Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ৩৬


কি_আবেশে (৩৬)

জেরিন_আক্তার

মেরাব ফাহমিদা খানের থেকে ফোনটা নিয়ে আননোন নাম্বারটায় কল দেয়। কলটি দিয়েছিলো আহনাফ মির্জা। ফাহমিদা খান কণ্ঠটা না চিনলেও মেরাব স্পষ্ট চিনতে পারে। আহনাফ মির্জা মেরাব আর ফাহমিদা খানকে একটা জায়গায় যেতে বললেন। সেখানেই মারুফুল খান আছেন। আহনাফ মির্জা এখন শুধু মেরাব আর ফাহমিদা খান এই দুজনকেই যেতে বললেন। মেরাব ফোন কেটে দিয়ে ফাহমিদা খানকে বলল,

“আহনাফ মির্জা কল দিয়েছে। তুমি চিনতে পারোনি।”

“কি বলল উনি? আর তোমার বাবা ঠিক আছে? তোমার বাবাকে তো কিছু করেনি?”

“ওর কলিজায় এতো সাহস নেই যে বাবার গায়ে হাত দিবে। তুমি রেডি হয়ে নাও, বেরোবো!”

ফাহমিদা খান চলে গেলেন। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছেন। তিনি রুমে এসে ঝটপট রেডি হয়ে নিলেন। মেরাব একটানে টি-শার্ট খুলে শার্ট পড়ে নেয়। প্যান্টও পড়ে নিয়ে ফোন, ওয়ালেট, আর গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যাওয়ার আগে স্নেহাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলে। স্নেহা রুমের দরজা ধরে মেরাবের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। মেরাব মেইন দরজা পেরিয়ে গেলে স্নেহা ফিরে এসে বিছানায় বসলো।

মেরাব আহনাফ মির্জার বাড়িতে চলে আসে। আহনাফ মির্জা মেরাবকে পাশে বসিয়ে সমস্ত কথা বললেন। তার সাথে বহুবছর আগে মারুফুল খান আর তাহমিনা খানের পুরোনো ঝামেলা ছিলো। ঝামেলা বলতে মারুফুল খানের কলেজের চাকরির পাশাপাশি বড়সড় ব্যাবসা ছিলো। এর পার্টনার ছিলো আহনাফ মির্জা। এই ব্যাবসা আহনাফ মির্জা নিজের করতে মারুফুল খানের অগোচরে কত কিছু করেছেন কিন্তু পারেননি। আরেকদিকে মারুফুল খান তার সয়-সম্মতি সব তখন তাহমিনা খানের নামে দিয়েছিলেন। সেদিন আহনাফ মির্জা তাহমিনা খানের কাছে এসেছিলো। তাহমিনা খানের থেকে তিনি কোনো উত্তর না পেয়ে সেদিন রাগে পরে তাকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন হয়তো ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন। তবে সেটাই ছিলো মৃত্যু যন্ত্রনা। তিনি ওই অবস্থায় তাহমিনা খানকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। যেহেতু এই ব্যাবসার কোনো কিছুই তিনি আদায়ও করতে পারেননি সেহেতু উনার দিকেও সেদিন ফিরেও তাকাননি। মারুফুল খানেরও এই নিয়ে প্রচুর সন্দেহ ছিলো শেষে এসে সন্দেহই আসল হলো। মারুফুল খান কেঁদে উঠলেন। মেরাব শুধু চেয়ে আছে। গলার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে।

আহনাফ মির্জা মেরাবের সামনে হাটু গেরে বসে বললেন,
“মেরাব তোমার সামনে কথা বলারও মুখ নেই আমার। আমায় মাফ করে দাও! তোমার যা শাস্তি দেওয়ার তুমি আমাকে দাও আমি মাথা পেতে নিবো।”

মেরাব থমথমে গলায় বলল
“আচ্ছা, সব ভুলে গেলাম, সব মেনেও নিলাম এখন মাফ করে দিলে কি আমার মাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? পারবেন সেই হাসি-খুশি মানুষটাকে ফিরিয়ে দিতে? আমি যে এতগুলো বছর মায়ের অভাবে গুমরে গুমরে মরেছি এই কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারবেন? বলুন?”

আহনাফ মির্জা মেরাবের পায়ে ধরে বললেন,
“মেরাব আমি তোমার মাকে ফিরিয়ে দিতে পারবো না। এখন তুমি আমাকে যে শাস্তি দিতে চাও আমি সেই শাস্তিই মাথা পেতে নিবো। আমাকে জেলে দিতে চাইলে আমি জেলেই যাবো।”

মারুফুল খান ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছেলের মাঝে এতো কষ্ট ছিলো তা দেখে তিনি কেঁদে উঠলেন। মেরাব কোনো কথাই বলছে না। ধ্যান ধরে আছে। যেনো কথা বলতে ভুলে গিয়েছে। কান্নাও আসছে না। যেনো রোবট হয়ে গিয়েছে। মারুফুল খান আর ফাহমিদা খান মেরাবের কাঁধে হাত রাখলেন। মারুফুল খান বলে উঠলেন,
“মেরাব কি চাও তুমি এখন?”

মেরাব আরও কিছুক্ষন নিরেট বেধে রইলো। এরপরে বলল,
“আমি এখন উনাকে শাস্তি দিয়ে কি করবো? মা তো আর ফিরে আসবে না। আর উনি এই কয়েক বছর অসুস্থ থাকায় উনার ওয়াইফ আর মেয়ে খুব কষ্টে সার্ভাইভ করেছে। উনার শাস্তি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এখন আর উনাকে শাস্তি দিয়ে উনার থেকে সন্তানকে আলাদা করতে চাইনা। একজন সন্তানই জানে তার কাছে তার বাবা-মা কি জিনিস।”

এই বলে মেরাব আহনাফ মির্জার থেকে পা ছাড়িয়ে বাহিরে চলে গেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।বুকের হাহাকার গুলো আজ মুক্তি পেয়েছে। এতবছরের বয়ে বেড়ানো কষ্টে থেকে আজ যেনো সত্যিই মুক্ত। মেরাব এখন যদি চিৎকার করে কাঁদতে পারতো, চিৎকার করে শুধু একটা বার নিজের মাকে ডাকতে পারতো তাহলে অনেকটাই হালকা হয়ে যেতো।

পরদিন সন্ধ্যার পরে,,,

মাহিন আর আসিফ গিয়েছিলো বাহিরে। সেখানে কিছু স্ন্যাক্স, আইসক্রিম নিয়ে আসে। মেয়েদের পছন্দ বলে কথা। ড্রইং রুমে সবাই এই বসে ছিলো। সবাইকে একটা একটা করে আইসক্রিম দেয়। সবাই খেতে থাকে। মাহিন একটা আলাদা করে মেরাবের জন্য রেখে দিলো। আর মেরাবকে হাই তুলে ডাকতে লাগলো। ফাহমিদা খান কিচেনে থেকে এগিয়ে এসে মাহিনকে বললেন,
“মাহিন মেরাব আইসক্রিম খেতে পারে না।”

“খেতে পারে না কেনো?”

ফাহমিদা খান বললেন,
“মেরাবের আইসক্রিম খেলে গলা বসে যায় কথা বলতে পারে না।”

মাহিন হেয়ালি করে বলে উঠলো,
“বড় আম্মু ও কিছু হবে না। এখন তো বড় হয়ে গিয়েছে। বাচ্চা না।”

মেরাবও নিচে নামে। মৌয়ের পাশে এসে বসে। মাহিন এগিয়ে এসে মেরাবকে আইসক্রিম দেয়। মেরাব নিতে চায় না। এরপরে মেরাব নিজেও বলে,
“আমার আইসক্রিমে গলা বসে যায়! খাবো না।”

মাহিন তবুও মেরাবের হাতে দিয়ে বলল,
“খাওতো কিচ্ছু হবে না। আর হলেও ডাক্তার দেখিয়ে নিবো।”

আসিফ মেরাবকে বলল,
“মেরাব কিচ্ছু হবে না। ভাই একটা খা!”

মেরাব আইসক্রিমটা হাতে নিলো। খাওয়ার কোনো মুড নেই। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে খেলো। আল্লাহ জানে কি হবে?

মেরাব আইসক্রিম খেয়ে থম মেরে বসে রইলো। এখন থেকেই গলা কেমন ভারী হয়ে আসছে। তবুও সেটা প্রকাশ না করে বসে রইলো। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে স্নেহাকে সাথে নিয়ে রুমে চলে আসলো। স্নেহা আজকে কোথাও ছাড়বে না। মেরাব রুমে শশুড় একবার ওষুধ কিনে আনার জন্য বের হয়েছিলো। পরে কি যেনো মনে করে আর বের হলো না। রুমে এসে স্নেহাকে বলল আদা, লবঙ্গ দিয়ে গরম পানি করে আনতে। স্নেহা তাই গেলো।

কিচেনে ঢুকতেই দেখলো ফাহমিদা খান চলে যাচ্ছেন। তিনি স্নেহাকে দেখে বললেন,
“কি লাগবে বল, করে দিচ্ছি!”

“মামনি তোমার ছেলের নাকি গলা ভার হয়ে আসছে। তাই গরম….!”

ফাহমিদা খান স্নেহাকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“হয়েছে বুঝেছি। ওখানে বস। করে দিচ্ছি।”

স্নেহা দাড়িয়ে রইলো। ফাহমিদা খান কাজ করতে করতে বললেন,
“ওকে ভালো করে চিনি। ও যে আইসক্রিম খেয়ে থাকতে পারে না এটা আগেই বলেছিলাম। কিন্তু সবার জোরাজোরিতে খেতেই হলো। আর এখন গরম কি ভালো করে পড়েছে নাকি? এখনও তো মনে হয় হালকা হালকা শীত পড়ে। এখনই ওদের আইসক্রিমের ভূত চেপেছে। দেখো এখন গলা ভার হয়ে আসছে। এখন কোনো কিছু না হলেই হয়।”

ফাহমিদা খান কথা বলতে বলতে পানি গরম করে কফি মগে ঢেলে স্নেহার হাতে দিলেন। স্নেহা সেটা নিয়ে উপরে চলে এলো। মেরাব পানি টুকু খেয়ে শুয়ে পড়লো। গলা ভার অনেকটাই কমেছে। স্নেহা রুমের দরজা লাগিয়ে আয়নার সামনে এসে চুলগুলো খুলে। এরপরে চিরুনি দিয়ে ব্রাশ করে বেণী করে নেয়। মেরাব তৎক্ষণাৎ বিছানায় থেকে নেমে স্নেহার পেছনে চলে গেলো। স্নেহার হাতে থেকে চুলের বিনুনি নিয়ে চুলগুলোর বিনুনি ছাড়িয়ে দেয়। স্নেহা আয়নাতে মেরাবকে দেখছে। মেরাবের উদ্দেশ্য কি কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। মেরাব স্নেহার চুলগুলো একসাইডে এনে উন্মুক্ত ঘাড়ে নাক ঘষতে ঘষতে বলল,
“উফ, কি যে লাগে খোলা চুলে।”

আস্তে আস্তে মেরাব স্নেহার কোমরে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। স্নেহা লাজুক চোখে তাকালো। মেরাব স্নেহার দুইগালে হাত রেখে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। স্নেহা মেরাবের শার্ট খামচে ধরলো। মেরাব তৎক্ষণাৎ স্নেহাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় যায়। স্নেহাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও তার উপরে শুয়ে বলল,
“জান, আজ আর নিজেকে আটকাতে পারবো না মানে পারবোই না। আজ তুমি আমার। শুধু আমার। আমার আর তোমার মাঝে একটুও দুরুত্ব চাইনা আজ।”

রাত তিনটায়,,, মেরাব স্নেহাকে পাঁজা কোলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। স্নেহাকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“গোসলটাও আমি করিয়ে দিবো নাকি?”

স্নেহা লজ্জা পেয়ে মেরাবের বুকে হালকা কিল মেরে বলল,
“বাহিরে যান তো! আমি আসছি!”

মেরাব বাকা হেসে বলল,
“বাহিরে গেলেই কি আর না গেলেই কি। এমন কিছু আছে নাকি যে আমি দেখিনি।”

স্নেহা মেরাবকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ওয়াশরুমের বাহিরে বের করে দিলো। স্নেহা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। এরপরে মেরাব ঢুকলো। মেরাব শাওয়ার নিয়ে শুধু টাওয়াল পড়ে বের হয়ে স্নেহার কাছে এলো। স্নেহাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসিয়ে হেয়ার ড্রায়ার অন করলো। পরম যত্নে স্নেহার চুলগুলো শুকিয়ে দিলো। নাহলে নিচে গেলে লজ্জায় পড়ে যাবে বেচারি।

আজ সেহেরি খাওয়ার জন্য ডাকতে এলো মৌ। দুজনকে ডেকে চলে গেলো। মেরাব স্নেহাকে সাথে করে নিয়ে নিচে নামলো। বড়রা ততক্ষনে খেয়ে চলে গিয়েছে। ফাহমিদা খান মেরাব আর স্নেহাকে বসতে বলল। স্নেহা আজকে যেনো লজ্জা বেশি পাচ্ছে। ঘোমটাটাও বড় করে দিয়েছে।

মেরাব কোনো কথা ছাড়াই খেতে বসে পড়লো। মাহিন মেরাবকে লক্ষ করলো। মেরাবের দিকে এগিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ভাই, তোমার ঘাড়ে কি হয়েছে?”

মেরাব ফিসফিস করে বলল,
“বউয়ের ভালোবাসা!”

মাহিন নাক-মুখ কুঁচকে জোরে বলে উঠলো,
“আল্লাহ রোজা-রমজানের দিনে আশেপাশের মানুষদের একটু হেদায়েত দিও!”

মেরাবই একটু জোরেই বলে উঠলো,

“দুলাভাই, কালকের আগের দিন রাতে দেখলাম সাইদা আপনাকে উত্তম-মাধ্যম মারলো! কিছু করেছিলেন নাকি দুলাভাই?”

সবাই মাহিনের দিকে তাকালো। মাহিন সাইদার দিকে তাকিয়ে কেশে উঠলো।

চলবে….

পরবর্তী পর্ব কালকে রাত ৯ টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।

ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply