Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৪৫
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

★ফ্ল্যাশব্যাক__

শীতকাল চলে এসেছে।ইদানীং সকালে হালকা কুয়াশা পড়ছে।রাতে একটু একটু ঠান্ডা লাগে। কিন্তু সূর্য উদয় হলেই আবারও খুব গরম পড়ছে।বাইরের তাপমাত্রা এতটাই, মনে হচ্ছে যেন গ্রীষ্মকাল।এই গরমের মধ্যেও দুই গৃহকর্তী রান্নাঘরে সকলের জন্য দুপুরের খাবার প্রস্তুত করছে।সারা বাড়িতে এসি থাকায়__এই গরমে আগুনের তাপের কাছে থাকার পরেও রক্ষা পেয়েছ দুজন।

এদিকে ড্রয়িং রুমে বসে আছে দাদি,জুই আর জিয়াদ।আজ স্কুলে যায়নি জিয়াদ।আর ওর দেখাদেখি জুইও যায়নি।তাই দাদির কাছে বসে ভারতের গল্প শুনছে।দাদি একজন ইন্ডিয়ান মেয়ে। ভারতের কাশ্মীর তার মাতৃভূমি।দাদা বিজনেসর কাজে যখন কাশ্মীর যায়,তখন দাদিকে পাহাড়ে বান্ধবীদের সাথে হাসিঠাট্টা করতে দেখে।আর তৎক্ষনাৎ এই সুন্দরী সুরেহা বিবির প্রেমে পড়ে।তখন দাদির বয়স আঠারো পড়েছে সবে।দাদা পরদিনই দাদির বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব দেয়।কিন্তু দাদির পরিবার রাজি হয় নি। কারণ দাদি তার বাবা-মার খুব আদরের সন্তান এবং বড় দুই ভাইয়েরও একমাত্র বোন।কেউই দাদিকে তাদের থেকে দূরে রাখতে চায় না।এই কারণেই দাদাকে রিজেক্ট করা।কিন্তু দাদাও হার মানার পাত্র নয়।তিনিও দাদিকে পটিয়ে কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে বাংলাদেশ চলে আসে।এই নিয়ে বহু বছর দাদির বাপের বাড়ির মানুষ অভিমান করে দাদির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।কিন্তু তাতে কি আর আদরের কন্যা কে কেউ ভুলতে পারে?সেই কয়েকবছর পর আবারও সম্পর্ক ঠিক হয়ে যায়।এরপর থেকে প্রতিবছর দাদিকে ভারতে যেতে হয় বেড়াতে।সেখানে গেলে কম হলেও তিনমাস আটকে রাখে।দাদিও সেই সুযোগে নিজের সকল আত্মীয় সজন দের বাড়িতে বেড়ায়।

এই বছরও দাদি বাপের বাড়ি যায় জায়ান ভাই দেশে আসার এক সপ্তাহ আগে।জায়ান ভাইয়ের দেশে আসার সিদ্ধান্তটা হঠাৎ হয়।যদি আগে জানতো জায়ান ভাই আসবে তাহলে যেতো না।আর কি?কাশ্মীর থেকে প্রতিদিন ফোন করে কি আপসোস দাদিরদেশে থাকলে নাতিটাকে দেখতে পারতো।তার তিনমাস পর দেশে আসেন তিনি।তখনও আসতে দিত না দাদিকেদাদির ভাইরা।কিন্তু আমার নিখোঁজ হওয়ার কথা শুনে দাদি অসুস্থ হয়ে পড়েন।আমার কাছে আসার জন্য সেই কি যে পাগলামি!! বাধ্য হয়ে দাদিকে আমাকে খুঁজে পাওয়ার পরদিন দেশে দিয়ে যায় বড় দাদু ভাইয়ের ছেলে।তিনি আমাদের সকলকেই দাওয়াত দিয়ে যায়। যাতে উনাদের ওখানে বেড়াতে যাই।কাশ্মীরে শেখ বাড়ির সকলেই বেড়িয়ে এসেছে।শুধু আমারই কখনো যাওয়া হয়নি।এমন কি গত বছর দাদির সাথে কবিতা আপু, জিয়াদ আর ছোট্ট জুইও গিয়েছিল।কিন্তু আমাকে নেয় নি।আমি সেই কি কান্না!! কিন্তু জায়ান ভাইয়ের কথার উপর কেউ কিছু বলতে পারে নি।জায়ান ভাই দেশের বাইরে থাকলেও আমার সব দায়িত্বই তিনি আড়ালে পালন করতো।উনার অনুমতি ছাড়া আমার এক পাও বাসা থেকে বেরোনোর অনুমতি নেই।

বাইরের এই কাট পোড় গরমের মধ্যে আমি কলেজ থেকে বাড়িতে এসেই কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে মারলাম।সাদা কলেজ ড্রেস ঘামে ভিজে একাকার। যদিও গাড়িতে এসি ছিলো।তাতে কি আর রাগের গরম কমে?আমাকে এত রেগে থাকতে দেখে, দাদি নিজের চশমাটা নাকের ডগায় এনে আমাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।জুইও কম যায় না!!সেও হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে গোল করে চোখের সামনে ধরে আমাকে দেখতে লাগলো।রাগের মধ্যে এমন ফাইজলামি দেখে আমার রাগ আরও বড়লো।আমি চেচিয়ে উঠলাম,
–বুড়ির ঘরে বুড়ি,আরেকবার এইসব করলো তোকে আবার তোর বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবো।বলে দিলাম হু।

আমার ঝাঁঝালো কন্ঠ শুনে দাদি নিজের চশমা আবার ঠেলে আগের স্থানে বসাতে বসাতে মুখ মুচরালো।আমি তেড়ে গিয়ে বললাম,,
–বুইড়া বয়সে ভঙ্গি চু*দাও আমার সাথে?

আমার কথায় দাদি মুখে হাত ধরে অবাক হওয়ার নাটক করলো।অতঃপর জুইকে আমাকে দেখিয়ে বললো,
–ন*ডির সেরির কথা শুনছস ছোট বোইন?মায়া মায়া গো কি তেজ কি তেজ?

দাদির হেয়ালি কথা শুনে জুই মুখে হাত ধরে হাসছে।দাদি আবার আমাকে বললো,
–শুন চেমরি এত রাগ দেখানো ভালো না।এখনো সময় আছে এই অভ্যাস বাদ দে।নাহলে রাইতে জামাই আদর করতে পারবো না।

–তরে আজকে খায়ালছি বুড়ি,,,,,,,

আমি রেগে দাদির দিকে তেড়ে যেতে নিলে জিয়াদ পেছন থেকে কোমরে পেচিয়ে ধরে আটকায়।এদিকে দাদি আর জুই হাসছে আমাকে রাগতে দেখে।এরই মাঝে কবিতা আপু সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তার হাতে ফোন।সে খুব মনযোগ দিয়ে ফোনে টাইপিং করছে।ইদানীং কয়েক মাস ধরে আপু ফোনেই বেশি মগ্ন থাকে।কেমন যেন বেখেয়ালিপনাও বেড়েছে।কোনো কাজে মন নেই, হঠাৎ হো হো করে হেসে দেয়।আমরা হাসির কারণ জানতে চাইলে বলে পুরানো কথা মনে করে হাসছে।আর কি আমরাও বোকার মতো হিহিহি করে হাসি, কবিতা আপুর সাথে।

আজ সকাল থেকে ভার্সিটিতেই ছিলো কবিতা আপু। আজকাল একদিনও ভার্সিটি মিস দেয় না।আর আগে ঠেলেও ওকে পাঠাতে পাড়তো না বড় আম্মু।আর আজকাল নিজেই নেচে নেচে চলে যায়। বাড়িতে প্রবেশ করতেই আমাকে নজরে পড়লো তার।কবিতা আপু ফোনে শেষবার টাইপিং করে ফোনটা এফ্রনের পকেটে রেখে আমার কাছে এগিয়ে আসলো।আমাকে রাগে গজগজ করতে দেখে বললো,
–কি হয়েছে বনু? এভাবে রেগে আছিস কেন?

আমি কবিতা আপুর কথায় ঠোঁট উল্টাম। তারপরই নাক টানতে লাগলাম। কবিতা আপু আমাকে ধরে সোফায় বসালো।অতঃপর আদুরে কন্ঠে জিগ্যেস করলো,
–কি হয়েছে বনু?কেউ কি বকাঝকা করেছে?

দাদি সহ বাকিরাও আমার দিকে মনযোগ দিলো।আমি টুক করে দাদির শাড়ির আচল দিয়ে সর্দি মুচে নিলাম।এতে দাদি মুখ মুচরালো।জুই জিয়াদ হিহি করে একটু হাসলো।আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললাম,
–শালি মাগী একটা।বাল চামরা তো কিচ্ছু নেই। আবার আমার জায়ান ভাইয়ের দিকে নজর দেয়।

কবিতা আপু জিজ্ঞেস করলো ,”কে আবার ভাইয়ার দিকে নজর দিলো রে?” আমি দাঁত কটমট করে বললাম,”ঐ চম্পা ন*ডি। বাল ডার নাম শুনলেই তো পাবলিকের কষা হয়ে যাবে।সে কিনা আবার আমার জামাইয়ের দিকে নজর দেয়!!” আমি আরও কিছু বলবো তার আগেই পুরুষালি কন্ঠ স্বর কানে আসে,
–কে তোর জামাই?

আমি সামনে তাকাতেই দেখলাম জায়ান ভাই প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।আমার সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি ব্রু নাচিয়ে ফের জিগ্যেস করলো,
–কি হলো বল?

কি লজ্জা কি লজ্জা!!এভাবে দিনে দুপুরে সকলের সামনে, জায়ান ভাইয়ের কাছে বাঁশ খেলাম!!আমি চোরের মতো চোখ নিচে নামিয়ে নিলাম। লজ্জায় গাল দুটো টকটকে লাল বর্ণ ধারন করেছে।আমার এই অবস্থা দেখে জায়ান ভাই সহ সকলেই ঠোঁট টিপে হাসছে।দাদি আমার লজ্জার মধ্যে আরও এক কথা বলে বসলো,
–শুন দাদুভাই,সরমিন্দা বউকে আদর করতে কিন্তু ভারি মজা।তোর দাদু আমার লজ্জা পাওয়া দেখে সবসময় বলতো।

জায়ান ভাই কৌতুক স্বরে বললো,”উমম তাই নাকি?তাহলে তো একটা সরমিন্দা বউই আমার লাগবে।”

জুই কবিতা আপুর সাথে দাঁড়িয়ে চাপা হাসিতে ফেটে পড়েছে। এদিকে লজ্জায় আমি আর উপরের দিকে তাকাতে পারছি না।এরই মাঝে কারো চিৎকার চেচামেচি শুনতে পাচ্ছি। সকলে সেই চেচামেচির আওয়াজ শুনে সদর দরজার দিকে তাকানোর আগেই আমি লাফ মেরে উঠে জায়ান ভাইয়ের পিছনে লুকিয়ে পড়লাম।অতঃপর উনার পিটের শার্ট খামচে ধরলাম।জায়ান ভাই আমার এমন কাজে ব্রু কুঁচকালো। আমি ভয়ে কেঁদে দিতে ঠোঁট উল্টালাম।তক্ষুনি সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো চম্পা আর চম্পার মা বাবা।সকলে ওদের দিকে তাকালো।চম্পার অবস্থা খুবই সূচনীয়। নাকে আর ঠোঁটের কোণে লাল তরল দৃশ্যমান।চোখ একটা কালো হয়ে কিছুটা ফুলে আছে। মাথায় জুটি করা চুলগুলো রাস্তার পাগলিদের মতো হয়ে আছে।কলেজের ড্রেসের এক সাইট ছিঁড়ে গেছে।ক্রস বেল্ট একটা কাঁধ থেকে পড়ে আছে।জায়ান ভাই সহ সকলে অবাক হয়ে মেয়েটাকে দেখছে।চেচামেচির আওয়াজ শুনে রান্নাঘর থেকে আম্মু আর বড় আম্মুও বেড়িয়ে এসেছে।চম্পা আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার বাবাকে বললো,
–আব্বা এই শয়তানটা আমাকে মারসে।

চম্পার বাবা গর্জে উঠলো, “এই মেয়ের অভিভাবক কে?কি শিক্ষা দিয়েছেন এই মেয়েকে?কলেজে যায় কি মস্তানি করতে?আমার মেয়ের কি অবস্থা করেছে দেখেন।আজ এর বিহিত না হলে, এই বজ্জাত কে থাপ্পড়ে সাইজ করে দিয়ে পরে যাব।”

লোকটার কথা শেষ হতে না হতেই জায়ান ভাই গর্জে উঠলো,
–স্টপ দ্যা ননসেন্স! হাউ ডিয়ার ইউ!!আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের মেয়েকেই এভাবে শাসানোর রাইট কে দিয়েছে আপনাকে?আসার আগে জেনে আসা উচিত ছিল কার বাড়িতে এসেছেন!!

জায়ান ভাইয়ের ধমকে এক মূহুর্তের জন্য সবাই থমকে যায়।তারপর চম্পার মা চেচিয়ে উঠলো,
–ওগো চম্পার বাপ, দেখেছ!!চোরের মায়ের বড় গলা।

এটা শুনার পর আমার মাথায় আগুন ধরে গেছে। কেউ কিছু বলার আগেই, আমিই জায়ান ভাইয়ের পিছন থেকে বেড়িয়ে আসলাম।অতঃপর শাড়ির মতো করে পায়জামাকে উপরে টেনে ধরে ঝগড়া করার জন্য এগিয়ে গেলাম,
–অক্করে না,অক্করে না,,,,,,

এটুকু চেচিয়ে বলতে বলতে এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে জায়ান ভাই আমার কান ধরে টেনে নিজের কাছে আটকালো।অতঃপর চোখ গরম দেখিয়ে চুপ করতে বললো।আমি আবার ভয়ে জড়সড় হয়ে উনার পিছনে দাঁড়িয়ে শার্ট খামছে ধরলাম।চম্পার বাবা জায়ান ভাইয়ের কাছে আমার নামে বিচার দিতে নিলেই হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিলো।অতঃপর শক্ত কন্ঠে বললো,
–আমাদের বাড়ির মেয়ের দোষ থাকতেই পারে না।আই হোপ কোনো ঝামেলা করলে আপনার মেয়েই করেছে।আন্ডারস্ট্যান্ড? এবার যে পথ দিয়ে এসেছেন,ঠিক সেই পথ দিয়ে বেড়িয়ে যান।

জায়ান ভাইয়ের শক্ত কন্ঠে বলা কথার ধরণ দেখে না চাইতেও চম্পার মা বাবা ভেতরে ভেতরে ভয় পেল।অতঃপর নিচু কন্ঠে বললো,
–আমার মেয়ের সাথে এত বড় অন্যায় আমি মুখ বুজে সহ্য করবো না।ভেবেছিলাম নিজেরা নিজেরা মিমাংসা করে নিব।কিন্তু আপনাদের ব্যবহার দেখে আর না।কি ভেবেছেন আপনাদের পয়সা আছে আমাদের কি নাই নাকি।এবার আদালতে দেখা হবে,,,

চম্পার বাবার কথা শেষ হতে না হতেই সদর দরজা থেকে একটা পুরুষালি কন্ঠ কানে আসলো,
–যা বলছেন ভেবে বলছেন তো?

সকলে সদর দরজার দিকে তাকালো, সেখানে জিতু ভাইয়া কথাটা বলে দাঁড়িয়ে হাসছে।তার পিছনে রাকিব ভাইয়া।তিনি পুলিশের ইউনিফর্ম পরিধান করে আছে।চম্পার বাবা থানায় যাওয়ার আগেই পুলিশ কে দেখতে পেয়ে খুশিতে গদগদ করছে।তিনি ছুটে গিয়ে রাকিব ভাইয়ের কাছে আমার নামে নালিশ দিতে থাকে।রাকিব ভাই একবার জিতু ভাইয়াকে আরেকবার জায়ান ভাইকে আর চোখে দেখছে।চম্পার বাবার নালিশ দেওয়া শেষ হলে তিনি বললেন,
–স্যার আমি দুটো কেইস করতে চাই।একটা আমার মেয়েকে আহত করার জন্য। আরেকটা মানহানীর মামলা।উনারা আমাদের কে অনেক অসম্মান,,,,,,,,

রাকিব ভাই চম্পার বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,”কার নামে মামলা করবেন বলছেন?”রাকিব ভাইয়া জায়ান ভাইকে দেখিয়ে বললো,”এই যে দেখছেন লোকটা দাঁড়িয়ে আছে;তিনি আর কেউ নন Director General জায়ান শেখ নীরব।” জিতু ভাইয়াকে দেখিয়ে বললো,”ইনি হচ্ছেন সিআইডি এসপি আরমান শেখ।”

রাকিব ভাইয়ের কথা শুনে লোকটা একটা শুকনো ঢুক গিলে জায়ান ভাইয়ের চোখের দিকে তাকায়।জায়ান ভাই পকেটে দু’হাত গুজে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে থাকে।লোকটা ভয়ে ভয়ে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকাতেই জিতু ভাইয়া বাঁকা হেসে প্যান্টের পকেট থেকে সিআইডি ব্যাজ লোকটার চোখের সামনে ধরে।লোকটা ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়।অতঃপর তিনজনে আমাদের কাছে মাপ চেয়ে তাড়াতাড়ি শেখ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়।এদিকে রাকিব ভাই কবিতা আপার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসতেই, কবিতা আপু চোখ উল্টে জিহ্বা দেখিয়ে চলে যায়।এটা দেখে ফেলে দুই বাটপার জিয়াদ আর জুই।তারা তক্ষুনি হো হো করে হেসে দেয়।রাকিব ভাইয়া লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে ধরে,চোখ নিচু করে নেয়।এদিকে জায়ান ভাই নিজের রুমের উদ্দেশ্য যেতে যেতে আমাকে বলে,
–জারা তুই আমার রুমে আই।তোর সাথে কথা আছে,,,,

ভয়ে হাত-পা কাঁপছে আমার।এখন রুমে আমাকে বকবে নাকি এই ভেবে গলা শুকিয়ে আসছে।জিতু ভাইয়া আশ্বাস দিলো বকবে না।তারপর সকলের দিকে তাকাতেই নজরে আসলো আম্মুর ক্ষ্যাপা দৃষ্টি।আমি মুখটা বাচ্চাদের মতো সরল করে জায়ান ভাইয়ের রুমের উদ্দেশ্য যাওয়া ধরলাম।


জায়ান ভাইয়ের রুমের সামনে এসে সূরা পড়ে,আল্লাহ নবীর নাম জপে বুকে তিনবার ফু দিয়ে ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকলাম। ভেতরে জায়ান ভাইকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।ওয়াশরুম থেকে শাওয়ারের শব্দ আসছে।আমি বুঝতে পারলাম তিনি ফ্রেশ হচ্ছেন। আমি ভয়ে বিছানার এক কোণায় চুপচাপ বসে রইলাম।আমি বসে বসে যখন নিজের চুলের জুটি ঠিক করছি__তখনই চোখে পড়ে বেডসাইডের টেবিলে জায়ান ভাইয়ের ফোন রাখা।আমি ওয়াশরুমে একবার উঁকি দিয়ে তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে নিলাম।অতঃপর পাসওয়ার্ড চাইলে বোকা পাখি দিয়ে লক খুললাম। অনেকদিন আগেই জায়ান ভাই উনার ফোনের পাসওয়ার্ড আমাকে বলে দিয়েছিলো।আমি মাঝেমধ্যেই নিজের ফোন রেখে উনার ফোন টিপি।ফোনে আছে বলতে আমার ছোট থেকে আজ পর্যন্ত তোলা সব ছবি।ফোনে আমার ছবি ছাড়া অন্য কারো কোনো পিকই নেই। আমাদের কাশবেন তোলা একটা পিক ওয়ালপেপার দেওয়া।আমি বেশ কিছুক্ষণ সেই ছবিটা তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। হঠাৎই ফোনটা বেজে উঠে। ফোনটা হাত থেকে পড়ে যেতে নিলেও ক্যাচ ধরে নিলাম।অতঃপর স্কিনে তাকাতেই দেখলাম অদ্ভুত এক নাম্বার।যেখানে এগারো ডিজিট নেই। তবে এত কিছু ভাবার আগেই কলটা কেটে যায়।আমি ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিতে যাব তখনই আবার একই নাম্বার থেকে কল আসে।আমি ফোনটা কে একবার দেখে আরেকবার ওয়াশরুমের দিকে তাকালাম।ডাক দিবো কি দিবো না ভাবতে ভাবতে আবারো লাইন কেটে গেছে।তক্ষুনি আবার কল আসে।এতবার কল আসছে বিষয়টা আমার মোটেও সুবিধার লাগছে না।হঠাৎই মাথায় আসলো কোনো মেয়ে আবার জায়ান ভাইকে বিরক্ত করছে না তো?ভেবেই ঝটপট ফোনটা রিসিভ করলাম।অপর প্রান্তের ব্যক্তি কিছু বলার আগেই আমি বললাম,
–হ্যালো???

ফোনের অপর প্রান্তে ইফান নিজের জিহ্বার আগায় থাকা অশ্রাব্য গালি গিলে নিলো আমার কন্ঠ স্বর শুনে।সে তার অফিসে বসে ড্রিংকস করছে।বারবার জায়ান ভাইকে কলে না পেয়ে রাগে রিরি করছিলো।এদিকে কারো উত্তর না পেয়ে আমি আবার বললাম,

–হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।

আমার কন্ঠ শুনে ইফানের বুঝতে বাকি নেই এটা যে জাহানারা।সে বুকের বা পাশে ফোনটা নিয়ে দু হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো।অতঃপ চোখ বন্ধ করে হাস্কি স্বরে হিসহিসালো,

–উফফ কি কন্ঠ রে মাইরি,শালা শুনলেই সিস্টেমে আগুন লাগে।

ইফানের এহেন কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইনান প্রশ্ন করে বসলো,”জি ভাই কোথায় আগুন লাগে।” ইনানের কথা শুনে ইফান আয়েশি “ইসসস” এর মতো আওয়াজ করতে করতে নিজের মেইন পয়েন্টে এক আঙ্গুল দিয়ে দেখালো।ইনান মাথা চুলকাতে চুলকাতে কেঁশে উঠলো,
–এহেম, এহেম।

আমি কপাল কুঁচকালাম কারো কন্ঠ না শুনতে পেয়ে। আমি আবারও বললাম,
–হ্যালো,কে ব,,,,,,

বাকি কথা বলার আগেই কেউ আমার কান থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো।আমি ঝটপট সেদিকে তাকাতেই দেখি জায়ান ভাই। তিনি কলটা কেটে বিছানায় ছুঁড়ে মারলো।আমি উনার কড়া চাউনি দেখে ভয়ে আরেকটু গুটিয়ে গেলাম।আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।জায়ান ভাই শান্ত কন্ঠে বললো,
–কলেজে কিসের জন্য যাস?

আমি মাথা নিচু করে রেখেই উত্তর দিলাম,”প পড়াশোনা করতে।” আমার কথার পিছে একই ভাবে প্রশ্ন করলো,”তাহলে ঐ মেয়েটার সাথে মারামারি কেন করেছিস?” আমি ঠোঁট উল্টালাম। এই কেঁদে দিব দিব তখনই জায়ান ভাই নরম কন্ঠে বললো,”ডোন্ট ক্রায়। স্পষ্ট করে কথা বল।আমি তোকে মারছি নাকি?”

আমি নাক টেনে বলতে লাগলাম কলেজ শেষ হওয়ার পরের ঘটনা।আমি তন্নি,সুমাইয়া, নাফিয়া আর আরিফ কথা বলতে বলতে কলেজ থেকে বের হচ্ছিলাম।তখনই চম্পা আর তার বান্ধবীদের কন্ঠ কানে আসে,
–দোস্ত জায়ান স্যার কি হ্যান্ডসাম ভাই।উনাকে দেখার পর থেকে আমার তো রাতে ঘুমে আসতে চায় না।খালি স্বপ্নে দেখি উনার সাথে আমি রোমান্স করছি।

চম্পার বান্ধবীরা হাসিতে ফেটে পড়লো।তারাও জায়ান ভাইকে নিয়ে এটা সেটা অনুভূতি শেয়ার করছে।এসব শুনে আমি রাগে ফুঁসতে লাগলাম।এরই মাঝে চম্পা আমাকে ডাকতে লাগলো,
–এই জায়ান স্যারের বোইন।শুন শুন।।

জায়ান ভাইয়ের বোন সম্মোধন শুনে রাগের মাত্রা আরও এক ধাপ বাড়লো।তন্নি আর আরিফ একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে বুঝালো,
–শালিরে আজ জাহান পশ্চাতে বাঁশ ঢুকাবে।

চম্পা আমার কাছে এসে জায়ান ভাইয়ের ফোন নাম্বার সহ পার্সোনাল ইনফরমেশন চাইতে থাকে।আমি এমনিতেই রাগ কন্ট্রোল করতে পারি না।তার উপর এই মাইয়া একটার পর একটা বকে যাচ্ছে। আমি ওকে এভয়ড করে চলে যেতে নিলে চম্পা আমার মাথায় গাট্টি মেরে বলে উঠে,
–এত ভাব ধরতাছস কেন?আমার সাথে ভালো আচরণ কর।আমি কদিন পর তোর ভাইকে বিয়ে করে তোর ভাবি হব।

এক পর্যায়ে চম্পা নিজের সকল লিমিট ক্রস করে বসে।আমি আর নিজের রাগ সামলে রাখতে পারলাম না।তাই নিজের কাঁধের ব্যাগটা আরিফের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চম্পার চুলগুলো দু’হাতে মুটি করে ধরলাম।চম্পাও আমার সাথে মারামারিতে লেগে গেলো।আমি হচ্ছি ট্রেনিং প্রাপ্ত ক্যারাটে। তাই চম্পা সহ ওর বান্ধবীরা একা-আমার সাথে পেরে উঠলো না।অন্যদিকে আরিফ মাটিতে থাপড়ে শীশ বাজিয়ে রেফারির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলো।আমি চম্পাকে মাটিতে ফেলে আচ্ছা মতো দু ঘা দিয়ে কেটে পড়ি, কলেজের টিচার্সরা আসার আগেই।


আমার কথা শুনার পর,জায়ান ভাই আমাকে কান ধরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছে।আমি দু কানে ধরে রেখে জায়ান ভাইয়কে আড় চোখে দেখছি।লোকটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে__দেহের বিন্দু বিন্দু পানিগুলো টাউয়ালের সাহায্য মুচ্ছে।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, শুকনো ঢুক গিলতে লাগলাম। তল পেটে কেমন যেন গুরগুর করছে।মনে হচ্ছে সেখানে লক্ষ প্রজাতি ডানা মেলে উড়ছে।এই অনুভূতিটা ভীষণ অস্বস্তিকর।সবে সপ্তাদশী, তাই বুঝে উঠতে পারি না এটা কি ধরনের অনুভূতি?আমি এক পা দিয়ে আরেক পা ঘষে যাচ্ছি।জায়ান ভাই আমাকে এমন অস্থির দেখে এদিকে এগিয়ে আসলো।লোকটার পড়নে একটা টাউজার।পেশিবহুল দেহ স্পষ্ট দৃশ্যমান। আমি না চাইলেও আমার নজর সেদিকে চলে যাচ্ছে বারবার।ব্যাপারটা জায়ান ভাই ধরে ফেলেছে।তিনি আমার খুব সন্নিকটে এসে দাঁড়াল।অতঃপর দেয়ালে এক হাত রেখে আমার উপর হালকা ঝুঁকে পড়ে সেডাকটিভ টোনে বললো,
–আরও কোনোদিন এমন করবি?

আমি কানে ধরে রেখেই নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে দু পাশে মাথা নাড়ালাম।অতঃপর রিনরিন সুরে বললাম,
–আমি তো কিছু করি নি।চম্পাই তো আমাকে রাগিয়ে দিলো,,,

জায়ান ভাই আচমকা আমার উপর আরও ঝুঁকে পড়ে।আমি এক পা আরেক পায়ের উপর আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।কি হচ্ছে আমার নিজেই বুঝতে পারছি না।লোকটার শরীরের মিষ্টি গন্ধ আমাকে আরও অস্থির করে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে লোকটার বুকে ঝাপিয়ে পড়ি।জায়ান ভাই নিজের মুখ আমার কানের কাছে নিয়ে আসলো।আমি ঝটপট চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিলাম।তল পেটের অস্বস্তিকর অনুভূতি পর্যায়ক্রমে আরও বেড়ে গেলো।মনে হচ্ছে সিনেমার নায়কদের মতো জায়ান ভাইও আমার কানে চুমু খাবে।কিন্তু আমার সব ভাবনা মাটি করে একই মাদকীয় কন্ঠে জায়ান ভাই বলে উঠলো,
–এইটুকু শরীরে এত রাগ কোথা থেকে আসে?

–জা জানি না তো,,,,

আমার বাচ্চাদের মতো কথা শুনে লোকটা ঠোঁট কামড়ে হাসলো।আমাকে আরও কিছু বলবে তার আগেই আবারও উনার ফোনটা বেজে উঠলো।জায়ান ভাই বিছানার ফোনটায় একবার দৃষ্টি বুলিয়ে আমাকে বললো কলেজ ড্রেস চেইঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নিতে।আমি মাথা নাড়িয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।

জায়ান ভাই আমার যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, ফোনটা রিসিভ করলো।অপর প্রান্ত থেকে ইফান হেয়ালি করে বললো,
–হ্যালো,আমার বউজান নাকি মা*ঙ্গের শালা?

জায়ান ভাই চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,”হা*রামি লেঙ্গুয়েজ ঠিক কর।তুই আমাকে কল দিবি না। তোর সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ। “

ফোনের অপর প্রান্ত ইফান হো হো করে হেসে উঠলো।অতঃপর বাঁকা হেসে বললো,
–তর বন্ধুত্ব কে আমি পাছা মেরে শা*লার সম্পর্কে নিয়ে এসেছি।

জায়ান ভাই ইফানের প্রতি চেঁচিয়ে উঠলো।রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
–তোকে এতদিন নিজের বন্ধু ভেবে এসেছিলাম, ছ্যাহ্,,,,,

ইফান হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে গেলো।তারপর কিছু একটা ভেবে চোয়াল শক্ত করে বললো,
–সেটা তরই দোষ। তুই কেন আগে বললি না, তর যে এত সুন্দরী বোন আছে।তাহলেই তো প্রথমেই শালা বানিয়ে দিতাম।

জায়ান ভাই আর নিতে পারছে না।তিনি চোখ বন্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।তখনই ফোনের ওপাশ থেকে ইফান ফের বললো,
–আমার পুটকি ছেড়ে আইনের পুটকি ধরলি কেন?

জায়ান ভাই নিজেকে শান্ত করে ঠান্ডা কন্ঠে বললো,”আমি তরটাই ধরেছিলাম কবে?”

–তার মানে আমাদের এত দিনের ফ্রেন্ডশিপকে অস্বীকার করছিস?

–এই কাজ আমি মরলেও করবো না।পৃথিবীতে আমাকে কখনো যদি মিথ্যা দিয়ে সত্যি ঢাকতে হয়। তাহলে জেনে রাখিস তরটাই ঢাকবো।

–পৃথিবীতে একমাত্র তুই যাকে আমি বারবার ছাড় দিই।তাহলে ভাব তুই আমার প্রায়োরিটি লিস্টে কতটা স্পেশাল আর ইম্পরট্যান্ট। আশা করি আমার সাথে বেইমানি করবি না!!

জায়ান ভাই মৃদু হেসে বললো,”আর যদি তুই করিস?” জায়ান ভাইয়ের কথা শুনে ইফান অনেকটা উদাস হয়ে গেলো।নিজের দেহটা কাউচে ছেড়ে দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বললো,
–একটা বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নই।সেটা ছাড়া কখনো করবো না।তুই কি আমাকে ট্রাস্ট করিস?

জায়ান ভাই বেডে শরীর ছেড়ে দিয়ে ইফানের মতো উদাস হয়ে বললো,”হয় তো নিজের চেয়েও তোকে বিশ্বাস করি।আমি জানি তুই সত্যি না বললেও কখনো আমায় মিথ্যা বলিস না।”

ইফানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ভেসে উঠলো।সে এক হাত দিয়ে নিজের ঘন কালো চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিতে দিতে বললো,”এত ট্রাস্ট করা কি ঠিক?”

জায়ান ভাই হাতটা চোখ দু’টোর উপর রেখে ফের তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।অতঃপর হাস্কি স্বরে বললো,,,,,
❝মন আর মস্তিষ্ক সবসময় নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই আটকায়রে ভি।আমিও আঁটকে গেলাম তর সাথে এক শিরোনামহীন বন্ধুত্বের দায়ে।❞

জায়ান ভাইয়ের কথার পিছে ইফান কিছু বলতে পাড়লো না।অতঃপর বেশ কিছুক্ষণ দু’জন নীরবতা পালন করে।সেই নীরবতা ভেঙে জায়ান ভাই বলে,
–এখন কোথায় আছিস?

ইফান চোখ বন্ধ করে কাউচে হেলান দিয়ে আছে।সেভাবেই উত্তর করলো,
–থাইল্যান্ড।। মাফিয়াদের একটা পার্টি এরেঞ্জ করা হয়েছে।রেডি হয়ে আছি কিছুক্ষণ পর সেখানেই যাব।

জায়ান ভাই সংক্ষিপ্ত প্রতিত্তোর করলো,”ও আচ্ছা।”

আবার দু’জনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করে।এবার ইফান সেটা ভেঙে জায়ান ভাইকে হাস্কি স্বরে ডেকে উঠে,

–নীরব!!

–হুম??

ইফান দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করলো।জায়ান ভাইও সেটা অনুভব করেছে।ইফান হিসহিসিয়ে বললো,

–আই ফিল ডিস্টার্ব!!

–হোয়াই??

ইফান চোখ বন্ধ রেখেই এক হাত নিজের বুকের বাম পাশে রেখে একই স্বরে বললো,,,,

–আই থিংক, সামথিং ইজ বার্নিং ইন মাই চেস্ট।

ইফানের কথা শুনে জায়ান ভাই ঝটপট উঠে বসলো।তিনি বেশ অবাক হয়েছেন ইফানের কথায়।তিনি হালকা হেসে কৌতুক স্বরে বললো,

–ওহ্ রিয়েলি!!

জায়ান ভাইয়ের এমন রিয়াকশনে ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে, সেও কৌতুক করে হিসহিসিয়ে বললো,

–উমমম,সামথিং সামথিং,,,,,


রাত সারে দশটা বাজে।আম্মু সকলকে ডাকছে ডিনার করার জন্য।জুই আমাকে বলে নিচে চলে গেছে।আমার পড়নে ওভার সাইজ গেঞ্জি আর প্লাজু।আমি নিজেকে আয়নায় দেখে আরেকটু পরিপাটি হয়ে নিলাম।রুম থেকে বের হওয়ার সময় ঠোঁটে হালকা লিপবাম দিয়ে, মাথায় ওড়না টেনে নিলাম।অতঃপর নাচতে নাচতে রুমে থেকে বেড়িয়ে গেলাম।কি একটা ভেবে জায়ান ভাইয়ের রুমে উঁকি দিলাম।আমার জানা মতে তিনি দুপুর দুইটাই বাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে যায়।এর পর আর বাড়িতে আসতে দেখি নি।আমি দরজা হালকা ফাঁক করে উঁকি মারছি তখন জায়ান ভাইয়ের কন্ঠ কানে আসে,
–এমন বিরক্ত করছিস কেন?কাজে মনযোগ দিতে পারছি না তো।

আমি ঠিকঠাক হয়ে রুমে ঢুকে দেখলাম, জায়ান ভাই কাউচে বসে উরুতে ল্যাপটপ নিয়ে মনযোগ সহকারে কাজ করছে।আমার মনের কোণে প্রশ্ন জাগলো,উনি তো একবারও আমার দিকে তাকালো না। তাহলে বুঝলো কিভাবে আমি বাইরে থেকে উঁকি মারছিলাম।মনের কথা মুখ ফুটে বলেই ফেললাম,
–আপনি তো তাকালেন না। তাহলে বুঝলেন কিভাবে, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম?

–তুই তুই একটা ফ্লেভার নাকে আসছিলো।

জায়ান ভাইয়ের কথা মাথায় ঢুকলো না।আমিও আর পাত্তা দিলাম না।কারণ আজ অনেক মজার মজার আইটেম রান্না হয়েছে।আমি হেলেদুলে বললাম,
–নিচ থেকে তো ডাকছে। খেতে যাবেন না?

–আমি অনেক বিজি খিদে নেই।।

–না না না,এটা বললে হবে না। আজ জিতু ভাইয়াও বাসায়, চলুন না।

জায়ান ভাই কিবোর্ডে হাত চালাতে চালাতে বললো,
–জারা তুই সবার সাথে খেয়ে নে।আমি অনেক বিজি।

আমি জায়ান ভাইয়ের কথা শুনলাম না।মনে এক অদম্য সাহস নিয়ে উনার বাহু ধরে টানতে লাগলাম। মূহুর্তেই লোকটা টাইপিং করা থামিয়ে দিলো।তারপর আামর দিকে তাকাতেই আমি আরও জুড়ে টানতে লাগলাম।আমি বাচ্চাদের মতো বাইনা ধরার মতো বলতে লাগলাম,
–চলুন না , চুলন না,,,,,,,,

জায়ান ভাই আর কিছু বলতে পারলো না। অনিচ্ছা থাকা সত্যিও ল্যাপটপ বন্ধ করে আমার সাথে নিচে আসলো।আমি এখনো উনার বাহু টেনে সিঁড়ি দিয়ে নামছি আর বলছি,
–আসুন, আসুন,,,,,,

আমাদেরকে দেখে দাদি বড় আব্বুকে চোখ টিপ মারলো।জিতু ভাইয়া আমাদের কে এক সাথে দেখে ঠোঁট কামড়ে ফোনে মনযোগ দিলো।জুই মুখে হাত ধরে মিটিমিটি হাসছে।আমি জায়ান ভাইকে একটা চেয়ারে বসতে দিয়ে, তার পাশে আমিও বসে পাড়লাম। বড় আম্মু সবাই কে খাবার দিতে এসে দেখলো কবিতা আপু এখনো আসে নি।তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
–কিরে জাহান কবিতা কোথায়?

আমি নিজের খালি প্লেটে কুটকুট শব্দ করতে করতে বললাম,
–তোমার মাইয়াকে ভূতে ধরসে বড় আম্মু।

সবাই আমার দিকে ডেবডেব করে তাকালো।বড় আম্মু অবাক হয়ে বললো,
–কি বলসরে জাহান!!

–হ্যা গো বড় আম্মু। কবিতা আপু একটা একলা কথা বলে। আবার একলা একলা হাসেও।আমি কিছু বললেই বলে এমনিতেই নাকি তার হাসি পাচ্ছে।

জায়ান ভাই আমার কথা শুনে আমার কপালে দু আঙ্গুল দিয়ে ঠোকা মেরে বললো,
–গাঁধি,,,

আমি গাল ফোলালাম।জায়ান ভাই দুটো ডাক দিতেই কবিতা আপু পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে আসলো।কবিতা আপুকে দেখে বড় আম্মু একটু বকে নিলো।বড় আব্বু কিছু বলার আগেই জায়ান ভাই শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
–কি সমস্যা?

কবিতা আপু একটা ঢুক গিলে আমতা আমতা করে বললো,
–ক কই কিছু না তো!!

–হুম, কিছু যাতে না হয়।আমি পরে জানতে পারলে শাস্তি পেতে হবে।মনে রাখবি কথাটা।

–আআ আচ্ছা, মনে থাকবে।

বাক্যটা শেষ করেই কবিতা আপু আমার দিকে রেগে তাকালো।আমি চোখ উল্টে ভেংচি কাটলাম।


আম্মু আর বড় আম্মু আমাদের যা প্রয়োজন তা দিচ্ছে।আমি মজা করে খেতে ব্যস্ত তখনই বড় আব্বুর কন্ঠ কানে আসে,
–মজিদ ভাই আমার, তোর কাছে একটা আবদার আছে।।

আব্বু খাওয়া থেকে মনযোগ সরিয়ে বড় আব্বুর দিকে তাকালো।বড় আব্বু ছোট ভাইয়ের কাঁধে এক হাত রেখে বললো,
–বাড়ির মেয়ে বাড়িতে সারাজীবন রেখে দিলে কেমন হয়?

আব্বুর চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি কথার মানে বুঝতে পারেননি।জায়ান ভাই এক মূহুর্তের জন্য খাওয়া বন্ধ করে। তিনিও বড় আব্বুর কথায় বেশ অবাক। তবে সেটা প্রকাশ করলো না।তিনি আবার খাওয়ায় মনযোগ দিলো।জায়ান ভাই ছাড়া উপস্থিত সবাই বড় আব্বুর কথায় মনযোগ দিলো।বড় আব্বু আবার বলতে লাগলো,
–ভাই ছেলেটার তো বিয়ের সময় হয়েছে। আমি চাইছি বাড়িতে পুত্র বধু নয় আমার আরেকটা মেয়ে আনতে।তুই যদি ভাই রাজি থাকস, তাহলে তোর আদরের বড় কন্যাকে আমার ছেলের সাথে চারহাত এক করে দে।আমাদের মেয়ে সবসময় আমাদের কাছেই থাকলো।মরণের আগ পর্যন্ত, সবসময় আম্মাজান কে চোখের সামনে দেখতে পারবো।

মহূর্তেই আব্বু খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।আম্মুও প্রস্তাবে বেশ খুশি হয়েছে।তবে আব্বুকে হঠাৎ এমন করতে দেখে উনার হাসি মিলিয়ে গেছে। বড় আব্বু মুখ অন্ধকার করে দাঁড়াল। অতঃপর ভাইয়ের কাছে করুন সুরে বলতে লাগলো,
–তুই যদি রাজি না থাকিস তাহলে আমি জোর করব না।তুই হয় তো মেয়ের জন্য আমার ছেলের থেকেও ভালো পা,,,,,,,

বাকি কথা শেষ করার আগেই আব্বু বড় আব্বু কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো।সবাই আরেক দফা অবাক হলো।আব্বু জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো,
–ভাই তুমি কি প্রস্তাব দিলে গো।খুশিতে তো আমার মুখ দিয়ে কথা আসছে না।এমন হীরার টুকরো ছেলে আমি কোথায় পেতাম।আমি তো মনে মনে এমন একটা ছেলেরই খোঁজ করছিলাম।আল্লাহ তুমি তো আমাকে জান ভিক্ষা দিলে। আমার তো ভাবলেই দম বন্ধ হয়ে আসতো,যে মেয়েকে পরের হাতে তুলে দিতে হবে।

দুই ভাই আনন্দে কেঁদে ভাসাচ্ছে।সকলেই সেই মূহুর্ত মন ভরে দেখছে।আমি এখনো বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে!! এদিকে সকলের দৃষ্টি সামনে থাকলেও জায়ান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে অপলক। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি।আব্বু আম্মুরা বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে। এদিকে বড় আব্বু আমাকে বললো,
–আম্মাজান আপনি রাজি?

হঠাৎই বড় আব্বুর কণ্ঠ কানে আসতেই আমি লাফ মেরে দাঁড়িয়ে পড়লাম।আমার হাতে হাঁসের বড় একটা রান।সেটা সহ দু’হাত, মাথা নাড়িয়ে খুশিতে গদগদ করতে করতে বলে দিলাম,
–আমি রাজি,আমি রাজি, আমি রাজি,,,,,,,

আমার এমন কান্ডে সকলেই হো হো করে হেসে দিলো।জায়ান ভাইয়া আমাকে গাঁধি সম্মোধন করে ডাইনিং রুম ত্যাগ করলো।


ঘড়ির কাটা টিকটিক করতে করতে রাত একটা পনেরো তে এসে থামলো।বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে।এটা নিশ্চিত হতেই আস্তে আস্তে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো কবিতা আপু।ভালোভাবে চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে বাড়ির পিছন গেইট দিয়ে বেড়িয়ে পড়লো।এদিকে জায়ান ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে সব কিছু অস্থির লাগছে।ঘুম আসছে না।চোখের সামনে ভেসে উঠছে হাজারও স্বপ্ন।আর তার সবটা জুড়ে আমি আর আমার জায়ান ভাই।জায়ান ভইকে নিয়ে ভাবতে গেলেই তল পেটের প্রজাতিগুলো ডানা মেলে ঝাঁপটাতে শুরু করে।ভিষণ অস্থির লাগে এই মূহুর্তটাই।আমি আর এভাবে শুইয়ে থাকতে পারলাম না।তাই বিছানা ছেড়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করতে লাগলাম।হঠাৎই নজর পড়লো বেলকনির দরজা খোলা। আমি দরজা লাগাতে যেতেই চোখ পড়লো শেখ বাড়ির বাউন্ডারির ঐ পাড়ে__একটা কালো গাড়ি চোখের পলকে স্থান ত্যাগ করলো।আমি একটু অবাক হলাম।কারণ আমাদের বাড়ির পিছনের রাস্তা দিয়ে এমন বড় গাড়ি কখনো চলাফেরা করে না।তাও আবার এত রাতে।

আমি এত না ভেবে দরজা বন্ধ করে ফোন নিয়ে বসলাম।জায়ান ভাইয়ের ইনস্টাগ্রাম আইডিতে বেশ কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করলাম।সেখানে উনার অনেক ছবি আপলোড দেওয়া সেগুলো জুম করে করে দেখলাম।মাঝে মাঝে ছবিতে চুমুও খেতে লাগলাম।ছবিতে চুমু খেয়ে লজ্জায় আমার গাল লাল টুকটুকে হয়ে উঠছে।আমি বেশিক্ষণ জায়ান ভাইয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে পাড়লাম না।সকল লাজুকতা আমায় ঘিরে ধরেছে।আমি আবার শুইয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসতে চাইছে না।অবশেষে ফোন হাতে নিয়ে কবিতা আপুর রুমের উদ্দেশ্য বেরোতে নিলেই দেখলাম, জায়ান ভাই ছাঁদের দিকে যাচ্ছে। আমিও চুপিচুপি পিছনে যেতে লাগলাম। আমাদের বাগান, ছাঁদে সারারাতই লাইট জ্বলে।তাই সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।আজ পূর্ণিমা রাত, সাথে হালকা কুয়াশা মাখা রাতের প্রকৃতি যে কারো মন ছুয়ে দিবে।আকাশে চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে।তার পাশে লক্ষ কোটি তারার মেলা।এই অপরুপ প্রকৃতির দৃশ্য যে দেখবে সেই মুগ্ধ হতে বাধ্য।

কিন্তু এই প্রকৃতি থেকেও আমাকে বেশি মুগ্ধ করছে জায়ান ভাইয়ের মায়াবী চেহারা।তবে জায়ান ভাইকে ভীষণ চিন্তিত লাগছে।তিনি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরে দিয়াশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে দিলো।এই দৃশ্যটা এত সুন্দর যে আমি হা করে তাকিয়ে দেখতে লাগালাম। তিনি সিগারেটে টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া কুন্ডলী ছেড়ে দিচ্ছে। আমি দরজার আড়াল থেকে সেই দৃশ্যই দেখে স্বপ্ন জগতে পারি দিচ্ছি। জায়ান ভাই একটা সিগারেট সম্পূর্ণ শেষ করে আরেকটা ধরালো।উনার অস্থিরতা যেন কিছুতেই কমছে না।সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎই তিনি স্থির হয়ে গেলেন।তিনি আবারও আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে, মাদকীয় হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,

–জাহানারা নামের অর্থ কি জানিস?

আচমকা উনার কন্ঠ স্বর শুনে আমার বুক কেঁপে উঠলো।আমি ঝটপট দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই মৃদু হাসলো।অতঃপর একই কন্ঠে বললো,
–কাছে আয় পাখি।তুই আমার কাছে থাকলে হৃদয়ে শান্তির স্রোত বয়ে যায়।

উনার এই বাক্যটা আমার অশান্ত হৃদয় আরও প্রণয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলো।আমার বুক কাঁপছে। হাত পা অসার হয়ে আসছে।তবুও লোকটার কথা ফেলতে পারলাম না।কাঁপা কাঁপা শরীর নিয়ে রেলিং ধরে উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জায়ান ভাই মন খুলে শ্বাস নিলো।মনে হচ্ছে এতক্ষণ উনার শ্বাস আটকানো ছিলো।আমি উনার দিকে তাকিয়ে রিনরিন সুরে বললাম,
–জাহানারা অর্থ বিশ্বের রানী।

–আর জারা অর্থ কি জানিস?

আমি লোকটার মায়াবী চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকেই উত্তর করতে চাইলাম।তবে আমাকে বলতে না দিয়েই তিনিই বলতে লাগলেন,
–রাজকুমারী,আমার রাজকুমারী। তুই জানিস বড্ড শখ করে তোর নাম জারা রেখেছিলাম। তুই জন্মের পর ঠিক কতটা কিউট হয়েছিলি যে হাজার বর্ণনা দিয়ে বললেও তার তুলনা করতে পারবো না।ডাক্তার সহ হাসপাতালের সকলেই আশ্চর্য হয়েছিলো।কারণ তুই একদম টুকটুকে পিংক কালার হয়েছিলি।তোর রং দেখে বড় দাদু তার মার মিল পায়।তাই উনার মার নাম অনুযায়ী তোর নাম জাহানারা রেখেছিলেন।আর আমি রেখেছিলাম জারা।জানিস আমি কখনো ভাবিনি তোকে কখনো নিজের করে নিতে চাইবো।এই ইচ্ছেটা তো সেদিন জাগে তখন তোর বয়স তিন কি সারে তিন বছর হবে।আমি পড়ছিলাম। তুই কোথা থেকে ছোট ছোট পা নিয়ে দৌড়ে আমার রুমে আসলি।আমি তোকে খেয়াল করি নি পড়ায় মনযোগী বলে। হঠাৎই তুই আমার পায়ে ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো দিয়ে থাপ্পড় দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে ডাকতে লাগলি,
–জান ভাই, জান ভাই হুন, হুন।

আমি তৎক্ষনাৎ তোর দিকে তাকালাম। তুই মায়াবী ডাগর ডাগর আঁখি যোগল দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। তোর ঠোঁটের আস পাস চকলেট দিয়ে মেখে আছে।আমি তোর কপালে চুমু খেয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে লাগলাম।তুই আামর শার্টের একটা কোণা ধরে টানতে টানতে আদুরে কন্ঠে বলতে লাগলি,
–হামি টুমার বও??

তোর মুখের আদুরে অবুঝ কথাটা শুনা মাত্রই আমার হৃৎস্পন্দন থমকে যায়।এক মূহুর্তের জন্য দম আটকে আসে।আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম।সেদিন এটা তুই কি বললি তুই নিজেও জানিস না।আমি ঢুক গিলে তোকে কোলে নিয়ে বললাম,
–জারা পাখি এটা পচা কথা, বলতে নেই।

তুই আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘারে কামড় বসালি।তারপর আমার কাঁধে মারতে মারতে রাগ দেখিয়ে বলতে লাগলি,
–অক্করে না, অক্করে মাইয়া ডিবাম হুম।দাদি কইচেনা হামি টুমার বউ।অকন টুমি মিচি কটা কইয়েই মাইয়া ডিবাম,,,,,

জানিস পাখি সেই দিন থেকে তুই আমার স্বপ্নে ধরা দিতি প্রতিরাতে। তোকে বউ বানানোর প্রবল ইচ্ছে এই হৃদয়ে বাসা বাঁধে।তোর অপেক্ষা করতে করতে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলো।আজ মনে হচ্ছে তোকে সত্যিই বউ করে নিতে পারবো।কিন্তু,,,,,

আমি খুব মনযোগ দিয়ে জায়ান ভাইয়ের কথাগুলো শুনছিলাম।হঠাৎ উনি থেমে যাওয়ায় আমি বললাম,
–কিন্তু কি??

জায়ান ভাই আকাশের থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকালো।অতঃপর সিগারেটের শেষ অংশ টুকু নিচে ফেলে__আমার দুগাল আগলে ধরে হাস্কি স্বরে বললো,
–আমার যে বড্ড বেশি ভয় করছ।নিজের জন্য নয়, তোকে হারানোর ভয়।আমার যে স্বপ্ন তোকে বধূ করে আমার ঘরে তোলার। কিন্তু তার আগেই যদি আমি হারিয়ে যায়,,,,,

–নাহ্,,,

আমি জায়ান ভাইয়ের মুখে হাত ধরে উনাকে বলতে দিলাম না।আমার চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে উনার এমন কথা শুনে।জায়ান ভাই আমার হাতটা উনার মুখ থেকে সরিয়ে__উনার বুকের বাম পাশে রাখলো।অতঃপর তিনি আবার বলতে লাগলেন,,

❝তুই অনেক সরল, পাখি আমার।আর সরল জিনিসগুলো ভীষণ স্বচ্ছ হয়।সেখানেই বিরাজ করে সকল পবিত্রতা।তুই ভীষণ পবিত্র রে জারা।তোর পবিত্র হৃদয়ে আমাকে যত্ন করে রাখিস।❞

জায়ান ভাইয়ের কথাগুলো শুনে আমার বুকে চিমচিম ব্যথা শুরু হয়েছে।লোকটা হঠাৎ এত ভারী কথা কেন বলছে বুঝতে পারছি না।আমার গলায় কান্নার দলা পাকিয়ে আসছে।আমি কান্না টুকু গিলে লোকটার বুক থেকে উনার হাতটা আমার বুকের বা পাশে রেখে ভেজা কন্ঠে বললাম,

❝এই যে এখানে যত্ন করে আপনাকে রেখে দিলাম।এবার মৃত্যু ছাড়া এই হৃদয় থেকে আপনার নাম কেউ মুছতে পারবে না।কথা দিলাম_

চলবে,,,,,,,,,,

(এত বড় করে লিখলাম ভুল ত্রুটি থাকতেই পারে,বুঝে পড়ে নিও।এই পর্বের শেষাংশ খুব তাড়াতাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবো। তার আগে রিয়েক্ট কমেন্ট করো।হ্যাপি রিডিং 🥹❤️‍🩹)

জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৪৬
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

আমার উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে দের মাস আগে।পরপরই আমার আর জায়ান ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।তারপর আরও এক মাস হাতে সময় নিয়ে বিয়ের সকল গোছগাছ করা হয়।

দেখতে দেখতে কিভাবে শীতকাল চলে আসলো!!হালকা হালকা ঠান্ডা পড়েছে।তাই সকাল আর রাতে গরম কাপড় পড়তে হয়।তবে দিনের বেলা তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে।আজকের দিনের শুরুটাই হয়েছিলো এক আলাদা অনুভূতি নিয়ে।হ্যা আজ আমার আর আমার প্রাণপ্রিয় জায়ান ভাইয়ের গায়ের হলুদ। আগামীকাল আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা প্রাপ্তির দিন।আমি আজ খুশিতে আত্মহারা।এই অপরিসীম আনন্দময় অনুভূতি আমার হৃদয়ে তোলপাড় চালাচ্ছে।

শেখ বাড়িতে আমাদের বিয়ের বিশাল এক আয়োজন করা হয়েছে।বিয়ে উপলক্ষে পুরো কলোনি লাইটিং করা হয়েছে।আমাদের সকল আত্মীয় স্বজন গতকালই চলে এসেছে।এখন বিকাল চারটা বাজে।সারা বাড়ি ভর্তি মানুষ।প্রতিবেশীরা আম্মু আর বড় আম্মুকে সকল কাজে সাহায্য করছে।মেহমানরা সকলে একসাথে বসে চা নাস্তা করতে করতে আড্ডার আসর জমিয়েছে।জুই তার সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করে বাড়ির এক প্রান্তে থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে।আয়নার সামনে বসে আছি আমি।আমার চুলের খোঁপায় ফুলের গাজরা বেঁধে দিচ্ছে কবিতা আপু।কবিতা আপু নিজের কাজ সম্পন্ন করে আমাকে বললো,

–এই তো সাজ কমপ্লিট। এবার আয়নাতে নিজেকে দেখ।

আমি লজ্জা মিশ্রিত চেহারা নিয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। মূহুর্তেই নিজের চোখেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে গেছে।আমি নিজেকে দেখে নিজেই অবাক।আমাকে এত সুন্দর লাগছে!!আমি নিজেকে আয়নায় দেখে লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে হাসলাম।কবিতা আপুর প্রশংসাও না করলেই নয়।মেয়েটা সব কিছুতেই ভীষণ পারফেক্ট।আমার সাজ দেখে মানুষ আমার সাথে কবিতা আপুরও প্রশংসা করবে।কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে!আমার পাশ থেকে তন্নি হেয়ালি কন্ঠে বলে উঠলো,
–ওও মাই খাট,এটা কে?আমি তো চিনতেই পারছি না!!

সুমাইয়া আর নাফিয়া আমার দু কাঁধে ধরে, আয়নাতে আমাকে দেখতে দেখতে নাফিয়া বললো,
–কে আর হবে হ্যা!এটা তো আমাদের জাহান টুকুটুকি।মাশাআল্লাহ বোইন তোকে তো একদমই পরীর মতো লাগছে।

সকলের প্রশংসা শুনে বেশ লজ্জা লাগছে।আমি লাজুক হাসতে লাগলাম।কবিতা আপুর কোমর জড়িয়ে ধরে বললাম,
–থাংকু থাংকু, এত সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়ার জন্য।

কবিতা আপু হাসতে হাসতে পাশের টোলটা টেনে আমার সামনে বসে বললো,
–হয়েছে হয়েছে, এত প্রশংসা করতে হবে না।তুই এমনিতেই এক পরী।তোকে না সাজলেও কিউট লাগে।আল্লাহ,তুই আমার ভাবি হয়ে যাচ্ছিস রে জাহান!! এখন থেকে তো তোকে ভাবি বলে ডাকতে হবে।

–ইশশশ যা,,,,

সকলের কথা শুনে লজ্জায় আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমাকে দেখে,এটা ওটা বলে সবাই হাসিঠাট্টা আরম্ভ করেছে।এরই মাঝে রুমে দাদি এসে হাজির হলো।তিনি আমার থুতনি ছুঁইয়ে নিজের হাতে শব্দ করে চুমু খেলেন।অতঃপর দাদি কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে নিজের চোখের কাজল আমার কানের পিছনে টিপ দিয়ে বললেন,
–মাশাআল্লাহ। আমার বোইনকে তো আজ হুরপরীর মতো লাগছে।আজ তরে দাদু ভাই দেখলে তো উষ্ঠা খেয়ে পড়বে রে।এত সুন্দরী বউ দেখে তো ভাইয়ের আদর করতে মন চাইবে।

দাদির কথা শুনে সকলে হেসে ফেটে পড়ছে।দাদির এসব কথা শুনে আমার লজ্জা আরও বাড়ছে।দাদি কিছুক্ষণ আমাদের সাথে হাসিঠাট্টা করে চলে যায়।কবিতা আপু সহ বাকিরাও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলো।তখনই রুমে আরিফ হাজির।আরিফ ক্যামেরা হাতে নিয়ে সেটাতে কিছু একটা করতে করতে বললো,
–কিরে বোইন তাড়াতাড়ি আয়।পড়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলে পিক কেমনে তুলবি।

তন্নিরাও আরিফের সাথে হ হ করলো।অতঃপর সকলে আমাকে দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো।কবিতা আপু সহ,আমার সকল বান্ধবী,কাজিনরা আমার মতো হলুদের শাড়ি পড়েছে।আমাদের ফটোশুট হবে বাড়ির পেছনের পুকুর ঘাটে।আমরা হেঁটে সামনে এগোচ্ছি।আর আরিফ ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও ধারণ করছে।আমরা ঘাটের কাছে আসতেই দেখলাম,জায়ান ভাইকে প্রতিবেশী দাদিরা ঘিরে ধরেছে।তারা জায়ান ভাইকে ঘিরে ধরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গীত গাইছে।জায়ান ভাই মুরুব্বিদের এমন কাজে না চাইতেও ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসছে।পাশেই জুই সহ জায়ান ভাই আর আমার কাজিনরা ঘাটে বসে মেহেদী পাতা, কাচা হলুদ,সরষে বাঁটছে।জুই আর আমার মামাতো বোনেরা আমার পক্ষ থেকে মেহেদী, হলুদ বাঁটছে।আর জায়ান ভাইয়ের পক্ষ থেকে হলুদ আর মেহেদী বাঁটছে জায়ান ভাইয়ের কাজিনরা।তাদের মুখ ভর্তি পান সুপারি।যাতে মুখ থেকে কোনো কথা বের না হয়।প্রতিবেশী দাদিরা বলেছে,বাঁটার সময় কথা বললে নাকি,নতুন বউও বিয়ের পর বেশি কথা বলে।

আরিফ তার ক্যামেরাটা জুইয়ের দিকে ঘুরালো।দাদি আমার নানু সহ নিজের সইদের সাথে হাসিতে মেতেছিলো।দাদি আমাকে দেখতে পেয়েই জায়ান ভাইকে কৌতুক করে বললো,
–কি দাদু ভাই, আজ বউকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারবে তো?

সকলে এটা ওটা বলা শুরু করেছে।বয়স্ক দাদিদের এসব লাগামহীন কথাবার্তা শুনে লজ্জায় এখান থেকে পালাতে ইচ্ছে করছে।জায়ান ভাই হঠাৎ এসব কথার মানে বুঝতে পারছে না। দাদি চোখের ইশারায় আমার দিকে দেখালো।জায়ান ভাই ইশারা অনুযায়ী সেদিকে তাকাতেই দেখলো আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।আমাকে এরকম সাজে দেখে জায়ান ভাই থমকে গেলো।কি বলবে কি করবে সব দিশা হারিয়ে, অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।এতে সকলে আরও আমাদের নিয়ে এটা ওটা বলে হাসছে।জায়ান ভাই আমাকে দেখতে দেখতে একটা শুকনো ঢুক গিললো।মনে হলো ঢুক গিলতে উনার ভীষণ কষ্ট হয়েছে।আরিফ সবটা ভিডিও করে নিচ্ছে।আমি এখনো মাথা উপরে তুলতে পারছি না।পাশ থেকে সুমাইয়া বলে উঠলো,
–বোইন একবার তাকায়া দেখ,দুলাভাই কেমনে ডেবডেব করে তাকিয়ে তোকে দেখছে।

আমি লাজুক চেহারাটা হালকা উপরে তুলে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি এখনো আমার দিকে তাকিয়ে।তাই চোখাচোখি হলো।জায়ান ভাই তক্ষুনি বিরবির করলো,
–মাশাআল্লাহ।

আমি তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিতে যাব তখনই লোকটার দিকে চোখ আটকালো।একটা কালো টাউজারের উপর একটা নেবি কালার টিশার্ট পড়ে আছে।পেশিবহুল দেহে টিশার্টটি আষ্টেপৃষ্টে দেহের সাথে মিশে আছে।ঘামে উনার শ্যামলা গায়ের রং টা আরেকটু গাঢ় দেখাচ্ছে।লোকটার মায়াবী চোখদুটোতে আমার জন্য একরাশ মুগ্ধতা।লোকটাকে যখন আমি ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি তখনই আরিফের কন্ঠ কানে আসে,
–জাহান সুন্দর করে হেঁটে ভাইয়ার কাছে যা। আমি ভিডিও করছি।

আমি লাজুক হেসে পেন্ডেলের দিকে তন্নিকে দেখিয়ে বললাম,”ঐখান থেকে এক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। “

তন্নি এক ছুটে গিয়ে একটা শরবতের গ্লাস নিয়ে এসে আমার হাতে দিলো।কবিতা আপু পাশ থেকে বললো সামনে এগোনোর জন্য।আমার বুকটা কেমন যেন দুরুদুরু করছে।নিজেকে ভীষণ নার্ভাস লাগছে।তবুও জোরে শ্বাস টেনে সুন্দর করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম, দু’হাত ভরা মেহেদী রাঙা হাতে শরবতের গ্লাস নিয়ে।পাড়ার মহিলারা আরও জোর গলায় গীত ধরেছে।আরিফ ভিডিও করছে।আমি ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে জায়ান ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালাম।আমাদের কাজিন আর ফ্রেন্ডরা হো হো হো করে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। জায়ান ভাইয়ের সামনে আমি কাঁপা কাঁপা হাতে শরবতের গ্লাসটা ধরলাম।তিনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
–আামর জন্য এত সুন্দর করে সেজেছিস!! ভারী মিষ্টি লাগছে তোকে।

জায়ান ভাইয়ের হিসহিসিয়ে বলা কথাগুলো আমার শরীরে শিহরন তুলে দিলো।তলপেটের প্রজাতিগুলো আবারও উড়তে আরম্ভ করলো।জায়ান ভাই আমার লজ্জা পাওয়া দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো।অতঃপর তিনি ঘাটের বেঞ্চিতে গিয়ে বসলো।আমিও উনার পাশে বসে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিলাম।তিনি হাতে নিয়ে এক চুমুকে সবটা খেয়ে নিলো।এতক্ষণ হয়তো এটার ভীষণ দরকার ছিলো উনার। কিন্তু এত কাজের মধ্যে সময় করে উঠতে পারি নি।জায়ান ভাই গ্লাসটা আবার আমার হাতে এগিয়ে দিলো।আমি সেটা নিয়ে বেঞ্চিতে রেখে দিলাম। তারপর আমার শাড়ির আচল দিয়ে উনার ঠোঁট সহ সারা মুখের ঘুম টুকু মুছিয়ে দিতে লাগলাম।সকলে আবার আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টায় মেতে উঠলো।জায়ান ভাই আমার কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বললো,
–তোকে একদমই আমার পাক্কা গৃহিনী লাগছে রে জারা।

আমি লজ্জায় আরও জমে গেলাম।তবুও ভিতর থেকে নিজেকে সামলে দুহাত জায়ান ভাইয়ের সামনে ধরলাম।জায়ান ভাই আমার হাতের দিকে তাকাতেই লক্ষ করলো,আমার হাতে উনার নাম লেখা ইংরেজি অক্ষরে।জায়ান ভাই আমার হাত দুটোতে হাত বুলিয়ে দিলো।উনার চোখেমুখে একরাশ তৃপ্তির হাসির রেখা। সকলে আমাদের কে দেখছে মন ভরে।আরিফ সবটা মূহুর্ত ভিডিও করতে ব্যস্ত।কবিতা আপু দৌড়ে এসে আমার হাতে বাঁটা মেহেদীর বাটিটা দিয়ে বললো,
–আমরা দিলে ভাইয়া পরবে না। তুই পড়িয়ে দে জাহান।

আমি লাজুক চোখে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকাতেই, তিনি চোখের পাপড়ি ফেলে সায় দিলেন।আমি উনার আঙ্গুল গুলোতে গোল গোল করে মেহেদী পড়িয়ে দিলাম।অতঃপর কবিতা আপু কাগজের মেহেদী পাতাটা দিলো জায়ান ভাইয়ের হাতে আমার নাম লিখে দেওয়ার জন্য। আমি জায়ান ভাইয়ের দু’হাতের তালুতে আমার নাম ইংরেজি অক্ষরে জারা লিখে দিলাম।লেখা শেষ হতেই জায়ান ভাই নিজের বুকে ইশারা করে বললো,,
–এখানেও লিখে দে।

আমি অবাক হলাম।তিনি ইশারায় আবার বললো লিখে দিতে।এবার আমার হাত পা কাঁপছে। আমি বুঝতে পারছি না কি করবো।সকলে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো লিখে দিতে।সকলের আনন্দ আর দেখে কে!!আমি কাঁপা কাঁপা হাতে জায়ান ভাইয়ের টিশার্ট টা উপরে তুললাম।অতঃপর বুকের বাম পাশে ইংরেজি গোটাগোটা অক্ষরে আমার নামটা লিখে দিলাম।তারপর টিশার্টের একটা কোণা জায়ান ভাইয়ের মুখে ধরিয়ে দিয়ে, তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলাম অন্যপাশে।দুনিয়ার সকল লাজ আমাকে ঘিরে ধরেছে। এদিকে আমাকে এত লজ্জা পেতে দেখে সকলে আরও হাসিঠাট্টা আরম্ভ করলো।জায়ান ভাইও আমাকে দেখে হাসতে লাগলো।


বাগানে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে।প্রথমে বাড়ির ছাঁদে করার সিদ্ধান্ত হলেও ছোট বড় সকলের কথা চিন্তা করে এখানে আয়োজন করা হয়েছে।চারিদিকে লাইটিং করা।যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ভিন্ন ভিন্ন আলোর সমাহার। স্টেজ অনেক সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।আমি সেখানে বসে আছি।আমার সামনে পায়েস,মিষ্টি, ফল দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করে সাজিয়ে রেখেছে।আমার সাথে বড় আব্বু থেকে শুরু করে একে একে সকলে আমার গালে,হাতে,গলায় হলুদ ছুঁইয়ে দিয়ে ছবি তুলছে।সাথে সকলে আমার জন্য দোয়া করে দিচ্ছে। আম্মু আব্বু তো কেঁদেই দিয়েছে, আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে গিয়ে। কিছুক্ষণ পর জিতু ভাইয়া জায়ান ভাইকে টেনে নিয়ে আসলো।অতঃপর জায়ান ভাই আর আমি একে অপরকে হলুদ মেখে দিলাম।জায়ান ভাই আমার সাথে কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়।তারপর পাড়ার প্রতিবেশী রা এক এক করে আমার গায়ে হলুদ ছুঁইয়ে দিতে থাকে।এক বয়স্ক মহিলা আমার হাতে হলুদ ছুঁইয়ে দিতে দিতে মজা করে বললো,
–সুন্দরী,, জামাইকে আঁচলে বেঁধে রাখিস।নাহলে দেখবি অন্য কেউ বেঁধে ফেলবে।

বয়স্ক মহিলার কথা শুনে মূহুর্তেই আমার হাস্যজ্জল চেহারা আঁধারে ছেয়ে গেলো।মহিলাটা চলে যেতেই সিআইডি অফিসাররা একে একে আমাকে হলুদ মেখে দিলো।সিআইডি অফিসার আবির আমাকে হলুদ মাখিয়ে, মজা করে জুইয়ের গালেও হলুদ লাগিয়ে দেয়।জুই রাগে গজগজ করে আবিরের হাতে থাপ্পড় মারলো।অতঃপর আবিরকে বিরবির করে বকতে বকতে অন্যদিকে গিয়ে দাঁড়াল। আবির ঠোঁট কামড়ে হাসতে হাসতে স্থান ত্যাগ করলো।আবির যতবার আমাদের বাসায় আসে ততবারই জুইয়ের পিছে লাগে।তাই জুই আবিরকে দেখতে পারে না।এদিকে রাকিব ভাইও সবার আড়ালে কবিতা আপুকে হলুদ লাগাতে নিলে, কবিতা আপু হাত ধরে আটকে দেয়।অতঃপর হেসে হেসে হলুদ লাগাতে মানা করে দেয়।

এখানের সব অনুষ্ঠান ফটোশুট শেষ হতে না হতেই আমি উঠে চলে গেলাম পুকুরের ঘাটে।পুকুরের মাঝ বরাবর ডিজাইন করে স্টিক লাইট লাগানো হয়েছে।সেই লাইটের ঝিলমিল আলোতে পুকুরের পানিও সেজে উঠেছে।আমি এখনো বয়স্ক মহিলাটার কথা ভুলতে পারছি না।এলাকার সবাই বলে, এই মহিলার নাকি চোখ লেগে যায়।আমারও বুকের ভেতর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।গলায় কান্না দলা বেঁধে আসছে।সত্যিই যদি মহিলার চোখ আমার জায়ান ভাইয়ের উপর লেগে যায়, তাহলে আমি কি করবো।ভাবতেই চোখ ভিজে আসলো।আমি ঘাটের বেঞ্চিতে বসে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম।

আমাকে খুঁজে না পেয়ে কবিতা আপু চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে।আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না খবরটা জায়ান ভাই শুনতেই, উনার হৃৎস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লো।মনের গহীনে অযাচিত একটা আশঙ্কা নাড়া দিয়ে উঠলো।জায়ান ভাই বুকে হাত রেখে খুব কষ্ট করে একটা ঢুক গিললো।তখনই একজন বলে উঠলো, আমাকে পুকুর পাড়ে দেখেছে।এটা শুনেই জায়ান ভাই ছুটলো।

আমি নাক টেনে টেনে কাঁদছি।আমার মনটা উতলা হয়ে আছে।আমি নিজেকে চাইলেও শান্ত করতে পারছি না।বুকে কিসের এক ভয় চড়ে বসেছে!জায়ান ভাইকে হারানোর ভয়।হঠাৎ পিছন থেকে জায়ান ভাই আমার হাত টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। মনে হচ্ছে এতক্ষণ দম আটকানো ছিলো।আমাকে কাছে পেয়ে যেন বাঁচার আবার স্বাদ জেগেছে। আমি লোকটার বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন শুনতে পারছি।শব্দটা এতটাই অনিয়ন্ত্রিত যে জায়ান ভাইয়ের বুকটা উঠানামা করছে।লোকটার দেহের ঘ্রাণ শুঁকেই বুঝতে পেরেছি এটা আমার শখের পুরুষ। কিন্তু লোকটার হঠাৎ কি হলো??আমি জায়ান ভাইয়ের বুকে মাথা রেখেই সেখানে হাত রাখলাম।কিছু বলতে যাব তখনই জায়ান ভাই কাঁপা কাঁপা কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–কেন এমন ছেলে মানুষী করিস পাখি।আমি তো এখনই মরে যেতে,,,,,

আমি তাড়াতাড়ি জায়ান ভাইয়ের মুখে হাত ধরে উনাকে আর বলতে দিলাম না।আমার জলে টইটম্বুর চোখ দুটো দেখে জায়ান ভাই নিজেকে শান্ত করে নিলো।আমি ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললাম,
–এভাবে বলবেন না আপনি।আমার খুব কষ্ট লাগে।

জায়ান ভাই বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে আমার চোখ দুটো মুছে দিলো।অতঃপর আমার গাল নিজের দু’হাতের মধ্যে রেখে হিসহিসিয়ে বললো,
–তোকে কষ্ট দিতে চাইনা বলেই তো আমার করে নিচ্ছি।তুই তো আমার জান পাখি,আমার কলিজা, আমার শ্বাসপ্রশ্বাস।

আমি নাক টানতে লাগলাম।জায়ান ভাই আমাকে এভাবে কাঁদতে দেখে বললো,”কি হয়েছে আমার জানপাখির?বল আমাকে,তোকে কেউ কিছু বলেছে?

জায়ান ভাইয়ের কথা শুনে আমি আরও আহ্লাদি হয়ে উঠলাম।আমি বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে প্রিয় মানুষটার বুকে কপাল ঠেকালাম। অতঃপর একই সুরে বললাম,❝জায়ান ভাই,আপনি’টা আমি কখনো কাউকে দিব না।❞

আমার বাচ্চাদের মতো কথা শুনে জায়ান ভাই মৃদু হাসলো।আমার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে বললো,❝আমার জারা,আমার বোকা পাখি।এই
আমি’টাকে তোকে লিখে দিচ্ছি তো।এবার সামলে
রাখিস,,,❞


আমাদের খুঁজতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সকলে হাজির হলো পুকুর ঘাটে।আমাকে ঠিক থাকতে দেখে বড়রা নিজেদের কাজে চলে গেলো। কবিতা আপু আমার কাছে ছুটে আসতে নিলে হঠাৎই তার পা থেমে গেলো।এত এত মানুষের ভীড়ে তার চেনা একজন মানুষকে দেখতে পেলো সে।তার ঠোঁট প্রসারিত হলো মূহুর্তের মধ্যে।কবিতা আপু সেদিকে চলে যাবে তার আগেই পিছন থেকে জিয়াদ ডেকে উঠলো,
–আপু সবাইকে নিয়ে ঘাটে বস গিয়ে। এখন আমরা নাচগান করবো।

কবিতা আপু এক মূহুর্তে জন্য জিয়াদের দিকে তাকায়। পরক্ষণে সেই পরিচিত মানুষটার দিকে তাকাতেই দেখলো, মানুষটা উধাও। তবে কবিতা আপু মন খরাপ করলো না।তার ফোনে একটা মেসেজ নোটিফিকেশন আসে।সে ফোনে টাইপিং করতে করতে ঘাটে এসে সবার সাথে বসলো।

জিয়াদ আমার গিটারটা, আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো গান গাইতে।জায়ান ভাইয়ের সামনে জিয়াদের এমন আবদারে, লজ্জায় আমার নাক মুখ লাল হয়ে উঠেছে।জায়ান ভাই না থাকলে কেউ বলার আগেই, গলা ফাটিয়ে গিটারে ভুলভাল সুর তুলে গান ধরতাম।কিন্তু এখন তো আর এটা করা যাবে না।প্রেমিক পুরুষের সামনে নিজের তো একটা প্রেস্টিজ আছে নাকি!আমি জিয়াদকে না করে দিলাম।সকলেই আমাকে জোরাজোরি করতে লাগলো।আমাকে রাজি করাতে না পেরে জায়ান ভাই কে ধরলো।আমি ভেবেছিলাম জায়ান ভাই রাজি হবে না।কিন্তু আমার ভাবনা পাল্টে দিয়ে জায়ান ভাই হাতে গিটার তুলে নিল।অতঃপর আমার হাত ধরে বেঞ্চিতে বসিয়ে সাথে নিজেও বসলো।জায়ান ভাই আমার কোলে গিটার দিয়ে পেছন থেকে আমার সাথে মিশে, আমার হাত ধরে গিটারে সুর তুললো।সবার সামনে এমনটা করায় আমি ভিষণ লজ্জা পেলাম।উপস্থিত ছোট বড় সবাই হইহই করে উঠলো।অবশেষে লাজুক কন্ঠে জায়ান ভাইয়ের সাথে আমিও গাইতে লাগলাম,,,

   ❝ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসাম নাদী কা কিনারা

ইয়ে চাঞ্চাল হাওয়া…………❞

আমাদের গানের তালের সাথে সকলেই দোলতে দোলতে সুর মিলাচ্ছে। জায়ান ভাই পুরোটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।আমিও কিছুক্ষণ পরপর উনার সাথে দৃষ্টি মিলিয়েছি।তবে বেশিক্ষণ সেই মায়াবী চোখের তরে চেয়ে থাকার সাধ্য আমার হয় নি।এত কাছ থেকে লোকটাকে পেয়ে হৃদয়ে উতালপাতাল ঢেউ উঠেছে।নিষিদ্ধ অনুভূতি গুলো বারবার আমাকে জড়িয়ে ধরছে।

আমাদের গান শেষ হতেই সকলে হাততালি দিয়ে প্রশংসায় মেতে উঠলো।তারপর আরও অনেকে গান গাইলো।সবার গান গাওয়া শেষ হলে কবিতা আপু আমাদের কাপল ডান্স করার জন্য বললো।আমি লজ্জায় হা না কিছু বলছি না।মনে মনে চাইছি প্রিয় মানুষটার হাত ধরতে।আমার না বলা কথাগুলো কিভাবে যেন জায়ান ভাই সবসময় বুঝে যায়!!তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত বাড়ালেন। আমি অবাক নয়নে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলেন।এতে আমি মনে ভরসা পেলাম।অতঃপর উনার হাত ধরে দাঁড়ালাম।সকলে খুশিতে হৈচৈ শুরু করেছে।আরিফ আগে থেকেই সবগুলো মূহুর্ত ক্যামেরা বন্দী করছে।আমি জায়ান ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলাম।জায়ান ভাই আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমাকে দেখতে দেখতে গানের তালে আমাকে নিয়ে মৃদু দোলছে।জিয়াদ সাউন্ড বক্সে লাউডলি গান ছেড়েছে,,,,

......সারদি কি রাতো মে 

হাম সোয়ে রাহে এক চাদার মে
হাম দোনো তানহা হো না কই ভি রাহে ইস ঘার মে..
জারা জারা ব্যাহেকতা হে
ম্যাহেকতা হে, আজ তো মেরা তান বাদান
মে প্যায়াসি হো মুঝে ভার লে আপনি বাহো মে….❤️‍🔥

ডান্স করার সময় আমাদের দৃষ্টি একে অপরের দিকে স্থির ছিলো।আমি ভালোবাসার লোকটার চোখের গহীনে ডুবে হাজারো স্বপ্ন দেখে ফেললাম।গান শেষ হওয়ার আগেই বেখেয়ালি ভাবে আমার পা টা মচকে যায়।আমি ব্যথায় আওয়াজ করে উঠলাম।জায়ান ভাই আমাকে নিয়ে উতলা হয়ে উঠলো।কেউ আমার কাছে আসতে আসতেই তিনি আমাকে পাজাকোলে তুলে অন্দরমহলের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলেন। সকলে হা করে আমাদের দিকে তাকিয়ে।আমি লজ্জায় মুচরামুচরি করছি।জায়ান ভাই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আমাকে নিয়ে, আমার রুমে চলে আসলো।অতঃপর আমাকে বিছানায় বসিয়ে আমার পা নিজের উরুর উপর তুলে নিলো।আমি উনার এমন কাজে চেঁচিয়ে উঠলাম,
–এটা কি করছেন, ছি ছি!!গুরুজনের উপর পা তুলতে নেই। আমার পাপ লাগবে।

জায়ান ভাই আমার মচকে যাওয়া পা’টা নাড়াচাড়া করতে করতে প্রতিত্তোর করলো,”বিয়ের পর আরও কত জায়গাতেই তো পা তুলবি,,,,,,”

জায়ান ভাইয়ের হঠাৎ এমন লাগামহীন কথ শুনে দুই কানে হাত ধরে চোখমুখ কুচকে ফেললাম।লজ্জায় মরিমরি অবস্থা।জায়ান ভাই আমার পা নাড়াচাড়া করতে করতে ঠোঁট কামড়ে আড় চোখে আমার দিকে তাকালো।আমি আর লজ্জায় চোখ খুললাম না।জায়ান ভাই আমার পা ছেড়ে আমার উপর ঝুঁকে পড়লো। অতঃপর কানের কাছে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–এই একটা রাতই জারা।কাল থেকে সম্পূর্ণ তুইটা আমার হয়ে যাবি।তোকে আমার ঘরে তুলে, এই অবাধ্য হৃদয়টাকে শান্ত করবো।

জায়ান ভাইয়ের কথাগুলো আমার শরীরে শিহরন জাগিয়ে তুলেছে।আমি কানে রাখা হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।আমার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে জায়ান ভাই বেশ মজা পেল।তিনি আবারও আমার কানে একই ভাবে হিসহিসিয়ে বললো,,

❝আমার হওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু কর পাখি,,,,,,❞

জায়ান ভাই নিজের কথা শেষ করেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।আমি তখনও চোখ খিচকে বসে রইলাম।হৃদয়ে প্রনয়নের জোয়ার ভাটা বইছে।যত সময় পার হচ্ছে ততই আমার অপেক্ষার বাঁধ যেন ভেঙে চলেছে।


চাপুলটেপেক পার্ক, মেক্সিকো সিটি।।।

মধ্যে রাত (বাংলাদেশ সময় তখন দিন)।।সবকিছু অন্ধকারে ডুবে আছে।এদিকে ইফান মেক্সিকো এর চাপুলটেপেক পার্ক স্থানে, তার ব্ল্যাক-ভেনম গ্যাং এর ফোর্সদের নিয়ে মিশনে এসেছে।গত এক মাস ধরে সে তার বাহিনী ছাড়া সকলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।সে ইতো মধ্যে আরও কয়েকটি মিশন সাকসেস করেছে।

ইফানের দেহ কালোতে মুড়ানো। মাথায় হুডির ক্যাপ টেনে রেখেছে। মুখে কালো মাস্ক, চোখে কালো চশমা। কেউ দেখে চিনতে পারবে না__এই রাতের আধারে অশরীরীর মতো দানবাকৃতির মানবটা কে!!ইফান তার ব্ল্যাক মার্সিডিজের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে।সে হাতে রিভলবার নিয়ে সেটা চোখের সামনে নেড়েচেড়ে দেখছে।তার কানে ইয়ার প্যাড গুজা।ইফান যেখানে দাঁড়িয়ে তার বেশ খানিকটা দূরে একটা মিউজিয়াম আছে।সেখানেই আজ লুটপাট চালাবে।তার লোকেরা সেখানে গিয়েছে।ভেনম ফোর্সদের সাথে আছে মাহিন।মিউজিয়ামের বাইরে ইনান আরও কিছু ফোর্স। তারা বাইরের দিক সামলাচ্ছে। সবকিছুই তাদের প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে।হঠাৎই একটা গার্ড ইনানের কানাকানি কিছু একটা বললো।মূহুর্তেই ইনানের চোখে আতংক দেখা দিলো।ইনান আর এক মূহুর্ত সময় ব্যয় করলো না।সে বাইক টেনে নিমিষেই ইফানের গাড়ির কাছে এসে থামলো।

ইফান ইনানকে দেখেই ঠোঁট বাকিয়ে মাস্কের আড়ালে ক্রুর হাসলো।তার ধারণা ইনান মিশন সাকসেসফুল হওয়ার কথাই জানাতে এসেছে।ইফান রিভলবার দেখিয়ে ইশারা করে ইনানকে কাছে ডাকতে ডাকতে ভারী কন্ঠে বললো,
–ইন্দুর, কাম হিয়ার মাই বয়।

ইনানও ইফানের মতো সারা দেহ কালো পোশাকে আবৃত করে রেখেছে। ইনান আড়ালে একটা ভয়ার্থক ঢুক গিলে ইফানের কাছে এসে আমতা আমতা করতে লাগলো।এতে ইফানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।ইনান ভয়ে বলে উঠলো,
–ভাই,ভাবিকে আজ জায়ান ভাই বিয়ে করছে।গতকাল তাদের ধুমধাম করে হলুদ অনুষ্ঠান হয়েছে,,,,,

ইনানের বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই ইফান ইনানের চোয়াল বরাবর পাঞ্চ বসালো।ইনান খেয় হারিয়ে গাড়ির ঢিকির উপর পড়লো।ইফান পেছন থেকে ইনানের ঘার ধরে গাড়ির সাথে আরও চেপে ধরলো।ইনান আতংক নিয়ে বলে উঠলো,
–ভাই আমাদের লোক এই মাত্র আমাকে খবর দিয়েছে। তারা নাকি আগে থেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলো।কিন্তু আমরা নেটওয়ার্কের বাইরে থা,,,,,,,

বাকি কথা না শুনে ইফান ইনানের ঘার ধরে মাথা উপরে তুলে আবার গাড়ির সাথে বারি মারলো।ইনান মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো। ইফানের সারা শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে।সে সেভাবেই হিসহিসিয়ে ইনানের উদ্দেশ্য অশ্রাব্য গালি ছুড়লো,
–চুতমারানির পোয়া। আমার সাথে মশকরা পেয়েছিস।আমার বউকে আরেক বাইনচো*দ ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে করে নিচ্ছে।আর তোরা আমাকে মাত্র বলছিস।

ইফানের চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে ওর কথাগুলো ইনানের শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ইফান আরেক ধফা ইনানকে গাড়ির সাথে বারি মেরে ছেড়ে , নিজের মাথা চেপে ধরলো।সেভাবেই চাপা হুংকার ছাড়লো,
–নীরব্বেয়া কুত্তার বাচ্চা, মাদারচোদ।।তোর লাশ ফেলে দিব বেইমান, যদি আামর বউকে আমার করে না পাই।আ’ম কামিং,,,,,,,

নিজের কথা শেষ করে আবারো চাপা হুংকার ছুড়লো।ইফান আর সময় নষ্ট না করে গাড়িতে উঠতে লাগলো। পেছন থেকে ইনান ভয়ে ভয়ে বললো,
–ভাই আপনি চলে গেলে আমাদের মিশন,,,,,,

ইফান ফের ইনানকে থামিয়ে দিলো।অতঃপর চোয়াল শক্ত করেই ভারী কন্ঠে উত্তর করলো,
–আমার কোনো মিশন আজ পর্যন্ত ফেল হয়নি।আর আমার অনুপস্থিতিতে তুই আর মাহিনই সব সামলানোর জন্য যথেষ্ট।

ইফান আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না।তার মার্সিডিজ টি পলেকে ইনানের চোখের আড়াল হয়ে গেলো।ইফানের হাতে সময় অনেক কম।মেক্সিকো থেকে বাংলাদেশ আসতে কমপক্ষে বারো-তেরো ঘন্টা লাগবে।ইফানের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। মস্তিষ্ক শুধু একটা কথায় বলছে,

❝আমার বুলবুলিকে চাই।যে কোনো মূল্যে চাই।প্রয়োজন হলে পুরো বাংলাদেশ এখান থেকে বসে জ্বালিয়ে দিবো।তবুও ওর ভাগ আমি কাউকে দিব না।❞

ইফান কানের ইয়ার প্যাড চেপে তার লোককে বললো,”ইমার্জেন্সি বাংলাদেশ ফিরছি। সব রেডি কর।”

ওপাশ থেকে গার্ড বললো,”জি বস, ফ্লাইট রেডি আছে।”

ইফান গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,”হুম, আমি আসছি।”

ইফান কানের ইয়ার প্যাডটা ছুড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিলো।অতঃপর ফুল স্পিডে ড্রাইভিং করতে করতে চোয়াল শক্ত করে বিরবির করলো,
–শালি বেয়াদব।একবার দেশে আসি।তোর বিয়ে করার করকুরানি পিছন দিয়ে ভরে দিব।


নভেম্বরের ২৭ তারিখ,শুক্রবার……||

বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা। আমি বধু সেজে বিছানার মাঝখানে বসে আছি।আজ আমার স্বপ্ন পূরনের দিন।আজ আমার ভালোবাসার মানুষটার জন্য বউ সেজেছি। আমার দেহ মুড়িয়ে আছে লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা দিয়ে।শরীরে ভারী সোনার অলংকার।আমার বিয়ের সকল কিছুই জায়ান ভাই নিজে পছন্দ করে কিনেছে।আমাকে যে দেখছে সেই জায়ান ভাইয়ের পছন্দের প্রসংশা না করে পারেনি।অনেকে বলেছে, “যে এমন পরীর মতো মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করেছে,তার বাকি পছন্দগুলেও তো এমনই হবে।”

সকল মেহমানদের খাওয়ানো শেষ। জায়ান ভাই নিজে স্টেজ ঘুরে ঘুরে সকল অতিথিদের খোঁজ খবর নিয়েছে।বিয়ের জামাই অতিথিদের এভাবে খুঁজ নিতে দেখে, সকলে অনেক মজা করেছে জায়ান ভাইকে নিয়ে। আবার অনেক প্রসংশাও করেছে।

দুপুর গড়িয়ে ঘড়ির কাটা বিকেল চারটা বিশের ঘরে।যে অতিথিগুলো চলে যাওয়ার কথা, তারা খেয়ে আমাকে উপহার দিয়ে চলে গেছে।আর যারা থাকার তারা এখনো আছে।প্রতিবেশী স্বজনরা কাল থেকে এই বাড়িতেই বেশি সময় পার করছে।

জিতু ভাইয়া কাজী সাহেবকে আমার রুমে নিয়ে এলো।এখানে সকল মহিলারা আছে।উনাদের সামনে কাজী দোয়া পড়লো।অতঃপর আমাকে কবুল বলতে বললো।বুকটা কেমন যেন ধুকপুক করছে।অধিক আনন্দে আমি কথা বলা ভুলে গেছি। আমার চোখ দুটো মূহুর্তে জলে টইটম্বুর হয়ে গেলো।জিতু ভাইয়া আমাকে বললো তাড়াতাড়ি কবুল বলতে।ফোনের ওপাশে জায়ান ভাই অপেক্ষা করছে।আমি তবুও কোনো কথা বলতে পারছি না।ফোনের ওপাশ থেকে জায়ান ভাই অস্থির হয়ে আছে।আমাকে কবুল বলতে না শুনে উনার গলা শুকিয়ে আসছে।উপস্থিত কাজী সহ সকলে আমাকে বারবার কবুল বলতে বলছে।আমি বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে, চোখ বন্ধ করে আলহামদুলিল্লাহ বলে, তিনবার কবুল বললাম।পরপরই হুহু করে কেঁদে দিলাম।সকলে আলহামদুলিল্লাহ বলছে,আমার কবুল বলতে শুনে। ফোনের ওপাশ থেকেও জায়ান ভাই সহ সকলে আলহামদুলিল্লাহ বললো।জায়ান ভাই যখন একটু স্বস্তি পেলো তখনই উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট জায়ান ভাইয়ের কানে কানে বললো,
–স্যার আমরা যা জানতে পেরেছি সেটা সিআইডি কে জানিয়ে দেওয়া দরকার। ওরা যদি জানতে পারে আমরা ওদের ওয়েবসাইট হ্যাক করে সকল তথ্য সরিয়ে দিয়েছি,তাহলে আমাদের জন্য মারাত্মক রিস্ক হয়ে যাবে।

শুভ কাজের মধ্যে এমন কথায় জায়ন ভাই চোখ পাকালো।অতঃপর ইশারায় বললো,এখনই আসল সময় নয় সবটা প্রকাশ্যে আনার।

কাজী সাহেব আমার দিক সম্পূর্ণ করে, জায়ান ভাইয়ের কাছে গেলো।সেখানে সকল পুরুষ বসে আছে।কাজী সাহেব দোয়া পাঠ শেষ করে,জায়ান ভাইকে বললো কবুল বলতে।জায়ান ভাইয়ও থমকে গেলো।আজ এত বড় প্রাপ্তি তার সহ্য হবে তো!!জায়ান ভাই মনের মধ্যে হাজারো কথোপকথন করে একটা ঢুক গিললো।অতঃপর কবুল বলতে যাবে তখনই ফোন বেজে উঠলো।মূহুর্তেই পরিবেশটা পাল্টে গেলো।সবাই একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে।জায়ান ভাই সবে কবুলের ক উচ্চারণ করেছিলো।তখনই ফোন বেজে উঠেছে। জিতু ভাইয়া ইশারা করলো তাড়াতাড়ি দেখতে কে কল করেছে। ইম্পর্ট্যান্ট কলও হতে পারে।যেহেতু আইনের লোক।জায়ান ভাইয়া ফোন চোখের সামনে ধরতেই দেখলো আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে।তিনি আর কিছু না ভেবে কল রিসিভ করে কানে ধরলো।অতঃপর ফোনের ওপাশ থেকে কলদাতা কিছু একটা বলতেই,জায়ান ভাইয়ের চোখ প্রসারিত হয়ে গেলো।হঠাৎই তিনি বুকের বা পাশে হাত রেখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,

–হোয়াট????এটা কি করে হতে পারে?না না না, এটা কিছুতেই হতে পারে না!!

জিতু ভাইয়া সহ সকলেই জায়ান ভাইয়ের আচরণে অবাক।জিতু ভাইয়া কিছু জিগ্যেস করার আগেই, জায়ান ভাই জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
–সবাই একটু ওয়াইট কর। আমি এক্ষুনি আসছি।

জায়ান ভাই পাগলের মতো ছুটে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।সকলেই অবাক নয়নে জায়ান ভাইয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে।


জায়ান ভাইয়ের পা থেকে মাঠি যেন সরে গেছে। ঠিক মতো হাঁটতে পারছে না।বারবার খুব কষ্ট করে ঢুক গিলছে।মনে হচ্ছে গলায় বারংবার কান্না আটকে আসছে।উনি কানে ফোনটা ধরে রেখেই বাড়ির ছাঁদের দিকে ছুটছে।বাম হাতটা এখনো বুকের বাম পাশে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে।হয়তো হাতটা সরালেই সেখানে স-যত্নে বন্দি থাকা প্রিয় পাখিটা উড়ে পালাবে।

জায়ান ভাইয়ের পা এসে থামলো বাড়ির ছাঁদে।প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়ে বুক বারবার উঠানামা করছে।হৃৎস্পন্দন এতটাই ফাস্ট যে, আশেপাশে থাকলে যে কেউ তার ধুকপুক আওয়াজ শুনতে পাবে।

জায়ান ভাই আগের ন্যায় কানে ফোন, বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে চাতক পাখির ন্যায় আসেপাশে কাউকে খুঁজতে লাগলো।হঠাৎই চোখ আটকালো আমাদের বাড়ি থেকে সাতটা বিল্ডিং পড়ে,নতুন একটা দালানের ছাঁদে।বিল্ডিংটায় এখনো প্লাস্টারের কাজ চলছে।সেখানে রেলিং এ এক পা রেখে দু হাতে রিভলবারটা চেপে ধরে, তা জায়ান ভাইয়ের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে আছে ইফান চৌধুরী।

ইফানকে দেখা মাত্রই বুকে ধরে রাখা হাতটা সরিয়ে নিলো জায়ান ভাই। তার চোখ দুটো যেন বিশ্বাস করতে চাইছে না,এটা আসলেই ইফান।জায়ান ভাইকে এভাবে দেখে ইফান ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হাসলো।

চলবে,,,,,,,,,,,

(আজ ৪৫ পর্বের শেষাংশ দেওয়ার কথা ছিলো।কিন্তু এক পর্বে সবটা শেষ করতে পারি নি।তাড়াহুড়ো করলে গল্পের ধারাবাহিকতায় নষ্ট হয়ে যায়।এমনিতেই এত স্কিপ করে লেখছি।তাই আগের পর্বটা ইডিট করে ৪৫ রেখেছি।আর আজ ৪৬ দিয়েছি।আগামী কাল পরশু ৪৭ পর্ব দিয়ে প্রথম খন্ড শেষ করবো ইনশাআল্লাহ।আর তোমরা যা ভাববে আশা করি আমি তার থেকে আলাদা কিছু লিখবো।তাই আগামী পর্বের জন্য অপেক্ষা কর। আর হ্যা বানান ভুল নিয়ে অনেকে অনেক কথা শুনায়।তাদেরকে বলছি,আমি রিচেক করার সময় পাই না।আমি খুব অল্প সময় নিয়ে অনেক বড় পর্ব লিখি।তাই সময় হয় না। পরো গল্প টা শেষ হলে এক সাথে সব ভুল সংশোধন করার চেষ্টা করবো।তবে এখন আমার হাতে একদমই সময় নেই। খুব কষ্টে সময় ম্যানেজ করে গল্প লিখছি।হ্যাপি রিডিং 🥹💞)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply