Golpo romantic golpo চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৬


চন্দ্রবিন্দু

পর্ব_৬

জান্নাতুল_নাঈমা

বিন্দুর ননদ এমি ‘ ভাবি, ভাবি ‘ ডাকতে ডাকতে এগুচ্ছে। সহসা চন্দ্রকে এক ধাক্কা মেরে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো বিন্দু। মনে মনে বলল, ‘ ছিঃ ছিঃ। এ কোন পাপ করছিলাম আমি? আমি যে এখন পরস্ত্রী!’
ঢোক গেলে বিন্দু। রক্ত লাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে চন্দ্রকে বলে,
‘ তুমি চলে যাও। চলে যাও চন্দ্র। ‘

চন্দ্র দিশেহারা হয়ে যায়। এগিয়ে এসে বিন্দুর দুই গাল আঁকড়ে ধরে। আকুতির স্বরে বলে,
‘ বিন্দু আমার বিন্দু। ‘

বিন্দুর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সে ফের বলে,
‘ চলে যাও তুমি, দোহাই লাগে। ‘

চন্দ্র চমকে উঠে। ঝাপসা চোখে একবার দেখে বিন্দুকে। মনে মনে বারবার বলে,
‘ আমি তোমায় ভালোবাসি বিন্দু। কেবলমাত্র তোমাকেই ভালোবাসি। এর প্রমাণ তুমি একদিন না একদিন ঠিক পাবে। ‘

এরপর দরজা খুলে বেরিয়ে যায় ত্বরিত। বিন্দু চমকে যায় ফের। চন্দ্র এতটাও সভ্য নয় যে এমন অবস্থায় ভয় পেয়ে সরে যাবে। তবে কেন গেল চন্দ্র? কেন জোর করেই অধিকার খাটালো না? পরোক্ষণেই আবার ছিঃ ছিঃ করে উঠে বিন্দু। কীসের অধিকার খাটাবে সে। তারা দুজনই যে আজ অন্যের। বিন্দু কাঁদে, খুব কাঁদে। আবেগের কাছে বারবার হেরে যায়। বিবেক তাকে বারবার প্রশ্ন করে, ‘কেন কাঁদছ বিন্দু কেন?’

চন্দ্র ভীষণ রগচটা স্বভাবের। ধৈর্য্যজ্ঞান তার মধ্যে নেই বললেই চলে৷ সে বিন্দুকে এতটাই ভালোবাসে যে সবকিছুর বিনিময়ে বিন্দুকে নিজের করে নিতে পারে। ওর বিয়ে হয়ে গেছে তাতে কী? চন্দ্রর এইটুকু ক্ষমতা আছে যে আজ এই মুহুর্তে বিন্দুকে তুলে নিয়ে যাবে৷ এরপর এহসানকে ডিভোর্স করিয়ে নিজে বিয়ে করে নেবে। কিন্তু আবেগ টুকুর জন্য সে তো এত বড়ো অন্যায় করতে পারছে না৷ বিবেক তাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কিন্তু সে চায় বিন্দু শুধু জানুক চন্দ্র তাকে ঠকায়নি। যার বুকভর্তি তার জন্য কেবল প্রেম আর প্রেম সে বিন্দুর সঙ্গে প্রতারণা করেনি।

চোখের পানি মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরল চন্দ্র। সাহেরা তার সামনে এলো। কথা বলার চেষ্টা করল। সে কথা বলল না। শুধু মায়ের সঙ্গে দেখা করে বলল,
‘ আমার একা থাকা প্রয়োজন আম্মা। আমি একা থাকতে চাই। তুমি চিন্তা করো না। নিজের খেয়াল রেখো৷ ‘

একা থাকা প্রয়োজন বলতে চন্দ্র এখন কোথায় যাবে, সময় কাটাবে বুঝে ফেলল চায়না বেগম। তাই ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
‘ ভাগ্যের ওপর আমাদের হাত নাই বাবা। তুমি নিজেকে সময় দিয়ে সবটা মেনে নাও। ‘

চন্দ্র আর দাঁড়াল না। চলে গেল। সাহেরা তাকে আটকাতে পারলো না। বিন্দুর বিয়ে হয়ে গেল। আজ বিন্দু অন্য কারো বউ। তবুও চন্দ্রর হৃদয়ে সাহেরা ঢুকতে পারলো না। পারলো না চন্দ্রর মন থেকে বিন্দুকে মুছে ফেলতে।

ভূঁইয়া বাড়ির খুব পুরোনো এক বাগান বাড়ি আছে। ভাঙাচোরা বাড়িটা একটা আস্ত জঙ্গল বলা চলে। মাকড়সার জালে ঘিরে আছে ছোট্ট একটা ছনের ঘর৷ সেই ঘরে গিয়ে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ল চন্দ্র। নিচে একটা কাঁথাও বিছালো না। গায়ের ওপর কোনো চাদরও টানলো না। গায়ে একটা সাদা পাঞ্জাবি পরা। পাঞ্জাবির পকেটে দুটো সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার। ব্যস আর কিছু নেই। দিন পেরিয়ে রাত নামল। চন্দ্রর মা বাড়ির কাজের ছেলেটাকে দিয়ে রাতের খাবার পাঠালো চন্দ্রর জন্য। সঙ্গে একটা কম্বল।

কাজের ছেলেটার নাম টুকু। সে চন্দ্রকে খাবার আর কম্বল দিয়ে গেল। চন্দ্র সে খাবার ছুঁয়েও দেখল না। আর না গায়ে চাপালো কম্বল। পৌষ মাসের তীব্র শীত। সারারাতে শরীর ঠান্ডা বরফ হয়ে রইল। চন্দ্রের এত কিছুমাত্র অনুভূত হলো না। সে একবার শুয়ে সিগারেট খেলো তো একবার বসে। সকালবেলা টুকু আবার খাবার নিয়ে এলো। রাতের খাবার ফেরত নিয়ে গেল৷ দুপুরে আবার এলো টুকু। সকালের খাবার ফেরত নিয়ে দুপুরের খাবার দিয়ে গেল। চন্দ্রের সিগারেট শেষ। টুকুকে বলে দিয়েছিল, সে যেন সিগারেট নিয়ে আসে। আর বন্ধু স্বপনকে খবর পাঠায়। টুকু সিগারেট এনে দিয়ে স্বপনকে খুঁজতে গেল। স্বপন এসে চন্দ্রের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠল।

‘ এইভাবে নিজেকে কষ্ট দিলেই বিন্দু ফিরে আসবে?’

বলল স্বপন। চন্দ্র সিগারেট ধরিয়ে বলল,

‘ বিন্দুর ফেরার জন্য আমি কিছু করছি না স্বপন। বরং বিন্দুকে আকাশ সমান কষ্ট দেওয়ার অপরাধে নিজেকে চুল পরিমাণ কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করছি। ‘

এ কথা বলেই সিগারেটটা ফেলে দিলো চন্দ্র। তারপর হঠাৎ বাচ্চাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘ আমার বিন্দু আজ অন্য কারো বউ। ‘

স্বপন আঁতকে উঠল। এ কোন চন্দ্রকে দেখছে সে? এ তো তার চেনা চন্দ্র নয়৷ অনেক বছর থেকেই সে শুনে আসছে চন্দ্র বিন্দুকে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসার ধরন সেভাবে চোখে পড়েনি৷ তার খুব সন্দেহ হতো সত্যি চন্দ্র বিন্দুকে ভালোবাসে তো? নাকি শুধুই মোহ। আজ কেন জানি মনে হচ্ছে চন্দ্র বিন্দুকে সত্যিই ভালোবাসে। তবে সাহেরা? স্বপন উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে,

‘ তবে সাহেরাকে কেন বিয়ে করলি? কেন ঠকালি বিন্দুকে? ‘

চন্দ্রের কান্না থামে। সে স্বপনকে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। স্বপন শুনতে আগ্রহী। চন্দ্র বলল,
‘ কিছু শুনতে চাস না স্বপন। যা আমি এখনো বিন্দুকে বলতে পারিনি তা তোকে কীভাবে বলব বল? ‘

স্বপন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।


বিন্দু সংসার করছে খুব গুছিয়ে। প্রতিনিয়ত নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে যত্ন ভরে। মাঝে মাঝে বৃন্দা এসে খবর দেয়। ভালো নেই চন্দ্র। একগাদা দাঁড়িতে ভরে গেছে মুখ। চুল গুলো বড্ড উষ্কখুষ্ক। শরীর শুকিয়ে যেন লম্বাটে পাটখড়ি। চোখমুখ ডেবে গেছে। মানুষটা বাড়িতে থাকে না। তার ঘর এখন বাগান বাড়ি। মায়ের জ্বর হওয়ায় একবার দেখতে এসেছিল। বৃন্দা তখনি দেখেছে চন্দ্র ভাইকে। বিন্দু টের পেলো চন্দ্রর অসুখ হয়েছে। বিন্দুর শোখে ঘোর অসুখে পড়েছে সে৷ পরোক্ষণেই মনে পড়ল সাহেরার কথা। দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিন্দু। পরের বর নিয়ে তার এত ভেবে কী হবে?

শীত পেরিয়ে গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। বিন্দু রান্না ঘরে চুলা ধরিয়েছে। এমন সময় বৃন্দা এলো হাঁপাতে হাঁপাতে। বিন্দু উঠে এসে বৃন্দার ঘামে জর্জরিত মুখটা মুছে দিয়ে বলল,

‘ আহারে বোন এত ছুটে এসেছিস কেন? পানি আনব পানি খাবি? ‘

বৃন্দা ঢোক গিলে বলল,

‘ না আপা না। চন্দ্র ভাই মারা গেছে। মা বলল তোমাকে দেখতে যেতে, শেষ দেখা। ‘

বিন্দুর হাতে থাকা তরকারির চামচটা অল্প শব্দ তুলে পড়ে গেল। স্থির হয়ে গেল বিন্দুর দৃষ্টি, মুখশ্রী আর সর্বাঙ্গ। বৃন্দা ওর বাহুতে ধাক্কা দিয়ে তাগাদা দিলো,
‘ আপা চল। ‘

বিন্দু মৃদু চমকালো। তারপর বৃন্দাকে ঠেলে সরিয়ে যেমন অবস্থায় ছিল অমনিভাবে দৌড় দিলো চন্দ্রের বাড়ির দিকে। বৃন্দা পেছন পেছন দৌড় দিয়ে ডাকল,

‘ এই আপা, আপা… বোরখা পরবা না? ‘

মুরগির মাংস বসিয়েছিল বিন্দু। চুলায় জ্বালানি জ্বলতে জ্বলতে নিভে গেল আপনাআপনি। বিন্দুর তরকারি রান্না সম্পন্ন হলো না। অর্ধেকটাতেই থেমে গেল। ঠিক যেমন থেমে গিয়েছিল চন্দ্রবিন্দুর প্রেম।

ভূঁইয়া বাড়িতে আজ শোকের ছায়া। গর্ভাবস্থার নয় মাস সাহেরার। এমতাবস্থায় স্বামীর মৃত্যু। মেনে নিতে পারছে না সে৷ স্থির ভাবে শুধু বসে আছে। নীরবতাও যে খুব বড়ো ধরনের শাস্তি। চন্দ্রের মা জ্ঞান হারাচ্ছে বারবার। বাড়িটা ভরে গেছে ক্রন্দনধ্বনিতে। এলোমেলো শাড়িতে বিন্দু এলো তখন। উপস্থিত জনতা অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে। আহা! কে না জানে চন্দ্র আর বিন্দুর সেই প্রেমের আখ্যান? সবাই সরে গিয়ে বিন্দুকে জায়গা করে দিলো৷ বিন্দু থমকানো লাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মৃদু পা ফেলে এগুচ্ছে। ঠিক তক্ষুনি বিন্দুর মা এসে চেপে ধরল বিন্দুকে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
‘ আর এগোস না বিন্দু। তুই এখন পরস্ত্রী। বদনাম হবে গো মা। ‘

এ পর্যায়ে বিন্দুর গাল বেয়ে অশ্রু গড়ায়। বদনাম? যে মানুষটা মরেই গেল তাকে একটু কাছ থেকে দেখলে, একটু ছুঁয়ে দিলে যদি বদনাম হয়। সে কেন সেই বদনাম টুকুর ভয় করবে?

বিন্দু মাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়। কল্ললী ফের পেছন থেকে জাপ্টে ধরে বিন্দুকে।

‘ কলঙ্কের বোঝা নিস না মা। ‘

বিন্দু গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মাকে ছাড়িয়ে দেয়। ধরা গলায় কঠিন করে বলে,

‘ মৃতের সঙ্গে কলঙ্কের ভয় করি না। ‘

বিন্দু আরও কয়েক পা এগোয়। ঠিক সেই মুহুর্তে সাদা কাপড়ে মোড়ানো চন্দ্রের পাশে এসে গর্ভবতী সাহেরা বসে। চন্দ্রের মুখের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে হুহু করে কাঁদতে কাঁদতে চুম্বন আঁটে চন্দ্রের কপালে। বিন্দুর পা দুটো থেমে যায় তক্ষুনি। ঝাপসা চোখে সে এক পলক চন্দ্রকে দেখেই রুদ্ধশ্বাসে ঘুরে দাঁড়ায়। এরপর ছুটে চলে যায় নিজের বাড়িতে। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আঁটকে গগনবিদারী আর্তনাদ করে বিন্দু। মেঝেতে বসে গলা কাঁটা মুরগির ন্যায় ছটফট করে। নেই কোনো অধিকার নেই তার। চন্দ্রের লাশটুকু ছুঁয়ে দেখার কোনো অধিকার তার নেই। নিথর দেহে পড়ে থাকা প্রাণহীন মানুষটার মাথা বুকে জাপ্টে ধরে কান্নার অধিকার নেই তার।

কী নিষ্ঠুর জগৎ!
প্রেমিকের লাশে প্রেমিকার অধিকার থাকে না।
প্রেম কেন স্বর্গ তুল্য? যদি প্রেমিকের লাশে প্রেমিকার অধিকারই না থাকে?

পরেরদিন এহসান মাস্টার এলো বিন্দুকে নিতে। বিন্দু যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। কল্ললী এহসানকে বুঝিয়ে বলল সবটা। এহসান ভারিক্কি বুদ্ধির মানুষ। তাছাড়া সে জানতো বিন্দুর সঙ্গে চন্দ্রের বিয়ে ঠিক ছিল। তবে তাদের ভালোবাসার গভীরতা সম্পর্কে জানতো না। আজ জেনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল।
কী হবে অতো জটিলতা দিয়ে? যেখানে মানুষ চিরজীবী নয়।

নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দিয়েছে বিন্দু। কতদিনে স্বাভাবিক হবে কে জানে? নিদ্রাহীন তার প্রতিটা রাত। আজ রাতে অল্প সময়ের জন্য চোখ লাগে বিন্দুর। ওই অল্প সময়ই সে স্বপ্নে দেখে চন্দ্রকে। জীর্ণশীর্ণ দেহে চন্দ্র বসে আছে তার বাগান বাড়িতে। বিন্দু ডাকল,
‘ চন্দ্র এই চন্দ্র। ‘

চন্দ্র তাকালো না। বিন্দু বলল,

‘ তাকাও। ‘

চন্দ্র বলল,
‘ আমি তাকাবো না। ‘

বিন্দু অবাক গলায় প্রশ্ন করল,
‘ কোন দোষে? ‘

চন্দ্র বলল,
‘ আমাকে তুমি একবারটি দেখতে আসোনি সেই দোষে। ‘

বিন্দু চুপ হয়ে যায়। চন্দ্র বলে,
‘ এসো বিন্দু। একবারটি এসে দেখে যাও। তোমায় ছাড়া কেমন আছি। ‘

মুহুর্তেই ঘুম ছেড়ে যায় বিন্দুর৷ হাসফাস চিত্তে উঠে বসে সে। এরপর ধাতস্থ হয়ে নেমে দাঁড়ায়। আশপাশে তাকিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে।

জোছনার আলোয় আলোকিত চারপাশ। বিন্দু প্রাণপণে হেঁটে চলেছে। হুঁশে নেই বিন্দু। বেহুশে হাঁটছে সে। এক সময় পৌঁছে গেল বাগান বাড়ির সেই ঘরটায় যেখানে শেষকালে একাকী সময় কাটিয়ে গেছে চন্দ্র। ঘরটায় ঢুকেই চন্দ্র যেখানে ঘুমাতো সেখানে শুয়ে পড়ল বিন্দু। তারপর লম্বা একটা ঘুম। ইশ, কতদিন পর বিন্দু ঘুমালো! যেন চন্দ্রের বুকের উম পেয়ে ঘুমাচ্ছে সে। এত আরাম আরাম লাগছে ওর শরীরটা।

~ক্রমশ~
শেষ টানার সময়ই হচ্ছে না৷ মানে লেখার সময় করে উঠতে পারিনি বাকিটুকু আগামীকাল দেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ ❤️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply