকে তাকানোয়। মেয়েটা
দিকবেদিকশুন্য হয়ে ঝুলে রইলো যেন মাঝ পথে। ইশ! সবসময় ওর সাথেই কেন এমনটা হয়? কেন?কেন? কেন? এখনই তাকাতে হলো লোকটাকে? সম্বিৎ ফিরতেই দ্রুত উপরে উঠে নিজের বেডে ঢুকে পড়ল প্রিয়ন্তী। ওড়নাটা মাথা থেকে সরিয়ে রাখলো একপাশে। এরপর বড় বড় শ্বাস নিলো কয়েকবার।
বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে,আনচান আনচান করছে।ছিঃ! ছি! লোকটা কি ভাববে ওকে?
ঠিক তখনই পাশে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।
স্ক্রিন জ্বলে উঠল অমনি। মেসেঞ্জারে একটা নোটিফিকেশন শো করছে। ফ্রম, তাজধীর সিদ্দিক আযান”। একমাত্রই এলো মেসেজটা। প্রিয়ন্তীর হাত কেঁপে উঠল। সেই কাঁপুনি তে কাঁপলো ফোনটাও। দুনোমুনো করল কয়েকবার। লোকটা ওকে মেসেজ পাঠিয়েছে? এই প্রথমবার লোকটা ওকে কোনো মেসেজ পাঠিয়েছে। কাপা কাপা হাতেই মেসেঞ্জার খুলল ও। ঢুকলো চ্যাটিংবারে। দেখতে পেল এক মিনিট আগে লোকটা লিখেছে,

“কি মিস প্রিয়ন্তী? বাচ্চার বাবাকে খুব বেশিই মিস করছেন বুঝি? আগে বললেই পারতেন—একসাথে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যেতে চান। তাহলে নাহয় আপনার ভাই ভাবীর মত আমাদের জন্যও একটা কাপল সিট্ বুক করতাম!”

প্রিয়ন্তীর মাথা ঝিঁ ঝিঁ করে উঠল। ছিঃ! লোকটা কী বলে এসব! মনে মনে নিজেকেই গালি ছুড়ল এযাত্রায়। ওঁ করেছেই এমন নির্লজ্জের মত কাজ। কেন ওভাবে উঁকি ঝুকি মারতে গিয়েছিস তখন? নির্লজ্জ মেয়ে কোথাকার! এরপর ভাবল এরকম একটা নির্লজ্জ লোক আশেপাশে ঘুরঘুর করলে ওতো নির্লজ্জ হবেই। ঠিক তখনই টুং শব্দে কেঁপে উঠল ফোনটা আবারও ,

“আপনি চাইলে এখনো ডাবল বেডের অ্যারেঞ্জ করা যায় কিন্ত। করবো নাকি, হু?”

প্রিয়ন্তী ফোনটা বুকে চেপে ধরল। গাল দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সিদ্ধান্ত নিলো এই অসভ্য লোকটাকে আর এক সেকেন্ডও সহ্য করবে না ও। এখনই ব্লক করবে। আজীবনের জন্য ব্লক লিস্টে ঢুকিয়ে রাখবে বেটাকে। ফোনটা হাতে নিয়ে যখন তাজধীরের নামের ওপর আঙুলটা চেপে ধরল—ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল শব্দ করে। হঠাৎ শব্দে চমকে উঠল ও। স্ক্রিনে ভেসে উঠল বান্দুবীর নাম। একটু বিরক্ত হয়েই কলটা রিসিভ করল প্রিয়ন্তী।

“কিরে! কই আছিস? কতগুলা মেসেজ দিলাম, একটারও রিপ্লাই নেই!”

প্রিয়ন্তী ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। বলল ধরে আসা কণ্ঠে,

“তোকে বললাম না, সিলেট যাচ্ছি। বাসে আছি।”

“ওমা! সত্যিই সিলেট যাচ্ছিস? আমি তো ভাবছিলাম তুই যাবিনা!”

“ভাইয়াকে বলেছিলাম। মানেনি ভাইয়া।”

“এই, নেভি সাহেব কইরে?”

প্রিয়ন্তীর গলা ঠান্ডা হয়ে এলো তৎক্ষণাৎ। উত্তর করল তেলেবেগুনে জ্বলে,

“কোথায় আবার! নিজের সিটে।”

“আর তুই?”

“আমার সিটে।”

ওপাশ থেকে ছোট করে একটা হাসি শোনা গেল। পরিহাস করেই বলে উঠল মেয়েটা এবার,

“দেখছিস? আমি বললাম না ওই ব্যাটা যাবেই। তুই তো বলছিলি যাবে না। এখনো বুঝছিস না লোকটা তোকে পছন্দ করে?”

প্রিয়ন্তী রেগে উঠল ফুস করে। রেগেমেগে বলল,

“একদম ফালতু কথা বলবি না। মুড এমনিতেই বিগড়ে আছে।”

“এত হ্যান্ডসাম একটা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পাশে থাকতে তোর মুড খারাপ কেমনে হয় মাইয়া? এইবার তো আমারো তোকে সন্দেহ হচ্ছে। তুই আসলেই মেয়ে মানুষ তো?”

“এইসব ফাউল কথা বলার জন্য ফোন করেছিস?”

“ফাউল না, ভালো কথা বলছি। ভেবে দেখ, লোকটা যদি তোকে পছন্দই না করতো, তাহলে মেসেজগুলোর কথা তোর ভাই-ভাবিকে জানালো না কেন?”

প্রিয়ন্তী চুপ করে শুনলো শুধু। বলল না কিছুই। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল তখন। ওপাশ থেকে আবার বলা হলো,

“মেয়ে, আর কখন বুঝবি? লোকটা তো তোকে বারবার নিজের বাচ্চার মা বানাচ্ছে! নিজেকে তোর বাচ্চার বাবা বলে দাবি করছে! এত হিন্টের পরও তোর মাথায় ঢুকছে না?”

এরপর থেমে আবারও বলতে লাগল,

“ওনি কি রাস্তাঘাটের ফালতু ছেলেদের মতো হাতে একটা গোলাপ এনে তোকে সবার সামনে সরাসরি প্রপোজ করবে গাধী? উনি একজন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার। ওনার ভাষা, স্টাইল সবই আলাদা। তবুও তো কতভাবে তোকে বুঝাচ্ছে বেচারা!”

“থাম! ভাই, চুপ যা প্লিজ!”

রেগে গিয়েই প্রিয়ন্তী ফোনটা কেটে দিল। বালিশের পাশে ছুড়ে ফেলল ফোনটা। বুক ধড়ফড় করছে কেমন যেন। রাগ, লজ্জা, অস্বস্তি—সব মিলে মাথাটা ঝিমঝিম করছে বলা চলে। অথচ রাগের আড়ালেও ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত লাজুক হাসি ফুটে উঠল নিমিষেই। কিছুক্ষণ পর আবার ফোনটা হাতে নিল। মেসেঞ্জার খুলল। তাজধীরের প্রোফাইল পিকচারে ঢুকল। ছবিটা জুম করল। ভালো করে তাকাল। শক্ত চোয়াল, গভীর একজোড়া চোখ, আর নাকের উপরে সেই কা টা দাগটা। হঠাৎ করেই গাল দুটো গরম হয়ে উঠল ওর । ফোনটা বুকে চেপে ধরল প্রিয়ন্তী। এরপর চোখ বন্ধ করল।


রাত প্রায় তিনটার কাছাকাছি। অন্ধকার ভেদ করে বাসটা এসে থামল কুমিল্লার এক হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের সামনে। হঠাৎ থামার ঝাঁকুনিতে অনেকেই নড়ে উঠল ঘুমের ঘোরে। ড্রাইভারের গলা শোনা গেল তখনই, “থার্টি মিনিট ব্রেক।”

বাসের ভেতরে হালকা গুঞ্জন শুরু হলো। কেউ নামছে হাতমুখ ধোয়ার জন্য। কেউ আবার ক্ষুধার তাড়নায় খাবার নিতে নামছে। পাভেল আর মিতালীও উঠে দাঁড়াল। নামার আগে একবার প্রিয়ন্তীকে ডেকে গেল দু’জনেই। মেয়েটা চুপচাপ শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। কোনো নড়াচড়া নেই। মিতালীর মনে হলো—ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো। তাই আর ডিস্টার্ব না করে দু’জনেই নেমে গেল। মিনিট দুয়েক পরে ঠকঠক শব্দ হলো পাশে। শব্দটা ওর সিটের পাশের কাঠের পার্টিশনে হলো। প্রথমে পাত্তা দিলোনা প্রিয়ন্তী। কিন্তু শব্দটা থামার যেন নাম নেই। যতক্ষণ না ও সাড়া দিচ্ছে শব্দটা বেড়েই যাচ্ছে। চোখ মুখ খিচে ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলো প্রিয়ন্তী। বান্দুবীর কথার পরতো আরো বেশি এই লোকটার মুখোমুখি হওয়া যাবেনা ওকে। তবে লোকটা বোধহয় পন করেই রেখেছে ওকে উঠানোর। তাইতো ডেকে উঠল রাশভারী সরে,

“এক মিনিট আগেও ফেসবুকে অ্যাকটিভ থাকা মানুষটা মিনিটের মধ্যেই কীভাবে এমন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, মিস প্রিয়ন্তী? এই গতিতে তো এখন দেখছি আপনার কাছ থেকেই ঘুমানোর ট্রেনিং নিতে হবে। সমুদ্রে লাইফ সংকটে দেখলে নিশ্চিন্তে মিনিটেই এভাবে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবো। না, সত্যি সত্যিই এক মিনিটে ঘুমানোর কোর্সটা কমপ্লিট করতে হবে আপনার কাছ থেকে। বলুন,বলুন সিক্রেটটা আমাদের সাথেও শেয়ার করুন। বিনিময়ে যা চাইবেন তাই পাবেন কিন্ত। এই অপারচিউনিটি হাত ছাড়া কইরেন না,মিস ব্লু হাফমুন!”

চলবে…….

( ৫ হাজার রিয়েক্ট + ৫০০ কমেন্টস ডান হলে পরবর্তী পর্ব আসবে )

আমার লিখা রোমান্টিক ধাচের গল্প পড়তে চাইলে আমার ইবুকগুলো সংগ্রহ করতে পারেন। লিনো কমেন্ট বক্সে দেয়া হলো 🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply