কি_আবেশে (৩২)
জেরিন_আক্তার
মেরাব স্নেহাকে কোলে নিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে এলো। স্নেহা তখনও মেরাবের বুকে মুখ লুকিয়ে আছে। মেরাব স্নেহাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। এরপরে সাইড টেবিলের কাছে গিয়ে কিছু একটা নিয়ে স্নেহার সামনে এসে হাটু গেরে বসলো। স্নেহা মেরাবের দিকে কিছুটা এগিয়ে বলল,
“আপনি নিচে বসেছেন কেনো? উপরে উঠে আসুন!”
মেরাব নিজের হাঁটুর উপরে স্নেহার পা উঠিয়ে নিলো। স্নেহা পা সরিয়ে নিয়ে বলল,
“ছি!ছি! কি করছেন! পায়ে হাত দিলেন?”
মেরাব আবারও পায়ে হাত দিয়ে বলল,
“উফ, বড্ডো বেশি কথা বলো। চুপচাপ পা রাখো!”
স্নেহা ইতস্তত নিয়ে পা রাখলো। মেরাব একজোড়া নুপুর বের করলো। স্নেহা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে উঠলো,
“এই নুপুর আমার জন্য এনেছেন?”
“হুম।”
“খুব সুন্দর তো!”
“ভালো লেগেছে?”
“খুব। পড়িয়ে দিন!”
স্নেহা তার পায়ের উপরে থেকে শাড়ি হালকা উঁচু করে নিলো। মেরাব মুচকি হাসতে হাসতে দুই পায়েই নুপুর পড়িয়ে দিলো। স্নেহা পা নামিয়ে বিছানায় থেকে উঠে দাড়ালো। বড় মিররের সামনে গিয়ে পা নাচিয়ে নাচিয়ে দেখছে আর নুপুরের শব্দ শুনছে। মেরাব উঠে দাড়িয়ে বুকে হাত গুজে স্নেহাকে দেখে যাচ্ছে। এরপরে ফোন বের স্নেহার হাসি-খুশি মুখটার ছবি তুলে নেয়। ছোট্ট একটা ভিডিওও করে নেয়। স্নেহা সেটা দেখার আগেই ফোনটা পকেটে ভরে নিলো।
স্নেহা মেরাবের সামনে এসে বলল,
“দেখুন তো কেমন লাগছে?”
“অনেক সুন্দর।”
“মামনিকে দেখিয়ে আসি?”
এ কথা শুনে মেরাব স্নেহার হাত ধরে বিছানার দিকে নিয়ে গেলো। এরপরে মেরাব নিজে বসে স্নেহাকে কোলে বসিয়ে বলল,
“তুমি ভুলে গেলে আমি তোমাকে কিভাবে নিয়ে এলাম এখন নিচে গেলে লজ্জা পাবে না?”
“পাবোই তো! কিন্তু মামনি কে না দেখানো পর্যন্ত তো আমার ভালোও লাগবে না।”
“পরে দেখিয়ো!”
“ঠিক আছে, কি আর করার!”
স্নেহা উঠে সরে যেতেই মেরাব ওর হাত ধরে বিছানায় শুইয়ে নিজে তার উপরে শুয়ে বলল,
“কোথায় যাচ্ছো? আমি যেতে বলেছি?”
“না!”
“তাহলে যাচ্ছো যে? আর এখন যদি নড়াচড়া করো আছাড় মারবো বলে দিলাম।”
স্নেহা মাথা নুইয়ে বলল,
“একটুও নড়াচড়া করবো না। আপনি যা বলবেন তাই করবো।”
মেরাব এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চায়। এই মুহূর্তে আবদার করে বসলো। বাকা হেসে স্নেহাকে বলল,
“যা করতে বলবো তাই করবে? তাহলে কিস করো!”
স্নেহা বিস্ময়ে তাকালো। কাপা-কাপা ঠোঁট নিয়ে মেরাবের গালে চুমু খেলো। মেরাব হেসে উঠলো। আর বলল,
“দেখেছো, অভিমান করেছিলাম বলেই তোমার একটু সাহস হয়েছে।”
স্নেহা মেরাবের বুকে কিল মেরে বলল,
“হয়েছে আমি এখন গেলাম।”
“এখনই তো ম্যাডাম আপনার ছুটি নেই।”
“কেনো?”
“আমি তোমায় কতসুন্দর একটা গিফট দিলাম আর তুমি আমায় কিছু না দিয়েই চলে যাবে এটা তো হয়না।”
“তাহলে কি দেবো? আমার কাছে তো গিফট দেওয়ার মতো কিছুই নেই?”
“আছে!”
“কি আছে?”
মেরাব ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“তোমার ঠোঁট দুটো তো আছে।”
রাতে খাবার খেতে মেরাব আর স্নেহা একসাথে নিচে নামলো। বড়রা বলতে মারুফুল খান, আর আরিফুল খান খেয়ে রুমে চলে গিয়েছে। এখন মেরাব, স্নেহা, সাদাফ, ফাহমিদা খান আর সাহারা খান বাকি আছে। এখন স্নেহা আর মেরাব নিচে এসেছে। স্নেহা ফাহমিদা খানকে দেখে লজ্জায় মেরাবের পেছনে লুকালো। মেরাব খেতে বসলো। স্নেহা তার পাশে দাড়িয়ে আছে। এর মাঝে মারুফুল খান উপরে থেকে ফাহমিদা খানকে ডেকে উঠলেন। তাকে উপরে যেতে বললেন। ফাহমিদা খান উপরে চলে গেলেন।
মিনিট বিশেক পার হয়ে গেলো। ফাহমিদা খান নিচে এলেন না। মেরাব স্নেহাকে বলল তাকে ডেকে নিয়ে আসতে। স্নেহা চলে গেলো তাকে ডাকতে। রুমের সামনে এসে বলল,
“মামনি, নিচে যাবে না?”
“হ্যা, যাবো। ভিতরে আয় তো একটু!”
স্নেহা ভিতরে ঢুকেই হতভম্ব হয়ে গেলো। মারুফুল খান গুমোট বেধে বিছানায় বসে আছেন। আর ফাহমিদা খান ফ্লোর দিয়ে কি যেনো খুঁজছে। স্নেহা ফাহমিদা খানকে বলল,
“মামনি কি খুঁজছো?”
ফাহমিদা খান উঠে দাড়িয়ে মারুফুল খানের দিকে তাকিয়ে রাগী কণ্ঠে বললেন,
“কি খুঁজবো তোর বড় মামাকে খুঁজছি!”
স্নেহা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিহ বড় মামাকে! কি বলছো পাগল হয়ে গিয়েছো।”
“না পাগল হইনি। তবে এখন হবো!”
“মামনি কি হয়েছে বলো তো?”
“আর বলিস না, তোর বড় মামা এখন বের হবে। একটা শার্ট বের করেছে। সেটার আবার বোতাম খুলে কোথায় যেনো পড়েছে। সেই বোতাম খুঁজে দিতে বলছে। কোথায় না কোথায় পড়েছে কিভাবে খুঁজবো।”
এই শুনে স্নেহা বলল,
“বড় মামা তাহলে অন্য শার্ট পড়ে যাও!”
ফাহমিদা খান বললেন,
“অন্যশার্ট হলে তো হতোই। সে পড়বে না অন্য শার্ট। এইটা পড়বে মানে এইটাই। স্নেহা এসেছিস ভালো করেছিস। আয়তো খুঁজে দে!”
“ঠিক আছে।”
স্নেহা মারুফুল খানের সামনে এসে বলল,
“বড় মামা আগে এইটা বলো, শার্টের বোতাম যখন খুলে পড়লো তখন তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলে?”
“ওই যে কাভার্ডের সামনে দাড়িয়ে পড়তেছিলাম।”
“ঠিক আছে। খুঁজে দিচ্ছি!”
আরও মিনিট দশেক পরে শার্টের বোতামটা খুঁজে পাওয়া গেলো। ফাহমিদা খানই পেয়েছেন। বোতামটা স্নেহার কাছে দিয়ে বললেন,
“ওই যে দেখ বিছানায় শার্ট। তু্ই বোতামটা লাগিয়ে দে!”
“সুচ-আর সুতো কোথায় মামনি?”
“দাড়া বের করে দিচ্ছি।”
স্নেহা শার্টের বোতামটা লাগিয়ে দিয়ে ফাহমিদা খানকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। স্নেহা ফাহমিদা খানের সামনে দাড়িয়ে পায়ের নুপুরজোড়া দেখিয়ে বলল,
“মামনি দেখোতো কেমন লাগছে?”
ফাহমিদা খান হেসে বললেন,
“খুব সুন্দর লাগছে! পায়ে মানিয়েছে ভালো। কখন বানালি?”
স্নেহা খানিকটা লজ্জা নিয়ে বলল,
“তোমার ছেলে দিয়েছে একটু আগে।”
ফাহমিদা খান মশকরা করে বললেন,
“এই জন্যই তো বলি, আমার ছেলেটা হঠাৎ এতো উতলা হয়ে আপনাকে কোলে করে নিয়ে গেলো কেনো!”
স্নেহার গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। সাথে সাথে ফাহমিদা খানকে ধরে সিঁড়ির দিকে আসতে আসতে বলল,
“চলো তো খিদে পেয়েছে!”
ফাহমিদা খান তখনও রসিকতা করে বললেন,
“খিদে পেয়েছে নাকি আমার ছেলেকে দেখতে ইচ্ছে করছে কোনটা মা!”
“ইশ, চলো তো!”
স্নেহা এসে মেরাবের পাশে বসলো। সবাই খাওয়া শুরু করে দিলো। খাওয়ার মাঝে মেরাব বরাবরের মতো স্নেহার পায়ের উপরে পা রাখলো। স্নেহা মেরাবের মুখপানে তাকালো। মনে মনে বলল,,,মুখটা দেখে বোঝা যাবে না উনার মাঝে কত শয়তানি রয়েছে।
সবার খাওয়ার মাঝে বাড়ির কলিং বেল বাজিয়ে ভিতরে ঢুকলো সাইদা আর ওর হাসব্যান্ড এলো। মৌ খাওয়া ছেড়েই উঠে চলে গেলো সাইদার কাছে।
“আপুউউউউ কেমন আছো?”
“ভালো। তু্ই কেমন আছিস?”
“ভালো। আর দুলাভাই আপনি কেমন আছেন? আমাদের কথা কি আর আপনার মনে থাকে!”
সাইদার হাসব্যান্ড মাহিন হেসে বলল,
“আপনারও তো আমাদের কথা মনে ছিলো না। একা একা বিয়ে করে নিয়েছেন!”
“উফ, ভাইয়া আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। উনিই তো!”
“হয়েছে শ্যালিকা সব বুঝেছি। তো এই বাড়ির আরেক জামাই কই! তার সাথে পরিচিত হই। অবশ্য পরিচিতই তবুও জামাই হিসেবে নাহয় আবার পরিচিত হলাম।”
স্নেহা বলল,
“দুলাভাই, নতুন জামাইয়ের দেখা পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।”
“কি বলছো স্নেহা?”
মেরাব বলল,
“একটু পরে আলোচনা করছি এখন খেতে বসুন!”
সাইদা বলল,
“না, ভাইয়া কিছু খাবো না। মাত্রই খেয়ে এসেছি।”
মাহিন সাইদার কথা শুনেও না শোনার ভান করে বলল,
“তুমি খেয়ে আসতেই পারো। আমি খাইনি।”
বলেই মাহিন ফাহমিদা খানের পাশে বসে পড়লো। ফাহমিদা খান প্লেট টেনে খাবার বেড়ে দিলেন। খান বাড়িতে মাহিন এলে বাড়িটাকে একবারে মাতিয়ে রাখে। সবার সাথে মিশুক।
মেরাব খাওয়া শেষ করে বাহিরে বাগানের দিকে চলে গেলো। স্নেহা ফাহমিদা খান আর সাহারা খানের সাথে টুকটাক কিছু কাজ করে দিলো।
রাত তখন নয়টা,, সবাই মিলে আড্ডা দিতে মৌয়ের রুমে এলো। আড্ডা বলতে আসিফকে কল দিয়ে বাড়িতে আনার পরিকল্পনা করবে। মৌ শুয়ে ছিলো। ওদের দেখে মৌ উঠে বসলো। সাইদা মৌয়ের পাশে বসে আফসোস নিয়ে বলল,
“আহারে, জামাইয়ের জন্য মন খারাপ হচ্ছে তাইনা!”
মৌ চেতে গিয়ে বলল,
“আপু কি শুরু করলে! তুমি যদি আবার খেপিয়েছো না তখন তোমার খবর আছে!”
মাহিন বলল,
“আমার সামনে আমার বউকেই হুমকি! না না আমি টা মেনে নিবো না।”
মেরাব, স্নেহা, সাদাফ, মৌ, আর মাহিন ওরা সবাই মৌকে ঘিরে বসলো। সবাই কথা বলা শুরু করলো। বলা যায় আড্ডা। মৌ সবার সাথে কথায় মগ্ন হলে সাদাফ একটা টিস্যু বের করে মৌয়ের সামনে ধরে বলল,
“বইনে একটা পারফিউম কিনেছিলাম দেখতো স্মেল কেমন?”
মৌ টিস্যুটা শুকতেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে যায় স্নেহার কোলে। স্নেহা আর সাইদা ওকে ধরে সুন্দর করে শুইয়ে দেয়। এখন ওদের থেকে একজন আসিফকে ভিডিও কল দিবে আর বলবে মৌ হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে আর জ্ঞান ফিরছে না। এ কথা শোনার পরে আর যাই হোক আসিফ বসে থাকতে পারবে না। ছুটে আসবেই।
ওদের প্ল্যানমতো মেরাব নিজেই আসিফকে কল দিলো। আসিফকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই অস্থির কণ্ঠে বলল,
“হ্যালো, আসিফ! তু্ই কোথায় ভাই?”
“রেস্টুরেন্টে! কেনো কি হয়েছে? তোর কথা এমন লাগছে কেনো রে?”
“আরে কি বলবো মৌ সেই ঘন্টাখানিক ধরে অজ্ঞান হয়ে আছে জ্ঞান ফিরছে না। কি করি এখন বলতো!”
“কি বলছিস? মজা করছিস নাকি?”
“বোনকে নিয়ে মজা করবো ভাবলি কি করে। সত্যিই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তু্ই ভিডিও কল দে!”
মেরাব ভিডিও কলে দেখালো আসিফকে। আসিফ সেটা বিশ্বাস করে উতলা হয়ে উঠলো। সাথে সাথে ইগো বাদ দিয়ে বলল,
“আমি আসছি এক্ষুনি আর ডক্টরকে কল দিসনি?”
“দিয়েছিলাম, ডক্টর আসছে!”
“ঠিক আছে। আমি আসছি!”
আসিফ আসছে শুনে সবাই খুশি হয়ে উঠলো। মেরাব মৌয়ের কাছে বসে বলল,
“শাকচুন্নি! কিছু মনে করিস না হ্যা! কালকে চকলেট কিনে দিবো। এখন অজ্ঞান হয়ে থাক।”
আসিফ আসলো খান বাড়িতে। বড়রা কেউই জানে না। পড়ে জানানো হবে। আসিফ মৌয়ের রুমের সামনে এসে দেখলো মেরাব আর মাহিন দাড়িয়ে আছে। আসিফ মেরাবকে দেখে বলল,
“কিরে মৌ কই! জ্ঞান ফিরেছে?”
মাহিন অভিনয় করে বলল,
“আসিফ তুমিই গিয়ে দেখো!”
আসিফ মৌয়ের রুমে ঢুকে পড়লো। মেরাব সাথে সাথে মৌয়ের রুমের দরজা বাহিরে থেকে বন্ধ করে দিলো। মাহিন আর মেরাব চলে এলো সেখানে থেকে। মেরাব সবাইকে বলল বাড়ির বড়দের জানাতে। সবাই চলে গেলো সেদিকে। এদিকে মেরাব স্নেহাকে ডেকে নিয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে নিলে মাহিন বলে উঠলো,
“তোমরা কই যাচ্ছো?”
মেরাব চোখে ঘুমের রেশ এনে বলে উঠলো,
“খুব ঘুম পাচ্ছে। এখন আর জেগে থাকতে পারছি না।”
মাহিন কপাল কুঁচকে বলল,
“সত্যিই ঘুম পাচ্ছে?”
মেরাব চোখ টিপ মেরে বলল,
“হুম। গভীর ঘুম পাচ্ছে।”
মাহিন মেরাবের যাওয়ার পানে তাকিয়ে হেসে বলল,
“যাও গভীর ঘুম দাও। বেস্ট অফ লাক! তবে মনে রেখো বাহিরে কিন্তু আমরা আছি। আবার তোমাকে নাও ঘুমাতে দিতে পারি।”
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে রাত আট টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৩১
-
কি আবেশে পর্ব ২৮
-
কি আবেশে পর্ব ৩৭
-
কি আবেশে পর্ব ২০
-
কি আবেশে পর্ব ১৩
-
কি আবেশে পর্ব ১৪
-
কি আবেশে পর্ব ১
-
কি আবেশে পর্ব ৪
-
কি আবেশে পর্ব ৪১
-
চোরাবালির পিছুটানে গল্পের লিংক