কাজরী-৪
“কাজরীর সঙ্গে কথা হলো? “
আল্পনা মাথা নেড়ে না বলল। আখতারউজ্জামান গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি কাজরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে? ও কী করছে, কেমন আছে সেসব খবর রাখবে? “
“কাজরী না চাইলে ওর ব্যাপারে কিছু জানা সম্ভব নয় বাবা। “
আখতারউজ্জামান বিরক্ত হলেন। বললেন,
“তুমি চেষ্টা করবে। সম্ভব না বলে চেষ্টা থেকে বিরত থাকলে তো চলবে না। “
আল্পনা জবাব দিলো না। আখতারউজ্জামান বললেন,
“তুমি এখন যাও। “
আল্পনা তবুও বসে আছে দেখে প্রশ্ন করলেন,
“আর কিছু বলবে? “
“কাজরী গয়নার বক্স নিয়ে যায় নি। আর আমার স্টোর রুমের চাবিটা দরকার ছিলো। “
গয়নার বাক্সের কথাটা তেমন গুরুত্ব না পেলেও স্টোর রুমের চাবির কথা শুনে বাবার মুখের অভিব্যক্তির যে পরিবর্তন হলো সেটা লক্ষ্য করলো আল্পনা।
“স্টোর রুমের চাবি দিয়ে তুমি কী করবে? “
“মায়ের কিছু জিনিসপত্র খুঁজে পাচ্ছি না। সেগুলো… ওই আর কী….
আখতারউজ্জামান এই বিষয়ে আর প্রশ্ন করলেন না আল্পনাকে। বললেন,
“আমি রুম খুলে দিতে বলব। এখন যাও তুমি। “
আল্পনা বেরিয়ে এলো। খুব ভয় পাচ্ছিলো, পাছে বাবা ওর মিথ্যেটা না ধরে ফেলে। মায়ের জিনিসপত্র নয়, স্টোর রুমের চাবিটা ওর অন্য কারণে দরকার।
আখতারউজ্জামান এর কাছের মানুষের মধ্যে অনেকেই জানে যে চৌধুরীদের বহু আগে একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো। দুই পরিবারে নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো। কী কারণে সেটা শত্রুতায় রুপ নেয় তা অস্পষ্ট। শুধু রাজনৈতিক কারণ নাকি অন্য আরও কারণ আছে তা নিয়ে ধোয়াশা
আখতারউজ্জামান এর আগে সুবর্ন নগরের উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন ফরিদ উদ্দীন মিয়া। তিনি ছিলেন ওয়াজেদ চৌধুরীর আরেক হাত। বর্বর এই লোক কে ওয়াজেদ চৌধুরী সব রকম শেল্টার দিতেন। জমি নিয়ে বিরোধ ছিলো রাজ্জাক মুন্সি নামের এক লোকের সঙ্গে ফরিদ উদ্দীন সেই লোক কে নিজ হাতে জবাই করেছিলেন ফজরের নামাজের পরে। ওয়াজেদ চৌধুরীর ছত্রছায়ায় তিনি সেইবার ভালো রকম উতরে যায়। মাস দুয়েক পর ঘটে এক ভয়ংকর ঘটনা। দুপুরের ভাত খেয়ে ফরিদ উদ্দীন বিশ্রাম করছিলেন। বাড়িতে চাকর, বাকর নিজের লোকের অভাব নেই তবুও একদল দুবৃত্ত রা বাড়ি ঢুকে ফরিদ উদ্দীন কে বাজেভাবে কুপিয়ে হত্যা করলেন। শুধু তাতেই থামলো না, ফরিদ উদ্দীন এর তিন ছেলেকেও একই দিনে হত্যা করে মারা হলো।
এরপর ফরিদ উদ্দীন এর জায়গায় নির্বাচন করেন আখতারউজ্জামান। তিনি মানুষ হিসেবেও লোকের কাছে ভালো প্রমাণিত হলেন। কিন্তু সমস্যা হলো চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি আখতারউজ্জামান এর রাজনীতিতে আসা মেনে নিতে পারেন নি। সামনাসামনি দুজনের মতবিরোধ, মন কষাকষি কিছুই নেই। তবুও দুজনের কার্যক্রম একটা না একটা কন্ট্রোভার্সি তৈরী করছিলো।
আখতারউজ্জামান চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। গভীর চিন্তায় মগ্ন। জাহিদ অনিচ্ছাসত্ত্বেও ডাকলো,
“চাচা একটু শুনবেন?”
“বলো। “
“যশোর পার্টি কিন্তু ঝামেলা করছে। “
আখতারউজ্জামান বুঝতে পারলেন যে জাহিদ কার কথা বোঝাতে চাইছে। তিনি জানতেন মেয়ের বিয়ের সময় একটা ঝামেলা নিশ্চয়ই হবে। তবে তিনি এই ধরনের ঝামেলা আশঙ্কা করেন নি। বরযাত্রীর গাড়ির উপর হামলা হলো, তাও কী না চৌধুরী বাড়ির কাছাকাছি রাস্তায়। ওয়াজেদ চৌধুরী সরাসরি আখতারউজ্জামান কে বলেছেন,
“নির্বাচনের সময় এই ধরনের ঝামেলা আমি করে নিজেকে নির্বোধ প্রমাণ করব না সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তুমি। এটা তৃতীয় পক্ষের কাজ। সে আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। “
“তৃতীয় পক্ষের এই স্পর্ধা দেখে আমি নিজেও স্তম্ভিত। কিন্তু দশজনের মধ্যে আটজনের কাছেই তৃতীয় পক্ষের এই গল্পটা আজগুবি কথা মনে হবে। “
“লোকের মুখ বন্ধ করার উপায় আছে আমার কাছে….
তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যে দিন টার অপেক্ষায় আখতারউজ্জামান ছিলেন। কাজরীর সঙ্গে তার একটা দূরত্ব তৈরী হবে এই বিয়েকে কেন্দ্র করে। হয়তো দূরত্ব শুরু হয়েও গেছে ইতিমধ্যে। তর্কযুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ফিরে যাবার সময় কাজরী তাকে বলেছিল, আপনি সত্যিই ইমোশনলেস। আমার জন্য তো কিছু আশা করি না, কিন্তু আল্পনার জন্য একটু আশা করেছিলাম।
আখতারউজ্জামান কাজরীর এই কথার পিঠে কিছু বলেন নি। তিনি অপেক্ষা করলেন সময়ের। সময় একদিন ঠিক ই সব প্রশ্নের জবাব দিবে।
কাজরী সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘন্টাখানেক পর আবারও ঘুমিয়ে পড়লো। ইশান আরও একবার এসে ফিরে গেছে। দ্বিতীয় বার কাজরীর ঘুম ভাঙলো দুপুরের পর। সময় নিয়ে গোসল করে বের হতেই দেখলো শবনম নামের মেয়েটা ওর খাবার নিয়ে এসেছে। শবনম কে কাল থেকে ওর সব কাজ করতে দেখা গেছে। মনে হয় ও’কে সেভাবেই বলা হয়েছে। শবনম কাজরীকে বলল,
“স্যার বললেন ঘরে বসে খেয়ে নিতে আজ। বাড়িতে এতো বেশী গেস্ট আছে যে আপনার অস্বস্তি হতে পারে। “
“থ্যাংক ইউ শবনম। “
কাজরী খাবারের মেন্যু টা দেখলো। ভাতের সঙ্গে কয়েক রকম ভর্তা, সবজি, চিংড়ি, ইলিশ সহ চিকেন বিফও আছে। শবনম প্লেটে খাবার সার্ভ করতে গেলে কাজরী বারন করলো। জানালো যে ও নিয়ে নিতে পারবে। ঠিক সেই সময় ইশান ঘরে প্রবেশ করলো। শবনম বেরিয়ে গেল। এই বাড়িতে কাজ করার আগে সম্ভবত সবাই কে এই ম্যানার শেখানো হয়েছে। কাজরী প্লেটে ভাত, সালাদ আর চিকেন তুলে নিতে নিতে বলল,
“তুমি কী বলতে চাও বলো। আমি খেতে খেতেই জবাব দেব।”
“তুমি বেশ চিল ম্যুডে আছ! খাচ্ছ, ঘুমাচ্ছ! গ্রেট! “
কাজরী আড়চোখে এক পলক দেখে বলল,
“তুমি অন্যকিছু এক্সপেক্ট করেছিলে? কাঁদব, মুষড়ে পড়ব এই টাইপ!”
“না। যতটা স্মার্ট হবার ভাব দেখাচ্ছ ততটা ভাবি নি। বাই দ্য ওয়ে, তুমি আমাকে বিয়ে করেছ নিশ্চয়ই টাকা আর স্ট্যাটাস এর জন্য?”
কাজরী চামচে করে অল্প ভাত মুখে নিলো। ভাতটুকু শেষ করে বলল,
“নামের পাশে চৌধুরী পদবী টা বাদ দিলে তোমার আর অস্তিত্ব থাকবে?”
কথাটা ইশানের ইগো হার্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু ও স্বাভাবিক রইলো। বলল,
“নামের পাশে চৌধুরী পদবী টা বাদ দিতে হবে কেন? আর ওয়াজেদ চৌধুরী আজ যা কিছু হয়েছে তাতে তার বাবার অবদান ছিলো। আমার মাথায় রাজমুকুট তুলে দিতেও বাবা থাকবেন। এটাই স্বাভাবিক বিষয় নয় কী?”
কাজরী ঠোঁট উল্টে বলল,
“হয়তো। “
“তবে তোমার হিসাব ঠিক আছে। বিজনেসম্যানের মেয়ে বলে কথা। “
“আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত টা একদম সঠিক ছিলো। “
কাজরী উপহাসের সুরে বলল,
“আচ্ছা! এতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করো নিজেকে? “
ইশান হো হো করে হাসলো। বলল,
” অফকোর্স। আমি হলাম কিং। আর রাজাদের ব্যাপার স্যাপার একটু আলাদা হয়। বাই দ্য ওয়ে, চৌধুরী বাড়ির অন্দরমহলে তুমি রানীর পরিচয়ে থাকলেও আমার কাছে তোমার গুরুত্ব ততটুকুই যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ আমি তোমাকে ভাবব। “
কাজরী মৃদু হেসে বলল,
“রানী হবার সবরকম যোগ্যতা যে আমার আছে সেটা মানছ তবে। “
“বিয়েটা যেহেতু আমার সঙ্গে হয়েছে… না চাইলেও মেনে নিতে হচ্ছে। “
“মিস্টার চৌধুরী আমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন ইশান। তুমি বোধহয় এটা জানো না। চৌধুরী প্যালেসের কুইন হবার মতো যোগ্যতা ও ক্যাপাসিটি আছে বলেই সেটা হয়েছে। তুমি অনেক বড় কিছু আর আমি অতি নগন্য দূর্বল টাইপ এমন কিছু ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভোগার মতো বোকামি তুমি কোরো না কেমন। “
ইশান উঠে দাঁড়ালো। কঠিন গলায় বলল,
“তুমিও নিজেকে ডানা কাটা পরী ভাবা বন্ধ করো। তোমার আমার বিয়ে রাজনৈতিক কারণে হয়েছে। ওয়াজেদ চৌধুরী নিজের ছাড়া অন্যের টা খুব কম ই ভাবেন। সো, অদৃশ্য পাখাগুলো ছেটে ফেলো। “
কাজরী ঠোঁট উল্টে সায় দিলো। ইশান অস্থির ভাবে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। একটা প্রশ্ন ওর মাথাতেও ঘুরছে। কাজরীর সঙ্গে ওর বিয়েটা এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন যে বাবা ওর শর্ত মেনে নিলেন। কিছু একটা দূর্বল দিক ওয়াজেদ চৌধুরীর আছে। যেটা কাজরী জানে, এবং সেই কারণে তার ওভার কনফিডেন্ট আচরণ।
ইশান আবারও ফিরে এলো। হাই তুলে কাজরীকে বলল,
“শুনলাম দাদী নাকি তার পুরোনো কাজের লোকের সঙ্গে তোমার চেহারার মিল পেয়েছেন?”
কাজরীর চোয়াল শক্ত হলো। রুক্ষ স্বরে বলল,
“সো হোয়াট? “
ইশান হেসে ফেলল। কাজরীর এমন একটা মুখাবয়ব দেখার জন্যই যেন ও অপেক্ষা করছিলো।
আজ ইশান ও কাজরীর রিসিপশন। সবকিছুর আয়োজন রাজকীয় ভাবে হচ্ছে। বিয়েটা হুট করে সাদামাটা হলেও বধূবরণ থেকে বাকী সবকিছুতে বিশাল আয়োজন।
কাজরীকে সাজাতে দেশের নামকরা মেকাপ আর্টিস্ট এসেছেন। তিন ডিজাইনের লেহেঙ্গা আনা হয়েছে এবং একদম নতুন গয়না। শিরিন মেকাপ আর্টিস্ট কে বললেন,
“যেটা ও’কে মানাবে সেটা পরাবেন। দেখতে যেন সুন্দর লাগে। ইশান চৌধুরীর বউয়ের লুক নিয়ে কেউ যেন আঙুল উঠাতে না পারে।”
মেকাপ আর্টিস্ট শিরিনের কথার তেজ কমিয়ে দিলো এক বাক্যেই। বললেন,
“উনি তো ন্যাচারালি খুব সুন্দর। ভারী মেকাপ না হলেও সুন্দর লাগবে। আর এই লেহেঙ্গা গুলো বেশী সুন্দর লাগবে ওনার গায়ে উঠলে। “
শাশুড়ী যে তার পুত্রবধূকে তেমন পছন্দ করছেন না সেটা মেকাপ আর্টিস্ট এর জানা নেই। তিনি নববধূর প্রশংসা রঙচঙ মেখে করেছেন বাড়তি টিপসের আশায়।
শিরিনের কথায় কাজরীর কোনো ভাবান্তর হলো না। ওর মনে অন্যকিছু চলছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ কিছু অঘটন ঘটবে। আল্পনার বিয়ের দিন যেরকম ঘটেছিলো সেরকম কিছু ঘটবে। কাল দুপুরের পর ইশানের সঙ্গে ওর দেখা হয় নি। রাতে নাকি জম্পেশ পার্টি করে ফিরেছে। এই খবর টা পেয়েছে শবনমের কাছ থেকে। শবনম আরও একটা বিষয় জানিয়েছে কাজরীকে। বিষয় টা হলো, ইশানের বাবা নাকি কাল খুব রিয়েক্ট করেছেন নতুন বউ রেখে এতো রাত অবধি বাইরে পার্টি করার জন্য।
ইশানের লাইফস্টাইল নিয়ে কাজরীর তেমন মাথাব্যথা নেই। বাইরে পার্টি করুক, মারামারি করুক যা খুশি করুক। কিন্তু কাজরীর কাছে না এলেই হয়। ইশান স্বামীর অধিকার ফলাতে এলে ব্যাপার টা খুব বিশ্রী হয়ে যাবে।
কাজরী হঠাৎ ই নিয়মবিরুদ্ধ একটা কাজ করলো। কাজটা করা উচিত নাকি অনুচিত সেটা ভাববার জন্য বেশী সময় নিলো না। মেকাপ আর্টিস্ট কে বলল আমি আপনার হাতে সাজব না। আমি নিজেই সাজতে পারব। মেকাপ আর্টিস্ট হতভম্ব হয়ে গেলেন। তার কোনো দোষ ত্রুটি আছে কিনা সেটা জানতে চাইলেন। কাজরী এতো ব্যখ্যা দিতে গেল না। ও সাজঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল ইশানের দাদীর ঘরে। বাড়িতে ঘন্টাখানেক ধরে চলল কথাবার্তা। শিরিন অস্থির হয়ে উঠলেন। এই মেয়ের মতিগতি ভালো ঠেকছে না। আখতারউজ্জামান এর মেয়ের কাছ থেকে তিনি এরকম আচরণ আশা করেন নি। কাজরী ইশানের দাদীর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো এক ঘন্টা পর। পরনে স্বর্নকাতান। গলায় সেই পানপাতা হার, কানে বড় ঝুমকা। চেহারায় ফুটে উঠেছে এক অন্যরকম আভিজাত্য। শিরিন কাজরীকে জিজ্ঞেস করলো,
“ওই ঘরে কী করছিলে এতক্ষন?”
“সাজলাম তো। দেখুন ঠিক আছে কী না? আপনার একটা কথা কানে বাজছিলো খুব। ইশান চৌধুরীর স্ত্রীর লুক নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন করতে না পারে। ভালো লাগছে আমাকে? “
শিরিন আপদামস্তক কাজরীকে দেখলেন। কোনো এঙ্গেল থেকেই বলার উপায় নেই যে ওকে খারাপ লাগছে। বরং সাজের ধরনে রাজকীয় ভাব থাকায় একটা গাম্ভীর্য ভাব এসেছে।
শিরিন বাড়িভর্তি মানুষের সামনে কিছু বললেন না। তবে তার মাথার মধ্যে ব্যাপার গুলো গেথে নিলেন একে একে। কাল সকাল থেকে শুরু হবে হিসাব নিকাশ। আজ রাত অবধি ও যা করে করুক।
অসংখ্য ক্যামেরা, লাইটে কাজরীর চোখে অস্বস্তি হচ্ছে। চোখ খুলে তাকাতে পারছে না ভালো করে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইশান। ওর ঠোঁটে হাসি লেগে আছে। ক্যামেরার ছবি উঠছে বলে ওর একটা হাত কাজরীর কাঁধ অবধি ছিলো। এখন সেই হাতটা কোমড়ে। কাজরী সরে যেতে চাইলে আরও শক্ত করে ধরলো। ইশান মুখ নামিয়ে কাজরীর কানে কানে বলল,
“গ্রেট প্লেয়ার তুমি! সবার আগে দাদীকে নিজের কব্জায় এনেছ তাই না? “
কাজরী ইশানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসি দিলো ও’কে বিভ্রান্ত করার জন্য। কিন্তু ইশান ও’কে নিজের দিকে টেনে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলো।
আল্পনা কাজরীর সঙ্গে দেখা করার সময় পেলো অনেকক্ষন পর। কাজরী আল্পনাকে দেখে খুশি হলো নাকি বেজার হলো বোঝা গেল না। গম্ভীর মুখেই বলল,
“তুমি যে আসবে সেটা এক্সপেক্ট করিনি। ঠিক আছ তুমি? “
আল্পনা মলিন হেসে বলল,
“তোমাকে খুব মিষ্টি লাগছে। “
কাজরী বিনিময়ে একটু হাসলো। আল্পনা খেয়াল করলো যে কাজরী একটা কিছু নিয়ে চিন্তিত আছে। ও দূর থেকে দুজনকে দেখছিল । কী সুন্দর লাগছে! চোখ নামিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে।
আল্পনা সংকুচিত হয়ে যায়। ওর বিয়ে যার সঙ্গে ঠিক হয়েছিল তার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল কেবল দুই মিনিটের জন্য। ও একবার লোকটাকে চোখ তুলে দেখেছিল। লোকটা তাকিয়ে ছিলো নিজের পায়ের দিকে। ভালো করে দেখতেও পারে নি মুখ টা। হঠাৎ হঠাৎ সেই নতমুখ টা মনে হলে অস্থির হয়ে যায়। তখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়। মনে হয় ওর দুর্ভাগ্যের কারণেই লোকটা মারা গেছে।
শিরিন বসে আছে আখতারউজ্জামান এর মুখোমুখি। শিরিন ভেবেছিলেন কাজরীর স্পষ্টবক্তা হবার ব্যাপার টা নিয়ে আখতারউজ্জামান কে কিছু বলবেন। কিন্তু এখানে অন্য একটা ঘটনা ঘটে গেছে। আখতারুজ্জামান সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট হওয়া ইশান আর ত্বরিতার ছবিগুলো শিরিন কে দেখালেন। সেটা দেখার পর শিরিন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন। ত্বরিতার ব্যাপার টা উনি জানেন। ইশান বিয়েতে সম্মতি দিতে যে তাড়াহুড়ো দেখিয়েছে তাতে তিনি ভেবেছিলেন ত্বরিতার চাপ্টার টা ও ক্লোজ করে ফেলেছে।
শিরিন নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“ছেলেদের টুকটাক এমন দোষ বিয়ের আগে থাকেই। বিয়ের পর বউ কত টা সামলে রাখতে পারে সেটা দেখার বিষয়। “
আখতারউজ্জামান হেসে বললেন,
“মিসেস চৌধুরীর লজিকে ঝাঝ টের পাওয়া যাচ্ছে না। “
শিরিন সরু চোখে তাকালো। বললেন,
“এর আগে কতবার ই বা আপনি আমার মুখোমুখি বসে আমার গলার ঝাঝ পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন?”
আখতারউজ্জামান নিভে গেলেন। শিরিন সেটা দেখে বললেন,
“আমাকে যা বলার বলেছেন কিন্তু চৌধুরী সাহেব কে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস করবেন না। “
“সাহস, দু:সাহসের প্রশ্ন আত্মীয়তার সম্পর্কের মধ্যে আসবে কেন? আর যা কিছু আপনাকে বলেছি তা চৌধুরী সাহেব কেও বলতে তো হবেই কারণ তিনি বলেছিলেন তার ছেলে শুধু উচ্ছৃঙ্খল, খারাপ নয়। চৌধুরীদের চরিত্রের দোষ নেই। এখন ওনার কথার সত্যতা তো ওনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। “
শিরিন অপমানে দগ্ধ হতে হতে উপলব্ধি করলেন যে কাজরী কথার পিঠে কথা বলার স্বভাব এই ধূর্ত লোকের কাছ থেকেই পেয়েছে।
এই পার্টিতে আল্পনার মতো পরিস্থিতি আরও একজনের আছে। সে হলো নিশান। তাকেও শুনতে হচ্ছে বড় ভাইয়ের আগে ছোট ভাইকে কেন বিয়ে করতে হলো। এছাড়া আরেকটা বিরক্তিকর কারণ হলো নিশানের দাদী। এই বৃদ্ধা মহিলা ও’কে পছন্দ করে না। তিনি কাউকেই পছন্দ করেন না। খানিকটা আহ্লাদীপনা ইশানের সঙ্গে দেখান সেটা ঠিক আছে। তবে কাজরীকে সিন্দুক খুলে গয়না দেয়ার ব্যাপার টা চোখে লাগার মতো । বাড়ির বনেদি আংটি টা কাজরীর অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে। যতবার নিশানের চোখে পড়ে ততবারই কানে একটা অদৃশ্য মৃদু কন্ঠস্বর বেজে ওঠে। দাবার গুটিগুলো উল্টো চালে চলছে। এবার ইশান জিতে যাচ্ছে।
নিশানের হাতের মুঠোয় বাজছে মুঠোফোন। স্ক্রিনে বাবার নাম টা দেখা যাচ্ছে। নিশান কল রিসিভ করতেই গম্ভীর গলায় ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো।
“আমার স্টাডি রুমে আসো।”
নিশানের হঠাৎ একটু ভয় লাগলো। ভয়টা অমূলক ছাড়া কিছু নয়। প্রতিদিন একবার হলেও ও বাবার স্টাডি রুমে যায়। কিন্তু একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরলো হঠাৎ।
“বাবা আসব?”
“হু।”
ঘরে জ্বলছে সবুজ রঙের ড্রিম লাইট। চৌধুরী সাহেব যখন কোনো কিছু নিয়ে চিন্তায় থাকেন তখন তার ঘরের পরিবেশ এমন থাকে।
“কোনো সমস্যা বাবা?”
নিশানের দিকে ট্যাব টা তুলে ধরলেন বাবা। নিশান দেখতে পেল ত্বরিতা ও ইশানের ছবি। নিশানের মুখ শুকিয়ে গেল মুহুর্তেই। ওয়াজেদ চৌধুরী নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“মেয়েটা দু:সাহসিক কাজ করেছে। কিন্তু ইন্দন কে জুগিয়েছে? তোমার মা?”
নিশান স্পিচলেস হয়ে বসে রইলো।
আল্পনা একাই বসে ছিলো। আশেপাশে পরিচিত কেউ নেই। কেউ কাজরীর আশেপাশে তো, কেউ সেলফি নিতে ব্যস্ত। আল্পনা একটা টেবিলে বসে ছিলো। হঠাৎ একজন এসে জিজ্ঞেস করলো,
“আল্পনা? “
আল্পনা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো।
“একটু আসুন আমার সঙ্গে। “
“কেন?”
“কাজরী আপনাকে আসতে বলল। “
আল্পনা উঠে চলে গেল। আর কোনো প্রশ্ন করলো না।
কাজরী আশঙ্কা করেছিল বিপদ যা কিছু আসুক সেটা ও কিংবা ওর বাবাকে ঘিরে হবে। কিন্তু আল্পনার কথা মাথায় আসে নি একবারও।
চলবে…..
সাবিকুন নাহার নিপা
(বেশী বেশী লাইক কমেন্ট করুন।)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ১
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ৭
-
কাজরী পর্ব ৩
-
কাজরী পর্ব ৫