কিছুদিন আগে বান্ধবীদের সঙ্গে বাজি ধরে যে লোকটাকে বউ সেজে মেসেজ করেছিলাম, সেই লোকটাই কিনা বাস্তবে আমার ভাইয়ের একমাত্র সম্মন্ধি বের হলো? তাও আবার যেই সেই মানুষ না… সোজা নেভির লেফটেন্যান্ট কমান্ডার, তাজধীর শেখ আজান! ভাবতে পারছিস? এখন আমার কী হবে?
ভাইয়ের গায়ে হলুদের দিন বান্ধবীরা ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার খেলতে খেলতেই ওদের কথায় পড়ে আমি লোকটার কাছে মজা করে একের পর এক মেসেজ পাঠিয়েছি। ইশ! কি কি মেসেজই না করেছি তখন, ভাবতেই তো লজ্জায় মাথা কাঁটা যাচ্ছে আমার।
এখন যদি সে লোকটা গিয়ে ওর বোনকে, কিংবা আমার ভাইকে সব বলে দেয়,আমি কী কী মেসেজ করেছিলাম তখন আমার অবস্থা কী হবে, বুঝতে পারছিস?
প্রিয়ন্তীর কথায় ফোনের ওপাশ থেকে কিছুক্ষণের নীরবতা ভেসে এল। অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি কী বলবে ঠিক ভেবে পাচ্ছিল না যে। শেষে কোনোরকমে ওকে শান্তনা দিয়ে বলল,
“তুই কি শিওর, উনিই সেই লোক?”
মেয়েটা হতাশ প্রত্তুত্তর করল,
“শিওর না হয়ে বলছি? ভাবীদের বাড়িতে ঢুকতেই তো দেয়ালে ওনার একটা বড় ছবি দেখলাম। যেই ছবিটা সেদিন ফেসবুকে প্রোফাইলে ছিল ঠিক সেটাই।”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো দ্রুত,
“কেন, তুই আগে জানতিস না যে তোর ভাবীর বড় ভাই হন সে?”
“জানলে কি আর এমন ভুল করার মত মহা ভুল করতাম রে? শুনেছি লোকটা নাকি এবার ছুটিতে বাড়িতেও এসেছে। যদি আমাকে দেখে চিনে ফেলে… আর ভাইয়াকে গিয়ে সব বলে দেয়,তখন আমার কী হবে জানিস? ভাইয়া সবার সামনে আমাকে ধরে ইচ্ছেমতো ঠ্যাঙাবে! আত্মীয় তাত্ত্বিয় মানবেনা একচুলও!”
“আচ্ছা, সে তোকে চিনবে কীভাবে? তোকে তো দেখেনি। তুই তো ফেক আইডি দিয়ে মেসেজ করেছিলি, তাই না? এখন এটা বলিস না যে অরিজিনাল আইডি দিয়েই করেছিলি!”
প্রিয়ন্তী ক্ষীণ গলায় বলল,
“অরিজিনালই ছিল…”
ওপাশ থেকে একরাশ হতাশা ঝরে পড়ল সঙ্গে সঙ্গেই। বলল হাপুত্তাস করে,
“এইবার আর তোকে কে বাঁচাবে, চান্দু! শুনেছি এই অফিসাররা খুব এংরি মাইন্ডের হয়। ইগোও নাকি আকাশচুম্বী। ওনার ইগোতে যদি লেগে যায়—তাহলে আজ তোর আর রক্ষে নেই ধরে রাখ। তবে একটা কাজ করতে পারিস। লোকটা তো তোকে দেখেনি এখনো। তার আগেই না হয় তুই এই বাড়ি থেকে কে টে পড়।”
প্রিয়ন্তী ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাল। রাত একটা পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এই সময়ে বাড়ি ফেরা অসম্ভবই পায়। ওদের বাসা যেতেই যো লাগবে দুই–তিন ঘণ্টা। তারউপর মধ্যরাত!
“এত রাতে তো যেতেও পারবো না রে…”
“তাহলে আজকে কোনোরকম গা ঢাকা দিয়ে থাক। কাল সকালে লোকটা দেখার আগেই কেটে পড়িস। এছাড়াতো আর কোনো উপায় দেখছি না।”
বান্ধবীর শেষ কথাটা প্রিয়ন্তীর মনে গাঁথলো। সায় মিলিয়ে জানাল তাতে,
“হ্যাঁ, সেটাই ভালো। আজ না হয় কোনোরকম লুকিয়ে থাকি রুমে। সকাল হলেই এই বাড়ি থেকে আমাকে আর পায় কে!”
“কেন, আমাকে ডাক্তার দেখাবেন না,মিস প্রিয়ন্তী?”
অমনি পেছন থেকে ভারী পুরুষালি গমগমে সুরে অন্তরাত্মারা কেঁপে উঠল প্রিয়ন্তীর। ফ্যাকাশে মুখখানা চুপসে গেল পুরোদমে। গলা শুকিয়ে কাঠ হলো। ফোনটা কানে চেপে ধরে থাকল ওভাবেই। ওপাশ থেকে মনে হলো ওর বান্ধবীও কণ্ঠস্বরটা শুনেছে। তাইতো সঙ্গে সঙ্গেই টুট টুট শব্দে কেটে গেল লাইনটা। তবুও ঘাড় ঘোরানোর সাহস হলো না প্রিয়ন্তীর।
“আমি তো এবার বেশ লম্বা ছুটিতে এসেছি।ভেবেছিলাম আপনি আমাকে আমার গোপন রোগের জন্য ডাক্তার দেখাবেন। তাই ভাবলাম ডাক্তারটা নাহয় দেখিয়েই যাই। তা… আপনার বাচ্চাকাচ্চাদের তো দেখতে পাচ্ছি না। ওরা কোথায়? রাত তো অনেক হয়েছে। নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে , তাই না? ডাকুন ওদের। বাবাকে দেখবে না? আমিতো আমার বাচ্চা কাচ্চাদের না দেখে এখান থেকে এক পাও নড়ছি না।”
প্রিয়ন্তীর বুক দরফর করছে সমান বেগে। কোনোরকমে ভয় সামলে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরাল সে। চোখ তুলে তাকাতেই সুম্মুখীন হলো লোকটার।ধূসর রঙা টি শার্ট আর কালো টাউজারে দৈত্তর মত লম্বা শরীরের এই কমান্ডারকে দেখতেই হৃদপিন্ড ঘোড়ার মত দ্রুত ছুটল ওর। ধারালো চোয়াল, ছোট ছোট করে কাটা চুলগুলো কপালের ওপর থেকে পেছনে আঁচড়ানো। লোকটার দু ভ্রূর কিঞ্চিৎ নিচে ছোট্ট একটা কাঁটা দাগ। উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণের এই পুরুষটিকে দেখেই বুঝা যায় কোনো সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত সে। ওর এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার মাঝেই লোকটা স্ট্রাইড করে এগিয়ে এসে ট্রাউজারের দুই পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে দাঁড়াল ওর সামনে।
“একবার বলেন, আমি নাকি বাচ্চাদের খোঁজ খবর তো দূর ফর্মুলার টাকাটাও পর্যন্ত পাঠাই না। আবার বলেন, আমার নাকি শারীরিক দুর্বলতা আছে। যদি সত্যিই আমার দুর্বলতা থাকতো, তাহলে এক রাতেই আপনার পেটে বাচ্চা এলো কীভাবে, মিস প্রিয়ন্তী?”
প্রিয়ন্তীর মাথাটা সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে গেল। কপাল ঘেমে টেমে একাকার। লোকটা সবকিছু খুব সূক্ষ্ম চোখে লক্ষ্য করল। তারপর ধীর গলায় বলল,
“সে যাই হোক, আপাতত আপনার শেষ কথাটা রাখতে এসেছি আমি। আপনি বলেছিলেন, এবার এলে আপনি নাকি আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। আমার ‘গোপন সমস্যার’ চিকিৎসা করাতে।”
এক পা এগিয়ে এসে নিচু গলায় যোগ করল,
“তা আমাকে ডাক্তার না দেখিয়ে উল্টো আপনি তো দেখছি বাড়ি থেকে পালাতে চাইছেন। দিস ইজ নট ফেয়ার, মিস প্রিয়ন্তী।”
প্রিয়ন্তীর শরীর কাঁপছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। হাতে থাকা ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে চোখ মুখ খিচে কোনোরকম বলল শুধু,
“প্লিজ… আমাকে ক্ষমা করে দিন।ভাইয়ার হলুদে বান্ধবীদের সঙ্গে ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলতে গিয়ে ভুল করে আপনাকে মেসেজ করে ফেলেছিলাম। আপনার আইডি আমি নিজে সিলেক্ট করিনি বিশ্বাস করুন। ওরাই আমাকে বলেছিল আপনাকে মেসেজ করতে। আমি সত্যিই খুব লজ্জিত!”
প্রিয়ন্তীর কথায় লোকটা এক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। চোখ দুটো সরু করে ভালো করে দেখল ওকে। ঠোঁটের কোণে সূক্ষ হাসি টেনেই বলল,
“মানে আপনি বলতে চাইছেন, দোষটা আপনার না, আপনার বান্ধবীদের?”
প্রিয়ন্তী ভয়ে মাথা নুইয়ে বলল,
“জি,। আমি সত্যিই খুব লজ্জিত।”
লোকটা হালকা হেসে এক ধাপ এগোলো কাছে। খুব কাছে। প্রিয়ন্তীর নিশ্বাস আটকে যাওয়ার মত কাছে।
“লজ্জিত হলে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হয়, মিস। এভাবে মাথা নামিয়ে রাখলে তো মনে হয় আপনি আবার অন্য কিছু প্ল্যান করছেন।”
প্রিয়ন্তী তড়িঘড়ি করে মাথা তুলল। চোখে চোখ পড়তেই আবার নামিয়ে ফেলল দ্রুত। নত মস্তকেই উত্তর করল,
“না না কিছু প্ল্যান করছিনা আমি।”
লোকটা ভ্রু তুলল সামান্য। বলল,
“তাহলে ভয় পাচ্ছেন নাকি আমাকে?”
“জিহ!”
“আমাকে দেখে? কেন?”
প্রিয়ন্তী কাঁপা গলায় বলল,
“জি, মানে আমি আপনার সঙ্গে… ওইসব…”
লোকটা হেসে ফেলল। শব্দ করেই হাসলো। এরপর বলল,
“ওইসব মানে, এক রাতে বাচ্চা, দুধের টাকা, গোপন রোগ সেইসব?”
প্রিয়ন্তীর মুখ লাল হলো লজ্জায়। মিউয়ে গেল মেয়েটা এবার। নিচু সরে বলল,
“প্লিজ এসব বলবেন না…”
লোকটা ইচ্ছে করেই আরও একটু টিজিং টোনে বলল,
“কেন? তখন তো খুব সাহসী ছিলেন। তাহলে এখন এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন?”
প্রিয়ন্তী খুব করে চাইল এখান থেকে এক দৌড়ে পালাতে। একবারে লোকটার চক্ষু সীমার বাইরে পালাতে। তবে পা দুটো ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। কথা শুনল না ওর। জমে রইল জায়গাতেই। বেঈমান পা।
“একজন নেভি কমান্ডারের সঙ্গে এরকম ফান করার জন্য আপনার কি শাস্তি হওয়া চাই, বলুন তো?”
অমনি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকাল প্রিয়ন্তী। চোখে পানি টলমল করছে ওর। লোকটা যদি সত্যিই ওর ভাইকে বলে দেয় তখন কি হবে ভাবতেই ওর বুকটা দুমড়ে মুচড়ে আসে ভয়ে। জড়তামিশ্রিত গলায় টেনেটুনে দু খানা বাক্য বের করে আনে কোনোরকম,
“দয়া করে ভাইয়া বা ভাবীকে কিছু জানাবেন না প্লিজ। ওনারা জানলে লজ্জায় আমার মাথাকাটা যাবে। সবাই হাসবে আমাকে নিয়ে। ভাইয়াও খুব রেগে যাবেন!”
” তো আমি কেন আপনার অনুরোধ শুনবো? আমাকে সেসব কথা বলার সময় লজ্জা লজ্জা ফিল হয়নি আপনার? আরো অনেক কিছুইতো বললেন সেদিন,আমার নাকি বেড পারফরম্যানস একদমই যাচ্ছে তাই। ভয়েই নাকি আপনার কাছ থেকে পালিয়েছি আমি। ওহ না, গা ঢাকা দিয়েছি। তো এখন তো এসেছি। এইযে দেখুন আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি দিব্যি।মেসেজগুলো কিন্ত এখনো আছে। আপনি চাইলে আমি আবার আপনাকে পরে শুনাতে পারি, শুনাবো?”
লজ্জায় দু কান দিয়ে রীতিমতো ধোয়া বের হচ্ছে প্রিয়ন্তীর। মনে মনে শপথ করল এযাত্রায় এ বাড়ির চৌকাঠ পেরোতে পারলে ইজীবনেও আর এ বাড়ির অন্তরমুখী হবেনা ও। ভুলেও না। তাই টলমল চোখে দু হাত জোড় করে মিনতি করল,
“আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে ছোট বোন মনে করে মাফ করে দিননা প্লিজ। এইযে দিব্যি কেটে বলছি,আমি আর কখনো কোনোদিন কারো সঙ্গেই এমন ইয়ার্কি করবো না। ইভেন আর কোনোদিন ট্রুথ এন্ড ডেয়ার গেইমসই খেলবোনা। প্রমিস!”
“উহু! তাতোনা হবেনা। যেখানে আপনি আমার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়েছেন, আমাকে কটাক্ষ করেছেন বিনিময়ে তার পানিশমেন্ট পাবেন না? একজন লেফটনেন্ট নেভি কমান্ডারের পুরুষত্ব নিয়ে মজা করার সুবাধে তার শাস্তিস্বরূপ আপনাকে এই আমার সঙ্গে, আপনার ভাষায় এই নিরামিষ পুরুষটার সঙ্গেই সারাজীবন কাটাতে হবে। মিস থেকে,মিসেস আযান সিদ্দিক হতে হবে। আমার নামের ট্যাগ লাগিয়ে পুরো একটা জীবন পার করতে হবে আপনার।
ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়েই সামান্য ঝুঁকলো তাজধীর। কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে একবাক্যয় বলল,
” বউ হবেন আমার?এই নিরামিষ পুরুষের, আমিষ বউ? “
চলবে….
ডেসটেনি
সুহাসিনি_মিমি
জীবনের প্রথম কোনো অনুগল্প লিখলাম। জানিনা কেমন হয়েছে। ভালো লাগলে, আর আপনারা চাইলে মাঝে মাঝে আপলোড দিবো আরো কয়েকটা পর্ব। নাহলে এখানেই বাদ 🫶🫶
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনী মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE