ডাকপ্রিয়র চিঠি
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
০১
ব্যাপারটা পারিবারিক সংঘাত থেকে প্রথমে তর্ক, তারপর হাতাহাতিতে চলে যায়। জনাকীর্ণ রাস্তায় এক যুবককে হকিস্টিক দিয়ে পেটাচ্ছে সৈয়দ বংশের বড় ছেলে মারিদ আলতাফ। তাকে থামানো দায়। ততক্ষণে আশেপাশে মানুষের ভিড় জমে গেছে। সবাই যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে নীরব দর্শক। কেউ আগ বাড়িয়ে ঝামেলা মেটাতে চাইছে না, কারণ প্রহারকারী নিজেই এ এলাকার কমিশনারের ভাতিজা। টাকা-পয়সা ও ক্ষমতার দিক দিয়ে সৈয়দ বংশের নাম সকলের জানা। তাই পুলিশ কেসের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসল না। শুধু দাঁড়িয়ে সকলে তামাশা দেখছে। তবে আহত যুবককে বাঁচাতে গিয়ে তার দুজন সঙ্গী—একজন ছেলে মেয়েও—ততক্ষণে মারিদ আলতাফের হাতে আহত হয়েছে। যদিও লাঠিয়াল মারিদ মেয়েটিকে আঘাত করতে চায়নি, কিন্তু হকিস্টিকের এলোমেলো আঘাত থেকে মেয়েটির শরীরও বাদ পড়েনি। রক্তে ভিজে একাকার হয়ে আছে কিশোরীর সাদা কলেজ ড্রেসটি। এরপরও নিজের বড় ভাইকে বাঁচাতে বারবার মারিদের হকিস্টিকের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল মেয়েটি। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য পরিস্থিতিতে মারিদের প্রাণঘাতী প্রহারে শিকার হতেই আহত তনিমা আর্তনাদ করে রাস্তায় ছিটকে পড়ল। এর মাঝে হঠাৎই ভিড় ঠেলে কোথা থেকে হাজির হলো রিফাত। অস্থির, উত্তেজিত ভঙ্গিতে তৎক্ষণাৎ দু’হাতে মারিদকে জাপটে জড়িয়ে বাধা দিল। আতঙ্কিত গলায় বলল,
” মারিদ, প্লিজ থাম। কী করছিস তুই? তোর জন্য একটা মেয়ে আঘাত পেয়েছে। তুই…
হিংস্র মারিদ গর্জে উঠে রিফাতকে ছিটকে ফেলার মতো গায়ের জোরে ধাক্কা মেরে ফের তেড়ে গেল রক্তাক্ত ছেলেটির দিকে। দু’হাতে হকিস্টিক তুলে প্রহার করতে উদ্যত হলে আহত তনিমা রাস্তা থেকে উঠে ফের দু’হাতে মারিদের পা জাপটে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে আর্তনাদে বলল,
“দয়া করে আমার ভাইকে আর মারবেন না। আমি আপনার পায়ে পড়ছি। প্লিজ আমার ভাইদেরকে ছেড়ে দিন। দয়া করুন। জান ভিক্ষা দিন।
তনিমার কান্নায় আবারও রিফাত এগিয়ে আসল। অশান্ত মারিদকে বাধা দিতে পথ আটকে দাঁড়াল। হিংস্র মারিদ পায়ে পড়া তনিমাকে দেখল কি দেখল না, তা জানা নেই। তবে রাগের দহনে তনিমাকে পায়ে ঠেলে পুনরায় প্রহার করতে চাইলে রিফাত জাপটে জরিয়ে ধস্তাধস্তি করে মারিদকে নিয়ে পিছিয়ে যেতে রাগে হুংকার ছাড়ল মারিদ। গর্জে উঠে বলল,
” ছাড় আমারে! হারামির বাচ্চার সাহস কীভাবে হয় আমার পরিবারের লোকেদের গায়ে হাত তোলার? আজ ওর হাত কেটে আমি বাড়ি নিয়ে যাব। দেখব, ওর কোন বাপ আমারে আটকায়।
হিংস্র মারিদ হকিস্টিক চেপে রিফাতসহ তেড়ে গেল রক্তাক্ত রাফিনকে আবারও মারতে। শক্তিবলে মারিদের চেয়ে কম ওজনের রিফাত আজ বেশ শক্তি দেখাল। গায়ের বল খাটিয়ে বেশ জোর করে মারিদকে নিয়ে ঠেলে দু-কদম পিছিয়ে গেল সে। মারিদকে সাবধান করে বলল,
‘ মারিদ, জেদ করিস না। শান্ত হ! আমি পুলিশকে ফোন করেছি, ওরা ব্যাপারটা দেখবে। তুই আমার সাথে চল। তোর জন্য একটা মেয়ে আঘাত পেয়েছে। ব্যাপারটা খুবই নিন্দনীয়। প্লিজ চল। মানুষ দেখছে।
মারিদের হিংস্র দৃষ্টি রাস্তায় গোঙানো রক্তাক্ত রাফিনের উপর পড়তেই রাগে শরীর রক্ত টগবগিয়ে উঠল তাঁর। মারিদের গায়ের কালো শার্টটা ঘামে আর রক্তে ভিজে পিঠে লেপ্টে গেছে। বলিষ্ঠ দেহে কিছু আঘাতের চিহ্ন মারিদের শরীরেও পরেছে। পরপর দুটো ছেলেকে একই হকিস্টিকে পেটানো সহজ ব্যাপার নয়। পাল্টা আঘাত অপর পক্ষ থেকেও ছিল। কিন্তু অপর পক্ষের আঘাতের চেয়ে মারিদের প্রহারের তাড়না তেজপূর্ণ হওয়ায় ছেলেগুলোর কেউ মারিদকে সামলে উঠতে পারেনি। অবস্থা বেগতিক দেখে এর মাঝে বেশ কয়েকবার তনিমা বাধা দিতে গিয়ে মারিদের প্রহারের শিকার সে-ও হয়। রিফাত মারিদকে ঠেলে ভিড় থেকে বের হতে কানে এল মেয়েলি কণ্ঠের ঝরঝর কান্নার গুঞ্জন। তনিমা আশেপাশের মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে আহাজারি করে বলছে,
“দয়া করে আপনারা কেউ আমাকে সাহায্য করুন। আমার ভাইদের হাসপাতালে নিতে হবে। নয়তো ওরা মরে যাবে। প্লিজ আপনারা এইভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে কেউ এগিয়ে আসুন, আমাকে সাহায্য করুন। আমার ভাইদের হাসপাতালে নিতে হবে।
অস্থির উত্তেজিত তনিমা কথাগুলো বলতে বলতে হাঁটু গেঁড়ে রক্তাক্ত রাফিনের সামনে বসতে বসতে রাফিনকে ডাকল…
“ভাই? এই ভাই? শুনছো আমাকে? রাফিন ভাই, চোখ খোলো। এই দেখো আমি তনিমা। ভাই? এই ভাই?
আহত তনিমার কান্নায় তখনো কেউ এগিয়ে আসল না। বরং ভিড়ের থেকে কেউ একজন খেঁক করে বলে উঠল,
“শোনো মাইয়া, তোমার ভাইদের এহানে যে সাহায্য করব, সে এহন পুলিশের কেসের ঝামেলায় পরব। কিছুক্ষণ আগেই তোমার ভাইটা সৈয়দ বংশের বয়স্ক সৈয়দ শাখের গায়ে হাত তুলছে। এহন তোমার ভাইরেও হের নাতি আইসা মাইরা গেছে। এর মাঝে আমরা যাঁরা তোমারে সাহায্য করমু সেই-ই পুলিশের মামলায় পড়মু। সৈয়দ বংশের বিরুদ্ধে এইখানে কেউ যাইব না। তার থেইক্কা বরং আমরা তোমারে একখান গাড়ি ঠিক কইরা দিই, তুমি নিজেই তোমার ভাইদের হাসপাতালে লইয়া যাও।
অসহায় তনিমা দুর্বল চিত্তে রাস্তায় বসে রক্তাক্ত রাফিনের মাথাটা কোলে নিল। গায়ের ওড়নাটা রাফিনের কপালে চেপে রক্ত পড়া বন্ধ করতে চেয়ে আশেপাশে তাকাল। পাশেই নিজের বন্ধু পলাশ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। ভাই এবং বন্ধু, দুটো ছেলেকে একা তনিমার পক্ষে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তনিমার নিজের অবস্থাই ভালো নেই। বারবার আঘাতে ওর শরীরও নিস্তেজ হয়ে এসেছে। কম্পিত শরীর ভেঙে দুর্বলতায় নেতিয়ে যাচ্ছে বারবার। কপাল ফেটে বেশ রক্ত ঝরেছে, যার দরুন তনিমাও জ্ঞান হারাবে বলে মনে হচ্ছে। অসহায় তনিমা কান্নাকাটি করতে করতে চারপাশে ঘোলাটে দেখল। অসময়ের বিপদে কে ওদের হাসপাতালে নিয়ে যাবে, সেই ভাবনার মাঝে সে-ও রাস্তায় ঢলে পড়ল জ্ঞান হারিয়ে। তনিমার ঝরঝর কান্নায় রিফাতের খুব মায়া হলো। মন খুব করে চাইল অসহায় তনিমাকে সাহায্য করতে, তারপরও রিফাত এগিয়ে গেল না। সে নিরুপায়। তার হাতে কিছু নেই। বরং রিফাত সাহায্য করতে চাইলে অবস্থা হিতে বিপরীত যেতে পারে ভেবে নিজেকে দমন করল। রাগান্বিত মারিদ হাতের হকিস্টিক ফেলে গাড়িতে উঠে বসলে রিফাত দৌড়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। দক্ষ হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি টানল এয়ারপোর্টের রাস্তায়। অথচ পিছনে ফেলে গেল দুজন অচেতন যুবকের সঙ্গে একাকী তনিমাকে। অচেতন তনিমাকে কে রাস্তা থেকে উঠাবে, কে জানে? তবে এর মাঝে শোনা গেল মারিদের ক্ষিপ্ত সুর। রিফাতকে শক্ত চোয়ালে আদেশ করে বলল,
‘ রিফাত, গাড়ি ঘোরা! বাড়ি চল।
মারিদের অযাচিত কথায় হতভম্ব হয়ে তৎক্ষণাৎ রিফাত বলল,
‘ বাড়ি মানে? তোর না একটু পর ফ্লাইট আছে? এয়ারপোর্টে যাবি না?
‘ না যাব না! তুই গাড়ি ঘোরা, আমি বাড়ি যাব রাইট নাও।
অবাক রিফাত গাড়ি টানল সৈয়দ ম্যানশনের দিকে। অথচ আজ মারিদের দুবাই ফ্লাইট ছিল ব্যবসায়িক কাজে। দাদা সৈয়দ শাখকে কেউ আঘাত করেছে, সেটা শুনে এয়ারপোর্ট থেকে ছুটে এসেছে রাফিনকে মারতে। হলো তাই, বেদম পেটাল রাফিনকে। কিন্তু এখন নিজের ফ্লাইট ছেড়ে পুনরায় কেন বাড়ি ফিরে যেতে চাইছে মারিদ সেটা বুঝল না রিফাত। রিফাত মারিদের ফুফাতো ভাই। পাশাপাশি মারিদের বন্ধু। মারিদ পড়াশোনার পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসায় জড়িয়েছে সেই কিশোর বয়সে। আজ সৈয়দ বংশের ব্যবসার পাশাপাশি মারিদের নিজেরও একটা নাম আছে ব্যবসার খাতে। সৈয়দ বংশের লোকেরা ব্যবসার জন্য অত্র এলাকায় বেশ পরিচিত। বলা যায়, সৈয়দ বংশের লোকদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো এ এলাকায় কেউ নেই, বিধায় আজ জনসম্মুখে সহজে রাফিনকে পেটাতে পেরেছে মারিদ আলতাফ। রিফাত গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মারিদের দিকে। এর মাঝে সৈয়দ বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থামতেই সেখান থেকে লাফিয়ে বের হলো মারিদ। মারিদের আকাশ সমান রাগটা তার চেহারায় স্পষ্ট। রাস্তায় মারামারি করেও যে মারিদের ক্ষোভ কমেনি, সেটা বুঝতে পেরে রিফাত তাড়াহুড়ো করে সিট বেল্ট খুলতে খুলতে হাঁক ছেড়ে ডাকল মারিদের গমন পথে। উত্তেজিত গলায় বলল,
