Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩১


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ #সাবিলা_সাবি
পর্ব: ৩১

মেক্সিকোর কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর ফারহানের লেদার জ্যাকেটের সেই পরিচিত ঘ্রাণ—এই দুয়ের মাঝে লুসিয়া কখন যে ফারহানের পিঠে মাথা রেখে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, তা সে নিজেও জানে না। বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন যখন ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে এসে থামল, তখন রাত প্রায় গভীর মেক্সিকোর অন্ধকার জগত তখনো শান্ত হয়নি।

ফারহান বাইক থামিয়ে লুসিয়ার হাতের বাঁধন আলতো করে ছাড়িয়ে দিল। লুসিয়া তখনো ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করছে। ফারহান কোনো কথা না বলে ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। লিফটের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। লুসিয়ার বিধ্বস্ত চেহারা, মেকআপ মাখা চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জল আর ড্রাগসের প্রভাবে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা ওকে এক অদ্ভুত দহনে পোড়াচ্ছে।

ফ্ল্যাটে ঢুকে ফারহান ওকে সরাসরি মাস্টার বেডরুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। জ্যাকেটের চেইনটা খুলে দিতেই লুসিয়া ধপ করে ফারহানের হাতটা চেপে ধরল। ওর চোখ দুটো আধবোজা, কিন্তু সেখানে এক তীব্র হাহাকার।

লুসিয়া ফিসফিস করে বলল, “আমাকে রেখে চলে যাবে নাতো?”

ফারহান স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল। যে মেয়েটা কিছুক্ষণ আগে নাইট ক্লাবে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিল, সে এখন কতটা অসহায়। ফারহান ওর হাতটা সরাল না, বরং ওর কপালে জমে থাকা ঘামগুলো মুছে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আমি কোথাও যাচ্ছি না লুসিয়া। এখন চুপচাপ ঘুমাও।”

লুসিয়া ওর কথা শুনল না। ড্রাগসের শেষ রেশটুকু তখনো ওর মস্তিষ্কে কামনার বিষ ছড়াচ্ছে। সে ফারহানের শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। ফারহানের ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “তুমি আমাকে ঘৃণা করো… জানি। কিন্তু ওই চুমুটা? ওটা কি কেবল আমাকে থামানোর জন্য ছিল ফারহান? নাকি ওটার পেছনেও কোনো লুকানো সত্যি আছে?”

ফারহান স্তব্ধ হয়ে রইল। উত্তর দেওয়ার মতো ভাষা ওর কাছে নেই। ও শুধু জানে, লুসিয়াকে এই অবস্থায় দেখে ওর হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ফারহান অতি কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে লুসিয়ার ওপর থেকে সরে আসতে চাইল, কিন্তু লুসিয়া ওকে ছাড়ল না।

মেক্সিকোর আকাশ ভেঙে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে। অ্যাপার্টমেন্টের ছোট ফ্ল্যাটটায় এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। বেডরুমে জ্বলছে কেবল একটি আবছা নীল আলো, যা অন্ধকারকে দূর না করে বরং আরও রহস্যময় করে তুলেছে। মেক্সিকান ড্রাগ ডিলারের সেই বিষাক্ত ইনজেকশন লুসিয়ার রক্তে এখন আরো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।বেডে শুয়ে লুসিয়া যন্ত্রণায় ছটফট করছে; কিন্তু সেই যন্ত্রণার আড়ালে এক আদিম, অবাধ্য নেশা তাকে তিলে তিলে গ্রাস করে নিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ফারহান এক গ্লাস জল নিয়ে ওর পাশে বসতেই লুসিয়া এক ঝটকায় ওর শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে আবারও টেনে নিল। লুসিয়ার চোখ দুটো লালচে, কামনার তীব্রতা আর ড্রাগের ঘোরে সে এখন পুরোপুরি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে ফারহানের ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, “ফারহান… অনেক তো দূরে ঠেলে দিলে। আজ এই বৃষ্টিতে আমি সব পুড়ে ছারখার করে দিতে চাই। আমাকে আটকিও না ফারহান, আজ আমাকে নিজের করে নাও…”

ফারহান নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই লুসিয়া আরও মরিয়া হয়ে উঠল। সে ফারহানের গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে শুরু করল। লুসিয়ার সেই তপ্ত ঠোঁট আর কামনার ছোঁয়ায় ফারহানের সারা শরীরে মুহূর্তেই বিদ্যুৎ খেলে গেল। ফারহানের সুপ্ত পুরুষত্বে সজোরে আঘাত হানছে লুসিয়ার এই বন্য আচরণ। লুসিয়া ওর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরে এক গভীর, অন্ধকার নেশায় ডুব দিতে চাইল।

ফারহানের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। ওর নিজের ভেতরেও এক আদিম লড়াই শুরু হয়েছে; শিরায় শিরায় বইছে উত্তেজনার তীব্র স্রোত। এক মুহূর্তের জন্য ফারহান চোখ বুজে ফেলল, ওর হাতগুলো নিজের অজান্তেই লুসিয়ার পিঠের দিকে এগোতে চাইল। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মস্তিষ্কে বিবেকের চাবুক পড়ল। ও জানে, লুসিয়া এখন যা করছে তা ভালোবাসার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং স্রেফ ড্রাগের প্রভাবে সৃষ্ট এক মরীচিকা।

ফারহান লুসিয়ার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ওকে নিজের থেকে সরিয়ে সোফায় চেপে ধরল। ওর চোখে চোখ রেখে শাসনের সুরে বলল, “লুসিয়া, থামো! তোমার শরীরের ওপর এখন তোমার নিয়ন্ত্রণ নেই। ড্রাগের প্রভাবে এই অতিরিক্ত উত্তেজনা তোমার হার্ট সহ্য করতে পারবে না। আর তাছাড়া লুসিয়া… আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি। আমি তোমাকে ভালোবাসি কি ঘৃণা করি সেটা পরের কথা, কিন্তু এই অবস্থায় তোমার অসহায়ত্বের সুযোগ নেব—এতটা নিচু আমি হতে পারব না।”

লুসিয়া তবুও থামছে না। সে বারবার ফারহানকে জড়িয়ে ধরে সেই ঘোরের জগতে ফিরে যেতে চাইছে। উপায়ান্তর না দেখে ফারহান এক ঝটকায় লুসিয়াকে কোলে তুলে নিল। লুসিয়া তখনো ওর শার্টের বোতাম খোলার নিষ্ফল চেষ্টা করছে আর অসংলগ্ন প্রলাপ বকছে। ফারহান ওকে সোজা নিয়ে গেল বাথরুমে। সেখানে থাকা বড় বাথটাবটার ভেতরে লুসিয়াকে বসিয়ে দিয়ে কোনো কথা না বলে শাওয়ারটা পূর্ণ শক্তিতে ছেড়ে দিল।

