খাঁচায় বন্দী ফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৪১
রাত্রির তৃতীয় প্রহর চলমান। অদিতি ঘুমের মধ্যে নিজের ওপর ভারী কিছু অনুভব করলো। মৃদু কপাল কুচকে আসে, নড়েচড়ে উঠে খানিকটা। কিন্তু নড়াচড়া করা যাচ্ছে না, ভারী কিছু একটা তাকে চাপা দিয়ে আছে। চরম বিরক্তিতে চোখ খুলল অদিতি। রুমের মধ্যে চলা লাল ডিপ লাইটের আলোয় দৃশ্যমান হলো সাইফের চওড়া পুরুষালি মুখটা। অদিতি ঘুম জড়ানো চোখে তাকিয়ে রইল সাইফের মুখের পানে। কি সুন্দর অদিতির বুকে মাথা রেখে পুরো শরীরের ভার তার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে অন্যদিকে ফিরে শুয়ে পড়েছিল অদিতি। সেটুকুই মনে আছে, তারপর কখন ঘুমের মধ্যে সাইফুল উপরে উঠে এসেছে বুঝতেই পারেনি। ইচ্ছে হলো সাইফের গালে হাত বুলিয়ে দেওয়ার।
হাতদুটোও চাপা পড়েছে সাইফের হাতের নিচে। অদিতি একটু উশখুশ করলো। এভাবে ঘুম ই আসবে না তার। সকাল সকাল আবার নদীর গায়ে হলুদ। কি এক মুসিবত। লোকটা ভালোবাসার নামে ইদানীং ভালো রকম শায়েস্তা করছে। অদিতি নিচু কন্ঠে ডাকলো
“শুনছেন? এই যে শুনছেন?”
সাইফ ঘুম জড়ানো কন্ঠেই বলল
“হুমমমমম”
“আপনি কিন্তু বলেছিলেন আমায় আর ছোঁবেন না।
সাইফ আরো আঁটসাঁট করে অদিতিকে জড়িয়ে ধরে বলল
“ ভুলে গেছি। মনে পড়লে আর ছোঁবো না”
“কি বজ্জাত লোক রে বাবা। ছাড়ুন না, আমার কষ্ট হচ্ছে।”
“আমারো হয়েছিলো, তখন কি আদর করেছিলে আমায়?”
“কিসের মধ্যে কি বলছেন? আর একটু পরেই ভোর হবে। ঘুমাতে দিন”
সাইফ অদিতির দিকে একবার তাকিয়ে পাশে শুয়ে পড়লো। এতক্ষণে একটু শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারছে অদিতি। সাইফ একা একা বলছে
“এভাবে আর পোষাবে না আমার। বিয়ে আরেকটা করতেই হবে”
অদিতি চট করে সাইফের দিকে ঘুরে বলল
“কি বললেন আপনি?”
“বললাম খুউউউউব চুমু খেতে ইচ্ছা করছে। যে বলবে কি বলেছি, তাকেই খেতে হবে। কাম বেইবি”
অদিতি আবার অন্যদিকে ফিরলো। সাইফ এগিয়ে এসে অদিতির গা ঘেষে বলল
“এটা তো কথা ছিলো না”
অদিতি মন খারাপ করে বলল
“ঘুম পাচ্ছে আমার। এমন করবেন না”
সাইফ আলগোছে বউকে জড়িয়ে নিয়ে বলল
“ঘুমিয়ে যাও”
–
ব্যালকনির গ্রিল হেলান দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে নদী। প্রায় ভোর হতে চলল। একটু পর ফজরের আযান দেবে। এখনো ঘুমায়নি সে। বারবার হাতের মেহেদির দিকে দেখছে। শুধুমাত্র দুই ভাইয়ের ওপর ভরসা করে এই বিয়েতে সাই দিয়েছে সে। নয়তো আত্মহত্যা করে হলেও এ বিয়ে থেকে মুক্তি পেতো অন্যের নামে মেহেদী হাতে ওঠার আগে মরে যাওয়াই তো ভালো। তাছাড়া তুমুলের খোঁজ নেই দুদিন ধরে। কোথায় আছে কি অবস্থায় আছে কিচ্ছু জানে না নদী। শুধু তুযার থেকে শুনেছে যে বাড়িতে গেছে। আজ আসার কথা তাও আসেনি।
দিনে কম করে হলেও কয়েকশ বার কল দিয়েছে নদী। প্রতি মুহূর্তে মরতে কল দিয়েছে। কোনো রেসপন্স নেই। যতই বিয়ের সময় এগিয়ে আসছে নদীর গলা যেন আরো আটকে আসছে, আরো দম বন্ধ হয়ে আসছে। মসজিদে আজানের ধ্বনি শোনা যায়। নদী উঠে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে উঁচু করে নিল। অজু করে নামাজ সেরে যায় নামাজেই বসে রইল।
ভোরবেলা বাইরের কলরবে নদীর ঘুম ভাঙ্গে। সে সময় জায়নামাজে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। বাইরের চেঁচামেচি শুনে মাথায় ওড়না দিয়ে বাইরে আসে নদী। এসে দেখে ড্রইংরুমে চামেলিকে বেধড়ক মারধর করছে হাবিব। নদীর দ্রুত এগিয়ে এলো, কিন্তু নদীর আগে দৌড়ে এলো সাইফ। হাবিবকে টেনে সরালো চামেলির কাছ থেকে। হাসান চৌধুরী ঘর থেকে দৌড়ে এলো। একে একে বাড়ির সবাই জড়ো হলো ড্রয়িং রুমে । হাসান চৌধুরী রেগে হাবিব চৌধুরীকে বলল
“পাগল হয়ে গেছো তুমি? মান ইজ্জত খোয়াবে নাকি? বাড়ি ভর্তি লোকজন, এত অতিথি। মেয়ের বিয়ে হতে চলেছে তোমার। তার মধ্যে কি শুরু করেছে তুমি? পুরুষ হয়ে একজন মেয়ের গায়ে হাত তুলছো?”
হাবিব ক্রোধ নিয়ে চামেলির দিকে তাকিয়ে বলল
“ও নদীর বিয়ের গয়না চুরি করেছে ভাইজান। আমি নিজে চোখে দেখেছি, হাতেনাতে ধরেছি ওকে। তার জন্যই মারছি”
সাইফ বলল
“তুমি হাতে নাতে ধরেছো মানে? কোথ থেকে ধরেছো তুমি?”
চামেলি কাদতে কাদতে হাসান চৌধুরীর পায়ে ধরে বলল
“চাচাজান, চাচাজান বিশ্বাস করুন। উনি একদম মিথ্যা বলছে। আমি চুরি করিনি চাচাজান। আমি তো মাত্রই ঢুকেছি। আর উনি আমাকে মারতে শুরু করলেন। বললেন আমি নাকি চুরি করেছি”
হাবিব চৌধুরী ফের তেড়ে এলো চামেলির দিকে। তখন বাড়িতে ঢুকলো নদীর মামা – মামি আর মামাতো বোন রিশা। ড্রইং রুমে হট্টগোল দেখে তাড়াও বেশ অবাক হলো। তুযা ভোরে বাড়িতে ফিরে ঘুমিয়েছে। চেচামেচি তে তারও ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ ডলতে ডলতে ড্রইং রুমে এলো। আধঘুমন্ত অবস্থায় তুযার মাথায় এমনিতেই খুন চড়ে থাকে। তার মধ্যে যদি হয় এত গন্ডগোল। লুঙ্গি পাড় ধরে বড় বড় পা ফেলে ড্রইং রুমে আসলো। ফুলমালা তুযা কে দেখে একটু স্বস্তি পেলো। মহিলা টার জন্য বেশ মায়া হচ্ছিলো ওর। তুযা এসে সকলের সামনে বলল
“এখানে সার্কাস হচ্ছে নাকি? কে দেখাচ্ছে?”
হাবিব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল
“ও তুমি দেখাচ্ছো? যাও পাড়ায় গিয়ে দেখাও। ঘুমের পিছন টা মেরে এখানে নাটক মারাচ্ছো?”
ওয়াহাব চৌধুরী চোখ রাঙানি দেয় তুযা কে। তুযা এগিয়ে এসে বলে
“বলো হয়েছে টা কি? বলো।”
চামেলি তুযার সামনে হাত জড়ো করে বলে
“ভাইজান, ভাইজান বিশ্বাস করেন। আমি চোর না। আমি চুরি করি নাই। আমি মাত্রই আইসা কামে লাগছি, আর হ্যায় আইসা আমারে মারতে শুরু করলো।”
হাবিব চেতে উঠে বলে
“শালি নষ্টা, তোর চরিত্রের নাই ঠিক, তুই আবার….
হাবিবের কথা শেষ হওয়ার আগে তুযা বলল
“তো তোমার থেকে ভালো আছে। আমার মুখ খুলাইও না, লুঙ্গির কাছা খুলে যাবে কইয়া দিলাম। সিসি ক্যামেরার ধো’ন ডা কি হুদাই লাগাইছে বাড়িতে? কোন হানে, ক্যামেরার মনিটর কোন হানে? নিয়া আয় তো সাইফ”
হাসান চৌধুরী বললো
“সিসি ক্যামেরা বাড়ির বাইরে। ভিতরে কোন সিসি ক্যামেরা লাগানো নেই। হাবিব যখন বলছে, অহেতুক তো আর বলছে না”
সবার মধ্যে থেকে সাইফ বলে উঠলো
“সিসি ক্যামেরা আছে, বাড়ির ভেতরে সিসি ক্যামেরা আছে”
আঞ্জুমান সাইফ কে বলল
“বাড়িতে সিসি ক্যামেরা আছে মানে? এবার কি তুইও পাগল হলি?”
সাইফ নিজের ফোন থেকে সকাল ছয়টার থেকে ফুটেজ দেখালো সবাইকে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চামেলি ৭:১৪ মিনিটে ভিতরে ঢুকলো। ভিতরে এসে প্রথমেই ড্রইং রুম থেকে ঝাড়ু দেওয়া শুরু করলো। এমন সময় হাবিব এসে পেটাতে শুরু করে। হাবিব চৌধুরী শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল
“এ….. এটা কি করে হলো? ক্যামেরা কো….থায়?”
সাইফ করিডোর এর সামনের বড় আর্টিফিশিয়াল প্ল্যান্ট এর ডগা থেকে একটা মিনি ক্যামেরা নিয়ে এলো। সবার সামনে সেটা দেখিয়ে বলল
“ক্যামেরা এইযে। শুধু এটাতেই শেষ না। এই বাড়ির আনাচে কানাচে মোট ১৩ টি ক্যামেরা লাগানো আছে।”
নদীর কপালের ভাজ প্রশস্ত হলো। তাহলে সাইফ এভাবেই জেনেছিলো তুমুলের কথা। নদীর মনে পরে যায় সেদিনের কথা, যেদিন গ্রাম থেকে সবাই থেকে বাড়িতে আসলো। সাইফ নদীর রুমে গিয়ে হাতে নাতে ধরেছিলো তুমুল কে। নদীর ভাবনা অদিতিই বোকামি বসত বলে ফেলেছে সাইফ কে। এবার সব ক্লিয়ার হলো, সাইফ আসলে এর থেকেই জেনেছে। কিন্তু এতসব সাইফ কি জন্য করেছে তা বুঝে আসেনা নদীর।
তুযা হাবিবের সামনে দাড়িয়ে বলল
“এবার ভালোয় ভালোয় বলে ফেলো তোমার মতলব টা কি”
সাইফ বলল
“বড় মা দেখোতো গয়না গুলো ঠিক আছে কিনা”
লতিফা বেগম দেখতে ঘরে গেলো। আলমারি চাবি দিয়ে খুলে ভিতরে থেকে একটা লোহার বাক্স বের করলো। সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুলে দেখলো তাগে একটা গয়নাও নেই। লতিফা আহাজারি করে বাইরে বেরিয়ে এলো
“নেই রে নেই….একটা গয়নাও নেই”
হাবিব দরদর করে ঘামতে লাগলো। খেলাটা সাইফ আর তুযা এইভাবে ঘুরিয়ে দেবে ভাবেনি একবারও। সবাই তার কথা বিশ্বাস করে চামেলি কে জেলে দিবে এটাই তার ধারণা ছিলো। হাবিব ভেবে পাচ্ছে না, এই তুযা কেনো বেইমান এর মতো আচরণ করছে। ওয়াহাব চৌধুরী দুই ভাই, নিজের স্ত্রী, আর দুই ভাইয়ের বউ কে নিয়ে ঘরে চলে গেলো। অতিথি দের সামনে এমন কাহিনি ভালো দেখাবে না।
যা করার সব নিজেরা নিজেরা করা যাবে।। অদিতি আর ফুলমালা চামেলি কে টেনে তুলল। আজ গায়ে হলুদ নদীর। সকলে ব্যাস্ত থাকবে এমনিতেই। খাওয়া দাওয়া টাও সেড়ে নিতে হবে। সাইফ চামেলি কে কিছু টাকা দিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো। নদীর মামা মামী এবং রিশা নিজেদের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে খাবার টেবিলে। তুযা হাত মুখ ধুয়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে একবার রেডি হয়ে বাহিরে এসেছে। রিসা তুযার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল
“ হ্যালো ব্রো! আমি রিশা”
তুযা রিশার দিকে তাকালোও না। চেয়ার টেনে পাশে বসে বলল
“হাই হ্যালো ট্যালো বাদ দাও। সালাম দিতে শেখো। তোমার বড় আমি”
রিশা মুখ গোমড়া করে বলল
“আসসালামু আলাইকুম”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম”
রিশা হেসে বলল
“আপনি নদী আপুর বড় ভাই তাই না? দাড়ান আমি আপনাকে সার্ভ করছি”
তুযা সৌজন্য মূলক হাসি দিয়ে বলল
“লাগবে না তুমি খাও। ফুল, এই ফুল। খাবার দে তো আমারে”
রিশা উঠে গিয়ে বলল
“আরে আরে আমি দিচ্ছি”
ফুল মালা এগিয়ে এসেও দাঁড়িয়ে রইলো।
রিশা হাত দিয়ে পরোটা তুলে দিলো তুযার প্লেটে। মাংসের বাটি থেকে কয়েক পিস মাংস তুযার প্লেটে দিতেই ফুলমালা রিশার হাত ধরে ফেললো। প্লেট টা তুযার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে বলল
“উনি গরুর মাংস খান না আপা। আমনে খান, আমি হেরে খাওন দিতেছি।”
রিশা তুযার কাঁধে হাত দিয়ে বলল
“আ’ম সো সরি। একচুয়ালি আমি জানতাম না”
ফুলমালা তুযাকে খাবার দিচ্ছে আর বারবার রিশার দিকে দেখছে। মেয়েটা কেমন ধরছে তুযা কে। ও কখনো গায়ে হাত দেয় না, আর এই মেয়েটা…..
ফুলমালা তুযা আর রিশার মাঝখান দিয়ে ঢুকে তুযা কে খাবার দিলো। রিশা মৃদু ধাক্কায় সরে গেলো একটু।
দীঘি সামনে বসে দেখছে ফুলমালার কান্ড। মনে মনে বলল
“অন্তত আমাদের বাড়ির ভোদাই দুটোর চাইতে ভালো”
চলবে?
[ আগের পর্বের রিয়্যাক্ট খুবই কম 🙂। এমন হলে আমার লিখতে ইচ্ছা করে না। অবশ্যই জানাবে কেমন হলো 💜🫶। ]
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