Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ২৬


কাজরী-২৬

সাবিকুননাহারনিপা

ঘুম ভাঙার পর কাজরী ফোন হাতে নিলো টাইম দেখার জন্য। অনেকগুলো মিসড কল দেখা যাচ্ছে স্ক্রিনে। এশনা এবং আখতারউজ্জামান এর। কাজরীর ইচ্ছে করলো না কথা বলতে। গতকাল ইশান শোকসভা থেকে সরাসরি ওর হাত ধরে গাড়িতে বসালো। সুবর্ননগর থেকে সরাসরি চলে উত্তরার দিকে। এখানে ওদের একটা ফার্মহাউজ আছে। কাজরী প্রথম এসেছে।

“গুড মর্নিং। “

কাজরী তাকালো ইশানের দিকে। ভেজা চুল, ঘামে ভেজা শরীর। পুশ আপ দিচ্ছিলো বোধহয়। কাজরী আলস্য কাটিয়ে বলল,

“গুড মর্নিং। “

“আর ইউ ওকে নাউ?”

কাজরী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

“ব্রেকফাস্ট করবে এখন নাকি একবারে লাঞ্চ?”

কাজরীকে বিভ্রান্ত দেখালো। অবশ্য প্রায়ই ইশান খুব সুন্দর ব্যবহার করে। পরবর্তীতে ওর আচরণ পাল্টে যায়। কিছু ক্ষেত্রে আচরণ এতো ভয়ংকর হয়ে যায় তখন মনে হয় এক ব্যক্তিই দুটো পার্সোনালিটি ক্যারি করছে। ইশানের দাদীর সঙ্গে সুন্দর, সহজ একটা সম্পর্ক। তার কাছে ইশানের শিশুরুপ, নিষ্পাপ আচরণ দেখা যায়। দাদীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে রসিকতা করে। অথচ মা, ভাইয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন রুপ। কাজরীর ব্যাপার আলাদা। ওর সঙ্গে টম এন্ড জেরি টাইপ সম্পর্কটাকে নরমাল ভাবেই নিয়েছে।

“ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের অপশন চুজ করতে এতো সময় নিচ্ছো! স্ট্রেঞ্জ! তোমাকে তো শান্তিচুক্তি কিংবা যুদ্ধ বিষয়ক কোনো অপশন চুজ করার কথা বলিনি। “

কাজরী হেসে ফেলল।

“আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। ব্রেকফাস্ট করব। “


ব্রেকফাস্টের আয়োজন করা হয়েছে গার্ডেনে। হেমন্তের শুরুতে প্রকৃতি নতুন রুপে সাজছে গরমকালকে বিদায় জানিয়ে শীতকাল বরণ করার উদ্দেশ্যে। গার্ডেনে নানান রকম ফুল গাছ আছে। অর্কিড গাছে ফুলও ধরেছে সুন্দর। কাজরী অপেক্ষা করছে। ওর পরনে কাঁচা হলুদ রঙের জর্জেট শাড়ি। ওয়ারড্রবের শাড়িগুলো ওর নিজের পছন্দ না হলেও সবগুলোই গায়ে মানিয়ে যায় দারুন ভাবে।

ইশান দূর থেকেই দেখলো। শাড়ির রং এর কারণেই চোখে পড়ে যায় সহজে। মেয়েটা সুন্দর আছে, সুন্দর বললেও কম বলা হবে। ইশান নিজের ধৈর্য্য সম্পর্কে অবগত, তবুও এতো কাছাকাছি দেখলে ভুল কিছু করে ফেলার লোভ সংবরন করা রীতিমতো পরীক্ষার মতো। অবশ্য ইশান যদি কিছু করে সেটা ভুল হবার কথা নয়, নরমালি হাজবেন্ড ওয়াইফের মধ্যে যা কিছু ঘটবে সেটা রোমান্টিক কিছুই হবে।

ইশানের ঠোঁটে স্মিত হাসি। কাজরীর মুখোমুখি বসতে বসতে বলল,

“শুরু করা যাক। তুমি তোমার প্ল্যান সম্পর্কে আমাকে কিছু শেয়ার করতে পারো। তাহলে ব্রেকফাস্ট বোরিং মনে হবে না। “

কাজরী ব্রেড, জ্যাম এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আমি কোনো প্ল্যান করিনি তো। সোশ্যাল মিডিয়ায় তোমার আপলোড করা ফটোগুলো দেখছিলাম। টমাসের বার্থডে পার্টির ছবিগুলো তোমার কাছে আছে? স্ট্রেঞ্জ!”

ইশান ব্রেডের এক টুকরো মুখে দিয়ে বলল,

“তুমি আমার মুখে ওয়াইন ছুড়ে মেরেছিলে? আমি তো কোনো ক্রা*ইমও করিনি। “

“ফ্ল্যার্টের লিমিট ক্রস করাকে আমার ডিকশনারিতে ক্রাইমই বলে। “

“তুমি কিন্তু প্রচণ্ড অহংকারী। “

কাজরী আপেলের টুকরো মুখে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“তুমি যেসব মেয়েদের সান্নিধ্যে গিয়েছ তারা সবাই গায়ে পড়া স্বভাবের তো, এজন্যও আমাকে অহংকারী লাগছে। “

ইশান খানিকটা দূর্বল গলায় বলল,

“নট এট অল। লিসেন, তুমি আমাকে ইনডাইরেক্টলি প্লে বয় বলছ। বাট আমি কখনো ডাবল টাইমিং করিনি। এক সময়ে একজনই গার্লফ্রেন্ড থাকতো। “

কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ। এই ধরনের ক্যারেক্টার এনালাইসিস ভালো লাগছে না। সুইজারল্যান্ডে ত্বরিতা যেভাবে ইশানের গায়ে পড়ছিল ভাবতেই রাগ উঠে যায়। হ্যাংলা স্বভাবের মেয়ে, বিবাহিত পুরুষের গায়ে পড়তে লজ্জাও হয় না। এমনসব পার্সোনালিটিলেস মানুষজন ওর চোখেই পড়ে।

“আমরা অফ ট্র‍্যাকে কথা বলছি কাজরী। আচ্ছা বলো তো শিরিন চৌধুরীকে তুমি ঠিক কী জবাব দিবে কালকের ঘটনার জন্য? তুমি তো কাউকে ছাড় দাও না সেজন্য কিউরিসিটি টা বেশী। “

ইশানের কথায় সূক্ষ্ম খোঁচা টের পেলেও কাজরী শান্ত গলায় জবাব দিলো,

“আমার মনে হয়, ওনাকে মোক্ষম জবাব তুমি দিয়ে ফেলেছ। আমি ওনাকে খেয়াল করেছি, কেউ ওনাকে ভাঙতে পারে না এক্সেপ্ট ইউ। “

ইশান হাসলো। কাজরী কাল পরিস্থিতি ইশানের জবাব দেবার ভঙ্গিতে চমকে গেছে। ওর কাছ থেকে এমন গোছানো কথাবার্তা আশা করা যায় না।

“আমি তোমাকে একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করি, তুমি কেন তোমার মা’কে অপছন্দ করো। “

ইশানের মুখটা গম্ভীর হয়। কাজরী আবারও বলে,

“বন্ধু হিসেবে শেয়ার করতে পারো, যদি চাও। “

“ফ্রেন্ড? তুমি? উঁহু আমরা শত্রু। “

“আমাদের ক্ষতটা আলাদা হলেও কারণগুলো সম্ভবত একই। তুমিও প্রোপার এটেনশন পাও নি, আমিও না। অর্থাৎ যে বয়সে মানুষ ভালোবাসা, মায়ায় বেড়ে ওঠে সেই বয়সে আমরা উপেক্ষা, অবহেলা পেয়েছি। “

ইশান ভাবলো। কফিমগ টা সামনে রেখে স্থির চোখে তাকালো কাজরীর দিকে।

“ইশান আমরা ঠিক একই কারণে নিজেদের একসেপ্ট করছি কিন্তু। এই বিয়েতে তোমার যেমন স্বার্থ ছিলো, আমারও তেমন ছিলো। “

“তোমার এখন নেই?”

“বোধহয় না। “

“না। কিন্তু কেন?”

“তোমার কী মনে হয় শুধু চৌধুরী প্যালেসের বউ হওয়াই আমার লক্ষ্য ছিলো? “

“হ্যাঁ। আমার তোমার ব্যাপারে যে ধারণা হয়েছে সেটাই সত্যি। “

“আমি শুনতে চাই। “

“তোমার মায়ের সংসার ভাঙার পিছনে শিরিন চৌধুরীর হাত আছে। তাই তার সংসারের চাবি তোমার চাই। “

কাজরী তীর্যক হেসে বলল,

“তুমি আর তোমার অনুমান…..

ইশানের ফোন বেজে উঠে কথোপকথনে ব্যাঘাত ঘটালো। ইশান কল রিসিভ করলো,

“হ্যাঁ ইরফান আঙ্কেল বলুন। আজই… আচ্ছা আমরা থাকব। “

ইশানের সংক্ষিপ্ত কনভার্সেশনে কাজরী কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। ও বলল,

“কাজরী প্যালেসে ফিরতে হবে আমাদের। বাবার লইয়ার থাকতে বলেছেন সবাইকে। “

“আমাকেও! “

ইশানের ঠোঁটে স্মিত হাসি। ও বলল,

“তুমি নিজের আইডেন্টিটি চেঞ্জ করতে চাইছ? মানে মিসেস ইশান চৌধুরী হয়ে থাকতে চাইছ না?”


শিরিন অসুস্থবোধ করছেন। তার ছেলে সবার সামনে কিভাবে ইমেজ নষ্ট করলো ভাবতেই প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। তার উপর সকাল সকাল প্রচন্ড মেজাজ খারাপ করিয়ে দিলো নিশান। সরাসরি এসে প্রশ্ন করলো,

“তোমার রাজনীতি করার কী প্রয়োজন? ওই জায়গাটা আমাকে দিলেই হয়ে যেত। “

“হাউ ডেয়ার ইউ নিশান! তুমি কৈফিয়ত চাইছ?”

“হ্যাঁ চাইছি। তুমি আগে বলো যে কোনদিক দিয়ে আমি যোগ্য নই। বাবার সঙ্গে থেকে আমিও তো সব শিখেছি। তুমি কী চাইছ? আমি তোমার ম্যানেজার হয়ে বাকী জীবন কাটাব? “

“তোমার কথাবার্তা অসংলগ্ন নিশান। ড্রিংক করে এসেছ নাকি ইশানের মতো বেয়া*দব সেটা প্রমাণ করতে চাইছ?”

“খুবই সিম্পল কোয়েশ্চেন করেছি। তোমার কী মনে হয় আমি অযোগ্য? “

শিরিন ভাবতে সময় নিলেন না। সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“হ্যাঁ। তুমি ভীষণ বোকা একটা ছেলে। বিজনেস, পলিটিক্স তোমার জন্য না?”

“ইশানকে তো সাইড করেছ অলরেডি, এখন আমাকেও! তোমার প্রবলেম কী মা? “

“হাউ ডেয়ার ইউ নিশান? ইশানকে সাইড করেছি আমি! সেলফিশ জিন তোমার মধ্যেও আছে ভালোমতো। “

নিশান বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,

“আফটার অল ইউ আর মাই মাদার। “

শিরিন আক্রোশে ফেটে পড়েন। রাগ দমন করতে দামী কিছু শোপিস ভেঙে ফেললেন। চুল খামচে ধরলেন। আগে তো শুধু ইশান ছিলো। এখন নিশানও! কী পরিবেশ তৈরী হয়েছে প্যালেসে! প্রতিটি মানুষ তার এগেইনেস্টে! এভাবে তাকে দমিয়ে রাখা যাবে! কখনো না।


বিকেল চারটা। চৌধুরী সাহেবের রিডিং রুমে তার ব্যক্তিগত উঁকিল মিস্টার সেলিম পাটোয়ারী বসে আছেন। সেখানে উপস্থিত আছে তার তিন ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূ ও স্ত্রী। পাটোয়ারী সাহেব উইল পড়ে শোনাবেন এখন। তাকে যথেষ্ট বিচলিত লাগছে। তিনি উইল পড়ে শোনানোর আগে বললেন,

“এই উইল তৈরী করা হয়েছে চার মাস আগে। “

শিরিন গম্ভীর স্বরে বললেন,

“আপনি পড়ে শোনান। “

পাটোয়ারী সাহেব এসির মধ্যেও ঘামছেন। তিনি আরেকটু সময় নিলেন। এতো নাটকীয়তার কী আছে সেটা ভেবে পেল না কাজরী। পাটোয়ারী সাহেব তার উইল পড়ে শোনাতে লাগলেন,

“আমি ওয়াজেদ চৌধুরী, সুস্থ মস্তিষ্কে নিজ বুদ্ধিতে কারো প্ররোচনায় না পড়ে আমার স্থাবর, অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি ও চৌধুরী গ্রুপের পাওয়ার অব এটর্নি আমার একমাত্র ছেলে ইশান ওয়াজেদ চৌধুরীর নামে হস্তান্তর করছি। আমার স্থাবর সম্পত্তির ত্রিশ পার্সেন্ট দাবিদার আমার কন্যা এশনা চৌধুরী ও স্ত্রী শিরিন চৌধুরী। “

উপস্থিত সকলে হতভম্ব। এই ধাক্কাটা সামলে নেয়ার আগেই এশনা চিৎকার করে বলল,

“একমাত্র ছেলে মানে? আপনি কী পড়লেন? “

পাটোয়ারী সাহেব নির্লিপ্ত গলায় বললেন,

“উইলে এরকমই লেখা আছে। “

সকলে দম বন্ধ করে বসে রইলো। শিরিন প্রচন্ড হতাশা নিয়ে তার বড় ছেলের দিকে তাকালেন। নিশান! নিশান চৌধুরী। সবগুলো চোখ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে ওই একটা মানুষের দিকে। নিশানের চোখের মনি স্থির। পলক পড়ছে না। শিরিনের চোখ ভরে উঠলো। ভাঙা গলায় তিনি ছেলেকে ডাকলেন,

“নিশান… নিশান….! “

চলবে…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply