কি_আবেশে (১৮)
জেরিন_আক্তার
মহিলাটি মেরাবের কথায় ঘাবড়ে গেলেন। তবুও মুখ থেকে একটা কথাও বের করলো না। সময় যত যাচ্ছে মেরাব ততই রেগে যাচ্ছে। যা দেখে মহিলাটিও আর চুপ থাকতে পারলেন না। তাকে এখানে থেকে ছাড়া পেতে হলে এখন মুখ খুলতেই হবে। নাহলে তার মেয়েকে নিয়ে এখানেই পঁচে মরতে হবে।
মহিলাটি নিজে থেকেই বলে উঠলেন,
“আমি সব বলছি।”
মেরাব সাথে সাথে বলে উঠলো,
“আফনান মির্জার সাথে কি সম্পর্ক আপনার?”
“উনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
“তাহলে উনি আপনার বাড়িতে যায় কেনো?”
এই বলে মেরাব নিজের ফোন বের করে একটা ছবি দেখিয়ে বলল,
“এই দেখুন, আপনারা তিনজনে মিলে ছবিও তুলেছেন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আপনারা তিনজন একসাথে। কোনো কারণ ছাড়াই কি এই ছবি উড়ে উড়ে এলো?”
মেরাব ছবিটা পাশে থাকা মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল,
“এই পিচ্চি মেয়ে এদিকে তাকাও!”
মেয়েটা মেরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার নাম সুনেরাহ।”
মেরাব তপ্ত গলায় বলল,
“আমি নাম জানতে চাইনি। দেখো এই ছবিতে থাকা লোকটা কি তোমার বাবা?”
সুনেরাহ তার মায়ের দিকে তাকালো। এরপরে মেরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জি ভাইয়া। উনি আমার বাবা।”
এই কথা শুনতেই স্নেহা দু কদম পিছিয়ে গেলো। তার দুনিয়া থমকে দাড়ালো। বুক ফেটে কান্না আসছে। এই মুহূর্তে বড় বড় শ্বাস নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করলো। মেরাব স্নেহার দিকে একনজর তাকিয়ে সুনেরাহকে বলল,
“তোমরা এখানে রয়েছো তোমার বাবা জানে?”
“না।”
“ফোন নাম্বার দাও! আমি জানাচ্ছি।”
“জানিয়ে কোনো লাভ হবে না।”
“কেনো?”
পাশে থেকে আসিফ মেরাবকে বলল,
“নাম্বার কেনো চাইছিস ভাই, তোর কাছেই তো নাম্বার আছে।”
মহিলাটি তড়িৎ চোখে তাকিয়ে বলল,
“কি বলছো তুমি? আমার স্বামীর নাম্বার তোমরা কোথায় পেলে?”
মেরাব মহিলাটির কথা ইগনোর করে সুনেরাহর সামনে এসে বলল,
“এই মেয়ে ফটাফট বলে দাও তোমার বাবার নাম্বার। যদি জানতাম তুমিই সব বলে দিতে পারবে তাহলে শুধু শুধু ওই মহিলার মুখ চেয়ে বসে থাকতাম না।”
মহিলাটি খানিকটা রাগ নিয়ে বলল,
“আমি তোমার মায়ের বয়সী আর তুমি আমাকে মহিলা বলছো।”
মেরাব কর্কশ গলায় বলল,
“আপনার সাহস কি করে হয় আমার মায়ের সাথে নিজের তুলনা করার। আপনি আমার মাকে খুন করেছেন বলেই আমি আপনাকে ভালো কোনো উপাধি দিতে পারলাম না। আপনার ভাগ্য ভালো যে আমি এখনও আপনার কথা শুনছি। অন্য কেউ হলে না, সাথে সাথে মেরে ফেলতো।”
সামনে বসে থাকা মহিলাটি অর্থাৎ আয়েশা খাতুন মেরাবের কথা শুনে বললেন,
“তোমার মাকে আমি মারিনি। তুমি ভুল ভাবছো।”
মেরাব উনার কথা শুনে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সুনেরাহর সামনে এলো। সুনেরাহ ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়া, প্লিজ ছেড়ে দেন।”
“ছেড়ে দেবো। আগে তোমার বাবাকে কল দাও!”
সুনেরাহ কেঁদে কেঁদে বলল,
“ভাইয়া, আমার বাবাকে কল দিয়ে কোনো লাভ হবে না। উনি কথা বলতে পারে না। অসুস্থ, প্যারালাইসিস রোগী উনি।”
মেরাব নাক-মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল,
“সিরিয়াসলি!”
পাশে থেকে আসিফ ভাবনায় পড়ে গিয়ে বলল,
“এই মেয়ে তো দেখি ভালো মানুষটাকে প্যারালাইসিস বানিয়ে দিয়েছে। এই মেয়ে মিথ্যে বলছো কেনো?”
সুনেরাহ বলল,
“ভাইয়া মিথ্যে বলছি না। আমার বাবা কথা বলতে পারে না। হসপিটালে এডমিট রয়েছে।”
মেরাব স্নেহার দিকে তাকালো। স্নেহা আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি বলুন তো, আপনার স্বামী কোথায়?”
“আমার স্বামী হসপিটালে রয়েছে। আর সুনেরাহ যা বলেছে তাই সত্যি।”
মেরাব মনে মনে ভাবলো,,, এ কি করে সম্ভব। উনার হাসব্যান্ড যদি ইনি হয় তাহলে হসপিটালে কে ভর্তি। কি হচ্ছে মেরাবের মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। স্নেহা বসে পড়লো। কেউ এর গোড়ামাথা কিচ্ছু খুঁজে পাচ্ছে না।
মেরাব চট করে আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার স্বামীর নাম কি?”
আয়েশা বেগম নিচু গলায় বললেন,
“আহনাফ মির্জা!”
এবার মেরাবের কাছে সব পরিষ্কার। আফনান মির্জা আর আহনাফ মির্জা তাহলে দুজনে যমজ ভাই। ছবিটার মধ্যে আহনাফ মির্জা ছিলো। যার কারণে সবাই তাকে স্নেহার বাবাই মনে করেছিলো। আর সুনেরাহ ঠিকই বলেছে।
রাত নয়টা,,,
মেরাব স্নেহাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। মেরাব ড্রাইভ করছিলো। স্নেহা পাশে বসে আছে। স্নেহা সব জানার পরে খুশিই হয়েছে। যাই হোক মনের ভাবনাগুলোই সত্যিই ছিলো। স্নেহা সব চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে বড় বড় শ্বাস ছাড়লো। অনেকটাই হালকা লাগছে। এর একটু পরে মেরাবকে বলল,
“এইযে শুনুন, খুব খিদে পেয়েছে। কিছু একটা অর্ডার করুন না। বাড়ি যেতে যেতে নাহয় সেটাও পৌঁছে যাবে।”
মেরাব মুখ বেকিয়ে বলল,
“বাব্বাহ, কাদতে কাদতে আবার খিদেও পেয়ে গিয়েছে তোমার। আরেকটু নাহয় কাঁদো তাহলে খিদে টুকুও চলে যাবে।”
স্নেহা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলল,
“বাজে কথা বন্ধ করুন। খাবার অর্ডার করুন!”
মেরাব নিজের ফোন বের করে বলল,
“কি খাবে?”
“আপনি যা খাবেন তাই অর্ডার করুন।”
“ঠিক আছে। আর কিছু খেতে ইচ্ছে করলে বলো। পরে কিন্তু আমি আর কিছু অর্ডার করতে পারবো না।”
“তাহলে ফোনটা আমার কাছে দিন, আমি অর্ডার করছি।”
মেরাব ফোন দিয়ে বলল,
“আপাতত বাহিরের কিছু খাবে? গাড়ি থামিয়ে কিছু কিনে দেই?”
“না, আমি অর্ডার করে নিচ্ছি।”
স্নেহা ফোনে খাবার অর্ডার করার পরে ফোনটা মেরাবকে দিয়ে দিতে নিয়ে আবার ঘুরিয়ে আনে। ওদের বিয়ে হয়েছে কিন্ত এই পর্যন্ত একসাথে কোনো ছবিই তুলেনি। স্নেহা মেরাবের ফোন নিয়ে ছবি তুলতে লাগলো। মেরাব ভ্রু উঠিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“কি ব্যাপার হঠাৎ আমার ফোনে ছবি তুলছো?”
“গ্যালারি তে ঢুকে আমার ছবি দেখলেই যেনো মনে হয় আপনি বিবাহিত তাই জন্য নিজের ছবি তুলে দিচ্ছি।”
মেরাব হাসবে না অবাক হবে তা ভুলে গিয়েছে। স্নেহা ছবিগুলো তুলে গ্যালারি তে ঢুকলো সেগুলো দেখতে। স্নেহা নিজের ছবিগুলো দেখতে দেখতে স্ক্রল করে নিচে নামে। সেখানে নিজের কয়েকবছর আগের ছবি দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। সাথে কয়েক মাস আগের তোলা কিছু ছবিও রয়েছে। স্নেহা মেরাবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু সুরে বলল,
“আমার ছবি আপনার ফোনে কি করে এলো?”
মেরাব তৎক্ষণাৎ ছো মেরে ফোনটা নিয়ে নিলো। স্নেহা মেরাবের দিকে ঘুরে বলল,
“কি হলো বলছেন না কেনো?”
“কি বলবো?”
“আমার ছবি এখানে এলো কি করে?”
মেরাব গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“এখানে আসবে না তো কোথায় আসবে? অন্যের ফোনে?”
“কথা সেটা না। এই ছবি তো আমি কাউকে দেইনি তাহলে আপনি পেলেন কোথায় থেকে?”
“কোথায় থেকে পাবো এটা আবার কেমন কথা! তোমার ছবি আমার ফোনে আসতেই পারে কারণ তুমি আমার ওয়াইফ।”
“আপনি কথা ঘোরাচ্ছেন কেনো? আমি আপনার ওয়াইফ হওয়ার আগের ছবিগুলো এখানে। সেগুলো তো আপনার ফোনে থাকার কথা না।”
ব্যাস এইটুকু শোনার পরে মেরাব ধমক দিয়ে উঠে,
“এই চুপ! এক কথা কান দিয়ে যায় না। বলছি না ছবি থাকতেই পারে। এতে এতো উতলা হওয়ার কি আছে।”
“আপনি আমায় ধমক দিলেন?”
মেরাব দাঁত এলিয়ে হেসে বলল,
“কি যে বলো তুমি আমার দশটা না, পাঁচটা না একটা মাত্র বউ। তোমাকে ধমক দিতে পারি আমি। এটা এক্সট্রা ভালোবাসা।”
স্নেহা মুখ ভেঙচি দিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো। মেরাব আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। স্নেহা রেগে থাকলেও মনে মনে যে কি খুশি হয়েছে তা বলার বাহিরে। তার মানে মেরাব তাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করতো। স্নেহার ইচ্ছে করছে মেরাবকে ধরে চুমু খেতে। কিন্তু না বোঝার ভান করে বসে রইলো এই দেখতে যে মেরাব কি করে।
বাড়িতে এসে মেরাব স্নেহাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্ক করতে গেলো। স্নেহা ততক্ষনে বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাড়ালো। মেরাবের কাছে চাবি রয়েছে। মেরাব এসে মেইন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“কি জীবন, বিয়ের পরে লোকের বউ রান্না করে ফাটাফাটি বাঁধিয়ে দেয়। আর আমার বউ কি রান্না করে খাওয়াবে তাকেই বাহিরে থেকে খাবার এনে খাওয়াতে হচ্ছে।”
স্নেহা পেছনে থেকে বিড়বিড় করে বলল,
“কিপ্টে কোথাকার। বলতে তো পারে না টাকা ফুরিয়ে যাবে। আর অন্য কথা বলছে।”
এই শুনে মেরাব মুখ বেকিয়ে বলল,
“সত্যি কথা বলেছি আর গায়ে লেগেছে।”
স্নেহা তেড়ে গিয়ে বলল,
“এই কি বললেন?”
মেরাব পেছনে ফিরে স্নেহার সামনে দাড়িয়ে বলল,
“দেখেছো তুমি এখনও কানে শুনতে পাওনি। বয়রা তুমি। তোমাকে কালকেই ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবো।”
স্নেহা চোখ বড় বড় করে তাকালো। তার ভালো দুটো কানকে বয়রা বানিয়ে দিলো। আসলেই কি সে বয়রা।
স্নেহা মেরাবের সাথে তর্কে যেতে চায় না। তাই মেরাবকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেলো। মেরাব পেছনে থেকে ঠেস মেরে বলল,
“চুপচাপ সম্মতির লক্ষণ এখন বুঝতে পারলাম। আসলেই যে কানে শুনতে পাও না প্রমান হয়েই গেলো।”
স্নেহা রেগে এগিয়ে এসে পাশে থেকে সোফার কুশন নিয়ে মেরাবকে মারতে লাগলো। মেরাব পিছিয়ে যেতে যেতে সোফায় থেকে নিজেও একটা কুশন নিয়ে স্নেহার থেকে আসা আঘাত আটকাচ্ছিল। ঠিক তখন বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠে। দুজনেই সেদিকে তাকিয়ে কুশন জায়গা মতো রেখে দেয়।
মেরাব মনে করে হয়তো ডেলিভারি ম্যান এসেছে। তাই এগিয়ে গেলো। কিন্তু ডেলিভারি ম্যান আসেনি। এসেছে মেরাবের দাদার ছোট ভাই মোজাম্মেল খান। হাতে লাঠি ভর করতে করতে ভিতরে ঢুকলেন। মেরাব তাকে ধরে বলল,
“দাদু তুমি এতদিন পরে?”
“হুম। শুনলাম তুমি এসেছো তাই দেখা করতে এলাম।”
“এসো বসো।”
“বাড়ির সবাই কই?”
“দাদু বাড়ির সবাই গ্রামে গিয়েছে।”
“ওহ।”
মোজাম্মেল খান স্নেহাকে দেখে বললেন,
“মেরাব, ও কে?”
মেরাব শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
“দাদু ও আমার ফুফাতো বোন।”
“ওহ। বিয়ে হয়েছে?”
“না। দাদু!”
স্নেহা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। মোজাম্মেল খান বললেন,
“মেরাব আমার কাছে একটা ভালো ছেলে আছে। ওর সাথে তোমার ফুফাতো বোনকে ভালো মানাবে।”
মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে মোজাম্মেল খানকে বলল,
“দাদু, ছেলে কি করে?”
স্নেহা আর দাঁড়ায় না। রাগে গটগট করতে করতে চলে যায়। নিজের ফোন বের করে মেরাবকে মেসেজ লিখে—-আপনি শুধু আজ রুমে আসেন, আপনার ঘাড় মটকাবো।
এদিকে মেরাব তৎক্ষণাৎ মোজাম্মেল খানকে বলল,
“দাদু, ও আমার বউ।”
“কিহ! তুমি বিয়ে করলে কবে?”
“করেছি কয়েকদিন হলো।”
মোজাম্মেল খান হেসে বললেন,
“ওহ ভালোই করেছো। তবে আমি বুঝতে পারিনি প্রথমে ভুল করেই বলে ফেলেছি ওই কথা।”
“সমস্যা নেই দাদু।”
মিনিট পাঁচেক পরে মোজাম্মেল খান উঠে বললেন,
“তাহলে আজ আসি।”
“এখনই চলে যাবে?”
“হুম, বাহিরে ড্রাইভারকে রেখে এসেছি।”
“ওহ।”
মোজাম্মেল খান চলে যেতেই মেরাব নিজের ফোন বের করে। বেশ আন্দাজ করতে পারছে এখন যে মেসেজ দিয়েছে সেটা স্নেহাই। মেরাব স্নেহার মেসেজ দেখে কি লিখবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। তবে স্নেহাকে আরও রাগাতে ছোট্ট করে লিখলো—-পেত্নী!
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে ইফতারের পরেই দিবো ইনশাআল্লাহ। আর যারা যারা গল্প পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ২
-
কি আবেশে পর্ব ১৪
-
কি আবেশে গল্পের লিংক
-
কি আবেশে পর্ব ৯
-
কি আবেশে পর্ব ১২
-
কি আবেশে পর্ব ১১
-
কি আবেশে পর্ব ১৫
-
কি আবেশে পর্ব ১০(স্পেশাল পার্ট)
-
কি আবেশে পর্ব ৪
-
চোরাবালির পিছুটানে ৩