কি_আবেশে (৪২)
জেরিন_আক্তার
মারুফুল খান ঠাই দাড়িয়ে রইলেন মেরাবের গাড়ির সামনে। সাদাফ মেরাবের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেরাব গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো। মারুফুল খান এগিয়ে এলেন। ছেলেকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না। ভাবলেন রেডি-সেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছে।ছেলেকে বললেন,
“মেরাব কোথায় যাচ্ছো?”
“হসপিটালে।”
মারুফুল খান কপালে ভাজ ফেললেন,
“হসপিটালে কেনো?”
“এক বন্ধুর ছেলে হয়েছে। সেখানেই দেখতে যাচ্ছি।”
“ঠিক আছে। যাও।”
মেরাব তার বাবার সন্দেহ দূর করতে প্রতিবারের মতো এবারও বলে উঠলো,
“তুমি চলো সাথে!”
“না, আজকে যাবো না। শরীরটা ভালো লাগছে না। শুয়ে পড়বো।”
“ওহ। বেশি খারাপ লাগলে শুয়ে পড়ো।”
মারুফুল খান মেরাবের কাঁধে হাত রেখে হালকা হেসে বললেন,
“সাবধানে থেকো। আর সাদাফ!”
“জি, বড় আব্বু!”
“ও যেনো ড্রাইভ না করে। আর যদি তোকে ড্রাইভ করতে না দেয় কল দিবি আমাকে।”
“ঠিক আছে, বড় আব্বু।”
মেরাব হেসে বলল,
“বাবা, আমি কি ছোট নাকি যে এখন কল দিবে।”
“ছোটই কি আর বড়ই কি, তুমি আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। তোমার কিছু হোক তা আমি চাইনা।”
মেরাব হাসলো। মারুফুল খান বললেন,
“যাও তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।”
“ঠিক আছে। তুমি রেস্ট নাও গিয়ে।”
“হুমমম।”
মারুফুল খান চলে যেতেই মেরাব আর সাদাফ গাড়িতে উঠে বসলো। সাদাফ ড্রাইভ শুরু করলো। মেরাব আসিফকে কল দিলো….আসিফ বলল,
“কিরে ভাই কেমন আছিস?”
“ভালো আছি। তু্ই কেমন আছিস?”
“ভালো। কি করছিস?”
“তোর বাড়ির দিকে যাচ্ছি!”
“আমার বাড়ির দিকে?”
“হুমমম। রেডি হ!”
আসিফ বলল,
“কোনো সিক্রেট কাজ নাকি?”
“হুমম।”
“আয়, আমি রেডি হয়ে বের হচ্ছি।”
“তাড়াতাড়ি আয়!”
“ওকে।”
আসিফ ফোন রেখে বিছানায় থেকে নামলো। কাভার্ড থেকে জামাকাপড় বের করে ওয়াশরুমে ঢুকলো চেঞ্জ করতে। মৌ রুমে এসে বিছানায় বসলো। আসিফ ড্রেস চেঞ্জ করে বের হলো। মৌ জিজ্ঞাসা করলো,
“কোথাও যাবেন নাকি?”
“হুমমম।”
“কোথায়?”
“রেস্টুরেন্টে।”
“মাত্র না এলেন। আবার যাবেন?”
“কি করবো কাজ পড়ে গিয়েছে।”
“ওহহ, আচ্ছা।”
“কখন আসবেন?”
আসিফ ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“কেনো, কোনো দরকার?”
“হুমমম।”
“কি দরকার?”
মৌ চট করে বলে দিলো,
“আপনাকে।”
আসিফ হেসে বলল,
“আমাকে!”
মৌ মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলল,
“না মানে, আজকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন সেটা বোঝাতে চেয়েছি।”
আসিফ ভেবেছিলো মৌ হয়তো ওকেই চায় বলবে। কিন্তু মৌ ওকে চেয়েও কথা ঘোরালো। আসিফ এই মুহূর্তে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আসবো না।”
“আসবেন না?”
“না, আসবো না।”
বলেই চলে গেলো আসিফ। মৌ পেছন পেছন এসে ডাক দিলো,
“শুনুন!”
আসিফ একটু দাড়ালো। পেছন না ফিরে বলল,
“কিছু লাগবে?”
মৌ মাথা কাত করে বলল,
“একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। প্লিজ।”
“চেষ্টা করবো।”
বলে আসিফ চলে গেলো। মৌ সাথে সাথে আসিফের মায়ের রুমে চলে গেলো। টুকটাক কথা বলে রুমে চলে এলো মৌ। সারা বাড়িতে ও একা। ওই আসিফ থাকলে কথা হয়, এইটা-সেইটা করা হয়। তাছাড়া শাশুড়ির সাথে কতক্ষন কথা বলবে।
মেরাব আসিফকে ওর বাড়ির সামনে থেকে উঠিয়ে নিলো। এরপরে ওরা চলে গেলো আহনাফ মির্জার বাড়িতে। মেরাব, আসিফ, সাদাফ হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো বাসার ভিতরে। আয়েশা বেগম সুনেরাহকে পড়াচ্ছিলেন। তিনি মেরাব, আসিফ, আর সাদাফকে দেখে অবাক হলেন বৈকি। ওদের এই সময় আসার তো কোনো কারণ নেই। আগের ঝামেলা গুলো তো মিটেই গিয়েছে এখন আবার কি নিয়ে আসবে।
আসিফ আশেপাশে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“আপনার স্বামী কই? পালিয়েছে নাকি?”
“আশ্চর্য তো, পালাবে কেনো? আর তোমরা এই সময় কি জন্যে এসেছো।”
আহনাফ মির্জা রুম থেকে বাহিরে এলেন। মেরাব তার সামনে গিয়ে কর্কশ গলায় বলে উঠলেন,
“আপনার ছেলে কোথায়?”
আহনাফ মির্জা বললেন,
“আমার ছেলে মানে?”
“দেখুন, আমি না জেনে আসিনি। আপনার ছেলে কোথায় আছে বের করুন! নাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
“আমার ছেলে আমাদের সাথে থাকে না।”
“থাকে না, নাকি মিথ্যে বলছেন?”
“না, মেরাব মিথ্যে বলছি না। ও আমাদের সাথে থাকে না।”
মেরাব তপ্ত গলায় বলল,
“তাহলে, আমাকে কেনো মারতে এসেছিলো।”
আহনাফ মির্জা বললেন,
“বেয়াদবটা তোমাকে মারতে গিয়েছিলো? ও তো আমাদের সাথে থাকে না। যোগাযোগও করে না।”
মেরাব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিঃক্ষেপ করে বলে উঠলো,
“সিরিয়াসলি?”
“হুমমম।”
“ওর ঠিকানা জানেন?”
“না।”
“ঠিকানা জানেন না, তবে বের করবেন। আমি আবার আসবো। তখন যদি আপনার ছেলের খবর না দিতে পারেন তাহলে দেখবেন মেরাব কি করতে পারে।”
তিনজনে বেরিয়ে গেলো। ওদের এখানে আসাটাই বৃথা গেলো। তিনজনে গাড়িতে উঠে বসলো। মেরাব, সাদাফ সামনে আর ব্যাক সিটে আসিফ একা। কিছুদূর যেতেই আসিফ এগিয়ে এসে মেরাবকে বলল,
“ভাই, আর কোথাও না গিয়ে আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিস তো!”
“কেনো? তোর আবার এতো তাড়া কেনো?”
আসিফ সাদাফের দিকে একপলক তাকিয়ে মেরাবকে বলে উঠলো,
“তোর বোন যেতে বলেছে।”
মেরাব আসিফের দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সাদাফ হাসতে চেয়েও পারলো না।
আসিফ থমথমে মুখে বলল,
“হাসছিস কেনো ভাই?”
মেরাব হাসি থামিয়েও থামাতে পারলো না। ওভাবেই বলে উঠলো,
“ভাবা যায় তোর মতো জেদি ছেলেকেও ওই পুঁচকে মেয়ে শাসন করছে। ওহ এখন তো আবার বউ।”
আসিফ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“হাহ, ভাই আমি নিজেই নিজেকে দেখে কনফিউজড হয়ে যাই। যতই হোক বউ তো। ওরই তো কথা শুনতে হবে।”
মেরাব বলল,
“হুমম। শোন, ভালো করে শোন।”
পাশ থেকে সাদাফ বলল,
“ভাইয়া, আমাদের বোন যদি রাতে মেহেদী লাগিয়ে দিতে চায় তাহলে কিন্তু নিয়েন।”
মেরাব হেসে বলল,
“সাদাফ, এতক্ষনে আসল কথা বলেছিস। দাড়া আমি আমার বোনকে বলছি।”
আসিফ মুখটা ছোট্ট করে বলে উঠলো,
“মেরাব ভাই আমার, প্লিজ এসবে জড়াস না।”
মেরাব আসিফকে ওর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। এর মাঝে স্নেহা মেরাবকে কল দিলো….
“হ্যালো আপনি কোথায়? এতো রাত হলো আসছেন না কেনো?”
“আসছি।”
“ঠিক আছে। সাথে কেউ আছে?”
“হুম, সাদাফ।।”
“ঠিক আছে। সাবধানে আসুন। এরপরে মজা বোঝাবো, এই অসুস্থ শরীর নিয়ে বাহিরে যাওয়া বের করবো।”
“আচ্ছা, যা বোঝানোর বুঝিও। আর আমাকেও কিছু বোঝাতে দিও।”
“ঠিক আছে, আগে আসুন।”
এদিকে,,, আসিফ বাড়িতে ঢুকে ডুব্লিকেট চাবি দিয়ে মেইন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো। ভেবেছিলো কেউ হয়তো জেগে নেই। কিন্তু ড্রইং রুমে পা রাখতেই দেখলো মৌ গুটিশুটি মেরে সোফায় বসে আছে। রাত তখন একটা ছুঁইছুই।
আসিফ কপালে ভাজ ফেলে এগিয়ে এলো। মৌ সোফায় থেকে পা নামিয়ে স্বস্তি ফেলে বলল,
“এসে গিয়েছেন?”
“হুমম। আর তুমি জেগে আছো কেনো?”
“আপনি আসবেন বলে বসে ছিলাম।”
আসিফ মৌয়ের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। আসিফ বেশ কয়েকদিন ধরেই লক্ষ করছে মৌয়ের অনুভূতি পাল্টে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম আসিফের আসার জন্য অপেক্ষা করতো না, ঘুমিয়ে পড়তো। আর এখন আসিফ যত রাতেই ফিরে আসুক না কেনো মৌ জেগে থাকবে।
আসিফ মৌকে উঠে রুমে যেতে বলল। এখনও মৌ ঘুমে টলমল করছে। মনে হচ্ছে এখনই কাত হয়ে পড়ে যাবে। আসিফ চাবি আর ফোনটা পকেটে ভরে এক ঝটকায় মৌকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। এই মুহূর্তে মৌয়ের ঘুম আর ঘুম নেই। ঘুমের রেশ কেটে গিয়েছে। আসিফ মৌকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেলো। মৌ পড়ে যাওয়ার ভয়ে আসিফের গলা পেঁচিয়ে ধরলো।
মেরাব রুমে ঢুকেই এক টানে শার্টটা খুলে ফেললো। পিঠে অনেকটাই কেটে গিয়েছে। যার কারণে সেই থেকে জ্বলছে কিন্তু ওদের সামনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সয়ে গিয়েছে। মেরাবের ইচ্ছে করছে স্নেহাকে আবারও কামড়ে দিতে। যেই ভাবা সেই কাজ। মেরাব ড্রেসিং টেবিলে থেকে নেইল কাটার নিয়ে বিছানায় এসে স্নেহাকে ডাকতে লাগলো।
“স্নেহা, এই স্নেহা!”
স্নেহা চোখ খুলে উঠে বসলো। মাত্রই এসে শুয়েছে। ঘুমটাও বেশি গভীর হয়নি।
“কখন এলেন?”
“এসেছি অনেকক্ষন হলো।”
“কই, আমি না একটু আগেও দেখে এলাম। আর এমন খালি গায়ে রয়েছেন কেনো? কিছু খাবেন এখন, বানিয়ে দেবো?”
“না, তোমার হাত দাও তো!”
“কেনো কি করবেন?”
“একটা সারপ্রাইস আছে। আমার হাতের উপরে হাত রাখো।”
স্নেহা সারপ্রাইসের কথা শুনে সাথে সাথে হাত রাখলো মেরাবের হাতের উপরে। মেরাব স্নেহার বাম হাতটি ধরে নেইল কাটার বের করলো। স্নেহা তখনই একটু চিৎকার দিয়ে উঠে বলল,
“এই না, এগুলো আমার কষ্টের নখ। এগুলো কাটবেন না।”
“তোমার কষ্টের নখ আমাকে একবারে মাংস উঠিয়ে দিয়েছে। এই নখ আজকে কেটেই ছাড়বো।”
“না না, প্লিজ। কিচ্ছু করবেন না। আমি আর খামচি দিবো।”
মেরাব মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলো,
“নাহ, তোমাকে দিয়ে বিশ্বাস নেই। আবার কখন না কখন খামচি দিবে। আমি নিজেকে নিয়ে কোনো রিস্কে থাকতে চাই না।”
মেরাব জোরপূর্বক স্নেহার হাতের নখগুলো কেটে ফেললো। স্নেহা রেগে গিয়ে বলল,
“আমি খামচি দিয়েছি বলে আমার নখ কাটলেন। আর আপনি যে আমাকে কামড় দিয়েছেন।”
মেরাব বাকা হেসে বলল,
“তাহলে কি আমার দাঁত ভাঙবে?”
স্নেহা বিড়বিড় করে বকতে বকতে শুয়ে পড়লো। পেছনে ফিরে মেরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি মামনি কে বলে দিবো। আমার নখ কেটে দিয়েছেন।”
মেরাব হেসে বলল,
“আগে দেখো উনার সামনে যেতে পারো কিনা। এমন জায়গায় কামড় মেরেছি ঢাকতেও তো পারবে না। ইচ্ছে করছে আরও দুটো দেই।”
স্নেহা রাগে কটমট করে তাকালো। মেরাব নেইল কাটার রেখে রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে বিছানায় বসলো। স্নেহা মেরাবের পেছনে বসলো। পিঠের ক্ষত জায়গায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বিছানায় থেকে নেমে গেলো। একটা মলম নিয়ে এসে লাগিয়ে দিয়ে বসলো। মেরাব স্নেহার মুখের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“আমি তোমার গলায় একটু স্পেশাল মলম লাগিয়ে দেই?”
“স্পেশাল মলম?”
“হুমমম। দিবো?”
“দিন।”
মেরাব স্নেহার গলায় কয়েকটা ছোট ছোট চুমু খেলো। স্নেহা মুচকি হেসে বলল,
“এইটাই কি স্পেশাল মলম নাকি?”
“হুমম। কেমন?”
“মোটেও ভালো না।”
“সিরিয়াসলি?”
“হুমমম।”
মেরাব স্নেহার কোমর ধরে কাছে এনে বলল,
“ভালো জিনিস নিবে?”
স্নেহা হেসে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। মেরাবের এমন কথা বলায় স্নেহা কি যে লজ্জা পেয়ে গিয়েছে। দুহাত দিয়ে মুখ ছাপিয়ে বলে উঠলো–ইশ কি লজ্জা।
চলবে….
নেক্সট পার্ট স্পেশাল হবে। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৮
-
কি আবেশে পর্ব ২৬
-
কি আবেশে পর্ব ১৮
-
কি আবেশে পর্ব ২৮
-
কি আবেশে পর্ব ৪
-
কি আবেশে পর্ব ৩৮
-
কি আবেশে পর্ব ৩২
-
কি আবেশে পর্ব ১২
-
কি আবেশে পর্ব ১৬
-
কি আবেশে পর্ব ৫