জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৭৩
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
রান্নাঘরে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকেই জুই থমকে দাঁড়াল। ছোট্ট রান্নাঘরটি আজ কেমন যেন শ্রীহীন আর অগোছালো ঠেকছে জুইয়ের কাছে। জিতু ভাইয়া মানুষটা বড় শৌখিন আর গোছালো। অপরিচ্ছন্নতা কিংবা এলোমেলো পরিবেশ দেখলেই তিনি বিরক্ত হন, তাই নিজের সব জিনিস সব সময় তকতকে করে গুছিয়ে রাখাই তাঁর স্বভাব। জুইয়ের ভেতরে খুব খারাপ লাগছে। একটা গোছালো মানুষের ঠিক কতটুকু শরীর খারাপ হলে এভাবে চোখের সামনে সব অগোছালো থাকে! জুই দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে পুরো রান্নাঘরে দৃষ্টি বুলাতে লাগল। জুই বুঝতে পারছে না এখন কি রান্না করবে! এমন কিছু রান্না করবে যাতে দ্রুত হয়ে যায়। জুই আর ভাবলো না। এত ভাবতে গেলে সময় অপচয় হবে। সে দ্রুত চাল ধুতে লাগল।
–“জুই তোমার কি হেল্প লাগবে আমাকে বল?”
ইতির কন্ঠ শুনে জুই পিছনে তাকাল। এই মূহুর্তে যদি ইতি তাকে কিছুটা হেল্প করতে পারে তাহলে বোধহয় রান্নার কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। জুই খানিকটা ভেবে বলল,
–“ইতি তুমি গ্যাসে চার-পাঁচটি বড় বড় দেখে আলু সেদ্ধ বসাও তো।”
রান্নার কাজে শরিক হওয়ার সুযোগ পেয়ে ইতির বিষণ্ণ মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে চটপট বড় বড় পাঁচটি আলু হাতে তুলে নিল। কিন্তু এখন কি করবে? প্রশ্নটি মাথায় আসতেই ইতির মনে হলো, সে তো কোনোদিন রান্না করেনি। এখন কি হবে! ভাবতেই ইতির চেহারা অন্ধকার হয়ে আসল। জুই রাইস কুকারে ভাত বসাতে বসাতে ইতির দিকে তাকাতেই দেখে মেয়েটা দু’হাতে আলু নিয়ে ভাবনায় ডুবে আছে। জুই সহাস্যে বলে উঠলো,
–“ঐ যে, ঐ পাতিলে একটু পানি নিয়ে আলুগুলো দিয়ে দাও।”
জুইয়ের কথা শুনে ইতির দেহে যেন প্রাণ এলো। সে জুইয়ের কথা অনুযায়ী পাতিলে আলুগুলো সমেত খানিকটা পানি নিয়ে গ্যাসের চুলায় বসিয়ে দিল। এইটুকু করেই ইতির চেহারায় ফুটে উঠলো বিশ্বজয় করা হাসির রেখা। একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো ইতির সেই কোমল ঠোঁটের হাসি। জুই ভাত বসিয়ে ঝটপট ডাল নিয়েছে রান্না করার জন্য। যখন পিছনে ঘুরে গ্যাসের চুলার দিকে তাকালো তক্ষুনি যেন একশো চল্লিশ ভোল্টেজ কারেন্টের ছ্যাকা খেল। কারণ ইতি গ্যাসের চুলাই অন করেনি, শুধু পাতিল বসিয়ে রেখেছে। জুই যেন কথা বলার বাক শক্তি হারিয়ে ফেলল খনিকের জন্য। সে ইতিকে দেখতে দেখতে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে দিয়ে আবার ইতিকে দেখতে দেখতে ডাল রান্না করতে চলে গেল। জুইয়ের এহেন দৃষ্টিতে ইতি লজ্জায় লজ্জাবতী লতার মতো গুটিয়ে গেল।
আলু সেদ্ধ হতে হতেই ডাল সেদ্ধ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে জুই পেঁয়াজ, রসুনসহ যাবতীয় সব কাটা-বাছা শেষ করে ফেলেছে। এবার ডালে বাগার দেবে। জুই দক্ষ হাতে খুব সতর্কতার সাথে গরম তেলে পেঁয়াজ-রসুন দিতেই ছ্যাঁত ছ্যাঁত করে শব্দ উঠল। মনে হলো যেন তেল ছিটকে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে ইতি “ও আল্লাহ গো!” বলে এক চিৎকার দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় উঁকি দিয়ে দাঁড়াল। জুই তক্ষুনি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল, ইতি রান্নাঘরের বাইরে দরজায় উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জুই চোখ পিটপিট করে এক মুহূর্ত ইতির দিকে তাকিয়ে থেকে আবার কাজে মন দিল। মেয়েটার এমন ছেলেমানুষি দেখে জুই বড্ড অবাক হলো। সে ইতিকে যতটা বোকা আর ভীতু ভাবত, ইতি তার চেয়েও বেশি।
রান্নাঘরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখে ইতি পুনরায় রান্নাঘরে ঢুকলো। জুই ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসি সংবরণ করে বলল,
–“তোমার ভয় লাগলে রুমে গিয়ে বসে থাকতে পার।”
জুইয়ের কথার পিছে ইতি দু’হাতে বারণ করতে করতে বলল,,
–“আরে না না না। আমি তোমার সাথে কাজ করব। বল আর কি করতে হবে।”
–“আমার ডাল হয়ে গেছে প্রায়। তুমি একটা কাজ কর, গ্যাস থেকে আলু নামিয়ে খোসা ছাড়িয়ে ফেলতো।”
–“আচ্ছা।”
নতুন আরেকটি কাজ পেয়ে খুশিতে নেচে উঠল ইতির শিশুসুলভ মন। সে উত্তেজনায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সরাসরি গরম পাতিলটি হাত দিয়ে তুলে নিল। মূহুর্তেই গরম পাতিলের তাপে হাত যেন পুড়ে যায় অবস্থা। যার ফলে হাত ফস্কে পাতিল ইতির পায়ের উপর পড়তেই গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
–“আআআআ।“
জুই তখন ডালে ভাজা তেল-মসলার বাগার দিয়ে নাড়ছিল। হঠাৎ ইতির চিৎকার শুনে জুঁইয়ের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ইতির দিকে তাকাতেই তার চোখ চড়কগাছ! গরম পানির ছোঁয়ায় ইতির ফর্সা ছোট্ট পা দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে গেছে।
এদিকে চিৎকার শুনে অসুস্থ শরীর নিয়েই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল জিতু ভাইয়া। রান্নাঘরে ইতির এই দশা দেখে তার মস্তিষ্ক রাগে দাউদাউ করে উঠল। কিন্তু পরিস্থিতি সামলাতে নিজের রাগকে সংবরণ করে দ্রুত ইতিকে কোলে তুলে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। ইতিকে সোজা ওয়াশরুমে নিয়ে এসে একটি বড় লাল বালতির ওপর দাঁড় করাল। ইতি যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। পেছন থেকে জুই ছুটে এসে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে উঠল,
–“কই দেখি কতটুকু লেগেছে?”
জুই আরেক পা এগোতে নিলেই কড়া চোখে জুইয়ের দিকে তাকাল জিতু ভাইয়া। চোয়াল শক্ত করে ধমকের স্বরে বলল,
–“যে কাজ নিজে পারিস না সে কাজ অন্যকে দিতে তোকে কে বলেছিল?”
বড় ভাইয়ের ধমকে কেঁপে উঠলো জুই। সে একমাত্র ভয় পায় বলতে জিতু ভাইয়াকেই। আবার জিতু ভাইয়াই সবচেয়ে বেশি আদর করে। তাই হঠাৎ ধমকে ভেতরে ভেতরে কেঁদে উঠল জুই। হাত পা কাঁপছে মেয়েটার। জিতু ভাইয়া চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে গলা খাদে নামিয়ে নরম করে বলল,
–“এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে মলম খুঁজে আন।”
বিনা বাক্যে কাঁদতে কাঁদতে জুই মলম আনতে চলে গেল। এদিকে জুইকে দেওয়া ধমকে ইতিও ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। ভীতু হরিণীর মতো হাত-পা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। জিতু ভাইয়া ইতির চেহারার দিকে না তাকিয়েই ইতির চিকন কাঁপা কাঁপা পা দুটো দেখেই বুঝে গেল। তাই আর ইতির দিকে তাকালো না। বরং খানিকটা নিজেকে শান্ত আর নরম করে বালতি থেকে ইতিকে নামিয়ে মগ দিয়ে পোড়া স্থানে ঠান্ডা পানি ডালতে লাগল। কয়েক মূহুর্ত পর নরম কন্ঠে শুধালো,
–“খুব জ্বালা করছে?”
অপর পক্ষ থেকে কোনো রা নেই। ইতি এখনো ভয়ে মাথা নিচু করে নিজের ক্ষতস্থানের জ্বালা সইতে না পেরে গুমরে গুমরে কাঁদছে। জিতু ভাইয়া উত্তর না পেয়ে চোখ তুলে ইতির ছোট কোমল চেহারার দিকে দৃষ্টিপাত করল। মেয়েটার চোখ দুটো জলে টইটম্বুর হয়ে আছে। বেশ ভয় পেয়েছে। জিতু ভাইয়া আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অতঃপর ইতিকে কোলে তুলে রুমে এনে বিছানায় বসায়। তারপর নিজেও মেঝেতে এক হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ে। জুই মলম এগিয়ে দিয়ে একপাশে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জিতু ভাইয়া জুইকে বলল রান্নাঘর দেখতে। জুই বিনা বাক্যে রান্নাঘরে চলে যায়। জিতু ভাইয়া ইতির পায়ের পুড়ে যাওয়া ক্ষতগুলোতে আলতো হাতে মলম লাগিয়ে দিতেই জ্বালা করায় ইতি মৃদু আর্তনাদ করে উঠল। জিতু ভাইয়ার হাত থমকে যায়। সে সামান্য চোখ তুলে একটিবার মেয়েটার লাল হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে পুনরায় দৃষ্টি নত করে ইতির পায়ে মলম লাগাতে লাগাতে কঠিন কণ্ঠে বলল,
–“কে বলেছিল রান্নাঘরে যেতে?”
ইতি নাক টেনে কান্না আড়াল করে প্রতিত্তোর করল, “কেউ না।”
–“তাহলে কেন গিয়েছিলে? তুমি কি জানো না, সব কাজ সবার জন্য নয়!”
এবার উত্তর করল না ইতি। জিতু ভাইয়ার কানে আসল ইতির চাপা কান্নার আওয়াজ। তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না তার। বরং নিজের বাহ্যিক কাঠিন্য স্বভাব ধরে রেখেই বলে উঠলো,
–“একটা কথা তোমাকে আমার আগে বলা উচিত ছিল। যাইহোক আজ বলছি, আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে। আর বারবার আমাকে মেসেজ করাও বন্ধ দিবে। আমি এসব পছন্দ করি না।”
উচ্চ স্বরে কান্নার আওয়াজে চোখ তুলে ইতির দিকে তাকাল জিতু ভাইয়া। ইতিকে সুক্ষ্ম চোখে পরখ করে বলল,
–“কি সমস্যা! এমন করে কান্না করছ কেন?”
ইতি বাচ্চাদের মতো আরও জুড়ে কান্না আরম্ভ করল। জিতু ভাইয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল আরও। তিনি কিছু বলতে যাবে তার আগেই হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে ইতি বলে উঠলো,
–“আআপনি এমন করছেন কেন? আআগে তো এমন করেন নি! আমাকে কখনো বকেননি!”
জিতু ভাইয়া মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুজে শান্ত কন্ঠে বলল,
–“কারণ তুমি পরের মেয়ে। বাট এখন মনে হচ্ছে শক্তভাবে না বললে তুমি শুনবে না।”
–“আআমি কি করেছি?”
–“সে তো তুমিই ভালো জানো!”
ইতি মাথা নিচু করে নিল। খুব কান্না আসছে তার। হঠাৎ জিতু ভাইয়ের এমন আচরণ কিছুতেই মানতে পারছেনা। জিতু ভাইয়া কথা না ঘুরিয়ে এবার সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করে উঠলো,
–“তুমি কি আমায় কোনোভাবে লাইক কর?
কান্না করা অবস্থায় জিতু ভাইয়ার এহেন প্রশ্নে জমে গেল ইতির শরীর। কেমন যেন তার দেহ অসার হয়ে আসছে। ছোট দেহে মৃদু শিহরণ বয়ে গেল। ইতির উত্তর না পেয়ে জিতু ভাইয়ার চোখ দুটো ছোট হয়ে আসল। তিনি পুনরায় বলে উঠলো,
–“কাউকে কেউ পছন্দ করলে বলার সৎ সাহস থাকতে হয়। নাহলে না এগোনোই ভালো…”
–“আআমি পছন্দ করি।”
জিতু ভাইয়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলো ইতি। জিতু ভাইয়া ইতির দিকে স্বাভাবিক নয়নে চেয়ে ফের শুধালো,
–“কাকে?”
–“আআপনাকে।”
জিতু ভাইয়া একটু চুপ থেকে দম ফেলল৷ অতঃপর বলে উঠলো, “কিন্তু আমি এসব পছন্দ করি না। প্রেম ভালোবাসায় আমার বিশ্বাস নেই।”
জিতু ভাইয়ার হঠাৎ এ ধরনের কথা শুনে ইতির কিশোরী মনে দহন শুরু হলো। সে ফুপিয়ে কেঁদে বলে উঠলো, “কেন করেন না? আমি আপনাকে সত্যি ভালোবাসি।”
জিতু ভাইয়া শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো, “বিয়ের আগে এমন প্রেম ভালোবাসা নিছক ফান ছাড়া আর কিছু না।”
–“তাহলে আমি আপনাকে বিয়ে করব।”
ইতি তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তর করল। ইতির কথায় জিতু ভাইয়া হালকা হাসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
–“ভেবে বলছ তো? পরে আবার আফসোস করও না। কারণ তোমার পরিবারের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক নেই। বিশেষ করে তোমার বাবার সাথে।”
এই কথাগুলো ইতির কেমন যেন ঠেকল! সে চোখ তুলে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতো শুধালো,
–“মানে?”
–“তোমার বাবা একজন রাজনীতিবিদ। তার চেয়েও বড় কথা তিনি অনেক বড় একজন অপরাধী। আর অপরাধীদের সাথে আইনের লোকদের কখনো ভালো সম্পর্ক হয় না”
–“কিহ্!”
ইতির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। এমন কথা সে তার বাবার সম্পর্কে কখনো শুনে নি। তার বাবা অপরাধী কি করে হতে পারে! তাকে তো কত আদর করে। আবার সবসময় ভালো কাজ করতে বলে। তাহলে! ইতির মনে অনেক ভাবনা এসে হানা দিল। জিতু ভাইয়া দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
–“তুমি তোমার বাবার একমাত্র রাজকন্যা। কোটি কোটি টাকার উপর বেড়ে উঠেছ। আর আমি সাধারণ, আমার পরিবারও সাধারণ। তবে এইটুকু বলতে পারি, আমার কালো টাকার পাহাড় না থাকলেও আমার পরিশ্রমের বৈধ উপার্জনেও তোমাকে রানীর মতো রাখতে পারবো। বাট ভবিষ্যতে তোমার পরিবারের সাথে কিছু হলে তার দায় কখনো আমায় দিতে পরবে না। এটা মেনে যদি আমায় ভালোবাসতে চাও, বিয়ে করতে চাও আমি আর কোনো দিকে তাকিয়ে দেখবনা কে কি বলছে। আমি কাউকে পরোয়া করে চলি না। আমি চলি আমার মর্জিতে।”
জিতু ভাইয়ার কথাগুলো কি ভয়ংকর ঠেকছে ইতির কাছে। এত কঠিন কথা তো সে কখনো কারো থেকে শুনেনি। ভাবুক ইতিকে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে বাঁকা হাসল জিতু ভাইয়া। তিনি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলেই ইতি বলে উঠলো,
–“আচ্ছা আমি বিয়ে করব।”
জিতু ভাইয়ার পা থেমে যায়। অতঃপর পিছনে তাকিয়ে শুধালেন, “ঠিক করে ভেবে চিন্তে বলছতো?”
–“হু।”
–“তাহলে কবে বিয়ে করতে চাও?”
–“মমানে?”
–“মানে তুমি যেদিন বলবে সেদিন। আজ বললে আজ। কাল বললে কাল। পরশু বললে পরশু। চাইলে কয়েক বছরও সময় নিতে পর।”
ইতি কিছু বলতে পারছে না। খুব ভয় করছে তার। কি করবে এখন! ইতিকে ভাবতে দেখে জিতু ভাইয়া রুম থেকে যেতে যেতে বলে উঠলো,
–“ওকে ভাব। সময় নিয়ে ভালো করে ভাব। আ’ম রেডি ফর এভরিথিং।”
কবিতা আপুর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। কেমন যেন তার চঞ্চলতা অত্যধিক বেড়ে গেছে! তার সব কাজে কর্মে উদাসীনতা লক্ষ্য করার মতো। কিন্তু সে ছিল ভীষণ ম্যাচিউর একটা মেয়ে। একদিন তো আমি দেখেছিলাম মাঝ রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। সেদিন এই কথা জায়ান ভাইকে বলতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু বলতে ভুলে যাই। যে ভুলের ফল জায়ান ভাইয়ের মৃত্যুর পর বুঝতে পারি।
জায়ান ভাইয়ের মৃত্যুর সুখে শেখ বাড়ির সকলেই তখন পাগলের মতো হয়ে যায়। শেখ বাড়িতে এতগুলো মানুষ থাকার পরও বাড়ি ছিলো প্রাণহীন। কবিতা আপু জায়ান ভাইয়ের সুখ মেনে নিতে পারছিল না। তাই সে হোস্টেলে চলে যায়। এক প্রকার জেদই ধরে বসেছিল হোস্টেলে যাওয়ার জন্য। বড়রাও ভেবেছিল এটাই ভালো সিদ্ধান্ত। মেয়েটা বাড়িতে থাকলে আমার মতো মানসিক রোগী হয়ে যাবে। জিতু ভাইয়ার কাজে তখন প্রচুর চাপ থাকতো। তবুও তিনি তাঁর সব কাজ ফেলে প্রতি সপ্তাহে কিংবা এক দুই সপ্তাহ পরে কবিতা আপুকে দেখে যেত। ফোনেও কম বেশি কথা হতো। এভাবে কয়েক মাস যেতেই হঠাৎ কবিতা আপু জিতু ভাইয়াকে বলে দেয় এভাবে কষ্ট করে না আসতে। কারণ জানতে চাইলে অনেক অযুহাত দেখায়। ফোনে কথা বলাও আগের চেয়ে কমে যায়। ধীরে ধীরে কবিতা আপু সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। জিতু ভাইয়া এই রকম অবস্থা দেখে হোস্টেলে খুঁজ নিয়ে দেখে কবিতা আপু এক সপ্তাহ আগেই হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে। সেই দিনের পর তাকে অনেক খুঁজে জিতু ভাইয়া। কিন্তু কোথাও পায় না। সকলের মন আরও ভেঙে যায়। দাদি তখন অচল হয়ে পড়ে জায়ান ভাই আর কবিতা আপুর সুখে।
দিন চলতে থাকে। শেখ বাড়ির এমন বাজে অবস্থার মধ্যে সাপোর্ট ছিলো জিতু ভাইয়া আর জিয়াদ। আমিও ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাতে লাগলাম। সামনে পরীক্ষা তাই না চাইতেও পড়াশোনায় মন দিলাম। লক্ষ্য ছিল একটাই, আইনের লোক হব। জায়ান ভাইয়ের খু”নিদের শাস্তি দিব।
একদিন রাতের ঘটনা। জিয়াদ আর আমি সবসময় একসাথে স্কুল-কলেজে যাওয়া আসা করতাম। জায়ান ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে আমাদের পারিবারিক ব্যবসায় অনেক লোকসান হয়। তাই আগের মতো আমাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ছিল না। তাই সাধারণ ভাবেই চলা ফেরা করতাম। আমাদের রাত আটটার দিকে কোচিং ছুটি হয়। আমি জিয়াদ আর আমাদের কিছু ক্লাসমেট এক সাথে বাড়ি ফিরছিলাম শর্টকাট রাস্তা দিয়ে। এদিকে মূলত সব ক্ষেত আর কিছু মাছ চাষের পুকুর। কিছুক্ষণ হেঁটে গেলেই লোকালয়। সকলে নিজেদের বাসায় চলে গেলে আর কয়েকটা ক্ষেত পেরোলে আমাদের বাড়ি। অন্যদিন দূরের মাছ চাষের পুকুরগুলোতে লাইট জ্বালানো থাকে। সেইদিন লাইট জ্বালানো ছিল না কারেন্ট না থাকায়। জিয়াদ তার ফোনের ফ্ল্যাশ ধরে আছে। আমি জিয়াদের হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে যাচ্ছি তক্ষুনি কানে ভেসে আসলো একটা অদ্ভুত আওয়াজ। ভূত মনে করে ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। আমি জিয়াদকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম,
–“এ ভাই কে আওয়াজ করছে!”
জিয়াদ কান খাড়া করে শুনার চেষ্টা করলো, কিন্তু কিছুই কানে আসলো না। আমার কানেও আর আসছে না। আমি ঢোক গিলে বললাম,
–“এ ভাই আই দৌড় দেই। আমার ভয় করছে।”
–“তুমি বড় মানুষ হয়েও ভয় পাও! হা হা হি হি।”
–“জিয়াদ শক্ত মার খাবি।”
–“ধুরু এত ডরায়াও না। আমি আছি না!”
জিয়াদ আর আমি এবার দ্রুত হাঁটতে গেলেই কানে আসে এক বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। আমাদের পা তৎক্ষনাৎ থমকে যায়। ভয়ের ছুটে আমার কপালে ঘাম ঝড়েতে থাকে। জিয়াদ আমাকে শক্ত করে ধরে সাহস জোগান দিল। একটা বাচ্চা ক্ষীণ স্বরে কাঁদছে। বাচ্চার সাথে ভেসে আসছে গো”ঙ্গানোর মৃদু আওয়াজ। আমি জিয়াদের হাতে নাড়া দিয়ে ফিসফিস করে বললাম,
–“এ ভাই আই দৌড় দেই।”
–“এই আপু আসেপাশে কেউ আছে মনে হইতাছে।”
–“ককি কস!”
জিয়াদ আমাকে ধরে আওয়াজ অনুযায়ী এগোতে লাগল। দু পা করে এগিয়ে যখন জিয়াদ ফোনের ফ্ল্যাশ ক্ষেতের নিচে ধরল তক্ষুনি আমি চিৎকার করে উঠলাম,
–“ও আল্লাহ গো!”
এক জোড়া ব্যথাতুর ঝলঝল করা চোখ আমাদের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে। বিধ’স্ত অবস্থায় ক্ষেতে পড়ে আছে কবিতা আপু। তাজা লাল র’ক্তে তার সারা দেহ ভিজে আছে। তার পায়ের কাছে র’ক্তের মধ্যে পড়ে আছে নবজাতক এক শিশু। মায়ের পেটের বোনকে এতদিন পর এই অবস্থায় দেখে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো জিয়াদের দেহ। জিয়াদ লাফ মেরে ক্ষেতে নেমে কবিতা আপুর পাশে বসে তার দেহেটা কোলে তুলে নিতেই খানিকটা ঝুলে পড়ল কবিতা আপর মাথা। তার গলা কেউ ছু’রিঘা’তে কে’টে দিয়েছে। আমি চিৎকার দিয়ে কবিতা আপুর কাছে বসে তার মাথাটা উঁচু করে ধরলাম। রক্তে সিক্ত হয়ে উঠলাম মূহুর্তেই। শক্ত মনের জিয়াদ হাউমাউ করে কেঁদে বলতে লাগল,
–“এ আপা আপা তর কি হইসে? এ আপা তরে কেলা মারছে?
কবিতা আপুর দেহ অসার হয়ে পড়েছে। যে কোনো সময় প্রাণপাখি পালিয়ে যাবে। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসেও আপন মানুষের মুখ দুটো দেখে যেন অন্তর খানিকটা শান্ত হল। কবিতা আপু অপলক জিয়াদের দিকে তাকিয়ে কা’টা গলায় অস্পষ্টভাবে বললো,
–“ভাই, আমার ভাই আইছ?”
জিয়াদ আরও চিৎকার করে কেঁদে উঠে উম্মাদের মতো বলে উঠলো, “হ আপা আইসি আমি। তোমার কিছু হইতো না।”
–“কবিতা আপু তোমারে কে মা’রলো আপু? ও আপু তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে আপু?”
কাঁদতে কাঁদতে আমি বললাম। কবিতা আপু দৃষ্টি ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। রক্ত দিয়ে পুরো মুখ ভিজে আছে। এত যন্ত্রণার মধ্যেও কাঁপা কাঁপা ঠোঁটজোড়ার একটু হাসির রেশ টেনে কা’টা গলায় অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে আওড়ালো,
–“আআমার ভালোবাসা আমার এমন অবস্থা করেছে।”
এইটুকু বলতেই কবিতা আপুর চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু কণা। আমি এক হাতে কবিতা আপুর মাথাটাকে সাপোর্ট দিয়ে আরেক হাতে ওর র’ক্তে মাখা কোমল চেহারায় হাত বুলাতেই কবিতা আপু ফুঁপিয়ে উঠে একই ভাবে বলতে লাগল,
–“আআমি খারাপ না বনু। আমি জানি না আমার সাথে কি হলো! কেন হলো! আমি শুধু জানি ঐ লোকটাকে ভালোবেসেছিলাম। তারপর আমার জীবনটাকে নরক করে দিলো। আমার পেটে তার বাবু ছিলো। তবুও ও আমাকে বিক্রি করে দেয়। আমার বাবু হলে তাকেও বেঁচে দিত। আমি জানি না আজ আমি কেমনে পালিয়ে আসলাম! দেদেখ তাকে ভালোবাসার শাস্তি হিসাবে আজ আমার কি হাল করেছে!”
খুব কষ্টে কথাগুলো বললো কবিতা আপু। পরপরই বাচ্চার কান্নায় চুপ হয়ে যায়। সে উঠে বসতে চায়। আমার আর জিয়াদের সাহায্যে হালকা ঝুঁকে তার পায়ের কাছ থেকে নবজাত বাচ্চাটাকে কাঁপা কাঁপা হাতে নিল। তার দেহে একটুও শক্তি নেয়। এইটুকু বাচ্চাটাকে কিভাবে ধরল আল্লাহ জানে! কবিতা আপু বাচ্চাটাকে মাটি থেকে তুলতেই বাচ্চার ভার নিতে না পেরে আমার দিকে ধরল। আমি বাচ্চাটাকে বুকে আগলে নিলাম। কবিতা আপুর হাতটা ঠাস করে পড়ে গেল জমিনে। আমি বাচ্চাটাকে সামলে কবিতা আপুর র’ক্তে ভেজা একটা হাত শক্ত করে মুটো করে ধরলাম। এদিকে, চারদিক থেকে লোকজন লাইট ধরে খুঁজাখুঁজি করছে, কোথা থেকে চিৎকার চেঁচামেচি আসছে। কবিতা আপু মাথা ছেড়ে দেওয়ার আগে এইটুকুই বললো,
–“এতিম বলে আমার বাচ্চাটাকে কষ্ট দিস না বনু। আর আর ঐ লোকটাকে কোনোদিন ক্ষমা করিস না।”
–“ককাকে?”
–“ইফান চৌধুরীকে….”
কবিতা আপু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতেই আমার আর জিয়াদের যেন দম বন্ধ হয়ে আসলো। যেন এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল এই পৃথিবী। পুরো গ্রামের লোক উপস্থিত হয়েছে। অথচ আমার কানে কারো আওয়াজ আসছিল না। শুধু কবিতা আপুর শেষ বাক্যগুলো মস্তিষ্ক জুড়ে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
মীরা আলতো করে আমার কাঁধে হাত রাখতেই আচমকা ঘোর থেকে বেরিয়ে সংবিতে ফিরে আসলাম। আমি মীরার চোখের দিকে তাকাতেই দেখলাম জলে থৈথৈ করা অক্ষিযুগল। কি আশ্চর্য! মীরা চৌধুরী কাঁদছে আমার কথা শুনে! আমার কন্ঠ ধরে এসেছে। নিজেকে সামলে নিলাম। আমি দীর্ঘ শ্বাস আড়াল করে বিছানার মাথায় হেলে বসে সহাস্যে বললাম,
–“এখনও বলবে ইফান চৌধুরীকে ক্ষমা করে দিতে?”
–“হ্যাঁ, এখনো বলব।”
আমি তীক্ষ্ণ চোখে মীরার দিকে তাকাতেই মীরা আড়ালে চোখ মুছে নিজেকে ধাতস্থ করে নিল। আমি অবিশ্বাস্য স্বরে আওড়ালাম,
–“এখনও!”
–“হ্যাঁ, এখনো। কারণ আমি জানি আমার ভাই কিছু করে নি। মানলাম তার পাস্টে ব্যাড রেকর্ড আছে। তবে এটা সত্যি আমার ভাই কখনো কাউকে ফোর্স করেনি, শুধু তোমাকে ছাড়া।”
আমি বিস্ময় ভরা কন্ঠে শুধালাম,“এতো বিশ্বাস!”
–“হুম এত বিশ্বাস। কারণ কবিতাকে নিয়ে তুমি যে সময়টার কথা উল্লেখ করেছ সেই সময়ে আমার ভাই প্যারিসের হসপিটালের বেডে প্যারালাইসিস অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছিল।”
আমি মীরার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইলাম। কিছুটা মূহুর্ত নিজের মধ্যে বুঝাপড়া করে সহাস্যে বলে উঠলাম,
–“তার মানে তুমি কবিতা আপুকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইছ? কিন্তু লাভ নেই। কারণ আমার কাছেও কবিতা আপুর কথার যথেষ্ট বিশ্বাস আর প্রমাণ আছে। কাবিতা আপু একদিন বলেছিল তার বয়ফ্রেন্ডের কানে পিয়ার্সিং করা। ইফানেরও তাই। আবার একদিন যখন সিঁড়িতে দুজন ফোন নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিলাম তখনও দেখেছি কবিতা আপুর ফোনে নামের শেষ একটা অক্ষর এন। আর ইফানের নামের শেষ অক্ষরও তাই। সেদিন কবিতা আপুর মৃত্যু সংবাদ শুনে দাদিও হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়। প্রথম জায়ান ভাই,তারপর এক সাথে আরও দুটো লাশ আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। ভাবতে পারছ, আমরা ঠিক কতটা অসহায় হয়ে গিয়েছিলাম! আর এই সবকিছুর জন্য দায়ী.. “
–“জারাহ্…”
বলার মাঝপথে আমাকে থামিয়ে দিয়ে মীরা কান্ত কন্ঠে আওড়ালো। আমি মুখে আসা কথাগুলো গিলে মীরার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মীরা আমার কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলো,
–“তুমি ভুল বুঝছ জারা। ইফান ব্রো এই রকম কাজ কোনোদিনও করবে না। এটা অন্যকেউ হলে তবুও মানতে পারতাম। কিন্তু কবিতার সাথে এটা অসম্ভ। তাছাড়া স্যার আমাকে নিজে বলেছে, ইফান ব্রো কবিতাকে স্যারের থেকেও বেশি বোন হিসেবে স্নেহ করত। প্রতি বছর প্যারিস থেকে শেখ বাড়িতে যে গিফট গুলো আসতো তা শুধু স্যার একা নয়, ভাইও পাঠাত। ব্রো কবিতা, জুই এবং ইতিকে একই নজরে দেখে। বরং ইতি সেই স্নেহ কিংবা গিফট পায়নি তার আপন ভাইয়ের থেকে যা কবিতা আর জুই পেয়েছে। এখন বলো না এগুলোও মিথ্যা। এগুলো একদম সত্যি কথা। স্যার আমাকে নিজে বলেছে..”
–“এই এক মিনিট, স্যার কে?”
আচমকা আমার প্রশ্নে বলার মাঝ পথে থমকে গেল মীরা। আমি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে মীরার দিকে তাকিয়ে। মীরা হঠাৎ যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অতঃপর গলার স্বর খাদে নামিয়ে প্রতিত্তোর করল,
–“জায়ান শেখ নীরব।”
–“তুমি কি জায়ান ভাইকে আগে থেকে চেন?”
মীরা পুনরায় আমার প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে কোনো উত্তর করছে না। আমি উত্তরের আশায় তার দিকে তাকিয়ে। কয়েক মূহুর্ত পর মীরা কথা ঘুরিয়ে বলে উঠলো,
–“তোমাদের সবার সাথে যা হয়েছে বা এখনো হচ্ছে সবাই তোমাদের ডেস্টিনি। এখানে কারো দোষ নেই। কবিতার বিষয়টা সত্যি আমার জানা নেই। তবে কবিতার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনে আমিও আ’হত হলাম। তবে এটা শিউর থাকতে পার, কবিতার সাথে ভাইয়ার কিছু ছিল না। হতে পারে এখানে অন্য কেউ আছে। এমনও হতে পারে, ভাইয়ার নাম ইউজ করে আমাদের সাথে কেউ গেইম খেলছে।”
আমি কোনো উত্তর করলাম না। বড্ড বেশি ক্লান্ত লাগছে৷ এসব কি হচ্ছে আমার সাথে! সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। আমি বিছানায় গা ছেড়ে আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। মীরা পিছন থেকে আমার মাথায় হাত রেখে নরম কন্ঠে বলল,
–“এরকম করলে তো তোমার শরীর আরও খারাপ হবে।”
–“হোক। বেঁচে থেকে আর কি করব? আর কেউ নেই আমার। এমনকি আমার পেটেরটাও তো আর নেই। কার জন্য বাঁচব?”
মীরা বলার কোনো কথা খুঁজে পেল না। তারপর খানিকটা সময় ভেবে বলল,“কবিতার তো একটা বেবি হয়েছিল, সে কোথায়?”
আমি উত্তর করলাম না। মীরা বেশ কিছুক্ষণ আমার থেকে উত্তরের অপেক্ষা করল। অতঃপর উত্তর না পেয়ে বলে উঠলো,
–“আমার কথা যদি তোমার বিশ্বাস না হয় আর বাচ্চাটা যদি আজও বেঁচে থাকে, তাহলে ভাইয়ার সাথে ডিএনএ টেস্ট করাতে পার। তবে একটা কথা মনে রেখো তোমার ধারণায় ভুল হবে। কবিতার সাথে কোনো প্রকার কানেকশন নেই ভাইয়ের।”
মীরা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সুপের বাটি হাতে নিয়ে দেখল সুপ ঠান্ডা হয়ে গেছে। মীরা উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,“কতবার বললাম সুপ খেয়ে নাও। এসেছ থেকে কিছু খাও নি। এখন দেখ সুপ ঠান্ডা হয়ে গেছে। এভাবে না খেয়ে থাকলে তো শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। আমি নতুন করে কাউকে দিয়ে পাঠাচ্ছি। তুমি কান্না থামিয়ে এবার রেস্ট নাও।”
–“কবিতা আপুর সাথে যদি ইফানের কিছু না থেকে তার পিছনে যদি অন্যকেউ থাকে, তাহলে তাকে আমি কঠিন শাস্তি দেব নিজ হাতে মেরে। কাউকেই এক চুল পরিমাণ ক্ষমা করবো না। আমার জায়ান ভাই, আমার বোন এবং সবশেষে আমার সন্তানদের যাদের জন্য হারালাম তাদের আমার হাত থেকে রেহাই নেই। আজ নয়তো কাল খুঁজে তো আমি বের করবই। আমারও দেখার আছে ইফানকে সামনে রেখে কে এমন নিকৃষ্ট গেইম খেলছে। খোদার কসম, আমার হাতেই তাদের মৃত্যু লিখব আমি। কঠিন মৃত্যু।”
মীরা রুম থেকে চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু আমার কন্ঠ শুনে দাঁড়িয়ে যায়। মীরা ঘাড় কাঁধ করে আমার দিকে তাকাতেই চোখমুখে এক কাঠিন্যের ছাপ ভেসে উঠল। তার চোখদুটো যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে। মীরা দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে আওড়ালো,“এই গেইমের শেষটা আমারও দেখার আছে।”
ইরহাম চৌধুরীর রুমে বসে আছে পঙ্কজ, মাহিন আর ইমরান। ইরহাম চৌধুরী মাথায় বরফ প্যাক ধরে বিছানায় বসে আছে গা ছেড়ে দিয়ে। মাহিন পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে বুকে দু’হাত গুঁজে। ইমরান মাথায় হাত ধরে মাথা নিচু করে বসে আছে। পঙ্কজ ড্রিংক করতে ব্যস্ত। আশেপাশে কি হলো না হলো এসব তার দেখার বিষয় না। ইরহাম চৌধুরী গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল,
–“এই বিপদ-আপদের সময় বড় ভাই কোথায় গিয়ে বসে আছে বলতো বাপ?”
মাহিন এখানে বসে থেকে বিরক্ত হচ্ছে। তারপরও নিজের বিরক্তি আড়াল করে কাঠকাঠ গলায় বলল,
–“গা ঢাকা দিয়েছে বোধহয়।”
–“কিহ্! আব্বু হঠাৎ গা ঢাকা দিতে যাবে কেন?”
ইমরানের কথায় মাহিন ঠোঁট বাকিয়ে সহাস্যে বললো,“কোনো এক ব্লা’ডিবিস্টের প্রাণভোমরায় হাত দিয়েছিল। তাই হয়তো এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে।”
মাহিনের কথার মানে যেন ইরহাম চৌধুরী আর ইমরানের বোধগম্য হলো না। ইমরানের কপালে চিন্তার ভাজ পড়ল। সে ভাবুক চেহারা করে শুধালো,
–“তোমাদের কথা তো সুবিধার ঠেকছে না ভাই! কি হয়েছে ক্লিয়ার করে বল!”
মাহিন দু আঙুলের সাহায্যে কপালের এক পাশ ঘষল। ইরহাম চৌধুরী উতলা হয়ে বলে উঠলো, “আরে বাপ আমার মাথায় ঢুকছে না কিছু। কি হয়েছে একটু ক্লিয়ার করে বল তো!”
–“সেটা তো তোমার ভাই ভালো বলতে পারবে কি হয়েছে!”
মাহিনের এমন উদ্ভট কথায় উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন ইরহাম চৌধুরী। মাথায় এখনো আইস প্যাক ধরে রাখা। তিনি দুশ্চিন্তা নিয়ে বলে উঠলেন,
–“দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভাইও জেলে যাবে সাথে আমরাও।”
মাহিন আওয়াজ করে হেসে বলে উঠলো, “আমরা না বল তুমি আর তোমার ভাই। এসব থার্ডক্লাস ঝামেলায় আমি নেই। এসব থানা-পুলিশ কেইসে আমি থাকতে পারব না, সরি।”
পঙ্কজ নাকে হাতের উল্টো পিঠ ঘষে একই সুরে বললো,“আমিও পারবো না, সরি।”
ইমরান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,“আরে ভাই এখানে থানা-পুলিশই আসল কোথা থেকে! এখনো কিচ্ছুটি প্রমাণ হয় নি। রাজনীতিতে থাকলে এমন একটু-আধটু কথা উঠবেই। তাই বলে আব্বু গা ঢাকা দিতে যাবে কেন?”
ইরহাম চৌধুরী আবারো বিছানায় গিয়ে বসল। তারপর মাহিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,“এতো চিন্তা আমি করতে পারবো না রে বাপ। আমার প্রেসার হাই হয়ে যাচ্ছে। তুই একটু ইফানকে বল বিষয়টা সামলে নিতে। সিআইডি অফিসারটা তো আবার তার শালা। তাই বল ম্যানেজ করে নিতে।”
–“নিজের কাজ নিজে করা ভালো। আামকে এসব না বলে ভাইকে গিয়ে বল। আর যতদূর মনে হচ্ছে ভাই কারো দিকে তাকিয়েও আর কোনোদিন দেখবে না। এবার তোমরা যা ভালো বুঝ কর।”
মহিন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। ব্লেজার কাঁধে ঝুলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসছে তার সাথে ইমরান আর পঙ্কজও উঠে দাঁড়াল। ইমরানের মাথায় কিছু ঢুকছে না। সে মহিনকে জিজ্ঞেস করলো,
–“আরে মাহিন ভাই স্পষ্ট করে কিছু না বললে আমি বিষয়টা বুঝব কি করে! আমাকে তো বুঝিয়ে বল ভাইয়ের সাথে আব্বুর কি ঝামেলা হয়েছে?”
নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরী আমি আসার খবর শুনে অফিস থেকে বাড়িতে এসেছে সবে। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই দেখে সকলে ইতিকে ঘিরে বসে আছে। ইতির পাশে আরেকটা মেয়ে। নাবিলা চৌধুরীর চিনতে একটুও অসুবিধে হলো না জুইকে। তিনি অনেকবার ইতির ফোনে জুইয়ের ছবি দেখেছে। নাবিলা চৌধুরী চোখমুখ কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
–“কি হয়েছে?”
মায়ের কন্ঠ শুনে ভয়ে জমে গেল ইতি। দু’হাত নাড়িয়ে সবাই বলতে না করছে। নাবিলা চৌধুরীর ভ্রু আরও কুঞ্চিত হলো। তিনি এগিয়ে এসে ইতির দিকে দৃষ্টিপাত করতেই মস্তিষ্ক দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো,
–“এটা কি করে হলো? আমার মেয়ের পা পুড়ল কি করে?”
উত্তেজিত হয়ে পড়ল নাবিলা চৌধুরী। মনিরা বেগম গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল,“কলেজে মনে হয়।”
–“কলেজে! কোথায় আমাকে তো কেউ কোনো খবর দেয় নি!”
বলেই নাবিলা চৌধুরী হাঁক ছেড়ে গার্ডদের ডাকতে লাগল। ইতি মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে ভয়ে কেঁদে দিল। নাবিলা চৌধুরী খানিকটা শান্ত হয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
–“পায়ে পুড়েছে কি করে?”
–“গরম চা পড়ে গিয়েছিল।”
ভয়ের চোটে ইতি বানোয়াট কথা বলে দিল। নাবিলা চৌধুরী সুক্ষ্ম চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। চা পড়ে এতটা পুড়ে গেছে! তিনি ইতির কথা বিশ্বাস না করে জুইয়ের দিকে কড়া চোখে তাকাতেই জুই ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল,“ও বাবা গো! আপুর শ্বাশুড়ি তো দেখছি রীনা খানের থেকেও ডেঞ্জারাস কড়া মহিলা!” জুই ঢোক গিলে রিনরিন কন্ঠে বললো,
–“আআসসালামু আলাইকুম আন্টি।”
নাবিলা চৌধুরী সালামের জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সবসময় জুইয়ের সাথে থাক তাই তো? তাহলে বল কিভাবে এটা হলো?”
জুই আড় চোখে ইতির দিকে তাকাতেই ইতি ইশারা দিল মিথ্যা কথাটায় বলতে। জুই জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,“জি আন্টি চা পড়ে গিয়েছিল।”
জুইকে ভয় পেতে দেখে পলি গলার স্বর নিচু করে বলল,“মা মনে হয় চা-ই পড়ে..”
পলি বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই নাবিলা চৌধুরী তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতেই পলি চুপসে গেল। পলি দ্রুত রান্নাঘরের দিকে যাওয়া ধরল। জুইও ভয়ে নাবিলা চৌধুরীর সামনে থেকে কেটে পড়তে চাইছে। পাশে ফারিয়া দাঁড়িয়ে আছে। জুই অনেকবার আমার সাথে ভিডিও কলে কথা বলার সময় ফারিয়ার সাথে পরিচিত হয়েছে। তাই এখন ফারিয়াকেই সবচেয়ে বেশি ভরসা পাচ্ছে। জুই ফারিয়ার কনিষ্ঠা আঙুল ধরে টেনে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
–“ফারিয়া আপু আমার আপুকে ডেকে দাও না।”
ফারিয়াও নাবিলা চৌধুরীর রাগী চেহারা দেখে ফিসফিস করে বলল,“মেডাম অনেক অসুস্থ বেইব। তাই নিচে আসে নি এখনো। তুমি রুমে চলে যাও।”
ফারিয়া দোতলায় ইশারা করে দেখাল। জুই নাবিলা চৌধুরীকে আড় চোখে দেখতে দেখতে কেটে পড়ছে। উল্টো দিকে তাকিয়ে যেতে তাকায় কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই আচমকা কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেতেই জুই তৎক্ষনাৎ ভয়ে চেঁচিয়ে উঠে। জুই খেই হারিয়ে পড়ে যেতে নিলেই কলেজের ব্যাগে টান অনুভব করে। কেউ শক্ত করে তার কলেজ ব্যাগ ধরে ফেলেছে। সকলে জুইয়ের চিৎকার শুনে সেদিকে তাকায়। মাহিন প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে। পিছন থেকে ইমরান মাহিনের কাঁধের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে জুইয়ের কলেজ ব্যাগ খামচে ধরে আছে। ইমরান মাহিনের উপর চেঁচিয়ে উঠলো,
–“আরে ভাই মেয়েটা পড়ে যাচ্ছে ধর ওকে। আমি ধরে রাখতে পারছি না। হাত ফস্কে এই এই…”
বলতে বলতে জুইয়ের ব্যাগ ইমরানের হাত ফসকে গেল। জুই পড়ে যেতে নিলেই পুনরায় চিৎকার দিয়ে উঠলো। জুইয়ের সাথে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত কয়েক জনেও তাল মেলাল। তবে জুই পড়ে যাওয়ার আগেই শক্ত একটা হাত জুইয়ের হাতে জোরে টান দিল। জুই তৎক্ষনাৎ ঘুরে শক্ত কিছু একটার সাথে লেপ্টে গেল। মেয়েটার হার্ট ফেল হয় অবস্থা। ছোট্ট বুক অনিয়ন্ত্রিত ভাবে কাঁপছে। মাহিনের শক্ত বুকের উপর লেপ্টে আছে ছোট্ট একটা নারী দেহ। জুইয়ের ছোট্ট দেহের নমনীয় ভাজগুলো অনুভব করতে পেরেই মাহিন দু’হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে শুকনো ঢোক গিলল। মাহিন ভীষণ বাজে অস্বস্তি ফিল করছে। হাত দুটো দিয়ে যে জুইকে তার থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিব তার জোরও পাচ্ছে না। হঠাৎই মাহিনের হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হতে আরম্ভ করল। জুইয়ের কানে ধুকপুক আওয়াজ যেতেই মস্তিষ্ক জানান দিল সে বোধহয় কারো বুকের মধ্যে। জুই মাথা তুলে উপরের দিকে তাকাতেই চোখ দুটো কঠোর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। তার মানে এই খবিশ লোকটার বুকে এতক্ষণ সে ছিলো! আর বেশি ভাবতে পারলো না মেয়েটা। ঝটপট জুই সরে দাঁড়াল। মাহিন এখনো নিজের ভেতরের অস্বাভাবিক অস্থিরতাকে না দমাতে পেরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি তার একদম সোজা সদরদরজার দিকে।
মাহিন আর ইমরান কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে ফাঁকা জায়গা দিয়ে সবার পিছনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা পঙ্কজ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকে ঘষতে ঘষতে জুইকে সুক্ষ্ম চোখে দেখতে ব্যস্ত। তখন ইমরান জুইকে ঘিরে দাঁড়াল। জুইয়ের বাহুতে ধরে সিঁড়ির আরেক পাশে এনে নরম কন্ঠে শুধালো,
–“এই তুমি ঠিক আছ? লাগেনি তো?”
–“আআমি ঠিক আছি।”
জুই রিনরিন কন্ঠে বলেই ধীর পায়ে সিঁড়ি থেকে নেমে যেতে লাগল। মাহিন শুকনো কেশে নিজেকে স্বাভাবিক করে। নিচে তাকাতেই দেখে মনিরা বেগম মুখে আচল ধরে মুচকি হাসছে। হাউ স্ট্রেঞ্জ! এভাবে হাসার কি হলো! মাহিন বুঝে উঠতে পারলো না। মনিরা বেগম এক হাত নাড়িয়ে মাথায় ছুঁইয়ে ইশারে করে বুঝাল,“কারো নজর না লাগুক।”
মাহিন মায়ের কাজে আরও বিরক্তবোধ করল। না চাইতেও মাহিনের কোণ চোখ ফারিয়ার পিছনে লুকিয়ে থাকা জুইয়ের দিকে চলে গেল। মাহিন ঝটপট দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। অযাচিত কারণে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো দ্বিগুণ। মাহিন আর এক মূহুর্ত এখানে না দাঁড়িয়ে বড় বড় পা ফেলে চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
এদিকে ইমরান পঙ্কজের সামনে দাঁড়িয়ে পরায় পঙ্কজ ইমরানের পশ্চাতে ঠাস করে থাপ্পড় মেরে দিল। আচমকা আঘাত পেয়ে ইমরান লাফিয়ে উঠে পশ্চাতে হাত ধরে পিছনে তাকাতেই দেখল, পঙ্কজের বিরক্তি মিশ্রিত চেহারা। পঙ্কজ বিড়বিড় করে ইমরানকে গা’লিগা’লাজ করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে লাগল। তখনই ফারিয়ার সাথে চোখাচোখি হয়। ফারিয়া পঙ্কজকে দেখা মাত্রই লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল। পঙ্কজ চোখ মেরে ঠোঁট গোল করে চুমু দেখিয়ে বাঁকা হাসতে হাসতে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এদিকে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পশ্চাতে হাত ধরে রাখা ইমরান দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
–“পুরুষ হয়েও ব্যাড টাচের হাত থেকে রক্ষা পেলাম না। হে মাবুদ আমাকে পুরুষ না বানিয়ে হাপলেডিস বানালেও পারতে!”
বিড়বিড় করে আফসোস করতে করতে ইমরানও চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সবাই আবার যে যার মতো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু নাবিলা চৌধুরী এখনো ইতিকে জেরা করে যাচ্ছেন; নিজের কলিজার টুকরো মেয়ের পা পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারছেন না।
অন্যদিকে, একজোড়া শান্ত অক্ষিযুগল একধ্যানে নিজের কোমল হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই হাতে ধরা একটি ধারালো ছু’রি। বেশ খানিকক্ষণ ছুরিটিকে উল্টেপাল্টে দেখে সে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সবজি কাটতে লাগল। সবজির প্রতিটি টুকরো হচ্ছে একদম একই মাপের; যেন খুব সূক্ষ্মভাবে সে তার কাজ সম্পন্ন করতে মগ্ন। সবজির একটা টুকরোও সে এদিক-ওদিক হতে দিবে না, কারণ সামান্য বিচ্যুতি মানেই যেন সে লক্ষ্যচ্যুত হবে। সবজি কাটার এমন নিখুঁত দক্ষতা দেখে পলি ফিক করে হেসে উঠল।
চলবে,,,,,,
নেক্সট পর্বটির জন্য সবাই প্রস্তুত থেকো। অনেক ইম্পর্ট্যান্ট একটি পর্ব হবে…..
প্রায় পাঁচ হাজার শব্দের পর্ব দিয়েছি। আশা করি কোনো অভিযোগ থাকবে না। যারা পর্বটি পড়েছেন সবাই রিয়েক্ট আর গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং 🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৭১
-
জাহানারা পর্ব ৩৩+৩৪
-
জাহানারা পর্ব ১
-
জাহানারা পর্ব ৫৩+৫৪
-
জাহানারা পর্ব ১০
-
জাহানারা পর্ব ৫৫+৫৬
-
জাহানারা পর্ব ৪৩+৪৪
-
জাহানারা পর্ব ৫
-
জাহানারা পর্ব ৩
-
জাহানারা পর্ব ১৯+২০