‘ মারিদ, বাড়িতে ঝামেলা করিস না। তোর কমিশনার চাচা কিন্তু বাড়িতে আছে।
কে শোনে রিফাতের কথা? এর মাঝে মারিদকে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেখে পিছন পিছন দৌড়ল রিফাত। ঘরে প্রবেশ করতে করতে যা ঘটার ততক্ষণে ঘটিয়ে ফেলেছে রাগান্বিত মারিদ। সামনে কলেজ পড়ুয়া সুফিয়া গাল চেপে ঝরঝর করে কাঁদছে নত মস্তিষ্কে। মারিদের দাবাং হাতের থাপ্পড় যে সুফিয়ার গালে পড়েছে, সেটা ততক্ষণে রিফাতের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আতঙ্কিত রিফাতকে আরও আতঙ্কিত করে সেখানে উপস্থিত হলো সৈয়দ পরিবারের দুই গিন্নি। সালমা সৈয়দ, মারিদের মা, আর ফাতেমা সৈয়দ, সুফিয়ার মা। দুজনই রান্নাঘরে ছিলেন দুপুরের রান্নার আয়োজনে। সুফিয়ার চিৎকারে ছুটে আসল তারা সেখান থেকে। সুফিয়াকে গালে হাত দিয়ে কাঁদতে দেখে তিনি সুফিয়াকে বুকে জড়িয়ে নিতে নিতে আহাজারি করে মারিদের উদ্দেশ্যে বললেন,
‘ তুই কী করলি এইটা মারিদ? ওকে মারলি কেন? কী করেছে ও?
মারিদ হাতের মুঠোয় চিঠির খামটি পিষে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ এই বেয়াদবের বাচ্চাকে আগে জিজ্ঞাসা করো ও কী করেছে।
‘ যাই করুক, তাই বলে বোনের গায়ে হাত তুলবি? তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি আমি?
মারিদের হাতের মুঠোয় চিঠির খামটি নজরে আসতে সেদিকে তাকাল রিফাত। রাগান্বিত মারিদকে সামলাতে গিয়ে এতক্ষণ সে এই চিঠিটা লক্ষ্য করেনি। বুদ্ধিমান রিফাত চট করে বুঝে গেল, মারিদ শুধু ওর দাদাভাইয়ের গায়ে হাত তোলার কারণে এত জেদ নিয়ে রাফিনকে মারেনি। এর পাশাপাশি আরও একটা কারণ অবশ্যই আছে। হয়তো এই চিঠিটা তার কারণ হবে। মায়ের কথার উত্তরে মারিদ কিছু বলবে, তার আগেই ফাতেমা সৈয়দ মারিদের পক্ষ নিয়ে বললেন,
‘ মারিদের কোনো দোষ নেই আপা। ছেলেটা এমনিতেই কোনো কিছু করে না। নিশ্চয়ই ও কোনো অঘটন ঘটিয়েছে, সেজন্য ছেলেটা এত ক্ষেপেছে। তু…
‘ মারিদ, তুমি বাড়িতে কী করছ? আজ না তোমার ফ্লাইট ছিল?
কারো গম্ভীর গলায় সকলে খানিকটা আতঙ্কিত হয়ে গেলেও মারিদ শক্ত চোয়ালে সুফিয়ার দিকে তখনো তাকিয়ে। রিফাত সুফিয়ার বাবা সৈয়দ রবিউল শাখকে দেখে ব্যাপারটা শান্ত করার জন্য তাড়াহুড়ো করে বলল,
‘ নানাভাইকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে ও আজ ফ্লাইট মিস করেছে মামা।
রিফাতের ছোট কথায় তখনই বাড়িতে আতঙ্ক ছেয়ে গেল সবার মাঝে। সুফিয়াকে ভুলে সবাই আহাজারি করে উঠল বয়স্ক সৈয়দ শাখকে নিয়ে। মারিদের মা সালমা সৈয়দ সুফিয়াকে ছেড়ে আহাজারি করে বললেন,
‘ কী হয়েছে বাবার? উনি হাসপাতালে কেন রিফাত?
মামিদেরকে অস্থির উত্তেজিত হতে দেখে রিফাত খানিকটা থতমত খেয়ে বসল। পাশে দাঁড়ানো কমিশনার মামার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পরখ করে আমতা আমতা করে সত্যিটা লুকিয়ে রিফাত বলল,
‘ আসলে তেমন কিছু হয়নি মামি। ড্রাইভারের অসাবধানতায় ছোট একটা এক্সিডেন্ট করেছে নানাভাই। আপনারা উত্তেজি…
রিফাতের কথা শেষ করার আগেই সালমা সৈয়দ ফের আতঙ্কিত ভঙ্গিতে বললেন,
‘ তুমি কী বলছ এসব রিফাত? বাবা এক্সিডেন্ট করেছে আর তুমি বলছ কিছু হয়নি? এই ফাতেমা? শান্তাকে খবর দে, বল, বাড়িতে আসতে। বাবা এক্সিডেন্ট করেছে। আমাদের এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে। আয়! আয়! তাড়াতাড়ি আয়। আল্লাহ জানে বাবা কোন হালতে আছে।
ফাতেমা সৈয়দ সম্মতি দিয়ে তৎক্ষণাৎ বললেন,
“জ্বি ভাবি, আমি এক্ষুনি বড় আপাকে ফোন করে জানাচ্ছি।
সালমা সৈয়দ যেতে যেতে অপরাধী সুফিয়াকে টেনে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলে রিফাত সেদিকে তাকাল। শান্তা রিফাতের মায়ের নাম। এই বাড়ির বড় মেয়ে। রিফাতের মায়ের নাম শান্তা হলেও স্বভাবে মোটেও তিনি শান্ত নয়। এবার কতটা অশান্ত, সেটা সামনেই বোঝা যাবে।
“থানা থেকে কল এসেছিল আমার কাছে, বলেছে তুমি নাকি কাদের মেরেছ, ব্যাপারটা কি সত্যি মারিদ?
মামার কথা কানে যেতে চট করে তাকাল রিফাত। পাশাপাশি মারিদ দাঁড়িয়ে। রাফিনের কথা স্বরণে আসতে ফের হাতের চিঠিটা মুঠোয় পিষল মারিদ। রিফাত মারিদের রাগের আভাস পেয়ে চট করে কমিশনার মামার কথার উত্তরে বলল,
“হ্যাঁ মামা, সত্যি।
“কেন মেরেছে?
রিফাত সত্যিটা বলে বলল,
” সামান্য রোড ক্রসিং নিয়ে ওরা রাস্তায় নানাভাইয়ের গায়ে হাত তুলেছিল, সেজন্য মারিদ ওদের মেরেছে। এই ব্যাপারে আমি থানায় ফোন করে জানিয়েছিলাম যেন বিষয়টা আপনার হাতে থাকে।
গম্ভীর রবিউল শাখ হঠাৎ রেগে গেলেন। উনার বাবার গায়ে হাত তোলা মানে বিষয়টা ব্যক্তিগত হয়ে যাওয়া। এই কেস উনি ব্যক্তিগতভাবেই দেখবেন। অত্র এলাকায় কার এত সাহস যে, উনার বাবাকে আঘাত করে, সেটা এবার উনিও দেখবেন। সৈয়দ পরিবারের বয়স্ক মানুষ উনার বাবা সৈয়দ শাখ। সমাজে একজন সম্মানিত মানুষ। উনার বাবার গায়ে হাত তোলা মানে উনাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হয়েছে তাতে। রাগান্বিত রবিউল শাখ গম্ভীর গলায় রিফাতকে আদেশ করে বললেন,
“তোমরা যাও। ব্যাপারটা আমি দেখছি।
“জ্বি মামা।
রিফাত রবিউল শাখকে সম্মতি দিতেই দেখল মারিদ ততক্ষণে জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। মারিদের পিছন পিছন রিফাতও মারিদের ঘরে পৌঁছে দেখল, মারিদ গায়ের শার্ট টেনে খুলে ফ্লোরে ফেলে দিচ্ছে। মারিদের পিঠে বেশ কিছু আঘাতের চিহ্ন দেখেও রিফাত আপাতত মারিদকে আঘাত নিয়ে প্রশ্ন করল না। বরং সে জানে মারিদ এসব আঘাত কিছুক্ষণ আগে মারামারি করতে গিয়ে পেয়েছে। তাই কৌতূহলী রিফাত মারিদের হাতের চিঠির খোঁজ করে বলল,
“তোর হাতে চিঠিটা কার ছিল? সুফিয়ার?
“নাহ!
“তাহলে সুফিয়াকে মারলি কেন?
“মন চেয়েছে তাই।
” মন চাইলেই মারবি? এমন নষ্ট মন কেন তোর?
মারিদ ফার্স্ট এইড বক্স খুলতে খুলতে বিরক্ত স্বরে বলল,
“যাবি তুই?
” না গেলে কী করবি? আমাকে তোর ঘরে রেখে দিবি?
মারিদ তেতো কণ্ঠে বলল,
” তোর কাজ-কাম নাই? বাড়ি যাহ।
” ভাই তুই শান্তি দিলি তো কাজ-কাম করব। তোর জন্য যত প্যারায় থাকি এতো প্যারা গার্লফ্রেন্ডও দেয়না। ভাই জীবনটা বেদনার তোর জন্য। চেম্বার, রোগী সব ফেলে এসেছি তোর খবর পেয়ে। এবার ভদ্রলোকের মতো মুখ খুলে বল, সুফিয়াকে কেন মারলি? রাফিনের ব্যাপারটা না-হয় বুঝলাম, কিন্তু সুফিয়া কী করল? আর তোর হাতের চিঠিটা কার সুফিয়ার?
রিফাতের পরপর প্রশ্নে মারিদকে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে দেখে রিফাত বুঝল মারিদ তার কথার উত্তর দেবে না। তবে মারিদ যে তখন ব্যক্তিগত কারণে সুফিয়াকে থাপ্পড় মেরেছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। রিফাত এগিয়ে এসে মারিদের মুখোমুখি হতে হতে প্রসঙ্গ পাল্টে ফের বলল,
“আচ্ছা বাদ দে! উত্তর দিস না। এখন বল তুই আজ দুবাই না গিয়ে ফ্লাইট মিস করলি কেন? কোন দুঃখে?
রিফাত প্রসঙ্গ পাল্টাতে মারিদও উত্তর দিতে দিতে বলল…
“মন চাইছে তাই যাইনি।
“ভাই তোর মন ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতোন। মেয়ে মানুষ এর থেকেও বেশি মুড সুইং করে তোর মন। আমি তোর মনের বিশাল বড়ো ফ্যান বুঝলি? এখন সুন্দর মনে বলো তো, সোনা, তুমি এখন কই যাইবা? হসপিটালে নাকি ফ্যাক্টরিতে?
বিরক্তিতে মারিদ তুলোয় অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে লাগাতে ছোট উত্তরে বলল,
“ফ্যাক্টরিতে।
“তাহলে নানাভাইকে দেখতে হসপিটালে যাবি না?
“যাব, সন্ধ্যায়।
মারিদ খালি গায়ে আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ রিফাতের সঙ্গে কথা চালিয়ে বুকে আঘাতে তুলোয় অ্যান্টিসেপটিক চেপে চেপে লাগাচ্ছিল। বুকের কাছটা শেষ হতে মারিদ হাত বাঁকিয়ে পিঠে লাগাতে চেয়ে রিফাতের কথার উত্তর করল। রিফাত মারিদের অসুবিধাটুকু বুঝে হাত বাড়িয়ে মারিদ থেকে অ্যান্টিসেপটিকের শিশিটি নিতে চেয়ে বলল,
“আমাকে দে, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।
মারিদ বাধা দিয়ে বলল,
“আমি পারব, তুই যা। সন্ধ্যায় হসপিটালে থাকিস।
মারিদের কথার অপেক্ষা করে রিফাত মারিদের হাত থেকে জোরপূর্বক অ্যান্টিসেপটিকের শিশিটি হাতে তুলে নিল। তুলোয় চেপে দক্ষ হাতে মারিদের পিঠের আঘাতের স্থানে ওয়াশ করতে করতে বলল,
” আমার হসপিটালের তুই আমাকে অলওয়েজ পাবি। রোগীর সেবা করা আমার ধর্ম। কিন্তু তোর জন্য আমার ধর্ম আর নীতি দুটোই নড়বড় হয়। রোগী ফেলে চেম্বার থেকে দৌড়ে এসেছি তোর খবর পেয়ে। অথচ এখানে এসেও তোর মর্জিই খুঁজে পাইনা। জীবনে গার্লফ্রেন্ড পটাতে এত খাটুনি হয়নি যতটা তোর পিছনে যায়। ভাই এর থেকে তুই মেয়ে হলে আমি বিয়ে করে সব টেনশন আমার ঘরে রেখে দিতাম। তোর মেয়ে না হওয়ার আফসোস আমার এ জন্মেও মিটবে না।
~
দুপুর ২:৪৫। অসময়ে মারিদ আবারও অবেলায় বাড়ি থেকে বের হলো পরিপাটি হয়ে। গায়ে আকাশি রঙের শার্ট জড়িয়ে সাদা প্যান্টের সঙ্গে। ফর্সা গায়ে, চোখে রোদ চশমা লাগিয়ে বাড়ির গ্যারেজ থেকে পছন্দের একটি বাইক বের করতে করতে পকেটে থাকা ফোনটি বেজে উঠল ততক্ষণে। মারিদ তাড়াহুড়ো করে ফোন বের করল না। বরং পা তুলে বাইকে চড়ে বসতে বসতে বাইকের চাবি ঠেকাল গাড়িতে। বাইক স্টার্ট না করে পকেট থেকে দামি আইফোনটি হাতে নিতে স্ক্রিনে ভাসল অপরিচিত একটা নাম্বার। এই নাম্বারটি মারিদ চেনে না। কখনো কথা হয়নি এই নাম্বার থেকে তার। তবে আজ বেশ কয়েকদিন ধরে সময়ে-অসময়ে এই নাম্বার থেকে কল আসে মারিদের। মারিদ কলটি একবার রিসিভ করেছিল, কিন্তু অপরপাশ থেকে কারও কথা শোনা যায়নি বলে দ্বিতীয়বার কখনো মারিদ এই কলদাতার কলটি সে রিসিভ করেনি। মারিদ একজন দক্ষ ব্যবসায়ী মানুষ। তার ব্যবসায়িক কাজে অনেক কলই আসে। কিন্তু পার্সোনাল ফোনে পরিবারের লোক ছাড়া তাকে কল করার মতোন কেউ নেই বলে সে এতদিন অপরিচিত নাম্বারটা ব্লক করে দেয়নি, পরিচিত কেউ হতে পারে ভেবে। মারিদ কল রিসিভ করে কানে তুলতেই বলল,
“হ্যালো?
“আসসালামু আলাইকুম।
মেয়েলি কণ্ঠে কেউ রিনরিনে সালাম দিতে মারিদের কপাল কুঁচকে আসল। সালামের উত্তর দিয়ে সে বলল,
“ওয়ালাইকুম সালাম। কে?
“আমি।
“আমি কে?
অপর পাশের মেয়েটি খানিকক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল। হয়তো পরবর্তী কথা গোছাচ্ছিল মনে মনে। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে মেয়েটি ফের রিনরিনিয়ে বলল,
“আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি…
মেয়েটিকে বলতে না দিয়ে মারিদ বিরক্তিতে তৎক্ষণাৎ বলল,
“আমি আপনাকে না চিনলে আপনি আমাকে কল দিয়েছেন কেন? কী চাই?
অপর পাশের মেয়েটি মিহি স্বরে বলল,
“আমি আপনাকে চিনি, তাই ফোন দিয়েছি। কথা বলব।
মেয়েটির কথায় মারিদের মনে হলো এই মেয়েটি তার পরিচিত কেউ হবে। এবং সে জেনে-বুঝে মারিদের সঙ্গে রং নাম্বারে কথা বলতে চাইছে, হয়তো মজা করতে নয়তো প্রেম করতে। কিন্তু মারিদ এসবে ইন্টারেস্টেড নয়। বিরক্তির মারিদ কল কাটতে চেয়ে বলল,
“নট ইন্টারেস্টেড, মিস। বাই।
তৎক্ষণাৎ শোনা গেল মেয়েটির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। মারিদকে অনুরোধ করে বলল,
“প্লিজ, কল কাটবেন না। অনেক সাহস নিয়ে আপনাকে ফোন দিয়েছি। আজ আমার মন ভালো নেই।
মারিদের বিরক্তি বাড়ে। কেমন উটকো ঝামেলায় পড়ল সে। কে তার সাথে এমন খামখেয়ালির মজা করতে পারে, সেটা চিহ্নিত করতে চেয়ে মারিদও মেয়েটির সঙ্গে কথা চালালো। কথায় কথায় মারিদ বলল,
“আপনার মন ভালো নেই এই ব্যাপারে আমি কী করব মিস? আপনার মন ভালো করার দায়িত্ব কি আমার?
ফোনের মেয়েটি সহজ সরল আবদার করে বলল,
“কথা যখন আপনার সাথে বলছি, তখন দায়িত্বটা কিন্তু আপনারই হওয়ার কথা তাই না?
“সবেমাত্র কথা হলো কয়েক সেকেন্ড, এর মাঝে দায়িত্ব তুলে দিচ্ছেন? এত ফাস্ট?
“দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছেন মনে হয়?
মেয়েটির পাল্টা প্রশ্নে মারিদ দায়সারা উত্তরে বলল,
“আমি নিজেই দায়িত্বহীন মানুষ, আমাকে দায়িত্ব দিয়ে লাভ নেই মিস। কাজ হবে না।
“তাহলে আমি আপনার দায়িত্ব নেব। হবেন আমার?
মেয়েটির কথায় মারিদ বাইকের লুকিং গ্লাসে তাকাল। নিজের সিল্কি চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“আমার দায়িত্ব নিবেন আপনি? ইন্টারেস্টিং! জানেন, আমি আপনার বাজেটের বাইরে হতে পারি। তখন সামলাতে পারবেন আমাকে?
“পারব।
“ইন্টারেস্টিং! তা কী দায়িত্ব নিবেন? ব্যক্তির মনের নাকি ব্যক্তির নিজের? কোনটা?
“দুটোই।
“লাইন মারছেন?
“উহুম! কথা বলতে চাচ্ছি।
“আপনি যেই হোন না কেন মিস। আমাকে দিয়ে মনে হয় না আপনার বিশেষ কোনো কাজ হবে। নিজের মূল্যবান সময় আমার পিছনে নষ্ট না করে অন্য কাউকে খুঁজুন, কাজে দেবে। বাই।
টুট টুট করে কল কেটে দিয়ে মারিদ বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোনটি প্যান্টের পকেটে গুঁজে লুকিং গ্লাসে নিজের প্রতিচ্ছবিটা এক পলক দেখে বাইক টানল ফ্যাক্টরির দিকে। আপাতত তাঁর হাতে অনেক কাজ। ব্যবসায়িক মানুষ হয়ে ফালতু সময় নষ্ট করার মতো সময় তাঁর নেই। মেয়েলি প্রেম-টেম তাঁকে দিয়ে হবে না। জীবনের তিরিশটা বছর হতে চলল, তাঁর জীবন এখনো বসন্তের দেখা পায়নি; এই বয়সে এসে এখন সে এসব ফ্যাসাদে জড়াবে না। সময় হলে পরিবারের পছন্দ একটা বিয়ে করে নিবে। তারপর জীবনটা এমনি এমনি কেটে যাবে। তারপরও এসব ফালতু বিষয়ে সময় নষ্ট করার মানুষ সে নয়। সবাইকে দিয়ে সবকিছু হয়না। তার ধারণা এই প্রেমটাও তাঁকে দিয়ে ইহজীবনে আর সম্ভব নয়। অথচ মারিদের বাইকের গতির সঙ্গে তার ভাবনা জুড়ে রইয়ে গেল ফোনালাপের মেয়েটি।
চলিত….
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২