Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব (৩০+৩১)


কাজরী-৩০+৩১

সাবিকুননাহারনিপা

ইশান বাবার চিঠিটা দ্বিতীয়বার পড়ার সাহস পেল না। যতটা ভ*য়ংকর তাকে ভেবেছে সেটার চেয়ে দশগুন মনে হচ্ছে চিঠির শেষ অংশটুকু পড়ার পর। চিঠিটা লেখা তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে। তার হাতের লেখা, সিগনেচার না থাকলে ইশান এটাকে মিথ্যে বলেও উড়িয়ে দিতে পারতো।

ইশানের ভাবনা এলোমেলো হয়ে যায়। ওয়াজেদ চৌধুরীর সম্পত্তির পরিমাণ কম নয়। চৌধুরী গ্রুপ, বাড়ি, প্রোপার্টি সবকিছুর মালিকানার বদলে ও’কে একজন মানুষকে সরিয়ে দিতে হবে। এটা ঠিক শর্ত নয়, বরং একটা টাস্ক। সবকিছু তো অলরেডি ইশানের নামে দলিল করা হয়ে গেছে, চাইলেও সেটা পরিবর্তন সম্ভব নয়। উনি তো দলিলে কোনো শর্তনামাও রাখেন নি।

চৌধুরী সাহেব ভেবেছেন ইশান ক্ষমতা, প্রতিপত্তির মোহে অন্ধ হয়ে তার শেষ ইচ্ছে মেনে নিবে। ইশান লকারে পাওয়া অন্য ফাইলগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজলো, সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু চোখে পড়ে নি। ইশান চিঠিটা সঙ্গে নিয়ে বাদবাকি সবকিছু লকারে রেখে বেরিয়ে গেল। ওর কানে রিপিট হচ্ছে মায়ের একটাই কথা। আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে ইশান, আমি এটা ডিজার্ভ করি না।

ইশান বেরিয়ে গেল। শিরিন চৌধুরীর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা দরকার।


“ওয়াজেদ চৌধুরী ঠান্ডা মাথার লোক ছিলেন। তোমাকে একটা ঘটনা বলি, সুবর্ন নগরের আগের যে চেয়ারম্যান ছিলেন তার নাম ফরিদ উদ্দীন। চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ভাত খাওয়ার মতো সম্পর্ক ছিলো। চৌধুরী সাহেব তাকে দিয়ে নিজের অনেক গোপন কাজ করিয়েছেন। দুই একটা লাশও গায়েব করেছিলেন ফরিদ উদ্দীন। এই মানুষ ক্ষমতার জোরে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল দিন দিন। মাদক ব্যবসা ছাড়াও যত ধরনের অবৈধ ব্যবসা আছে সবকিছুর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মিস্টার চৌধুরী তাকে সবরকম আইনী প্রোটেকশনও দিতেন। অথচ ফরিদ উদ্দীনকে তিনি নৃশংস ভাবে হত্যা করালেন। শুধু তাই নয়, তার পুরো বংশই শেষ করলেন। ছয় বছরের নাতিটাকে পর্যন্ত মে*রে ফেলা হলো। “

কাজরী প্রশ্ন করলো,

“উনি এমন কেন করলেন? “

“শোনা যায় ফরিদ উদ্দীন তার সঙ্গে বেইমানি করেছিলেন। ধরা পড়ে ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক ঠিক করেও নিয়েছিলেন।তবে সুবর্ননগরে তিনি ওয়াজেদ চৌধুরীর চেয়েও বড় মাথা হতে চেয়েছিলেন।”

“উনি তো আপনাকে ভয় পেতেন?”

“আমাকে ভয় পেতেন এটা তোমার ভুল ভাবনা। তবে আমাকে সরিয়ে দিলে তিনি বিপদে পড়তেন এটা জানতেন। আমার বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই, তাছাড়া সুবর্ননগরের মানুষজন আমাকে ভরসা করতেন এটা তার চিন্তার কারণ হলেও ভয়ের কারণ ছিলো না। সুবর্ননগর তার বাপ, দাদার এলাকা। সেখানকার সবকিছু গুটিয়ে আসার মতো মানসিকতা তার ছিলো না। বাপের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ছিলো। তিনি মানুষও ভালো ছিলেন। তাছাড়া উনি শেকড় আকড়ে ধরে রাখা মানুষ। বলতে পারো বাপের প্রতি তিনি অবসেসড ছিলেন। দেখো নি ওনার স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, এতিমখানা, মসজিদ সবকিছুই বাপের নামে করা। সুবর্ননগর তার বাবার এলাকা বলে উনি চেয়েছিলেন ওখানকার সর্বেসর্বা হতে। কিন্তু ওনার মৃত্যুই তো সবকিছু বদলে দিলো। “

“উনি সম্ভবত ইচ্ছেমৃত্যু বেছে নিয়েছেন। ওনার গোছানো কাজ, বিশেষ করে ওনার দলিল তাই ভাবতে বাধ্য করছে। “

“উড়িয়ে দেয়া যায় না এই ভাবনা। উনি সেই মানুষ যে ভাঙবেন কিন্তু মচকাবেন না। নিশান, শিরিন চৌধুরীকে তিলে তিলে শেষ করার জন্য উনি মৃত্যুকে বেছে নিতেই পারেন। কারণ উনি সবসময় চেয়েছেন নিজেকে বড় রাখতে। আজ যদি সারা দেশের মানুষ জেনে যায় নিশান তার ছেলে না, সেক্ষেত্রে চৌধুরীর প্রতি একটা সিম্প্যাথি তৈরী হবে। কিছু লোক তাকে সম্মানের চোখে দেখবে কারণ নিশানকে তিনি গড়েছেন যত্ন করে। আর বেশী সংখ্যক লোক শিরিন চৌধুরী ও নিশানকে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়ী করবে। তার সব পাপ, অন্যায় চাপা পড়ে যাবে এই একটা সত্যি সামনে এলেই। “

“আপনি আমাকে আরও একটা সত্যি বলুন। আপনাদের সঙ্গে সেদিন যে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল তার পিছনে ওয়াজেদ চৌধুরীর হাত ছিলো? “

আখতারউজ্জামান নরম গলায় বললেন,

“আমি এই ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তোমার মা আমাকে বাড়তি কিছু বলেনও নি। আমি তোমাকে এই ব্যাপারে যতটুকু বলেছি এর বাইরে আর কিছু বলা সম্ভব নয়। “

কাজরী অস্থির গলায় বলে,

“কবে? কিভাবে আমি সব জানতে পারব। যে সবকিছু জানতেন তিনিও আর নেই। আপনি জানেন চৌধুরীর মৃত্যু আমাকে কতো দূর্বল করে দিয়েছে?”

“তোমার জন্য একটা সত্যিই যথেষ্ট যে ওই ঘটনার পর তোমার মা’কে শর্ত দেয়া হয়েছিল যে গর্ভপাত করাতে হবে। সন্তান জন্ম নিলে পিতৃপরিচয় নিয়ে সমাজের যে প্রশ্ন উঠবে সেটা মানা সম্ভব না। এই শর্ত ইফতেখার চৌধুরী নিজেই দিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে তিনি উপস্থিত থাকা স্বত্তেও। তোমার মা অভিমান করে চৌধুরী প্যালেস ছেড়ে আসে। অভিমান হয়তো না, তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে তার সন্তানকে রেখেছিলেন। আর তারপর তিনি আল্পনার মায়ের ঘরে ফেরা নিশ্চিত করার জন্য স্বেচ্ছায় ডাকাতের কাছে ধরা দিয়েছিলেন।”

কাজরী আরও একবার এই ঘটনা শুনেছে। দ্বিতীয়বার শুনেও দুর্বল হয়ে গেল। আখতারউজ্জামান গলায় মমতা ঢেলে বললেন,

“কাজরী তুমি দূর্বল কেন হচ্ছো? আমি কখনো চাই নি তুমি দূর্বল হও। তুমি শক্ত, দৃঢ় থাকো। “

“আমি এখন কী করব? মিস্টার চৌধুরী বেঁচে নেই, আমার লড়াই তো ছিলো তার সঙ্গে। “

“তুমি বলছ লড়াই শেষ? “

“শেষ নয়? আমার মায়ের ইচ্ছে ছিলো আমি ওই বাড়িতে থাকি। মিস্টার চৌধুরীকে মনে করিয়ে দেয়া যে তারা না চাওয়া স্বত্তেও আমি ওই প্যালেসে মাথাউঁচু করে আছি। কিন্তু এখন তো উনি নেই। “

“কী চাইছ তাহলে? ফিরে আসবে? “

কাজরীকে বিভ্রান্ত দেখালো। আখতারউজ্জামান বললেন,

“ইফতেখার চৌধুরী মারা গিয়েছিলেন আ*ত্মহত্যা করে। মানসিক ভাবে সুস্থ ছিলেন না। অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, মদের নেশায় ডুবে থেকে নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলেন। তিনি সজ্ঞানে নিজের সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছিলেন তার ভাইকে। যে সম্পত্তির আশিভাগই ছিলো তোমার নানা অর্থাৎ কোমলের বাবার। তিনি বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন। বোনের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবার পর সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন মেয়ে জামাইয়ের নামে। অথচ তোমার মা এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন, পরবর্তীতে তিনি কেমন জীবন যাপন করেছে সেটা শেষবার যখন দেখা হলো তাতে তার মলিন চেহারা বেশভূষায় প্রমাণ পেয়েছিলাম প্রশ্ন না করেও। “

কাজরী অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে আখতারউজ্জামান এর দিকে।

“নিজের প্রাপ্যটুকু কেন ছেড়ে দিচ্ছো? দলীলপত্র যে তৈরী করে গেছেন সেখানে তোমার নাম আছে? “

কাজরী মাথা নেড়ে না বলল।

“তাহলে কেন ভাবছ তোমার কাজ শেষ? তুমি ইশানের কাছ থেকে নিজের অংশ বুঝে নিয়েই ওই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসবে। এমন পরিস্থিতি তৈরী করবে যেন তারা তোমাকে ঘৃনা করার পরিবর্তে ভয় পায়। “

কাজরী মনে করলো ইশান ওর সঙ্গে কতটা সহজ হয়ে গেছে। একটা ভরসার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে দুজনের মধ্যে। পাশাপাশি থেকে কামনার চেয়ে ভরসা, বন্ধুত্বটা তৈরী হয়েছে সবচেয়ে বেশী। এক বিছানায় শুয়েও কাজরী অস্বস্তিবোধ করে না, ইশানও ওর কাছ থেকে ওরকম কিছু এক্সপেক্ট করে না। পূর্ণ সম্মান রেখেছে।

“মিস্টার চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে প্রতিটি মানুষই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। “

কাজরী হালকা গলায় বলল,

“ইশান কিছু জানে না, ও তো ফ্যামিলি পলিটিক্স এর বাইরে ছিলো বাবা। বরং ও নিজেও অনেক ট্রমাটিক সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করেছে। আর মন্যুজান খাতুন আমাকে স্নেহ করেন। বাকী থাকে শুধু শিরিন চৌধুরী।”

“তুমি দূর্বল হচ্ছো কাজরী। শক্ত হও, ইস্পাতের চেয়েও কঠিন হও। মন্যুজান খাতুন এর স্নেহ গায়ে মাখার প্রয়োজন নেই। তার ছেলেও সবাইকে স্নেহ, মায়া দিয়ে শেষে গলা টিপে মে* রে ফেলতেন। জলজ্যান্ত প্রমাণ তো নিশান আছেই তোমার সামনে। “

কাজরী দু’হাতে কপাল চেপে ধরে রাখলো। আখতারউজ্জামান আবারও বললেন,

“এখন যে প্রসঙ্গে তোমাকে বলব সেটা বলা উচিত নয়, তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি। তোমার মায়ের জীবন খুব কঠিন ছিলো। ইফতেখার চৌধুরী তাকে মানসিক অত্যাচার করতেন। ঘরে বউ থাকা স্বত্তেও বাইরে সম্পর্ক রেখে তোমার মা’কে কোনঠাসা করে রাখতেন। “

কাজরীর ঠোঁটে তীর্যক হাসি। ও বলল,

“আপনি যাদের কথা বলছেন তারা কেউ আর নেই। ইফতেখার চৌধুরী, ওয়াজেদ চৌধুরী, কোমল চৌধুরী কেউ আর নেই। যারা নেই তাদের জাস্টিসের জন্য আমি নিজের সঙ্গে ইনজাস্টিস করছি। এই ব্যাপারটাই হাস্যকর তাই না?”

আখতারউজ্জামান স্পষ্ট টের পেলেন কাজরী বদলে গেছে। শুধু বদলে যাওয়া নয়, মানসিক ভাবে খুব দূর্বলও হয়ে পড়েছে। তিনি যে কাজরীকে এতোদিন দেখেছেন সেই কাজরীর সঙ্গে বসে থাকা মেয়েটির অনেক তফাত। চোখের সেই জলন্ত আগুনের পরিবর্তে এখন অসহায়ত্ব। বড্ড ক্লান্তও হয়ে গেছে। কথায় দম নেই, এমন পরিবর্তন এর কারণ কী! তিনি বাবা হয়ে মেয়েকে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারেন না বলে থেমে যান।

“তাহলে কী চাও তুমি? “

কাজরী দৃঢ় গলায় বলল,

“আমি হেরে যাব না। আমার লক্ষ্য স্থির। কষ্টের কারণ এটাই যে যারা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে, আমার মা’কে অন্যায়ভাবে ঠকিয়েছে তারা প্রায়শ্চিত্ত করার আগেই পৃথিবী ছেড়েছেন। তাদের হেরে যাওয়া যেমন আমার দেখা হলো না, তেমনি আমার জিতে যাওয়াও তারা দেখতে পারলেন না। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আমার লক্ষ্য ভুলে যায় নি। “

“এটাই হওয়া উচিত। তুমি বুদ্ধিমতি, বিচক্ষণ। নিজের অধিকার ছেড়ো না, আমি তোমার জন্য আগেও যেমন ছিলাম এখনো আছি। “

“থ্যাংক ইউ বাবা। আমি এখন উঠছি। “

“আল্পনার সঙ্গে দেখা করে যাও। “

কাজরীর এতক্ষনে খেয়াল হলো। অনেকটা সময় তো কাটালো, একবারও আল্পনাকে দেখলো না।

আল্পনা কাজরীকে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো।

“কেমন আছ কাজরী?”

“ভালো। তোমার কী অবস্থা? “

আল্পনা জবাব দিলো মাথানিচু করে।

“আমি ভালো। “

“সেদিনের আঘাতের জন্য সরি। তবে তুমি আমাকে যে আঘাত করেছ সেটা একদম কলিজায় গিয়ে লেগেছে। আমি তোমাকে রেসপেক্ট করি, তুমিও আমার অনেক কেয়ার করেছ। কখনো মনে হয় নি যে আল্পনা আমার মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে, ইভেন আমি ভাবিও নি যে তুমি আমাকে হার্ট করবে। এখন আমি আঘাতটা হজম করে নিয়েছি। ইন ফিউচার তুমি যদি এর থেকেও বেশী হার্ট করো তাতে আমি অবাক হবো না৷ ভেবেই নেব যে তোমার কাছ থেকে এটা এক্সপেক্টেড। আফটার অল ব্লাড রিলেটেড কোনো বন্ডিং তো আমাদের মধ্যে নেই। “

“আমি ভুল স্বীকার করছি। জানিনা আমার কী হয়েছিল…..

“ইউ নিড সামওয়ান টু বি উইথ ইউ। তোমার একজন পার্টনার এর প্রয়োজন আল্পনা। তুমি ফ্যান্টাসির জগতে বিলং করছ। একজন হ্যান্ডসাম হিরো এসে তোমার জীবন পাল্টে দিবে এই টাইপ চিন্তাভাবনা করো তাই না? “

আল্পনা চোখ তুলে তাকালো।

“দুর্জয়ের চ্যাপ্টার টা ক্লোজ হয়েছে। হি ডাজেন্ট লাভ ইউ। ও তোমাকে ইউজ করেছে আমার কাছে পৌছানোর জন্য। আমাকে বিয়ের জন্য প্রোপোজ করেছিল, আমি একসেপ্ট না করায় মেল ইগো হার্ট হয়েছে। দুর্জয় সাইকোলজি নিয়ে রিসার্চ করতে পছন্দ করে। হিউম্যান সাইকোলজি, তোমাকে জাস্ট ইউজ করেছে। অনেক সময় তোমার হাতে, নিজেকে প্রস্তুত করো, গ্রুমিং করো। স্মার্ট হবার ভান না করে কনফিডেন্ট হও যেন দ্বিতীয় কোনো দুর্জয় তোমাকে ইউজ করার কথা না ভাবে। আর মোস্ট ইম্পরট্যান্ট যেটা সেটা হলো নিজের বাউন্ডারি স্ট্রং করো। আখতারউজ্জামান এর মেয়ে তুমি! নিজেকে এতো সস্তা ও তুচ্ছ কেন ভাবো! “

আল্পনা অভিমানী কন্ঠে বলল,

“আমি যেমন আছি তেমন ই নিজের কাছে সন্তুষ্ট। আমার তোমার মতো হবার প্রয়োজন নেই। “

“আমি তো আমার মতো হতে বলিনি। আমি কখনো বেলো দ্য বেল্ট যাইও নি। আমিও চাই না, তুমি আমার মতো হও। তাছাড়া আমি স্ট্রংলি স্বীকার করি যে আমার মতো খারাপ কম মানুষ ই আছে। আমি ইমোশনলেস, ক্রু*য়েল, বাট নট সেলফিশ। “

আল্পনার নাকের পাটা ফুলে উঠলো রাগে। বলল,

“তুমি আমার পিছনে স্পাই কেন লাগিয়েছিলে কাজরী?”

“কনসার্ন থেকে। এখন আর সেই কনসার্ন নেই। শোনো তোমার বাবাকে আমিও বাবা বলে ডাকি। কিছু রেসপন্সবিলিটি থেকেই যায়। বাই দ্য ওয়ে বেস্ট অব লাক। তোমার খুব চমৎকার একজন পার্টনার হোক৷ মন থেকে চাইছি তোমার একটা রোমান্টিক রিলেশনশিপ হোক। ভালো থাকো আল্পনা। “

আল্পনার অভিমানী চোখ ভরে এলো। কাজরী বেরিয়ে গেল, একবারও পিছু ফিরে দেখলো না।


দুটো দিন ইশান ঘরে থাকলো। কারোর সঙ্গে কথাও বলল না তেমন। কাজরীকে ইগ্নোর করলো পুরোপুরি। ও প্রশ্ন করলে সরাসরি বলল,

“আমি আপসেট কাজরী। প্লিজ লিভ মি এলোন।”

কাজরী বিরক্ত করে নি আর। প্যালেসে ওর সময় কাটলো এশনা, মন্যুজান খাতুন এর সঙ্গে। ইশানের চুপ থাকা ও’কেও ভীষণ ভাবালো। কাজরী নিজেও স্পষ্ট টের পাচ্ছে ও লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছে। তবুও জেদে অনড় হয়ে রইলো।

নিশান একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। শারিরীক অসুস্থতা সেড়ে উঠলেও মানসিক বিধ্বস্ততা সাড়ে নি। শিরিন তো এখনো নিজের ফর্মে ফিরতে পারছে না। কাজরী নিশানের জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিল। তখন বলল,

“আমার একটা এডভাইজ আছে নিশান, তুমি দেশের বাইরে চলে যাও। প্রয়োজনে সেখানে সেটল্ড হয়ে যেতে পারো। এই ট্রমা কাটিয়ে ওটা কঠিন হবে, তবুও পারবে কারণ তুমি এখন এডাল্ট। এখানে থেকে নিজের মেন্টাল হেলথ খারাপ করছ!”

নিশান শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এমন পরিস্থিতি ও কখনো কল্পনাও করতে পারে নি। কাজরী জবাব না পেয়ে বলল,

“নিশান এখানে একচুয়েলি তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি আসলে ভিক্টিম। “

নিশান অসহায় গলায় বলল,

“আমি এরকম কিছু কখনো ফিল করতে পারি নি। বাবা…. মিস্টার চৌধুরী যদি আমাকে কখনো ব্যাপারটা ফিল করাতেন….

বাবা শব্দটা উচ্চারণ করেও বুকে চাপ অনুভব করলো নিশান। তিনি স্পষ্ট বলে গেছেন তার একমাত্র ছেলে ইশান চৌধুরী।

কাজরী নিশানের পাশে বসে বলল,

“ইটস অল এবাউট মাইন্ড গেম নিশান। মিস্টার চৌধুরী আর মিসেস চৌধুরীর খেলার অংশ হিসেবে তুমি ব্যবহার হয়েছ। এখন এই ব্যাপারটা যত বড় করে দেখবে, জটিলতা গুলো ততো বাড়বে। আর এই মুহুর্তে কারো সিম্প্যাথি নয়, নিজেই নিজের শক্তি হও। “

এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিশানের কেবল কাজরীর সঙ্গেই কথা বলতে ভালো লাগলো। ইশানের দিকে তো ও তাকাতেই পারছে না। হারজিতের খেলায় ইশান শুধু জিতে যায় নি, বাজিমাৎ করে গেছে। এখন ইশানের করুনা ও’কে মেনে নিতে হবে। অথচ ও স্বপ্নে বিভোর থাকতো ইশানের হেরে যাওয়া দেখে। আর মা শব্দটার প্রতি তো ঘৃনা ধরে গেছে। আরেকবার সামনে পেলে হয়তো খু**ন করে ফেলবে। এই মহিলাকে ও জীবনভর ঘৃনা করে যাবে৷ কখনো আর মা ডাকবে না।


গভীর রাত। ইশান দরজা খুলে বেরিয়ে মায়ের ঘরের দরজায় মৃদু টোকা দিলো। শিরিন দরজা খুলে ছেলেকে দেখে প্রশ্ন করলেন,

“তুমি? নিশান ঠিক আছে? “

ইশান হালকা হেসে বলল,

“ঠিক হয়ে যাবে। ডোন্ট ওরি। আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। “

শিরিন কিছু সময় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বললেন,

“এসো ইশান। “

শিরিন দরজা বন্ধ করে দিলেন। ইশানের মুখোমুখি বসার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলেন। ইশান বলল,

“তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার আগ্রহ নেই সত্যিই। তোমার পাস্ট লাইফ নিয়ে প্রশ্ন করার রাইটও আমার নেই। তবুও আমি জানতে চাই। কিউরিওসিটি থেকে না, আমি একচুয়েলি তোমার সাইকোলজি টা বুঝতে চাইছি। নিশান যদি আমার বাবার সন্তান না হয়ে থাকে তাহলে তুমি কেন আমাকে পিছিয়ে নিশানকে সামনে এগিয়ে রাখতে চেয়েছিলে? আমার সঙ্গে তোমার প্রবলেম কিসের? নাকি তুমি বাবাকে ঘৃনা করো বলেই তার উত্তরাধিকার এমন একজন কে বানাতে চেয়েছিলে যে এটার যোগ্য নয়। “

শিরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“আমার প্রতি তোমার কাউন্টলেস কমপ্লেইন আছে, আগেও ছিলো। আমি বিষয়টা হালকা ভাবে নিয়েছি। খুব বিরক্ত হতাম যে তুমি আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছ না। তবে লাস্ট কয়েকমাস ধরে আমি ফিল করতে পারলাম যে তুমি শুধু অভিযোগ করে ক্ষ্যান্ত হও নি, আমাকে প্রচন্ড ঘৃনাও করো। “

“আউট অব কনটেক্সটে কথা আমরা পরেও বলতে পারব মা। এখন তুমি কারেন্ট সিচুয়েশন নিয়ে কথা বলো। তোমাদের বিয়ের দুই বছর পর নিশানের জন্ম, তারপর অল্প গ্যাপে আমার আর অনেকটা গ্যাপে এশনার। বাবার সঙ্গে বিয়ে হবার পর যদি তোমার জীবনে কেউ এসে থাকে তবে সে কে? তাহলে তার সঙ্গে কেন সেটল্ড হলে না? বাবার তরফ থেকে কোনো থ্রে*ট ছিলো? “

শিরিন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। তিনি ভীষণ লজ্জিত বোধ করছেন আজ। ছেলের সামনে এতো পারসোনাল কথাবার্তা বলতে গিয়ে তিনি অসহায়বোধ করছেন।

“তোমার বাবার সঙ্গে আমার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। তোমার নানার বিজনেসে তিনি ইনভেস্টর ছিলেন। আমি তখন মেডিকেল কলেজে পড়া শেষ করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন এর জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছি। একজনের সঙ্গে রিলেশনশিপে ছিলাম। আমি জানতাম ও বিশ্বাসও করতাম যে তার সঙ্গেই আমার বিয়ে হবে। আমার কলেজের সিনিয়র ছিলেন। প্রচন্ড মেধাবী, জিনিয়াস। কিন্তু সব হিসেব গোলমেলে হয়ে গেল। তোমার নানা ব্যবসায়ে বড় ধরনের লস করলেন। মার্কেটে প্রচুর ঋন করে ব্যবসা ধার করাতে গিয়ে সেই টাকাও ভুল লোকের হাতে যাওয়ায় ঠকে গেলেন। ব্যাংক লোন তো ছিলোই সেই সঙ্গে আরও এতো ধারদেনা তৈরী হলো যে আমরা পুরো পরিবার বিপদে পড়লাম। মাথার উপর ছাদটুকু ছাড়া আর সম্বল কিছু নেই। এতো পরিমাণ লস ছিলো যে বাড়ি বিক্রি করেও সেটা ওভারকাম করা পসিবল ছিলো না। তখন তোমার বাবা উদারতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। তিনি সাহায্য করলেন এবং পরিবর্তে চাইলেন আমার সঙ্গে তার বিয়ে। তোমার নানার মেনে নেয়া ছাড়া আর উপায় রইলো না। এটা সেই সময়ের কথা যখন ছেলেমেয়েরা মা, বাবার ইমোশনালি কথায় ম্যানিপুলেট হয়ে এরেঞ্জ ম্যারেজ করে। আমাকেও মানতে হলো। আমি তোমার বাবাকে মানতে পারলাম না। আমাদের মেন্টাল কমপ্যাটিবিলিটি ম্যাচ করে নি, না সে আমাকে ভালোবেসেছে না আমি তাকে ভালোবাসতে পেরেছি। শুনতে তোমার খারাপ লাগবে তবুও বলছি আমি তাকে প্রচন্ড ঘৃনা করতাম। কারণ তিনি আমাকে ভালোবেসে নয় বরং নিজের ক্ষমতার জাহির করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করেছিলেন। প্রচন্ড ভেঙে পড়েছিলাম হতাশ হয়েছিলাম কারণ আমার আর কোনো ক্যারিয়ারও হয় নি। গলায় স্টেথোস্কোপ এর পরিবর্তে যেন অদৃশ্য শেকল বেঁধে দেয়া হলো। একটা সমস্যার কারণে তোমার বাবা আমাকে নিয়ে সুইডেনে শিফট হলেন। সেই সময় তোমার নানা মারা গেলেও তাকে শেষদেখা হয়ে ওঠে না। প্রচন্ড রাগ, ক্ষোভ জন্মায়। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই। মানুষ একটা সময়ে এসে অভ্যস্ত হয়ে যায়, অথচ আমি পারছিলাম না। সেই অস্থির সময়ে আমি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলি। আমি আমার সেই প্রেমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি যাকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। তিনি সুইডেনে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন, আশ্বাস দেন যে আমাকে মুক্ত করবেন। কিন্তু ফিরে গিয়ে আর যোগাযোগ করেন না। প্রচন্ড হতাশার মধ্যে আমি টের পেলাম যে প্রেগন্যান্ট। মনে একটা আশঙ্কা তো ছিলোই…..

শিরিন থেমে গেছেন। তার আর সাহস হচ্ছে না। তিনি কাঁপছেন, ইশান স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। তাকে সামলানোর জন্য কিছু করলো না।

“নিশান তাহলে সত্যিই? “

শিরিন জবাব দিলেন না। ইশান আবারও প্রশ্ন করলো,

“তোমার কী কোনোদিনও মনে হয়েছে যে বাবা এই সত্যি জানতেন?”

“আসলে ইশান… আমি…. মানে….

ইশান অস্থির গলায় বলল,

“মানে? মানে তুমি নিজেও কনফিউজড ছিলে?”

শিরিন এমনভাবে মাথানিচু করে রইলো যে তার মুখ স্পষ্ট দেখা গেল না।

ইশান নরম গলায় বলল,

“আই এম সরি। টেক ইওর টাইম। “

ইশান উঠে দাঁড়ালো। শিরিন কাতর গলায় বললেন,

“ইশান শোনো…. তুমি নিশানের কোনো ক্ষতি করবে না। “

ইশান তীর্যক হেসে বলল,

“ইউ ডিজার্ভ ইট মা। ইউ ডিজার্ভ ইট। “

ইশান বেরিয়ে আসে। মায়ের জন্য ওর সিম্প্যাথি কাজ করে না, বাবার জন্যও না। দুজন অসুস্থ মানুষ একটা সম্পর্কের মিথ্যে নাটক করে গেছে। কেউ কারো প্রতি মিনিমাম রেসপেক্ট টুকু রাখে নি। তবে মা’কে আজও ইশানের স্বার্থপর ই মনে হলো। তিনি জানতেন নিশান বাবার সন্তান নয়, তবুও তাকে সবকিছুর উর্ধ্বে রাখতে চেয়েছিলেন। আর ও’কে ঠকাতে একবারও বুক কাঁপে নি, জাস্ট বিকজ শী হেটস হার হাজবেন্ড।

ইশানের কাছে সবটা ক্লিয়ার। বাবার প্রতি ওর উথলে ওঠা আবেগ মিথ্যে নয়। বরং ও তার প্রায়োরিটি লিস্টে ছিলো বলে গর্বে বুক ভরে উঠেছে। হিউজ রেসপেক্ট বেড়েছে। কিন্তু এখন তো সবটা পরিষ্কার, তিনি ইশানকে প্রায়োরিটি লিস্টে রেখেছিলেন কারণ তার কাছে আদারস অপশন ছিলো না৷ নিশান তো তার কেউ না। তিনি নিজেকে মহান প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও মহান তো ছিলেন না।

ইশান তার বাবার গেমের অংশ হবে না। ওই চিঠিতে লেখা কথাগুলোর ভ্যালু ওর কাছে নেই। তিনি যেমন নিজেকে বড় করে দেখেছেন ইশানও নিজেকে বড় করে দেখবেন। তার জটিল খেলার গুটি হয়ে এমন কিছুই করবে না যাতে সারাজীবন নিজেকে অপরাধী ভাবতে হয়।

ইশান চিঠিটা পুড়িয়ে দিলো। মৃত মানুষের অসুন্দর স্মৃতিটুকু নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন নেই।

কাজরী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে দেখেই ইশান বুঝতে পারলো ও বড্ড ক্লান্ত। এই মেয়েটা যতক্ষণ পর্যন্ত ওর ক্ষতি করার কথা না ভাববে ততক্ষণ পর্যন্ত ইশানও ওর ক্ষতি করতে পারবে না। ইশান অসহায় বোধ করে। যার ঘুম ভাঙার চিন্তায় বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করছে, তার ক্ষতি করার কথা ভাবতে গিয়ে বুকে সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করে।

চলবে…..

(ঈদ কার্নিভাল উপলক্ষ্যে বইটই এপে প্রকাশিত হয়েছে নতুন উপন্যাস মেমোরিজ ইন ডিসেম্বর। পড়ে ফেলুন বইটই এপ থেকে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply