কি_আবেশে (১৩)
জেরিন_আক্তার
স্নেহা বসে কাদতে থাকে। নাফিসা বেগম বিছানায় থেকে নেমে রুমের লাইট জ্বালালেন। এরপরে এগিয়ে এসে স্নেহার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে আসিফকে বলেন,
‘হ্যালো, তুমি কি মেরাবের সাথেই আছো?’
‘হ্যাঁ। আমি ওর সাথেই।’
‘ওর অবস্থা এখন কেমন?’
‘হাতে ব্যথা, মাথায় একটু পেয়েছে।’
‘তুমি কোন হসপিটালে আছো আমাকে বলো আমরা আসছি।’
নাফিসা বেগম আসিফের থেকে হসপিটালের নাম জেনে নিয়ে রুমের দরজা খুলে পাশের রুমে আফনান মির্জাকে ডাকতে গেলেন। তিনি আফনান মির্জাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলেন মেরাবের এক্সিডেন্ট হয়েছে। এখনই হসপিটালে যেতে হবে। আফনান মির্জা তাড়াহুড়ো করে গাড়ি বের করলেন।
নাফিসা বেগম স্নেহাকে নিয়ে বের হলেন। আফনান মির্জা গাড়ি ড্রাইভ করে হসপিটালে এলেন। সেখানে আসতেই স্নেহা আসিফকে দেখে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন,
‘ভাইয়া, মেরাব কোথায়?’
‘আসুন আমার সাথে।’
স্নেহা আসিফের পেছন পেছন ছুটে যায়। সাথে আফনান মির্জা আর নাফিসা বেগমও। একটা কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ায় আসিফ। এরপরে স্নেহাকে বলে,
‘আপনি একটু দাঁড়ান আমি ভিতরে থেকে দেখে আসছি মেরাব জেগে আছে কিনা। আর যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে ডাক্তার ডাকতে না করেছে।’
নাফিসা বেগম বলেন,
‘ঠিক আছে দেখে এসো।’
আসিফ কেবিনের দরজা খুলে এমন ভাবে ঢুকলো যাতে বাহিরে থেকে কিছু না দেখা যায়। মেরাব বেডে শুয়ে শুয়ে মোবাইল দেখছিল। আসিফ এসে বলে,
‘তোর বউ এসেছে। ফোন রেখে সিরিয়াস হ!’
মেরাব ফোন রেখে শুয়ে রইলো। আসিফ চলে এলো রুমের বাহিরে। এসে বলল,
‘ভাবী চলুন!’
স্নেহা ঢুকলো। নাফিসা বেগম ঢুকতে নিলে আফনান মির্জা বলেন,
‘নাফিসা ওরা কথা বলুক। আমরা না হয় একটু পরে ঢুকব।’
‘ঠিক আছে।’
স্নেহা মেরাবের পাশে এসে দাড়ালো। একহাতে ব্যান্ডেজ করা। মাথায়ও ব্যান্ডেজ করা। যা দেখে স্নেহা কেঁদেই দিলো। মেরাব আসিফকে কিছু ইশারা করতেই আসিফ বলে উঠলো,
‘আমি নার্সের সাথে কথা বলে আসছি।’
আসিফ চলে গেলো। স্নেহা চেয়ার টেনে বসলো। মেরাব বলল,
‘এত রাতে আসতে বলেছিল কে?’
স্নেহা ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
‘কেউনা!’
মেরাব আর আসিফ ওদের কিছু বন্ধুদের সাথে নিয়ে আফনান মির্জার দ্বিতীয় বউকে অন্য জায়গায় সরিয়ে রাখার পরে আড্ডা দিচ্ছিলো। সবাই আড্ডা শেষে চলে যায়। মেরাব আর আসিফ দুজনে একসাথে ফিরছিল। রাত অনেক থাকার কারণে রাস্তা ফাঁকা থাকায় ট্রাকগুলো বেপরোয়া ভাবে ছুটছিল। একটা ট্রাককে সাইড দিতে গিয়েই মেরাব নিজের গাড়ি অন্যদিকে ব্রেক করে গাছের সাথে বারি খায়। দুজনে খুব একটা ব্যথা পায়নি। সেখানে থেকে আসিফ আর মেরাব ইচ্ছে করেই হসপিটালে গিয়ে এডমিট হয়।
স্নেহা মাথা নত করে কাদঁছে। মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কাদঁছো কেনো?’
‘এমনি কাদছি!’
‘তো আমার সামনে কাদঁছো কেনো?’
স্নেহা মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
‘হসপিটালের বেডে শুয়ে আছেন তবুও এগো নিয়েই রয়েছেন।’
‘আমি এগো নিয়ে রইনি। রাতের বেলা ফোন দিবে বলেই আসতে হবে। সকালে আসতে!’
‘আমার এখন ইচ্ছে হয়েছে তাই এসেছি। আপনার কি?’
‘আমার আবার কি? আমার কিছুইনা।’
মিনিট দুই পরে স্নেহা তাকিয়ে দেখে মেরাবের স্যালাইন শেষ হয়ে গিয়েছে। সাথে সাথে উঠে দাড়িয়ে বলে,
‘স্যালাইন শেষ হয়ে গিয়েছে। আমি নার্সকে ডেকে আনছি!’
মেরাব সেদিকে তাকিয়ে একটানে নিজের হাতে থেকে স্যালাইনের সুচটা খুলে ফেলে। দুই এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়তে নিলে স্নেহাকে বলে,
‘ঐযে ওই তুলো দিয়ে এখানে ধরো! আমার হাতে ব্যথা।’
স্নেহা হাত বাড়িয়ে তুলো নিয়ে মেরাবের হাতে রাখে। রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেলে হাত সরিয়ে বসে। মেরাব উঠে হেলান দিয়ে বসে বলে,
‘পানি দাও একটু!’,
‘দিচ্ছি!’
এর একটু পরে আসিফ আসে। সাথে নার্সও আসে। নার্স এসে দেখে স্যালাইন খোলা। নার্সটি মেরাবের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আপনার স্যালাইন শেষ হয়ে গিয়েছে আমাকে ডাকবেন তো! নিজে নিজেই কি খুলেছেন নাকি?’
‘হুম।’
‘এখন কেমন বোধ করছেন?’
‘ভালো!’
‘বাড়ি থেকে কেউ আসেনি?’
‘এসেছে!’
‘ওহ আচ্ছা। শুনুন, এরপরে থেকে সাবধানে ড্রাইভ করবেন।’
‘ঠিক আছে।’
মেরাব আর নার্সের কথকপথন দেখে স্নেহা রাগে ফুঁসতে থাকে। কই তার সাথে তো এত সুন্দর করে কথা বলল না আর এই নার্সটির সাথে কত সুন্দর করে কথা বলছে। মেরাব স্নেহাকে আরও রাগাতে নার্সটাকে বলল,
‘আমাকে সাজেস্ট করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!’
নার্স মেয়েটি হেসে বলে,
‘থ্যাংক ইউ!’
আসিফ বলে উঠলো,
‘তাহলে ওকে হসপিটালে থেকে ডিসচার্জ করবেন কবে?
‘উনি যদি সুস্থ বোধ করেন তাহলে কালকেই।’
বলেই নার্সটি চলে যায়। সাথে আসিফও চলে যায়। স্নেহা বিড়বিড় করে বকতে বকতে তাকায় মেরাবের দিকে। মেরাব ভ্রু উঠিয়ে বলে,
‘ওভাবে তাকাচ্ছো কেনো?’
‘আপনাকে দেখছি!’
‘দেখো না করেছে কে?’
স্নেহা পাশ ফিরে বলে,
‘এখানে তো উনাকে দেখার জন্য অন্যজন আছেই শুধু শুধু আসতে গেলাম। সত্যিই তো আমার কি? আমার যত উনাকে নিয়ে চিন্তা।’
মেরাব হাত বাড়িয়ে স্নেহাকে টেনে নিজের কাছ ঘেষে বসালো। স্নেহা অন্যদিকেই তাকিয়ে আছে। মেরাব জড়ানো গলায় বলল,
‘তাকাও আমার দিকে?’
স্নেহা তাকায় না। মেরাব গম্ভীর গলায় বলে,
‘তাকাও আমার দিকে! এখনও যদি তেরামি করো তাহলে আমি ভুলে যাবো এইটা হসপিটাল।’
স্নেহা তাকায়। মেরাব বলে,
‘আমার জন্য তোমার চিন্তা হয়?’
‘হুম।’
‘কতখানি?’
‘জানিনা!’
‘কেনো জানোনা?’
স্নেহার চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। কথা বলতে পারছে না। মেরাব ধীর গলায় বলে,
‘কেদো না। বাসায় চলে যাও।’
‘যাবো না আমি। আপনার সাথে থাকবো।’
‘ঠিক আছে। থাকো।’
আফনান মির্জা আর নাফিসা বেগম মেরাবকে দেখে চলে যায়। তারা প্রথমে যেতে চায়নি কিন্তু মেরাবের জোরাজোরিতে যেতে বাধ্য হয়। স্নেহা থেকে যায়। সকাল হতেই মারুফুল খান খবর পান তার ছেলে হসপিটালে। তিনি সহ বাড়ির সবাই চলে আসেন হসপিটালে। ফাহমিদা খান মেরাবের সামনে এসে বসে সাথে সাথে কেদে উঠে বলেন,
‘কি অবস্থা হয়েছে ছেলেটার। ইশ না জানি কতটা ব্যথা পেয়েছে।’
মেরাব বলে,
‘বেশি ব্যাথা পাইনি তো!’
ফাহমিদা খান ধমকের সুরে বলেন,
‘একটা দিবো এখন! মিথ্যে বলছো কেনো আমি দেখতে পাচ্ছি তো কতটা ব্যথা পেয়েছো। আর এত রাত করে ফিরতে হবে কেনো? সকালেই ফিরতে।’
ফাহমিহা খান আসিফের দিকে তাকিয়ে বলেন,
‘দুজনের একসাথে থাকা এখন থেকে বন্ধ।’
আসিফ বলে উঠে,
‘আন্টি এতে আমাদের একসাথে থাকা বন্ধ কেনো?’
মেরাব আসিফের দিকে তাকিয়ে চুপ থাকতে বলে। ফাহমিদা খান মারুফুল খানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
‘এই তুমি যাও, ডাক্তারের সাথে কথা বলে এসো।’
ফাহমিদা খান মেরাবের এই অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে উঠলেন। মেরাব তার কথা বলার মাঝে নিজের মাকে খুঁজে পায়। তার মা ও ঠিক এইভাবে উতলা হয়ে যেতো কিছু হলে।
ফাহমিদা খান নিজেই মারুফুল খানকে নিয়ে বাহিরে ডক্টরের সাথে কথা বলতে গেলেন। মৌ এগিয়ে এসে মেরাবের কাধে হাত রেখে বলল,
‘ ভাইয়া তোমার এখন কেমন লাগছে?’
‘ভালো।’
‘খুব ব্যাথা পেয়েছো?’
‘ধুর পাগলী, খুব ব্যাথা পেলে কি বসে থেকে কথা বলতে পারতাম?’
মৌ তৎক্ষণাৎ আসিফের দিকে তাকিয়ে কোমরে হাত গুজে বলে,
‘আপনি যদি এরপরে আমার ভাইয়াকে রাত-বিরাতে ডাকেন না তাহলে খবর আছে।’
আসিফ এবার রেগে যায়। সব দোষ তার উপরে এসে কেনো পড়ছে তাই বুঝতে পারছে না। আসিফও মৌয়ের সামনে এসে কোমরে হাত গুজে বলে,
‘তোমার ভাইকে সিন্দুকে তুলে রেখো!’
‘হুম। দরকার হলে তাই রাখবো।’
স্নেহা হেসেই দিলো ওদের ঝগড়া দেখে। এরপরে মৌকে নিয়ে কথা বলতে বলতে বাহিরে চলে গেলো।আসিফ মেরাবের সামনে এসে বলে,
‘কিরে সবাই আমাকে দোষারোপ করছে কেনো রে?’
মেরাব হেসে হেসে বলে,
‘বাড়িতে থেকে বের হওয়ার সময় সবাইকে বলে এসেছিলাম আসিফের সাথে একটা জায়গায় যাবো। তাই সবাই তোকে দোষ দিচ্ছে।’
আসিফ অবাক হয়ে বলে,
‘ওরে শালা। তুই ঘরে ঝামেলা বাঁধিয়ে এসেছিস আমাকে নিয়ে।’
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে দুপুর তিনটায় আসবে। এর আগে কোনো পর্ব আসবে না।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৬
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ২
-
কি আবেশে পর্ব ৭
-
চোরাবালির পিছুটানে গল্পের লিংক
-
কি আবেশে পর্ব ১০(স্পেশাল পার্ট)
-
কি আবেশে পর্ব ৫
-
কি আবেশে পর্ব ৮
-
কি আবেশে পর্ব ৩
-
কি আবেশে পর্ব ১১
-
কি আবেশে পর্ব ১২