ডেসটেনি [ ১০ ]
সুহাসিনি_মিমি
“আপনি কি আমাকে স্টক করছেন, মিস প্রিয়ন্তী ?”
তখনের কথার পর প্রিয়ন্তী কথাটা শুনেও আমলে না নিয়ে একা একাই হেঁটে নামতে থাকে উপর থেকে। তবে এইবার উক্ত কথার পর চলন্ত পা দুটো থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আবার। তাজধীর একবার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে ভ্রু তুলল সামান্য। প্রিয়ন্তী প্রথমে কথাটার মানে ধরতে পারল না। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“মানে?”
নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে পরপর ওর দিকে তাকিয়ে সরস গলায় বলল তাজধীর,
“এই যে আপনি আমার শার্ট এর সাথে মিলিয়ে একই কালার ড্রেস পড়েছেন? এটাকি কাকতালীয় নাকি আমার প্রথম সন্দেহটাই ঠিক? আপনি আবার আমাকে স্টক করেন না তো?”
কথাটা বলেই চোখে বাঁকা চোখে তাকাল। ঠোঁট চেপে হাসিটুকু ধমিয়ে রাখল। প্রিয়ন্তীর মাথায় এতক্ষনে ঢুকল পুরো ব্যাপারটা। নিজের পোশাকের দিকে তাকাল ও। সত্যিই তো—একই শেডের আকাশি!
ইশ! ও তো খেয়ালই করেনি এতক্ষন! এপর্যায়ে বেশ ইতস্তত হতে হতেও হলোনা। বরং নাক-মুখ কুঁচকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনাকে স্টক করে আমার লাভ?”
তাজধীর এগিয়ে এসে দাঁড়াল পিছন থেকে। দুজনের মাঝামাঝি যথেষ্ট দূরত্ব রেখেই বলল,
“লাভ?লাভ লসের হিসেব কষে কেউ স্টক করে নাকি?”
প্রিয়ন্তী চোখ গোল গোল করে তাকাল এবার। বলল,
“আমি করি। আর আপনার পেছনে ঘোরার মতো সময়ও আমার নেই।”
তাজধীর মাথা নেড়ে যেন ভাবার ভান করল। পরোক্ষনে চট করে বলে ফেলল,
“হুম তাহলে কি ধরব? আমার পছন্দ আপনার পছন্দের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়?”
“আপনি নিজেকে খুব ইম্পরট্যান্ট ভাবেন, তাই না?”
“কেন আমি নই?”
“মোটেও না!”
“তবে আপনার চোখ তো অন্য কথা বলছে মিস ব্লু হাফমুন!”
এপর্যায়ে থতথত খেয়ে উঠল প্রিয়ন্তী। তুড়ন্ত সরিয়ে নিলো চোখ দুটো। এই একটা বাক্যয় এমন কি আছে জানা নেই ওর। তবে লোকটা যখন ও-কে এই নামে সম্বোধন করে তখন মুহূর্তেই একটা ভালো লাগা কাজ করে ভিতরে। অজানা এক অনুভূতির জোয়ার ভাসে হৃদয়ে। যেই অনুভূতির সঙ্গে একটু আধটু পরিচিত ও। পরোক্ষনে নিজেকে সামলে নিতে সেখান থেকে বড় বড় কদমে এগিয়ে যায় সামনে। এই লোকটার পাশাপাশি,কাছাকাছি থাকা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা!
প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে ওরা গিয়ে জাফলংয়ে পৌঁছালো। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা রোদ তখন ঠিক মাথার উপর হেলে পড়েছে। তাজধীর গাড়িটা পার্কিংয়ে রেখে দরজা লক করল। চারপাশে ব্যাপক পর্যটকের ভিড়, কোলাহল মিলিয়ে হাঁটা ধরলো সামনে। এখান থেকে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘালয়ে অবস্থিত ইন্ডিয়ার ডাউকি গ্রামটা স্পষ্টতই দেখা যায়।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই মিতালীর চোখ গিয়ে আটকালো এক কোণে দাঁড়ানো একটি পাঞ্চিং মেশিনে।লাল-কালো রঙের বক্সটা ঝুলছে পাশে বড় বড় করে লেখা,
“Hit 999 & Win a Free Speed!”
মিতালী এক লাফে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“পাভেল! পাভেল! ওইখানে মারো না একবার প্লিজ!”
হাটতেই হাটতেই থমকাল পাভেল। আশ্চর্য চোখে চাইলো মিতালীর দিকে। যে ছেলে জীবনও একটা ডাম্বেল উঠিয়ে দেখেনি তাকে তার বউ বলছে পাঞ্চিং মেশিনে মারতে? পাভেল ঢুক গিলল। নাকোজ করে জানাল সাফ সাফ,
“তুমি কি বাচ্চা মিতু? কিসব বাচ্চামো করছো? এইসব আমাকে দিয়ে হবে না।”
“আমার ওই স্পিডটা চাই, বুঝছো? প্লিজ জান না করোনা।”
পাভেল বিরক্ত মুখে তাকাল চারপাশে। সবাই ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। শেষমেশ মিতালীর জোড়াজুড়িতে শার্টের হাতা গুটিয়ে বলল,
“এই মেয়েটা আমাকে একদিন নিঃস করেই ছাড়বে!”
বিড়বিড় করে এক দম নিয়ে ঘুষি মারল পাভেল।
ডিজিটাল স্কোর দেখাল সময় নিয়ে, ৬৪৩। মিতালীর মুখ ঝুলে গেল। অসন্তুষ্ট হয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো পাভেলের দিকে। ক্ষুদ্দ হয়ে চেঁচাল,
“এইটুকু?”
কটমট করে তাকালো পাভেল।
“এইটুকু মানে? তুই পারলে মার তো দেখি!”
হাপাতে হাপাতে বলল ছেলেটা । শেষের কথাটা খুব আস্তেই বলল। তখনই সেদিকে এগিয়ে এলো হাসিব। হাসিব আর তাজধীর কোথাও একটা গিয়েছিলো তখন। মিতালী হতাশ মুখে চারপাশে তাকাল। তারপর চোখ পড়ল হাসিবের দিকে। উৎসুক হয়ে বলল,
“হাসিব ভাই, আপনি একবার ট্রাই করেন না?”
হাসিব ভুরু তুলে পাভেলের দিকে তাকাল। নিজেকে জেন্টেলম্যান প্রমান করার এই মুখ্যম সুযোগ।নাহলে তখন জোঁকের ভয়ে যেভাবে নিচে দৌড়ে এসেছিলো দেখা যাবে এটা না পারলে ওর ম্যান সম্মান সব যাবে। হাসিব হাত মুঠো করতে করতে তাকাল একবার প্রিয়ন্তীর দিকে। মেয়েটাও কেমন কৌতূহলি হয়ে তাকিয়ে আছে। হাসিব এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“কি খাও মিয়া? এর থেকে বেশি তো মেয়েরাও উঠাতে পারে।”
বলতে বলতে গ্লাভসটা হাতে পড়ল ও। কাঁধ ঘুরিয়ে, মুঠো শক্ত করে একদম জোরে আঘাত করল মেশিনটায়। সময় নিয়ে থেমে থেমে স্কর দেখাল ৮২১।
চারপাশে হালকা “ওওও” শব্দ উঠল। ইতিমধ্যে ছোট, বড় ছেলেরাও উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে এদিকে।
হাসিব স্কোরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকাল।বলল,
“ধুর! আরেকটু হলেই হয়ে যেত।”
বলেই দ্বিতীয়বার মারল। এইবার টেনে টুনে উঠল সেখানে ৮৫৭। মেশিনের পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,
“ভাই, ৯৯৯ কেউ তুলতে পারে না প্রায়।”
এইবার হাসিব চোখ ঘুরিয়ে তাকাল তাজধীরের দিকে। ছেলেটা কোক এর বোতলে থাকা অবশিষ্ট কোক টুকু খেয়ে বোতল টা ছুড়ে ফেললো অদূরে। ডাকল হাসিব,
” কমান্ডার সাহেব, দিনরাত পরিশ্রম করে যেই বডি বানাইছেন, এখন সেটাকে একটু কাজে লাগান। আসেন দেখি আপনার দৌড় কতটুকু!”