বরফ শীতল জল লুসিয়ার মাথায় আর শরীরে পড়তেই সে এক মুহূর্তের জন্য স্থাণু হয়ে গেল। ঠান্ডা জলের ঝাপটায় ওর অবশ স্নায়ুগুলো যেন একটু সজাগ হলো, নেশার ঘোরটাও সামান্য ফিকে হয়ে এল। ফারহান এক পলক ওর সিক্ত অবয়বের দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল, “চুপচাপ এখানে বসে থাকো! যতক্ষণ না এই আগুনের নেশা নামছে, ততক্ষণ শাওয়ার থেকে বেরোবে না।”

বাথরুমের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিয়ে ফারহান ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। ওর নিজের বুক তখনো হাপরের মতো ওঠানামা করছে; সারা শরীর ঘামে ভিজে একাকার। সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ওর মস্তিস্কে লুসিয়ার ওই উন্মত্ত স্পর্শগুলো বারবার প্রতিধ্বনি হতে লাগল।

লুসিয়ার নরম ঠোঁট যখন ওর গলায় বিচরণ করছিল, ওর গায়ের সেই মাদকতাময় সুগন্ধ আর শরীরের তীব্র উষ্ণতা—সবকিছু ফারহানের দীর্ঘদিনের অবদমিত কল্পনাকে আগ্নেয়গিরির মতো উস্কে দিচ্ছিল। ও চাইলেও ওই স্মৃতিগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। বারবার কানে বাজছে লুসিয়ার সেই হাহাকার মাখা কণ্ঠ—”আমাকে নিজের করে নাও ফারহান।” নিজের অবচেতন মনের সাথে ফারহানের এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হলো। সে জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার রাতে কাঁচের গায়ে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ ফারহানের অস্থিরতাকে শান্ত করার বদলে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।

ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। ওর মনে পড়ে গেল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। যখন থেকে সে দুনিয়াটা বুঝতে শিখেছে, তখন থেকেই রিকার্দোর ছত্রছায়ায় অন্ধকার জগতের সাথে তার বসবাস। একজন নিরেট গ্যাংস্টার হিসেবে ওর জীবনটা ছিল স্রেফ রক্ত, অবৈধ অস্ত্র, নিখুঁত ডিল আর টাকার নেশায় মগ্ন। দিন-রাত কেবল শত্রু নিধন আর নিজেদের সাম্রাজ্য রক্ষার হিসাব কষতেই তার জীবন পার হয়ে যেত। কোনো নারীকে কাছে পাওয়া, ভালোবাসার কোমল স্পর্শ কিংবা রোমান্সের মায়াবী আবেশ—এই বিষয়গুলো ফারহানের জীবনে কখনোই কোনো স্থান পায়নি। সে বরাবরই ভেবে এসেছে, ভালোবাসা কেবল দুর্বল চিত্তের মানুষদের বিলাসিতা।

সে তো এখানে এসেছিল তার বোন তান্বীকে জাভিয়ানের হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু ভাগ্য তাকে এমন এক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে যেখানে আজ সব সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। এতদিন সে যে রক্তের নেশায় বুঁদ ছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী আর ভয়ংকর নেশা হলো এই প্রেম। লুসিয়ার অবাধ্য স্পর্শগুলো ওর দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা পাথুরে দেয়ালটাকে তাসের ঘরের মতো ধসিয়ে দিচ্ছে। ও এখন আর খুনের নেশা নয়, বরং লুসিয়ার ওই মোহনীয় আকর্ষণের জালে নিঃশর্তভাবে বন্দি হতে চাইছে।

ফারহান নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল, “কেন এমন হচ্ছে? কেন এই মেয়েটার নেশা বন্দুকের গুলির চেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছে?” সে অনুভব করল, ওর ভেতরের সেই কঠোর, রক্তপিপাসু গ্যাংস্টারটি আজ এক চরম পরাজয়ের সম্মুখীন। লুসিয়া কেবল ওর শত্রু জাভিয়ানের বোন নয়; লুসিয়া এখন ওর শিরায় শিরায় বয়ে চলা এক মরণ নেশা, যা তাকে তিল তিল করে ধ্বংস করছে অথবা হয়তো নতুন করে গড়ে তুলছে।

মেক্সিকোর অন্ধকার গলিগুলোর এক কোণে অবস্থিত সেই হাই-সিকিউরিটি জেলের নির্জন সেলে মেইলস্ট্রোমকে রাখা হয়েছে। বাইরে প্রবল বর্ষণের সাথে থেকে থেকে বজ্রপাত হচ্ছে, যার ক্ষণিক আলোয় সেলের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালগুলো বীভৎসভাবে ফুটে উঠছে। থানার সেই অন্ধকার সেলে বসে মেইলস্ট্রোম তখন নিজের নখ দিয়ে সিমেন্টের দেয়ালে আঁকিবুঁকি কাটছে। ইনভেস্টিগেটররা হাজারো জেরা করলেও সে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। সে শুধু অপেক্ষা করছে তার সেই গোপন বার্তার উত্তরের জন্য।মেইলস্ট্রোমের চোখেমুখে কোনো অস্থিরতা নেই, বরং এক গভীর শিকারির ধৈর্য নিয়ে সে অপেক্ষা করছে।

হঠাৎ সেলের বাইরে এক পুলিশ অফিসার এসে দাঁড়াল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপিচুপি একটা নীল খাম স্লাইডিং উইন্ডো দিয়ে ভেতরে চালান করে দিল। মেইলস্ট্রোম দ্রুত মেঝের ওপর পড়ে থাকা খামটি তুলে নিয়ে সে অতি সাবধানে সিলটা ছিঁড়ল। ভেতরে একটি ছোট্ট চিরকুট, যাতে কোনো প্রেরকের নাম নেই, শুধু রক্তবর্ণের কালিতে লেখা একটি সাংকেতিক বার্তা:

“দাবার বোর্ড সাজানো শেষ। লক্ষ্য এখন স্থির। জাভিয়ান যেটাকে তার চূড়ান্ত জয় বলে ভাবছে, সেটা আসলে ওর ধ্বংসের এক নিপুণ নীলকশা। তুমি শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করো।”

চিরকুটের লেখাগুলো পড়ে মেইলস্ট্রোমের ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে জানে, এই বার্তাটি কার কাছ থেকে এসেছে এবং এর গভীরতা কতটা। জাভিয়ান এবং সারা পৃথিবী এটাই জানে যে মেইলস্ট্রোম এখন একা, তার সাম্রাজ্য ধসে পড়েছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকা এই রহস্যময় খেলোয়াড়টি কে, তা এখনো এই গল্পের সবচেয়ে বড় এবং অন্ধকার রহস্য। কেউ হয়তো আন্দাজ করতে চাইছে, কিন্তু এই অদৃশ্য ছায়াটি যে জাভিয়ানের কতটা কাছে লুকিয়ে আছে, তা মেইলস্ট্রোম ছাড়া আর কেউ জানে না।

মেইলস্ট্রোম চিরকুটটি হাতের মুঠোয় পিষে ফেলে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “জাভিয়ান… তুই ভাবছিস আমাকে খাঁচায় বন্দি করে তুই জিতে গিয়েছিস? তুই তো এখনো জানিসই না, আসল খেলাটা শুরুই হয়নি। খুব শীঘ্রই তোর গড়ে তোলা স্বর্গের দুর্গে আগুন জ্বলবে, আর সেই আগুনের খবর বয়ে আনবে আমার এই গোপন সঙ্গী।”

সেলে আবার বজ্রপাতের তীব্র আলো খেলে গেল। মেইলস্ট্রোমের সেই হাসি আর চোখের স্থির দৃষ্টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মেক্সিকোর বুকে জাভিয়ানের জন্য এক মহাপ্রলয় অপেক্ষা করছে।

.
.
.
মেক্সিকোর আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন, প্রায় ভোর হয়ে এসেছে ,এক বিষণ্ণ চাদর শহরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে। হাসপাতালের সাদা দেয়ালঘেরা কেবিনে শুয়ে থাকা তান্বী যখন ধীরে ধীরে চোখ মেলল, ওর কানে এখনো বাজছে সেই মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর ভ্যালেরিয়ার লা/শের পাশে বসে করা নিজের আর্তনাদ। জানালার ওপাশে ধূসর আকাশটা ওকে বারবার সেই রক্তমাখা স্মৃতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

পাশে তাকিয়ে দেখল রায়হান বসে আছে। জাভিয়ান নেই। তান্বী খুব ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, “রায়হান ভাই… জাভিয়ান কোথায়? সে কি আসেনি?”

রায়হান একটু ম্লান হেসে বলল, “স্যার একটু আগেই বেরোলেন ম্যাম। ডক্টরদের সাথে কথা বলছিলেন আর কয়েকটা জরুরি কল আসছিল। আপনি চিন্তা করবেন না, উনি আপনার পাশেই ছিলেন সারারাত।”

তান্বী চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। রায়হান এবার কিছুটা আমতা আমতা করে বলল, “মিস গজদন্তনি, আপনার রিপোর্ট নিয়ে স্যার একটু চিন্তিত। আপনার হিমোগ্লোবিন অনেক কম, আর প্রেশারও খুব লো। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো… আপনার ‘ভ্যাসোভ্যাগাল সিনকোপ’ নামের একটি সমস্যা ধরা পড়েছে।”

তান্বী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “সেটা কী রায়হান ভাই?”
“এটা এমন এক শারীরিক অবস্থা… যখন আপনার স্নায়ুতন্ত্র কোনো তীব্র আবেগ বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে পারে না, তখন রক্তচাপ হঠাৎ করে কমে যায় আর আপনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ডাক্তার বলেছেন, জাভিয়ান স্যারের সান্নিধ্যে আসা বা কোনো তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে আপনার বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটা এই রোগেরই অংশ।”

তান্বী স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মানে কি ওর নিজের শরীরটাই ওর ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? সে কি সারাজীবন এভাবেই দুর্বল হয়ে থাকবে?

বিকেল গড়াতেই বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। ঠিক সেই সময় জাভিয়ান কেবিনে ঢুকল। ওর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে তান্বীর জন্য এক সমুদ্র উদ্বেগ। জাভিয়ানকে দেখা মাত্রই তান্বী যেন আশ্রয়ের খোঁজ পেল; ও জাভিয়ানের হাতটা খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ওর চোখ দুটো জলে ছলছল করছে।

তান্বী খুব অসহায় স্বরে বলল, “জাভিয়ান… আমি আমার বাবা-মাকে দেখতে চাই। আমার বড্ড একা লাগছে এখানে। প্লিজ, আমাকে উনাদের কাছে নিয়ে চলুন।”

জাভিয়ান ওর কপালে লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে বলল, “আমি জানি তান্বী। নিজেকে একটু সামলে নাও, আমি কথা দিচ্ছি—আগে এখান থেকে ডিসচার্জ হয়ে বাসায় ফিরি, তারপর আমি নিজেই তোমাকে তোমার বাবা-মার কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। এখন শরীরের ওপর জেদ করো না, প্লিজ।”

ঠিক সেই সময় ডাক্তার জাভিয়ানকে কেবিনের বাইরে আসার ইশারা করলেন। জাভিয়ান বাইরে আসতেই ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, “মিস্টার জাভিয়ান, ওনার শারীরিক অবস্থা যতটা না খারাপ, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক ওনার মানসিক স্থিতি। কাছের কারো মৃত্যুর স্মৃতি ওনার মস্তিষ্কে গভীর ট্রমা তৈরি করেছে। এই পরিবেশে থাকলে ওনার ‘সিনকোপ’ অ্যাটাক আরও বাড়তে পারে, যা থেকে বড় কোনো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি আছে।”

জাভিয়ান চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে ওর জন্য সেরা চিকিৎসা কী?”

ডাক্তার পরামর্শ দিলেন, “ওকে দ্রুত এই শহর আর এই গুমোট পরিবেশ থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যান। পাহাড় কিংবা সমুদ্রের নির্জনতা ওনার মানসিক প্রশান্তির জন্য এখন ওষুধের চেয়েও বেশি জরুরি। যেখানে উনি পুরোনো স্মৃতি ভুলে নতুন করে বাঁচতে পারবে।”

জাভিয়ান জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে মনে মনে সংকল্প করল, মেইলস্ট্রোমের বাকি কেসগুলো রায়হানের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে তান্বীকে নিয়ে কোনো এক নির্জন হিল স্টেশনে চলে যাবে। যেখানে শুধু শান্ত বাতাস আর ওরা দুজন থাকবে।
.
.
.
মেক্সিকোর অ্যাপার্টমেন্টে বৃষ্টির শব্দ তখনো থামেনি। ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ফারহান ঘড়ির দিকে তাকাল। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু বাথরুম থেকে লুসিয়ার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। শাওয়ারের একটানা পানির শব্দ ড্রয়িংরুম পর্যন্ত ভেসে আসছে, কিন্তু লুসিয়াকে কয়েকবার ডাকার পরও ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসেনি।

ফারহানের মনে কু ডাকল। ড্রাগের রিয়াকশনে কোনো অঘটন ঘটল না তো? ও বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে আবারও জোরে ডাকল, “লুসিয়া! লুসিয়া কথা বলো! তুমি ঠিক আছো তো?”

ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। ফারহান আর দ্বিধা করল না; এক ঝটকায় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে ঢুকতেই ওর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।

বাথটাবটা পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উপচে পড়ছে। শাওয়ারের ঠান্ডা পানি অবিরাম লুসিয়ার শরীরের ওপর পড়ছে। লুসিয়া সেই বরফ শীতল পানিতে ভেজা শরীরে বাথটাবেই মাথা হেলিয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে আছে। ড্রাগের তীব্রতা আর ঠান্ডা পানির ঝাপটায় ওর শরীর নিস্তেজ হয়ে গেছে। ভেজা জামাকাপড় ওর শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, মুখটা ফ্যাকাশে সাদা দেখাচ্ছে।

ফারহান দ্রুত গিয়ে শাওয়ার বন্ধ করল। ওর বুকটা ধক করে উঠল লুসিয়ার এই নিস্পন্দ দেহ দেখে। ফারহান ওকে চাদরে জড়িয়ে সোফায় শুইয়ে দিল।তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে লাগলো।লুসিয়ার এই শান্ত, অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে ফারহানের ভেতরের সেই কঠোর সত্তাটা যেন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। ও ভাবতেও পারেনি, যে মেয়েটা একটু আগে কামনার দাবানলে জ্বলছিল, সে এভাবে নিভে গিয়ে শিশুর মতো ঘুমাবে। ফারহান ওর ভেজা চুলগুলো আলতো করে মুখ থেকে সরিয়ে দিল।

লুসিয়ার ভেজা কাপড়গুলো দ্রুত পাল্টানো দরকার, নাহলে ওর নিউমোনিয়া হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ফারহান থমকে দাঁড়াল। অবচেতন মনে লুসিয়া তাকে যতই আকর্ষণ করুক না কেন, এই অবস্থায় ওর শরীরের সুযোগ নেওয়া বা ওর পোশাক পরিবর্তন করে দেওয়ার সাহস ফারহান সঞ্চয় করতে পারল না। ওর নীতিবোধ আর লুসিয়ার প্রতি এক অদ্ভুত সম্মান ওকে আটকে দিল।

ফারহান দ্রুত ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের কলিংবেল চাপল। দরজা খুললেন মধ্যবয়সী এক নারী, যাকে সবাই এই অ্যাপার্টমেন্টে ‘এলেনা আপু’ বলে চেনে। ফারহান কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল, “আপু, আসলে আমার গার্লফ্রেন্ড… ও একটু বেশি ড্রিঙ্কস করে ফেলেছে। ওর একদম সেন্স নেই। ওর ভেজা ড্রেসগুলো যদি একটু চেঞ্জ করে দিতেন? আমি রুমে থাকতে পারছি না।”

এলেনা আপু কিছুটা কৌতুক মেশানো হাসিতে ফারহানের দিকে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন, “নিজের গার্লফ্রেন্ডের ড্রেস তো তুমি নিজেই পাল্টে দিতে পারো। এখানে লজ্জা পাওয়ার কী আছে? আজকালকার জমানায় তোমরা তো অনেক অ্যাডভান্সড।”

ফারহান স্থির দৃষ্টিতে এলেনা আপুর দিকে তাকাল। ওর কন্ঠস্বরে এক দৃঢ়তা ফুটে উঠল। সে গম্ভীর গলায় বলল, “না আপু। আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি। আর আমি বিয়ের আগে ওর এতটা ক্লোজ হতে চাই না, বিশেষ করে ওর এই অসহায় অবস্থায়। আমি চাই না কাল সকালে জ্ঞান ফেরার পর ও রিগার্ট ফিল করুক। প্লিজ আপু, আমাকে সাহায্য করুন।”

ফারহানের কথা শুনে এলেনা আপুর মুখের হাসি অম্লান হয়ে গেল। তিনি বেশ অবাক হয়ে ফারহানের দিকে তাকালেন। এই এখনকার আধুনিক যুগে এই ছেলেটার ভেতরে যে এত গভীর মূল্যবোধ লুকিয়ে আছে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। তিনি আলতো হেসে বললেন, “ঠিক আছে। তুমি বাইরে দাঁড়াও, আমি দেখছি।”

ফারহান বাইরে করিডোরে গিয়ে দাঁড়াল। মেক্সিকোর রাতের শীতল বাতাস ওর চোখেমুখে লাগছে। সে ভাবছে, কেন সে নিজেকে এত আটকাচ্ছে? কেন লুসিয়ার প্রতি তার এই অদ্ভুত মায়া? রিকার্ডোর সেই নিষ্ঠুর গ্যাংস্টার ফারহান আজ যেন নিজের কাছেই অচেনা হয়ে উঠছে।
.
.
.
.

সকালে মেক্সিকোর আকাশটা ধোয়াটে মেঘে ঢেকে আছে। হাসপাতালের কেবিনে তান্বী তখনো জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে গতরাতের সেই বিভীষিকা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। জাভিয়ান যখন কেবিনে ঢুকল, তান্বী কোনো কথা না বলে জাভিয়ানের হাতটা পরম নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরল। যেন এই একটা স্পর্শই ওকে পৃথিবীর সব ঝড় থেকে আড়াল করতে পারে।

জাভিয়ান রায়হানকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল, “রায়হান, লজিস্টিকস সব রেডি তো? আমি আর এক মুহূর্তও এই গুমোট হাসপাতালে থাকতে চাই না।”

রায়হান ফাইলটা বন্ধ করে মাথা নিচু করে জানাল, “জি স্যার, সব তৈরি। ডিসচার্জ পেপার থেকে শুরু করে সিকিউরিটি—সব সেট। আমি মেক্সিকো সিটির বাইরে একটি নির্জন আর নিরাপদ হিল স্টেশনে কটেজ বুক করে রেখেছি আগামীকালের জন্য। সেখানে মেইলস্ট্রোম কিংবা বাইরের কোনো লোক আপনার নাগাল পাবে না।”

জাভিয়ান তান্বীর দিকে ফিরল। ওর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমরা অনেক দূরে চলে যাবো তান্বী। এমন এক জায়গায়, যেখানে শুধু পাহাড়, মেঘ সমুদ্র আর আমাদের নিজস্ব কিছু মুহূর্ত থাকবে। সেখানে গিয়ে তুমি তোমার সব কষ্ট ভুলে যাবে, আমি তোমাকে সব ভুলিয়ে দেব।”

তান্বী কোনো উত্তর দিল না, শুধু এক চিলতে ম্লান হাসল। সে জানে না এই যাত্রা তাকে সুস্থ করবে নাকি নতুন কোনো ঝড়ের মুখে ঠেলে দেবে। কিন্তু জাভিয়ানের চোখের ওই অতল গভীরতা আর কন্ঠের দৃঢ়তা ওকে এক অদ্ভুত সাহস দিচ্ছিল।

কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে যখন ওরা মেক্সিকোর সেই রাজকীয় ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’-র বিশাল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখন বাড়ির অন্দরমহলে যেন এক নীরব ঝড় বয়ে যাচ্ছে। গাড়ি থামতেই দেখা গেল বারান্দায় জাভিয়ানের বাবা-মা এবং ওর চাচারা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। জাভিয়ান আর তান্বীকে এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় গাড়ি থেকে নামতে দেখে পরিবারের বড়দের মধ্যে চরম উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল।

তান্বী তখনো খুব দুর্বল, ওর পা কাঁপছে। গাড়ি থেকে নামতেই জাভিয়ানের বাবা এগিয়ে এসে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “জাভিয়ান! মেক্সিকো সিটিতে এসব কী শুনছি? মেইলস্ট্রোমের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিলে? আর তান্বীর এই অবস্থা কেন? তোমরা কি বড় কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছিলে?”

চাচাও পাশ থেকে যোগ করলেন, “মেইলস্ট্রোমকে কি সত্যিই পুলিশে দেওয়া হয়েছে? ওর ক্ষমতার উৎসগুলো ধ্বংস করার জন্য কী ব্যবস্থা নিলে? জাভিয়ান, পরিবারের সম্মান আর ব্যবসার ক্ষতি হয় এমন কিছু তো করোনি?”

একদিকে ভ্যালেরিয়ার মৃত্যুশোক, অন্যদিকে তান্বীর এই মৃতপ্রায় অবস্থা—জাভিয়ান এমনিতেই গত কয়েকদিনের স্নায়ুচাপে বিধ্বস্ত। তার ওপর পরিবারের বড়দের এই তদন্তমূলক প্রশ্ন আর মেইলস্ট্রোমের ক্ষমতা নিয়ে দুশ্চিন্তা ওর সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি আর প্রশ্নের বাণে পরিবেশটা অসহ্য হয়ে উঠতেই জাভিয়ান আর কোনো কথা বলার ধৈর্য রাখল না। সে কোনো উত্তর না দিয়ে, সবার সামনেই এক ঝটকায় তানভীকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।

জাভিয়ানের এই দুঃসাহসিক আর আকস্মিক পদক্ষেপে ওর বাবা-মা আর চাচারা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বাড়ির বড়দের সামনে এমন আচরণ অভাবনীয়! জাভিয়ান জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করল: “মেইলস্ট্রোম হোক বা অন্য কিছু—এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সময় বা মানসিকতা এখন আমার হাতে নেই। আগে তান্বীকে সুস্থ হতে হবে। লিভ আস এলন! (আমাদের একা থাকতে দাও!)”

পুরো ড্রয়িংরুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। কারো মুখে আর কোনো কথা সরল না। জাভিয়ান তান্বীকে কোলে নিয়েই বীরদর্পে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলার মাস্টার বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ওর বলিষ্ঠ হাতের বাঁধনে তান্বী নিজেকে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করে চোখ বুজে রইল।

জাভিয়ান জানে, ওকে কাল ভোরেই হিল স্টেশনের কটেজে যেতে হবে। কিন্তু তার আগে অফিসের কিছু জরুরি ফাইল সই করা আর দীর্ঘ সফরের জন্য প্রয়োজনীয় লাগেজ গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আজ রাতটা এই ভিলাতেই কাটাতে হবে। জাভিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় রায়হানকে ইশারা করল সব বড়দের বুঝিয়ে বলতে। কিন্তু জাভিয়ানের মাথায় তখন একটাই চিন্তা—কালকের এই যাত্রা ওদের জীবনকে কোন দিকে নিয়ে যাবে?

জাভিয়ান তান্বীকে অতি সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। তান্বী চোখ বুজে থাকলেও ওর ফ্যাকাশে মুখটা দেখে জাভিয়ানের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে জাভিয়ান রুমের এসিটা ঠিক করে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

দরজার বাইরেই কয়েকজন বিশ্বস্ত সার্ভেন্ট আর তত্ত্বাবধায়ক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। জাভিয়ানের চোখেমুখে তখনো সেই কঠোরতা। সে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল, “শোনো, তান্বীর শরীর মোটেও ভালো না। ওর বিশ্রামে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। একদম ঘড়ি ধরে ওকে পুষ্টিকর খাবার, টাটকা ফল আর ডাক্তার যে মেডিসিনগুলো দিয়েছে সেগুলো খাইয়ে দেবে। কোনো রকম গাফিলতি আমি বরদাস্ত করব না।”

তত্ত্বাবধায়ক মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, “জি স্যার, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা সব সামলে নেব।”

জাভিয়ান তার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল। অফিসে কিছু জরুরি নথিপত্রে সই করা আর কালকের সফরের ফাইনাল অ্যারেঞ্জমেন্টগুলো চেক করা দরকার। সে কোটটা গায়ে চড়িয়ে আবার বলল, “আমি ঘণ্টাখানেকের জন্য অফিসে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে ফোন করবে।”

এরপর জাভিয়ান দ্রুত কদমে ভিলার বাইরে বেরিয়ে গেল। একদিকে তান্বীরর অসুস্থতা আর অন্যদিকে মেইলস্ট্রোমের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ দাবার চাল—জাভিয়ান জানে, শান্তি পেতে হলে তাকে এই মেক্সিকো শহর থেকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যেতেই হবে।

ভিলা থেকে সরাসরি জাভিয়ান তার অফিসে এসে পৌঁছাল। পারফিউম ইন্ডাস্ট্রিতে জাভিয়ানের নাম এক অনন্য উচ্চতায়। আজ জাভিয়ানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন; পারফিউম ওয়ার্ল্ডের একজন মেজর ক্লায়েন্ট মিসে রোজালিন্ড এসেছেন একটি বিশেষ লিমিটেড এডিশন পারফিউম ডিলের জন্য।

কনফারেন্স রুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা। রায়হান প্রজেক্টের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ক্লায়েন্টের সামনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরছে। জাভিয়ান প্রফেশনাল মুখে শুনলেও তার মনের এক কোণে সারাক্ষণ তান্বীর সেই ফ্যাকাশে মুখটা ভাসছে।

মিটিং যখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, ঠিক তখনই জাভিয়ানের ব্যক্তিগত ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠল ‘জিন্নীয়া’।

মুহূর্তের মধ্যে জাভিয়ানের চোখের কঠোর দৃষ্টি বদলে গিয়ে এক অদ্ভুত কোমলতা আর ব্যাকুলতা ফুটে উঠল। একজন প্রফেশনাল বিজনেস টাইকুন হিসেবে মিটিংয়ের মাঝখানে ফোন ধরা তার স্বভাববিরুদ্ধ, বিশেষ করে যখন মিস রোজালিন্ডের মতো বড় ক্লায়েন্ট সামনে বসা। কিন্তু জিন্নীয়া অর্থাৎ তান্বীর ফোন বলে কথা! জাভিয়ান এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না।

মিস রোজালিন্ড একটি বিশেষ ফ্রেগ্রেন্স নোট নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু জাভিয়ান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। গম্ভীর কিন্তু দ্রুত স্বরে জাভিয়ান বলল, “আই অ্যাম রিয়েলি সরি, মিস রোজালিন্ড। একটি অত্যন্ত জরুরি ব্যক্তিগত কল। রায়হান তুমি ডিলটা কন্টিনিউ করো।”

মিটিংয়ের সবাইকে অবাক করে দিয়ে জাভিয়ান দ্রুত কদমে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে একটু আড়ালে চলে গেল। করিডোরের শেষ প্রান্তে গিয়ে কাঁপা হাতে রিসিভ করল ফোনটা।

জাভিয়ানের কণ্ঠস্বরে তখন প্রফেশনালিজমের লেশমাত্র নেই, বরং এক তীব্র মমতা মিশিয়ে সে বলল, “জিন্নীয়া? তুমি ফোন করেছ? শরীর কি এখন একটু ভালো লাগছে? আমি অফিসে এসেছি কয়েকটা সাইন করতে। আমি একদম কথা দিচ্ছি জিন্নীয়া, আর কিছুক্ষণ… আমি কাজ শেষ করেই তোমার কাছে ফিরছি। আমরা কাল সকালেই রওনা হচ্ছি পাহাড়ের দিকে।”

ফোনের ওপাশ থেকে তান্বীর ক্ষীণ স্বর শুনে জাভিয়ানের বুকটা শান্ত হলো। এই একটা নামের মাঝেই জাভিয়ানের সমস্ত আবেগ আর পৃথিবী সীমাবদ্ধ।

কনফারেন্স রুমে ফিরে আসার পর জাভিয়ানের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছিল। জিন্নীয়ার কণ্ঠ শোনার পর তার সব ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে।

রায়হান ততক্ষণে ডিলের ড্রাফট চূড়ান্ত করে ফেলেছে। মেজর ক্লায়েন্ট মিস রোজালিন্ড জাভিয়ানের প্রফেশনালিজম আর পারফিউম সেন্সে মুগ্ধ হয়ে চুক্তিতে সই করলেন।

মিটিং শেষে মিসেস রোজালিন্ড হাসিমুখে জাভিয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “চমৎকার একটা ডিল হলো মিস্টার জাভিয়ান। এই সাকসেসটা সেলিব্রেট করা দরকার। আজ রাতে আমরা সবাই কি একসাথে ডিনার করতে পারি?”

জাভিয়ান ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে বিনীতভাবে হাসল। সে মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল, “অত্যন্ত দুঃখিত মিস রোজালিন্ড, আমি আপনার প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে পারছি না। আমার ওয়াইফ বাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমাকে এখনই ফিরতে হবে।”

রোজালিন্ড কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। কৌতুকের স্বরে বললেন, “তোমার ওয়াইফ? মানে ওই ‘জিন্নীয়া’? মিটিংয়ের মাঝে যার কল পেয়ে তুমি দৌড়ে গেলে?”

জাভিয়ান এক মুহূর্ত চুপ রইল। তারপর সপ্রতিভ গলায় বলল, “ওর নাম তান্বী। তবে আমি ওকে জিন্নীয়া বলে ডাকতেই বেশি ভালোবাসি।”

রোজালিন্ডের কৌতূহল এবার আরও বেড়ে গেল। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন দেখতে তোমার এই জিন্নীয়া? যার জন্য তুমি বিজনেস ডিনারও অনায়াসে রিজেক্ট করতে পারো?”

জাভিয়ানের চোখের দৃষ্টি যেন কোনো এক গহীন নেশায় হারিয়ে গেল। সে কনফারেন্স রুমের জানালার ওপাশে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘোরের মধ্যে বলতে শুরু করল “ওর রূপ? মাথাভর্তি একরাশ রেশমি চুল রূপস্রোতের নদীর মতোই ঠিক যেন রাপুনজেল।ওর হিরন্ময়ী চোখজোড়া যখন লাজে বুজে আসে, মনে হয় বসন্তের হাওয়া বইছে। আর ঠোঁট দুটো? যেন কুঁড়ি মেলা লাজুক কোনো ফুল। কিন্তু সবচেয়ে মিষ্টি ওর মুখের বুলি। গজদন্তনির মুখের বুলি মনে হয় এক মায়াবী ময়না পাখির নন-স্টপ রেডিও বেজেই চলেছে। শুনলে মনে হয় সময়টা ওখানেই থমকে যাক।”

রোজালিন্ড বাকরুদ্ধ হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সায়েম চৌধুরীর এই ছেলের কথা সবসময় শুনেছিলেন অথচ আজ যেনো অন্য কিছুই দেখতে পেলেন, এই পাথুরে হৃদয়ের মানুষটা যে কারও রূপের এত সূক্ষ্ম আর কাব্যিক বর্ণনা দিতে পারে, তা উনার কল্পনার বাইরে ছিল।

উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বললেন, “ওয়াও! জাভিয়ান, আমি তোমার পারফিউমের ফ্যান ছিলাম, আজ তোমার প্রেমের ফ্যান হয়ে গেলাম। সত্যি, মেয়েটা ভীষণ ভাগ্যবতী যে তোমার মতো একজন হাজবেন্ড পেয়েছে।”

জাভিয়ান সলজ্জ হেসে বিদায় নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। ওর মাথায় তখন শুধুই ওর ময়না পাখির মুখটা ঘুরপাক খাচ্ছে।
.
.
.
বিকেল গড়িয়ে তখন পশ্চিম আকাশে সূর্যের আভা ম্লান হয়ে আসছে। লুসিয়া যখন চোখ মেলল, দেখল সে নরম বিছানায় শুয়ে আছে। শরীরটা আগের চেয়ে হালকা লাগছে ঠিকই, কিন্তু কাল রাতের অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো মাথায় আসতেই ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল—ওর গায়ে নিজের সেই পোশাক নেই। একটা সুন্দর মেয়েলি পোশাক ওর শরীরে, যা ওর নিজের নয়।

লুসিয়া অবাক হয়ে ভাবল, “এই ড্রেসটা কার? ফারহান কি তবে…” ওর ভাবনার মাঝেই ফারহান রুমে ঢুকল। হাতে এক গ্লাস পানি আর কিছু ওষুধ। লুসিয়াকে তাকানো অবস্থায় দেখে ফারহান শান্ত গলায় বলল, “জেগেছ? এলেনা আপুর ড্রেস ওটা।পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। কাল রাতে তোমার ড্রেস ভিজে গিয়েছিল, তাই ওনাকে ডেকেছিলাম পাল্টে দেওয়ার জন্য।”

ফারহানের কথা শুনে লুসিয়া মনে মনে স্বস্তি পেলেও কাল রাতের কথা মনে পড়তেই লজ্জায় ওর কান-ঝাঁঝাঁ করতে লাগল। ড্রাগের ঘোরে সে ফারহানের কতটা কাছে চলে গিয়েছিল, কীভাবে ওর শার্ট আঁকড়ে ধরেছিল—সবই এখন আবছা মনে পড়ছে। লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল লুসিয়া।

ফারহান একটা চেয়ার টেনে বসে জিজ্ঞেস করল, “এখন কি সুস্থ বোধ করছ? তোমার কি বাড়িতে ফেরার অবস্থা আছে?”

লুসিয়া সোজা হয়ে বসল। মনের ভেতরে একটা খচখচানি ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সে সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাড়ি যাব। কিন্তু তার আগে একটা কথা… তুমি কাল রাতে আমাকে কিস কেন করেছিলে? আর তুমি ওই ক্লাবে কেন গিয়েছিলে? আমাকে ফলো করছিলে?”

ফারহান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওর চোখে এক পলক অস্থিরতা দেখা দিলেও সেটা সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “এসব অবান্তর কথা ছাড়ো লুসিয়া। ওটা পরিস্থিতির দাবি ছিল তোমাকে শান্ত করার জন্য। আর ক্লাবে কেন গিয়েছিলাম সেটা এখন জরুরি নয়। জরুরি হলো—কাল আমার বাংলাদেশের ফ্লাইট। আমি ফিরে যাচ্ছি।”

বাংলাদেশ! নামটা শুনেই লুসিয়ার হার্টবিট যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে জানে তান্বী এখন বাংলাদেশে নেই, সে এখানেই মেক্সিকোতে। অথচ ফারহান ভাবছে তান্বী হয়তো দেশেই আছে। লুসিয়া অনেকবার চাইল সত্যিটা বলতে, কিন্তু ওর জিভ যেন আড়ষ্ট হয়ে এল। যদি এখন সত্যিটা বলে আর ফারহান যদি ওকে ভুল বোঝে? যদি ভাবে লুসিয়াও এই নোংরা খেলার অংশ?

লুসিয়া ধীরপায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ফারহানের চোখে চোখ রেখে সে কিছুটা সময় নিশ্চুপ রইল। তারপর এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “ফারহান, তুমি যেহেতু চলেই যাচ্ছো, তবে যাওয়ার আগে এই একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও—তোমার কি আমার প্রতি কোনো ফিলিংস নেই? বিন্দুমাত্র মায়াও কি কাজ করে না আমার জন্য?”

ফারহান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুধু বলল, “জানি না।”

এই শীতল উত্তর লুসিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে নিজেকে শক্ত করে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, “ঠিক আছে! তাহলে শুনে রাখো ফারহান, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি আমার পুরনো লাইফে ফিরে যাব। আর এবার আমি আগের চেয়েও বেশি জঘন্য হবো। আগে তো শুধু ড্রিঙ্কস আর ডান্স করতাম, কোনো লোকের সাথে রুমে যেতাম না। কিন্তু এখন থেকে আমি ঠিক সেটাই করবো। প্রতি রাতে নতুন নতুন মানুষের শয্যাসঙ্গিনী হবো আমি!”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফারহানের ভেতর যেন দাবানল জ্বলে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সে হিংস্র বাঘের মতো লুসিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লুসিয়ার গলা চেপে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল ফারহান। ওর দুচোখ দিয়ে তখন যেন আগুন ঝরছে।

দাঁতে দাঁত চেপে ফারহান হুংকার দিয়ে বলল, “খবরদার লুসিয়া! নিজের মুখে আর একবারও এই নোংরা কথা আনবে না। অন্য কারো সাথে রুমে যাওয়া তো দূর, আজ থেকে যদি কোনোদিন তোমায় কোনো ক্লাবের আশেপাশেও দেখি, তবে কসম খোদার, আমি একদম জানে মেরে ফেলবো তোমাকে! এটা মাথায় রেখো!”

লুসিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু ফারহানের এই রুদ্রমূর্তি আর দখলীপনা দেখে ওর ঠোঁটে একটা বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, ফারহানের ওই ‘জানি না’ শব্দের আড়ালে কতটা গভীর ভালোবাসা আর অধিকারবোধ লুকিয়ে আছে।

ফারহান যখন বুঝতে পারল সে লুসিয়াকে ব্যথা দিচ্ছে, তখন ঝট করে হাত সরিয়ে নিল। ওর বুকটা তখনো দ্রুত ওঠানামা করছে।

ফারহান গলা ছেড়ে দেওয়ার পর লুসিয়া অনেকক্ষণ কাশল। ওর গলাটা লাল হয়ে গেছে, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত জেদ। লুসিয়া কাশতে কাশতেই ফুপিয়ে উঠে বলল, “তুমি আসলে কী চাও বলো তো ফারহান? জেলাস হচ্ছো আবার নিজের মনের কথা এড়িয়ে যাচ্ছো। আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো আবার অন্য কেউ কাছে আসবে শুনলে পাগল হয়ে যাচ্ছো। এভাবে আমাকে ঝুলিয়ে রাখার মানে কী?”

ফারহান এবার আর নিজেকে সামলালো না। এক পা এগিয়ে লুসিয়ার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ওদের নিঃশ্বাস একে অপরের গায়ে লাগছে। ফারহান গভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী চাও লুসিয়া?”

লুসিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমাকে চাই!”

ফারহান একটা তেতো হাসি হাসল। “আমাকে? আমার লাইফ সম্বন্ধে জানো তুমি? আমার অতীত, আমার বর্তমান—সবটা কি নিতে পারবে?”

“আই ডোন্ট কেয়ার ফারহান! আমি শুধু তোমাক চিনি,” লুসিয়ার কণ্ঠে দৃঢ়তা।

ফারহান এবার লুসিয়ার কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় কথাগুলো বলতে শুরু করল, “শোনো লুসিয়া, আবেগ আর বাস্তব এক নয়। তুমি যদি আমাকে চাও, তবে তোমাকে আমার সাথে আমার দেশে গিয়ে থাকতে হবে। সেখানে এই মেক্সিকোর মতো লাক্সারিয়াস লাইফ নেই। আমার বাড়িতে এসি নেই, সেখানে মেক্সিকান খাবার চলবে না—তোমাকে খেতে হবে ডাল-ভাত। তোমার জন্য দামি গাড়ি থাকবে না, রোদে পুড়ে বাসে চড়তে হবে। পারবে এই জাঁকজমক ছেড়ে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন কাটাতে?”

লুসিয়া আবারও বলল, “আমি বললাম তো, আই ডোন্ট কেয়ার!”

ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মুখে বলা সহজ লুসিয়া, কিন্তু করাটা অনেক কঠিন। আমি চাইলেই তোমাকে লাক্সারিয়াস লাইফ দিতে পারি, কিন্তু ওসব পাপের টাকায় আমি আমার কাছের মানুষদের অন্তত রাখতে পারব না। এই কদিন এই অন্ধকার জগতে থেকে আমি একটা জিনিস বুঝেছি—পাপ মানুষকে সাময়িক সুখ দিলেও ভেতরে ভেতরে ধ্বংস করে দেয়। ওসব কালো টাকায় কোনো শান্তি নেই। যে শান্তিটা ছিল আমার ছোট্ট বিলাসিতাহীন পরিবারে, আমার সেই ছোট্ট বাড়ি ‘রেহেমান প্রিয়াঙ্গনে’।”

ফারহানের কণ্ঠে দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টারের বদলে এক ঘরমুখো ছেলের আর্তি ফুটে উঠল। লুসিয়া দেখল, ফারহানের দুচোখে ওর ফেলে আসা মা-বাবার জন্য এক গভীর হাহাকার।

ফারহানের কথাগুলো শুনে লুসিয়ার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না; এক পা এগিয়ে শক্ত করে ফারহানকে জড়িয়ে ধরল। ফারহানের বুকের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। লুসিয়া ওর বুকে মুখ লুকিয়ে রুদ্ধ স্বরে বলল, “তুমি তো চলেই যাবে ফারহান। কিন্তু যাওয়ার আগে অন্তত আমাকে এখানে একটু শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে যাও। শুধু একবার নিজের মুখে বলো যে, তোমার আমার প্রতি ফিলিংস আছে। এই একটা কথা সম্বল করেই আমি আমার বাকি জীবন পার করে দেব।”

ফারহান নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লুসিয়া আবার বলল, “তুমি ভাত-ডালের কথা বলছ? আমি সব শিখে নেব ফারহান। মেক্সিকোর এই জাঁকজমক, এই আভিজাত্য—কিছুই আমার লাগবে না। শুধু তোমার ওই ‘রেহেমান প্রিয়াঙ্গনে’র এক কোণে আমাকে একটু জায়গা দিও। আমি বাসে চড়ব, রোদে পুড়ব, তাও তোমার সাথে থাকতে চাই।”

লুসিয়ার আকুতি শুনে ফারহানের কঠিন হৃদয়টা এবার সত্যিই গলে গেল। সে লুসিয়াকে নিজের থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে ওর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরল। ফারহান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “আমি কথা দিচ্ছি লুসিয়া, আমি ফিরে আসব। কিন্তু তার আগে আমাকে আমার বাড়িতে ফিরতে হবে। তোমাকে যদি আমার সেই জীবনে নিয়ে যেতে হয়, তবে আগে আমাকে সেই পথটা পরিষ্কার করতে হবে। সব গুছিয়ে নিয়ে আমি ঠিক ফিরে আসব তোমাকে নিতে। আর তখনই না হয় আমার সব জমানো কথা তোমাকে বলব।”

লুসিয়া ছলছল চোখে মাথা নাড়ল। ফারহান এবার একটু গম্ভীর হয়ে আঙুল উঁচিয়ে সতর্ক করে বলল, “তবে শোনো, আমি এখানে না থাকা অবস্থায় তুমি মদ, সিগারেট—এসব ছূঁয়েও দেখবে না। একদম পরিষ্কার কথা, এসব থেকে দূরে থাকবে।”

লুসিয়া ঠোঁট উল্টে আদুরে গলায় বলল, “আচ্ছা বাবা, খাবো না। কিন্তু যদি তোমাকে অনেক বেশি মিস করি? তখন তো মনটা খুব খারাপ হয়ে যাবে, তখন কি একটুও ড্রিঙ্কস করতে পারব না?”

ফারহানের কপাল কুঁচকে গেল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তার মানে তুমি আবার ক্লাবে যাবে?”

লুসিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, “উফ ফারহান! না, আমি ক্লাবে যাব না। আমি মার্তার (বান্ধবী) বাড়িতে গিয়ে একটু ড্রিঙ্কস করব যদি তোমাকে খুব বেশি মনে পড়ে।”

ফারহান এবার আরও কঠোর হয়ে গেল। সে লুসিয়ার হাতটা আলতো চেপে ধরে বলল, “নো! একদম না! আমাকে মিস করলেও তুমি ওসব ছোঁবে না। মনে রেখো লুসিয়া, তুমি যদি ওসব করো, তবে আমি আর ফিরে আসব না। আর তুমি মেক্সিকোর কোথায় কী করছ, কার সাথে মিশছ—সবই কিন্তু আমি ওখান থেকে জানতে পারব। আমার চোখ সব জায়গায় আছে, তাই কোনো লুকোচুরি করার চেষ্টা করো না।”

ফারহানের এই শাসনের আড়ালে থাকা গভীর ভালোবাসাটা লুসিয়া অনুভব করতে পারল। সে মুচকি হেসে ফারহানের বুকে মাথা রাখল। সে জানে, এই মানুষটার শাসনের মধ্যেই তার জীবনের সবটুকু নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।

চলবে………

আমার দুটো ইবুকের ওপর ৪০ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট চলছে তাই এখনই অফার লুফে নিন আজকে পর্যন্ত অফার থাকবে। আযদাহা আর অ্যাথানাসিয়া ৪০ পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে কিনতে পারবেন।

নোট: আমি গল্প নিয়মিত দিতে চাই কিন্তু আপনারা সেই পথ রাখেন না। কয়েক পর্বে ৩.২ কে রিয়েক্ট পর্যন্ত আছে সেখানে ৩কে হয়না যাক ২.৮কে রিয়েক্ট হলেই এখন থেকে গল্প দিয়ে দিবো তাই ২.৮কে করবেন অন্তত আর প্লিজ নাইস অসাধারণ একদম মন্তব্য করবেন না গঠনমূলক কমেন্টে পোস্টের এনগেজমেন্টটা বাড়ে।গল্প রিচেক করিনি কোথাও ভুল থাকলে কমেন্টে জানিয়ে দিবেন।❤️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply