কি_আবেশে (৩৮)
জেরিন_আক্তার
মেরাব কলেজে চলে যাওয়ার পরেই স্নেহা, সাইদা আর মাহিনের কাছে আসে। মেরাবকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ফাহমিদা খানকে মা ডাকানোর জন্য ও একা কিছুই করতে পারবে না। আর মেরাব যেই পরিমানে চালাক ও কিছুতেই এই চ্যালেঞ্জ এ হারবে না। উল্টো ওকেই হারাবে। যাই হোক স্নেহা হারতে চায় না। তাই সাইদা আর মাহিনের থেকে সাহায্য নিতে এসেছে। মাহিন থাকলে ওর আর চিন্তা কি? মাহিনের যে শয়তানি বুদ্ধি। ওর ধারাই চ্যালেঞ্জ টা জিততে পারবে স্নেহা।
মাহিন শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলো। সাইদা পাশে বসে মোবাইল স্ক্রল করছিলো। স্নেহা নক রুমে এসে সাইদার পাশে বসলো। সাইদা মোবাইল রেখে বলল,
“কিরে তোকে এমন লাগছে কেনো? কিছু নিয়ে চিন্তায় নাকি?”
“হুম। অনেক বড় একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।”
মাহিন টিভির দিকে তাকিয়েই বলে উঠলো,
“কি চিন্তা শুধু একবার বলো! তোমার সব চিন্তা গায়েব করে দিচ্ছি।”
স্নেহা মাহিনের দিকে বসে বলল,
“দুলাভাই! আপনার থেকে একটা হেল্প চাই!”
“বলে ফেলো!”
“দুলাভাই, মেরাবকে জানেনই তো, ও মামনিকে এই পর্যন্ত ডাকেনি। কঠিন বিপদে পড়লেও ডাকে না। বলে ইতস্তত লাগে।”
“হুম, লাগবেই তো! ও ছেলে মানুষ। মেয়ে মানুষ হলে কবে জড়িয়ে ধরে ন্যাকা কান্না কাঁদতো!”
সাইদা মাহিনের কাধে হালকা চাপর মেরে বলল,
“ওগুলো বাদ দিয়ে কি করা যায় ভাবো!”
স্নেহা বলল,
“আমি উনাকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছি। বলেছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে উনার মুখ থেকে মা ডাক বের করবো।”
মাহিন ভাবুক গলায় বলল,
“বুঝেছি। এখন কোথায় মেরাব?”
“কলেজে গিয়েছে।”
“আসবে কখন?”
“বলে যায়নি। তবে বলে দিয়েছি কলেজ থেকে বের হয়ে একবার কল দিতে।”
“ঠিক আছে। এখন এখানে যা করার আমাদেরই করতে হবে। আর বড় আম্মু কোথায়?”
“দেখে আসলাম তো মৌয়ের সাথে বসে আছে। ওরা একটু পরে চলে যাবে।”
মাহিন বিছানায় থেকে নেমে বলল,
“একটু পরেই চলে যাবে যখন, তাহলে চলো ওদের সাথে দেখা করে আসি।”
বলেই মাহিন চলে গেলো। স্নেহা বোকা বনে চলে গেলো। ও এসেছিলো মাহিনের থেকে সাহায্য চাইতে আর সেই চলে গেলো ওকে রেখে। সাইদা বিছানায় থেকে নেমে বলল,
“দেখ, আমরা যে এখানে বসে আছি তার উপরে চলে গেলো। কেমন লাগে! আয় তো!”
মেরাব কলেজে এসে কিছু কাজ করে তার বাবার কেবিনেই বসে ছিলো। মারুফুল খান গিয়েছেন থার্ড ফ্লোরে। মেরাব বসে বসে বোর হচ্ছিলো বলে স্নেহাকে ফোন দিলো। স্নেহা ফোনটা রুমে রেখে ড্রইং রুমে ছিলো বলে ধরতে পারেনি। মেরাব দুই থেকে তিনবার কল দেওয়ার পরে কোনো উত্তর না পেয়ে আর কল দিলো না। মনে মনে ভাবলো স্নেহা হয়তো মাহিনদের সাথেই চ্যালেঞ্জটা নিয়ে কথা বলছে। মেরাব এই চব্বিশ ঘণ্টায় মা ডাকবে না। চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে গেলে ডাকবে। এতে চ্যালেঞ্জটাও জিতে যাবে। ভাবতে ভাবতে মেরাব বাকা হেসে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
“তোমরা যত যাই করো আমি এই চব্বিশ ঘণ্টায় মুখ দিয়ে মা শব্দটা বের করবো না চব্বিশ ঘন্টা চলে গেলে মা ডাকবো। সমস্যা নেই। আর মানুষটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তাকে এবার মা বলে ডাকতেই হবে নাহলে নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে যাবো।”
মেরাব একা একা বিড়বিড় করে কি যেনো বলছে দেখে মারুফুল খান বললেন,
“কি ব্যাপার ছেলে কি পাগল হয়ে গেলো নাকি?”
মেরাব মশকরা করে বলে উঠলো,
“যে বউ এনে দিয়েছো পাগলই হতে হবে।”
এ কথা বলে মেরাব মারুফুল খানের চেয়ারে থেকে উঠে দাড়ালো। মারুফুল খান হাত উঠিয়ে ওখানেই বসতে বলে নিজে ছেলের মুখোমুখি বসে বললেন,
“বউ নিজেই পছন্দ করে রেখেছিলে আমরা শুধু বিষয়টা এগিয়ে দিয়েছি।”
“হুম, তোমরা না থাকলে এতো তাড়াতাড়ি পেতামও না।”
“তবে, এখন কি প্ল্যান, শশুরবাড়ি যাবে না? ওরা যেতে বলছে তোমাদের সবাইকে।”
“বাড়িতে গিয়ে বলছি। দেখি ওরা কি বলে।”
“ঠিক আছে।”
এমন সময় স্নেহা কল দেয়। মেরাব কল রিসিভ করতেই স্নেহা বলল,
“আপনি কল দিয়েছিলেন তখন নিচে ছিলাম। এখন রুমে এসে দেখলাম কল দিয়েছিলেন। কিছু হয়েছে?”
“না, এমনিই কল দিয়েছিলাম।”
“ওহ, কি করছেন?”
“বসে আছি। তুমি? নিশ্চই দুলাভাইয়ের থেকে কু-বুদ্ধি নিয়ে এলে!”
“মানে?”
“আমাকে চ্যালেঞ্জএ হারাতে দুলাভাইয়ের স্বরণাপন্ন হয়েছিলে না?”
“হুম।”
স্নেহা মনে মনে বলল, এই লোকটা সব জানে কি করে? গণক নাকি?
মেরাব বলল,
“তাহলে কু-বুদ্ধি নিতে থাকো, কিচ্ছুটি করতে পারবে না। আমি ঘন্টা খানিক পরে আসছি!”
“ঠিক আছে।”
“আর কিছু আনতে হবে?”
স্নেহা মেরাবকে দেরি করানোর জন্য বলল,
“হুম, আনতে হবে!”
“কি, বলো!”
“আমার জন্য একটা শাড়ি আনবেন।”
মেরাব কপাল কুঁচকে বলল,
“শাড়ি!”
“হুম।”
“আরও কিছু?”
“না, তবে শাড়িটা যেনো পছন্দ হয় এইরকম দেখে আনবেন। যদি পছন্দ না হয় তাহলে আবার পাঠাবো শাড়ি কিনতে।”
“ঠিক আছে।”
মেরাব ফোন কেটে দিলো। কেবিনে আরেকজন টিচার এলো। নাম আনিকা। সেও ইংলিশ টিচার।বয়স বেশি না। মেরাবদের সমবয়সী। সবার সাথে বন্ডিং ভালো শুধু মেরাবের সাথে ভালো নয়। মেরাব এর থেকে একটু দূরেই থাকে। মেরাবও যেহেতু ইংলিশ টিচার সেক্ষেত্রে সে কথা বলতে এসেছে। মারুফুল খান বললেন,
“আনিকা, কেমন আছো?”
“স্যার, ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো। তো কোনো প্রবলেম হয়েছে নাকি?”
“না স্যার, আমি ইংলিশ সাবজেক্টটা নিয়ে মেরাব স্যারের সাথে কিছু কথা বলতে এসেছি।”
“ওহ, শিওর। কথা বলো মেরাবের সাথে।”
মেরাব সেদিকে তাকিয়ে বলল,
“জি, বলুন!”
“সামনে ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষার প্রশ্নটা আপনি করবেন নাকি আমি? আমার মনে হয় দুজনে মিলে করাটাই বেস্ট হবে।”
“হুম। ঠিক বলছেন। সময়ও তো বেশি নেই। তাড়াতাড়িই রেডি করতে হবে।”
আনিকা ম্যাম কথা বলে চলে গেলো। মেরাব তপ্ত শ্বাস ছেড়ে চেয়ারে গা এলিয়ে মারুফুল খানকে বলল,
“বাবা একটা কথা বলবো?”
“বলো!”
“বাবা, আমাকে অন্য সাবজেক্টের টিচার করা যায় না?”
মারুফুল খান গম্ভীর গলায় বললেন,
“কেনো? কি হয়েছে?”
“ওই ম্যাডামের সাথে একসাথে কাজ করতে পারবো না।”
“না পারলেও করতে হবে।”
“বাবা, বিয়ে করেছি। এখন অন্য কোনো মেয়েকেও দেখা পাপ!”
মারুফুল খান হতভম্ব এই ছেলের কথা শুনে। এখন কি করে অন্য সাবজেক্টে ট্রান্সফার করে দেবেন। তিনি এই মুহূর্তে কড়া গলায় বললেন,
“ওর সাথেই কাজ করতে হবে।”
স্নেহা মেরাবকে দেরি করানোর জন্য শাড়ি আনতে বলল। কারণ এদিকে কোনো প্ল্যানই করা হয়নি। মাহিন আর সাইদা ভেবেই চলেছে এখনও বের করতে পারেনি কি করবে!
ফাহমিদা খান এই তিনটাকে কিছু নিয়ে গভীর চিন্তায় থাকতে দেখে নিজেও চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনটার হলো টা কি? এর একটু আগে আবার আসিফ মৌকে নিয়ে চলে গেলো সেটা নিয়ে নাকি? হতেও পারে।
ফাহমিদা খান রহিমা বেগমকে কাজ দেখিয়ে দিয়ে এসে ওদের সাথে যোগ দিলেন। স্নেহার পাশে বসে বললেন,
“কি এতো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছিস তোরা?”
স্নেহা ফাহমিদা খানের দিকে ঘুরে তার হাত ধরে বলল,
“আচ্ছা, মামনি তোমার ছেলের মুখ থেকে তোমার মা ডাক শুনতে ইচ্ছা করে না?”
ফাহমিদা খান গভীর শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“করে। করবে না কেনো? আর ওর যখন ইচ্ছা ও ডাকবে আমার এতে সমস্যা নেই।”
মাহিন বলল,
“যদি আমরা ওকে বাধ্য করি।”
“এই না। ও যখন ইচ্ছা তখন ডাকবে ওকে জোর করার কোনো দরকার নেই।”
মাহিন বলল,
“নেই বললে তো হবে না। আমরা ওকে ডাকাবোই।”
ফাহমিদা খান বললেন,
“যা ইচ্ছা তাই করো! তবে এতে যেনো ও রেগে না যায়।”
এদিকে মেরাবের কেমন একটা লাগছে। না জানি ওরা বাড়িতে কি ষড়যন্ত্র করছে। বাড়িতে থাকলে ওদের একসাথে কথা বলার চান্সই দিতো না। সব ভেস্তে গিয়েছে এই কলেজে এসে। এখন একটাই পথ, স্নেহাকে একটু পরপর কল দিয়ে ওকে অন্যমনস্ক করে দেওয়া। মেরাব স্নেহাকে কল দিলো। স্নেহা সবার সাথে কথা বলা ছেড়ে উঠে অন্য জায়গায় চলে এলো। এরপরে কল রিসিভ করে বলল,
“হ্যা বলুন!”
মেরাব বলল,
“কি বলবো?”
“তাহলে কল দিলেন যে?”
“কেনো আমি কি দিতে পারিনা?”
“না।”
“কেনো?”
স্নেহা ঝাড়ি মেরে বলে উঠলো,
“কলেজে কাজে গিয়েছেন এতো বার কল দিচ্ছেন কেনো? কাজ করুন!”
মেরাব নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
“কাজ করতেই তো গিয়েছিলাম। এর মধ্যে আনিকা ম্যামকে তো চিনোই কেমন সেধে সেধে কথা বলে। উনি এসে কথা বলছে বারবার। তাই তো তোমায় ফোন করলাম।”
স্নেহা আনিকা ম্যামের কথা শুনে রেগে গিয়ে বলল,
“বাড়ি চলে আসুন। কলেজে যেতে হবে না।”
মেরাব মুখটিপে হেসে বলল,
“তাহলে খাবো কি বউ?”
“বড় মামা খাওয়াবে। চলে আসুন।”
“সত্যিই চলে আসবো?”
“হুমমম। তাড়াতাড়ি আসুন।”
“সিরিয়াসলি আসবো?”
“হুমমম।”
মেরাব যেনো এই কথা শোনারই অপেক্ষায় ছিলো। ভালোই হয়েছে এখন বাড়ি ফিরে ওদের একটা প্ল্যানও করতে দেবে না। মেরাব চাইছে দিনটা ভালোই ভালোই যাক। রাতে বোঝাবে।
মেরাব বাড়ি ফিরে এলে মাহিন ওকে দেখা মাত্রই বলে উঠলো,
“কি ব্যাপার ভাই! চলে এলে এতো আগে?”
“হুমম। বউ থাকতে দিলো না। চলে আসতে বলল।”
মাহিন পেছনে ফিরে স্নেহার দিকে তাকালো। স্নেহা মেরাবকে বাড়িতে আসতে বলে মাহিনের সব প্ল্যান ভেস্তে দিলো। মাহিন বিড়বিড় করে বকতে বকতে সাইদার কাছে এসে বসলো। আর মেরাব স্নেহাকে ডেকে উপরে চলে গেলো।
আজ বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো তবুও মেরাব বিছানা ছেড়ে উঠলো না। স্নেহা রুমে এসে মেরাবের পাশে বসলো। প্রতিদিন আগে উঠে আসরের নামাজ পড়ে আজকে উঠছে না বলে স্নেহার কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো। মেরাবের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। মেরাবের মুখটা কেমন মলিন লাগছে। স্নেহা মেরাবের কপালে হাত রাখলো। কপালটা জ্বরে পুড়ে উঠছে। শরীরে হাত দিলে বুঝতে পারে শরীরও জ্বরে পুড়ে উঠছে।
চলবে….
পরবর্তী পর্ব স্পেশাল হবে। পরবর্তী পর্ব কালকে রাত ৯ টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৩১
-
কি আবেশে পর্ব ২১
-
কি আবেশে পর্ব ৮
-
কি আবেশে পর্ব ১২
-
কি আবেশে পর্ব ৩
-
কি আবেশে পর্ব ১৯
-
কি আবেশে পর্ব ৩৫
-
কি আবেশে পর্ব ৬
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ২
-
কি আবেশে গল্পের লিংক