“এইসব বাচ্চাদের খেলা আমি খেলি না।
মিতালী সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“ভাইয়া প্লিজ! একবার মারো না!”
হাসিব কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আজকের জন্য আমাদের কাছে বাচ্চা হয়ে যা না ভাই!”
তাজধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজি হলো। হাতের হাতা দুটো কনুই অব্দি গুটিয়ে নিলো। গ্লাভস পড়ল হাতে।প্রিয়ন্তী এইবার বেশ উৎসুক হয়ে রইল। লোকটার হাতের হাতা দুটো গুটাতেই উন্মুক্ত হলো উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের পুরুষালি ত্বক। লোকটার হাতে সবসময় ঘড়ি দেখলে অন্যহাতে থাকা সিলভার রঙা ব্রেসলেট টা নজর কারল এই প্রথম। প্রিয়ন্তীর খুব লোভ হলো। একবার ওই ব্রেসলেট টা ছুঁয়ে দেখার লোভ। ওর এসব ভাবনার মাঝেই পাঞ্চ করল তাজধীর। সেই শব্দে ধ্যান ভাঙলো প্রিয়ন্তীর। ঘুষির শব্দটা যেন একটু বেশি জোরেই প্রতিধ্বনিত হল এবার। সবাই বেশ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। ডিজিটাল স্কোর দৌড়াতে লাগল ঘোড়ার মত। এক ঝটকায় পুরো ৯৯৯ পার হলো এবার। মেশিনের ছেলেটা মুখ ফ্যাকাশে করে চেয়ে আছে। বিস্মিত হয়ে তাজধীরের দিকে তাকিয়ে আপনা আপনি বলে উঠল,
“ভাই এক ঘুষিতেই ?”
আশেপাশের ছেলেরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তখনো। মুহূর্তেই চারোপাশে গুঞ্জন শুরু হলো।
মিতালী চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল আনন্দে। ও জানতো ওর ভাই পারবে। পাভেল কেন দেখিয়ে দেখিয়ে বলল,
“দেখো দেখো। কিছু শিখো আমার ভাই থেকে!”
পাভেল পারছেনা মিতালী কে চোখ দিয়ে গিলে খেতে। সবার সামনে মেয়েটা ওর ম্যান সম্মান নিয়ে টানাটানি করে। হাসিব ও বেশ অবাক হলো। জড়তা কাটিয়ে এসে দাঁড়ালো বন্ধুর পাশে। বলল,
“এই না হলে আমাদের কমান্ডার! তা ভাই গুষিটা কাকে মিন করে দিয়েছিস? নিশ্চই তোর এক্স টেক্স হবে?”
“উহুম! রং! এক্সের জায়গায় তোর চেহারা ভেবে হিট করেছি ইডিয়ট!”
“যা দুষ্ট! আমি কেন তোর এক্স হতে যাবো!”
ওই সময় ছেলেটা হাতে একটা স্পিডের বোতল এগিয়ে এনে তাজধীরের দিকে বাড়াতেই তাজধীর বলল,
“এইটা ওই যে পেছনের বাচ্চা ম্যামকে দাও। যেভাবে মুখ হাঁ করে আছে মুখে জাফলং এর পানি সব ঢুকে যাবে!”
ছেলেটা বোতলটা নিয়ে প্রিয়ন্তীর সামনে এসে দাঁড়াল। প্রিয়ন্তী লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল দ্রুত। লোকটা তো ওর দিকে তাকায়নি বুঝল কিভাবে? ছেলেটা এসে বলল,
“ভাবি, নেন। ভাইকে কি খাওয়ান ভাবি? মাশাল্লাহ! ভাইয়ের বডি তো একদম নায়কদের মত!”
ভাবি! আরেকবার এই ভাবি সম্মোধনে কাচু মাচু করে উঠল প্রিয়ন্তী। লজ্জায় হাঁসফাঁস করল প্রচন্ড। ছেলেটার এগিয়ে দেয়া স্পিডটা হাতে নিয়ে দুই ঢুক খেলো। সত্যিই ওর পানির পিপাসাও পেয়েছিলো ভীষণ।
প্রায় দশ মিনিট যাবৎ একাধারে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে ক্লান্ত প্রিয়ন্তী। উপরের কোলাহল পেছনে ফেলে নিচের দিকে নামার সাথে সাথে বাতাসে ঠান্ডা আর্দ্রতা বাড়ছিল ঠিকই, কিন্তু রোদের তেজ তখনও কমেনি। মিতালী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আর কতদূর রে!”
হাসিব হেসে উঠল পিছন থেকে। মজা করে বলল,
“আরও দুয়েক ঘন্টা তো লাগবেই কমসে কম!”
বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে চাইলো মিতালী। চিৎকার করে উঠল একপ্রকার,
“অসম্ভব! তাহলে আমি নামবোই না ভাই। সোজা গাড়িতে যাবো!”
“আরেহ মজা করে বলেছি। এইতো আরেকটু!”
মাঝে মাঝে থেমে থেমে সবাই ঠান্ডা পানি খেল। অবশেষে সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করে নিচে নামতেই দুই পাশে সারি বেঁধে থাকা দোকান গুলোতে চোখ পড়ল ওদের। বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী আছে সেখানে। বেশিরভাগী ইন্ডিয়ান প্রোডাক্ট। ছোট ছোট পাথরের পথ অতিক্রম করতে বারোটা বেজে গেলো মেয়েদের।
অবশেষে অনেকটা হাঁটার পর ওরা পৌঁছাল সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায়। সামনে স্বচ্ছ তকতকে পানি। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে স্রোত বইছে। সূর্যের আলো পড়ে পানির উপর চিকচিক করছে।
হাসিব এগিয়ে গিয়ে দুই-তিনটা সিট বুক করল। ছাতার নিচে ব্যাগ রাখলো সকলে। একপ্রকার দৌড়িয়ে সবার আগে ছুটে গেল পাভেল। সরাসরি পা ডুবিয়েই চেঁচিয়ে উঠল পায়,
“উফফ! বরফ!কিজে আরাম লাগছে এখন!”
তারপর নামল হাসিব। মিতালী দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“এই! আমাকে না নামিয়ে একাই চলে যাচ্ছ?”
পাভেল আবার ফিরে এসে হাত বাড়াল। বাড়ন্ত হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল মিতালী। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে মনে মনে স্বস্তির শ্বাস ফেললো তাজধীর। বোনটা তার জন্য সঠিক ব্যক্তিই নির্বাচন করেছে ভেবে সন্তুষ্টও হলো।
ওদিকে ছাতার নিচে বসে আছে প্রিয়ন্তী। ব্যাগ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে কয়েক ঢোক খেল আবার। শরীরটা একটু জুড়িয়ে এলো তাতে। ঠিক তখনই চোখ গেল তাজধীরের দিকে। হাসিব পানির ভিতর থেকেই ডাকছে ইশারায় বন্ধুকে। প্যান্টের নিচটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে শার্টের হাতাও কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করল তাজধীর। স্কাই কালারের শার্টটা রোদের আলোয় আলাদা করে ফুটে উঠছে যেন। এরপর আস্তে ধীরে নামল পানিতে। এতক্ষনে প্রিয়ন্তী খেয়াল করল লোকটা সানগ্লাস পড়েছে। প্রথমে গোড়ালি, তারপর হাঁটু তারপর একটু সামনে গিয়ে সোজা স্রোতের মাঝামাঝি দাঁড়াল হাসিবের পাশে। হাসিব কিছু বলতেই তাজধীর ঝুঁকে ডুব দিল পানিতে।এরপর পানির ভেতর থেকে উঠে মাথা ঝাকাল চুল থেকে পানি ফেলতে। ভেজা চুলগুলো দু হাতে ঠেলে পিছনে সরালো। পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গলার পাশে। ভেজা শার্ট শরীরের সঙ্গে লেগে আছে আষ্টে পিষ্ঠে। হালকা রঙটা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে পানির স্পর্শে। পাতলা কাপড়ের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শক্ত বাহু, টানটান বুক, পিটানো শরীরটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে ভালোই।
রোদের জন্য চোখে কালো সানগ্লাস পড়েছে। ঝলসে ওঠা রোদের তোপে পানিতে দাঁড়িয়ে সেই সুদর্শন মানবকে দেখেই গলা শুকিয়ে গেল বসে থাকা প্রিয়ন্তীর । অকারণে দু’বার ঢোক গিলল মেয়েটা। হৃদপিন্ড টা ঘোড়ার মত ছুটল। ইচ্ছে হচ্ছে এই মুহূর্ত টুকু বারবার ফোনে থাকা ভিডিওর মত পসড করতে।
লোভ সামলাতে না পেরে ব্যাগে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নিলো ও। সরাসরি লক খুলে ঢুকল ক্যামেরার অপশনে। নিজের সেলফি তোলার ভান ধরে যেইনা লোকটার একটা ছবি তে ক্লিক করবে অমনি ফোনের
ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। দিনের বেলায় হওয়ায় প্রিয়ন্তী খেয়াল না করলেও দূরে থাকা তাজধীর ঠিকই বুঝতে পারল। ভ্রু কুঁচকে সরাসরি তাকাল ওর দিকে।
প্রিয়ন্তীর হাত কেঁপে উঠল তৎক্ষণাৎ। লোকটা ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? তাহলে কি বুঝতে পারছে ওজে এতক্ষন ওনার ছবিই তুলছিলো? পরোক্ষনে ফ্ল্যাশ অন করা খেয়াল করতেই সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা নিচে নামিয়ে ফেলল।
ইশ! লজ্জায় রীতিমতো মরে যেতে ইচ্ছে হলো ওর। এখন কি ভাববে লোকটা ওকে? ছেসরা তো ভাববেই। কাজই করেছে এমন। তাজধীর কিছু বলল না। শুধু একপাশে ঠোঁট টেনে সামান্য হাসল। হাসিব দূর থেকে চেঁচাল,
“কী হলো? কে ছবি তুলছে?”
তাজধীর উত্তর না দিয়ে সরাসরি উঠে এলো সেখান থেকে।ওদিকে প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করে বোতলের ঢাকনা নিয়ে ব্যস্ত হলো। প্রিয়ন্তী তাজধীর কে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখে তাড়াহুড়ায় ফোনটা পুনরায় হাতে নিয়ে সামনে থাকা এপস ওপেন করেই সেখান চোখ দুটো স্থির করে রাখল কিছুক্ষন। এমন ভাব যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। বুক ধুকপুক করছে সমানে। স্ক্রিনে কি দেখছে না দেখছে সেদিকে খেয়াল নেই। ভেজা চুল হাত দিয়ে পেছনে ঠেলতে ঠেলতে পানি থেকে উপরে উঠে এলো তাজধীর।
তাজধীর উঠে এসে দাঁড়াল একদম ওর পাশে। চুলে হাত চালাতে চালাতেই বলল,
“মিস ব্লু হাফমুন,এইভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে ছবি তোলার কী দরকার ছিল বলুন তো? আমি তো আপনার সামনেই ছিলাম। বলতেই পারতেন আমাকে। এইযে আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। নিন এইবার যত ইচ্ছে ছবি তুলুন । আই ডোন্ট মাইন্ড।”
প্রিয়ন্তী ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও না শোনার ভান ধরে রইল। স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে অযথা।লোকটা যে এই সুযোগ হাতছাড়া করবে না ওকে কথা শুনাতে ঢের বুঝতে পারল তা। এই মানুষটার সামনে দুর্বলতা দেখানো মানেই শেষ। তাজধীর থামল না। কাক্ষিত জবাব না পেয়ে ভ্রু গুটিয়ে ঝুকে এসে বলল,
“এই যে! সমস্ত ধ্যানঘ্যান ডুবিয়ে কী এমন পড়ছেন মিস?নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। দেখি আমিও দেখি।”
বলেই ছো মেরে ফোনটা ওর হাত থেকে কেড়ে নিল সে। প্রিয়ন্তী ভড়কে গিয়ে কি রিয়েক্ট করবে বুঝে উঠার আগেই ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে কপাল কুঁচকে এলো তাজধীরের। কয়েকটা ইংরেজি লাইন ভেসে আছে সেখানে। ডার্ক রোমান্টিক কোনো নোবেল এর অংশ। মুখ বিকৃত করে বিড়বিড় করে পড়ল দুই লাইন। তারপর আচমকা ফোনটা প্রিয়ন্তীর কোলে ছুড়ে দিয়ে বলল,
“আস্তাগফিরুল্লাহ,দিন দুপুরে এসব কি পড়ছেন মিস প্রিয়ন্তী? এইসব পরেই বুঝি নষ্ট হয়েছেন? বিয়ের আগেই বাচ্চার মা হওয়ার ইচ্ছায় ফেন্টাসিতে ভুগেন?আর আমার মত এই অসহায় ব্যক্তিকে সেই ফেন্টাসিতে সামিল করে সরাসরি বাচ্চার বাবাও বানিয়ে দিয়েছেন?
একটানা কথাগুলো বলে থামল তাজধীর। প্রিয়ন্তীর মাথায় যেন বাজ পড়ল। ফোনটা কোলের উপর থেকে নিয়ে ভালো করে অবলোকন করতেই লাইনগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। অমনি লজ্জায় মূর্ছা যেতে লাগল ও। বারবার! বারবার ওর সঙ্গেই কেন এমনটা হতে হবে? কেন? কেন? কেন ? ওতো তাড়াহুড়ো খেয়াল ও করেনি কোথায় ঢুকে কি পড়ছিলো! ভুলবশত হোয়াটপেডে ঢুকে সামনে থাকা একটা নোবেলে তাকিয়ে ছিল ও। তবে শেষমেশ যে এই জায়গায় এসেই আটকাতে হবে কেন জানে! মনে হচ্ছে মাটিটা ফাঁক হোক আর ও সেখানে ঢুকে পড়ুক। কিভাবে মুখ দেখাবে ও।
“আপনার ভাই-ভাবি কি জানে তাদের আদরের ছোট বোন এখন যে আর ছোট নেই? দিন দুপুরে এসব পড়ে বেড়ায়?”
“কি হয়েছে ভাইয়া?”
মিতালীর ডাকে চোখ তুলে তাকালো তাজধীর।
নির্বিকার স্বরে বোনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খবর রাখিসনা নিজের ননদ কী করে না করে বেড়ায় ?”
মিতালী ভুরু কুঁচকাল।প্রশ্নণাত্মক চোখে চেয়ে বলল,
“খবর রাখব মানে?”
প্রিয়ন্তীর মাথা ঝিমঝিম করছে এইবার। এই লোক সব বলে দিতে পারে। এর বিশ্বাস নেই। এর দ্বারা কোনো কিছুই অসম্ভব না। দ্রুত উঠে মিতালীর হাত চেপে ধরল প্রিয়ন্তী। অন্যদিকে ইশারায় দেখিয়ে বলল,
“কিছু না ভাবি। ওইদিকে আসো তো। মুড়ি খাব।”
মিতালী অবাক হলেও চলে গেল ননদের সঙ্গে। প্রিয়ন্তী হাফ ছাড়ল এবার। একবার ঘুরে তাকালো পিছনে। লোকটা ওদের দিকে তাকিয়ে ভেজা চুলে হাত চালিয়ে চালিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল আকস্মিক।
চলবে…..
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনী মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি পর্ব ৩
-
ডেসটেনি পর্ব ৯
-
ডেসটেনি পর্ব ৬
-
ডেসটেনি পর্ব ৮
-
ডেসটিনি পর্ব ৫
-
ডেসটেনি পর্ব ২
-
ডেসটেনি গল্পের লিংক
-
ডেসটেনি পর্ব ১
-
ডেস্টিনি পর্ব ৪
-
ডেসটেনি পর্ব ৭