Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৬


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;০৬

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

–” আপনি বরং কিছু পরিয়েন না। তাহলে শান্তি চারপাশ দিয়ে ভেসে ভেসে আসবে।”

কথা শেষে তরী দাঁড়ালো না। দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে প্রস্থান করলো সে। তরঙ্গ এখনো থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তরী ঠিক কি বলে গেলো। তা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো তরঙ্গের ধূর্ত মস্তিষ্কে। কথা গুলো বোধগম্য হতেই তরীর পেছনে ছুটলো তরঙ্গ। সবে সিঁড়ি ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে তরী। ঝুঁকে পানির ঝাঝারি কর্ণারে রেখে।

সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তরঙ্গ এসে উপস্থিত হলো। তাকে দেখে ও কোনো রকম রিয়েকশন দিলো না তরী। নিজের মতো নেমে যেতে চাইলো সে। তরঙ্গ পথ আটকে দাঁড়ালো। তরীর শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচু কন্ঠে সুধালো সে;-

–” আমি আনড্রেস হাঁটলে তুই সহ্য করতে পারবি? তুই যদি পারিস। তবে আমার ও সমস্যা নেই।”

তরী ঠোঁট গোল করে কিছু বলার পূর্বেই তরঙ্গ ফের বললো।

–” ওয়ান কন্ডিশন, আমাকে নির্লজ্জ বলে চোখ ফেরাতে পারবি না।”

প্রসন্ন হাসলো তরী। তার হাসির সাথে থুতনিতে ছোট্ট টোল পড়লো। তরঙ্গ তা তৃপ্ত চোখে দেখলো। পর পর বুকে হাত চেপে ধরলো সে। আজ যেনো তরঙ্গের সাথে পাল্লা দিয়ে তরী ও নির্লজ্জতার সীমা অতিক্রম করেছে।

–” ভুলে যাবি না। আমি তোর বড় বোন। ছোটো বেলায় বহু শি পাল্টেছি তোর।”

তরীর মুখে তুই সম্বোধনের, সাথে এমন কথায় থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তরঙ্গ। তার চোখ মুখে বিস্ময়তা ঠিকরে পড়ছে। তা দেখে তরীর খুব হাসি পেলো। ছেলেটা এতোদিন তাকে বেশ জ্বালিয়েছে। এইবার তার সময় এসেছে। এতো দিনে তরী একটা কথা বেশ ভালোই বুঝেছে। সে যতো চুপ করে থাকবে তরঙ্গের কথায়। তরঙ্গ ততো বাড় বাড়বে। তরঙ্গ কে চুপ থাকতে দেখে তরী সুধালো;-

–” আর কিছু বলবি তরঙ্গ?”

বিস্ময় ভাব চেপে তরঙ্গ বললো,

–” আমাকে আবার তুই করে বলছিস?”

তরী উত্তর দিলো না। গট গট পায়ে সিঁড়ি মাড়িয়ে দোতলায় নেমে এলো সে। সারা বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। সবাই এখনো যার যার রুমে। গলি ছেড়ে নিজেদের রুমের দরজা ঢেলে ভেতরে প্রবেশ করলো তরী। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। তরী এসে বিছানায় বসলো। কোমর থেকে পিঠ পর্যন্ত ব্যথা করছে। সকাল থেকে দৌড়ের উপর ছিলো সে।

দুপুরের খাবার শেষে এঁটো প্লেট বাটি ধুয়ে আবার ছাদে গিয়েছিল। বাড়ির কাজের লোক দুটো সকালে এসে কাজ করে দিয়ে যায়। অতঃপর সারাদিনের সব কাজ তরী কে করতে হয়। মাঝে মধ্যে সাহনারা হাতে হাতে কিছু করেন। তাও বিশেষ দিনক্ষণ দেখে। যখন ওনার সংসারের কাজ করতে ইচ্ছে হয় তখনি ই করেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আধো ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলো তরী।

ওয়াশরুমের ছিটকিনির শব্দে পুনরায় মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠলো তার। ওভাবে শুয়ে থেকেই তিন্নির দিকে তাকালো সে। চুলে গামছা পেঁচিয়ে বোনের পায়ের কাছে এসে বসলো তিন্নি। চোখে মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট বিদ্যমান। আদুরে কন্ঠে তরী সুধালো;-

–” খিদে পেয়েছে পাখি?”

তিন্নি মাথা নাড়ালো। পর পর তরীর পাশে গুটি শুটি মেরে শুয়ে পড়লো বাচ্চা টা। মুচকি হেসে বাম হাতে তিন্নি কে জড়িয়ে ধরলো তরী।

–” মন খারাপ?”

বোনের প্রশ্ন না বোধক মাথা দোলালো তিন্নি।

–” আমার খিদে পেয়েছে আপু।”

–” চল ভাত দিবো তোকে।”

–” তোমার হাতে খাবো। নিচে যেতে ইচ্ছে করছে না।”

মিনিট না ক্ষইয়ে তরী উঠে বসলো। তিন্নির পাশ কাটিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো সে। পর পর রুম থেকে বেরিয়ে গেলো তরী। বোন কে যেতে দেখে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো তিন্নি। পায়ের হাঁটুতে ব্যথা করছে। স্কুল ছুটির পর তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে বেঞ্চিতে লেগে গিয়েছিল। কিছু টা ছিলে গেছে হাঁটুর চামড়া। ভয়ে তরী কে বলেনি। পাছে বোকা খাবে।

–” এই টেমা কি করছিস?”

তরঙ্গের ডাকে দরজার দিকে তাকালো তিন্নি। লুঙ্গি পরিহিত তরঙ্গ কে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফিক করে হেসে দিলো বাচ্চা টা। তা দেখে কপালের চামড়া কুঁচকে নিলো তরঙ্গ। কপট রাগ দেখিয়ে। দরজা ঢেলে তিন্নির পাশে এসে নির্দ্বিধায় বসে পড়লো সে।

–” আমাকে দেখে হাসলি কেন টেমা?”

তরঙ্গ কে বসতে দেখে তিন্নি ও উঠে বসলো।

–” তুমি আবার লুঙ্গি পরেছো?”

–” হ্যাঁ রে টেমা। খুব ভালো লাগে লুঙ্গি পরতে। সুন্দর লাগছে না আমাকে? কচকচে এক হাজার টাকার নোট দিয়ে লুঙ্গি টা কিনেছি।”

–” আমি জানি তুমি লুঙ্গি পরেছো কেন!”

–” কেনো?”

–” আপু কে জ্বালানোর জন্য।”

কথা শেষে মুখে হাত চেপে হেসে ফেললো তিন্নি। তরঙ্গ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো;-

–” তুই তো খুব চালাক হয়েছিস টেমা? এতো কিছু বুঝতে শুরু করেছিস? আর কি জানিস তুই? কথা চেপে চেপেই তবে পেট এতো বড় করেছিস?”

তরঙ্গের কথায় গাল ফুলালো তিন্নি। তার ইচ্ছে করলো তরঙ্গের পিঠের মাঝ বরাবর কয়েকটা ঘুষি বসাতে। কিন্তু বড় ভাই হওয়াতে সেই ইচ্ছেতে এক বালতি জল ঢেলে; গমগমে কন্ঠে বললো সে;-

–” ইমন স্যার বলেছিলেন আপুর নাম্বার দিতে। আপু কে নাকি ওনার বেশ পছন্দ হয়েছে। আপুর সাথে কথা বলে। আব্বুর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন। আমার ও স্যার কে দুলাভাই হিসেবে পছন্দ হয়েছে। আজ আমাকে দুটো চকলেট দিয়েছিলো স্যার। পড়ার জন্য ও মারে না।”

এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে থামলো তিন্নি। দশ বছরের তিন্নির এক নাগাড়ে গড়গড় করে বলা কথা গুলো শুনে তরঙ্গ ফাটা বেলুনের অনুরূপ চুপসে গেলো।

–” তোর ভাইয়ের সাথে তুই বেইমানি করবি টেমা পাখি?”

ভাইয়ের আদুরে স্বরে ও তিন্নির মন গললো না। সে তাকিয়ে রইলো জানলার দিকে। তরঙ্গ বুঝলো মিষ্টি কথায় তিন্নির মন গলবে না।

–” ভেবেছিলাম তোর জন্য পেয়ারা গাছের পাখির ছানা দুটো পেড়ে দিবো। কিন্তু তুই তো আমার শক্র পক্ষের দলে ভীড়ছিস।”

পাখির ছানার কথা শুনতেই জ্বল জ্বল করে উঠলো তিন্নির চোখ জোড়া। সে ঘুরে বসলো তরঙ্গের দিকে। তারপর আহ্লাদি স্বরে বললো সে;-

–” কাউকে নাম্বার দিবো না ভাইয়া। আমার দুলাভাই একমাত্র তুমি ই হবে।”

–” আজ থেকে তোর বোনের কানের কাছে আমার সুনাম করবি। যতো ভালো কাজ আছে আমার সব বলবি, বুঝেছিস?”

বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নাড়ালো তিন্নি। যেনো খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা সে বুঝেছে।

–” কিন্তু তোমার তো কোনো ভালো কাজ নেই ভাইয়া।”

–” যে কটা পাস। ওগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলবি।”

–” আচ্ছা।”

তরঙ্গ মুচকি হাসলো। হাসি থামিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে সুধালো সে;-

–” তোর হার্ড নাড বোনটা কই রে?”

–” আপু আমার জন্য ভাত আনতে গিয়েছে।”

–” ওহ, “

কথা শেষে রুমের চারদিকে চোখ বুলালো তরঙ্গ। পর পর তিন্নির মাথার দিকে তাকালো সে। গমগমে কন্ঠে তরঙ্গ বলে উঠলো;-

–” চিরুনি নিয়ে এদিক আয়। মাথার মধ্যে পাখির বাসা বেঁধেছিস কেন? ছানা দুটোকে এখানে রাখবি নাকি?”

তিন্নি হাসলো, তরঙ্গ যে তাকে ঘুষ হিসেবে মাথা আঁচড়ে দিতে চাইছে তা ঢের বুঝলো। বুঝে ও বিনা বাক্যে ব্যয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে চিরুনি নিয়ে এসে তরঙ্গের সামনে মেঝেতে বসে পড়লো সে। বোনের মাথা থেকে ভেজা গামছা খুলে পাশে রেখে। আলতো হাতে চুলে চিরুনি চালালো তরঙ্গ।

–” এই দেখ একটা ভালো কাজ করছি।”

–” আচ্ছা,”

ভাতের প্লেট হাতে রুমে উপস্থিত হলো তরী। তরঙ্গ কে দেখে কপাল সংকুচিত হয়ে এলো তার। কিছু না বলে তিন্নির পড়ার টেবিলের উপর ভাতের প্লেট রেখে শান্ত স্বরে তরী বললো;-

–” উঠে আয় পাখি। তোকে খাইয়ে দেই।”

তিন্নি উঠতে যেতেই তরঙ্গ তার চুল টেনে ধরলো। মুখ নামিয়ে কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বললো সে।

–” তোর হার্ড নাড বোন কে বল আমিও ভাত খাবো।”

তিন্নি বিরক্ত চোখে তাকালো তরঙ্গের দিকে। বাচ্চাটার ফর্সা মুখ বিরক্তিতে লাল হয়ে উঠেছে। তরঙ্গ বুঝে ও অবুঝ চোখে তাকিয়ে রইলো তিন্নির মুখের দিকে। ভাত মাখা শেষে তিন্নি কে ফের ডাকলো তরী।

–” উঠে আয় তিন্নি। সন্ধ্যা পড়ে গেলো বলে।”

–” আমার সাথে তরঙ্গ ভাইয়া ও ভাত খাবে আপু।”

চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,
আজকের পর্ব কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু? কাল সন্ধ্যার মধ্যে এক হাজার রিয়েক্ট উঠে গেলে কাল আরেকটা পর্ব দিবো, ইনশাল্লাহ। জলদি জলদি গল্প পড়ে রেসপন্স।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply