Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ২১+২২


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :২১
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

গভীর রাত, সমস্ত ধরণী অন্ধকারে তলিয়ে আছে। আমি অটো ভারা মিটিয়ে রাস্তার পাশে দাড়ালাম। স্ট্রিট লাইটের হলদে আলোয় স্পষ্ট দৃশ্যমান গেইটের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আমি সেই দিকটায় বেশ কিছুক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলাম। অতঃপর গেইটের ভেতরে প্রবেশ করলাম। হাসপাতালের প্রতিটি ইউনিটের কোণায় কোণায় লাইট জ্বালানো। মানুষ এখান থেকে ওখানে ছোটাছুটি করছে। আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে কালো বোরকার উপর পড়া কালো হিজাব ওড়নাটা দিয়ে মুখটা আরেকটু আড়াল করে নিলাম।

হাসপাতালের নতুন ভবনের দোতলার ২০৫ নাম্বার রুমে I CU তে ভর্তি ইফান চৌধুরী। কক্ষের সামনে চেয়ারে বসে আছে নাবিলা চৌধুরী,নুলক চৌধুরী আর ইমরান। বাকিরা হয়তো হাসপাতালের বিভিন্ন ফর্মালিটি নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে ক্লান্ত হয়ে তিনজনই ঝিমাচ্ছে। আমি সেই সুযোগটায় ব্যবহার করে তাড়াতাড়ি I CU কেবিনে ঢুকে পড়লাম। আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে সামনে তাকাতেই চোখ পড়লো হসপিটাল বেডে অচেতন পরে থাকা ইফান চৌধুরীর উপর। ইফানকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রধান করা হচ্ছে। সময়ের স্বল্পতার কারণে দেশের বাইরে নেওয়া সম্ভব হয় নি। পুরো ICU কেবিন অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরপুর। ইফানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক,দু হাতে ক্যানুলা লাগানো এখনো শরীরে রক্ত আর সেলাইন চলছে। ইফানকে এই অবস্থায় দেখে ভীষণ শান্তি লাগছে। কিন্তু এখানে বেশি দেরি করা যাবে না। কিছুক্ষণ পর পর কেবিনে ডক্টর আর নার্স আসা যাওয়া করছে। তাই আমাকে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমি এগিয়ে গেলাম বেডের কাছে। আস্তে করে ওর অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দিলাম। সাথে সাথেই ওর শ্বাসকষ্ট ভেসে উঠলো। পরক্ষনেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় তার বুক উঠানামা শুরু করেছে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লাইফ‑সাপোর্ট যন্ত্রগুলোর মনিটরের দিকে তাকালাম। প্রত্যেকটি স্কিনেই গ্রাফ স্পন্দন খুব ফাস্ট চলা শুরু করেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্পন্দনগুলো ধীরে ধীরে একেবারে স্থির হয়ে যায়। আমি আবার তাড়াতাড়ি তাকালাম ইফানের দিকে। না সে আর মুভ করছে না। আর শ্বাস নেওয়ার বৃথা প্রয়াস চালাচ্ছে না। অবশেষে পৃথিবীর বুক থেকে মুচে দিলাম ইফান চৌধুরী নামক এক পাপিষ্ঠ পুরুষ কে।

আমি ইফানের মুখের উপর কিছুটা ঝুকে পড়লাম। মনযোগ দিয়ে তাকে দেখতে লাগলাম। আজ আমার এতদিনের সাধনা পূরণ হয়েছে। আমি ইফানকে শেষ বারের মতো বিদায় দিয়ে কিছু বলতে যাব ঠিক তখনি দরজায় খুব জুড়ে জুড়ে করাঘাত হতে থাকে। বাইরে থেকে ভিষণ চেঁচামেচি করছে। আমার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আবার মিলিয়ে যায়। সবাই তো চলে এসেছে এখন আমি কিভবাে কেবিন থেকে বেরিয়ে যাব। এসব ভাবতে ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি চটপট করতে করতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম। না তবুও ভিষণ কষ্ট হচ্ছে। তখনই আমি আচমকা শুয়া থেকে উঠে বসে পড়লাম। কেমন যেন বুকের ভেতর ধকধক করছে। অন্ধকার রুম,টিকটিক শব্দ করে ঘড়ির কাঁটা ১টা বেজে ২৫ এর ঘরে এসেছে। আমি বুকে হাত রেখে হাঁপিয়ে চলেছি। দিন দুনিয়ার কোনো কিছুই এই মূহুর্তে আমার মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারছে না। বেশ কিছুক্ষণ পর বাস্তবতায় ফিরলাম। হাঁপাতে হাঁপাতেই এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো আলগোছে কানে গোজে অস্পষ্টভাবে বিরবির করলাম,
–“এটা বাস্তব না? আমি কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম!”


তখনই দরজায় একাধারে হওয়া করাঘাতের শব্দ কানে পৌঁছায়। দরজার বাইরে থেকে পলি আর ইতির কোন্দনরত গলা ভেসে আসছে। দুজনেই বারবার বলে যাচ্ছে,
–“জাহানারা ভাবি তাড়াতাড়ি দরজা খোল সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

–“বড় ভাবি বের হও। আল্লাহ গো আমার ভাইরে বাঁচাও,,,,,,”

ওদের অস্বাভাবিক ডাকাডাকি শুনে আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না। এক ছুটে রুমের লাইট অন করে দরজা খুলে দিলাম। সাথে সাথেই আমার বুকে হামলে পড়লো ইতি। পলি আচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফুুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। ইতি জোরে জোরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে শুধু এইটুকুই বলছে,
–“ভাবি ভাইয়া…..আ..আমার ভাইয়া…”

অতিরিক্ত কাঁদার ফলে কিছু বলতেও পারছে না মেয়েটা। আমারও ভিষণ টেনশন হতে লাগলো কি হয়েছে? আমি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে পলির দিকে তাকালাম। সেও বলার মতো অবস্থায় নেই।

–“আরে তোমরা এভাবে কাঁদছ কেন? কি হয়েছে বলবে তো না কি?”

–“ভা ভাইয়া…”

আবার হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে এইটুকু বললো ইতি। তবে ভাইয়া কথাটা শুনেই সন্ধ্যার কথাটা মাথায় চলে আসে। ইমরান অনেক চিন্তিত হয়ে বাসা থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। আচ্ছা ছেলেটার আবার কিছু হয়নি তো? ভেবেই চিন্তিত হয়ে পলির দিকে তাকিয়ে তাকে জিগ্যেস করলাম,
–“ইমরানের কি কিছু হয়েছে পলি?”

ঐদিক থেকে পলির আওয়াজ আসতে পারলো না। তার আগেই নিচ থেকে সোরগোল কানে আসে। আমি ওদের দু’জনকে রেখেই ঝটপট নিচে নামলাম। এসেই দেখি ইকবাল চৌধুরী ও ইরহাম চৌধুরী বাসা থেকে বেড়িয়ে গেল। অনেকটাই দৌড়াতে দৌড়াতে। এদিকে কাকিয়া মনিরা বেগম আর দাদি রোকেয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে ভাসাচ্ছে। এরই মাঝে নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরীও রেডি হয়ে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে এসেছে। হঠাৎ করেই দাদি আমাকে দেখতে পান সিঁড়ির কাছে। তৎক্ষণাৎ ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বিলাপ জুড়ে দিয়েছে।

–“নাত বউরে, তর কি হইবো রে বইন? আমার নাতির যে আল্লাহর ডাক পড়সে। আল্লাহ আল্লাহ গো আমার নাতির জান ভিক্ষা দেও গো…”

দাদির বিলাপে এবার সামিল হলো কাকিয়া। তিনিও ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো,
–“আল্লাগো এই বয়সে এতটুকু মেয়েটারে বিধবা বানিও না গো আল্লাহ। জাহানারা মা রে এভাবে চুপ করে থেকো না মা। এতে মনের উপর আরও চাপ পড়বে। একটু কেঁদে আল্লাহ কে ডাক মা। স্ত্রীর দোয়া আল্লাহ বেশি কবুল করে।”

আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। তবুও যতটুকু বুঝলাম ইফান চৌধুরীর সাথে কিছু একটা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেলো একটু আগের স্বপ্নের কথা। তখন তো আমি ইফানকে খা’রাপ অবস্থায় দেখেছি। আচ্ছা তার সাথে সত্যিই খা’রাপ কোনো কিছু হয়নি তো। এটুকু ভাবতেই আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। এতো ভালো একটা নিউজ পেলাম আল্লাহ কে ধন্যবাদ জানাবো না? অবশ্যই জানাবো। তাই মৃদু স্বরে বলে উঠলাম,
–“আলহামদুলিল্লাহ।”

তারপর সামনে তাকাতেই চোখ পড়লো নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরীর তীক্ষ্ণ চাউনিতে। উনারা তড়িঘড়ি করে চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু দাদি আর কাকিয়ার ডাকে আমাকে লক্ষ করেই থেমে যায়। তখন থেকে একইভাবে দুজন এভাবে তাকিয়ে আছে। আশ্চর্য বিষয়, আমি এখনো কিছু বুঝতেই পারলাম না কি হয়েছে? আর উনারা আমাকে এমন সুক্ষ্ম নজরে দেখছে। আচ্ছা উনারা কি ভাবছেন যা হয়েছে তার জন্য আমিই দায়ি? এসব ভাবনার মাঝে মনে আরেকটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। এই যে, “দাদা, কাকিয়া, পলি এবং ছোট্ট ইতিও কাঁদছে ইফানের জন্য। অথচ নাবিলা চৌধুরীর চোখে অশ্রু কণার ছিটেফোটাও নেই। কি সাংঘাতিক মহিলা ছেলের জন্যও নিজের চিরচেনা সত্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।”

এরই মাঝে গটগট করে সদর দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন নাবিলা চৌধুরী। উনার অ্যাটিটিউড দেখে আমি চোখ উল্টে আরেক পাশে তাকাতেই চোখ আটকালো নুলক চৌধুরীর দিকে। তিনি এখনো আমার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে আছে। উনার ক্ষেত্রেও একই ব্যপার। আগের ন্যয় অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। উনি কি ভাবেন আমি উনার এমন দৃষ্টিকে ভয় পাই?

❝Fuck her thoughts, হাহ্।❞

মনে মনে অ’শ্রাব্য এক গা’লি দিয়ে আমিও একই ভাবে উনার চোখে চোখ রাখলাম। আমাদের দুজনের সাথে যেন স্নায়ু যুদ্ধ চলছে। অথচ আমাদের দু’জনের মধ্যে কউই জানতে পারলাম না, আমাদের অগোচরে কোনো একটি সুপরিচিত মুখে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠেছে।
__

নুলক চৌধুরীও এবার তারাহুরো করে বেড়িয়ে গেলন। এদিকে বাড়ির সবাই আমাকে ঘিরে মরা কান্না জুড়েছে। আমি এত তাড়াতাড়ি কখনো ঘুমিয়ে পড়ি না। যেহেতু গত রাতে এত চাপ গেছে। তারপর সারাদিন শরীরও জ্বরে হালকা গরম ছিলো। তাই ক্লান্তিতে ১১টার দিকেই চোখ লেগে গিয়েছিল। আর আজই এত ভয়ানক স্বপ্ন দেখলাম।

সবাই মিলে আমাকে সবটা জানালো কিছুক্ষণ আগে ইফানের অনেক বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। এখন নাকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে আছে। ইফানের জন্য বিন্দু মাত্রও কষ্ট অনুভব হচ্ছে না। তখনই মনের একটা কোণ থেকে কেউ বলে উঠলো,
–“সে যেমনই মানুষ হোক তোমার স্বামী…”

এই টুকু বললো কি বললো না, তার মধ্যেই মনের আরেক প্রান্ত থেকে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,
–“সাবধান জাহানারা। স্বামী তো দূর ওকে মানুষ মনে করলেও তোমার শিক্ষায় বাধবে। ও নিকৃষ্ট, জানোয়ার,খুনী, রেপি*স্ট। ওকে তুমি এই জীবনে কখনোই ক্ষমা করবে না।”

মনের বাকন্দিতায় যখন বুদ হয়ে আছি তখনই কানে এসে বাড়ি খায় একটা অস্বাভাবিক শব্দ। আমি সেই শব্দকে অনুসরণ করে বাম দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম সোফার এক কোণে বসে আছে নোহা। তার হাতে অ্যাপেল কোম্পানির iphone সিক্সটিন প্রোম্যাক্স। তবে ব্যাক কাভারে কোন বেডার জিম করা পেশিবহুল উদলা পিক। সেটাও বড় কথা না। মেয়েটা এমন আশ্চর্য রকমের আওয়াজ করছে কেন? আমি গিয়ে ওর সামনে দাড়ালাম। চোখ ছোট ছোট করে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম,
–“কি সমস্যা? এরকম অদ্ভুত আওয়াজ করছ কেন?”

আমার গলা শুনে চোখ উপরে তুললো। নাকে একটা টিস্যু গুজে ফোনে নিজেকে ভালোভাবে দেখে ক্লিক করে একটা সেলফি তুলে নিলো। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে আবার নাক টেনে টেনে গলা থেকে ঐ অদ্ভুত শব্দ বের করলো।

–“ই ই ই।”

বিরক্তি তে মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় শব্দ বেরিয়ে আসলো,
–“এই মেয়ে মুখ দিয়ে এরকম উদ্ভট আওয়াজ বের করছ কেন?”

আমার কথা শুনে আবার একই ভাবে আওয়াজ বের করলো নোহা। অতঃপর নেকামি স্বরে উত্তর দিলো,
–“আমার বেইবিটা হসপিটালে ভর্তি তাই অনেক কান্না পাচ্ছে।”

এবার এমন শব্দের কারণ বুঝতে পেরে নাক ছিটকে বলে উঠলাম,
–“আর আমি ভেবেছিলাম কষা হয়েছে। তাই এমন করে কু*তাচ্ছ।”

আমার কাথা মেয়েটা শুনলো কি শুনলো না কি জানি? সে আবার মনযোগ দিয়ে ঐরকম শব্দ বের করতে করতে নাকের টিস্যু টা চেইঞ্জ করে আরেকট নিয়েছে। আবার নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তো সেলফি তুলছে। আমি যা বুঝার বুঝে গেলাম। নিশ্চয়ই এর মাথায় গন্ডগোল আছে। না হলে নিজের মায়ের পেটের ভাই হাসপাতালে দম যায় যায় অবস্থা। আর সে এসব করছে। আমার আর ভালো লাগছে না। এদিকে বাড়িতে যারা থেকে গেছে তারা বিলাপ করে কেঁদে ভাসাচ্ছে। তাই আর এখানে এক দন্ড থাকতে ইচ্ছে হলো না। আবার সিঁড়ির উদ্দেশ্য পা বাড়াবো তখনই নোহার নেকামি কন্ঠ কানে আসে।

–“প্রিটি গার্ল আমার ভিষণ কষ্ট লাগছে। এই মূহুর্তে ভালো সেড সং শুনলে মন ভালো হয়ে যাবে। কয়েকটি সেড সংয়ের নেইম বল তো।”

এই মেয়ে টা কি লেভেলের বোকাচোদা ভাবতে পারছেন? অন্তত আমি ভাবতে পারছি না। তাই চোয়াল শক্ত করে দাঁত দাঁত চেপে প্রতিত্তোর করলাম,
–“তোমার দুঃখ কমাতে নারগিচ আপার গানই বেস্ট।”

আমি আর কোনো দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলাম না। আর সোজা উপরে যাওয়া ধরলাম। আমি নিজের রুমে যেতে যেতে শুনতে পেলাম নোহা ই ই আওয়াজে নাক টেনে কান্না করে নারগিচ আপার বেগুনওয়ালা গানটা শুনছে।


–“Goodbye. My Dear ফা*কিং বুলবুলি।”

ইফানকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ডোর ক্লোজ করার সাথে সাথেই তার বাক্যটাও শেষ হলো। এতক্ষণের নিভু নিভু চোখগুলো তার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এম্বুলেন্সের ভেতরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা আরম্ভ করে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেওয়া হয়। ডক্টর তার পালস চেক করতে থাকেন বার বার। কারণ সময়ের সাথে সাথে র’ক্ত চলাচল ও হৃৎস্পন্দন কমতে থাকে। ইতোমধ্যে চৌধুরী বাড়িতে খবর চলে গেছে। তাই ডক্টররা ইফানকে যথাসম্ভব প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হসপিটালের ICU তে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার নিদারুণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে ততই ডাক্তারদের মুখ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তারা ভিষণ শঙ্কিত আধও কি ইফান চৌধুরীর বন্ধ চোখগুলো আবারও খুলে পৃথিবীর আলো দেখতে পারবে কিনা? নাকি এই পাপিষ্ঠ পুরুষ অকালে ঝরে পড়বে পৃথিবীর বুক থেকে?
__

দশমিনিট আগে ইফান আর পঙ্কজ কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ICU অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়।তবে ড্রাইভার ফারুক কে হসপিটালে আনার পথেয় সে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে। চৌধুরী বাড়ির কর্তা কর্তৃরা হসপিটালে পৌঁছেছে আরও বিশ মিনিট পর। কারণ উত্তরা থেকে মেডিকেল হসপিটাল বেশ কিছু টা দূরে। তারা সকলে ICU অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা করছে।পুরো দের ঘন্টার পর অপারেশন থিয়েটার থেকে বেড়িয়ে আসে একজন ডক্টর। উনাকে দেখেই সকলে এগিয়ে উদগীব হয়ে জানতে চায় ইফানের অবস্থা।ডাক্তারের মুখ আরও অন্ধকার হয়ে যায়। তবুও তিনি ইকবাল চৌধুরীর সামনে দাড়িয়ে জানালেন,
–“স্যার পেসেন্টের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। তবে যতটুকু দেখে এসেছিলাম মি. পঙ্কজকে তাতে বুঝা গিয়েছে বডিতে অনেক আ’ঘাত পেয়েছে। কিন্তু মি. ইফান চৌধুরীর বডিতে তেমন অ’ঘাত না লাগলেও মাথায় প্রচুর আ’ঘাত পেয়েছে। এখনো পুরোপুরি র’ক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সক্ষম হইনি আমরা। আমাদের আরও কিছু সময় দিতে হবে। তবে এইটুকু বলে রাখবো সকল পরিস্থিতির জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকবেন।

ডাক্তার দ্রুত কথা বলেই আবার অপারেশন থিয়েটার কেবিনে ঢুকে পড়ল। এদিকে সকলেই ভেঙে পড়েছে। এই যে নাবিলা চৌধুরী এতক্ষণ এতটা শক্ত ছিলেন। আর এখন ডাক্তারের শেষ কথা শুনার পর পরই চোখ দিয়ে একফোটা নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে।


নিশুতি রাত, ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে ৩টা বেজে ৪৭ মিনিটে পৌছেছে। যখন থেকে জানতে পারলাম ইফানের এ’ক্সিডেন্ট হয়েছে তখন থেকেই রুমে পায়চারী করে যাচ্ছি।মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না এটা কি আসলে এক্সিডেন্ট নাকি প্ল্যান। ভাবনার ইতি টানলাম ফোনের কর্কষ আওয়াজে। তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করে বেলকনিতে চলে আসলাম।

–“হ্যালো! কি খবর?”

ঐপাশের ব্যক্তি আমাকে বেশ কিছু সময় একনাগাড়ে বলে গেল যা আমি ছাড়া কাকপক্ষীও শুনতে পাইনি। কিন্তু অপর প্রান্তের কথা শুনে আমার চেহারায় চিন্তার ভাজ পড়ে। আমি আনমনেই ফোনকলের ঐ পাশের ব্যক্তির উদ্দেশ্য বললাম,
–“প্ল্যানে এ’ক্সিডেন্ট তো ছিলো না। তাহলে কিভাবে হলো এটা?”

আমি বলতে বলতেই পিছনে ঘুরি। তখনই দেখতে পাই রুমের দরজার ওপাশ থেকে একটি ছায়া সরে গেছে। অদ্ভুত লাগে এই বিষয় টা। বিয়ে করে আসার পর থেকেই আমার সাথে এমনটা হচ্ছে। যখন মনে হয় কেউ একজন আছে তখনই তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলে দেখি কেউ নেই। রুমের আশপাশ একদমই শূন্য। আজ খুব ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেলাম। তারপরই আচমকা দরজা খোলে যাকে দেখলাম তাকে কখনো কল্পনায় করি নি। তারমানে এতদিন বাড়ির কাজের মেয়ে লতা কান পেতে দাড়িয়ে থাকতো। আমাকে থা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লতা চোখের পানি মুচে কান্না জড়িত গলায় বললো,
–“জাহানারা আপা নিচ থেকে আমাকে পাঠিয়েছে বড় আম্মা। হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে ইফান দাদাবাবুর অবস্থা বেশি বালা না।ঐ অপেরেশন ঘর আইশুতে আছে।”

লতার কথায় কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উত্তর করি,
–“ঐটা অপারেশন আর আইসিইউ হবে।”

লতার কথায় আমি ভুল ধরায় কিছুটা ল’জ্জা পেল।
–“আইচ্ছা আপা আমি তাইলে যাই।”

–“কখন থেকে আমার রুমের সামনে দাড়িয়ে ছিলে?”

লতা যখন চলে যাচ্ছিল তখনই আমি প্রশ্ন ছুড়লাম। সে আবার পিছন ফিরে চোখ মুচতে মুচতে বললো,
–“এইতো আপা আপনিও দরজা খুলসেন আমিও এসে থামলাম রুমের সামনে। কিন্তু ডাক দেওয়ার আগেই আপনি দরজা খুলে দিসেন।”

আমি ওর কথায় হালকা ঠোঁট প্রসারিত করে স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলাম,
–“লতা তুমি এখানে আসার আগে আশেপাশে কাউকে দেখছ?”

লতা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললো,
–“উমমম না তো আপা। হগ্গলেই তো ডয়িং রুমে বয়া আছে।”

–“ঠিক আছে তুমি যাও।”

লতা মাথা নাড়িয়ে চলেই যাচ্ছিল তখনই আমি আবার পিছু ডাকলাম,
–“আ ঐটা ডয়িং রুম নয় ড্রয়িং রুম হবে।”

লতা কান্নার মধ্যেই দাঁত কেলিয়ে দিলো। ল’জ্জায় তার কান দিয়ে ধোঁয়া ছুটছে। সে আর এখানে দাঁড়ালো না তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে গেলো। আমি তার যাওয়ার পানে চেয়ে। মেয়েটার বয়স আর কত হবে এই ২৮ কি ২৯। দারিদ্র্যতার কারণে অল্প বয়সে মা বাবা বিয়ে দিয়ে দেয়। আর বিয়ের পরেও সুখ হয় নি। জামাই জুয়া*খেলে সব অর্থ নষ্ট করে দিয়েছে। তারপর প্রতিদিন রাতে মদ খেয়ে বাড়িতে এসে লতা কে মা’রধর করতো। কয়েক বছর সংসার করার পর জন্ম নেয় একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান। মেয়ে হওয়ায় লতাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তার জামাই। তারপর আশ্রয় নেয় তার মায়ের কাছে। বাবার বাড়ি অবস্থা ভালো না হওয়ায় ভাই বউরা উঠতে বসতে খোটা দিতো। সেই জ্বালায় বৃদ্ধা মার কাছে পাঁচ বছরের মেয়ে কে রেখে দিনের পর দিন এই বাড়িতে কাজ করে চলছে।

এইসব ভেবেই ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রুমে ডুকে আবার দরজা লাগিয়ে দিলাম। আমার কাছে এই চৌধুরী বাড়িটাকে অশরীরীর মতোই লাগে। যত তারাতাড়ি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে হয়তো ততই আমার জন্য মঙ্গল।

চলবে,,,

জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :২২
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

আজ আকাশের চাঁদটা কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। আমি সেই কখন থেকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সেদিকেই তাকিয়ে আছি। বাড়ির ভেতরে এসি আছে তাই কখনো গরম অনুভব হয় না। কিন্তু আজকাল বাইরে ভিষণ রকমের গরম পড়েছে। আজ আবার বাইরে বাতাসও বইছে না। তারপরও এখানে গরমের মধ্যে দাড়িয়ে আছি। এই স্থানটা আমার খুব পছন্দের হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি রেলিং এ হাত রেখে সুদূরে তাকিয়ে আনমনে ভাবতে লাগলাম।দেখতে দেখতে কিভাবে ছয়দিন পেরিয়ে গেল। তিনদিন আগে ইফান চৌধুরীর জ্ঞান ফিরেছে।এই নিয়েও এক লম্বা কাহিনি ঘটেছে। পঙ্কজের বাম পা আর ডান হাত ভেঙে গেছে। মাথায় হালকা একটু চোট পেলেও তেমন আ’ঘাত লাগেনি। তাকে ব্যান্ডেজ, প্লাস্টার করে তিনদিন পরেই হাসপাতাল থেকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে নুলক চৌধুরীর কথায়। তিনি নাকি বাসায় ছেলের বাকি ট্রিটমেন্ট দিবেন। পঙ্কজের গাড়ি যখন উত্তরা প্রবেশ করে তক্ষুনি নুলক চৌধুরীর কাছে নাবিলা চৌধুরীর কল আসে। তিনি বলেন এক্ষুনি পঙ্কজ কে নিয়ে হসপিটালে ব্যাক করতে। কিন্তু কেন বেক করতে বলেছে তা বুঝে উঠতে পারেন নি। হয়তো ইমারজেন্সি কিছু হয়েছে তাই। তিনি কথা অনুযায়ী হাসপাতালে বেক করলেন।সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন ইফানের কথায় উনাদের এখানে আনা হয়েছে।

৭২ ঘন্টা পেরিয়ে যায় তবুও ইফানের জ্ঞান ফিরে নি।নাবিলা চৌধুরী তখন ছেলের সাথে ICU তে দেখা করতে এসেছেন। কিছুক্ষণ পরেই সেখানে ইমরান আসে।
–“মম পঙ্কি ব্রো কে মিমি বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। আপাতত বাকি ট্রিটমেন্ট বাসাতেই হবে।”

ইমরানের কথার পাছে নাবিলা চৌধুরী কিছু বলার আগেই ইফানের গলা তাদের কানে আসলো,
–“ঐ বাস্টার্ডকে এক্ষনি আমার সামনে নিয়ে আস।”

নাবিলা চৌধুরী আর ইমরান হতবিহ্বল হয়ে বেডের দিকে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল। যে ছেলের তিন দিন ধরে কোনো জ্ঞান নেই তার আচমকা জ্ঞান কিভাবে ফিরে আসলো। আসলো তো আসলোই সাথে আবার চেচিয়ে কথা বলাও শুরু করে দিয়েছে।ইফান এক হাতে বেডে ভর দিয়ে বালিশ থেকে মাথাটা হালকা উঁচিয়ে আরেক হাতে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে চোখ গরম করে তাদের দিকে তাকিয়ে।

–“কি হলো সা*উয়া দিয়ে বাতাস ঢুকছে না নাকি?”

ইফানের পুরো মাথা এমনকি থুতনি সবটা দিয়ে পেচিয়ে সাদা ব্যান্ডেজ করা। ব্যান্ডেজে কিছু জায়গা লালছে হয়ে আছে। এই অবস্থায় ইফানের এমন আচরণ দেখে নাবিলা চৌধুরী আর ইমরান দু জনেই স্পিচলেস।মা ভাইকে নড়াচড়া করতে না দেখে সে নিজেই উঠে যেতে উদ্ধত হলে ইমরান তাড়াহুড়ো করে তাকে আবার শুইয়ে দেয়। ইফানের শরীরে একবিন্দু শক্তি নেই তবুও হঠাৎ এমন আচরণের কারণ বুঝে উঠতে পারলো না কেউই। অতএব ইফানের কথা মতো পঙ্কিকে তার কেবিনে আনা হলো। তখন সে বললো তার পায়ের কাছে আরেকটা বেডের ব্যবস্থা করতে। সকলে তাও করে দিলো। তারপর পঙ্কিকে বললো যতদিন পর্যন্ত ও সুস্থ না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত এখানেই পঙ্কজ কে থাকতে হবে তার চোখের সামনে। চরম বিরক্তি তে পঙ্কজের মাথার রগ গুলো ফোলে উঠে।

–“কিরে ভাই তোর কি সমস্যা?”

দাঁতে দাঁত পিষে ইফানের উদ্দেশ্য বাক্য ছাড়লো পঙ্কজ। ইফান চিত হয়ে বেডে পড়ে আছে। একটু আগে চেঁচানোর ফলে মাথায় আবার চাপ পড়েছে। তাই এখন আর জোরে কথা বলা তো দূর আস্তে বলার শক্তিও তার নেই। তাই ইফান হাত দিয়ে ইশারা করলো পঙ্কিকে তার কাছে আসতে। পঙ্কজ চরম বিরক্ত ইফানের কাজে। তার হেঁটে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। সে হুইলচেয়ারে বসে আছে। এমনকি হুইলচেয়ার চালিয়ে নিয়ে যাওয়ারও ক্ষমতাও নেই, এক হাত ভাঙা। ইমরান পঙ্কজ কে ইফানের মাথার কাছে নিয়ে গেলো।

–“তুই আমাকে একা ফেলে বাড়ি চলে গেলে আমি কার সাথে বাল ফেলব ভাই? তাই তো তোকে এখানে রাখার বন্ধ-বস্ত করলাম। এবার চোখের সামনে তোকে দেখলে ময়নাটা একটু হলেও ঠান্ডা থাকবে।”

সিরিয়াস মূহুর্তেও ইফানের আজাইরা কথায় রাগে বাকহীন হয়ে পড়ে পঙ্কজ। রাগে ঠোঁটগুলো থরথর করে কাঁপতে থাকে। আর কি এভাবেই ইফানের পায়ের কাছে বেড ফেলে পঙ্কজ কে তিনদিন ধরে আটকে রেখেছে ইফান। এমনকি পঙ্কজকে টয়লেটে নিয়ে গেলেও ভিডিও করে এনে দেখাতে হয় ইফানকে। এতক্ষণ টয়লেটে পঙ্কজ কি করেছে। ইফানের এমন সব অত্যাচারে পঙ্কজ পাগল হয়ে মাঝেমাঝেই রাগে চেঁচামেচি করে,
–“ঐ বা’ঙ্গির বাচ্চা কেউ আমারে পাবনা দিয়ে আয়। ঐ বুলশিট আমাকে পাগলাগারদ দিয়ে য়…”


অত্যাধিক গরমে বেলকনিতে দাড়িয়ে থাকায় শরীর ঘেমে একাকার। এই রকম গরমে শাড়ি পড়ে থাকতে কার ভালো লাগে? তবুও পড়ে থাকতে হয় চৌধুরী বউদের। মনে মনে ঠিক করে নিলাম দু একদিনের মধ্যে বাপের বাড়ি যাব। এক মাসের উপরে হয়ে গেলো এখনো নিজের বাড়ি যেতে পারলাম না। বাপের বাড়ির কথা ভাবতে গেলেই মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তাই আর ভাবলাম না। একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে রওনা দিলাম। এবার শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হওয়া দরকার। নাহলে রাতে আবার ঘুম আসতে চাইবে না।

মাতাল অবস্থায় হেলেদুলে নোহা আমার ঘরে আসে। ঘড়ির কাটা তখন ১১টা বেজে ৩৮মিনিট। আমি এখনো শাওয়ার নিচ্ছি। নোহা একবার পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে নিলো। না ঘরে কেউ নেই। অতএব বিছানায় উঠে দুই পা মেলিয়ে বাচ্চাদের মতো গালে হাত দিয়ে বসে পড়ে। আমি আরও পাঁচ মিনিট পর শাওয়ার নিয়ে বের হলাম। আমার পরনে গেঞ্জি আর প্লাজু। আমি তখনো নোহাকে খেয়াল করি নি। বরং আয়নার সামনে দাড়িয়ে মনযোগ দিয়ে ভেজা চুল গুলো কে মুছতে ব্যস্ত। হঠাৎ করেই নোহার অদ্ভুত কান্নার আওয়াজ কানে আসে। আমি তড়িৎ গতিতে আয়নাতে চোখ রাখলাম। নোহা একই ভাবে বিছানায় বসে আছে। তার পরনে একটা কালো ইনার আর জিন্সের হাফ প্যান্ট। আমি হাতের টাওয়াল টা সিঙ্গেল কাউচটার উপর রেখে ওর সামনে গিয়ে দাড়ালাম।

–“এই মেয়ে কি সমস্যা? মাঝ রাতে আমার ঘরে এসে কু*তাচ্ছ কেন?”

আমি চিবিয়ে চিবিয়ে নোহাকে কথাগুলো বললাম। আমার কথা শুনে সে আমার দিকে তাকালো। অতঃপর কোনো ইঙ্গিত না দিয়েই টিস্যু ছাড়া নাক মুচে সেই হাতটা বিছানায় মুচে দিলো। তার এহেন কান্ডে রাগে আমার মাথাটা ফেটে পড়ছে। আমি তাকে হেচকা টান মেরে বিছানা থেকে নামিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম,
–“ইয়াক ছি। বেয়াদব গি*দর। ইউ ছি ছি। এই মেয়ে এটা তুমি কি করলে হ্যা? কোনো ম্যানারস জান না?”

আমার এইটুকু তেই নোহা ও ও ও করে কেঁদে দিলো। আমি দু হাত ধরে মাথা চেপে ধরে দীর্ঘ শ্বাস ফেললাম। এই মেয়েটার বয়স আমার বয়সী। তারপরও এই টাইপের বাচ্চাদের বিহেভিয়ার কেন করে মাথায় ঢুকে না। মনে মনে আবার বিরবির করলাম, “বড়লোক হলে যা হয় আরকি।”

–“প্রিটি গার্ল জান আজ কি হয়েছে?”

নোহার চোখদুটো টলমল করছে। এরকম আমি এর আগে কখনো দেখি নি। তাই নিজের রাগকে কন্ট্রোলে রেখে প্রতিত্তোর করলাম,
–“না বললে জানবো কিভাবে?”

একটা ব্রু উচিয়ে স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করলাম। এবার নোহা আবার হাত দিয়ে নাক মুচে তার মিনি পেন্টে মুচে দিলো। তারপর আঙুল দিয়ে তার পশ্চাতে ইশারা করে হেঁচকি তুলতে তুলতে বললো,
–“এখানে না একজন Devil পুলিশ লাঠি দিয়ে একটা বারি মেরেছে।”

নেহার কথায় আমার চোখ কপালে উঠে গেল। আমি উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলাম,
–“পুলিশ তোমার পাছায় মেয়েছে! But why?”

আমার কথায় যেন ও আরেকটু আশকারা পেয়েছে। তাই নাক টেনে টেনে পাছা আমার দিকে ঘুরালো। অতপর নিজের হাফ প্যান্ট খুলার জন্য উদ্ধৃত হলেই আমি আবার চেঁচিয়ে উঠলাম,
–“এই মেয়ে হাফ প্যান্ট খুলছো কেন?”

–“এখানেই তো মে’রেছে, দেখ।”

কি মেয়েরে বাবা। পা’ছায় মার খেয়েছে সেটা আবার আমাকে দেখাতে চাইছে। আমি এবার চোয়াল শক্ত করে মার খাওয়ার কারণ জানতে চাইলাম,
–“কি কান্ড ঘটিয়েছ যে পুলিশের হাতে মার খেতে হলো?”

আমার বাক্যটা শেষ হতেই নোহা একটু উঠে বিছানা থেকে একটা বেগুন আরেকটা শশা নিলো। এতক্ষণ বিছানায় এগুলো পড়ে ছিল আমি খেয়ালই করি নি।কি অদ্ভুত ব্যপার? এই মেয়ে রাতবিরেতে সবজি নিয়ে ঘুরছে কেন? আমার ভাবনার মধ্যে নোহা নেকামি স্বরে বলে উঠে,
–“জান প্রিটি গার্ল বেইবি হসপিটালে তাই আমার কোনো কিছু ভালো লাগতো না। তাই তো কিউকাম্বার আর এগ-প্লান্ট দিয়ে কাজ কাজ সারতাম।”

–“কাজ সারতাম মানে?”

নোহার কথায় আশ্চর্য হয়ে বাক্যটা ছুড়লাম। নোহা আমার কথায় জোরে জোরে মাথা দোলালো।
–“হ্যা তো কাজ সারতাম। বেইবি না থাকায় তুমি এটা ইউজ কর নি?”

নোহার কথায় আমি বাকহারা হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি। এই মেয়ে এসব কি বলছে? বেগুন আর শশা দিয়ে কি কাজ সারে আমার মাথায় আসছে না। আমি কিছু বলছি না দেখে সে আবার বলতে আরম্ভ করলো,
–“কিন্তু ইফান বেইবি এখন সুস্থ আছে। তাই এই আনন্দে আমি আজ ক্লাবে যাই। তখন আমি পার্টি করছিলাম হঠাৎই আমার পাশে একটা হেন্ডু বয় এসে দাঁড়ায়।”

এইটুকু বলেই থেমে যায় নোহা। আমি ওর পাশে ফ্লোরে বসলাম। বেশ সময় চুপ করে বসে থাকতে দেখে আমিই বললাম,
–“তারপর?”

নোহা কি যেন ভাবছিলো। আমার কথা কানে যেতেই একটা ঢোক গিলে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করলো,
–“You don’t know how cute he was.আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখেছি হেন্ডুটা কি কিউট করে ফোনে কথা বলছিলো। তারপরই আমার পা’ছায় মে’রে দিলো এ্যাএ্যাএ্যা।”

এটুকু বলেই আবার কান্না শুরু করে দিয়েছে নোহা। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। ও তাকিয়ে ছিল বলেই লোকটা মেয়েটার পাছায় মেরে দিয়েছে। বিষয়টা ক্লিয়ার হওয়ার জন্য আবার নোহাকে প্রশ্ন করলাম,
–“তুমি কিছু না করলে লোকটা এমনি এমনিই মেরে দিলো?”

নোহা গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো,
–“হ্যা তো,শুধু শুধু মেরে দিয়েছে। আমি শুধু বললাম হেই হ্যান্ডসাম I will fu*ck you.”

নোহার কথা শুনে আমার জমিন থেকে মাটি সরে গেল মনে হচ্ছে। মাথা কেমন যেন ভনভন করে ঘুরছে। এই মেয়ে চেনে না জানে না কোন অপরিচিত লোককে এমন বেহায়া কথা বলে দিলো।”


সূর্যের তীর্যক আলো চোখে মুখে পড়তেই ঘুম কাচা হয়ে আসলো। চোখ কচলে সারা রুমে একবার চোখ বুলালাম। তারপর বিছানা থেকে উঠে বসতে যাব তখন-ই শরীরে টান অনুভব করলাম। নিজের কোমরের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই চোখমুখ চরম বিরক্তিতে কুঁচকে উঠলো। নোহা সাপের মতো আমাকে পেচিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। গতরাতে মাতাল হয়ে আমার রুমেই জোর জবরদস্তি করে ঘুমিয়ে পড়েছে। সারারাত আমাকে একটুও ঘুমাতে দেয় নি। ঘুমের মধ্যে বারবার আমার প্রাইভেট পার্টে হাত মেরে দিয়েছে। সারারাত নিদ্রাহীন থাকায় রাগে শেষ রাতে বিছানা থেকে টেনেহিচরে ফ্লোরে শুইয়ে দিই। কিন্তু এটা আবার বিছানায় কখন আসলো। কি জ্বালা!

আমি ভালোভাবে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আজ ভার্সিটি যেতে হবে একবার। কিছুদিনের মধ্যেই এক্সাম শুরু হবে। তার চেয়েও বড় কথা আজ বাইরে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। সেটা যে করে হোক সম্পন্ন করতে হবে। আর বেশি ভাবলাম না তাড়াতাড়ি নিচে নেমে গেলাম। নিচে নামতে না নামতেই হাজির হলো ইফানের পিএ ইনান খন্দকার। এই লোকটাকে আমি প্রথম দেখি যেদিন ইফানের জ্ঞান ফিরে। ইফানের এক্সিডেন্ট হওয়ার পর এখন পর্যন্ত একবারও ওকে দেখতে যাইনি। এই নিয়ে সকলেই আমার উপর অসন্তোষ। তাতে আমার কি? সেদিন ইনান খন্দকার বাড়িতে এসে আমাকে ডাকছিল,
–“জাহানারা ভাবি, জাহানারা ভাবি আপনাকে ভাই দেখতে চেয়েছে। তাড়াতাড়ি আসেন?”

কারো গলার আওয়াজ শুনে আমি নিচে আসি। লোকটাকে চিনতে না পেরে চোখ সরু করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি চিন্তা পারছি না বুঝতে পেরে নিজেই পরিচয় দেওয়া শুরু করে,
–“আসসালামু আলাইকুম ভাবি। আমি ইন্দুর থুরি ইনান খন্দকার। আব্বা বুলু খন্দকার। আম্মা মাধুরি বেগম। আমারা..”

–“কি আশ্চর্য আপনি আমাকে আপনার বয়ো ডাটা দিচ্ছেন কেন?”

আমি নাক ছিটকে কথাটা বললাম। আমার কথা শুনে মাথা চুলকে হালকা হেসে দেয় লোকটা। অতঃপর আমাকে জানায় তার ভাই মানে ইফান আমাকে ডেকেছে হাসপাতালে দেখা করতে। সেদিন এই লোকটা কে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এর পর থেকে ডেইলি দিনে দুই তিন বার আমাকে নিতে আসে। কিন্তু কখনোই যেতে রাজি হইনি।
__

–“ভাবি ভাই আপনার সাথে দেখা করতে চায়,,,”

মাঝ পথে থামিয়ে দিলাম ইনানকে,
–“কানে কি বাতাস ঢুকে না? প্রতিদিন এক কথা কেন বলতে হয় আমি যাবো না?”

–“কিন্তু ভাই,,,”

আবার মাঝ পথে থামিয়ে দিলাম,
–“লিসেন মিস্টার গন্ধকার। আপনার ভাইকে গিয়ে ভালোভাবে বলে দিবেন ম’রলেও আমি দেখতে যাব না।”

–“আচ্ছা ভাবি। তাহলে একটু কলে কথা বলে নিন।”

–“পলিইইই ঝাড়ু টা কোথায় রেখেছঅঅঅঅ?”

আমার কথা শুনে প্রতিদিনের মতোই আজও হাওয়ার বেগে কেটে পড়েছে লোকটা। এগুলো প্রতিদিনের কাহিনি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি ঝাড়ু, জুতার খুঁজ না নেওয়া পর্যন্ত চৌধুরী বাড়ি থেকে এক পাও বের করবে না লোকটা।


আমাদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে রান্নাঘর থেকে কাকিয়া, পলি বেড়িয়ে এসেছে। অন্যদিকে দাদিকে ইতি লিভিং রুমে ধরে ধরে নিয়ে আসে। ইফানের এক্সিডেন্টের পর দাদির শরীরের অবনতি হয়েছে। দাদি আমার উপর ভিষণ রেগে আছেন। উনার কথা অনুযায়ী স্বামী যেমনই হোক এমন মৃত্যুশয্যায় থাকাকালীন তোমাকে বারবার দেখতে চাইছে, আর তুমি একবার দেখতে গেলে না।

–“আমার ছেলে বেঁচে যাবে এটা মনে হয় আশা কর নি?”

ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলাম কারো গলার আওয়াজে। ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই চোখ পড়ল নাবিলা চৌধুরীর দিকে। তিনি বাক্যটা বলে আমার কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। উনার পেছনে নুলক চৌধুরী দাঁড়িয়ে। উনাদের পরিপাটি লাগছে হয়তো কোথাও বেড়বে।

–“তুমি একটু বেশিই উড়ছ জাহানারা। আমি তোমাকে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি এবার থাম। নাহলে অকালে ঝরে যাবে।”

ঠান্ডা গলায় এক প্রকার হুমকি দিয়ে চলে যেতে লাগলেন তিনি। আমি আরেকটু এগিয়ে উনার পেছন থেকে বলে উঠলাম,
–“পাখিকে খাঁচায় বন্দী করে রাখতে যাবেন না। পাখি ঝরে যাওয়ার আগেই তার অ’ভিশাপে আপনারা পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবেন।”

আমার কন্ঠ কানে যেতেই পেছনে ফিরে তাকাল নাবিলা চৌধুরী। বেশ কয়েক সেকেন্ড আমাদের চোখে চোখে স্নায়ুযুদ্ধ চলে। অতঃপর তার সমাপ্তি ঘটিয়ে বলেন,
–“তার মানে তুমি থামবে না?”

–“আমি তো এখনো কিছুই করি নি। তাহলে থামবোই বা কোথায়?”

আমার কথা শুনে নাবিলা চৌধুরী মৃদু হাসলেন।যাওয়ার আগে একটা বাক্যই বলে গেলেন,
–“wish for danger.”

নাবিলা চৌধুরীর শেষ বাক্যে আমিও মৃদু হাসলাম। তখন নুলক চৌধুরীর সাথেও চোখাচোখি হয়। উনার চোখমুখ আগের ন্যয় অনুভূতিহীন। উনারা দুজন বাসা থেকে বেড়িয়ে যেতেই কাকিয়া আর দাদি আমার কাছে আসেন। কাকিয়া কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না দাদির কথা শুনে।
–“শুন নাত বউ। সবসময় জেদ করাটা বোকামি।এসব ছেড়ে অসুস্থ স্বামীর দিকে মন দাও।”

এই টুকু বলেই তিনি সোফায় গিয়ে বসলেন। আমার আর ব্রেকফাস্ট করার রুচি নেই। তাই উপরে উঠে যেতে উদ্ধৃত হলেই কাকিয়ার শান্ত কন্ঠ কানে আসে।

–“সবসময় মুখোমুখি যুদ্ধ করতে নেই বউমা। এমনও হতে পারে বিপরীত পক্ষ যুদ্ধে নামার আগেই পেছন থেকে ছু’রি বসাবে।”

আমি পেছনে তাকাতেই কাকিয়া মৃদু হেসে বললেন,
–“আজ তো নিশ্চয়ই ভার্সিটি যাবে। একদমই না খেয়ে বের হবে না কেমন।”


আমি রুমে গিয়ে পুরোপুরি রেডি হয়ে নিলাম। সাইড ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে যাবো তখনই মনে পড়ে আমি তো আসল জিনিসটাই নিতে ভুলে গেছি। তাড়াতাড়ি কাভার্ড খুলে শাড়িগুলোর ভেতর থেকে একটা ফাইল বের করলাম। ঐটাকে দেখেই ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠলো। ফাইলটার দিকে তাকিয়ে যখন কিছু ভাবছি তখনই পেছন থেকে নোহার কন্ঠ কানে বাড়ি খেলো।

–“তোমার হাতে ওটা কি প্রিটি গার্ল?”

–“সেই কৈফিয়ত কি তোমাকে দিতে হবে?”

আমি তাড়াতাড়ি ব্যাগে ফাইলটা ঢুকিয়ে নোহার দিকে কড়া ভাবে তাকিয়ে উত্তর করলাম। এতে নোহার মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে নিভু নিভু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আরেক প্রশ্ন করে বসলো,
–“What is কফিয়ত?”

আমি ওর কথা শুনে মুখ ফুলিয়ে শ্বাস বের করলাম। অতঃপর রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নোহার উদ্দেশ্য ছুড়লাম একটাই শব্দ,
–“বোকাচোদা।”


আজ অন্যদিনের তুলনায় রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যাম বেশি। এদিকে মাথার উপর সূর্য খাড়া ভাবে কিরণ দিচ্ছে। আমি ঘেমে একাকার। শাড়ির আচল দিয়ে নাক-মুখ,গলা টা মুচে নিলাম। ভার্সিটি থেকে বেড়িয়েছি তিনটার দিকে। আমাকে এভাবে রাস্তায় ইফান কিছুতেই একা ছাড়তে চাইতো না। সবসময় আমার পিছনে একজন না একজন থাকতো।এখন তার অসুস্থতার জন্য চামচা গুলোকে আর দেখতে পারছি না দুদিন ধরে।নাহলে মাথা চিবিয়ে খেতো এটা ওটা বলে বলে,
–“ভাবি এভাবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবেন না গাড়িতে উঠুন। আমরা আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি।”

আরেকজন ছাতা নিয়ে পিছনে পড়ে থাকতো,
–“ভাবি এত রোদের মধ্যে এভাবে হাঁটবেন না। তাতে আপনার অসুখ হয়ে যাবে। আর আপনার অসুখ হলে ভাই আমাদের বুড়িগঙ্গায় কে*টে ভাসিয়ে দিবে।”

আমি শত ধমকেও ওদের আমার পিছু ছাড়াতে পারি না। সেই কারণেই এই ফাইলটার এখনো কোনো ব্যবস্থা করে উঠতে পারি নি। গতকাল একটু দরকারি কাজে লাইব্রেরি গিয়েছিলাম। আমি আবার চৌধুরী বাড়ির কোনো গাড়িতে যাতায়াত করি না।হয়তো হেঁটে যায় না হয় তো রিকশা বা অটো করে যাতায়াত করি। সেই দিন কাউকে ফলো করতে না দেখে বুঝতে পারলাম ইফানের অনুপস্থিতিতে ওরা কাজে ফাঁকি দিচ্ছে। তাতে অবশ্য আমারই লাভ।এই যে আজ ফাইলটা,,,,

আমার ভাবনার ছেদ ঘটে একটা পুরুষালি কন্ঠে। আমি পিছনে তাকাতেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা পায়।যার জন্য আধ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি। লোকটার পড়নে শার্ট প্যান্ট। চোখে রৌদ চশমা আর মুখে মাস্ক পড়া। আমি উনার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। হয়তো লোকটাও মাস্কের আড়ালে মৃদু হেসেছে। অতঃপর লোকটা হালকা খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে আমার সামনে দাঁড়ালো। আমি ঝটপট ফাইল টা লোকটার হাতে তুলে দিলাম। লোকটাও ঝটপট করে অফিসের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। এর পর আর বেশি সময় আমরা এক সাথে দা্ড়িয়ে থাকলাম না। তিন চার মিনিটের মতো কথা বলেই দুজন দু দিকে চলে গেলাম।


সকালে না খেয়ে আসার কারণে শরীর বেশ দুর্বল। যদিও আমার বান্ধবী জোর করে একটা কেক খাইয়ে দিয়েছে। তাতে কি আর একটা মানুষের পেট ভরে? যাইহোক তাড়াতাড়ি এবার বাড়ি ফিরতে হবে। বিশ্ব রোডের বামপাশে দাড়িয়ে আছি ঐ পাড়ে যাবো বলে। আজকে মাত্রা অতিরিক্ত যানজট রাস্তায়। আমি রাস্তার এপাশ ওপাশ ভালো করে দেখতে ব্যস্ত তখনই কয়েকজন লোকের গলা আর হাতের তালির শব্দ কানে আসে। আমি পিছনে তাকাতেই দেখি তিনজন হিজরা দাঁড়িয়ে। তিনজনই পান চিবাতে চিবাতে আমাকে দেখে কিল কিল করে হাসছে আর হাতে তালি বাজাচ্ছে। আমি এদের পাত্তা দিলাম না। বরং আবার রাস্তা পেরতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তাদেরকে এভয়েড করেছি ব্যপারটা বুঝতে পেরেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করল। তারপর একজন পানের পিচকিরি ফেলে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।

–“হেই হেই হেই। সুন্দরীর কিসের এত তাড়া? ঘরে জামাই ফেলে এসেছিস নাকি?”

আমি বিরক্তিতে ব্রু কুচকালাম। তাতে কপালে সুক্ষ কয়েকটা ভাজ পড়লো। তবুও বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিলাম,
–“ফেলে আসলেও তোমাদের কি?”

আমার কথা শুনে তিনজন হিজরাই উচ্চ স্বরে হেসে দিলো। প্রথম হিজরাটা আমার পাশ ঘেঁষে দাড়িয়ে দু’হাতে তালি বাজাতে বাজাতে কানের কাছে বলে উঠলো,
–“উমমমম, তাহলে তো সুন্দরী রাতে জামাইয়ের সাথে অনেক মস্তি কর।”

চলবে,,,,,,,

(তোমাদের কি জায়ান ভাইয়ের কথা মনে আছে? খুব শীগ্রই তার সম্পর্কে জানতে পারবে🙂🫰।হ্যাপি রিডিং 🥳🫶)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply