কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩৫
তুমুলের কন্ঠস্বর শুনার পর থেকেই অদিতি নিচে আসার জন্য আকুপাকু করছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে সাইফ ছাড়েনি অদিতিকে। সন্ধ্যার দিকে সাইফ ঘুমিয়ে পড়ার পর অদিতি নিচে এসেছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চামিলিকে কোথাও খুঁজে পায় না। সায়রা কে জিজ্ঞেস করে
“কাকিয়া। কেউ কি এসেছিলো?
সায়রা একটু রুক্ষ হয়েই বলল
“তুমি কার আসার কথা বলছ বলতো?”
অদিতি বুঝলো সায়রা তার কথা মোটেও পছন্দ করছেন না এবং উত্তর উনি দেবেন না। কন্ঠ নিচু করে মিনমিনে গলায় বলল
“না মানে নিচে কার যেন চিৎকার চেঁচামেচি…..”
অদিতির কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়রা বলল
“কত দিকল কান থাকে তোমার? ছোট মানুষ, ছোট মানুষের মত থাকবে। এত পাকনামো করতে কে বলেছে তোমাকে?”
অদিতি মাথা নিচু করে দীঘির রুমের দিকে হাটা দেয়। সায়রা আবারও পিছন থেকে ডাকে
“পারলে নদীর রুমটা একটু গুছিয়ে দিয়ে এসো। মেয়েটাকে কাল বাড়িতে আনা হবে”
নদীর বাড়ি ফেরার কথায় বেশ খুশি হয় অদিতি। নদীর রুমে গিয়ে ঘরটা গোছগাছ করে নেয়। মনে মনে ভাবছে চেঁচামেচির সময় যদি চামেলী বাড়িতে থেকে থাকে, তবে এই কথাগুলো সব শোনা যাবে।
বাড়ির সকলে যে যার ঘরে। হাসান চৌধুরী আর আঞ্জুমান নদীর সাথে হাসপাতালে। সাইফ ও ঘুমোচ্ছে। দীঘির পরীক্ষা চলে বিধায় রুম থেকে বের হয় না। এমনিতেও বাবা মায়ের চোখে বেশ অপরাধী হয়ে আছে দীঘি। তাই আর ড্রয়িং রুমে সচরাচর আসে না। অদিতি কোন কাজ না পেয়ে ছাদে চলে গেল।
এখন বেশ ভালোই গরম পড়ে। ছাদের ফুরফুরে হাওয়া ভালই লাগছে অদিতির। এ বাড়িতে আসার পর এই প্রথম ছাদে এলো। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বাতাস অনুভব করতে থাকে। বেশ শান্তি লাগছে, ওপর তলা থেকে নিচের বিল্ডিং গুলো কেমন ছোট ছোট দেখায়। যদিও এর থেকেও উঁচু উঁচু বিল্ডিং চারিদিকে দেখা যাচ্ছে। গ্রামে বড় হাওয়ায় কখনো কোন দালানের ছাদে চড়েনি অদিতি। তাই একটু বেশি ভালো লাগছে।
সিঁড়ি থেকে চামেলির গলার স্বর পাওয়া যায়। আদিতি পিছন ফিরে বলে
“চামেলিয়া আপা, এইখানে আমি। আসো।”
চামেলি ছাদে এলো। হাতে একটা বাটি। তাতে কিছুটা চালতার আচার। চিলেকোঠার ঘর থেকে একটা চেয়ার বের করে আনলো। অদিতিকে বসতে দিয়ে চালতার আচারের বাটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল
“খাইয়া দেখেন ভাবি। আমি কিন্তু ম্যালা ভালো আচার বানাই”
অদিতি বাটিটা হাতে নিয়ে বলল
“আরেকটা চেয়ার আনতে, তুমি কোথায় বসবে?”
চামেলী ছাদের ওপরই বসে পড়লো কোনো কিছু ছাড়া।
“আমার কিছু লাগবো না ভাবি। খান”
চামেলীর পোষাক আশাক অদিতির খুব একটা ভালো লাগে না। কিন্ত মানুষটার কথা বার্তা খুব ভালো। অদিতি কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করলো
“আচ্ছা চামেলি আপা। তোমার স্বামী কোথায় থাকে গো?”
চামেলি পা জড় করে বসে নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দিলো
“হ্যায় তো রিশকা চালায় ভাবি। ওই যে পাশের বস্তিতে আমরা থাহি। হ্যায় বাড়িতে যাওয়ার পথে আমারে রিশকা কইরা নিয়া যায়?”
অদিতি চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে চামেলীর দিকে
“তুমি বাচ্চা নিতে পারো তো এখন”
চামেলী মুচকি হেসে বলল
“কি যে কন না আপা। হ্যায় চালায় রিশকা। আমি করি মাইসের বাড়িত কাম। যা কামাই হ্যায় নেশা কইরা উড়াই দেয়। দুই প্যাট ই চলে না, আবার পোলাপান হইলে খাওয়ামু কইত্তে?”
এই সমস্যাটা অদিতি বুঝে। সে নিজেও গরিব ঘরের মেয়ে। তার বাবা মারা যাওয়ার পরে সংসারে যেই অভাবটা দেখা দিয়েছিলো। ভুলেনি অদিতি। অদিতির মা পাশের মিলে কাজ নিয়েছিলো। সেখানেও সুবিধা করতে পারেনি। পরবর্তী তে অদিতির মা কে গ্রামের লোক বুঝিয়ে শুনিয়ে বিয়ে দেয়। কিন্তু বিয়ের পরও সুখ হয়নি তার। স্বামী নেশা করতো, রোজ মারতো বাড়ি ফিরে। তারপর একদিন মারাই গেলো।
তখনই অদিতির জীবন টা কালো মেঘে ঢেকে গেলো। সৎ বাবা ঢাকায় কোনো আত্মীয় বাড়ি যাবে বলে নিয়ে এসে, বেচে দিলো কুঠিতে।
অদিতির গা শিউরে ওঠে। চামেলী অদিতি কে উদাস দেখে বলল
“কিও ভাবি। কতা কও না কেরে। আচার ডি ভালো হয় নাই?”
“ভালো হয়েছে। আচ্ছা তুমি এমন পোষাক কেনো পড়ো? খুব বাজে লাগে তোমাকে চামেলী আপা। তুমি মাশাল্লাহ কত সুন্দর। একটু শালীন হয়ে চলবে। দেখবে কত্ত ভালো লাগে দেখতে”
চামেলি অল্প হাসলো
“কী যে কন না ভাবি। দুনিয়ায় ভালো লোকের দাম আছে বুঝি? আগে না কত্ত ভালো আছিলাম। কই মাইনসে ভালো কওয়ার বদলে ইজ্জতে হাত দেবার চাইছে। অহন খারাপ হইছি। অহন ইজ্জত ও নাই, ইজ্জত হারানোর ভয়ও নাই”
অদিতি দেখলো হাসতে হাসতে কথা গুলো বললেও চামেলীর চোখের পাতা ভিজে উঠেছে।
অদিতি আচার খেতে খেতে বলল
“তোমার তো চেহারা সুরত মাশাল্লাহ, তা ওই লোকটার সাথে কেনো বিয়ে দিলো?”
চামেলী আকাশের দিকে তাকিয়ে মলিন মুখে বলল
“ছুডো কালে মায় মরছে। বাপে মাস ঘুরতেই বুয়া কইরা নিয়া আইলো। তাও বড় পোলা ওয়ালা এক বেডিরে। সেই পোলা নিয়া আমগো বাড়িত থাকতো। বাড়ির বেবাক (সব) কাম আমারে দিয়া হারাইতো। সকালে দুইডা রুটি আর রাইতে ওরা খাইয়া বাচলে এক মুঠ ভাত দিতো, না থাকলে পানি খাইয়াই শুইয়া পরতাম।
আব্বায় কোনো প্রতিবাদ করতো না। সেসব ওবদি ঠিকই ছিলো কিন্তু ওই মহিলার পোলা কেমন বাজে নজরে দেখতো আমারে। সুযোগ পাইয়া গায়ে হাত দিতো। আমি আব্বায়রে কইলেই সৎ মায় আমারে ধইরা মারতো।
আমিও চেষ্টা করতাম সব সময় ওর থেকে দূরে দূরে থাকার। কিন্তু একদিন সব সীমা পার করে ফেললো ও। আমি ছিলাম ১৩ বছরের। মায় আর বাপে গেছিলো পাশের গেরামে যাত্রা দেখতে। হেইদিন খালি বাড়ি পাইয়া আমারে……”
আর কথা বলে না চামেলী। আচল দিয়ে চোখ মুছে। অদিতিরও চোখ বেয়ে পানি পরছে চামেলীর কথা শুনে। চামেলী কিছুক্ষণ পর ভেজা গলায় বলল
“তারপর বাবা মায় বাড়িত আইলে কইলাম সব। মায় খুব মারলো আমারে। আব্বায় খুব চিন্তিত হইয়া বইসা রইলো। গেরামের লোক হুনলে ছি ছি করবো। মায় কইলো শিগগিরী বিয়া দিয়া দাও। সমাজের মাইনসে জানলে আর মুখ দেহান লাগবো না। তহন ধইরা বাইন্ধা মোড়ল বাড়ির কামের লোকের লগে বিয়া দিয়া দিলো।
রোজ নেশা কইরে আাড়িতে আহে ভাবি। রোজ গায়ে হাত তোলে আমার। যা বেতন পাই কাম কইরা, সব নিয়া যায়। নিজের জন্যও তো কিছু লাগে।”
অদিতি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চামেলীর দিকে। এই হাসি খুশি মানুষ টা এত কষ্ট বুকে নিয়ে
বেচে আছে? দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই।
আকাশ টা আজ বেশ গম্ভীর। বাংলা ক্যালেন্ডারে ফাল্গুন মাস যায়। মেঘ করছে বোধহয় একটু একটু। সিড়ি বেয়ে সাইফ আসে ছাদে। পরনে ট্রাউজার আর সাদা শার্ট, তার সব গুলো বোতাম খুলা। ঘুম থেকে ওঠায় চুল গুলো অল্প এলোমেলো। মুখটাও শুষ্ক। অদিতিকে বাড়িতে খুজে না পেয়ে ছাদে এসেছে।
চামেলী সাইফ কে দেখেই উঠে গেলো। সাইফ অদিতির পাশে এসে দাড়াতেই চামেলী আরেকটা চেয়ার এনে সাইফ কে নিয়ে চলে গেলো। সাইফ চেয়ার টেনে অদিতির গা ঘেষে বসে। ঘাড়ে মাথা রেখে হাস্কি কন্ঠে বলল
“আমাকে রেখে উঠে এসেছো কেন?”
অদিতি আচার খেতে খেতে বলল
“ অনেক সুন্দর চাঁদ উঠেছিলো। আরেকটু আগে এলে আপনাকে দেখাতে পারতাম। এখন তো মেঘে ঢেকে গেছে”
“তার চেয়ে সুন্দর চাঁদ তো আমার পাশে বসে আছে”
অদিতি মাথা টা নিচু করে নিলো লজ্জায়। সাইফ অদিতিকে আরো একটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল
“ওহে প্রেমিনি, তোমায় হালাল ভাবে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছি। প্রেম করবে আমার সাথে?”
অদিতি ওপর নিচ মাথা নাড়ে। সাইফ অদিতির কাধে চুমু দিয়ে বলল
“এখানে প্রেম করা যাবে না। রুমে চলো।”
অদিতি কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কোলে তুলে নিলো সাইফ। অদিতি কোলে চড়েই বলল
“এমন প্রেম আমি করতে চাই না। নামান আমায়। আপনি খুব খারাপ। আমাকে সাদাসিধে পেয়ে ফাঁসাচ্ছেন।”
সাইফের কানে যায় না কোনো কথাই। অদিতি কে রুমে এনে দরজা বন্ধ করে দেয়। অদিতিকে বিছানায় টেনে এনে অদিতির কাছে যেতে গেলে সরে যায় অদিতি। ফাজলামো করে বলে
“প্রকৃত প্রেমিক রা দেহ চায় না চৌধুরী সাহেব। প্রেম হয় মন দিয়ে”
সাইফ অদিতির পা ধরে টেনে আনে
“তোমার মনের মধ্যে কি আমি পোল্ট্রি মুরগির খামার দিবো? তোমার দেহই তো আমার লাগবে”
—-
ফুলহারা গ্রামে আজ প্রকৃতির গুমট ভাব বিদ্যমান। চারিদিকে জড়ো হাওয়া বইছে। এ বছরে বৃষ্টির আগমন দেখা যায় আগে আগেই। বাতাসে চারিদিকে আমের মুকুলের ঘ্রাণ মো মো করছে।
রাত ঘড়িতে ১০ টার কাটা ছুয়েছে। বাড়ির সবাই সজাগ। রাতে খাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কবিতা ওয়াহাব কে ছড়া পড়ে শোনাচ্ছে। লতিফা আর কদভানু খাবার গরম করছে রান্না ঘরে।
বাড়িতে প্রবেশের বড় লোহার দরজা টায় কেউ কড়া না। তুযা ছাড়া কেউ না। কদভানু যায় দরজা খুলতে। কবিতাও যায় পিছন পিছন। বাইরে এরই মধ্যে বৃষ্টির ঝাপটা শুরু হয়ে গেছে। কদভানু গেট খুলতেই দেখলো তুযা অর্ধভেজা হয়ে দাড়িয়ে আছে।
গ্রাম এলাকা, বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ থাকে না। হারিকেন এর মৃদু আলোয় কদভানু দেখলো তুযার পাশে বউ বেশে এক মেয়ে দাড়িয়ে। কবিতার ও চোখ এড়ালো না বিষয়টা। কদভানু চিৎকার করলো
“ও বড় আম্মাআআআআ, দ্যাহেন বড় ভাইজান বউ লই আইছে”
লতিফা আর ওয়াহাব চোকিতে তাকালো সদর দরজার দিকে। কবিতা দেওয়ালে ঝুলানো হারিকেন টা নিয়ে এগিয়ে গেলো ঘর সামনে। হারিকেনের আলোয় স্পষ্ট হলো বধূ সাজের মেয়েটার মুখ। কবিতা চেচিয়ে বলল
“ও মা এ দেখি জাবেদা।”
চলবে?
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৪