Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৭১


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৭১
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

বেশ কয়েকদিনের অনুপস্থিতির পর আজ ভোরেই সূর্য উঁকি দিয়েছে। শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে তার মৃদু, সোনালি আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই নরম রোদ সকলের গায়ে পড়তেই বেশ উষ্ণ আর মিষ্টি অনুভূতি দিচ্ছে। বিশাল অট্টালিকা এই চৌধুরী ম্যানশনটি। বাইরে থেকে দেখতে যেমন অত্যাধুনিক, ভেতরেও সব কিছু তার আভিজাত্যের প্রতীক। প্রতিদিনের মতো আজও চৌধুরী ম্যানশন ঘিরে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে শ-খানিক কালো পোশাকধারী গার্ড। চৌধুরীদের গাড়ি দেখতে পেয়েই ঝটপট গেইটের দুই পার্ট খুলে দিল দুজন দারোয়ান। তৎক্ষনাৎ হনহনিয়ে চৌধুরী ম্যানশনের ভেতর প্রবেশ করলো একটি কালো মার্সিডিজ।

গাড়ি থেকে ঝটপট নেমে পড়ল মাহিন। মাহিনকে দেখে বেশ চিন্তিত আর উদ্বীগ্ন মনে হচ্ছে। মাহিন কোনো দিক না তাকিয়ে সোজা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। চৌধুরীরা সবে ঘুম থেকে উঠেছে। লতা ড্রয়িং রুম ঝাঁট দিচ্ছে। ফারিয়া চা বসিয়েছে। মনিরা বেগম আর পলি কি রান্না করবে তা নিয়ে কথা বলছে। হঠাৎ মাহিনকে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে দেখে মনিরা বেগম ছেলেকে শুধালো,
–“বাবা কোথা থেকে সাতসকালে বাড়ি ফিরলে? আর রাতেই কোথায় ছিলে?”

মাহিন জবাব না দিয়ে সোফায় গিয়ে বসে হাঁটুতে দু’হাতের কনুই রেখে মুখে হাত ধরে চিন্তামগ্ন হল। কাল রাতে সে নিজেদের ব্যবসার জরুরি কাজে বাড়ি ফিরে নি। এদিকে সকাল সকাল খবর এসেছে আমি আইসিইউতে চৌদ্দ ঘন্টা ধরে। অবস্থা খুবই গুরুতর। খবরটি অবশ্য ইনানই দিয়েছে। ইফানের বিশ্বস্ত কিছু লোক ছাড়া এই খবর কেউ জানে না। তবে আমার এমন সংকটময় অবস্থা দেখে ইফানকে না জানিয়েই ইনান মাহিনকে খবর দিয়েছে।

–“মাহিন বাবা আমার, কি হয়েছে সোনা?”

মনিরা বেগমের কন্ঠ শুনে চোখ তুলে তাকাল মাহিন। অতঃপর মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
–“মম ভাবি..”

–“ভাবি, কোন ভাবি?”

মনিরা বেগম মাহিনের মুখের কথা কেঁড়ে নিল। এর মধ্যে নাবিলা চৌধুরী, নুলক চৌধুরী, রোকেয়া বেগম, ইতি আর নোহাও উপস্থিত হয়েছে। মাহিন জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
–“জাহানারা ভাবি গতকাল থেকে আইসিইউতে।”

–“কিহ্!”

কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই মাহিনের বাক্যটা শুনতে পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকা মীরা আওড়ালো। মীরার বোধগম্য হচ্ছে না কি হচ্ছে। মীরা নিচে নেমে এসে বলল,
–“কিসব বলছ তুমি? ভাবি তো বিগ ব্রোর সাথে আছে।”

–“হুম ছিল। বাট ভাবিকে গু’লি করা হয়েছে। খবর পেয়েছি অবস্থা ভলো না।”

মাহিনের এই বাক্য মূহুর্তেই উপস্থিত সবাইকে নাড়িয়ে দিল। চৌধুরী বাড়িতে তৎক্ষনাৎ কান্নার রোল পড়েছে। নাবিলা চৌধুরী অনুভূতিহীন চোখে সকলকে দেখছে। ইতি এমনিতেই দুর্বল চিত্তের মানুষ, তাই এই খবর শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে শরীর ছেড়ে দিয়েছে। নাবিলা চৌধুরী মেয়েকে ধরে সোফায় বসে পড়ল। সকলের এমন অবস্থায় তিনি ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারছেন না। নুলক চৌধুরী নিউজটি শুনে আনন্দিত। তিনি তো এটাই চেয়েছিলেন, যাতে আমি মরে উনার রাস্তা পরিষ্কার করে দেই। কিন্তু নিজের পেটের মেয়ের এমন গর্ধবের মতো কাজ দেখে চোখমুখ শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষলো। নোহা সোফার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। ফলে নাকের পানি চোখের পানি মিশে একাকার। সকলে এটা ওটা বলে বিলাপ করছে। নোহাও সকলকে অনুসরণ করে কাঁদতে কাঁদতে বিলাপ করতে লাগল,
–“ও পাপা গো, প্রিটি গার্ল মরে গেলে কে আমার ইফান বেবিকে সা’উয়া’র চিপায় লুকিয়ে রাখবে গো? আমি কার সা’উ’য়ার চিপা থেকে ইফান বেবিকে খুঁজে বের করব রে। কে আমাকে ভালোবেসে বেহায়াচো’দা, বোকাচো”দা বলে ডাকবে গো? ওয়া ওয়া…”

নোহার কথায় এক মূহুর্তের জন্য সকলে স্তব্ধ হয়ে গেল। নুলক চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দমিয়ে রেখে নোহাকে টেনেটুনে এখান থেকে নিয়ে যায়। অতঃপর সকলে পুনরায় কান্নাকাটি আরম্ভ করে। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে বাড়ির সবাইকে এমন করে বিলাপ জুড়ে কাঁদতে দেখে মাহিন আর মীরা দু’জনই বড্ড বিরক্ত হল। মীরা মাহিনের পাশে বসে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
–“ব্রো ওরা এখন কোথায়?”

–“দুবাই আছে। ভাবিকে প্রাইভেট চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আপাতত আমরা ছাড়া এই খবর কেউ জানে না। না জানানোই ভালো।”

মাহিনের কথায় মীরা সম্মতি জানিয়ে বলল,
–“হুম এটাই করতে হবে। বিষয়টা বাইরে লিক হলে শত্রুরা আঘাত হানবে। এখন দুবাই কি আমাদের যাওয়া উচিত না?”

মীরার কথায় মাহিন ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
–“মীরা তুই এক কাজ কর, তুই বরং ইমিডিয়েট প্রাইভেট জ্যাটে করে দুবাই রওনা দে।”

–“ওকে ফাইন। বাট তুমি যাবে না?”

মাহিন টি-টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে গিলে বলল,
–“অনেক বড় গন্ডগোল হয়ে গেছে মীরা।”

মাহিনের এহেন কথায় মীরা নড়েচড়ে বসল। অতঃপর ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“রিসেন্ট ইস্যুর কথা বলছ?”

মাহিন মাথা উপর নিচ করে সাঁই জানিয়ে বলল,
–“ইয়াহ্। দিস ইজ আ ভেরি সেনসিটিভ ইস্যু। বাংলাদেশে যত ইলিগ্যাল শিপমেন্ট ছিল তার সব প্রমাণ সিআইডির হাতে চলে গেছে। যদিও এসবে আমাদের গ্যাং এর কোনো হাত নেই। আমরা তো ডলার দিয়ে ওদের থেকে মাল কিনে নিই। এন্ড আমরা বাংলাদেশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাট বিষয় হচ্ছে এসবে খুব ভালো করে বড় আব্বু ইনভলভ। পলিটিক্স, বুঝতে পারছিস মীরা পলিটিক্স। বড় আব্বু এখানেই ফেঁসে গেছে। পরিস্থিতি সবার হাতের বাইরে। সিআইডি যখনতখন সব নথি পাবলিশ করে দিতে পারে। তারপর কি হবে গড নোজ।”

মাহিন হতাশার শ্বাস ছাড়ল। মীরা মাহিনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
–“এত প্যানিক হওয়ার কিছু নেই। যা ঘটবার তাই ঘটবে। তুমি যা ভাবছ তাই যদি হাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে এবার আমার মমকে আমার সাথে নিয়ে চলে যাব। তারপর পৃথিবী রসাতলে যাক।”

মীরা নিজের বলা শেষ করেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। কারণ ঝটপট রেডি হয়ে দুবাই যেতে হবে। এদিকে উচ্চস্বরে কান্নার আওয়াজ শুনে ঘুমিয়ে থাকা ইমরান ছুটে আসে লিভিং রুমে। কাঁদতে থাকা পলিকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে সকলের উদ্দেশ্য প্রশ্ন ছুঁড়ে। পলি ঘটনা খুলে বলতেই ইমরান থ হয়ে যায়। নিজেকে সামলে মাহিনকে শুধালো,
–“ভাই এসব কিভাবে হলো?”

ইমরানের প্রশ্নে মাহিন ইমরানের দিকে এক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবল। অতঃপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দোতলার দিকে তাকাতেই দেখল পঙ্কজ সেখানে দাঁড়িয়ে মুখে হাত ধরে বড় করে হাই তুলছে। তারপর মাহিনের সাথে চোখাচোখি হতেই ঠোঁট উল্টাল।


আজ আর সকাল থেকে চৌধুরী বাড়িতে রান্নাবান্না হয়নি। বেলা এগারোটা বেজে গেছে। ক্লান্ত হয়ে সকলেই নিজেদের রুমে চলে গেছে। বাড়ির এমন অবস্থা দেখে অবশেষে কাজের মেয়ে লতা আর ফারিয়া রান্না চাপিয়েছে। হঠাৎ কলিং বেল বাজতেই লতা গিয়ে সদর দরজা খুলে দেয়। তৎক্ষনাৎ ভেতরে প্রবেশ করে ইকবাল চৌধুরী আর ইরহাম চৌধুরী। দুই ভাইয়ের চেহারা অন্ধকার হয়ে আছে। কেউ কোনো বাক্য বিনিময় না করে হনহনিয়ে নিজেদের রুমের দিকে অগ্রসর হলো।

ইকবাল চৌধুরী তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে রুমে পা রাখতেই নজরে পড়ল নাবিলা চৌধুরী বিছানায় আধশোয়া হয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিমিষেই ইকবাল চৌধুরীর রাগ তলানি পড়ল। তিনি এগিয়ে এসে আস্তে করে নাবিলা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করল,
–“নাবু, আম্মুর কি হয়েছে?”

কিছু একটা আনমনে ভাবছিল নাবিলা চৌধুরী। হঠাৎ কারো গলার আওয়াজ শুনে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে নাবিলা চৌধুরী। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে উঁকি দিয়ে দেখে ইতি ঘুমিয়ে পড়েছে। অতঃপর নিচু স্বরে উত্তর করে,
–”অনেক কান্নাকাটি করছে, তাই মাথা ধরেছে। আমি রুমে এনে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।”

মেয়ে কান্নাকাটি করছে কথাটা শুনে মেজাজ বিগড়ে গেল ইকবাল চৌধুরীর। তিনি সহাস্যে বলে উঠলো,
–”কেন কি হয়েছে আমার মেয়ের? কেউ কি কিছু বলেছে? নাকি কিছু আবদার করেছে তুমি না করে দিয়েছ?”

ইকবাল চৌধুরীর কথায় নাবিলা চৌধুরী খুব স্বাভাবিক ভাবে হালকা করে উত্তর করল,
–”কার জন্য আর কাঁদবে? আমার আপন মানুষগুলো তো আজীবন আমার শত্রুদের জন্যই কাঁদে। তারপর আমাকে নিঃস্ব করে ক্ষান্ত হয়।”

নাবিলা চৌধুরীর বিদ্রুপপূর্ণ কথায় ইকবাল চৌধুরীর মুখ চুপসে যায়। নাবিলা চৌধুরী যে পুরনো ঘটনা টেনে তাকে কথা শুনাচ্ছে তা আর বুঝতে বাকি নেই। তিনি কথা ঘুরাতে বলে উঠলো,
–”কার কথা বলছ তুমি আমি সত্যি বুঝতে পারছি। মেয়েটা আবার কেঁদে শরীর খারাপ করলো।”

নাবিলা চৌধুরী ইকবাল চৌধুরীর থেকে চোখ সরিয়ে ইতির মাথায় পুনরায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–”ঐ মেয়েটার নাকি গু’লি লেগেছে। এখন আইসিইউতে ভর্তি আছে।”

–”কিহ, গুলি লেগেছে! কার গুলি লেগেছে? কোন মেয়ের কথা বলছ তুমি?”

নাবিলা চৌধুরী, ইকবাল চৌধুরীর কথায় চোখ সরু করে ইকবাল চৌধুরীর দিকে তাকালো। নাবিলা চৌধুরী চাইছে না আমার নাম উচ্চারণ করতে। আমাকে যেমন অপছন্দ করেন ঠিক তেমন আমার নামকেও। আমার নাম উচ্চারণ করতে চায় না বলেই এটা ওটা বলে ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাচ্ছে। কিন্তু ইকবাল চৌধুরীর অবুঝ সাজার বিষয়টা নাবিলা চৌধুরীকে বেশ চটিয়ে দিলো। তিনি বিছানা ছেড়ে ইকবাল চৌধুরীর সামনে এসে দাঁড়ালো। অতঃপর ইকবাল চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে খুব হালকাভাবে বলল,
–”বুঝতে পারছ না কোন মেয়ের কথা বলছি? আমার ছেলের বউয়ের কথা বলছি। তোমার প্রেমিকা মানে জেসমিনের ভাইঝির কথা বলছে। আরও বুঝিয়ে বলতে হবে?”

আচমকা নাবিলা চৌধুরীর বিষপূরক মন্তব্যে ভরকে গেল ইকবাল চৌধুরী। থতমত খেয়ে একবার বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েকে দেখে চাপা স্বরে বলল,
–”এসব কি বলছ নাবু? আমাদের মেয়ে এখানে উপস্থিত আছে। এসব শুনলে কি ধারণা হবে?”

ইকবাল চৌধুরীর কথায় ঠোঁট বাঁকালো নাবিলা চৌধুরী। অতঃপর তাচ্ছিল্য করে বলল,
–”ধারনা আবার কি? জানতে পারবে তার আসেপাশের মুখোশধারী মানুষদেরকে।”

–”অতীতের কাজগুলোর জন্য তোমার কাছে আমি আর কত ক্ষমা চাইব বল? এবার অন্তত ক্ষমা কর? আর কথায় কথায় মৃত মানুষকে টেনে আনা এবার থামাও।”

ইকবাল চৌধুরীর কথায় আবারো চটে গেলো নাবিলা চৌধুরী। ইকবাল চৌধুরীর খুব সন্নিকটে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,
–”ও মৃত মানুষ, মৃত! মৃত হয়েও আমার জীবিত জীবনে তার বসবাস প্রতিনিয়ত। অস্বীকার করতে পারবে এখনো তুমি আমার থেকে তাকে বেশি ভালোবাস না? আমার জীবনটা শেষ করে দিলো ঐ মেয়ে। এবার ওর বংশেরই আরেক বি’ষ আমার ছেলেটাকে শেষ করতে এসেছে।”

ইকবাল চৌধুরী চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ দমিয়ে চোয়াল শক্ত করে মৃদু স্বরে বলল,
–”বি’ষ কিন্তু তোমার ছেলেই সেধে গিলেছে।”

–”হ্যাঁ গিলেছে। শেখ বাড়ির সবকটাই যে জাদুকরী। একটা যেভাবে তোমাকে বশ করেছিল, আরেকটা আমার ছেলেকে।”

নাবিলা চৌধুরীর কথায় এবার আর রাগ দমিয়ে রাখতে পারল না ইকবাল চৌধুরী। ফলস্বরূপ চেঁচিয়ে উঠলো,
–”কথায় কথায় জেসমিনকে টানা বন্ধ কর নাবু।”

এবার নাবিলা চৌধুরীর রাগের পাল্লা আরও বেড়ে গেল। তিনি থাবা মেরে ইকবাল চৌধুরীর পাঞ্জাবির কলার ধরে চাপা স্বরে গর্জে উঠলো,
–”এই মুখ সামলে কথা বলবে। আমি এখন শুধু নাবিলা চৌধুরী নই, ইফান চৌধুরীর মা। আমার বেলুনের বাড়ি একটাও নিচে পড়বে না কিন্তু।”

নিমিষেই ইকবাল চৌধুরী চুপসে গেল। নাবিলা চৌধুরী ঝাঁকি দিয়ে পাঞ্জাবি কলার ছেড়ে মেয়ের কাছে বিছানায় এসে বসল। চেচামেচিতে ঘুমের মধ্যেই ভয় পেয়ে শরীর কেঁপে উঠেছে মেয়েটার। নাবিলা চৌধুরী ইতিকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বুঝাল মা পাশে আছে। ইকবাল চৌধুরী হতাশ হয়ে সোফায় বসে রইল।

সারা রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। বাইরে থেকে জোহরের আজান ভেসে আসছে। নাবিলা চৌধুরী আর একবারও ইকবাল চৌধুরীর দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। ইকবাল চৌধুরী অপলক দৃষ্টিতে নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রইল। আজ মেয়েটার বড় বড় ছেলে মেয়ে আছে। অথচ রুপে, যৌবনে যেন একটুও ভাটা পড়েনি। সে আগের মতোই স্নিগ্ধ কোমল চেহারা। পরিবর্তন শুধু এইটুকুই, আগের মেয়েটা ছিল হাস্যোজ্জ্বল। আর এখন গম্ভীর। ইকবাল চৌধুরীর চোখের সামনে ভেসে উঠে বারবার সেই দিনগুলোর কথা। কত নি’ষ্ঠুর আচরই না করতো। তার জন্য আজও তিনি অনুতপ্ত।

আজান থেমেছে আরও বেশ খানিকক্ষণ আগে। এখনো ঘর জুড়ে নীরবতা। নাবিলা চৌধুরীকে আনমনা হয়ে কিছু ভাবতে দেখে ইকবাল চৌধুরী জিজ্ঞেস করল,
–”আসছি থেকে দেখছি কি ভাবনায় ডুবে আছ। এখনোও তাই। কি এমন ভাবছ?”

আবারো কারো কন্ঠের আওয়াজে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে নাবিলা চৌধুরী। ইকবাল চৌধুরীর দিকে এক পলক তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো,
–”বাবা মারা যাওয়ার আগে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মূহুর্তে এসেও বলতে পারেন নি।”


কলেজ ছুটি হতেই ছাত্র ছাত্রীরা ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে আসল। জুই এবং তার দুই বান্ধবী গেইটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আসেপাশে চোখ ঘুরাল। জুই বলে উঠলো,
–“আজ মনে হয় সত্যি ইতি আসেনি রে।”

জুইয়ের কথায় সোমা মাথা নাড়িয়ে বলল,“আমারো তাই মনে হচ্ছে, আজ ইতি আসেনি।”

মিনা বললো,“আজ তো ওকে অনলাইনেও দেখিনি। ইতির আবার শরীর খারাপ করেনি তো?”

জুই ভাবুক চেহারা করে বললো,“হতেও পারে। আচ্ছা বাসায় গিয়ে কথা বলব নে। চল ভাইয়ার সাথে দেখা করে আসি। দুদিন ধরে জাহানপু কল ধরছে না। ভালো লাগছে না-রে কিছু।”

–“চল তাহলে। ঘুরাও হয়ে যাবে।”

জুইরা অটোতে ওঠে পড়ল। দশমিনিটে সিআইডি অফিসে পৌঁছে যায়। সকল অফিসাররা খুব মনযোগ দিয়ে কাজে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ জুইকে দেখে সকলে ওঠে আসে। জিতু ভাইয়া জুইয়ের কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
–“কিরে বনু অফিসে এলি দরকার নাকি?”

জিতু ভাইয়ার কথা শুনে চিবুক নামিয়ে নিল জুই। মুখ ভার করে কেঁদে দেয় দেয় অবস্থা। হঠাৎ জুইকে এমন করতে দেখে জিতু ভাইয়া চেয়ার টেনে জুইয়ের পাশে বসল। হেসে বলে উঠলো,
–“বোকা মেয়ে কি হয়েছে? ভালো করেছিস এসেছিস। আমার ব্যস্ততার জন্য আমি যেতে পারি নি। টাকা পয়সা তোদের কাছে আছে নাকি শেষ হয়ে গেছে?”

পাশ থেকে মিনা বলে উঠলো, “জি ভাইয়া আছে।”

–“শেষ হলে বলবি কেমন। এখন তোরা কি খাবি?”

জিতু ভাইয়ার কথার পিছে লাফিয়ে উঠলো অফিসার হিমন। খুশিতে গদগদ করে বলে উঠলো, “এসপি স্যার খাওয়ার কথা আবার জিজ্ঞেস করার লাগে কেন? আমি এক্ষুনি গিয়ে সবার জন্য বিরিয়ানির পেকেট নিয়ে আসছি।”

হিমনের কথায় সবাই হেসে দিল। অফিসার কবির বলে উঠলো, “যাও যাও গিয়ে নিয়ে আস। তোমার টাকায় বিরিয়ানি খাওয়ার সুযোগ ছাড়া যাবে না।”

নিজের পকেট থেকে টাকা ভরতে হবে মনে হতেই হিমনের চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। আমতা আমতা করে বলল,“আমাকেই খাওয়াতে হবে?”

সকলে উচ্চ স্বরে হেসে দিল। হিমন বুক টানটান করে বলে উঠলো, “কোনো ব্যপার না। আজ আমিই সকলকে বিরিয়ানি খাওয়াব।”

অফিসার হিমন বুক টানটান করেই হেঁটে যাওয়া ধরল। পিছন থেকে জিতু ভাইয়া ডাকলো টাকা নিয়ে যেতে। কিন্তু হিমন শুনলো না। এদিকে জুইকে গাল ফুলিয়ে থাকতে দেখে অফিসার আবির মজা করে বলল,
–“পিচ্ছি মুখ ফুলিয়ে বসে আছ কেন? দেখে মনে হচ্ছে দুগালে একটু ঠুকা দিলেই ঠুস করে ফুটে যাবে।”

আবিরের হেঁয়ালি কথায় জুই নাকের পাঠা ফুলিয়ে চোখ গরম করে বলে উঠলো, “আবির ভাই সবসময় ফাইজলামি করবেন না।”

–“আহ্ আবির বনুকে বিরক্ত করবে না। বনু কি হয়েছে তোর? কেউ কিছু বলেছে?”

জুই আবার চোয়াল ঝুলিয়ে নিল। অতঃপর রিনরিন কন্ঠে বলে উঠলো, “জাহানপু বিদেশে চলে গেছে শুনেছ তো?”

–“হ্যা শুনেছি।”

এবার জুই ফুপিয়ে কেঁদে বলে উঠলো, “ইতি বলেছিল তার ভাইয়া নাকি বিদেশে থকতো। জাহানপুকে বিয়ে করার কিছুদিন আগে দেশে ফিরেছে। আবার নাকি বিদেশে চলে যেতে পারে৷ আমার জাহাপুও কি এখন থেকে বিদেশে থাকবে?”

জুইয়ের মন খারাপের কারণ বুঝতে পেরেই জিতু ভাইয়ার চেহারায় উদয় হওয়া দুশ্চিন্তা সরে গেল। অতঃপর হেসে বলল,“ধুর পাগলি, জাহান বিদেশে থাকবে কেন? ঘুরা হয়ে গেলেই দেশে ফিরে আসবে।”

–“তাহলে দুদিন ধরে কল ধরে না কেন?”

জুইয়ের পাল্টা প্রশ্নে জিতু ভাইয়া আবার চিন্তিত হয়ে পড়ল। সত্যিই তো দুদিন ধরে তার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। জিতু ভাইয়া ভাবনায় ডুব দিল। তক্ষুনি একটি পুরুষালি কন্ঠ কানে আসে,
–“আসতে পারি?”

সকলে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো মাহিন দাঁড়িয়ে আছে প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে। সকল অফিসাররা মাহিনকে দেখা মাত্রই আশ্চর্য হলে। সকলে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করল। এদিকে কারো অনুমতির তোয়াক্কা না করে মাহিন নিজেই ভেতরে প্রবেশ করল। জুইকে হঠাৎ সিআইডি অফিসে দেখে মাহিনের কপাল কুঞ্চিত হয়। সে এক পলক দেখে চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনে তেসরা চোখে তাকাতেই অফিসার আবিরকে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। অতঃপর চেয়ার টেনে জিতু ভাইয়ার সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ল। মাহিনের এহেন আচরণে উপস্থিত সকলের চোখ সরু হয়ে গেলেও জিতু ভাইয়া স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করল,
–“এত মহান একজন ব্যক্তি সিআইডি অফিসে?”

মাহিন হালকা ঠোঁট বাকিয়ে হাসল। অতঃপর আবার জুইয়ের দিকে দৃষ্টি ঘুরাতেই দেখল জুই আড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে। দু’জনের চোখাচোখি হতেই জুই নাক ছিটকে চোখ সরিয়ে নিল। মাহিনও বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। কেন জানি জুইকে সহ্য করতে পারে না সে। কিন্তু কেন পারে না মাহিন নিজেও জানে না। এই একটা মেয়েই যাকে দেখলেই বিরক্তি অনুভব করে।

–“মিস্টার মাহিন কোনো প্রয়োজনে এসেছেন নাকি আমাদের মিস করছিলেন তাই দেখতে এসেছেন?”

আবিরের বিদ্রুপপূর্ণ কথায় সকলের অগোচরে দাঁতে দাঁত পিষল মাহিন। বাইরে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে শীতল কন্ঠে বলে উঠলো,
–”মাহিন চৌধুরীর এত ইউজলেস সময় নেই যখনতখন অলিগলি, স্কুল-কলেজে ঘুরে বেড়াবে।”

মাহিনের পাল্টা জবাবে আবির দাঁতে দাঁত চেপে ধরে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। মাহিন অযথা সময় ব্যয় না করে জিতু ভাইয়ার উদ্দেশ্য বললো,
–“আই থিংক আপনাকে জানানো দরকার তাই সব কাজ ফেলে আসতে হলো। ভাবি আই মিন আপনার বোন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। যতটুকু আপডেট পেলাম এইটিন আওয়ার হতে চললো, ফিজিক্যাল কন্ডিশন আগের মতোই।”

মাহিনের এমন কথায় সকলের চেহারার রং পাল্টে গেলো। মাহিনের কথাগুলো জিতু ভাইয়ার যেন বোধগম্য হলো না। তাই শুকনো ঢোক গিলে শুধালো,
–“ককি হয়েছে জাহানের?”

–“গু’লি লেগেছে বুকে। এখনো চিকিৎসা চলছে। আমার মনে হলো আর কাউকে না জানালেও আপনাকে জানিয়ে রাখা দরকার। আমি আসি।”

মাহিন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল তৎক্ষনাৎ। জিতু ভাইয়া কিছু আর বলতে কিংবা জিজ্ঞেস করতে পারছে না। তার গলা যেন কেউ চেপে ধরেছে। জিতু ভাইয়া ফ্যালফ্যাল করে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। শুধু জিতু ভাইয়াই নয়। উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ পাথরের মূর্তি বনে গেছে। শুধু সকলের ভিজে উঠা কাতর চাহনি যেন কথা বলছে। মাহিন যেভাবে এসেছিল সেভাবেই বড় বড় পা ফেলে বেড়িয়ে গেল।

মাহিন বের হতেই বিরিয়ানির অনেকগুলো পেকেট নিয়ে ভেতর আসল অফিসার হিমন। সবাই এরকম চুপচাপ বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
–“স্যার আপনাদের সকলের কি হয়েছে? আর মাহিন চৌধুরীকে সিআইডি অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলাম?”

মূহুর্তেই যেন সকলের হুঁশ ফিরে। জুই উচ্চ স্বরে কান্না করতে করত দৌড়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলো। মাহিন গাড়ির দরজা খুলতেই পিছন থেকে তার সাদা শার্ট কেউ একজন খামচে ধরেছে। থেমে গেল মাহিন। চোখমুখ কুঁচকে ঘাড় কাঁধ করে পিছনে তাকাতেই নজরে পড়ল জুইকে। কাঁদতে কাঁদতে সম্পূর্ণ চেহারা লাল হয়ে গেছে। চোখের পানি, নাকের পানি মিশে একাকার। মাহিন জুইকে এক পলক দেখে তার পিঠের দিকে তাকিয়ে দেখলো, জুই দুই হাতে তার শার্ট খামচে ধরে আছে। মাহিনের দৃষ্টি লক্ষ্য করতেই জুই তৎক্ষনাৎ হাত সরিয়ে নিল। ফুটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,
–“দয়া করে আমার জাহান আপুর কাছে নিয়ে চলুন। আমার আপুর কি হয়েছে? আমার আপু ভালো আছে? বলুন না। কিছু বলছেন না কেন? জাহান আপুও কি কবিতা আপুর মতো মরে যাবে?”

এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো জুই। মাহিন খানিকটা অবাক হলো। অতঃপর আসেপাশে একবার দৃষ্টি বুলাতেই দেখল রাস্তার সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে। মাহিন জুইয়ের দিকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“ভাবি দেশের বাইরে। জানি না কি হবে।”

মাহিন নিজের বাক্য শেষ করেই গাড়িতে উঠতে নিলে জুই পুনরায় মাহিনের শার্টের হাতা চিমটি দিয়ে ধরে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
–“দয়া করে একটিবার আমাকে আপুর কাছে নিয়ে চলুন না। আমি সত্যি বলছি আপুকে আর কোনোদিন হাদি বলে বিরক্ত করব না। আর কোনোদিন গাধা বলব না। আর আপুর কথার অবাধ্য হব না। দয়া করে আপুর কাছে নিয়ে চলুন।”

মাহিন আড় চোখে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল কাঁদতে কাঁদতে শরীর কেঁপে উঠছে মেয়েটার। জলে টইটম্বুর ছোট ছোট অক্ষিযুগল। মাহিন দৃষ্টি সরিয়ে জুইয়ের হাতটা সরিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে ছোট্ট করে বলল,
–“এটা পসিবল নয়।”

মূহুর্তেই জুইয়ের চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেলে মাহিনের গাড়ি। জুইয়ের কান্না হঠাৎই থেমে গেছে। তার দেহ যেন নিস্তেজ হয়ে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। জুই সম্পূর্ণ হেলে পড়ে যেতে নিলেই পিছন থেকে আবির মেয়েটাকে ধরে নিলো।


দুবাই।।

–“ইফান, লিসেন টু মি। উই ডিডন্ট ডু এনিথিং।”

হেলেনার কথায় কোনোপ্রকার ভ্রুক্ষেপ করলো না ইফান। ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ারে বসে সামনে রাখা টেবিলটির উপর ঝুঁকে মনযোগ দিয়ে সাজিয়ে রাখা গানগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। সেই তখন থেকে একই কাজ করছে ইফান। এদিকে তার সামনে বেঁধে রাখা হয়েছে দুবাই ডন শেখ হানাফ মাহমুদ আর তার কণ্যা হেলেনাকে। সেই তখন থেকে বাপ মেয়ে আকুতি মিনতি করছে ইফানের কাছে,”তারা কোনো দোষ করে নি তাহলে কেন তাদের আটকে রাখা হয়েছে?”
এর কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না ইফান। ইফানের দু’পাশে দুহাত পিছনে নিয়ে যন্ত্রমানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে মীরা আর ইনান।

মীরা দুবাই এসে পৌঁছেছিল এগারোটার পর। এসেই দেখছে ইফান পাগলের মতো যাকে পাচ্ছে তাকেই মে’রে লা’শ ফেলে দিচ্ছে। মীরা একবার হসপিটাল থেকেও ঘুরে সকল কিছু চেক করা সহ আরও কঠোর সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে দেওয়ার পর ইফানের পিছু পিছু ঘুরছে। তাদের সবার জানা ইফানের মস্তিষ্ক একবার বিগড়ে গেলে কখন কি করে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ইনান আর মীরা চোখাচোখি করল। এখন কি হতে চলেছে তারা ভালোই বুঝতে পারছে। বেশ কয়েকবার ইফানকে কিছু বলে বুঝাতে চেয়েছে। কিন্তু ইফানের রক্তিম চোখ তাদের দিকে ঘুরতেই চুপসে যায়।

–“হে খুদা, হামনে ক্যা কিয়া হ্যায়? হামে ইউ হি কিউ পকড় কর রাখা হ্যায়? হামনে সচ মে কুছ নহি কিয়া। হামে ছোড় দো।”

–“ছেড়ে দিব?”

শেখ হানাফ মাহমুদের কথার পিছে ইফান বিরবির করে আওড়ালো। অতঃপর ঠাস ঠাস পরপর আটবার শব্দ হলো। বু’লেটে ছি’ন্নভিন্ন হলো শেখ হানাফ মাহমুদ আর হেলেনার বুক আর মস্তিষ্ক। অতঃপর তাদের দেহ শিপ থেকে হেলে পড়ে গেল পারস্য উপসাগরের নীল পানিতে। বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে উঠলো চারপাশ। মাফিয়াদের জগতে এটা নতুন কিছু না। তবুও উপস্থিত ব্ল্যাক ভেনমের ব্লাড হাউন্ডসরা আঁতকে উঠলো ব্লা’ডিবিস্টের নি’ষ্ঠুরতায়। মীরা আর ইনান আড়ালে তপ্ত শ্বাস ছাড়ল।


পারস্য উপসাগরের উপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বড় একটি বিলাসবহুল ক্রুজ শিপ। বাইরে থেকে সম্পূর্ণ ক্রুজ শিপ আলোয় ঝলমল করছে। বিশালাকার ক্রুজ শিপটি দেখে মনে হচ্ছে ছোট্ট একটি শহর। ইফান নিজ কামড়ার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সুদূর। ঠোঁটে ধরে আছে সিগারেট। চোখেমুখে কোনো অনুভূতির রেশ মাত্র নেই। থাকবেই বা কিভাবে? গতকাল থেকে ড্রা’গস
নিয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক এখন তার ফাঁকা হয়ে আছে। তাই মনের সুখে একটার পর একটা সিগারেট টানছে। হঠাৎই ইফানের কাঁধে কেউ হাত রাখল। ইফান আড় চোখে এক নজর দেখে আগের জায়গায় দৃষ্টি স্থির করল। সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। মাঝেমধ্যে সুদূরে এক ঝলক আলো দেখা যাচ্ছে অন্য শিপ গুলো থেকে। পলক কাইসার ইফানের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বলল,
–“ম্যানে পহলে হি কহা থা ইস লড়কি সে খুদ কো দূর রাখো। তুমনে মেরি বাত নাহি মানি। জো হোনা থা, ও হো গয়া। মেরা বেটা বহুত স্ট্রং হ্যায়। মুঝে পতা হ্যায় তুম হার পরিস্থিতি মে খুদ কো সাম্ভাল লগে। অব আইসে মত রহো। যাও, জাকার আরাম করো।”

পলক কাইসারের কথায় ইফানের কোনো ভাবাবেগ হলো না। পলক কাইসার এবার আরও নরম হলো। ইফানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“মুঝে পতা হ্যায় তুম উস লড়কি সে কিতনা মোহাব্বত করতে হো। পেয়ার কোই পাপ নহি হোতা। তুমহারা পেয়ার ভি সচ্চা ঔর পবিত্র হ্যায়।”

এই বাক্যগুলো ইফানের একদমই পছন্দ হলো না। রাগে চোয়াল শক্ত করে সিগারেট মুষ্ঠি করে ধরে চাপা স্বরে বলে উঠলো,
–“ম্যাঁ উসে পেয়ার নেহি করতি। ম্যাঁ উসসে সির্ফ নফরত করতি হুঁ।”

তক্ষুনি ইফানের ফোন কল বেজে উঠলো। ইফান কানে ব্লুটুথ কানেক্ট করতেই ওপাশ থেকে কিছু একটা বলল। মূহুর্তেই ইফানের চেহারায় হিংস্রতা প্রকট হলো। ইফানের এমন চেহারা দেখে পলক কাইসার জিজ্ঞেস করলো,
–“ক্যা হুয়া বেটা?”

ইফান অধিক ক্রুদ্ধ হয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে হুংকার ছুড়ল,
–“হা”রামির বাচ্চার লা’শ ফেলে দিব।”

ইফান আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে হনহনিয়ে স্থান ত্যাগ করল। পলক কাইসার ইফানের যাওয়ার পানে চেয়ে হালকা ঠোঁট বাকিয়ে বিরবির করে আওড়ালো,
–”বিলকুল সহি।”


রাত তিনটা বেজে দশ। পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী নির্জন একটি স্থানে প্রাণপণে ছুটছে একটা লোক। আশেপাশে কাকপক্ষীও নেই। হঠাৎই ছুটতে থাকা লোকটি থমকে দাঁড়াল। কারণ পিছন থেকে একটা কু’ড়াল এসে আচমকা লোকটির পিঠে বিঁধল। লোকটি ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল স্ট্রিট লাইটের হলদেটে আলোতে দৃশ্যমান একটি মুখাবয়ব। ইফান বাঁকা হেসে ঠোঁটে সিগারেট ধরে এগিয়ে আসতে লাগল। লোকটা হেলে মাটিতে পড়তেই ইফান এসে এক হাঁটু গেড়ে লোকটার বুকের উপর বসে বিদ্রুপ করে বললো,
–“এতই সহজ আমার খাঁচার পাখিকে আহত করে পালানো? এতোই সহজ!”

হ্যাঁ এই সেই লোক যে আমার বুকে গু’লি চালিয়েছিল। পলক কাইসার তৎক্ষনাৎ আশেপাশের সকল এরিয়া সিলগালা করে দিয়েছিল। যার কারণে লোকটি এই এরিয়ার মধ্যেই পলাতক ছিল। আজ প্রায় ছত্রিশ ঘন্টা পর ইফান খুঁজে বের করেছে। লোকটা গো’ঙ্গাতে গো’ঙ্গাতে বললো,
–“আমি কিছু করিনি ছেড়ে দাও আমায়।”

–“কার কথায় মা’রতে চেয়েছিলি?”

–“আমাকে টাকা দেওয়া হয়েছিল। আমি সুপারি কি’লার। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাজ করি।”

–“কে পাঠিয়েছে তোকে?”

–“আমি কিছু জানি না?”

তৎক্ষনাৎ ইফান হাতের জ্বালানো সিগা’রেটটি লোকটরা চোখে চেপে ধরল। লোকটি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো সাথে সাথে। ইফান পৈশাচিক হেসে হিসহিসিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
–“কার অর্ডারে কাজ করেছিস?”

–“ইইকবাল চৌধুরী।”

লোকটা নামটি উচ্চারণ করতে না করতেই ইফান হুংকার ছেড়ে লোকটির গলায় না’ইফ চালিয়ে দিল। লোকটা গো’ঙ্গাতে গো’ঙ্গাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।


এক হাতে র’ক্তমাখা কু’ড়াল আরেক হাতে ছু’রি নিয়ে উদাস ভঙ্গিমায় গলিতে হাঁটছে ইফান। কিছুটা এগোতেই দেখতে পেলো একটা মসজিদ। মসজিদের ভেতর লাইট জ্বলছে। মধ্যে রাত হওয়ায় আশেপাশে কেউকে নজরে পড়ল না। ইফান নিগুঢ় দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ মসজিদের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। ইফানের বত্রিশ বছর জীবনে সে আজ পর্যন্ত কোনোদিন মসজিদে আসে নি। আসবে কিভাবে? তার বড় হয়ে উঠাই তো অন্ধকার বিভিষিকাময় জগতে। ছিলনা কোনো আক্ষেপ, আর না ছিল কোনো কিছু চাওয়া। যা প্রয়োজন তা শুধু ছিনিয়ে নিতে শিখেছে। কিন্তু আজ যে একটা জিনিস চাইতে ইচ্ছে করছে। যদি উপায় থাকতো তাহলে বোধহয় এবারও ছিনিয়ে নিয়ে জিতে যেতো সে। কিন্তু তার যে কোনো উপায় নেই। আজ কি তার ভেতরে যাওয়া উচিত হবে?

মনের সাথে তর্কবিতর্ক করে অবশেষে হাওজে গিয়ে হাতের কু”ড়াল আর ছু’রি রেখে দেহে লেগে থাকা র’ক্ত মুছে হাতমুখ ভালো করে ধুতে লাগলো। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার জন্য হাওজে ওযু করতে আসা বৃদ্ধ ইমাম মধ্যে রাতে র’ক্তাক্ত আর অ’স্ত্র হাতে ইফানকে দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। অথচ ইফান পাশে যে কেউ আছে তার দিকে তাকিয়ে একবার দেখতেও চাইলো না। সে নিজের মতো করে হাত পা ধুয়ে মসজিদের ভেতর প্রবেশ করল।

জীবনের প্রথম মসজিদে পা রাখতেই ইফানের বুক আচানক কেঁপে উঠলো। ইফান ভেতরে ঢুকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বড্ড বেশি অস্বস্তি হচ্ছে তার। সে তো পাপিষ্ঠ পুরুষ। তাকে তো এসব মানায় না। ইফান জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে খুব কষ্ট শুকনো ঢোক গিললো। গতকাল থেকে নেশার দ্রব্য সেবন করেই এখনো বেঁচে আছে। ইফান শুকনো কেশে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,
–“আমি আসতে চাইনি বাধ্য হয়ে এসেছি, আমার বেইমান মহিলার জন্য।”

আবার চুপ হয়ে গেল ইফান। এটুকু বলেই যেন তার সব কথা ফুরিয়ে এসেছে। কি বলবে সে বুঝতে পারছে না। পরপর ঢোক গিলে ইফান আবার বলতে লাগলো,
–“দেখেন স্যার, কিভাবে চায়তে হয় অ্যাকচুয়ালি আই ডোন্ট নো। তাই সরাসরি আপনার সাথে একটা ডিল করতে চাই।”

পুরো মসজিদ জুড়ে নিরবতা। ইফান ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে লাগলো,
–“দেখুন আমি ভালো মানুষ না। আমার সবটা জুড়েই পাপে ভরপুর। যদি আমার আমলনামা নিয়ে বসেন, তাহলে সেখানে পাপ কাজ ছাড়া কিছুই পাবেন না। কারণ আমি কখনো কোনো ভালো কাজ করিই নি। আমি যদি টপকে যাই তাহলে সামনের যে পাপগুলো করব, যে বা’স্টার্ডগুলোকে খু’ন করবো ঐগুলো বেঁচে যাবে। পৃথিবীতে আমার আবার কেউ নেই বুঝলেন। কারো দাবিটাবিও থাকবে না। আমার জন্য কাঁদারও আবার মানুষ নেই। কি লাভ? কোনো লাভ নেই। বরং আমি ম’রলে সব দিকেই লাভ। আপনি আমাকে টপকে দেন বরং। আর আমার বদলে ঐ বেইমানটাকে বাঁচিয়ে রাখেন। শা’লি বড়ই ন্যায়বান বুঝলেন। তাই আমার অংশ তার পেটে এসেছিলো বলে মেরে দিয়েছে। অবশ্য খুব ভালো কাজ করেছে। আমার না পাওয়ার শূন্য খাতা পূরণ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।”

একনাগাড়ে কি সব বললো ইফান নিজেই বুঝতে পারছে না? জীবনের প্রথম বার এমন এলোমেলো হয়ে গেল সে। ইফান বুক ফুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে মাথা নত করে নিলো। ভাংচুর হয়ে আসা কন্ঠনালি দিয়ে খুব কষ্টে আওড়ালো,
–“সবাই বলে আপনি সব পারেন। আপনি কি পারেন না আমার আয়ু ওকে দিয়ে দিতে। ওর গর্ভে যে আমার অংশ আছে সেও কি খুব বেশি পাপী? ও বেঁচে গেলে কি খুব বেশি পাপ হবে? আমার বদলে ওদের কি বাঁচানো যায় না? প্লিজ আল্লাহ, সেভ দেম। আর কোনোদিন কিছু চাইব না। ট্রাস্ট মি, এই নষ্ট জীবনের চাওয়া পাওয়ার শূন্য খাতা নিয়ে আর কোনোদিন অভিযোগ করবো না। এটাই শেষ। প্লিজ…”

এই কলুষিত জীবনে কখনো কারো কাছে মাথা নত করে নি এই ব্লা’ডিবিস্ট। এই প্রথম মাথা নত করলো। তাও নিজের সৃষ্টি কর্তার কাছে। আজ সত্যিই অসহায় ঠেকছে মাফিয়া বসকে। আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেল না। কন্ঠ নালি তার নিভে গেছে। মাথা নত করে একই ভাবে বসে রইলো সে। এদিকে সেই তখন থেকে পিছনে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ইমামের চোখ বেয়ে আপনা-আপনি কখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তা ইমাম নিজেই বুঝতে পারে নি। কিছুক্ষণ আগেও এই ইফানকে ভয়ংকর রুপে দেখে ভয় পেলেও এখন কেন জানি ইমাম সাহেবের ভয় হচ্ছে না। তিনি সাহস করে পিছন থেকে ইফানের কাঁধে হাত রাখতেই ইফানের মস্তিষ্ক সচল হয়ে গেল। তড়িৎ বেগে ঘাড় কাঁধ করতেই ঝলঝল নয়নে তাকিয়ে থাকা ইমামকে দেখলো। ইমাম সাহেব ভেজা কন্ঠে বললো,
–“তিনি আর-রাহীম, তিনি আল-গফুর। অর্থাৎ আল্লাহ অতি দয়ালু, আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল। এই মহাবিশ্বের এমন কিছুই নেই যা তাঁর অসাধ্য। তুমি নিজের ভুল স্বীকার করে তাঁর কাছে চেয়েছো। ইনশাআল্লাহ, তিনি তাঁর এই পবিত্র ঘর থেকে তোমাকে খালি হাতে ফেরাবেন না। এখন রাতের শেষ প্রহর– তাহাজ্জুদ পড়ার সর্বোত্তম সময়। এই সময় মহান আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং তাঁর বান্দাদের দোয়া কবুল করেন। তুমি এখন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে মন খুলে চাও। তিনি নিশ্চয়ই বান্দার ডাক কবুল করবেন।”

ইমামের কথায় ইফান ভ্রু কুঞ্চিত করলো। ইমাম সাহেব কি একটা ভেবে শুকনো কেশে বলে উঠলো,
–“বাবা তুমি কি নামাজ পড়তে জানো?”

শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ঠোঁটগুলো ইফান জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে নিচু স্বরে বললো,
–“উহু। ওকে দেখতাম রাতবিরেত পড়তে।”

ইমাম সাহেব চোখের পানি মুছে মৃদু হেসে বললেন, “আমি পড়ছি, তুমি আমাকে অনুসরণ করো।”

ইমাম সাহেব ইফানের সামনে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। ইফান প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথায় পেঁচিয়ে জীবনের প্রথমবার ইমাম সাহেবকে অনুসরণ করে নামাজ আদায় করতে লাগল।

চলবে,,,,

অনেক বড় করে পর্ব লিখি হাজার হাজার শব্দের। ভুল ত্রুটি থাকলে কষ্ট করে বুঝে পড়ে নিবেন । উপাখ্যানটি প্রায় শেষের দিকে। সামনের প্রতিটি পর্বে বাকি রহস্যগুলো উন্মোচন করা হবে। আজকের পর্ব কেমন লাগলো রিয়েক্ট দিয়ে গঠনমূলক মন্তব্য করে জানাবেন। গল্প সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন থাকলে আমার ফেইবুক গ্রুপে পোস্ট করে বাকি মেম্বারদের থেকে জানতে পারেন। হ্যাপি রিডিং 💗

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply