Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৫৫+৫৬


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৫৫
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

   🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

লোকটা ট্রিগারে রাখা আঙ্গুলে চাপ বসাতে যাবে ঠিক তক্ষুনি এক এক করে পনেরো থেকে বিশটির মতো কালো মার্সিডিজ মাঝ বাজারে আমাদের কাছে এসে থামলো।উপস্থিত শতাধিক পাবলিক সরে দাঁড়িয়েছে তৎক্ষনাৎ। ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা লোকটা বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় উচ্চারণ করে ঝটপট সরে গেলো।
মার্সিডিজগুলো থেকে হনহনিয়ে কালো পোশাকধারী গার্ডগুলো বেরিয়ে এসে পুরো বাজার ঘিরে দাঁড়ালো।ইনান গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে অপজিট ডোর খুলে দিতেই ইফান দ্রুত ব’ন্দু’ক হাতে নেমে আসলো।সে কোনোদিক তা থাকিয়ে বড় বড় পা পেলে আমার দিকে তেড়ে আসছে।পড়নে সফেদা রঙের শার্ট।শার্টের হাতা কনুই অব্ধি তুলে রাখা।শক্ত চোয়াল, চোখদুটো রাগে লাল হয়ে আছে।আসেপাশের মানুষ ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে।সকলে ইফান কে খুব ভালো করেই চেনে।এই লোক যেখানে থাকে সেখানেই আতংক ধরিয়ে দেয়।
আমি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে ইফানের দিকে তাকিয়ে।আমার কাছে এসব নতুন কিছু না।বরং ভাবছি এই লোক এখানে কি করছে?এরই মাঝে ইফান আচমকা এসে এক হাতে আমার দু’গালে থাবা মেরে ধরে।দাঁতে দাঁত পিষে আওরায়,

–“বা’ন্দির বাচ্চা ম’রার লাগি মন চাকুম-চুকুম করছে।আমি ভালো হয়ে থাকলে তোর শান্তি লাগে না,তাই তো।না করেছিলাম না,আমার অনুমতি ছাড়া একা কোথাও না যেতে।”

আমি আশেপাশে এক নজর তাকিয়ে দেখলাম, সকলে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। আমি আবার ইফানের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ওর হাত টেনে সরাতে সরাতে শক্ত কন্ঠে বললাম,”আমি তোমার দাসি নই যে তোমার সব কথা শুনে চলবো।”
ইফান দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,”না দাসি হইবি কেন?তুই তো আমার বান্দি।থা’প’ড়ে না তোর সব দাঁত ফেলে দিব হা’রা’মির বাচ্চা।মা’স্তানি দেখাস রাস্তাঘাটে? এখন যদি তোর কিছু হয়ে যেতো তখন,,,”

–“মুক্তি পেতাম। তোমার থেকে মুক্তি পেতাম আর,,,”

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।তার আগেই ইফান তার সিগারেটে পোড়া কড়কড়ে ওষ্ঠেজোড়া দিয়ে আমার কোমল ওষ্ঠভাঁজে হামলে পড়লো।হঠাৎ এমন হামলায় আমি দু কদম পিছিয়ে গেলাম।আমি স্তম্ভিত হয়ে ইফানের চোখের দিকে তাকালাম তৎক্ষনাৎ। ইফান আমার কাজল রঙা অক্ষিপটের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার ওষ্ঠে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিচ্ছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই হুঁশ ফিরতেই ইফানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলাম। ইফান এতে আমার ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে দিলো।তাকে একবিন্দুও সরাতে পারছি না।বরং ওর ওষ্ঠের উত্তাপে আমি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলাম।”ওম ওম” আওয়াজ করে শার্টের কলার চেপে ধরলাম।ইফান বন্দুক ধরে রাখা হাত আমার কোমরে জড়িয়ে ধরলো।অপর হাতটা আমার ঘাড়ে রেখে তার কাছে টেনে নিলো।

ইফানের আগমনে পুরো বাজার স্তব্ধ। সেখানে সাইরেন আওয়াজ করতে করতে পুলিশ আর সিআইডির গাড়ি এসে থামলো।তারা দ্রুত গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের এই অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।জিতু ভাইয়া গাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসতেই আমাকে আর ইফান চুম্বনরত অবস্থায় দেখতে পায়।তিনি তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি নত করে ফেলে।হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাগে ফেটে পড়ছে।
আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে ভাইয়াকে দেখতে পেয়ে ইফানকে শরীরের সকল শক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে আরও দু কদম পিছিয়ে গেলাম।হঠাৎ ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে ইফানও এক পা পিছিয়ে গেলো।

আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে রাগে রিরি করতে করতে চাপা স্বরে বলে উঠলাম,”জা’নো’য়ার একটা।”
পরমুহূর্তে আবার আড় চোখে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকালাম। তিনি এখনো দৃষ্টি নত করে দাঁড়িয়ে। ইফান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট মুছে আবার আমার কাছে এগিয়ে আসতে লাগলো।আমি ল’জ্জায় আর কোনো দিকে তাকাতে পারলাম না।তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে লাগলাম।আমি ইফানের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি। ইফান ঘাড় কাঁধ করে আমার দিকে শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।অতঃপর জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে ক্রুর হাসলো।

আমি জনগনের মাঝখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।আমার পিছুপিছু আমার বান্ধবী সহ পলিও বেড়িয়ে আসলো।আমি চোখের আড়াল হাতেই ইফানও আমার পিছু আসার জন্য উদ্ধত হলো। তার লম্বা ঘন কালো চুলগুলো কে পিছনের দিকে ঠেলতে ঠেলতে জিতু ভাইকে ক্রস করে চলে যাবে তখনই জিতু ভাইয়ার কন্ঠ ইফানের কর্ণধার হলো,

–“কোথায় যাচ্ছেন মি ইফান চৌধুরী?”

ইফান থামলো।এক পা পিছিয়ে এসে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকালো।জিতু ভাইয়া ইফানের উপর থেকে নিচে একবার দৃষ্টি বুলালো। ইফানের হাতে রিভলবার দেখে জিতু ভাইয়া ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হেসে হেয়ালি কন্ঠে বললো,
–“দিন দুপুরে দেখছি অ’স্ত্র নিয়ে ঘুরছেন!বাংলাদেশকে কি ফ্রান্স মনে করছেন নাকি?”

ইফান সুক্ষ্ম দৃষ্টি বুলালো জিতু ভাইয়ার উপর। অতঃপর শান্ত ভঙ্গিমায় বললো,”কিসের ফ্রান্স আর কিসের বাংলাদেশ?সব-ই তো আমার শ্বশুরবাড়ি, মাই ডিয়ার এক ইঞ্চি নু’নুওয়ালা শা’লার ভাই ।”

ইফানের বাক্যটা জিতু ভাইয়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অফিসারের কানে যেতেই তারা শুকনো কেশে উঠলো।জিতু ভাইয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ক্রুদ্ধ নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হিসহিসিয়ে বললো,
–“ভদ্র ভাবে কথা বলুন।”

জিতু ভাইয়ার কথায় ইফান একটা ব্রু উঁচালো।অতঃপর হাতের রিভলবার পিছনে গুজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাতে শার্টের কলার ঠিক করে বললো,”ঠিক আছে মাননীয় পাখি ছোট শালাবাবু।”

জিতু ভাইয়ার মুষ্টিবদ্ধ হাতদুটো আরও শক্ত হয়ে আসলো।তিনি রাগে দাঁত কটমট করছে।ইফান চোখ মেরে ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বাঁকা হেসে শিশ বাজিয়ে স্থান ত্যাগ করলো।
জিতু ভাইয়া ঘাড় কাঁধ করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো।পাশ থেকে অফিসার আবির বললো,”ইফান চৌধুরী কে যেতে দিলেন স্যার?”
জিতু ভাইয়া ইফানের যাওয়ার দিকে তাকিয়েই বাঁকা হেসে বললো,”এক মাঘে শীত যায় না।জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ।”


পিছন থেকে তন্নিরা ডাকছে।আমি কোনো কিছু না শুনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আর পারছি না।সত্যি এ জীবন না থাকলে বেশি ভালো হয়।এক এক করে জীবন থেকে আপন মানুষগুলো কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে!
আমি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লাম।ভেতরে চেপে রাখা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করলাম।তন্নিরা আমার কাছে এসে থামলো।আমার পিছনে ছুটে এসে এখন হাঁপাচ্ছে। পলি আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
–“বাসায় যাবে না?”

কিছু আর বললাম না।আমি ক্লান্ত চোখে পলির দিকে তাকালাম। মেয়েটাও হাঁপিয়ে উঠেছে।সুমাইয়া বললো,”আল্লাহ কি হয়ে গেলো!জাহান বাসায় চলে যা তুই।র’ক্তে মেখে আছিস।”
আমি নিজের দিকে তাকালাম।শাড়ি হাত দু’টোতে র’ক্ত লেগে আছে।মানুষের র’ক্ত। ভাবতেই ভেতর থেকে ক্লান্তি আরও বেড়ে যাচ্ছে। তবুও নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলাম।কারণ তন্নিরা আজকের এই দৃশ্য দেখে ভেতর থেকে অনেক ভেঙে পড়েছে। ভয়ও পাচ্ছে। কিন্তু আমাকে সামলানোর জন্য নিজেদের সামলে নিচ্ছে। আমি তন্নিদের বললাম,”সন্ধ্যা হলো বলে।তোরা তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যা।একা না যেতে পারলে জিতু ভাইয়াকে বল। তিনি ব্যবস্থা করে দিবে।ভাইয়াকে তো আমি আর এই মুখ দেখাতে পারবো না।”
নাফি আামর কাঁধে হাত রেখে বললো,”তুই এত ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সত্যিই কি সব ঠিক হবে?নিজের মন কে প্রশ্ন করলাম। কোনো উত্তর পেলাম না।আমি তন্নিদের বলালম চলে যেতে।ওরা বাধ্য হয়ে হোস্টেলের উদ্দেশ্য চলে গেলো।আমি তাকিয়ে দেখলাম ওরা গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। ওরা চোখের আড়াল হতেই পলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই আলাল দুলাল এসে হাজির হলো।পলির উদ্দেশ্য দুলাল বললো,”ভাবি ইমরান ভাই ডাকছে চলুন।”
পলি আমার দিকে তাকালো।আমি হ্যাঁ বলতেই দুলালের সাথে চলে গেলো।আলাল আমার দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিলো।আমি হাত দু’টো ধুয়ে নিলাম।অতঃপর অন্যদিকে তাকিয়ে বোতলটা এগিয়ে দিলাম।শাড়ির আচঁলে হাত মুছতে মুছতে বললাম,”কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?তোর ভাই কোথায়?”

–“এখানে জান।”

ইফানের কন্ঠ কানে আসতেই ঝটপট ঘুরে দাঁড়ালাম।ইফান আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে হাতের বোতলটা ফেলে দিলো।আমি অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম।ইফান তার শীতল হাত আমার গালে স্পর্শ করতেই হালকা কেঁপে উঠলাম।ইফান সুক্ষ্ম চোখে আমায় পরুক করে কপালেও হাত ছুঁইয়ে দেখলো।আমি হাত সরিয়ে হাঁটা ধরলাম।ইফান আমার হাতে টান মেরে তার বক্ষে এনে ফেললো।রক্তে ওর সফেদা শার্টও মাখামাখি। ইফান উতলা হয়ে উঠলো,”জান ঠিক আছ তুমি।”

–“বাড়িতে নিয়ে চল।”

আমি মৃদু স্বরে বাক্যটা উচ্চারণ করতেই ইফান আমাকে পাজাকোলে তুলে নিলো।হঠাৎ এভাবে কোলে তোলায় তাড়াতাড়ি ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম।বিরক্তিতে বললাম,”কি শুরু করেছে তুমি? তোমার জন্য মনে হয় এখন আর বাইরে মুখও দেখাতে পারবো না।”
ইফান আমাকে শপিং মলের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো,”বাইরে দেখানোর দরকার নেই। আমাকে দেখালেই হবে।”

–“তুই একটা কু’ত্তা, বান্দর, শ’য়’তান…. “

আমি বকাঝকা করতে লাগলাম। ইফান খালি হাসছে।
__

সন্ধ্যা হয়ে গেছে।রাস্তা দোকানপাট সহ আসেপাশের সবকিছুই কৃত্রিম আলোয় আলোকিত।ইফান আমাকে নিয়ে শোরুমে আসলো।যা বুঝলাম আগেই ইফানের লোক কথা বলে রেখেছে। তাই আমরা আসতেই ম্যানেজার সহ সকল স্টাফরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ম্যানেজার আমাদের ট্রায়াল রুমের সামনে দিয়ে চলে গেলো।আমি ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাব তখনই ইফান হাত দিয়ে বাঁধা দিয়ে ভেতরে চলে আসে।আমি কপাল কুঁচকে বললাম,
–“এটা লেডিস ট্রায়াল রুম। বেড়িয়ে যাও।”

ইফান আমার কোনো কথা শুনলো না।বরং ডোর অফ করে আমাকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।আমি আশ্চর্য হলাম।কারণ পুরো ট্রায়াল রুম ভর্তি নামি-দামি ব্র্যান্ডের শাড়ি,থ্রি পিস সহ সুন্দর সুন্দর গাউন__ক্লথিং রেকে সাজিয়ে রাখা।সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় বেশিরভাগ কাপড়ই পিংক কালারের বিভিন্ন শেডের উপর। আমার নজর আটকালো আলাদা করে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা রোজ পিংক কালার শাড়িটার উপর।হ্যাঁ,এটাই তো সেই শাড়িটা যা আজকে মার্কেটে আমি পছন্দ করেছিলাম।ঐ শাড়িটা এখানে কি করে আসলো?

–“জান তাড়াতাড়ি চেইঞ্জ করে হুডি পরে নাও।তোমার নিশ্চয়ই ঠান্ডা লাগছে।”

আমার ভাবনার মধ্যেই ইফানের কন্ঠ স্বর কানে আসে।আমি ইফানের দিকে তাকালাম।সত্যিই আজ ঠান্ডা পড়েছে।ইফান আমার হাত ধরে ক্লথিং রেকগুলোর কাছে নিয়ে গেলো,,
–“বেইবি কোনটা পছন্দ হয়েছে তোমার?তোমার যা পছন্দ তা পড়ে নাও।বাকি ড্রেসগুলো প্যাকিং করে নিয়ে যাব, কেমন।”

আমি রোজ পিংক কালার শাড়িটির দিকে তাকালাম। ইফান আমার দৃষ্টি অনুযায়ী সেদিকে তাকালো।অতঃপর শাড়িটা হাতে নিয়ে আমার বাহুতে জড়িয়ে বললো,”ওয়াও পারফেক্ট।”
আমিও দেয়ালের মিররের দিকে তাকালাম। ইফান আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,”তাড়াতাড়ি পড়ে নাও।”
আমি ইফানের থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললাম,”চেইঞ্জ করবো। বেরিয়ে যাও।”
–“হোয়াট?”

–“বললাম বেরিয়ে যাও।চেইঞ্জ করবো।”

–“তো কর।বেরিয়ে যাব আবার কি?”

বলতে বলতে ইফান বসে পড়লো।তারপর তার শার্টের বোতামে হাত চালাতে লাগলো।তারও শার্ট চেইঞ্জ করতে হবে।আমি ইফানের ভাবলেশহীন ভঙ্গি দেখে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে আরেক পাশে ঘুরে দাঁড়ালাম।অতঃপর শাড়িটা খুলে ব্লাউজের বোতামে হাত চালালাম।ইফান নিজের শার্ট খুলে হাতে আরেকটা সাদা শার্ট তুলে পড়ে নিলো।শার্টের বোতাম লাগাবে তখনই আমার উপর নজর আটকালো।আমি ব্লাউজ খুলতেই দৃশ্যমান হলো ভেতরের কালো রঙের অন্ত:বাস।আমি পিছনে হাত বাড়িয়ে হুকগুলো খুলতে লাগলাম।ইফান বড়সড় ঢোক গিলে সিঙ্গেল কাউচটায় গা ছেড়ে দিলো।অতঃপর ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ বন্ধ করে শার্টটা আরেকটু মেলে দিলো।হঠাৎই তার প্রচুর গরম লাগছে।ইফান আবার আমার দিকে তাকালো।আমি ইনারের ফিতা কাঁধ থেকে নামাচ্ছি। ইফান পরপর ঢুক গিলে বিরবির করলো,
–“কন্ট্রোল ছোট ভাই কন্ট্রোল।”

আমি গা থেকে ইনার খুলতেই দেহের উপরের অংশ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হলো।ইফানের চোখে আমার ফর্সা খালি পিঠ দৃশ্যমান।সেখানে অনেক জায়গায় তার করে দেওয়া লালচে দাগ ভেসে আছে।ইফান তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল। আমি আরেকটা ইনার নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই পিছন থেকে ইফান জড়িয়ে ধরে।আমি কোনো মতে সামনে রাখা শাড়ির একাংশ এলোমেলো করে বুকের সামনে ধরলাম।ইফানের খালি বুক আমার পিঠের সাথে মিশে আছে।লোকটা হঠাৎ উন্মাদের মতো আচরণ করছে।আমার উদরে তার এলোমেলো দু’হাতের বিচরণ।আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, “কি হচ্ছে কি?”

সে আমার ঘাড়ে কখনো ঠোঁট তো কখনো নাক ঘষে আমার দেহের ঘ্রাণ নিচ্ছে। সেভাবেই মাদকীয় হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“তুমি অনেক জুসি জান।নিজেকে সামলাতে পারছি না।বউ চল এখানেই,,,,”

–“ইফান,, “

আমি দূরে সরে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম।ইফান ঢুক গিললো। ঘাড়ে হাত বুলিয়ে আমার দিকে অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে রইলো।আমি বুকে ধরে রাখা কাপড়টা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,”এভাবে তাকাবে না।দৃষ্টি সরাও।”

ইফান জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে হাস্কি স্বরে বললো,”বউ বেশি সময় নিব না।জাস্ট টুয়েন্টি,,,,,”

ইফান বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না।তার আগেই দৃষ্টি পরে আমার পায়ের দিকে। কারণ ইতোমধ্যে আমি পায়ের জুতা খুলতে উদ্ধত হয়েছি।ইফান শুকনো ঢুক গিলে পুনরায় কাউচে গিয়ে বসে পড়লো।আমি গাল ফুলিয়ে শ্বাস বের করে ড্রেস চেইঞ্জ করে নিলাম।ইফান গোমড়া মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বারবার ঢুক গিলতে গিলতে শার্টের বোতামে হাত চালাতে লাগলো।


চৌধুরী ম্যানশন…।।

লিভিং রুমে বাড়ির সকলে উপস্থিত হয়েছে। সকলের দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু নোহা।সে সোফায় দু পা তুলে বসে ভে ভে করে কেঁদে ভাসাচ্ছে।আসেপাশে টিস্যুর ছোড়াছুড়ি।তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মহিলা পুলিশ কনস্টেবল। সোফার এক কোণে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নুলক চৌধুরী।নাবিলা চৌধুরীও উপস্থিত। তিনি মূলত অফিস থেকে সবে মাত্র বাসায় এসেছে। এসেই দেখে বাড়িতে পুলিশ। একজন মহিলা কনস্টেবল নোহাকে শান্তনা দিয়ে বললো,

–“ম্যাম চিন্তা করবেন না।আপনার মূল্যবান সম্পদ আমরা যে করেই হোক খুঁজে বের করবো।”

তক্ষুনি বাড়ির চারকোণা থেকে কিছু পুলিশ বেরিয়ে এসে নোহার সামনে দাঁড়ালো।নোহা কান্না থামিয়ে সোফার উপর উঠে দাঁড়িয়ে খুশিতে গদগদ করতে করতে জিজ্ঞেস করলো,”পু আংকল, পেয়েছেন?”

পুলিশ অফিসার শুকনো কেশে বললো,”জি না ম্যাম। আমরা এখনো আপনার মূল্যবান সম্পদের সন্ধ্যান পাই নি।”
নোহা আবার ধপ করে সোফায় বসে ভে ভে করে কাঁদতে লাগলো।মিরা,পলি আর ইতি নিজের হাসি কোনো মতে আটকাতে চাইছে।ইমরান ঠোঁট কামড়ে বসে আছে।তার চোখে স্পষ্ট হাসি দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে হাসিতে ফেটে পড়ছে।
দাদি নোহাকে শান্তনা দিয়ে বললো, “বোইন আর কান্দিস না।”
নোহা দাদির বুকে মাথা রেখে তার বুকে দু’হাত দিয়ে হালকা আ’ঘা’ত করে কাঁদতে লাগলো,”ও গ্র্যানি,গ্র্যানি গোওওও।”

আমি তক্ষুনি চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।ঢুকতেই দাদির সাথে চোখাচোখি। দাদি মুচকি হেসে শাড়ির আচল দিয়ে মুখ ঢাকল।আমি যেদিক দিয়ে এসেছি আবার সেদিক দিয়ে বেড়িয়ে যেতে যেতে চোখমুখ খিচকে বিরবির করে বলতে লাগলাম,,

–“আস্তাগফিরুল্লা আস্তাগফিরুল্লা।”

সদর দরজা দিয়ে বের হতে নিলেই ইফানের বুকে ধাক্কা খেলাম।ইফান আমার বাহুতে ধরে বললো,”কি হয়েছে?আবার বেরিয়ে যাচ্ছ কেন?”

আমি দাঁত কটমট করে বললাম,”বালের বেডা,তুই আমার ই’জ্জ’ত কিছু রাখলি না।”
ইফান ঠোঁট কামড়ে ঘাড়ে হাত বুলাতে লাগলো।কিছু বলতে যাবে তার আগেই নোহার কন্ঠ কানে ভেসে আসে,
–“প্রিটি গার্ল তুমি এসেছঅঅঅ…।”

আমি তৎক্ষনাৎ পিছনে ফিরে তাকাতে না তাকাতেই নোহা ব্যাঙের মতো লাফিয়ে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।প্রথমত এতগুলো দিন পর নোহাকে এই বাড়িতে হঠাৎ দেখে বিস্মিত হলাম।তার উপর এই মেয়ে এভবে কাঁদছে কেন?আমি বেশি দূর আর ভাবতে পারলাম না।তার আগেই নোহা আমার হাত ধরে টানতে লাগলো সদর দরজার দিকে।
–“প্রিটি গার্ল কুইকলি আমার সাথে চল।”

–“কেন কি হয়েছে?”

আমার কথায় নোহা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙে নাক টানতে টানতে বললো,”এক্ষুনি সিআইডি অফিসে গিয়ে তাদের ইনফর্ম করতে হবে।যে করে হোক আমার জিনিস চাই।”

নোহার কথা আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তখনই চোখ পড়ে বাড়ি ভর্তি পুলিশের উপর। আমি আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করলাম ,”বাসায় পুলিশ কেন?কি হয়েছে?”

অতঃপর পুলিশ অফিসার সবটা খুলে বললো।।নোহা সকালে সিআইডি অফিস থেকে চৌধুরী বাড়িতে ফিরে।অতঃপর দুপুরে শাওয়ার নিয়ে তার জাঙ্গিয়াটা বেলকনিতে রোদে শুকাতে দেয়।বিকেলে সেটা আনতে গিয়ে দেখে জাঙ্গিয়াটা নেই। তারপরই শুরু হয় নোহার পাগলামি। পুলিশ কে ফোন করে বলে জলদি চৌধুরী বাড়িতে আসতে।এখানে বিশাল বড় চুরি হয়েছে।পুলিশ মূহুর্তেই ফোর্স নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে আসে।এসে যখন শুনে জাঙ্গিয়া কেইস।তখন পুলিশ অফিসাররা বাকহারা হয়ে পড়ে।আর সেই বিকাল থেকে এখন রাত সারে সাতটা অব্ধি পুলিশ অফিসাররা পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজছে। কিন্তু জাঙ্গিয়ার খুঁজ কোথাও পাচ্ছে না।এদিকে নোহা কেঁদে কেঁদে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে।

ইফান পুলিশদের চলে যেতে বললো।পুলিশ আর এক মূহুর্ত দেরি না করে পালালো।তাদের জীবনে তাদেরকে নোহার মতো এমন নাকানিচুবানি কেউ করে নি।ইফান নোহার কৃত্তি-কলাপ শুনে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বিরক্তি নিয়ে বললো,”কোন মা’দা’রির পোয়া জাঙ্গিয়া নিয়ে গেলো রে?তরে নিয়ে যাইতে পারলো না!”
ইফানের কথা নোহা কানে তুললো না।সে তার মতো বকেই যাচ্ছে,,
–“ও প্রিটি গার্ল তাড়াতাড়ি চল কেইস করতে হবে।সিআইডি কে সবটা জানাতে হবে তো।”

নোহার কথা শুনে বেশ বিরক্ত হচ্ছি।এদিকে নোহা আমাকে টেনে নিয়ে যেতে না পেরে ফ্লোরে বসে হাত-পা ছড়িয়ে বাচ্চাদের মতো ভে ভে করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,
–“কত কষ্ট করে সিক্স মানথ আগে জিতু বেইবির জাঙ্গিটা চুরি করেছিলাম।এখন আবার কিভাবে করবো ওওওও।”

নোহা নিজের কথা বলে আবার ভে ভে করে কাঁদতে লাগলো।আমি যেন আরেক দফা হোটচ খেলাম।এই মেয়ে এসব কি বলে?আমি হা করে নোহার দিকে তাকিয়ে রইলাম।পলি, ইমরান, মিরা, ইতি এমনকি দাদিও হাসছে।আবার দাদির সাথে আমার চোখাচোখি হতেই আমি গলা খাঁকারি দিতে দিতে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে লাগলাম।তক্ষুনিই সদর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠে।আমার পা থেমে যায়।আমি ঘাড় কাঁধ করে সদর দরজার দিকে তাকালাম।

চলবে,,,,,,,,,,,

জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৫৬
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

আমি উৎসুক দৃষ্টিতে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে। কাজের মেয়ে লতা গিয়ে দরজা খুলতেই চোখ আটকালো ফর্মাল ড্রেসআপে দাঁড়িয়ে থাকা পঙ্কজের উপর।ছয় মাস পর পঙ্কজকে দেখে বেশ বিস্মিত হলাম। এদিকে পঙ্কজের হাতে ট্রলি ব্যাগ।দেখে তো মনে হচ্ছে আজই দেশে ফিরেছে।
আমি সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলাম।পঙ্কজ চোখের সানগ্লাসটা খুলে লতাকে সুক্ষ্ম চোখে দেখতে লাগলো।লতা এতে অস্বস্তি অনুভব করছে।তাই সহসা বলে উঠলো,
–“আসসালামু আলাইকুম স্যার।”

পঙ্কজ উত্তর করলো না।বরং চুইঙ্গাম চিবাতে চিবাতে ব্রু উঁচালো।লতাকে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইমরান এগিয়ে আসতে আসতে শুধালো,
–“কিরে লতা কে আসলো?”

লতা কিছু বলার আগেই নজরে পড়লো পঙ্কজ কে।ইমরান খুশিতে পঙ্কজ কে জড়িয়ে ধরে বললো,”আরে ব্রো যে। কি খবর তোমার? দেশে কখন আসলে?”
পঙ্কজ ইমরানের পিঠ চাপড়ে বললো,”তোদের সারপ্রাইজ দিতে না জানিয়ে চলে আসলাম।”
পঙ্কজ অন্দরমহলে পা রাখতেই সবাই উতলা হয়ে উঠলো।এদিকে সবার সাথে কথা বলে পঙ্কজ পলির কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
–“হোয়াট’স আপ ভাবি জান।দেবরকে ভুলেটুলে গিয়েছিলেন নাকি?”

পঙ্কজের তাকানোটা পলিকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।তবুও ভদ্রতার খাতিরে পলি ভালোমন্দ জিগ্যেস করলো।তারপর পঙ্কজ জিজ্ঞেস করলো,”আমার আরেক ভাবিজান কোথায়? কতদিন হলো ভাবি জানের গালাগাল শুনি না।”
বলতে বলতেই পঙ্কজের দৃষ্টি আটকালো সিঁড়িতে।আমি চলে যাচ্ছিলাম। তক্ষুনি পিছন থেকে পঙ্কজের কন্ঠ ভেসে আসে,
–“আরে সুন্দরী ভাবি নাকি?”

–“না,তোর মা।”

পঙ্কজের বাক্যটা শুনে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।তক্ষুনি গমগমে পুরুষালী কন্ঠ স্বর কানে আসে।আমি সহ সকলেই দোতলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম।স্বয়ং ইফান চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছে।শরীরে শার্ট নেই। মনে হয় রুমে ফ্রেশ হচ্ছিল,তখন পঙ্কজের কন্ঠ শুনে বেরিয়ে আসে।আমি ইফানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পিছন ফিরে তাকালাম। পঙ্কজ উপরে ইফানের চোখের দিকে তাকিয়ে। তাদের দু’জনেরই চেহারায় শীতলতা। ইফান আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার কাঁধে এক হাত রেখে তার সাথে মিশিয়ে ধরে পঙ্কজের উদ্দেশ্য আরেক বাক্য ছুড়লো,
–“ভাবি আর জান দুইটাই লুচ্চামির ডাক। আজ থেকে আমার বউকে আম্মা বলে ডাকবি।”

ইফানের কথায় পঙ্কজের মুখে অন্ধকার নেমে আসলো।নুলক চৌধুরী আর নাবিলা চৌধুরী আমার দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে। নাবিলা চৌধুরীর গায়ে আগুন ধরানোর জন্য আমি ইফানের সাথে আরেকটু চেপে দাঁড়ালাম।তারপর আমার কাঁধে রাখা ইফানের হাতটায় আমার হাত রাখালম।নাবিলা চৌধুরী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দৃষ্টি সরিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো।নুলক চৌধুরী ছেলেকে বললো,”বেটা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আস।”
পঙ্কজ তার মায়ের কথায় না চাইতেও মৃদু হেসে ইফানের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমাকে আড় চোখে দেখে রুমে চলে গেলো।ইফানও আমার বাহু ধরে রুমে নিয়ে চলে আসে।


আমি শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।শাওয়ার নেওয়ার পর বেশ ঠান্ডা লাগছে এখন। আজ আমি শাড়ি পড়ি নি।আমার পড়নে কালো রঙের থ্রিপিস। এগুলো আজ ইফান কিনে এনেছে।দেখে আমার ভিষণ পছন্দ হলো।তাই আর না পড়ে থাকতে পারলাম না।
আমি মিররের সামনে দাঁড়িয়ে টাউয়াল দিয়ে চুলের পানি মুছতে লাগলাম।আমার চুলগুলো আগের চেয়ে আরও বড় হয়েছে।আগে কোমর ছাড়িয়ে ছিলো।আর এখন হাঁটু অব্ধি। তবে আজকাল এগুলোকে সামলাতে বড্ড কষ্ট হয়।চুল অধিক ঘন আর লম্বা হওয়ায় জট খুলতে বেশ বেগ পোহাতে হয়।
আমি এসব ভাবনায় যখন ডুবে গেছি তখনই কানে ধুমধাম আওয়াজ আসে।আমি ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসলাম।ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম সেই দিকে।
ইফান সেই কখন জিম রুমে গেছে। মনে হয় বক্সিং করছে।সেটার আওয়াজই হয়তো আসছে।আমি আবার নিজের কাজে মন দিলাম। কিন্তু আওয়াজ পালাক্রমে বেড়েই যাচ্ছে। আমি টাউয়ালটা চুলে পেচিয়ে জিম রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমাদের রুমটা দুই পার্ট করা। প্রথমে আমাদের বেডরুম। তারপর ভেতরের পার্টে আমার স্টাডি কারার সুবিধার জন্য ইফান পড়ার টেবিল সাথে কিছু বুক শেলফ দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। প্রতিটি তাক-এই বিভিন্ন উপন্যাসের বই দিয়ে পূর্ণ। দেখলেই মন হালকা লাগে।তার উপর আমাদের সারা রুম ফেয়ারি লাইট দিয়ে সাজানো। যখন লাইটগুলো জ্বালানো হয় তখন অসম্ভব সুন্দর লাগে।
আমি স্টাডি রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ জিম রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভেতর থেকে ভেজানো।হঠাৎ ইফান সেখানে তান্ডব চালাচ্ছে কেন?ভাবতে ভাবতে এগিয়ে দরজা টা হালকা খুললাম।ডান দিকে তাকাতেই চোখ পড়লো ইফানের দিকে।সে একটার পর একটা শক্ত পাঞ্চ বসাচ্ছে পাঞ্চিং ব্যাগে।আমি ব্রু কুঁচকে শুধালাম,
–“এখনো এখানে কি করছ?আর এমন বিহেভ করছ কেন?”

–“রেগে আছি জান।”

ইফান আমার দিকে না তাকিয়েই ছোট্ট করে উত্তর করল।আমি চোখ উল্টালাম।অতঃপর পুনরায় দরজা ভিজিয়ে চলে যাব তার আগেই লোকটার দিকে চোখ আটকায়।লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখে মুখে এসে আঁচড়ে পড়ছে। সুঠাম দেহে বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখের সামনে পুরনো কিছু স্মৃতি ভেসে উঠছে।হঠাৎই বক্সিং-এর আওয়াজ আমার কানে আর আসছে না।নিমিষেই সম্পূর্ণ পরিবেশটা কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে।

ফ্ল্যাশব্যাক__

সপ্তাদশী আমি নুপুর পায়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি।দৌড়ানোর সাথে আমার লম্বা চুলগুলো দোলছে।গোলাপি ওষ্ঠপুটে ফোটে উঠেছে স্নিগ্ধ হাসি।এদিকে হেসে ফোনে কথা বলতে বলতে নিচে নামার জন্য সবে প্রথম সিঁড়িতে পা দিলো কবিতা আপু। আর তক্ষুনি আমার সাথে ধাক্কা লাগে।ফলস্বরূপ আমরা দু’জনেই ফ্লোরে পড়ে যায়।আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসে কবিতা আপুর উপর চেঁচিয়ে উঠলাম,,
–“ধুর ধুর ধুর।এই ধবলি মাইয়া চোখে কি দেখ না নাকি?”

কবিতা আপু উঠতে উঠতে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,”তুই কি চোখে দেখস না?চোখ কই থাকে তোর হ্যাঁ।এখনই তো আমার হাতপা ভাঙতো।সাথে তোরটাও।একটু দেখে চলবিতো নাকি!”

–“আমি না হয় নিজের বেডাকে নিয়ে কল্পনা করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম, তাই মনযোগ ছিল না।তুমি কি করছিলে হু?”

আমার কথায় কবিতা আপু তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,”আমিও আমার বেডার সাথে ক…..”

বলতে বলতেই কবিতা আপু থেমে জিহ্ব কামড়ে ধরলো।আমি চোখ বড় বড় করে ফেললাম কবিতা আপুর কথায়।তাকে চেপে ধরলাম, “এএএএ তুমি প্রেম কর!কার সাথে প্রেম কর?”
আমার কথায় কবিতা আপুর মনে পড়লো সে ফোনে কথা বলছিলো।কিন্তু মোবাইল কোথায়?কবিতা আপু আসেপাশে চোখ ঘোরাতেই দেখলো সিঁড়ির কাছে ফোন পড়ে আছে।আমিও কবিতা আপুর দৃষ্টি অনুযায়ী তাকালাম। তারপর দু’জনেই চোখাচোখি করে ফোন হাতে নেওয়ার জন্য হামলে পড়লাম।
যেই আমি ফোন হাতে নিতে যাব তখনই কবিতা আপু আমাকে আটকে দেয়।আবার কবিতা আপু যখন ফোন হাতে নিতে যায় তখন আমি আটকে দেই। এভাবেই কয়েক মূহুর্ত আমরা ফোন নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে লাগলাম।
অপরদিকে ফোনে কানেক্ট থাকা অপর প্রান্তের ব্যাক্তি ঘনঘন শ্বাস ফেলছে।কবিতা আপু আর আমি দু’জনেই একসাথে ফোনটাকে নেওয়ার জন্য ফোনে হাত রাখলাম।কবিতা আপু টানছে একদিকে।আর আমি টানছি এক দিকে।অবশেষে কবিতা আপু শক্তির সাথে পেরে উঠলাম না।আমার হাত থেকে ফোনটা কবিতা আপু নিয়ে যায়।তবে ফোনের স্কিনে তখন একটা অক্ষর ঝাপসা দেখতে পাই। সেটা কি ইউ নাকি এন শিউর না। কবিতা আপুর হাতের জন্য আগের অক্ষরগুলো দেখতে পেলাম না।

আমি গাল ফুলিয়ে বলালম,”সত্যি করে বল কার সাথে ফোনে কথা বলছ?”

কবিতা আপু ফোন লুকিয়ে মুখ মুচড়ে বললো,”উমম বলবো না।”

আমি নাকের পাঠা ফুলিয়ে ফের শুধালাম, “তুমি যদি না বল তাহলে জায়ান ভাইকে বলে দিব তুমি এক বকাটে ছেলের সাথে প্রেম কর,হু।”

কবিতা আপু আমাকে ভেংচি কেটে বললো,
–“তুমি যদি না বল তাহলে জায়ান ভাইকে বলে দিব।আরে যা গিয়ে বল। আমিও জিতু ভাইয়াকে বলে দিব তুই জায়ান ভাইকে বিরক্ত করিস।তখন দেখবি!”

আমি গাল ফুলিয়ে কবিতা আপুর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।বুঝালাম আমি অভিমান করেছি।কবিতা আপু লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বললো ,”Someone special.সময় হলেই সব জানতে পারবি।এখন বলবো না।”
কথা শেষ করেই কবিতা আপু মুচকি হেসে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো।আমি নাক ছিটকে কবিতা আপুর দিকে তাকিয়ে চোখ উল্টালাম।হঠাৎই কিছু একটা মনে আসতেই গান ধরলাম,

লাঙ্গের আশা কইরা তোমার ভাতারের ভাত চাঁঙ্গে
তোমার লাঙ্গে,ও ..তোমার লাঙ্গে গো
আধা পথে নিয়া কোমর ভাঙ্গে
তোমার লাঙ্গে গো
আধা পথে নিয়া কোমর ভাঙ্গে….

কবিতা আপুর পা থেমে গেলো।সে তৎক্ষনাৎ পিছন ফিরে আমার দিকে তাকাতেই দেখলো,আমি ব্যঙ্গ করে নেচে নেচে গান গাইছি।কবিতা আপু আমার দিকে রাগে তেড়ে আসতে নিলেই আমি ছুটে জায়ান ভাইয়ের রুমে হাজির হলাম।
রুমে জায়ান ভাই নেই। তাহলে এত সাতসকালে লোকটা কোথায় গেলো।আমার ভাবনার ছেদ ঘটে ধুমধাম আওয়াজে। আমি বুঝতে পারলাম জায়ান ভাই জিম রুমে আছে।আমি আর এক মূহুর্ত দেরি না করে দরজা হালকা খুলে উঁকি মারলাম।জায়ান ভাই পাঞ্চিং ব্যাগে একটার পর একটা পাঞ্চ বসাচ্ছে। লোকটার বলিষ্ঠ দেহ ঘেমে জুবুথুবু। কপালেও ঘাম জমে আছে।আমি ঢোক গিললাম।ইশশ লোকটাকে কত কিউট লাগছে।আমি মনে মনে জায়ান ভাইকে নিয়ে কল্পনার রাজ্যে পারি জমালাম।
আমার দৃষ্টি জায়ান ভাইতেই নিবদ্ধ। বারবার ঢোক গিলছি।জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছি। এদিকে হঠাৎই জায়ান ভাই কি একটা ভেবে দরজার দিকে তাকালো।আমি উনাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি।জায়ান ভাই মুচকি হাসলো।এ যেন হাসি নয়,আমাকে আরেক দফা পাগল করার মন্ত্র ।কত স্নিগ্ধই না লাগে লোকটা হাসলে।আমার গভীর দৃষ্টি দেখে জায়ান ভাইয়ের চোখদুটো শীতল হয়ে আসলো।তিনি আমার কাছে এসে বুকে দু’হাত ভাজ করে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল।কিন্তু আমার খেয়াল নেই। আমি এখনো জায়ান ভাইয়ের আগের অবস্থানের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াচ্ছি।
আমার বেখেয়ালিপনা দেখে জায়ান ভাইয়ের চোখ সরু হয়ে আসলো।তিনিও আমার দৃষ্টি অনুযায়ী তাকিয়ে দেখলো।কিছুই নেই সেদিকে। জায়ান ভাই ব্রু কুঁচকে আমার কপালে মৃদু ঠুকা মারতেই আমরা হুঁশ ফিরে।আমি ধরফরিয়ে উঠলাম।খেয়াল করতেই দেখলাম জায়ান ভাই আমার খুব সন্নিকটে। আমি চোর ধরা পড়ে যাওয়ার মতো আমতা আমতা করে বললাম,
–“আআপনি এএখানে,,,,,”

জায়ান ভাই আমার উপর ঝুঁকে গম্ভীর কন্ঠে বললো,”তুই জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিস নাকি রে?”

–“ককই না-তো?”

–“রিয়েলি! তো এখানে,,,,,”

জায়ান ভাই বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না।এরই মাঝে আমি এক সাহসী কাজ করে বসেছি।নিজের ওড়না দিয়ে জায়ান ভাইয়ের কপালের ঘাম মুছতে লাগলাম। জায়ান ভাই অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার হাতটি কাঁপছে। সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।তলপেটে অবাধ্য প্রজাপতিগুলো ডানা ঝাপটাতে আরম্ভ করেছে। তবুও আমি জায়ান ভাইয়ের সারা মুখের ঘামটুকু মুছে দিচ্ছি। হঠাৎই কারো তীব্র হৃৎস্পন্দন কানে আসে।আমার হাত থেমে যায়।আমি আস্তে আস্তে জায়ান ভাইয়ের বুকের বামপাশে তাকায়। সেখানে মৃদু কম্পিত হচ্ছে। জায়ান ভাই এখনো আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আমি উনার কপাল থেকে হাতটা সরিয়ে উনার বুকের কাছে আনলাম।একটা শুকনো ঢুক গিলে বললাম,
–“আপনার হার্টবিট…..”

–“তুই-ই তো আমার হার্টবিট।”

আমার বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই জায়ান ভাই খপ করে আমার হাতটা তার বুকের সাথে চেপে ধরে বললো।আমি আচমকা জায়ান ভাইয়ের চোখের দিকে তাকালাম। লোকটা আমার দিকে মোহ ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আমি সেই মায়া ভরা নয়নে হারিয়ে গেলাম তৎক্ষনাৎ। কিছুতো একটা আছে উনার চোখে।যা আমাকে বারবার লোকটার প্রেমে ফেলে দেয়।এরই মাঝে জায়ান ভাই হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,”পছন্দ করিস আমায়?”

বাক্যটা আমার কানে পৌঁছাতেই আমার বুকটা পুনরায় কম্পিত হলো।আমি ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম।লজ্জায় কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। জায়ান ভাই বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে মোহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো উত্তরের আসায়।কিন্তু আমার থেকে উত্তর না পেয়ে তার নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলোর লাগাম টানলো।তিনি বিনা বাক্য সরে গিয়ে আবার পাঞ্চিং ব্যাগে পাঞ্চ বসাতে লাগলো।আমি ঝটপট দরজা ভেজিয়ে দেয়ালের সাথে ঘেষে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলাম।আমার এতক্ষণ দমবন্ধ লাগছিলো।অতঃপর চোখ বন্ধ করে নিলাম।ভেতর থেকে পাঞ্চিং এর আওয়াজ ভেসে আসছে।আমি কয়েক মূহুর্ত নিজেকে স্থির করে রিনরিন স্বরে গেয়ে উঠলাম,,

❝তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়
হাজার বছর আগেও বুঝি ছিলো পরিচয়
আমার এমন মনে হয়_

আমার মাধুর্য কন্ঠ জায়ান ভাইয়ের কান অব্ধি পৌঁছাতেই তিনি থমকে যায়।আজ এতগুলো বছর পর একই গান আমার মুখ থেকে শুনার পর তার হৃদয়স্পন্দন পুনরায় তীব্রভাবে স্পন্দিত হতে থাকে।জায়ান ভাই বুকের বাম পাশে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে বিরবির করে,,,,

❝আমার পরাণপাখি।❞

__বর্তমান __

আমার চোখে কারো ঠোঁটের উষ্ণ ছুঁয়া পেতেই সারা শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো।আমি কল্পনা থেকে মূহুর্তেই বেরিয়ে আসলাম। আমার অক্ষিপট দিয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ার আগেই ইফান ঠোঁট ছুঁইয়ে আহরণ করে নিচ্ছে।

আমি যে অনেকক্ষণ ধরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, ইফান না তাকিয়েই বুঝতে পেরেছে।কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ হওয়ার পরও যখন আমি নির্লিপ্ত তখন ইফান দরজার দিকে তাকায়।আর মূহুর্তেই তার বুক কেঁপে উঠলো । ইফান হাতের বক্সিং গ্লাভস খুলে ফেলে দ্রুত আমার কাছে আসে।আমার দৃষ্টি তখনও ইফানের আগের অবস্থানে।আমি কল্পনায় মত্ত। আমার চোখ বেয়ে কখন যে তপ্ত অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ছে আমার জানা নেই। আর তখনই আমার চোখের পানি নিচে পড়ার আগেই ইফান অধর যুগলের সাহায্য গ্রহণ করে নেয়।

আমি অনুভূতিহীন ইফানের দিকে তাকিয়ে। ইফান আমার খুব সন্নিকটে। তার এক হাত দরজায়।আরেক হাত আমার ঘাড়ে।ইফান আমার উপর কিছুটা ঝুঁকে আছে।তার ওষ্ঠ যুগল এখনো আমার চোখের নিচে। ইফানও আমার নির্লিপ্ত চোখের দিকে তাকালো।আমি ইফানের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম_ জায়ান ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ি।দিনরাত পাগলামি করতাম।আমাকে ঘুমের ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হতো বেশিরভাগ সময়। যতটুকু সময় সজাগ থাকতাম, ততক্ষণ আমাকে শিখল পড়িয়ে রাখতো।সারাক্ষণ জায়ান ভাইয়ের নাম যপে যেতাম।একা একা জায়ান ভাইয়ের সাথে কথা বলতাম।প্রাণ খুলে হাসতাম।আবার যখনই বিয়ের দিনের স্মৃতি টা মনে পড়তো, আমি চিৎকার চেচামেচি করে সারা মহল্লা কাঁপিয়ে ফেলতাম। আমার মানসিক অসুস্থতার জন্য জিতু ভাইয়াও জানতে পারে নি, সেদিন ছাঁদে কি হয়েছিল? আমি কিছু জানি কি না?জায়ান ভাইয়ের কেইসটা প্রায় অচল হয়ে পড়ে।জিতু ভাইয়া বাধ্য হয়ে কেইস স্থগিত করে আমি সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত। প্রায় আট-নয় মাসের ব্যবধানে আমি স্বাভাবিক হওয়া শুরু করি।কিন্তু তখন আমার মধ্যে বিশাল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।আমি একদমই কথা বলি না কারো সাথে। হঠাৎই আমি চুপচাপ হয়ে যায়।ততদিনে নিজ গ্রাম সহ আসেপাশের গ্রামে কথা চলে যায়_শেখ বাড়ির মেয়ে জায়ানের সুখে পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎই আমার চিৎকার চেচামেচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকজন প্রতিবেশী আমাদের বাড়িতে এসে আম্মু আব্বু কে জিজ্ঞেস করতো, আপনাদের পাগল মেয়েটা কি মারা গেছে?”
এসব শুনে আম্মু, বড় আম্মু রান্নাঘরে বসে গুমরে গুমরে কাঁদত।আব্বুর হার্টেরও অবনতি হয়।বড় আব্বুও ভেঙে পড়ে।দাদিও এসব সুখে অচল হয়ে পড়ে।আর সবকিছুর মাঝে কবিতা আপুর পড়াশোনা, সাথে পরিবারের এমন মানসিক টানাপোড়েনে মেয়েটাও অসুস্থ হয়ে যাবে বলে হোস্টেল চলে যায়।পুরো শেখ বাড়ি হয়ে উঠেছিলো প্রাণহীন মরুভূমি।

একদিন জিতু ভাইয়া আমার থেকে সেদিনের ঘটনা নিয়ে জানতে চায়।ততদিনে ইফান চৌধুরী নামের লোকটা আমার মনের বিষে রুপান্তরিত হয়।হ্যাঁ, তখনও জানতাম না ইফান চৌধুরীর নাম এবং সে কে।আমি মনে মনে, শয়নেস্বপনে দিবারাত্রি প্রতিদিন ইফান চৌধুরী কে নিজ হাতে খু*ন করতাম।সেদিন ভাইয়া কে ইফান চৌধুরী সম্পর্কে বলেছিলাম-যে ছাঁদে বন্দুক হাতে আমি ইফানকে দেখি।আমার সব কথা শুনার পর ভাইয়া সব কথা খুলে বলে।জায়ান ভাইয়ের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, জায়ান ভাই কে পচাত্তর ডিগ্রি এঙ্গেল থেকে শুট করা হয়।আর ইফান চৌধুরী ছিলো নাইন্টি ডিগ্রি এঙ্গেলে।আর দূরত্বের দিক দিয়েও ইফানের অবস্থানের চেয়ে আরও কিছু মিটার পিছন থেকে শুট করা হয়।সেই অবস্থাটা ছিল ইফান যে বিল্ডিং এ দাঁড়িয়ে ছিলো তার পিছনের বিল্ডিং। সিআইডিরা তদন্ত করে সেই বিল্ডিং এর ছাঁদে গান পাউডার পায়।আর সেখান থেকে শুট করা হয়েছে এটা সকালে নিশ্চিত হয়।তারপর এটাও জানতে পারলাম, জায়ান ভাই আর ইফান একে অপরের ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলো।

সেদিন আমি ইফানকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু লোকটার প্রতি ছিলো এক পাহাড় সমান ঘৃণা। এই লোকটা যদি সেদিন জায়ান ভাই কে ছাঁদে না নিয়ে যেত,তাহলে আমার প্রাণ পাখি আমার কাছেই থাকতো।কিন্তু তারপর?তারপর যা হলো?….

পুনরায় মস্তিষ্ক সচল হতেই ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুনে আমার মন মস্তিষ্ক ক্রোধে ফেটে পড়ার উপক্রম। আমি আচমকা ইফানের বুকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে চেচিয়ে উঠলাম,
❝তুই আমার কলঙ্ক।আমার শত ব্যাথার কারণ।ঘৃণা করি আমি তোকে।❞

আমার আচমকা ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে ইফান কয়েক পা পিছিয়ে পড়ে।আমি ক্রোধিত নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। সেখানেই অশ্রু ঝলমল করছে।চোখের পলক ফেললেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে।ইফান আমার দিকে নির্লিপ্ত ভাবে কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে রইলো।অতঃপর ক্রুর হেসে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটে লেগে থাকা নোনাজল আহরণ করে, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে আমার কাছে এগিয়ে আসে।ইফান হাত বাড়িয়ে আমার গালের অশ্রু মুছিয়ে দিতে নিলেই আমি ঘৃণা ভরা দৃষ্টি ঘুরিয়ে সরে দাঁড়ালাম। এতে ইফান পুনরায় বাঁকা হাসলো।
সে আবার আমার কাছে এগিয়ে এসে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে দুগাল আল্ত হাতে মুছিয়ে দিলো।অতঃপর আমার মাথা টেনে নিজের সন্নিকটে নিয়ে আসে।খানিকটা ঝুঁকে আমার কানে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
❝এক দু’টো কলঙ্ক থাকা ভালো__একা পথ চলতে শেখায়।❞

আমি ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে নিলাম।হাতদুটো দিয়ে জামা খামচে ধরলাম।ইফান আমার চেহারায় দৃষ্টি বুলিয়ে আবারও বাঁকা হাসলো।তবে এই হাসিটা অদ্ভুত রহস্যময়। ইফান আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে আগের মতো হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,,
❝কেঁদে নাও আগুনপাখি।এখনই তো কাঁদার সময়। কেঁদে ভেতরের সব আগুন নিভতে থাক।এখন না নিভতে থাকলে পরে দেখবে, আমি হারিয়ে গেলে সেই আগুন আর নিভবে না।❞

আমি তৎক্ষনাৎ চোখ মেলে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান আমার সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলো না।এই প্রথম। হ্যাঁ,এই প্রথম লোকটা আমাকে উপেক্ষা করে জিম রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।আমি ঘাড় কাঁধ করে ইফানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।কিন্তু বেশিক্ষণ পারলাম না।আমর কানে ভেসে আসে মিষ্টি একটা সুর।কেউ ভায়োলিনে চমৎকার সুর তুলেছে ।সুরটা এটই সুন্দর যে মূহুর্তেই আমার ঘোর লেগে গেছে।সুরটা যতটা না শুনতে মধুর ততটাই বেদনাদায়ক। কেন জানি এই মূহুর্তে আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। কি আছে সুরটাতে।কেই-বা এত করুন সুর বাজিয়ে যাচ্ছে। তাও আবার এই চৌধুরী বাড়িতে!!

চলবে,,,,,,,,,

🚫অনেকের অতীত পড়তে অনিহা। সবাইকে বলছি এখন আর তেমন অতীত আসবে না।শুধু কিছু সিন হঠাৎ স্বল্প সময়ের জন্য আসবে রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য।

(আমার এক্সাম শুরু হয়েছে।একদিন পর পর গল্প দেওয়া সম্ভব নয়।গল্প যেদিন দিব সেদিন পেইজে না হলে গ্রুপে জানিয়ে দিব।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply