জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৪৯
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
ক্লাস থেকে স্যার বেড়িয়ে আসতেই সকল ছাত্রছাত্রী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বেড়িয়ে আসলো।জুই তার প্রাণের দুই সখী মিনা আর সোমার হাত ধরে গল্প করতে করতে ক্লাস রুম থেকে বেরোচ্ছে।ঘড়ির কাটা বেলা চারটায়।মিনা জুইকে বললো,
–“চল দোস্ত ফুচকা খাই।”
বাক্যটা বলেই মিনা ঢুক গিললো।সোমা মিনার কথা শুনে সায় জানিয়ে বললো,”হ দোস্ত, চল গিয়ে ফুচকা খাই।”
সোমা আর মিনার জিহ্বে জল এসে পড়েছে। দুজনের চোখমুখ খুশিতে ঝিলিক দিচ্ছে।জুই একটু ভেবে বললো,”গতকালও তো খেলাম।আজ আর ফুচকা খেতে মন চাইছে না রে।”
মিনা তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো, “তাহলে তুই কি খাবি।তুই যা খাইবি আমরাও তা খাব।” মিনার কথায় সোমাও সায় দিলো।জুই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ ভেবে বললো,”চল আজ ভেলপুরি খাই।”
জুইয়ের কথা শুনে দুই বান্ধবী খুশিতে গদগদ করে বলে উঠলো, “তাহলে তো আরও বেশি মজা হবে।চল তাড়াতাড়ি।”
তিন বান্ধবী তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই পিছন থেকে একটা মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠ কানে আসে,
–“জুই….”
ভীড়ের মধ্যে নিজের নাম শুনতে পাওয়ায় পিছন ফিরলো জুই।ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে চোখ বুলালো। কিন্তু কাউকে পেল না।জুই সামনে ফিরতে যাবো তখনই চোখ আটকালো কলেজ ড্রেস পরহিত একটা মেয়ের দিকে।মেয়েটার পিছনে কালো পোশাকধারী তিনজন গার্ড।জুই ঠিক চিনতে পারছে না বিষয়টা বোধগম্য হতেই ইতি নিজের মুখের কালো মাস্ক খুলে ফেললো।জুইয়ের আর চিনতে বাকি রইলো না মেয়ে টা যে ইতি।জুইয়ের অবাক চাহনি দেখে ইতি ঠোঁট প্রসারিত করে অমায়িক হাসলো।জুইও অবাক হয়ে হেসে দিলো।ইতি জুইয়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,
–“কেমন আছ জুই?”
–“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।তুমি?”
–“আলহামদুলিল্লাহ আমিও অনেক ভালো আছি।”
জুই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,”ইতি তুমি আমাদের কলেজে কি করছ?”
–“আমি এই কলেজে পড়ি জুই।”
–“ও মা তাই ! আমি তো তোমাকে কোনোদিন কলেজে দেখি নি।”
জুইয়ের কথায় ইতি হেসে বললো,”আসলে আমি আজই কলেজে প্রথমদিন ক্লাস করতে আসলাম।আমাকে তো মম কলেজে আসতে দেয় না।টিচার্স আমাকে বাসায় পড়িয়ে আসে।জাহানারা ভাবির থেকে শুনলাম তুমিও নাকি এই কলেজে পড়। তাই আজ আব্বু কে বলে মমকে ম্যানেজ করে চলে এসেছি তোমার সাথে দেখা করতে।”
জুই খুশি হয়ে বললো,”ওয়াও তাই!! খুব ভালো করেছ।তোমার সাথে তো সেই কবে আমাদের বাসায় দেখা হয়েছিলো।তারপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।আজ দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লাগছে।”
জুইয়ের কথায় ইতি খুশিতে আত্মহারা। জুই আর ইতিকে এভাবে হেসে কথা বলতে দেখে সোমা আর মিনা চেহারা অন্ধকার করে ফেললো।আসলে ছোট থেকে তারা বেস্ট ফ্রেন্ড। তাদের মধ্যে কখনো কোনো বাড়তি ফ্রেন্ড আসে নি।আসলেও সোমা ঝগড়া করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমা জুইয়ের হাত ধরে টেনে তার কাছে নিয়ে এসে রাগে বললো,”ঐ শয়তান ঢাকা আইসায় বান্ধবী পাতিয়ে ফেলছস।”
মিনা গাল ফুলিয়ে বললো,”তুই কিন্তু কামটা ঠিক করলি না জুই।আমি অনেক কষ্ট পেলাম।”
জুই হাহাহা করে হেসে মিনা আর সোমার হাত ধরে ইতির সামনে দাঁড়িয়ে পরিচয় করিয়ে দিলো,
“ইতি এই হচ্ছে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড মিনা আর সোমা।আর সোমা ইতি হচ্ছে আমার জাহানাপুর একমাত্র ছোট ননদ।”
জুই বেস্ট ফ্রেন্ড বলায় মিনা আর সোমার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে গেলো।তারা ইতির সাথে পরিচয় করে নিলো।কিছুক্ষণ কথা বলার পর জুই বললো,”ইতি তুমি কি এখন থেকে রোজ কলেজে আসবে নাকি?”
ইতি মন খারাপ করে বললো,”আমি তো জানি না মম রোজ আসতে দিবে কিনা।আর……. “
ইতি থেমে গেলো।তার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। জুই বললো,”আর কি?”
–“আমার না কোনো ফ্রেন্ড নেই। আমি কার সাথে এসে গল্প করবো। আজ না আমি একা একা ক্লাসে বসে ছিলাম।”
ইতির কথা শুনে তিন বান্ধবীর কষ্ট লাগলো।সোমা বললো,”আহা রে তোমার কোনো ফ্রেন্ড নেই। “
ইতি মন খারাপ করেই বললো,”মম ছোট থেকে বাইরের কারো সাথে মিশতে দেই নি।তাই কখনো আমার ফ্রেন্ড হয় নি।”
সকলের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।জুই ইতির হাত ধরে বললো,”ঠিক আছে আজ থেকে আমরা তিনজন তোমার ফ্রেন্ড হলাম।”
সোমা আর মিনাও হ্যাঁ বললো।এই প্রথম ইতির কোনো ফ্রেন্ড হওয়ায় মেয়েটার চোখে পানি চলে এসেছে।কোনো মতে কান্না আটকাতে চাইছে।জুই হেসে বললো,”আরে তুমি কাঁদছ কেন?চল আজ আমরা এক সাথে ভেলপুরি খেতে যাই।”
ইতি কান্না ভুলে অবাক হয়ে বললো,”ভেলপুরি!!সেটা কি জুই?”
ইতির কথা শুনে তিন বান্ধবী চোখাচোখি করলো।তারপর জুই হেসে বললো,”তুমি কোনোদিন খাওনি?”
ইতি মাথা নাড়িয়ে না বললো।মিনা ইতিকে বললো,”কোনো ব্যপার না।চল আজ প্রথম ট্রাই করবে।ভীষণ মজা।একবার খেলে প্রতিদিন খেতে মন চাইবে।”
ইতি নতুন বান্ধবীদের সদয় আচরণে সব সংকোচ ভুলে রাজি হলো।তারা যাবে তখনই একজন গার্ড বলে উঠলো,
–“ম্যাম, নাবিলা ম্যাম স্টেইটলি বলে দিয়েছে কলেজ শেষ হলেই আপনাকে চৌধুরী মেনশনে পৌঁছে দিতে।”
ইতি নাকচ করে বললো,”আমি এখন ফ্রেন্ডদের সাথে খাব।তোমাদের সাথে এখন যাব না।তোমরা আব্বু কে বলে দাও।”
গার্ডগুলো ইতির কথা অনুযায়ী ইকবাল চৌধুরীর থেকে পারমিশন নিচ্ছে।সোমা আর মিনা একে অপরের দিকে চোখাচোখি করলো।
হঠাৎই জুইকে কেউ পিছন থেকে ঢেকে উঠলো।জুই তাড়াতাড়ি পিছনে তাকাতেই দেখলো জিতু ভাইয়া। জুই খুশিতে দৌড়ে ভাইয়ার কাছে গিয়ে বললো,
–“ভাইয়া তুমি!! “
জিতু ভাইয়া জুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,”কাজে অনেক ব্যস্ত ছিলাম তাই তিনদিন তোর সাথে দেখা করতে আসতে পারি নি।সব ঠিকঠাক আছে তো।”
–“জি ভাইয়া সব ঠিকঠাক আছে।”
–“এখন বাসায় যাবি তো।চল আগে তোর কি কি লাগবে কেনাকাটা করে দিই।”
–“ভাইয়া এখন আমরা বাইরে ভেলপুরি খেতে যাব।আজ যাব না।আমার সবকিছুই আছে আপাতত কিছু লাগবে না।”
জুইয়ের কথায় জিতু ভাইয়া মিনা আর সোমার দিকে তাকাতে নিলেই চোখে পড়লো ইতিকে।মেয়েটা সাদা কলেজ ড্রেস পড়ে আছে।দু কাঁধে দু’টো বিনুনি সামনের দিকে ফেলে রাখা।ইতি এতক্ষণ জিতু ভাইয়ার দিকেই তাকিয়ে ছিল।হঠাৎই জিতু ভাইয়া তার দিকে তাকিয়ে পড়ায় লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছে।গাল দুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে।জিতু ভাইয়া আনমনা হয়ে বিরবির করলো,
–“লজ্জাবতী এখানে!!”
জুই সেটা শুনে উত্তর করলো,”ভাইয়া ইতিও আমাদের কলেজে পড়ে।আজই আমি জানতে পারলাম।তাই তো ওকে নিয়ে আমরা বাইরে খেতে যাব।”
জিতু ভাইয়া শুকনো কেশে ইতির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।অতঃপর যেতে যেতে বললো,”আমার সাথে আয়।”
জুই, সোমা আর মিনা খুশিতে একসাথে বলে উঠলো, “হুররে,আজ ভাইয়া ট্রিট দিবে।”
জুই ইতির এক হাত ধরে বললো,”চলঅঅঅ…”
ওদের আনন্দ দেখে ইতিও হেসে জুইয়ের সাথে ছুটলো।
কলেজের সামনে ফুচকাওয়ালার ভ্যান গাড়িটার কাছে চারজন দাঁড়ালো।জিতু ভাইয়া ফুচকাওয়ালা কে বললো ওরা যা খেতে চায় তা দিতে।সকলে প্লেটে দুটো ভেলপুরি নিয়ে টোলে বসে পড়লো।সোমা আর মিনা বড় বড় কামড় দিয়ে খাওয়া শুরু করেছে।ইতি ওদের খাওয়া দেখছে।এই প্রথমবার খাবে তাই বুঝতে পারছে না কি করবে।এদিকে জুই জিতু ভাইয়া কে ডেকে বললো,
–“ভাইয়া আজ আমাদের সাথে তুমিও খাও।”
জিতু ভাইয়া এক হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাতে ফোন টিপছিলো।জুইয়ের কথা শুনে ফোনে দৃষ্টি রেখেই উত্তর করলো,”তোরা খা।আমি এসব খাই না।”
মিনা বললো,”ও ভাইয়া আজ কে খাও না।এই দেখ ইতিও কোনোদিন খায় নি। আজ খাবে।”
মিনার কথা শুনে জিতু ভাইয়ার টাইপিং করা হাতটা থেমে গেলো।তিনি মাথা নিচু করে হাতে প্লেট নিয়ে বসে থাকা ইতির দিকে তাকালো।যদিও সানগ্লাস পড়ে থাকায় কেউ বুঝতে পারে নি।তবে লাজুক মেয়েটা কেমন হাঁপ সাপ করছে।সোমা যতবার ভেলপুরি তে কামড় দিচ্ছে ততবারই ঠোঁটের আশপাশ সস দিয়ে মেখে যাচ্ছে।ইতি এটা দেখে মনে মনে ভাবছে,”ইশশশ সবার সামনে কিভাবে খাব আমি!”
এরই মাঝে জুই বলে উঠলো, “ভাইয়া আজকে খাও না।এটা অনেক মজা।”
জিতু ভাইয়া আর না করলো না।ফোনটা পকেটে রেখে,চোখের রোদ চশমাটা শার্টে গুঁজে ইতির পাশে দূরত্ব বজায় রেখে বসে পড়লো।লাজুক ইতির বুকটা ধুকপুক করতে শুরু করেছে।মেয়েটা অযাচিত কারণে নার্ভাস ফিল করছে।ভেলপুরি প্লেটে ধরে রাখা হাত দু’টো কাঁপছে।জুই আরেকটা ভেলপুরি বানাতে বললো ফুচকাওয়ালা মামাকে।ইতি জুইয়ের কানাকানি বললো,
–“জুই আমি দুটো কাবো না।একটা তুমি নিয়ে নাও।”
জুই আরেকটা ভেলপুরি বানাতে না করে দিলো।জিতু ভাইয়াকে বললো,
–“ভাইয়া তুমি আমারটা খেয়ে নাও।ইতি দুটো খেতে পারবে না।”
জিতু ভাইয়া ইতির দিকে তাকালো।কোনো শব্দ ব্যয় না করে ইতির প্লেট থেকে একটা তুলে নিলো।ইতি আশ্চর্য হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকালো।ভাইয়া একটা কামড় দিয়ে বললো,
–“নট বেড।ট্রাই করতে পার।”
ইতি তাড়াতাড়ি চোখ নিচে নামিয়ে নিলো।জিতু ভাইয়া খাওয়ায় মনযোগ দিয়েছে।ইতি আড় চোখে ভাইয়ার দিকে তাকালো।ভাইয়া চিবচ্ছে, তারপর গিলছে।কন্ঠ নালি উঠানামা করছে। বিষয়টা ইতিকে আকর্ষণ কারছে।ইতি মুগ্ধ নয়নে ভাইয়াকে দেখতে লাগলো।ভাইয়া নিজের খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটার হুশ ফিরলো।ইতি খেতে লাগলো।আবার আড় চোখে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিতু ভাইয়াকে দেখতে লাগলো।এই প্রথম কোনো পুরুষ কে এতটা গভীর ভাবে দেখছে সে।তার কোমল গোলাপি ওষ্ঠ কোণে হাসির ঝলক দেখা দিচ্ছে।
সেই কখন থেকে অটোরিকশা চলছে তো চলছে।অবশ্য খারাপ লাগছে না।অনেকদিন পর এভাবে ঘোরা হচ্ছে।আমার পাশেই বসে আছে ইফান। তার দৃষ্টি আমাতেই নিবদ্ধ। যদিও আমি ওর দিকে তাকাচ্ছি না।খোলা রাস্তা দিয়ে গাড়িটা চলতে চলতে হঠাৎ এসে থামলো।আসেপাশে অনেক মানুষ। বাম দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল বিশাল বড় একটা গেইট।সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা আনন্দ মেলা।চারপাশে খুব সুন্দর করে সাজানো। আমি ইফানের দিকে ঘুরতেই দেখি সে নেই।আমি অবাক হলাম।
“আমি এখানে…।”
আমি ঝটপট ঘুরে তাকালাম। ইফান হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো।আমি ইফানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে উপেক্ষা করে একাই নামলাম।হঠাৎই নজর পড়লো আমাদের অটোরিকশাটার থেকে বেশ খানিকটা দূরে ইফানের গার্ডদের তিনটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।আমি দৃষ্টি সরিয়ে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ইফানের দিকে ঘুরে তাকালাম।
–“এখানে নিয়ে আসার কারণ?”
ইফান মৃদু হেসে আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলো।আমি ইফানের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললাম,
–“আমি বাসায় যাব।”
ইফান সামনে এগিয়ে যেতে যেতে প্রতিত্তর করলো,”বাসায় গিয়ে কি করবে?তোমার জামাই তো এখানে।”
–“অসহ্য!!”
ইফান আমাকে নিয়ে ভেতরে আসতেই আমি বেশ অবাক হলাম।ভেতরে কত মানুষ। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট,নাগরদোলা আরও কত কি!!আজ বহুবছর পর মেলায় আসলাম তাই এই পরিবেশ দেখে অবাক হচ্ছি কিছুটা।এদিকে ইফানকে আর আমাকে দেখে আসেপাশের কিছু মানুষ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে।আমি আসেপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম।না আসলেই সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে!আমি ইফানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলাম।এতে ইফান আমার বাহু ধরে ওর সাথে মিশিয়ে নিলো।সকলের সামনে অস্বস্তিতে পড়লাম।এদিকে কয়েকজন লুকিয়ে আমাদের দিকে ফোন ধরে ভিডিও করতে নিলেই তাদের চোখ পড়ে আমাদের পিছনে আসা গার্ডদের দিকে।গার্ডরা চোখ রাঙাতেই সকলে আমাদের থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।
ইফান আমাকে নিয়ে চারপাশ ঘুরে দেখাচ্ছে।আমার কি লাগবে জিগ্যেস করছে।আমি কোনো উত্তর করছি না।ইফান আমাকে হাওয়ায় মিঠাই এর দোকানে নিয়ে গেলো।আমাকে আর কিছু জিগ্যেস না করে দুটো হাওয়াই মিঠাই কিনে দিল।অতঃপর আমার হাতে জোর করে ধরিয়ে দেয়।আমি সেগুলো অনিচ্ছা সত্যিও হাতে ধরে রেখে বললাম,
–“আমি কি বলেছি খাব, আজীব!”
–“তোমাকে কোন কিছু বলতে হবে না।আমি সব জানি।আর এটাও জানি এই ফুড তোমার পছন্দ।”
আমি আশ্চর্য হলাম ইফান কিভাবে এটা জানলো আমি হাওয়াই মিঠাই খেতে পছন্দ করি!আমি কিছু বলতে নিলেই ইফান আমার হাত থেকে হাওয়াই মিটায় নিয়ে আমার মুখে পুরে দিলো।আমি সেটা মুখে নিয়ে কটমট করে তাকিয়ে।ইফান ঠোঁট টিপে হাসছে।আমি মুখের মিঠাই শেষ করতে লাগলাম।ইফান আমাকে মনযোগ দিয়ে দেখছে।আমার ঠোঁটে মিঠাই লেগে আছে।গোলাপি ওষ্ঠগুলো ঝলমল করছে।ইফান অন্যদিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো।আমি খাওয়া শেষ করতেই আমার দিকে তাকালো।আমার ঠোঁটে এখনো মিঠাই জেলির মতো লেগে আছে।ইফান আমাকে ইশারা করলো।আমি বুঝলাম না।ইফান পুনরায় আমার ঠোঁটে ইশারা করলো।আমি বিরক্ত হয়ে চোখ সরু করে ফেললাম।ইফান আমাকে আর কিছু না বলে আমার ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো।আমি সরে যেতে নিলেই মাথায় ধরে তার সাথে চেপে ধরে রাখলো।সেভাবেই নিজের জিহ্বা দিয়ে আমার ঠোঁটে লেগে থাকা মিঠাই চুষে খাচ্ছে।পাবলিক প্লেস অথচ কারো সাহসে কুলালো না আমাদের দিকে তাকাতে।কারণ সকলেই ইফান চৌধুরী কে ভালো করে চিনে জানে।
ইফান আমার ঠোঁট ততক্ষণ নিজের দখলে রাখলো যতক্ষণ মিষ্টি স্বাদ মুখে গেছে।আমার ঠোঁটের আসেপাশে মিষ্টি স্বাদ নিয়ে ঠোঁট ছেড়ে জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে হাস্কি স্বরে বললো,
–“এবার ঠিক আছে।”
আমি হাতের উল্টো পৃষ্ঠা দিয়ে কোনো মতে ঠোঁট মুছে ইফানকে বকতে লাগলাম,”কুত্তার বাচ্চা। নির্লজ্জ ন*ষ্ট পুরুষ।”
আমার কথা শুনে ইফান হেসে দিলো।তারপর আমাকে টেনে নিয়ে নাগরদোলায় উঠে বসলো।আমি কতবার বারণ করলাম।কিন্তু বেপরোয়া লোকটা শুনলো না।নাগরদোলা ঘুরতে শুরু করেছে।এদিকে আমার কলিজা লাফাচ্ছে।না পারছি চেঁচাতে আর না পারছি ইফানকে ঝাপটে ধরতে।বাকিরা ঠিকই চিৎকার চেচামেচি করছে।নাগরদোলা যখন উপর উঠছে তখনই আমি শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিলাম।আমি ভয় পাচ্ছি দেখে ইফান তার বুকের সাথে চেপে ধরলো।আমিও ওর বুকের কাছে কোটের কিছুটা অংশ শক্ত করে ধরলাম।ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে আমার মাথা তার বুকে আরও চেপে ধরলো।
নাগর দোলা থেকে নেমে আমি রাগে গজগজ করতে করতে আরেক দিকে যেতে লাগলাম।ইফান আমার পিছু পিছু আসছে।
বিশাল বড় মেলা আমরা হয়তো একাংশ ঘুরতে পেরেছি।এরই মাঝে সন্ধ্যা নেমে আসলো।চারিদিক থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে।ধরণীতে আধার নেমে এসেছে।সব জায়গায় লাইটিং থাকায় বুঝা বড় দায় এখন দিন না রাত।চারিপাশে শব্দ দূষণ।আমি ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।ইফান পিছন থেকে এসে বললো,
–“জান তোমার অনেক খিদে লেগেছে তাই না।”
–“আমি কি তোমাকে একবারও বলেছি যে আমার খিদে লেগেছে?”
ইফান আমার হাত ধরে আরেকটা স্টলে নিয়ে যেতে যেতে বললো,”অনেক সকালে অল্প খেয়ে বেড়িয়েছ। এখন তুমি অনেক ক্ষুধার্ত।”
আমার কোনো কথা শুনলো না।আমাকে জিগ্যেস করলো কি খাবে।আমি হা না কিছু বলতে পারছি না।আসলেই আমি অনেক ক্ষুধার্ত।তার উপর সামনে এত সুন্দর সুন্দর খাবার পেটের ক্ষুধা আরও বেড়েই চলেছে।আমি কিছু বলছি না দেখে ইফান নিজেই এক প্লেট চিকেন ফ্রাই,স্যান্ডউইচ আর চিংড়ি ফ্রাই নিলো।তারপর আমার হাতে খাবারের প্লেট ধরিয়ে দিলো।আমি উশখুশ করছি কি করবো না করবো।কারণ ইফান নিজের জন্য কিছু নিলো না।আমি ওর সামনে একা কিভাবে খাব!আর এটাই বা কিভাবে জিগ্যেস করবো আপনি কাবেন না?আমার ভাবনার মাঝেই ইফানের কন্ঠ স্বর কানে আসলো,
–“ঠান্ডা হয়ে যাবে খেয়ে নাও।আমি স্ট্রিট ফুড খাই না।”
এবার আমি কিছু না ভেবে খেয়ে নিলাম।অসম্ভব খুদা পেটে। তার উপর ফেবারিট ডিশ।আমার খাওয়া শেষ হতেই ইফান টিস্যু দিয়ে আমার ঠোঁট মুছিয়ে পানির বোতল এগিয়ে দিলো।
ইফান আমাকে নিয়ে কসমেটিকসের স্টলে গেলো।আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,”এত অভিনয় কিসের জন্য?”
ইফান আমার দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,”কিসের অভিনয়?” আমি এটা ওটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বলালম,”এই যে এত ভালো মানুষের মতো আচরণ করছেন।”
–“আমি ভালো মানুষ না সেটা তুমি কেন পুরো বিশ্ব জানে।ভালো মানুষী দেখানোর কোনো কারণ নেই।তোমার প্রতি আমার অনুভূতি অলওয়েজ ট্রু।”
ইফান নিজের কথা শেষ করেই একটা ছোট কালো টিপ আামর কপালে পড়িয়ে দিলো।আমি চোখ উল্টে দেখার চেষ্টা করলাম।ইফান হেসে বললো,”উমমম পারফেক্ট।”
আমি ভাবলেশহীন ভাবে ইফানকে জিগ্যেস করলাম,”এতদিন পর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলেন।আমি তো ভেবেছিলাম হয়তো একেবারে হারিয়ে গেছেন।”
–“আমি ফিরে আসায় খুব দুঃখ হচ্ছে তাই না?”
আমি ইফানের কথায় দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লাম।ইফান মনযোগ দিয়ে আমার ক্লান্ত চেহারাটা দেখতে লাগলো।কিছুক্ষণ চুপ থেকে হিসহিসিয়ে বললো,”তুমি যতই চেষ্টা কর আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে। কিন্তু পারবে না।আমি তা কখনোই হতে দিব না।”
–“আলাদা তো তখন হয় যখন এক থাকে।আমাদের মাঝে তো প্রথম থেকেই বিশাল এক দেওয়াল।”
–“তাহলে এই দেওয়ালটাই ভেঙে দিব।”
–“দেখা যাবে।”
ইফান নিজের পছন্দ মতো আমার জন্য এটা-ওটা কিনছে।মনে তো হচ্ছে পুরো মেলার সব নিয়ে নিচ্ছে। আমি যেদিকে, যে জিনিসে তাকিয়েছি সব কিনে নিয়েছে।আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে এসব কান্ড দেখছি। এবার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আসেপাশে মানুষের ভীড়ে চোখ বুলালাম।ইফান গার্ডদের ডেবিট কার্ড দিয়ে চলে এসেছে।গার্ডরা জিনিসগুলো নিচ্ছে।
হঠাৎই পিছন থেকে ইফান এসে আমার খোপায় কাঠি ব্যান্ট গুঁজে দিলো।আমি ক্লান্ত চেহারা নিয়ে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান আমার গালে হাত বুলিয়ে বললো,
–“বেশি টায়ার্ড লাগছে?”
আমি সামনে হাঁটা ধরে বললাম,”আমার সিদ্ধান্ত কি আপনি কখনো শুনেছেন?” আমার কথায় ইফান হাসলো।
❝ভেবে দেখেছ কি তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…❞
আমি হাঁটতে হাঁটতে আরেক দিকে আসলাম।হঠাৎই কানে গানের সুর আসলো।আমার পা আপনা-আপনি থেমে গেছে।আমি সেই দিকে তাকিয়ে দেখলাম মানুষের অনেক ভীড়।সেখানে কিছু সিঙ্গার তাদের গানের দল নিয়ে বসেছে।এক দুজন সুর মিলাচ্ছে।বাকি কজন ইন্সট্রুমেন্ট বাজাচ্ছে।আমি কয়েক পলক মোহ দৃষ্টিতে দেখলাম।মনের ব্যথা গুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছে।আমি একটা ঢুক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম।
ইফান আমাকে গভীর দৃষ্টিতে খেয়াল করলো।অতঃপর যেদিকে গান হচ্ছে সেদিকে এগিয়ে গেলো।আমি তাকে খেয়াল করলাম না।আমি অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ালাম।
❝বন্ধু-তুমি-ভালো তুমিতো চাঁদের-আলো
আমি মনে হয় ব্রামণ হয়ে চাঁদে হাত বাড়াই….❞
আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে এক পা এগোতেই আরেকটা নতুন গানের সুর কানে আসলো।কান্ঠটা আমার চেনা ঠেকছে।তাই আচমকা আমার পা থেমে যায়।আমি তৎক্ষনাৎ সেদিকে ফিরে তাকালাম।
❝জলসে সে যাব জানি মানছে না মন খানি।
পাবনা যেনও মিছেমিচি কোন তোমাকে ছুঁতে চাই।
আমি কোন বার বার প্রেমে পড়ে যাই।
এই জনমে পাই বা-না পাই পর জনমে চাই……❞
আসেপাশের সকল মানুষ ইফানের গান শুনে চিৎকার চেচামেচি শুরু করেছে।অনেকে তাল মিলিয়ে গাইছে।আমি দেখছি, ইফান গানের দলের সাথে গিটার হাতে বসে।একেকটা তারে হাত চালিয়ে গলার সাথে গিটারেও সুর তুলছে।তার অপলক দৃষ্টি আমাতেই আবদ্ধ। ঠোঁটে চোখে সুক্ষ্ম হাসির ঝলক।আমি চরম আশ্চর্য।আমার অবাক হওয়া চেহারা দেখে ইফানের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও প্রসস্থ হচ্ছে।আমি দু’হাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে শুধু দেখতে লাগলাম।
ইফান আমাকে একটা ব্রিজের ওপর নিয়ে এসেছে।চারিদিকে অন্ধকার থাকায় বুঝতে পারছি না এটা কোন জায়গা।আমি ব্রিজের ব্যালুস্ট্রেড ধরে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে।যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় সবটাই অন্ধকার।যতটুকু ব্রিজ লাইটের আলোতে দেখা যাচ্ছে সেটা বাতাসে হালকা কুয়াশা বা হেজে আলোটা আবছা দেখাচ্ছে।ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়ায় খানিকটা ঠান্ডা অনুভব করছি।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম।দু’হাতে দুই বাহু ঘষছি।হঠাৎই ইফান পিছন থেকে আমার সাথে মিশে দাঁড়ায়।দু’হাতে আগলে ধরে তার ওভার লং কোট দিয়ে আমাকে খানিকটা ঢেকে নিলো।এখন আর ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে না।
কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলো।আমি আগের মতো দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো প্রকার শব্দ ব্যয়হীন।ইফানও কিছুক্ষণ চুপচাপ আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে সেদিকে চেয়ে।হঠাৎই কানে ইফানের হাস্কি স্বর কানে আসলো,
–“হঠাৎ এত শান্ত চুপচাপ হয়ে গেলে কেন?”
আমার থেকে উত্তর আসলো না।ইফান তপ্ত শ্বাস ছেড়ে কিছুটা ঝুঁকে আমার মাথায় গাল ঠেকালো।আমাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“অন্ধকারে একা এত ভয় পাও তবুও কেন প্রতিদিন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাক এত রাত পর্যন্ত।”
–“সব খবরই রাখতে দেখছি।”
–“তোমার কি মনে হয়,আমি দূরে গিয়ে তোমার চোখের আড়াল হয়েছিলাম বলে তোমাকেও আমার চোখের আড়াল হতে দিতাম?”
আবারও আমার থেকে উত্তর আসলো না।ইফান আমার চুলের ঘ্রাণ টেনে নিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,”আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন আমার এই চোখজোড়া তোমাতেই সীমাবদ্ধ।”
ইফান আমার শাড়ির আচল ভেদ করে পেটে হাত রাখলো।ঘারে চুম্বন এঁকে দিচ্ছে। সমান তালে আমার উন্মুক্ত উদারে তার হাতের বিচরণ।আমি কোনো প্রতিক্রিয়া করছি না।ইফান গাঢ় চুমু খেতে খেতে আমার কানে ঠোঁট রাখলো।স্পোকি টোনে ফিসফিস করে বললো,
–“আমি ছিলাম না রাতে একা একা খুব ভয় পেতে তাই না সোনা।”
ইফানের কথাটা আমার টনক নড়ালো।সত্যি কথা বলতে তো রাতে একা থাকতে আসলেই ভয় পেতাম।যদিও কখনো প্রকাশ করি নি।বিয়ের পর থেকেই খালি মনে হতো আমার দিকে কয়েক জোড়া চোখ নিবদ্ধ।
ছয়মাস আগে যখন আমার বাপের বাড়ি থেকে আবার চৌধুরী বাড়িতে আসি তখন সব ঠিকঠাক ছিলো।সমস্যাটা আবার শুরু হয় যখন দুদিন পর ইফান দেশের বাইরে চলে যায়।কিন্তু ইফান কিছুদিনের মধ্যেই আবার দেশে চলে আসে।তারপর আবার সব স্বাভাবিক।আমার আন্দাজ মতে ইফান দেশের বাইরে থেকেও আমাকে স্টক করার সময় বিষয়টা বুঝতে পারে আমি কিছু একটা কারণে নিজের রুমে থাকতে ভয় পায়।তাই ইফান নিজের কাজ দ্রুত শেষ করে ফিরে আসে।
ইফান আরও দুমাস আমার সাথে থাকে।কিন্তু হঠাৎই কিছু একটা কারণে দেশ ত্যাগ করে।তারপর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে যায়। আমি কেন!!চৌধুরী বাড়ির কারো সাথেই ইফানের কোনো যোগাযোগ ছিলো না।
ইফানের অনুপস্থিতিতে সেই থেকে আমার সাথে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে।
জায়ান ভাইকে হারানোর পর থেকে আমার রাতে আকাশ দেখার অভ্যাস তৈরি হয়।আমি যখন বেলকনিতে দাঁড়ায়, আমার মনে হয় আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে।কখনো মনে হয় বাগানে কেউ হাঁটছে।যদিও কিছু কখনো কিছু দেখতে পাই নি।তবে অনেক ভয় পাই।তবুও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার অভ্যাস ছাড়তে পারি না।আমি হ্যালুসিনেশন করি আমার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে জায়ান ভাই।মূহুর্তেই আমার সব ভয় কেটে যায়।
–“প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে কি খুঁজ বেইবি?”
ইফানের কন্ঠ স্বর কানে আসতেই আমি কল্পনা থেকে বেড়িয়ে আসলাম।আমার চোখ দুটো এখনো আকাশের দিকেই স্থির।আজ আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।আকাশ ভর্তি লক্ষ কোটি তারার মেলা।আমি আনমনে বলে উঠলাম,
–“এক বিন্দু সুখের দিশা।”
–“আমি তোমাকে এক আকাশ পরিমাণ সুখ এনে দিব।তুমি শুধু আমার হয়ে যাও জান।”
–“আপনার থেকে সুখ না নেওয়ার বিনিময়ে যদি আমাকে সারাজীবন দুঃখ বয়ে বেড়াতে হয়।তাহলে আমি দুঃখ নিয়েই বাঁচতে রাজি।”
আমার বাক্যটা শেষ হতে না হতেই এক টান মেরে ইফান নিজের দিকে ফিরিয়ে আমার গলায় থাবা মেরে ধরলো।এতক্ষণের সব নমনীয়তা ক্রোধে রুপ নিয়েছে।ইফান আমার গলা ধরে রেখেই ব্রিজের ব্যালুস্ট্রেডের সাথে চেপে ধরলো।ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। চোখ দুটো রাগে টগবগ করছে।ইফান দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,
–“হারা/মির বাচ্চা মেরে ফেলবো তোকে।একদমই জানে মেরে ফেলবো।রাখ তর বালের সুখ। তুই কষ্টে থাকারই যোগ্য। তোকে কষ্টেই রাখবো।”
গলা এমন ভাবে শক্তে চেপে ধরেছে যে আমি দম নিতে পারছি না।আমি ইফানের হাত ধরে গলা থেকে ছাড়াতে চাইছি।আমার এমন অবস্থা দেখে ইফান ছেড়ে দিলো।অতঃপর আমাকে তার কাছে টেনে উন্মাদের মতো চুমু খেতে লাগলো।আমি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি।ইফান তার বুকে আমাকে মিশিয়ে নিয়ে বলতে লাগলো,
–“অনেক লেগেছে সোনা।খুব ব্যথা পেয়েছ?আ’ম সরি জান আ’ম সরি।”
আমি ইফানকে ঠেলে সরে দাঁড়ালাম।ইফান ঢোক গিলে আমাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম।তারপর আগের মতো অপলক আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।নিজের প্রতি করুণা হয় যদি একটু চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম তাহলে হয় তো বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণাটা একটু উপশম হতো।আমি ভালো নেই জায়ান ভাই, সত্যি ভালো নেই।
ইফান অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।কেউ কোনো কথা বলছি না।হঠাৎই ইফান আমাকে পিছন থেকে ঝাপটে ধরে কাঁধে মুখ ডুবিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠে,
–“এভাবে চুপ করে থাকিস না বউ।তোর এই নিরবতা আমাকে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয় আমি ধ্বংসের দারপ্রান্তে।”
ইফান থামল।আবারও নীরবতা।ইফান আমার শরীর থেকে নাক টেনে ঘ্রাণ নিলো।ওর তপ্ত শ্বাস আমার ঘারে আঁচড়ে পরছে।ইফান তার খরখরে ওষ্ঠজোড়া আমার কানে ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
❝আমি তোর সব কষ্ট দূর করে দিবো বুলবুলি। একদিন আসবে,আমাদের মধ্যে সব দূরত্ব ঘুচে যাবে।প্রয়োজনে আমি হেরে গিয়ে হলেও তোকে জিতিয়ে দিব।শেষ বেলায় তুই হাসবি জান।তোর সুখের জন্য যদি আমাকে নিঃশেষ হতে হয়, তবে জেনে রাখ আমি অকালেই ঝরে যাব।❞
রাতের অন্ধকারে সব ছেয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অন্ধকার ছোট্ট রুমের সবটা জুড়ে শতাধিক মোমবাতি জ্বলে উঠেছে।রুমের চার দেয়ালে বহু সংখ্যক সুন্দরী মেয়ের ছবি সহ অদ্ভুত ভয়ানক সব চিত্রকার্য।মোমবাতির হলদে আভায় দৃশ্যমান আমার বিয়ের দিনের লাল লেহেঙ্গা পড়া একটা ছবি।ছবিটার মধ্যে সামনের মোমবাতি থেকে আগুনের শিখা ঝলঝল করছে।
শতাধিক মোমবাতির মাঝখানে অশরীরির মতো কেউ একজন বসে আছে।তার সামনে লাল সুতা মোড়ানো পুতুল,ভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র__মানুষের অবয়ব আঁকি ঝুকি করা কাগজ আর আমার ছবিটা রাখা।আসেপাশে লাল তরলের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।আসলে রক্ত না রং বুঝে ওঠা বড় দায়।গা ছমছমে পরিবেশ। অশরীরির মতো বসে থাকা ব্যক্তি কালোতে মোড়ানো। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় মুখ দিয়ে কেমন অদ্ভুত সব আওয়াজ করছে।
হঠাৎই কক্ষে আরেকজন নিঃশব্দে উপস্থিত হয়।কিন্তু ধ্যানমগ্ন থাকা ব্যক্তির বুঝতে অসুবিধা হলো না কে এসেছে।সে অদ্ভুত কন্ঠে বলে উঠলো,
❝ঐ মেয়ে আমাদের সব রাজত্ব ধ্বংস করতে এসেছে।এবার আমাদেরকেই কিছু করতে হবে,,,,❞
চলবে,,,,,,,
(এই খন্ডে কিন্তু অনেক ভায়োলেন্স থাকবে।তাই সবাই আগে থেকেই মানসিক ভাবে প্রস্তুত থেকো।হ্যাপি রিডিং 🥳💗)
জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৫০
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
ব্যস্ত নগরী। রাতেও চারদিকে আলোর খেলা। সড়ক-মহাসড়ক আর ফ্লাইওভারজুড়ে যানবাহনগুলো ছুটে চলেছে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।ঢাকা উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে চৌধুরী বাড়ির অবস্থান। বিশাল আয়তনের এই অট্টালিকা যেন গর্বভরে শির তুলায় দাঁড়িয়ে আছে। সারা বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে, তার সেই সৌন্দর্য যে কারো চোখ ধাঁধিয়ে দেবে।চারদিক ঘিরে সশস্ত্র কালো পোশাকধারী গার্ডদের সতর্ক দৃষ্টি। গেইটের দু’পাশের গার্ডরা দরজা খুলতেই কালো কুচকুচে মার্সিডিজটা হুরমুর করে ঢুকে পড়ল চৌধুরী মেনশনের ভেতরে।
ইফান পার্কিং লটে গাড়ি থামাতেই আমি ঝটপট নেমে পড়লাম।ইফান কিছু বলার আগেই দ্রুত পায়ে সামনে হেঁটে এগিয়ে গেলাম।ইফান হেসে পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,
–“এই যে ঝাঁঝওয়ালি, বি কেয়ারফুল।হোটচ খেয়ে পড়ে যাবে তো বেইবি।আজ কিন্তু আমি ব্যথা দেওয়ার আগে ব্যথা পেলে চলবে না।”
আমি ঝটপট পিছনে ফিরে দাঁত কটমট করে বললাম,”শা’লা লু’চ্চা। তুই কোনোদিন মানুষ হবি না।”
নিজের কথা শেষ করেই পার্কিং এরিয়া ত্যাগ করলাম।যাওয়ার সময় ইফানের উচ্চ স্বরে হাসি কানে আসে।
আমি রাগে গজগজ করতে করতে কলিং বেল বাজালাম।প্রথমবারে কেউ দরজা খুললো না।মেজাজ আরও গরম হয়ে গেলো।তাই একনাগাড়ে বেশ কয়েকবার চাপতেই দরজা খুললো।
“কি ব্যপার এত দেরি……!!”
বাকি কথা আর সম্পূর্ণ করতে পারলাম না।তার আগেই নজরে পড়ে সামনে থাকা ব্যক্তির উপর। আমি অবাক নয়নে অস্পষ্ট ভাবে বললাম,”মীরা আপু!!”
মীরা হেসে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,”ওহ্ ডিয়ার ভাবিজান। ডোন্ট কল মি আপু।হতে পারি তোমার সিনিয়র।বাট তুমি আমার বড় ভাইয়ের ওয়াইফ।সো অলওয়েজ আমার নাম ধরেই ডাকতে পার কেমন।”
মীরা আমাকে ছেড়ে দাঁড়াল।আমি মিষ্টি হাসি দিয়ে বললাম,”আচ্ছা বাবা ঠিক আছে।তো হঠাৎ দেশে ফিরলে যে।আমি তো ভেবেছিলাম এ জীবনে বড় ননদিনীর সাথে সামনাসামনি দেখা হবে না।”
মীরা মন ভুলানো হাসি দিয়ে বললো,”ওও সুইটি তোমাকে দেখার জন্যই তো হঠাৎ ডিসিশন চেইঞ্জ করে ভাইয়ার সাথে প্ল্যান ছড়াই দেশে ফিরা।”
–“ওও আচ্ছা বুঝলাম সবাই খালি বড় ভাবির কথায় ভাবে। আমি বুঝি কেউ না?”
আমার আর মীরার কথার মাঝেই পলি হাজির।মীরা হেসে পলির বাহু হালকা জড়িয়ে ধরে বললো,”ও মাই গড, তুমি তো আমার সুইটহার্ট।তোমার কথা ভাববো না কেন!এক্টচুয়ালি আমি তোমাদেরকে দেখার জন্যই আসলাম।”
আমরা তিনজন কথা বলতে বলতে ড্রয়িং রুমে আসলাম।আগে থেকেই চৌধুরী বাড়ির কিছু সদস্য সেখানে উপস্থিত।আমাকে দেখেই নাবিলা চৌধুরী মুখ অন্ধকার করে ফেললো।ছয়মাস আগে বাপের বাড়ি থেকে চৌধুরী বাড়িতে আসার পর নাবিলা চৌধুরী আর আমার সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে।কথায় কথায় আমাদের ঝগড়া।আর সেই ঝগড়ার মূল কারণ থাকে ইফান।আমি নাকি তার ছেলেকে আচলে বেঁধে মায়ের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি!!
নাবিলা চৌধুরী আর আমি দুজনেই মুখ মুচড়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
আমাকে দেখা মাত্রই সোফায় বসে থাকা মাহিন দাঁড়িয়ে কাছে এসে কুর্নিশ জানিয়ে বললো,”মাননীয় ভাবি জান কি খবর,ভালো আছেন?এই অবিবাহিত মাসুম দেবরটাকে ভুলে যাননি তো নাকি?”
মাহিনের কথায় হেসে দিলাম।তিন মাস আগে ইফান দেশের বাইরে যাওয়ার চারদিনের মাথায় মাহিনও দেশ ছাড়ে।
–“তো ভায়া এবার বিয়েসাদী করে নাও।আর কতকাল বউ হীনা জীবন পাড়ি দিবে?”
মাহিন বুকে হাত ধরে আফসোসের সুরে বললো,”উফফ ভাবি আপনার মতো করে কেউ আর বিয়ের কথা বলে না গো।নাহলে আমারও তো একটা টুকটুকে বউ থাকতো।এবার আমার বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব টা আপনিই নেন।”
–“সে তো আমিই নিব।তোমার বিয়ে দিয়ে তো আবার আমার বড় ননদিনী কেও বিয়ে দিতে হবে নাকি?”
আমার কথাটা শুনা মাত্রই এতক্ষণ হাসিখুশি থাকা মীরার চেহারা মলিন হয়ে গেলো।মনিরা বেগম আমার কাছে এসে বললো,”এত দিনে ঠিক জায়গায় দায়িত্ব পড়লো।শুন বড় বউমা, এবার তুমিই দেবরের বিয়ের ব্যবস্থা কর।আমরা বললে তো আবার এখন না,এখন না করে।পাজি ছেলে এখন ভাবির কাছে বিয়ে করানোর আবদার করেছে।”
–“আরে আমার বেটা।”
মাহিনকে নিয়ে সবাই হাসিঠাট্টা করছে।তখনই নাবিলা চৌধুরীর কন্ঠ কানে আসে।আমি সহ সকলেই নাবিলা চৌধুরীর দৃষ্টি অনুযায়ী দরজার দিকে তাকাতেই দেখলাম ইফান ভেতরে আসছে।ইফান ভেতরে আসতে আসতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে তার মায়ের দিকে রাখলো।দু’হাত মেলে ধরে বললো,
–“ওহ্ ডিয়ার মম।”
নাবিলা চৌধুরী ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো।ইফান মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু খেয়ে বললো,”হাউ আর ইউ মম?”
নাবিলা চৌধুরী আধিক্যেতা দেখিয়ে বলতে লাগলো,”ওহ্ মাই সন আ’ম ফাইন।বাট আই মিস ইউ সো মাচ।এতগুলো দিন কোনো যোগাযোগ কর নি কেন বেটা?”
নাবিলা চৌধুরীর কথা শুনে ইফান আমার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে হেয়ালি করে প্রতিত্তোর করলো,”যে সাঙ্ঘাতিক জিনিস খাইয়ে পড়িয়ে পালছি মনে হয় না পরের বার আর ফিরা হবে।”
ইফানের কথার মানে কেউ বুঝলো কি বুঝলনা জানা নেই। তবে এতক্ষণ সোফায় চুপচাপ বসে ফোন টিপতে থাকা নুলক চৌধুরী আড় চোখে আমার দিকে তাকালো। এদিকে ইফানের দিকে চোখ সরিয়ে আরেক পাশে তাকাতেই নুলক চৌধুরীর সাথে আমার চোখাচোখি। সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।অনুভূতিহীন নুলক চৌধুরী দৃষ্টি সরিয়ে আবারো ফোন টিপায় মনযোগ দিলো।
নোহাকে নিয়ে চৌধুরী বাড়ি ফেরার পরদিনই নুলক চৌধুরী অসুস্থ পঙ্কি আর নোহাকে নিয়ে লন্ডন বেক করে।গত সপ্তাহে দেশে এসেছেন এই ভদ্র মহিলা। তবে নোহা আর পঙ্কি এবার আসে নি।আমার কাছে যতদিন যাচ্ছে নুলক চৌধুরী তত রহস্যময় হয়ে উঠছে।আমি উনাকে নিয়ে যতই হিসাব মিলাতে যাই ততই তা গোলমেলে হয়ে যায়।
আমার ভাবনার ছেদ ঘটে নাবিলা চৌধুরীর কথায়,
–“তুমি ছেলে না বাবা, এই মেয়ে যে কি কি করেছে তার কোনো আইডিয়া আছে তোমার।ও মাই গড, আমি বলেই ওকে দেখেশুনে রাখতে পেরেছি।”
নাবিলা চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই আমি সবার সামনে হোহো করে হেসে দিলাম।সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। কেউ বুঝতে পারছে না হাসার কারণ। আমি এক আঙ্গুল নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাক করে হাসতে হাসতে বলালম,
–“এত বড় ডাহা মিথ্যা কিভাবে বললেন সাসু মা!আপনি তো এই বয়সেও বাবার পিছনে স্টক মেরেই সময় পান না। আমাকে দেখে রাখতেন কখন!!”
আমার কথা শুনে সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে।নুলক চৌধুরী চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে লিভিং রুম ত্যাগ করলো।নাবিলা চৌধুরী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চেচিয়ে উঠলো,
–“অসভ্য বেয়া……”
বাক্য সম্পন্ন হওয়ার আগেই কয়েকজন গার্ড মেলা থেকে নিয়ে আসা জিনিসগুলো ভেতরে নিয়ে আসলো।সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।গার্ডগুলো জিনিস গুলো রেখে চলে যেতেই নাবিলা চৌধুরী শুধালো,
–“হোয়াট ইজ দিস?”
আমি ছুটে গিয়ে বললাম,”এগুলো আমার জন্য।আপনার ছেলে তো আমাকে নিয়ে মেলায় ঘুরতে গিয়েছিলো।কেন আপনি জানেন না?”
নাবিলা চৌধুরী ছেলের দিকে তাকালো।আমি আবারো বলে উঠলাম,”আহারে আপনি কিছুই দেখছি জানেন না।আপনার ছেলে তো দেশে আসার পর থেকে আমার সাথেই ছিলো।আজ আমরা কত ঘুরাঘুরি করলাম…”
আমি থামলাম।ইফানের বুকে এক আঙ্গুল দিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে নাটকীয় ভঙ্গিমায় বললাম,”এটা তুমি একদমই ঠিক করো নি ইফান।তোমার উচিত ছিলো আমার একমাত্র সাসু মাকে নিয়ে যাওয়া।”
নাবিলা চৌধুরী আমার কথা শুনে রাগে ফুঁসছে।আমি ওনার রাগ বাড়াতে বলে উঠলাম,”মন খারাপ করবেন না।ছেলে নিয়ে যায় নি তো কি হয়েছে আপনার জামাই তো আছে…..”
আমি থামলাম।ভুলাভালা চেহারা করে বললাম,”কিন্তু বাবা তো আপনাকে দেখলেই এভাবে কাঁপে…আমি নাটকীয় ভঙ্গিমায় দু’হাত সামনে ধরে চোখ উল্টে শরীর কাঁপিয়ে দেখালাম।এটা দেখে ইফান মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসতে হাসতে নিজের রুমে যাওয়া ধরলো।এদিকে পলি আমার কাঁপুনি দেখে নিজের চাপা হাসি চেপে রাখতে পারলো না।
হাসির আওয়াজ নাবিলা চৌধুরীর কানে পৌঁছাতেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন,”এই মেয়ে চুপ। একদম চুপ।তোরা দু’জনেই কুচক্রী। তোরা আমার সুখের সংসারে আগুন লাগাতে এসেছিস।”
নাবিলা চৌধুরীর ধমকে সকলের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো।দাদি মুখ মুচড়ে মুখে আচল টেনে ধরলো।মাহিন হেসে শুকনো কাশতে কাশতে লিভিং রুম ত্যাগ করলো।আমি মেলা থেকে আনা জিনিসগুলো থেকে সবাই কে এটা ওটা দিচ্ছি।নাবিলা চৌধুরী বুকে হাত গুঁজে আড় চোখে সবটা দেখলো।অতঃপর গজগজ করতে করতে চলে যেতে নিলেই আমি ঢেকে উঠলাম,
–“আরে সাসুমা আপনি চলে যাচ্ছেন কেন?আমি তো আপনার জন্যও স্পেশাল গিফট আনলাম।”
আমার ডাক শুনে নাবিলা চৌধুরী থামলো।শাড়ির আচল কাঁধে তুলে পিছনে ফিরে গম্ভীর ভঙ্গিমায় আমাকে পরক করলো।আমি দাঁত বের করে ওনার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম,”আপনি কি ভেবেছিলেন সাসুমা, আপনার সোনা বউমা আপনার জন্য কিছুই আনবে না?একদমই না।আমি তো আপনার জন্য খুঁজে খুঁজে একদম বেস্ট একটা জিনিস এনেছি ওয়েট!”
আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজিয়ে আমার সাইট ব্যাগটা থেকে টুক করে একটা বেলান বের করলাম।তারপর সেটা নাবিলা চৌধুরীর চোখের সামনে ধরতেই তিনি রেগে ফায়ার।আমি বাচ্চা চেহারা করে চোখ পিটপিট করলাম।নাবিলা চৌধুরী ফুঁসতে ফুঁসতে যেতে যেতে বললো,
–“অস’ভ্য বে’য়া’দব ঢিঙ্গি মেয়ে কোথাকার!!”
বাড়ির সকলেই হো হো করে হেসে ওঠলাম।তখনই নাবিলা চৌধুরী আবার ফেরত আসলো।আমরা হাসি থামিয়ে দিলাম তৎক্ষনাৎ। নাবিলা চৌধুরী বাড়ির সবাই কে চোখ রাঙিয়ে আমার দিকে সরু চোখে তাকালো।পরপরই টুক করে আমার হাতের বেলানটা নিয়ে যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই চলে গেলো।
আমি রুমে গিয়ে দেখলাম ইফান নেই।নাকে সিগারেটের বি’চ্ছি’রি গন্ধ আসছে।বুঝতে পারলাম ইফান বেলকনিতে।আমি কাঁধের ব্যগটা রেখে বেঁধে রাখা খোঁপাটা খুললাম।সাথে সাথে লম্বা ঘন চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে পড়লো।আমি শাড়ির আচল দিয়ে সারা মুখটা মুছে নিলাম।ফর্সা ত্বক লালচে হয়ে আছে।সারাদিন বাইরে দৌড়ঝাঁপ করায় এই অবস্থা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁধ থেকে সেফটিপিন খুলছি।হঠাৎই মনে হলো দরজার কাছে কেউ আছে।আমার হাতটা থেমে গেলো।এটা হয়ে আসছে বহুদিন ধরে।বাইরে গেলেই দেখি কেউ নেই।আমি মাথা হালকা বাকিয়ে বেলকনিতে দৃষ্টি রাখলাম।না ইফানের কোনো সারা শব্দ পেলাম না।তবে সিগারেটের গন্ধ এখনো আসছে।আমি পিছন ফিরে দরজার দিকে তাকাতেই মনে হলো কেউ একজন সরে গেছে। আমি ধীর পায়ে দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।কয়েক মিনিট পর আবার উপলব্ধি করলাম দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে। আমি তৎক্ষনাৎ দরজা খুলতেই কাজের মেয়ে লতা আঁতকে উঠল।
লতাকে দরজার সামনে দেখে আমি মোটেও অবাক হলাম না।কারণ আমার ধরনা ছিলো আজকেও লতাকেই পাব।আজ এ নিয়ে চারবার লতাকে আমি দরজার সামনে পেয়েছি।সব দিনেই লতার থেকে উত্তর আসে আমাকে ডাকতে কিংবা এটা ওটা দিতে এসেছে।আজও তার ব্যতিক্রম নয়।লতার হাতে শরবতের গ্লাস। লতা আমাকে দেখে হেসে বললো,
–“আপা আপনার জন্য কাকি আম্মা শরবত পাঠিয়েছে।”
–“কখন এসেছে এখানে?”
লতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো,” জি আপা একটু আগে।স্যার বাড়িতে দেইখা আপনারে ডাকার সাহস পাচ্ছিলাম না।”
লতার কথায় মৃদু হাসলাম।তারপর জহরি চোখে পরক করতে করতে ট্রে থেকে শরবতের একটা গ্লাস নিলাম।
–“তুমি আসতে পার।”
–“স্যার খাবে না।”
–“মনে হয় না।”
–“তাহলে আমি আসি আপা।দরকার লাগলে আমারে ডাক দিয়েন।আর ফেশ হয়ে নিচে আয়া পড়েন। রাতের খাবার রেডি হয়া গেছে।”
–“ওটা ফেশ নয় ফ্রেশ।”
লতার কথায় ভুল ধরায় হেসে লজ্জায় মাথা নিচু করে তাড়াতাড়ি চলে গেলো।আমি ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে বিরবির করলাম,”ঘাপলা আছে…”
–“সে তো আছেই।বিশাল এক ঘাপলা। তবে সেটা তোমার মধ্যে বুলবুলি। “
হঠাৎই পিছন থেকে ইফান এসে জড়িয়ে ধরলো।আমার ঘারে মুখ ডুবাতেই নাকে আসলো সিগা’রে’টের বাজে গন্ধ।আমার বমি এসে যাওয়ার উপক্রম।আমি ঠেলে ইফানকে আমার থেকে সরিয়ে দূরে সরে গেলাম।ইফান গা দুলিয়ে হেসে দিলো।আমি নাকে আচল টেনে ধরে।ইফান আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,
–“কি হলো ঝাঁঝওয়ালি কাছে আস।”
–“ছিহ্যা দূরে থাক।কি বাজে গন্ধ।”
আমি বমি করার মতো চোখমুখ কুঁচকে নিলাম।ইফান আমার কোমর জড়িয়ে ধরে বললো,”এই কদিনেই আমার ফ্লেভার ভুলে গেছ জান।কোনো ব্যপার না আজ থেকে আবার অভ্যস হয়ে যাবে।”
আমি ইফানকে সরিয়ে আরেকটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম।নাকে আঁচল ধরে রেখেই ইফানকে বললাম,”সবসময় ফাইজলামি ভালো লাগে না।সামনে থেকে সরে দাঁড়ান গোসল করতে যাব।”
–“এখনই কিসের গোসল, গোসল তো শেষরাতে করবে…..ইফান থামলো।একটু ভেবে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে হাস্কি স্বরে বললো,”উমম এখন গোসল করা প্রয়োজন।চল এক রাউন্ড খেলে একসাথেই গোসল করে নেই।”
আমি দাঁত কটমট করলাম।ইফান গা দুলিয়ে হাসতে লাগলো।আমি মনে মনে অ’শ্রা’ব্য ভাষায় আচ্ছা মত কয়েকটা গালি দিয়ে দিলাম।টায়ার্ড লাগছে,সাওয়ার নেওয়া প্রয়োজন।আমি হাতের গ্লাসের শরবতটা এক চুমুকে খেতে লাগলাম।খাওয়ার সময় কিছুটা শরবত মুখ থেকে থুতনি গলা বেয়ে বুকের মাঝখান দিয়ে ব্লাউজের ভেতর চলে গেলো।ইফান এটা দেখে বারবার ঢুক গিলতে লাগলো।
আমি ঠান্ডা শরবতটা খেয়ে তৃপ্তি পেলাম।বেখেয়ালি সামনে তাকাতেই ইফানের উপর চোখ আটকালো।কি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ইফানের দৃষ্টি অনুযায়ী আমি তাকাতেই দেখি আমার গলা ভিজে আছে।আমি তাড়াতাড়ি মুছতে নিলেই ইফান আচমকা এসে আমার হাত ধরে আটকে নিলো।ইফানের ধূসর বর্ণের চোখগুলো কেমন লালচে বর্ণ ধারণ করেছে।আমি আমতা আমতা করে বললাম,
–“ক কি হয়েছে তোমার?”
ইফান আমার ভেজা গলা আর বু’কের দিকে চেয়ে থেকেই হিসহিসিয়ে উত্তর করলো,
–“বেইব, আই’ম থার্স্টি।”
–“পা পানি খা….”
বাকি কথা বলার আগেই ইফান আমার ঠোঁটের পানি জিহ্বা দিয়ে চেটে নিতে লাগলো।তারপর আস্তে আস্তে থুতনি, গলা আর তার নিচের যতটুকু পর্যন্ত উন্মুক্ত ছিলো,তার সবটা জায়গার লেগে থাকা শরবত জিহ্বা দিয়ে চেটে নিলো।এক হাতে আমার শাড়ির আচল বুক থেকে সরিয়ে দিলো।ইফানের মুখ ব্লাউজের কাছে এসে থামলো।সে একটা বোতাম খুলতে নিলেই আমি লাফ মেরে দূরে সরে বুকে আঁচল টেনে নিলাম।
আমি সেই আগের উন্মাদ ইফানকে দেখতে পারছি।আমি ঢোক গিললাম।ইফান বিরক্ত নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
–“আমার তৃষ্ণা এখনো মিটে নি।”
আমি তাড়াতাড়ি শাড়ির আচল দিয়ে সেঁতসেঁতে সবটা জায়গা মুছে নিলাম।আমার মুখে সিগা’রে’টের গন্ধ লেগে গেছে। বমি চলে আসার উপক্রম। আমি চোখমুখ খিচকে ওয়াক ওয়াক করতে করতে কাভার্ড থেকে জামাকাপড় বের করলাম।ইফান আমার হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো।আমি বিরক্ত নিয়ে বললাম,
–“ইফান আমার বমি চলে আসছে।যেতে দাও আমায়।”
ইফান আমার আরও কাছে এগিয়ে আসছে। হঠাৎই আমার নজরে পড়লো ইফানের কাঁধে।এতক্ষণ খেয়াল করি নি ইফানকে।তার পরনে শুধু একটা পেন্ট তাও আবার নিম্নাংশে নেমে আছে।তার পেশিবহুল দেহের গঠন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে।আগের চেয়ে তার পেশি আরও ফুলে উঠেছে। হয় তো মোটা হয়েছে।কিন্তু আমার নজর তো ওর কাঁধে যেখানে গভীর এক ক্ষত।যদিও ওর সারা দেহে অনেক আঘাতের চিহ্ন।কিন্তু এটা নতুন। আমি ঠোঁট ভিজিয়ে মনের বিরুদ্ধে গিয়েও জিগ্যেস করলাম,
–“কাঁধে কি হয়েছে তোমার?”
ইফান আমার বাহুতে ধরে আয়নার সামনে দাঁড় করালো।আমি আয়নাতে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ইফান হালকা হেসে তার পেন্টের পিছনের পকেট থেকে কিছু একটা নিয়ে আমার চোখের সামনে ধরলো।একটা গাঢ় নীল রঙের নেকলেস।এটা দেখা মাত্রই আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো।এমন পাথর আমি জীবনেও দেখিনি।গাঢ় নীল রঙা পাথরটিকে ঘিরে আছে ছোট ছোট অনেকগুলো সাদা চকচকে পাথর।নেকলেসটা আমার চোখের সামনে ঝিলিক দিচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো নক্ষত্র আমার চোখের সামনে।
হঠাৎই মনে পড়লো নেকলেসটা কোথাও একটা দেখেছি।ওও হ্যা মনে পড়েছে, এটা তো আমি নিউজে দেখেছি।বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান পাথর।প্রাইজ ৩৫০ মিলিয়ন এর মতো। বাংলাদেশি টাকায় এটার প্রাইজ প্রায় ৪২০০ কোটির মতো পড়বে।এটি বিশ্বে একটি মাত্রই আছে।কিন্তু সেটা তো যুক্তরাষ্ট্রের একটা মিউজিয়ামে ছিলো যা কয়েকমাস আগে চুরি হয়েছে।
আমি আর ভাবতে পারছি না।গাঢ় নীল ডায়মন্ডের নেকলেস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আয়নায় ইফানের দিকে তাকিয়ে অবাক কন্ঠে শুধালাম,
–“এ এটা… “
–“হোপ ডায়মন্ড।যা শুধু তোমার জন্য পৃথিবীতে এক পিসই আছে।”
ইফান বলতে বলতে আমার গলায় নেকলেসটা পড়িয়ে দিলো।আমি কোনো কথা বলার ভাষায় নেই। মানে এটা ইফান চুরি করেছে।আমি চেষ্টা করছি ঢোক গিলার গিলতে পারছি না।ইফান আমার গলায় নেকলেসটা পড়িয়ে দিয়ে কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“লুক বেইবি।বলেছিলাম না পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস গুলো আমার বুলবুলি কেই সুট করে।দেখলে তো!!”
আমি খুব কষ্টে একটা শুকনো ঢোক গিলে আস্তে আস্তে বললাম,
–“ত তুমি এটা চুরি করেছ!!”
আমার কথায় ইফানের চোখ সরু হয়ে গেলো।আমার বোকা কথা শুনে অবাক হয়ে বললো,”হোয়াট দ্যা ফা*ক বউ!চু’রি করতে যাব কেন?আমার যা লাগে আমি ছি’নিয়ে নেই।”
আমি কিছু আর না বলে গলার নেকলেস টা খুলতে নিলেই ইফান আমার হাত ধরে নেয়। আমি আয়নাতে তাকাতেই ইফান শক্ত কন্ঠে বললো,”ডোন্ট টাচ।এটাতে তোমায় সুন্দর লাগছে।”
আমি বলার কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। ভাবা যায় কি সা’ঙ্ঘা’তিক লোক এই ইফান চৌধুরী।আমার অবাক দৃষ্টি নিজের গলাতেই।গাঢ় নীল নেকলেস গলায় ঝলমল করছে।আমার সৌন্দর্যকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমার অবাক দৃষ্টি দেখে ইফান আমার কানের লতিতে দাঁত বাসিয়ে গাঢ় চুম্বন এঁকে হিসহিসিয়ে বললো,
❝তোর থেকে এক দফা রতির আশায় আয়ু ফুরিয়ে এলো।অথচ তোর রক্তক্ষয়ী অক্ষিজোগলে আমার জন্য দুর্ভেদ্য ঘৃণা ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না…❞
ইফান নিজের বাক্য সম্পন্ন করেই আমার মাথায় শব্দ করে চুমু খেয়ে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্য চলে গেলো।আমি ঘার বাকিয়ে ইফানের যাওয়ার পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
বিছানার মাঝখানে উপর হয়ে শুইয়ে আছে ইতি।তার দু’হাতের মাঝে পিংক কালার একটা টেডিবিয়ার। তার লাজুকতায় ভরপুর চোখ দুটো সেটাতেই নিবদ্ধ। ইতি এক আঙ্গুল দিয়ে টেডিবিয়ারের নাকে আল্তো টাচ করতেই দুনিয়ার সকল লাজ তাকে ঘিরে ধরেছে।ইতি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে ফেললো।গাল দুটো লাল টকটকে বর্ণ ধারণ করেছে।
রুমের দরজা খোলা থাকায় আমি ভেতরে এসে দেখি ইতি টেডিবিয়ার সামনে রেখে চোখ বন্ধ করে শুইয়ে।আমি কিছু না বলে আস্তে আস্তে ওর পাশে গিয়ে বসলাম।চোখ বন্ধ রেখেই মেয়েটা মুচকি হাসছে।আবার চোখমুখ কুঁচকে নিচ্ছে।আচ্ছা ইতি কি কোনো কারণে লজ্জা পাচ্ছে!
–“ইতি, মা খাওয়ার জন্য তোমাকে ডাকছে।”
পলির কন্ঠ শুনেই মেয়েটা আঁতকে উঠল। আমি পিছন থেকে হালকা জড়িয়ে ধরে বললাম,”আরে ভয় পেও না পলি ডাকছে।”
বলতে বলতেই পলি রুমে আসলো।ইতি অবাক হয়ে বললো,”বড় ভাবি তুমি কখন আসলে।”
–“আরে ভাবি তুমিও এখানে। আমি আরও তোমার রুমে খুঁজে এলাম।”
পলি এসে পাশে বসলো।আমি ইতিকে বললাম,”আমি একটু আগেই আসলাম। এসেই দেখি তুমি শাই করছ।কি হয়েছে হুম। হঠাৎ এত লজ্জা পাওয়ার কারণ কি?”
–“ওমা তাই নাকি।আমাদের ননদিনী প্রেমেটেমে পড়লো নাকি।হুম হুম।”
আমার আর পলির কথা শুনে মেয়েটা আরও লজ্জা পেলো।”ধুর কি যে বল ইসসস, জাহান ভাবি।” ইতি বললো।
আমি মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,”পলি আর লজ্জা দিও না।ইতি আর প্রেম হাহাহা। যাইহোক তোমার জন্য যে মেলা থেকে জিনিস গুলো এনেছি দেখেছ?পছন্দ হয়েছে?”
ইতি খুশিতে বলে উঠলো, “তুমি আমার জন্য মেলা থেকে জিনিস এনেছ কখন?”
–“ওমা দেখ নি!”
ইতি মাথা নাড়িয়ে না করলো।পলি বললো,”ও দেখবে কিভাবে!আজ বিকেলে কলেজ থেকে বাসায় এসে একবারো নিচে নামে নি।এমনকি মীরা আপুও ওর সাথে রুমে দেখা করে গেছে।”
–“কেন, শরীর খারাপ নাকি?”
–“না না না আমি ঠিক আছি।তুমি বাসায় ছিলে না তো আর ছোট ভাবিও রান্নার কাজে বিজি ছিলো।তাই নামি নি।”
–“ওও আচ্ছা। গিয়ে তোমার জিনিস গুলো নিয়ে এসো।আমি নিচে যাচ্ছি। তোমরাও চলে এসো।”
আমি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।তখনই ইতি ঢেকে উঠে,”ও ভাবি তোমার গলার নেকলেস টা কি মেলা থেকে নিয়েছ। খুব সুন্দর তো।”
পলি এতক্ষণ খেয়াল করে নি।ইতির কথা শুনে তাকালো।সেও প্রসংশা করছে।আমি নিজের গলার দিকে তাকালাম।নেকলেসটা গোসল করার সময় খুলে ফেলেছিলাম।কিন্তু ইফান আবার পড়িয়ে দেয়।আমার গলায় নাকি বেশ লাগে।আমি কিছু বলতে পারি নি।তাই রুম থেকে বেরিয়ে এসেছি।
আমি ইতির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো ঝেড়ে পুনরায় টাউয়াল দিয়ে পেচিয়ে খোঁপা করতে করতে বললাম,
–“না গো বোন।এটা তোমার ভাই দিয়েছে।”
–“ভাইয়া চলে এসেছে!”
ইতি খুশিতে বলে উঠলো। আমি হালকা হেসে বললাম,”সেই কখন এসেছে। তাড়াতাড়ি নিচে আস কেমন।”
কথাটা বলে মাথায় আঁচল টেনে বেড়িয়ে গেলাম।পলি ইতিকে বললো,”কি চলছে হুমমম।”
ইতি চোখ নিচে নামিয়ে টেডিটাকে নাড়াচাড়া করতে করতে বললো,”ইসস ভাবি।”
পলি হেসে দিলো।হঠাৎই নজরে পরলো টেডিটার ওপরে।পলি একটু ভেবে বললো,”এটা তো তোমার রুমে আগে কখনো দেখিনি।নতুন কিনলে?”
ইতির মনে পড়ে গেলো বিকেলের কথা।জুইয়ের সাথে সবাইকে শপিং করাতে মলে নিয়ে যায় জিতু ভাইয়া।তারপর সবাইকেই কিছু না কিছু কিনে দেয়।ইতির টেডিবিয়ার টা পছন্দ হয়। কিন্তু ল’জ্জা’য় বলতে পারছিলো না।কিন্তু জিতু ভাইয়া বুঝে যায়।তাই তিনি টেডিটা কিনে দেয়।
আর সেই থেকেই মেয়েটা এটা হাতছাড়া করছে না।কেন জানি টেডিটাকে তার নিজের কাছে রাখতে ইচ্ছে করছে।
–“কি হলো ইতি! কিছু বলছ না।”
পলির কথায় ইতি ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসলো।তারপর লাজুক চেহারা নিয়ে বললো,”জুইয়ের ভাইয়া আমাদের সবাইকে গিফট কিনে দিয়েছে।”
পলি অবাক হয়ে বললো,”জুইয়ের ভাইয়া।এই ভাবির বোন জুই নাকি?”
–“হু।”
–“আজ জুইয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো নাকি?”
–“জুই আমাদের কলেজে পড়ে।”
–“তাই নাকি।খুব ভালো হয়েছে।তোমার সাথে ফ্রেন্ড শিপ করেছ তো।”
ইতি খুশিতে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।পলি বললো,”মেয়েটাকে ছবিতে দেখেছি।ভরী মিষ্টি। ওকে আমাদের এখানে নিয়ে আসতে।”
–“আমি জোর করেছিলাম,কিন্তু ও আসে নি।”
পলি কিছুক্ষণ কথা বলে উঠে দাঁড়াল,”আমার এখানে বসে থাকলে চলবে না গো।তুমি তাড়াতাড়ি নিচে চলে এসো।”
ইতি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো।পলি বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে।ইতি মাথা বাড়িয়ে দেখলো পলি চলে গেছে কিনা।শিউর হতেই মুঠো ফোনটা হাতে তুলে নিলো।টেডিটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ফেইবুকে ঢুকলো।আজ জুইয়ের সাথে ফেবুতে এড হয়েছে।
ইতি জুইয়ের আইডি ঘটে জিতু ভাইয়ার আইডিটা বের করলো।আইডি নেইম আরমান শেখ।প্রোফাইল পিকে জিতু ভাইয়ার হ্যান্ডসাম ছবি।প্রোফাইল টা দেখেই ইতির বুক উঠানামা শুরু করলো।ফোন ধরে রাখা হাত দুটোও কাঁপছে।
ইতি ফোনটাকে সাইডে রেখে দিলো।চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করলো।তারপর ফোনটা আবার হাতে নিলো।আইডিতে জিতু ভাইয়ার অনেক ছবি।ইতি কাঁপা কাঁপা হাতে ছবি গুলোকে জুম করে দেখতে লাগলো।তার তল পেটে কেমন যেন করছে।মেয়েটার এমন অনুভূতি এই প্রথম হচ্ছে।বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। খালি অনুভব করছে তার ভেতরে উতালপাতাল ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। তল পেটে লক্ষ প্রজাতির ডানা ঝাপটাচ্ছে।
ইতি ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিললো।আইডিতে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎই কয়েকটা গ্রুপ ফটো সামনে আসে।সেখানে জিতু ভাইয়ার সিআইডি টিমের সব সদস্য আছে।প্রথম ছবিটা ইতির খুব ভালো লাগলো।কিন্তু দ্বিতীয় ছবিটা দেখে লাজুক মেয়েটার নাকের পাঠা ফুলে উঠলো।ছবিতে ফরেন্সিক ডক্টর সুমি জিতু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে।ইতির ভিষণ রাগ হলো।
ইতি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিন নাম্বার ছবিটা দেখতেই রাগের সাথে অভিমানের পাল্লা ভরী হলো।চোখ দুটোতে পানি কণা জমা হলো।এই ছবিতেি আগের ছবির মেয়েটা এখনো জিতু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু জিতু ভাইয়া হেসে আরেকটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে। সে ছেলেদের মতো শার্ট প্যান্ট পড়ে।কিন্তু মেয়েটার মুখে কালো মাস্ক সাথে মাথায় ক্যাপ দেওয়া।ফলে সারা মুখ ঢেকে আছে।
জিতু ভাইয়াকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে অভিমানে চোখ দিয়ে পানি বেড়িয়ে এলো।ইতি হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে ক্যাপশন চেক করলো।ক্যাপশনে লেখা,
❝We are one family.❞
তারপর সকলের আইডি ম্যানশন দেওয়া,”আবির, কবির,হিমন,কণা,অরনা,ডক্টর আব্দুল হোসাইন, ডক্টর সুমি।”
ইতি নাম অনুযায়ী আইডিগুলোতে ঢুকে সকলকে চিহ্নিত করলো।কিন্তু শেষ ছবিতে জিতু ভাইয়া যার দিকে তাকিয়ে হাসছিলো তার আইডি পেলো না।মানে ক্যাপশনে সবাইকে ম্যানশন করলেও সেই মেয়েটাকে করা হয় নি।
ইতি মাস্ক পড়া মেয়েটাকে জুম করে দেখতে চাইলো। কিন্তু চেহারার কোনো অংশই উন্মুক্ত নয়।সবটা ঢাকা।ইতি দু’হাতের মুঠোয় শক্ত করে ফোনটাকে চেপে ধরে নাক টেনে কাঁদতে কাঁদতে বিরবির করলো,
❝কে এই মেয়েটা!!❞
চলবে,,,,,,,,,,,,,,
(সবাই আগের পর্বের মতো লাইক কমেন্ট করে দাও।কাল যদি পূরণ হয়ে যায়।তাহলে কালই আরেকটা পর্ব পাবে।আর হ্যাঁ পরের পর্ব জারা ইফানময়😫)
হ্যাপি রিডিং 🥳💗
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ২
-
জাহানারা পর্ব ৩৩+৩৪
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬
-
জাহানারা পর্ব ১৭+১৮
-
জাহানারা পর্ব ৪৭
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪
-
জাহানারা পর্ব ৩
-
জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬
-
জাহানারা পর্ব ৫১+৫২
-
জাহানারা পর্ব ২১+২২