ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৩৮
অবন্তিকা_তৃপ্তি
কাব্য কুহুর ঠোঁটের কোণে চরম আশ্লেষে চুমু খেয়ে সরে আসলো নিজেই। কাব্য ওর বন্ধ চোখের দিকে চেয়ে এবার ওর বাহু চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে রাগে কাপতে কাপতে বলে যেতে লাগলো———-‘ওকে… ওকে কখনোই না। কিন্তু তোকে সবসময়, সবটা সময়! আই… আই লাভ ইউ— জাস্ট ইউ অ্যান্ড ব্লাডি ইউ, ড্যাম ইট।’
কুহু টলমল চোখে ধীরে ধীরে চোখটা খুলে তাকালো সাথেসাথেই। কাব্য রাগে ফুঁসছে রীতিমতো তখন।
অবাক মলিন কুহুর মেয়েলি দুই আকর্ষণীয় চোখ, যা স্বামী কাব্য ভীষণ আবেশে চোখ দেখে ভেতর পরিমাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তখন কুহুর দুই শীর্ণকায় হাত কাব্যের বুকের শার্ট খামচে ধরেছে, চেয়ে আছে ভয়ার্ত চোখে কাব্যের চোখের দিকে। পলক ফেলছে, থেমে থেমে, কাব্যও তখন একইভাবে কুহুর চোখে চোখ রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
কুহু একসময় ইতস্তত ভঙ্গিতে কাব্যের শার্ট আঙুলের মুঠি থেকে ছেড়ে দিতেই, কাব্য থম ভঙ্গিতে নিজের বুকের শার্টের দিকে তাকাল। কুহু চোখ নামিয়ে, অস্বস্তি নিয়ে হালকা করে ধাক্কা দিল কাব্যকে। কাব্য সরে গেল সহসা।
কুহু চুপচাপ সিটে এসে বসলো, কথা না বলে জানালার দিকে ফিরিয়ে জোরে একটা শ্বাস নিয়ে সেভাবেই থম হয়ে বসে থাকলো। ওর চোখ তখন কেমন যেন, টলমলে! কান্না আটকে, গায়ের ওড়না মেলে দিয়ে সেটাকে খামচে ধরে আঁকড়ে ধরে ওভাবেই বসে রইল। বেসুরে তবলার ন্যায় কানের কাছে কাব্যের একটা কথা বারবার বেজে যাচ্ছে—
‘কাব্য লাভস কুহু, অনলি অ্যান্ড অনলি তুই কুহু!’
এই কথা, এই কথাটা কাব্য ভাই সেদিন কেন বললেন না? যেদিন কুহু এসেছিল প্রেমের দাবি নিয়ে। থাপ্পড়, কাব্য ভাইয়ের অবহেলা কুহু এতকিছুর পরেও ভুলতে পারে না কেন? অথচ আজকের এই কথাটা শোনার পর— কুহুর নাজুক হৃদয় ধরফর শুরু করেছে, বুক ফেটে কান্না আসছে আবার, অনেকটা দিন পর।
কাব্য তখনো কুহুর দিকে চেয়ে আছে, পরপর আস্তে করে ডাকলো——‘কু. .কুহু!’
কুহু হা করে একটা লম্বা শ্বাস নিজের মধ্যে টেনে নিয়ে জবাবে রুদ্ধশ্বাস গলায় জবাব দিল———-‘দেরি হচ্ছে আমাদের, গাড়ি স্টার্ট দিন।’
কাব্য কুহুর হাতটা ধরে কিছু বলতে যাবে; সাথেসাথেই কুহু হাত সরিয়ে নিলো। কাব্য থেমে গেল সাথেসাথেই; ফিরিয়ে নিল হাত। ভ্রু কুচকে ওপাশ ফেরা কুহুর দিকে চেয়ে রইলো অনেকটাক্ষণ। কুহুর নাক টানার শব্দ আসলো একবার, কাব্য চোখ বুজে মাথাটা উচিয়ে ধীর ধীরে সিটে হেলান দিল। লম্বা-লম্বা কয়েকটা শ্বাস ফেললো স্রেফ, শ্বাসের সাথে বেরিয়ে এলো কতগুলো চাপা দীর্ঘশ্বাস!
খানিক পর চোখ খুলে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিল আবার। নিজেই মনে মনে নিজেকে কয়েকশো থাপ্পড় বসালো। আজ ওর একটা ফালতু–বাচ্চামো ভুলের জন্যে কাব্য নিজেও সাফার করছে, একইভাবে কুহুও সাফার করছে— কুহু যদিও সেটা স্বীকার করবে না।
———————
বিকেল ৫:৩০!
কায়া–স্নিগ্ধ নদীর পারে বসে আছে। কায়ার হাতের বাদামের প্যাকেট; মাত্রই স্নিগ্ধ কিনে দিল। কায়া খুশিমনে বাদাম খেতে খেতে নদীর দিকে চেয়ে আছে, পরনে স্কুল ড্রেস। স্নিগ্ধ ওর পাশে বসে আছে। কায়া বাদাম খেতে খেতে স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে বলল———‘খাবেন? দেই?’
স্নিগ্ধ বাধ্য ছেলের ন্যায় হা করল, কায়া অল্প হেসে স্নিগ্ধের মুখে বাদাম দিল। স্নিগ্ধ বাদাম চিবুতে চিবুতে হঠাৎ ভাবুক হয়ে বলল————‘ওরা আসবে আজ? দেরি হচ্ছে আমাদের।’
কায়া ঘড়ি দেখল, জবাব দিল———- ‘চলে তো আসার কথা এখন।’
স্নিগ্ধ আর কিছু বললো না।
‘ঐতো অদিতি আপু, ধ্রুব ভাই।’ — কায়া বাদামের প্যাকেট ফেলে উঠে দাঁড়ালো।
স্নিগ্ধ ওদের চিনে না, আশপাশে খুঁজে দেখতে দেখতে বলল—‘কই? কোথায়?’
কায়া ওদের দেখিয়ে বলল— ‘ব্লু শাড়ি, ব্ল্যাক শার্ট? দেখছেন?’
স্নিগ্ধ তাকাল, সোজা সামনের দিকে। একজোড়া কাপল এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। স্নিগ্ধের কেন যেন গলাটা শুকিয়ে এলো হঠাৎ। কায়ার বাড়ির কারোর সাথে ওর এই প্রথম দেখা। না জানি কি থেকে কি ব্লান্ডার ঘটে, স্নিগ্ধ নিচু স্বরে বিরবির করলো——-‘খোদা, ইজ্জতটা রাইখো।’
অদিতি এসেই কায়াকে জড়িয়ে ধরল— ‘কেমন আছিস?’
কায়াও পালটা জড়িয়ে ধরল, মৃদু হেসে জবাবও দিল——-‘ভালো। তুমি?’
অদিতি জবাব দিলো।
ধ্রুব স্নিগ্ধের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডশেক করলো ওরা দুজন।
ধ্রুব হালকা হেসে বলল— ‘হাই, হোয়াট’স আপ?’
‘গুড ভাইয়া।’ — স্নিগ্ধ মুচকি হাসার চেষ্টা করলো, ওদিকে বেচারার জনের পানি শুকিয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
ধ্রুব কায়ার দিকে চেয়ে নম্র হয়ে বলল— ‘হাই শালীসাহেবা!’
‘হাই ভাইয়া, ভালো আছেন?’ — কায়া হালকা হেসে কুশল জিজ্ঞেস করলো।
‘হুঁ! কোনো ক্যাফেতে বসে কথা বলি?’ — ধ্রুব অফার দিল।
————————-
~ সিজনস রেস্টুরেন্ট, মহাখালি~
ধ্রুব–অদিতি, স্নিগ্ধ–কায়া বসেছে সম্মুখ–সম্মুখে। ধ্রুব সবার জন্যে খাবার অর্ডার দিয়েছে যার যার পছন্দ মতো।
ওদিকে বেচারা স্নিগ্ধ অস্থির ভীষণ। বারবার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ইতি-ওতি চোখ ফেরাক্জ। কায়া হয়তোবা সেটা বুঝল।
ও আলগোছে সবার অগোচরে টেবিলের নিচে স্নিগ্ধের হাতের ওপর হাত রাখল। স্নিগ্ধ তাকাল সাথেসাথে,কায়া মৃদু হাসল স্রেফ! স্নিগ্ধও পাল্টা হাসার চেষ্টা করলো। নিজেকে গম্ভীর করে কায়ার হাতটা চেপে ধরে! স্নিগ্ধ ব্রেভ পুরুষ, বউয়ের সামনে নিজেকে দুর্বল দেখাবে না, ওর ইজ্জত যে থাকবে না। তারউপর একবার স্নিগ্ধকে ভয় পেতে দেখলে কায়ার বাচ্চাও ওকে মান দিতে চাইবে না, আর উপন্যাসের স্নিগ্ধও এতটা বোকা স্বামী নয়।
ধ্রুব ওদিকে লেমন জুসে চুমুক দিতে দিতে ওদের দুজনের এইসব কাণ্ড ভ্রু বাঁকিয়ে বাকিয়ে দেখছে। অদিতি ওদিকে বসে ফোনে তৃণার সাথে কথা বলছে; ধীর ঘুমাতে যাবে, মায়ের সঙ্গে কথা বলবে বলে জেদ দেখাচ্ছিল। স্নিগ্ধ–কায়ার এসব নিয়ে অদিতির আপাতত মন না থাকলেও; ওর ধুরন্দর বখাটে স্বামীর ঠিকই আছে।
স্নিগ্ধের চোখ এবার পড়লো ধ্রুবর দিকে। দেখতে পেল, ধ্রুব ভ্রু কুচকে স্নিগ্ধের দিকেই চেয়ে আছে। স্নিগ্ধ সাথে সাথে কেশে উঠে কায়ার হাত সরিয়ে ওর থেকে একটু দূরে সরে বসলো। ধ্রুব এবার হেসে উঠল নিঃশব্দে; অদিতির দিকে চেয়ে বললো— ‘কল শেষ?’
অদিতি ফোনটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল— ‘হুঁ, ধীর জেদ দেখাচ্ছিল।’
‘হুঁ, ওদের কথা শুনি এবার?’ — ধ্রুব বললো।
অদিতি এবার যেন হুঁশে এলো, কায়ার দিকে চেয়ে এবার ভীষন আতঙ্কিত হয়ে বলল— ‘বিয়ে যে করে ফেললি, এখন? জানিস তো গ্রামের অবস্থা। তোর আব্বু শুনলে—!’
স্নিগ্ধ পাশ থেকে উত্তেজিত হয়ে বলল— ‘কি করবেন? কিছু না। আমার ওয়াইফ ও এখন।’
ধ্রুব ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো সাথেসাথে স্নিগ্ধের দিকে। স্নিগ্ধ ধ্রুবর এমন চাওনি লক্ষ করে চুপসে যায়, চুপ হয়ে গেল তাৎক্ষণিক। বেচারা ধ্রুবর চোখে চোখ রাখতে পারছে না, কেন যেন ভয় পাচ্ছে। যতই হোক, বউয়ের বড় বোনের স্বামী। তারউপর শুনেছে ধ্রুব ভাই মারাত্মক রাগী। আর ধ্রুবকে দেখেও মনে হচ্ছে— অনেক রুড একটা মানুষ!
অদিতি স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল—‘জি ভাইয়া; আপনার ওয়াইফ ও। কিন্তু ও তার আগে আমাদের গ্রামের মেয়ে। আমাদের গ্রামের খবর তো জানেন? নতুন করে কি বলব আর।’
স্নিগ্ধ মুখটা চুপসে গেল। অদিতি কায়ার দিকে চেয়ে বলল—‘স্নিগ্ধের বাবা মা জানে?’
কায়া চুপসে যাওয়া মুখে স্রেফ মাথা দুপাশে দোলাল— অর্থাৎ না।
অদিতি তীক্ষ্ম চোখে তাকালো কায়ার দিকে———‘এতবড় একটা ব্যাপার, জানাজানি হলে কি কেলেঙ্কারী হবে জানিস? বোকা কোথাকার!’
কায়া মাথাটা নামিয়ে নিলো, মাথা যেন বুকে এসে ঠেকবে। ওভাবেই নিচু স্বরে দায় মেনে বললো——-‘সরি আপু।’
অদিতি হতাশ শ্বাস ফেলে ধ্রুবর দিকে তাকাল, চিন্তিত স্বরে বললো————‘কি করা যায় বলুন কিছু। বিয়ে তো করে ফেলেছে। এখন লোক হাসাহাসি হলে কবিতা আন্টি অনেক কষ্ট পাবে।’
ধ্রুব তখনও স্নিগ্ধকে তীক্ষ্ম চোখে দেখছে। বেচারা স্নিগ্ধ একটু পরপর কেশে উঠে সোজা হয়ে বসতে বসতে আড়চোখে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। ধ্রুবকে চুপ দেখে অদিতি বিরক্ত হয়ে ওকে ঝাঁকালো——-‘কথা বলেন? কি করবে?’
ধ্রুব স্নিগ্ধের থেকে চোখ সরিয়ে অদিতির দিকে তাকাল, ভ্রু উঁচিয়ে বলল— ‘আরে… আমি কি বলবো? আমার কি লুকিয়ে বিয়ে করার অভিজ্ঞতা আছে নাকি? দিয়েছো এক্সপেরিয়েন্স করতে?’
অদিতি ভ্রু কুচকে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে ওর ফালতু মজা শুনল, পরে মুখটা তেতো করে বলল————-‘সিরিয়াসলি ধ্রুব? এমন একটা পরিস্থিতিতে আপনি এমন মজা করছেন?’
ধ্রুব আবার লেমন জুস চুমুক দিতে দিতে গা–ছাড়া ভঙ্গিতে বাকা হেসে জবাবটা দিল— ‘টু বি অনেস্ট… মজা তো আমার লাগছেই। তোমার এন্টি লাভার বাবার গ্রামে ফাইনালি এমন একটা কেস… ফাটাফাটি একটা ব্যাপার।’
বলে হেসে উঠলো ধ্রুব। অদিতি ভ্রু কুচকে রাগ নিয়ে ধ্রুবর দিকে চেয়ে দেখলো ওই হাসি।পরপর স্নিগ্ধের অগোচরে চোখ রাঙিয়ে বলল————‘বেশি হচ্ছে কিন্তু। ওদের সামনে আমার বাবা…!’
ব্যাস! আবার শুরু হয়েছে তোফাজ্জল হায়াতের ভদ্র কন্যার বাবা নিয়ে প্যানপ্যানানি! ধ্রুব হচ্ছে চালাক স্বামী, আবার বাবা নিয়ে ঝগড়া শুরু করার আগেই ও কথা ঘুরিয়ে ফেললো। তখন দেখা গেল ওদের অর্ডার করা খাবারও চলে এসেছে; তাই না চাইতেই অদিতিকে চুপ হতে হলো, তবুও এইটা চোখ রাঙানি দেওয়া ভুললো না।
ধ্রুবও অদিতির দিকে চেয়ে মাসুম চেহারা বানিয়ে ফিসফিস করে বলল— ‘আরে ভাবো এটা. . ফাইনালি লিট্রেলি ফাইনালি কেউ তো নিয়ম ভাঙল তোমাদের বাড়ির… সো ভাঙতে দাও। তোমার বাবারও বোঝা উচিত এটা ২০২৫! প্রেমের বিয়ে ইজ সো নরমাল নাও এ ডেইজ!’
অদিতি হতাশ চোখে ধ্রুবর দিকে তাকাল। ধ্রুব সেটা দেখে স্যারেন্ডার করে বলল————-‘আচ্ছা, আচ্ছা কুল… আগে খেয়ে নেই? তারপর ভাবছি।’
অদিতি মুখ ঘুরিয়ে নিলো! খাবার খেতে খেতে ধ্রুব আবার স্নিগ্ধের দিকে তাকালো। স্নিগ্ধ তাকিয়েছিল একইসাথে। ধ্রুবর গম্ভীর মুখ দেখে সাথেসাথেই আবার চোখ নামিয়ে নিলো।
ধ্রুব সেই গম্ভীর মুখেই খেতে খেতে প্রশ্ন করল—‘বিয়ের সাক্ষী কে ছিলো তোমাদের?’
স্নিগ্ধ মাথা তুলল— ‘জি?’
‘সাক্ষী কে ছিলো?’ — ধ্রুব সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করল।
স্নিগ্ধ গলা পরিষ্কার করে শুকনো স্বরে জবাব দিল———-‘ভাইয়া–ভাবী… ভাবি মানে কুহু, আমার চাচাতো বোন।’
‘কাব্য?’ — ধ্রুব হয়তো কাব্যের নাম শুনে অবাকই হয়েছে।
স্নিগ্ধ চুপ। ধ্রুব অবাক হয়ে বলল———- ‘ও রাজি হয়েছে এভাবে বিয়েতে? আই মিন এই লুকিয়ে করা বিয়েতে? স্ট্রেঞ্জ!’
স্নিগ্ধ অসহায় হয়ে অদিতির দিকে তাকাল এবার। অদিতি সেটা বুঝে ধ্রুবর কাছে মাথা এনে ফিসফিস করে বলল—‘দেখুন…ধ্রুব এত বড় ভাই সাজার দরকার নেই। স্নিগ্ধ অপ্রস্তুত হচ্ছে কিন্তু।’
ধ্রুব শুনলো না। স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল———-‘দেনমোহর?’
‘উ… দুই লাখ দশ।’ — স্নিগ্ধ চাপা স্বরে বলল।
‘কে দিল? তুমি?’ — ধ্রুব ভ্রু বাঁকালো।
‘আমি অল্প, বাকিটা ভাইয়া।’ — স্নিগ্ধ আবার শুকনো কণ্ঠে জবাব দিল।
ধ্রুব মাথা দোলাল, আবার খেতে মন দিল। স্নিগ্ধ কায়ার দিকে ফিরে চোখের ইশারায় কিছু বলল। কায়া বেচারিও বেকায়দায় পড়েছে। ওর নিজেরও আশ্চর্য লাগছে ধ্রুবর এমন আচরণ দেখে। ফোনকলে তো ভাইয়াকে খুশি দেখাচ্ছিল বিয়ের নিউজে। এখন স্নিগ্ধের সামনে এসে এমন আচরণ করছেন? ধ্রুব ভাই তো এমন নন। উনি আজ এতটা গম্ভীর, রুড দেখাচ্ছেন কেন? কায়া অদিতির দিকে তাকালো, অদিতি কায়ার দিকে চেয়ে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করল।
পরপর ধ্রুবর দিকে মাথা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—‘আবার কি হয়েছে? হুঁ?’
ধ্রুব খেতে খেতে নিচু গলায় স্রেফ অদিতিকে শুনিয়ে কণ্ঠে ‘হায়’ নিয়ে বলল———-‘আ’ম জেলাস! যে কাজ আমি করতে পারলাম না, সেটা এই পুঁচকে ছেলে–মেয়ে করে ফেলেছে। তাই একটু বুকের পাঁঠা মাপছি তোমার বোনের হাসবেন্ডের।’
অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল—‘বাচ্চা আপনি? এখন এমন অযৌক্তিক কথা বলছেন? থামান এগুলো।’
ধ্রুব জবাব দিল না, সেভাবেই স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে বলল———-‘কবে থেকে রিলেশন?’
অদিতির মেজাজ গরম। সে চোখ রাঙিয়ে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এক্ষুনি খেয়ে ফেলবে ওকে। স্নিগ্ধ গলা খাঁকারি দিয়ে জবাব দিল—‘দুই বছর প্লাস।’
‘ইন্টার থেকে? ভেরি গুড?’— ধ্রুব খেতে খেতে চাপা হেসে বলল।
স্নিগ্ধ নিচু কণ্ঠে শুধরে দিল— ‘না ভাইয়া… অনার্স ফার্স্ট ইয়ার থেকে।’
‘হুঁ? কায়া নিশ্চয়ই টেনে পড়তো?’ — ধ্রুব বলতে বলতে কায়ার দিকে তাকাল।
কায়া সাথে সাথে মাথা নামিয়ে নিলো। লজ্জা পেয়েছে বেচারি।
খাবার–দাবার শেষ।
ধ্রুব–অদিতির সাথে স্নিগ্ধ আজ দেখা করেছিল— কিভাবে বিয়েটা সবার সামনে তুলবে। কিন্তু পুরোটা সময় ধ্রুব এতটা গম্ভীর ছিলো যে, স্নিগ্ধর সাহস হয়নি ওসব নিয়ে কথা বলার। দেখা গেল— স্নিগ্ধ মনেমনে কিছুটা আশাহতই হয়েছে। যে কাজের জন্যে এলো, কিছুই হলো না। উল্টো ধ্রুব ভাইয়ার সামনে নিচু হয়ে গেল।
ধ্রুব বিল মিটিয়ে নিলো। স্নিগ্ধ মেটাতে চাইলে ধ্রুব শুনলো না। স্রেফ ওয়ালেট কেড়ে নিয়ে, নিজের ফোন থেকে বিকাশ করে দিল।
সবাই একসাথে বাইরে বেরোবে, ধ্রুব অদিতির দিকে চেয়ে বলল—‘আই নিড টু টক টু স্নিগ্ধ। আমরা যাচ্ছি; তোমরা আসো।’
ধ্রুবর এই এককথাতে স্নিগ্ধ–কায়ার দুজনেরই মুখ একদম শুকিয়ে গেল এইবার। দুজন একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, ওডিওএ অদিতি সেটা লক্ষ করে ধ্রুবর কাছে এগিয়ে এসে বলল—
‘কেন? দেখুন… আমার বোন আর বোনের হাজবেন্ড কিন্তু। সো, বুঝে–শুনে কথা বলুন।’
ধ্রুব শুনল না। আয়েশি ভঙ্গিতে অদিতিকে পাশ কাটিয়ে স্নিগ্ধের ঘাড়ে হাত রাখতেই— বেচারা স্নিগ্ধ একটা ঢোক গিলল। অসহায় হয়ে ধ্রুবর দিকে তাকাতেই; ধ্রুব ওকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল———-‘লিসেন…মেয়েরা গল্প করুক। আমরা এগোই!’
বাইরে এসে ধ্রুব–স্নিগ্ধ একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে দাঁড়ালো। এখানে শেষ বিকেলের নরম রোদ এসে আছড়ে পড়ছে। ধ্রুব-স্নিগ্ধ ছায়া পেয়ে একটা বটতলার নিচে এসে দাঁড়াল। দূর থেকে কায়া–অদিতি এগিয়ে আসছে। অদিতি পাশে দাড়িয়ে বকবক করছে। আর বেচারি কায়ার শুকনো মুখ— নিজের স্বামীরদিকেই তাকানো; কি করছে ধ্রুব ভাই, সেটাই ভয়ার্ত চোখে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। স্নিগ্ধ ওখানে দাঁড়ানো, ওদিকে স্ত্রী কায়ার জানে পানি নেই।
ধ্রুব স্নিগ্ধের দিকে তাকাল, স্নিগ্ধ বারবার কপালের ঘাম মুছছে। ধ্রুব সেসব দেখে টিস্যু এগিয়ে দিতেই, স্নিগ্ধ ফ্যাসফ্যসে গলায় বলল—‘ঠিক আছি ভাইয়া।’
‘ঘাম মুছো।’ — ধ্রুব গম্ভীর স্বরে বলল।
ধ্রুবর এমন একটা গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুনে স্নিগ্ধ সাথেসাথে টিস্যু নিয়ে কপাল–নাকের ঘাম মুছে ফেলল। ধ্রুব ভেতরে ভেতরে চাপা হেসে দেখল। স্নিগ্ধকে এভাবে নার্ভাস ওর ভালোই মজা লাগছে। হয়তোবা ধ্রুবর মধ্যে তোফাজ্জল হায়াতের আচরণ চলে আসছে। কথায় বলে না—
যেন শ্বশুর তেন জামাই। নাক কাটা শ্বশুরের কান কাটা জামাই।
হাসলো ধ্রুব। ধ্রুবর মেয়ে হলে, সেও ওর প্রেমিকের সাথে এমন একটা আচরণ দেখাবে— একটিং তো ভালোই পারে। ধ্রুব ওরফে তোফাজ্জল হায়াৎ! হাসলো ধুব মনেমনে।
পরপর মুখ-চোখ গম্ভীর করে ফেলল, স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে বলল—‘আমাকেই এত ভয়? তোমার ওয়াইফের বাবা কিন্তু খুব একটা সুবিধার না। তাকে কিভাবে ফেস করবে?’
স্নিগ্ধ তাকালো ধ্রুবর দিকে। নিচু কণ্ঠে উত্তর দিলো——‘সাহস জুগিয়ে তবেই সামনে যাব ভাইয়া।’
ধ্রুব এবার স্নিগ্ধের দিকে তাকালো। পরপর দূর থেকে অদিতির দিকে চেয়ে হালকা হাসল। আবারও স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে গম্ভীর-গম্ভীর অভিনয় বাদ দিয়ে মৃদু হেসে বলে গেল——————-‘আমার আর অদিতির কাহিনি জানো? আমার এত প্রতিপত্তি, আমার বাবার এত নাম–ডাক থাকা সত্ত্বেও আমার বিয়ের নাটক সাজানো লেগেছে? কায়া জানে; শুনে নিও ওর থেকে। আর সেখানে তোমরা লুকিয়ে বিয়ে করেছো— ইটস নট অ্যা সিম্পল ম্যাটার ব্যাডি! বুকের পাঁঠা এখন থেকেই তৈরি করো; সামনে অনেক কিছুই ফেস করতে হবে।’
স্নিগ্ধ তাকিয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল চোখে। বেচারা আবার ভয় পাচ্ছে। ধ্রুব স্নিগ্ধের ফ্যাকাশে মুখ দেখে হাসল। স্নিগ্ধ অবাক হয়ে ধ্রুবর হাসি দেখল তখন। ধ্রুব হেসে স্নিগ্ধর কাঁধে চাপড়ে বলল———-‘আর হ্যাঁ. . . আমি রুড না। আই ওয়াজ জাস্ট টেস্টিং ইউ। আমাকে ফেস কতটুকু করতে পারো, সেটা দেখছিলাম। অদিতির বাবা আর কায়ার বাবা কিন্তু ফ্রেন্ড। শর্টলি, দু’দু’টো শ্বশুর তোমার। আমি একটা শ্বশুরই সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি, এক বাচ্চা থাকার পরেও কিছু হলেই এখনো বউ টানাটানি শুরু করে। ওদের সাথে জিততে হলে জেদী হাসবেন্ড হওয়া লাগবে,
লাইক— আমার জিনিস আমার চাই টাইপস না হলে নাহলে টিকতে পারবে না এদের মাঝে। আমাদের ওয়াইফদের ফ্যামিলি ভীষণ জেদী, কড়া।’
স্নিগ্ধ মনোযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছে ধ্রুবর কথা। ধ্রুব এবার সানগ্লাস চোখে লাগাল; স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে বলল——-‘প্ল্যান করে আমি ইনবক্স করে দিচ্ছি তোমাকে। বাসায় যাও এখন। এন্ড ডোন্ট ওয়ারি। আমি–অদিতি, আর অলওয়েজ উইদ ইউ গাইজ!’
একটু থেমে ধ্রুব আবার বললো———‘একচুয়ালি আমি তোমার প্রতি ফার্স্ট থেকেই ভীষণ ইমপ্রেসড ম্যান! যে ট্যাবু আমি ভাঙতে পারিনি, তুমি ভেঙেছ, গ্যাটস তো আছে তোমার। আম রিয়েলি ইম্প্রেসড!’
বলে সানগ্লাস চোখ থেকে নাকের উপর নামিয়ে ধ্রুব চোখ টিপলো। স্নিগ্ধ সাথেসাথেই হেসে উঠল। এগিয়ে এসে সজোরে ধ্রুবকে জড়িয়ে ধরলো। ধ্রুবও হেসে স্নিগ্ধর পিঠে চাপড়ে দিল।
কায়া–অদিতি দুজনেই দূর থেকে অবাক হয়ে দেখছে— এরা কি করছে? এদের দেখে তো মনেই হচ্ছে না— একটু আগে এদের মধ্যে ঝড় বয়ে গেছে। অদিতি কায়ার দিকে তাকাল, তাজ্জব হয়ে জিজ্ঞেস করলো——-‘কিছু বুঝলি?’
কায়া দুপাশে মাথা নাড়াল——‘উহু!’
স্নিগ্ধ ধ্রুবকে ছেড়ে দিয়ে বলল— ‘থ্যাংক ইউ ভাইয়া। আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম টু বি অনেস্ট। বাট আপনি আসলেই অনেক কুল।’
ধ্রুব হাসলো। পরপর একটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় স্নিগ্ধের দিকে ফিরে বলল— ‘আরেকটা কথা. . আই’ম অলসো ফিলিং জেলাস অফ ইউ।’
বলেই ধ্রুব স্নিগ্ধকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল অদিতির দিকে। স্নিগ্ধ পেছনে থেকে হেসে উঠল শব্দ করে।
————————————
পরদিন সকাল ৮:২০, কাব্যদের ফ্ল্যাট!
কুহু শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে। ভার্সিটিতে যাওয়া লাগবে আজ। আজ শেষদিন, তারপর পুজোর বন্ধ দিবে। কুহু বেরিয়ে আসতেই কাব্য ড্রয়ার থেকে একটা খাম এনে কুহুর হাতে ধরিয়ে দিল। কুহু খাম হাতে নিয়ে তাকালো কাব্যের দিকে। কাব্য ওর দৃষ্টি বুঝে জবাব দিল———-‘খুলে দেখ। বাকিটা গোসল করে এসে এক্সপ্লেইন করছি।’
বলে কাব্য বাথরুমে ঢুকে গেল। কুহু ভ্রু কুচকে এবার খামটার দিকে তাকালো। তারপর টাওয়াল একপাশে রেখে খাম খোলা শুরু করল। খাম থেকে বেরিয়ে এলো একটা সুন্দর নোট, আর দুটো বিমানের টিকিট।
কুহু বিমানের টিকেটটা দেখলো, ঢাকা টু সিলেট ফ্লাইট! আজকের রাতের সময় দেখাচ্ছে টিকিটে, রাত ১০টা !
কুহু তখনও কিছুই বুঝেনি। ও সেভাবেই টিকিট রেখে নোট খুলে দেখলো। সেখানে গুটিগুটি অক্ষরে লেখা——
—ভাইয়া ও ভাবি. . .
হানিমুন টিকেট তোমাদের জন্যে!
এনজয় ইউর হানিমুন পিরিয়ড!
From,
Snigdho…
Extra: ভাবি, প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। এটা আম্মুর আইডিয়া, আমার নিজস্ব না। তবে আমি হ্যাপি.. এনজয়!
চলবে
আজকের মধ্যে ৭ হাজার রিয়েক্ট হলে, নেক্সট পর্ব শুক্র-শনিবারেই আসবেই। নাহলে সামনের শনিবার! পেইজের রিচ অনেক কমে গেছে, এইজন্যেই আমি একটু দ্রুত দুইটা এপিসোড দিব। তারজন্যে আপনাদেরও সাহায্য লাগবে একটু। এভাবে বলার জন্যে সরি, এগেইন🥺
ধ্রুব-অদিতি নিয়ে আমার একটা আলাদা গল্প আছে। গল্পের নাম: #আমারপ্রেমিকধ্রুব (বখাটে ধ্রুব-ভীতু অদিতির গল্প)
ডেনিম জ্যাকেটের সামনের কয়েকটা পর্ব ওদেরকে রাখব, কারণ আগের গল্পে ওদের অনেক কাহিনি বলা হয়নি- এসব এই গল্পে বলা হবে।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৮