Golpo romantic golpo ডেনিম জ্যাকেট

ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৮


ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৪৮

অবন্তিকা_তৃপ্তি

অথচ. . একজোড়া শালিকের সম্পর্কের এই দ্বিধা-দন্ধ. .এ সবটাই দূর থেকে শকুনি নজরে দেখে যায় সিয়াম। ও এতক্ষণ সবটা দেখে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসে সে কল করল কাউকে। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই, সিয়াম আশপাশ ভালো করে দেখতে দেখতে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল———‘ও প্রেগন্যান্ট। সম্পর্কটা ভীষণ নড়বড়ে এখনো, তাসের ঘরের মতো। ভাঙা যাবে সহজেই।’

পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে কুহু-শার্লিন! আজ সারাদিনের ধকলে কুহু ক্লান্তিতে হেলে পড়তে চায় শার্লিনের ঘাড়ের উপরে।
শার্লিনও সাথেসাথে ভীষণ যত্নে আলতো হাতে কুহুকে আগল ধরল। নরম কণ্ঠে জানতে চাইল———‘ঠিক আছিস? কষ্ট হচ্ছে?’

কুহু ক্লান্ত স্বরে জবাব দিল——-‘হু; ব. .বাসায় যাব।’

শার্লিন শোনে ওকে ধরে ধরে উঠানোর চেষ্টা করে বলল———‘তাহলে চল, আমাকে ধরে ওঠার চেষ্টা কর তো।’

কুহু কোনোরকমে শার্লিনের সাহায্যে উঠে দাঁড়ালো। হাটতে হাটতে শার্লিন একটু আগে কিনে আনা হাতের ডালিমের জুসটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল———‘এটা খেতে খেতে হাঁট। ডক্টর কী বললো, শুনিসনি? হিমোগ্লোবিন অনেক কম তোর।’

কুহু মাথা নড়ালো, বাচ্চার জন্যে হলেও ওকে এখন সবটা, চারপাশ সামলাতে হবে। কুহু ছিপি খুলে ডালিমের জুসে চুমুক দিল। শার্লিন ওদিকে কুহুর রিপোর্ট কাগজপত্রের একটা ছবি তুলে রাখল, কেন যেন শার্লিনের শঙ্কা কাটেনি। যদি এই বাচ্চাকে কিছু করে ফেলে কুহু। কাব্য ভাইকে জানানো উচিত। জানিয়ে রাখলে অন্তত উনি সামনে নিতে পারবেন সবটা।

কুহুর হাভভাব দেখে মনে হিচ্ছে— ও এখন বলবে না কিছুই কাব্য ভাইকে। পরে নিজের প্রতি অবহেলায় কিছু হলে; কাব্য ভাই শার্লিনকে আস্ত খেয়ে ফেলবেন নির্ঘাত!

ছবি তোলা শেষ করে সবগুলো কাগজপত্র আবার আগের মতো করে ফাইলে ঢুকিয়ে নিজের এক হাতে কুহুকে ধরে রেখে এগুলো।

হসপিটাল থেকে বেরোতেই হঠাৎ আচমকা ভূতের মতো ওদের পথ আটকে ফেললো সিয়াম। কুহু সাথেসাথেই থেমে, চমকে তাকাল ওর মুখের দিকে। শার্লিনও অবাক হলো সম্ভবত। সিয়ামের ঠোঁটে মৃদু হাসি, ও ওভাবেই রসিক কণ্ঠে ডাকে————————‘হ্যালো কুহু! চিনতে পেরেছো আমাকে? তোমার এক্স?’

কুহু সিয়ামের এ ধরনের বিশ্রী হাসিতে বিতৃষ্ণা দেখিয়ে বললো———‘চিনেছি। হঠাৎ কোথা থেকে এলে?’

সিয়াম হেসে জবাব দিল ওভাবেই——-‘এতদিন আমি কোথায় ছিলাম, সেটা তোমার হাজবেন্ডকে জিজ্ঞেস করলে ভালো উত্তর পাবে। তা হসপিটালে কেন?’

কুহু জবাবে রুক্ষ স্বরে বলল———‘একটা কাজে এসেছিলাম।’

ওদিকে শার্লিন সিয়ামের ভাবভঙ্গি সুবিধার লাগছে না। মনে হচ্ছে—কোনো বড় কুবুদ্ধি নিয়েই এতটাদিন পর এই ছেলে কুহুর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই কুহুর মাথার ভূত বাচ্চা আসার পর একটু হলেও নেমেছে—এখন এই সিয়াম কুহুকে ভরকে মাথা নষ্ট করে দেওয়ার আগে-আগেই কেটে পড়তে হবে।

যেই ভাবা, সেই কাজ! শার্লিন কুহুকে শক্ত করে টেনে এনে বলল———‘আজেবাজে মানুষের সাথে কথা বলার দরকার নেই কুহু। চল, বাড়ি যাব আমরা। এক্সকিউজ মি, সিয়াম ভাইয়া।’

বলেই শার্লিন কুহুকে টেনে নিয়ে গেল সামনে। কুহুও আর তাকাল না ওদিকে। আগের অতীত ও পেছনে ছেড়ে এসেছে আজকের পর, তাই সিয়ামের এভাবে আসা; ওর সাথে কথা বলা— কোনোটাতেই আগ্রহ দেখাতে ইচ্ছে হলো না কুহুর আজ।

ওদিকে কুহুকে ওভাবে চলে যেতে দেখে পেছন থেকে হঠাৎ সিয়াম চেঁচিয়ে বলে উঠল———‘ঊর্মি প্রেগন্যান্ট কুহু। বাচ্চাটা কাব্যের।’

আচমকা এমন একটা সংবাদে কুহু থমকে গেল হাঁটার পথে। শার্লিন আহাম্মক হয়ে সাথেসাথেই পেছন ফিরে তাকাল। কুহু মূর্তির মতো আস্তে করে পেছনে তাকিয়ে দেখে সিয়ামকে। সিয়াম জিন্সের পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে কুহুর দিকে স্থির চেয়ে থাকে। পরপর এগিয়ে আসে। কুহু তখনও অবাক চোখে ফ্যালফ্যাল করে সিয়ামের দিকে চেয়ে আছে; ওর হাতের ওর প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট চেপে ধরে রাখা ছিলো ঠিক তখনও।

সিয়াম এসে কুহুর হাত থেকে কুহুর রিপোর্টটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে, হেসে বলল———‘ওহ! তুমিও প্রেগন্যান্ট নাকি? দ্যাটস গ্রেট! বাহারওয়ালি ঘরওয়ালি একই সাথে! কাব্যের লাক আছে বলতে হবে।’

বাহারওয়ালি কথাটা শুনে কুহুর কী যেন হলো। ও আচমকা নিজেকে সামলে জেদ দেখিয়ে টান দিয়ে সিয়ামের কাছ থেকে রিপোর্টটা ছিনিয়ে নিয়ে ঘেন্নার দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বলল——-‘আসি।’

বলে শার্লিনের হাতটা ধরে বলল———‘চল এখান থেকে।’

শার্লিন তবুও পেছন ফিরে একবার তাকালো, পরপর চলে আসে কুহুর সাথে। সিয়াম পেছন থেকে বলতে থাকে———‘আমার কাছে প্রুভ আছে কুহু। আমি কিন্তু মোটেও মিথ্যে বলছি না। শোনো তুমি… আমার কথা…!’

সিয়াম বড্ড অনুনয় করেছে, মনে হলো কুহুর কাছে। কুহু এবার পেছন ফিরে তাকাল। সিয়ামের কথা আটকে যায় কুহুর ওই কঠিন চেহারা দেখে। কুহু এগিয়ে এলো দু-কদম,সিয়াম থামে, কথা ভুলে। কুহুর ওর চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত ঘেন্না নিয়ে বলে উঠে—————-—‘আমি কাব্যের স্ত্রী। আমার বাচ্চা বৈধ; আমি বৈধ! বাকি কে কি আমার ভাবার দরকার নেই। আচ্ছা? আপনারা দু’জন বেঁচে আছেনই বা কেন? হু? একসাথে মরে যেতে পারেন না দু’জন? আমার লাইফে ঝামেলা করার থেকে নিজের লাইফ নিয়ে ভাবুন, নেক্সট টাইম আমি কিন্তু মোটেও ছেড়ে কথা বলবো না আপনাদের দুজনকে। আমার বাচ্চার জন্যে আমি সব করতে পারি; এমনকি আপনাদের দুজনকে জাহান্নাম অব্দি দেখিয়েও দিতে পারি। তাই আমাকে চেতাবেন না, সাবধান করে দিলাম।’

বলেই শার্লিনকে হিচড়ে ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল সামনে। সিয়াম রীতিমতো আহাম্মক হয়ে তাকিয়ে আছে কুহুর এই অভাবনীয় রূপের দিকে। কুহুর কাছে এমন একটা রিঅ্যাকশন আশা করেনি সিয়াম। ভেবেছিল—কুহু ওকে বিশ্বাস করবে। কিন্তু কুহু প্রুভ অব্দি চেয়েও দেখেনি। উল্টো ওকে… সিয়ামের মাথা ধরে যাচ্ছে।

ও সাথে সাথেই কল করে ঊর্মিকে। অথচ অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে—ঊর্মির ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে এলো সিয়ামের। ঊর্মির তো এখন ফোনের কাছাকাছি থাকার কথা। গেল কই এই পাগল সাইকোপ্যাথটা ফোন রেখে?

——————————
লন্ডন: যুক্তরাজ্য, দুপুর ২:৩৯!

রাস্তার পাশে একটা পরিতাক্ত দালানের একদম কর্নারের একটা অন্ধকার রুমে বন্দি হয়ে আছে ঊর্মি! চোখ কাপড়ে বাঁধা; বড্ড গালাগালি করে যাচ্ছে এতক্ষণ ধরে——‘কোন শু* বাচ্চারে! চোখ খুল আমার, একবার ছেড়ে দে হাতদুটো; ভেঙে ফেলতেছি তোরে। সামনে আয় মা**!’

মেয়ে মানুষের কণ্ঠে গালা-গালি সহ্য করতে পারেনি সামনের মানুষটা। সাথেসাথেই একটা হকিস্টিকের শক্ত আ ঘাত পড়ল ঊর্মির ঠিক হাঁটুর হাড়ে। ব্যথাতে ঊর্মি রীতিমতো কুঁকিয়ে উঠল। চিৎকার থেমে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল ঊর্মি। ডাকে ব্যথাতুর কণ্ঠে——-‘কে? কে এটা? আমাকে তুলে এনেছেন কেন?’

পরপর শোনা যায় হকিস্টিকটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলার শব্দ। ঊর্মি ততক্ষণে চিৎকার থামিয়ে দিয়েছে: শুকনো ঢোক গিলে বোঝার চেষ্টা করে কিছু। চোখ কুঁচকে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে ভাবছে কিছু। নাক দিয়ে ঘ্রাণ শুকতেই চিনতে পারে— চিরচেনা পারফিউম স্মেল। অস্ফুটে ঊর্মি বলে বসে———‘কা… কাব্য! এটা তু. .তুমি?’

ওপাশ থেকে ঊর্মির হাতের কবজিতে সটান করে ব্লেডের ধারালো কিছু চলে গেল, সাথে সাথে হাত কেটে ফিনফিনিয়ে রক্ত বের হলো। ঊর্মি সজোরে চিৎকার করে উঠল ব্যথায়। সাথেসাথেই ওপাশ থেকে কেউ ঊর্মির মাথাটা দেয়ালে চেপে ধরে শক্ত করে। ঊর্মির এ যাত্রায় বোধ হলো—ওর মাথাটা দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে যাবে, পিষে যাচ্ছে রীতিমতো! ব্যথায় নীল হয়ে গেল ঊর্মির ফর্সা মুখটা।

ঊর্মির দুটো হাত পেছনে বেধে রাখা। মাথায় দেয়ালের সাথে পিসে ফেলতে ফেলতে কেউ ওর কানের কাছে এবার ফিসফিসালো; লো ভয়েসে আগুন কণ্ঠে———‘কাব্য… ইটস শাহরিয়ার কাব্য!’

কানের কাছে এই একটা নাম শুনে ঊর্মি ব্যথা ভুলে যায় এক নিমিষে, হা করে তাকানোর চেষ্টা করে মাথা তুলে। কাব্য দিল না, আবার আরও জোরে ওর মাথাটা দেয়ালে ধাক্কা দিয়ে আবার চিৎকার করে বলে———‘এবার চিনেছিস? আমি কে? হু? সাইকো?’

ঊর্মির মুখ হা হয়ে আসে। ও ওভাবেই; ব্যথা গায়ে-মাথায় নিয়ে কাব্যকে ছুতে ছুতে চায় পাগলের মতো———‘কাব্য… তুমি? জান তুমি আমার জন্য এসেছ? আমাকে খুঁজে এসেছ?’

কাব্য ওকে ছুঁতে দেয় না। বরং হাত মুচড়ে ধরে পিঠের পেছনে, হুঁশিয়ারি করে বলল———‘হুঁ, তোর জন্যই তো এসেছি। আমাকে তিলে তিলে কষ্ট দিলি; এমনি ছেড়ে দেব ভেবেছিলি?’

ঊর্মি কাব্যের এমন কথা গায়ে মাখে না। ও কাব্যকে ধরতে যায় আবারও———‘জান… জান! আমি জানতাম তুমি আসবে! এই জন্যই আমি তোমার জন্য একটা রুম প্রতিদিন সাজিয়ে রাখতাম। আমি আর তুমি এখন থেকে ওই রুমে থাকব; হ্যাঁ? শোনো কাব্য?’

কাব্য বুঝতে পারল—ঊর্মির মানসিক অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। নাহলে এমন টর্চারের পর এই কথাগুলো ঊর্মি বলত না।
কাব্য এবার কী মনে করল। ও ঊর্মির হাত ছেড়ে দিল। সাথে ঊর্মির চোখ খুলে দিয়ে শুধু একটা হাত শিকলে বেঁধে রাখল।

ঊর্মি ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখে—কাব্য; ওর সামনে একটা চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। হাতে একটা হকিস্টিক; ক্রমাগত সেটা ঘুরাচ্ছে আঙুলের সাহায্যে; কুচকে চেয়ে আছে ঊর্মির দিকে। তার ওই নেশালো, হুডেড দু চোখে এটুকু মহব্বত নেই ঊর্মির জন্যে।

ঊর্মির বুক কেপে উঠে। ও এসব এড়িয়ে গেল। আত্মসম্মান ভুলে আবারও কাব্যকে এক হাতেই ছুতে যেতে চায়———‘জান… কতদিন পর তুমি এলে… কুহু . .ওই মেয়ে হ্যা তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে না? ওয়াও। আমি জানতাম।’

ঊর্মি আবে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতেই শিকলে আটকে পড়ে গেল মাটিতে। পরপর ছলছল চোখে তাকাল কাব্যের দিকে। ও এভাবে বারবার ব্যথা পাচ্ছে, কাব্য তখনও এক হাতে হকিস্টিক নাড়তে নাড়তে ভীষণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঊর্মির আর্তনাদ শুনছে; দেখছে—মুখের এতটুকুও কুঞ্চিত ভাব নেই। ঊর্মির এত ব্যথা দেখেও ওর চোখে দরদ এলো না। ঊর্মির কান্না চলে এলো কেন যেন এটা দেখে।

ঊর্মি আবার উঠে বসল। শরীরটা ব্যথা করছে ভীষণ। কাব্যের দেওয়া ইঞ্জেকশনের কারণে হাত নড়তে পারছে না।
ঊর্মি কাব্যকে করুন কণ্ঠে ডাকে———‘কাব্য…! এই কাব্য?’

কাব্য হকিস্টিক এগিয়ে ধরে, সেটার কর্ণার দিয়ে ঊর্মির কাঁদো-কাঁদো মুখটা তুলে ধরে; ভ্রু উঁচিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে———‘কি?’

‘কুহু ছেড়ে দিয়েছে তোমাকে?’—ঊর্মি ভাঙা গলায় জানতে চায়।

কাব্য বাঁকা হাসল, ঊর্মির ঠোঁটনিতে হকিস্টিকটা আরও শক্ত করে গেঁথে দিতে দিতে———‘কি মনে হয়?’

ঊর্মি কান্নামুখেও হেসে ওঠে জোরে———‘ছেড়ে দিয়েছে। এত অবিশ্বাস নিয়ে সংসার করা যায় নাকি?’

কাব্য তাকিয়ে রইল ঊর্মির দিকে। এ কথাটা ওর মাথা ধরিয়ে দিল একপ্রকার! সাথেসাথেই হকিস্টিক ফেলে দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে এসে ঊর্মির থুতনিটা চেপে ধরে দু আঙুলে, আঙুল যেন গেঁথে যেতে চাইল। কাব্য ধরে আরও শক্ত করে, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো—————‘কুহু আমার বিয়ে করা স্ত্রী। কি বললাম, হ্যাঁ? বিয়ে করা স্ত্রী ও আমার। স্ত্রীর মাথার তার ছিঁড়ে গেলেও স্বামী হিসেবে আমি ওই তার জোড়া লাগিয়ে দেব। চুনোপুঁটিদের করা ছলচাতুরিতে আমি কাব্য আমার ওয়াইফকে ছেড়ে দিব ভেবেছিলে?কুহু যদি আমার সাথে থাকতে না-ও চাইত, তবুও আমি ওকে বন্দি করে নিজের কাছে রেখে দিতাম, ডিভোর্স দেওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না।’

ঊর্মি হা করে তাকাল কাব্যের দিকে; কোনরকম কষ্ট করে উচ্চারণ করে আশ্চর্য হয়ে———‘কুহু আছে? এখনো? এতকিছুর পরেও? আর আমি? আমি কাব্য? আমাকেও পাগল বলে ছেড়ে দিলে? ও কী তাহলে?’

কাব্য ওকে ছিটকে ফেলে দিয়ে বলল———‘তুই একটা আগাছা আমার লাইফে। যাকে এতদিন না ছিড়ে ফেললেও; আজ ছিঁড়ব; উপরে দেব।’

ঊর্মি কেঁপে উঠলো। কাব্য চেয়ার পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঊর্মির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ঊর্মির মুখের থুতনিতে চেপে হিসহিসিয়ে বলল———‘ভালোবাসা? বুঝিস কিছু? কী হয় সেটা, জানিস?

ঊর্মি তাকাল——-‘বুঝি কাব্য।’

কাব্য হাসে, ঊর্মি চেয়েই রইল অপলক ওই হাসির দিকে। কাব্য ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বড়ই বাচ্চাদের মতো করে বলল——-‘আমাকে ভালোবাসো? প্রুভ দিবে না? না হলে বুঝব কি করে? রাইট?’

ঊর্মি তাকাল, উত্তেজিত হয়ে উঠে বলে গেল——-‘কি প্রুভ? তুমি যা বলবে আমি তাই করবো কাব্য, তাই করব: একবার জাস্ট বলেই দেখো না। হ্যাঁ?’

কাব্য ঊর্মির থুতনি ছেড়ে দিয়ে ওর গালে হাত রাখল, শক্ত করে গালটা চেপে ধরে বলে হাসিহাসি মুখে বলে উঠল———‘সবকিছু খুলে বলো আমাকে। যা কিছু করেছো আজ অব্দি আমার জন্যে সব।’

ঊর্মি হাসল এত ব্যথার মধ্যেও, পরপর বলল———‘সব বললে আমার হবে তুমি?’

কাব্য তাকাল; ঠোঁটে হাসি রেখে পরপর নিভু স্বরে বলল———‘আমি যার, আমি তারই হব।’

ঊর্মি ভাবে, কাব্য ওর কথা বলছে। ও শান্তিতে হেসে ওঠে। কাব্য ওকে ছেড়ে দিয়ে ঊর্মির অগোচরে ফোন সেট করে রাখে টেবিলে। ভিডিও হচ্ছে; ঊর্মি বলে যায়——————‘আমি পাগল ছিলাম, তুমি কাব্য আমার পাগলামির উপশম ছিলে। আমি কুহুর ব্যাপারে জানতাম না কোনোদিনও। কুহুর প্রপোজের ব্যাপারে আমি বলব না— আমি কীভাবে জেনেছি। তবে জানার পর আমি এতটাও পাত্তা দিতে চাইনি, ভেবেছি কুহুর মতো ইম্যাচিউর মেয়ে তোমাকে পাবে না কোনোদিনও।’

ঊর্মি হাসে———‘কিন্তু আমি যে কতটা ভুল, আমি সেটা তখন বুঝতে পারলাম, যখন কুহুকে রিজেক্ট করে আসার পর তোমার বদলে যাওয়া দেখলাম। কুহুকে বোন ভেবে রিজেক্ট করা এই তুমি কিনা ওর দুঃখে আমার সামনে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে থাকলে, ওর জন্য এতটা কাতর হচ্ছিলে কাব্য। আমি ঊর্মি সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম, তুমি কোনো একদিন ওকে ভালোবাসবে, সেটা আজ না হোক, কাল অবশ্যই!’

কাব্য তাকিয়ে রইল ঊর্মির দিকে। একবার চেক করল— ভিডিও হচ্ছে কি না। ঊর্মি একহাতে ঠোঁটের কোণের রক্ত মুছে নিয়ে আবার হেসে উঠে বলে———‘তাই আমি প্ল্যান করেছিলাম। আমার আর তোমার বন্ধুত্বের সময়কার ছবি এডিট করতে দেই। কাকে জানো? জেমসকে চেনো? আমার চাচাতো ভাই। হার্ভার্ডে পড়ে; এআই-এ অনেক পারদর্শী। ওকে দিয়ে আমাদের ওই একসাথের ছবি এডিট করে কুহুকে পাঠাতাম। আমার ভাই তো, এমনভাবে ছবি এডিট করত, কুহু গাধা বুঝত না সেটা। অবশ্য একটু খেয়াল করলে ধরতে পেত। কিন্তু ছাগল আমি যা বলতাম তাই বিশ্বাস করতো, ইম্মাচিউর কি এমনি এমনি বলি ওকে! তারপর ফলাফল— ও তোমাকে অবিশ্বাস করা শুরু করে।’

কাব্য ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু পা অস্থির ভাবে নড়াতে শুরু করেছে; সম্ভবত রাগ কন্ট্রোল করছে। ঊর্মি আবার বলে———‘আমি আমার লক্ষ্যেও ছিলাম। আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড সিয়ামকে লেলিয়ে দিলাম পেছনে পেছনে। কুহুকে উসকে দিলাম— তোমার বিপক্ষে আরও কঠিন করে। ব্যাস, কুহু সিয়ামের প্রপোজাল একসেপ্ট করে ফেলল।’

ঊর্মি এবার রেগে মাটি খামচে ধরে বলে———‘আমি তোমার জন্য এতকিছু করলাম। সেই তুমি কি না— আমাকে ছেড়ে ঠিক ওকেই বিয়ে করলে? আমাকে অ্যাডমিট করিয়ে রাখলে মেন্টাল অ্যাসাইলামে? কেন? আমি পাগল? এই কাব্য, আমি পাগল? আমাকে পাগল লাগে তোমার কাছে? আমি তোমাকে এতটা ভালোবাসি— সেটা তোমার কাছে পাগলামি মনে হয়? এই কাব্য?’

কাব্য নাক টানল, পরপর নাকের নিচ ঘষতে ঘষতে ঊর্মিকে বলল———‘ঘড়ির রহস্য বলবে, না আমি বের করব?’

ঊর্মি এবার হাসে———‘এটা বলব না আমি। এটা সিক্রেট থাকুক। আমাকে অনেক ভালোবাসো, তারপর বলব।’

কাব্য হাসল এ যাত্রায়———‘ওকে; অ্যাজ ইউর উইশ!’

বলে চেয়ার থেকে উঠে একটা ঘড়ি ব্যাগ থেকে বের করে টেবিলের উপর রাখল। ঘড়িটার ভেতরের সব যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে খুলে রাখা হয়েছে। যন্ত্রপাতির পাশেই মাইক্রোফোনের ছোট একটা চিপ! কাব্য এটা আঙুলের ডগায় তুলে ঊর্মির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল———‘দেখো তো? এটা চিনো কি না।’

ঊর্মি আশ্চর্য হয়ে গেল——‘এটা… এটা তো? তুমি এটার খবর কীভাবে পেলে?’

কাব্য হেসে চিপটা আবার জায়গামতো বক্সে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল———‘সুরমা! রাইট? সুরমা নাকি সুরভী? ভালোই গেম খেলেছিস। পাগলের ব্রেইন স্বাভাবিক মানুষের থেকে এগিয়ে চলে।’

ঊর্মি সাথেসাথেই হুঙ্কার ছাড়ল———‘আমি পাগল নই, কাব্য। খবরদার আমাকে পাগল বলবে না।’

কাব্য বক্স সবকিছু ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল———‘পাগল নিজেকে পাগল মনে করে না কোনোদিন।’

ঊর্মি রাগে পাগল হয়ে যায় রীতিমত, ও ফ্লোরে থাবা দিয়ে বলল———‘আমি পাগল নই কাব্য। অন্তত তুমি আমাকে পাগল বলো না, আমার খুব লাগে।’

কাব্য তাকাল ঊর্মির দিকে, উদ্বেগহীন কণ্ঠে ফের আউড়ায় ——‘পাগলকে পাগল বললে গায়ে লাগবে কেন? আস্ক ইয়োরসেলফ।’

ঊর্মি এবার কেঁদেই ফেলল———‘প্লিজ কাব্য। মানা করলাম তো আমি।’

কাব্য তখনও নিজের মতো ভিডিও অফ করে দিয়ে ঊর্মিকে দেখাল——‘তোমার গিল্টট্রিপের ভিডিও। দারুণ রিজোলেশন দিয়ে তোলা।’

ঊর্মি তাজ্জব হয়ে গেল, ——-‘মানে? ভিডিও করছিলে তুমি?’

কাব্য বড়ই বেচারার মতো বলে——‘আমার কুহুটা আবার অনেক ইম্মাচিউর কি না। প্রুভ না দিলে . . সো. . !’

কাব্য দায়ছাড়া কণ্ঠে কথাটা বলে ভিডিওর সবটা ঠিকঠাক করে দেখতে শুরু করে। ঊর্মি চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়ায়——-‘তুমি. . আমার সাথে এমন. . বিশ্বাসঘাতকতা করলে?’

কাব্য হাসল, পিশাচিক হাসি। সাথেসাথে হকিস্টিক তুলতেই ঊর্মি চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলল———‘মেরে ফেলো আমাকে কাব্য, তুমি বরং মেরেই ফেলো। তোমার এই বিশ্বাসঘাতক রূপ আমাকে এমনিতেই মেরে ফেলছে তিলে তিলে।’

কাব্য হেসে হকিস্টিকটা তুলে রাখল ওর ব্যাগের ভেতরে——‘মারব কখন বললাম? তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব। আফটার অল লাইফের প্রথম পছন্দকে মেরে ফেলা যায় না।’

ঊর্মি তাকিয়ে রইল। কাব্য এতক্ষণ ঊর্মির ভিডিও সেইভ করে ভালো করে দেখে নিল সব ঠিক আছে কি না। তারপর কল লাগল কায়রানের।

একটুপর যুক্তরাজ্যের ইউনিফর্ম পড়া একটা পুলিশ অফিসার এলো। কাব্য ওকে দেখে হেসে এগিয়ে গেল———‘কায়রান! বাকি কাজটা তুই করে দে, আমার যাওয়া লাগবে। আধা ঘণ্টা পর ফ্লাইট আছে বাংলাদেশের।’

কায়রান উর্মিকে দেখে বলে———‘আমাকে না দিয়ে এটাকে মেন্টাল অ্যাসাইলাম দিয়ে দে? কী বলিস?’

কাব্য কড়া চোখে তাকাল; কায়রান সাথেসাথেই চুপ হয়ে গেল। কাব্য ব্যাগপত্র ঠিক করতে করতে বলে———‘মার্ডার মামলা দিয়ে রাখ; কিছুদিন ভুগুক। প্ল্যান তো রেডি আছেই একটা।’

কায়রান হেসে কাব্যের কাঁধে চাপড় দিয়ে বলল———‘হুঁ? তারপর? বাংলাদেশে ভাবির জন্য কী সারপ্রাইজ আছে আজ?’

কাব্য নিজের হাতের ভিডিও দেখিয়ে দিল।
কায়রান হেসে উঠে, থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল———‘বেস্ট অফ লাক, ম্যান।’

————-—————
দুপুর ৩ টা।

কুহুর ফোনে এতক্ষণে বাড়ির সবার কল এসেছে। কুহু কারোর ফোন ধরেনি; রিসিভ করেনি।শার্লিন উবার ডাকতে চাইলে সেটাও কুহু দিল না কেন যেন। আলতো করে শার্লিনের হাতটা ধরে বলল———‘ওইখানে বাচ্চারা খেলছে। পার্কে গিয়ে বসি। বাসায় গেলে দম বন্ধ লাগবে।’

শার্লিন ফোনটা রেখে দিতে দিতে বলল———‘আন্টি কল করবে কুহু, চিন্তা করছে নিশ্চয়ই!’

কুহু জবাব দিল———‘মেসেজ করে বল, তোর বাসায় যাচ্ছি।’

শার্লিন চোখ কুচকে কুহুর দিকে তাকিয়ে থাকল। কুহু ওর সাথে কথা বলা শেষ করে আবার বাচ্চাদের খেলার দিকে স্থির তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো অনুভূতির রেশ নেই; স্রেফ মূর্তির মতো তাকিয়ে দেখছিল ওপাশে।

শার্লিন কুহুকে এনে পার্কের একটা বেঞ্চে বসালো। জিজ্ঞেস করল———‘কিছু খাবি? পানি খা আগে। বাদাম দেই কিনে?’

কুহু শার্লিনের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে হঠাৎ অন্যমনস্ক হাসল। তারপর শার্লিনের হাত ধরে টেনে ওকে বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে বলল———‘বস আমার পাশে। শান্ত হো। সবে দু মাসের প্রেগন্যান্সি, তোর এসব দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি ডেলিভারি হয়ে যাবে আমায়।’

বলে হেসে উঠল কুহু। হাসতে হাসতে ঢলে পরে শার্লিনের গায়ে। শার্লিন মিনমিন করে জবাব দিল———‘বাচ্চাটা না থাকলে তুই ভেঙে যাবি কুহু… বাচ্চাটা আসুক; আমি চাই আসুক।’

কুহু শোনেও না এসব। ও এবার হাসি থামিয়ে শার্লিনের হাতটা টেনে এনে নিজের পাশে বসিয়ে শার্লিনের হাত চেপে নিজের কোলে রেখে মিষ্টি হেসে বলল———‘জানিস শার্লিন? আমি কুহু জীবনে কিছু পাই না পাই, একটা বন্ধু পেয়েছি— তোর মতো একটা বন্ধু। লাইফের বেসটেস্ট গিফট।’

কুহু বলতে বলতে হাসল আবার। শার্লিন অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকাল কুহুর মুখটার দিকে। কুহু খানিক হেসে শার্লিনের কাঁধে মাথা রেখে আবার হাসলো। পরপর তাকিয়ে রইল স্থির সামনে। শার্লিন একবার কুহুকে দেখে, পরপর নিজেও হেসে উঠে কুহুর হাতটা চেপে ধরে শক্ত করে।

‘কাছে আসবে না খবরদার! দূরে যাও নষ্ট পুরুষ। মেয়ে দেখলে হুঁশ থাকে না, না? চোখ উপড়ে ফেলব আমি তোমার; চেনো আমাকে?’ —— একটা মহিলা কিশোরী কণ্ঠে গালাগালি দিতে দিতে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে আসছে সামনে। পেছনে একটা পুরুষ বাচ্চা কোলে অসহায় ভঙ্গিতে মহিলার পেছনে ছুটছিল। মেয়েটা কাঁদছে ভীষণ, পুরুষটার মুখ দেখেই মনে হচ্ছে— বেচারা ফ্যাসাদে পড়ে গেছে।

কুহু ওদের ঝগড়া শুনে তাকাল ওদিকে; শার্লিন বলে———‘দেখেছিস? সব পুরুষ এক। বৌ মেয়ে নিয়ে এসেও লুচ্চামি কমে না এদের।’

কুহু শুকনো মুখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরোটা ঘটনা বিস্তারিত দেখল ও, কেন যেন ভীষণ আগ্রহ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে দেখে গেল সম্পূর্ণটা।

ঘটনা এমন—
লোকটা মেয়েটার স্বামী, ১০ বছরের বিয়ের সম্পর্ক তাদের। মহিলাটা স্বামীর মেয়েদের সাথে অসংলগ্নতার খবর পেয়েই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। আর এখন ঝাঁঝিয়ে সেতার কোপ দিচ্ছে।

মহিলা একসময় ক্লান্ত হয়ে বেঞ্চে বসল। স্বামীর নাম সম্ভবত রাকিব। উনি বাচ্চাটা কোলে নিয়ে মহিলার সামনে এসে পানির বোতল ধরে বললেন———‘পানি খাও সায়নী। চিৎকার করে হাপিয়ে গেছো।’

সায়নী কেড়ে কেড়ে পানির বোতল ঝাঁড়ি দিয়ে ফেলে দিল। রাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাচ্চাকে কোলে করে বেঞ্চে সায়নীর পাশটায় বসল। সায়নী কেঁদে উঠে জোর গিয়ে বলল———‘বসবে না আমার পাশে; কাছে আসবে না। ঘেন্না করি তোমাকে। ছিঃ!’

রাকিব মৃদু স্বরে বলল———‘বাচ্চাটার সামনে এসব বলো না। ও কি বোঝে এসব? পুরো ঘটনাটা না জেনে আমাকে দোষারোপ করছ তুমি সায়নী। অযথা নিজেও কষ্ট পাচ্ছ, আমাকেও দিচ্ছ কষ্ট।’

সায়নী বাচ্চার দিকে তাকিয়ে ওকে বলল———‘ফিহা, যাও ওখানে গিয়ে খেলো। তোমার বাবার সাথে কথা আছে আমার।’

ফিহা বাবার মুখের দিকে আদুরে চোখে চেয়ে পা নামিয়ে চলে গেল কোল থেকে। মায়ের হাত থেকে বাবল ওয়াটার নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। রাকিব ওকে দেখে রাখল ওভাবেই, দূর থেকে।

সায়নী চোখের জল মুছে কেঁদে উঠে আবার বলল———‘বল, কী বলার কথা বলবে এখন? আর কী নোংরা মুখ আছে তোমার, আমিও শুনতে চাই।’

রাকিব মৃদু স্বরে বলল———‘আমি দুশ্চরিত্র নই সায়নী। তোমাকে কেউ ভুল বোঝাচ্ছে।’

সায়নী জবাব দিল কর্কশ স্বরে———‘না; ভুল বুঝিনি আমি। শখও নেই নিজের সংসারে ঝামেলা করার। তুমি ঘুরেছ ওই মেয়ের সাথে, ছবি আছে আমার কাছে।’

রাকিব ভ্রু কুঁচকে নিল———‘দাও তো ছবি, দেখি।’
সায়নী চোখের জল মুছে ফোন বের করে দেখাল। রাকিব ছবিটা দেখে নিল———‘এখানে আমি কীভাবে এলাম? আমার মুখ তো দেখাচ্ছে না ছবিতে।’

সায়নী জবাব দিল———‘মুখ না দেখালেও— এই শার্ট আমি গিফট করেছিলাম তোমাকে। আড়ং থেকে; আড়ঙের ব্যাজও লাগানো আছে এখনো।’

রাকিব ছোট শ্বাস ফেলে বলল———‘কিন্তু একইরকম শার্ট অনেকের হতে পারে সায়নী। আমি কীভাবে হলাম এটা?’

সায়নী শাসিয়ে উঠল———‘খবরদার আমাকে মিথ্যে বলবে না। অনিন্দ্যদা আমাকে বলেছে তোমার কুকীর্তির ব্যাপারে।’

রাকিব ভ্রু কুঁচকায়———‘কে? কে বলেছে? অনিন্দ্য?’

‘হ্যাঁ, কেন ফোসকা পড়ল বুঝি। তোমার শত্রুর কথাও কেন নেচে ফেললাম?’ — সায়নী বলে।

রাকিব জবাব দিল———‘কষ্ট হচ্ছে; ফোসকা পড়েনি। অনিন্দ্যের ব্যাপারে আমি তোমাকে সব বলেছি। প্রমোশনের নেশায় আমার পেছনে পড়ে আছে সেটা জানো তুমি। আর এই মেয়েটা আমার কলিগ, নিউ জয়েন। কথাবার্তা প্রফেশনাল ব্যাপারে হলেও— ওর সাথে আমি এই রেস্টুরেন্টে যাইনি। এটা অন্য কেউ।’

সায়নী নাক টেনে বলে———‘আর কত মিথ্যে বলবে তুমি?’

রাকিব বলে———‘সায়নী… আজ একটা কথা বলি? একটা সম্পর্কের মধ্যে যখন বিন্দু পরিমাণ ফাটল থাকে না, তখন ওই সম্পর্কের ভেতর শয়তান থার্ড পার্সন ঢুকিয়ে দেয় সম্পর্ক ভাঙার জন্য।’

কুহুর মাথায় এই একটা কথা ভীষণ রকম গেঁথে গেল। কুহু শার্লিনের কাঁধ থেকে মাথা তুলে বসল এবার। ভ্রু কুঁচকে ওদের কথা শুনতে শুরু করল— আগের চেয়েও আরও আগ্রহে।
সায়নী চোখ মেলে তাকাল রাকিবের দিকে।

রাকিব বলে———‘দেখ… ২৬ তারিখের ছবি এটা, ডেট দেখাচ্ছে ছবিতে। ২৬ তারিখ আমি অফিস থেকে আগে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তমালকে কল করে বলেছিলাম। বাড়িতে গেছি, সেখানে গরু দেখেছিলাম কুরবানির জন্য, তুমি নিজে চুজ করে দিয়েছিলে। বাড়িতে যেতে লাগে ৩ ঘণ্টা। আর অফিস থেকে বেরিয়েছি ১২টায়। তাহলে ১টায় আমি ঢাকার রেস্টুরেন্টে কীভাবে থাকলাম? কমন সেন্স তো তাই বলে সায়নী।’

সায়নী এতক্ষণে থামল। আসলেই তো। ছবিটা ভালো করে জুম করে দেখে সায়নী। পরপর চুলের কাটিং দেখে সাথেসাথেই বলে উঠল———‘এটা তো… এটা তো তুমি না। চুলের কাটিং তোমার মতো না, ছবির ছেলেটার চুল অন্যরকম।’

রাকিব এ যাত্রায় মৃদু স্বরে বলল———‘বর্তমানে অনেক কিছু ডিজিটাল হয়ে গেছে সায়নী। আজকাল এআই দিয়ে অনেক কিছু করা হচ্ছে। একটা ছবির উপর ভিত্তি করে তোমার-আমার সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না। আচ্ছা? তুমি তো ১০ বছর ধরে আমার সাথে আছো। আজ অব্দি তোমার সামনে আমি কোনো বাইরের মেয়ের সাথে সন্দেহভাজন ভাবেও একবারের জন্য কথা বলেছি? স্ত্রী হিসেবে কী বলবে তুমি?’

সায়নী জবাব দিল———‘না।’

‘তাহলে? যে আমি তোমার সামনে কোনোদিন অশোভন কিছুই করিনি— সেই আমি কিনা এসব করে বেড়াই বাইরে। সায়নী, একটা মানুষ ১০ বছর ধরে তোমার সাথে আছে— তাকে তুমি যতটা চিনবে, বাইরের লোক ততটা চিনবে না। আর তোমার সাথে ছোট বেলা থেকেই আমার দেখা-সাক্ষাৎ। আমার ব্যাপারে তুমি যথেষ্ট জানো— ছেলে হিসেবে আমি কেমন ছিলাম।’ — রাকিব থামে।

আবার বলে———‘তাহলে, যাকে তুমি ছোটবেলা থেকে ভালো ছেলে, জেন্টলম্যান, ফ্যামিলিম্যান হিসেবে ভাবতে, তাকে হঠাৎ একটা বাইরের মানুষের কথায় এত বড় অপবাদ দিচ্ছিলে? কোনো কিছু জাজ না করে? শুধুমাত্র কয়েকটা ফটো আর মিথ্যে কথার ভিত্তিতে?’

রাকিব একবার শেষবার বলে———‘যখন কেউ তোমার খুব কাছে থাকে, তাকে যদি কোনোদিন ভুল বুঝো, তার সাথে কথা বল এ ব্যাপারে। তাকে কষ্ট দিয়ে নয়; বরং দুজন মিলে ডিসকাস করতে হয় সায়নী।’

সায়নী লজ্জায় পড়ে মাথাটা নামিয়ে দিল।

কুহু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। একসময় ও চোখ বুজে একটা শ্বাস ফেলে আবার আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কুহু নিজের ছাপ দেখল কেন যেন: রাকিবের একটা কথা ওর কানে ক্রমাগত বেজেই যাচ্ছে-

~ ‘তাহলে, যাকে তুমি ছোটবেলা থেকে ভালো ছেলে, জেন্টলম্যান, ফ্যামিলিম্যান হিসেবে ভাবতে, তাকে হঠাৎ একটা বাইরের মানুষের কথায় এত বড় অপবাদ দিচ্ছিলে? কোনো কিছু জাজ না করে? শুধুমাত্র কয়েকটা ফটো আর মিথ্যে কথার ভিত্তিতে?’~

কুহু সাথেসাথেই উঠে দাড়িয়ে গেল। শার্লিনের দিকে চেয়ে হঠাৎ বলে উঠল———‘আমি বাসায় যাব, উবার ডাক। দ্রুত শার্লিন; প্লিজ।’

শার্লিন আহাম্মক হয়ে তাকাল———‘মানে? এখন তো বললি…!’

কুহু থামিয়ে দিল ওকে; অস্থির হয়ে বলল———‘প্লিজ শার্লিন।’

‘ওকে, আমি উবার ডাকছি। তুই শান্ত হয়ে বস আগে।’ — শার্লিন ফোন বের করে উবার বুক করে আশ্চর্য হয়ে কুহুকে দেখে। কুহু অস্থির হয়ে নিজের ফোনের ঊর্মির সাথে চ্যাটহিস্ট্রি দেখতে থাকে ভালো করে।

এতমাস পর. . প্রথমবারের মতো চুড়ান্ত ইগোয়ালি,ইম্মাচিউর, কুহেলিকা সিদ্দিক কুহু জুম করে করে দেখে ঊর্মির পাঠানো ঊর্মি-কাব্যের প্রত্যেকটা ঘনিষ্ঠ ছবি।

চলবে

আজ সবাই রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট করবেন। আমি সবার মন্তব্যের রিপোই দিব। আর কিছু জানার বাকি আছে কারোর গল্প থেকে? গল্প তো প্রায় শেষের দিকে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply