Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ১৬


কাজরী-১৬

সাবিকুননাহারনিপা

“আল্পনা তোমার নিজের বোন নয়? যাকে বাবা বলে জানছ, তিনিও তোমার বাবা নন?”

কাজরী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। ইশান গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা করলো। একটা জটিল খেলা চলছে মিস্টার চৌধুরীর মাথায়। সেই খেলায় ইশানকেও জড়ানো হয়েছে। কাজরীকে পুরোপুরি বিশ্বাস না করতে পারলেও করতে চাইছে। ইশান অস্থির ভাবে পায়চারী করতে লাগলো ঘরময়। কাজরী শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। ও’কে অতো বেশী বিপর্যস্ত লাগছে না, যতটা লাগছে ইশান কে। ইশান হঠাৎ ঝড়ের গতিতে কাজরীর সামনে এসে বসলো। আচমকা এমন করায় কাজরী একটু চমকে গেলেও সামলে নিলো।

“কাজরী তুমি হঠাৎ আমাকে সত্যিটা কনফেস কেন করলে? না মানে তোমার উদ্দেশ্য কী? শিওর কিছু এক্সপেক্ট করছ, সেটা কী?”

অনেকগুলো প্রশ্ন, কাজরী মৃদু হাসলো। সত্যি বলতে ইশানকে অস্থির হতে দেখে ও নিশ্চিন্ত হলো। কারণ ইশানের আচরণে ওর জন্য সিমপ্যাথি আছে যথেষ্ট। কাজরী ইশানের হাত ধরে পাশে বসিয়ে বলল,

” খুব ছোটবেলায় বুঝতে পেরেছিলাম যে আল্পনার মা আমার মা নন। তিনি অসুস্থ, মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। চৌদ্দই নভেম্বর রাতে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি ফিরে এসেছিলেন অনেক দিন পর, উঁহু ফিরে আসেন নি, তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। এরপর তার মানসিক অবস্থা খারাপ হয়। সিঙ্গাপুরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেয়া হলেও লাভ হয় না। এক পর্যায়ে ডাক্তারের রিপোর্ট অনুযায়ী এক বিরল রোগে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন সেটা জানা যায়। রোগ টা হলো, তিনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সমস্ত স্মৃতি ভুলে গেছেন। গত সপ্তাহের ঘটনা তিনি মনে রাখতে পারতেন না, কিন্তু বহু পুরোনো ঘটনা তার মনে গেথে আছে। তিনি বিয়ের স্মৃতি, আল্পনার জন্মের স্মৃতি সব মনে রেখেছেন। এরপর অনেক কিছু ভুলে গেছেন। আমাকে তিনি মেয়ে মানতেন না। ভাবতেন তার স্বামীর পাপ, যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি আমাকে প্রচন্ড ঘৃনা করেছেন। আমি ছোটবেলায় ভারী অবাক হতাম, কেন তিনি আমার সঙ্গে এরকম করছেন। আল্পনাকে যেমন আদর করেন, আমাকে তেমন করে না কেন! প্রচন্ড অবহেলা, অবজ্ঞা করতেন। তবুও আমি তার কাছে ছুটে যেতাম। তিনি অসুস্থ হলে তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতাম, অপেক্ষা করতাম আল্পনাকে যেমন তিনি ডেকে পাশে বসিয়ে আদর করছেন আমাকেও তেমন করবেন। এসব আচরণ আমার মনে প্রভাব ফেলেছিল খুব। আমি আল্পনার বাবাকে প্রশ্ন করি, তিনি এড়িয়ে যান। কিন্তু একসময় তাকে স্বীকার করতে হয় সবকিছু। “

কাজরী থামলো। ইশানের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছে যেন কাছের কোনো মানুষ।

“তোমার মা কোথায়? “

কাজরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমি জানিনা ইশান। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন তাও জানিনা। তিনি আমাকে আল্পনার বাবার কাছে দিয়ে কোথায় চলে গিয়েছিলেন কেউ জানেনা। তার কোনো হদিশ পাওয়া যায় নি। “

“কাজরী ওয়েট, আই হ্যাভ কুয়েশ্চন আল্পনার মা’কে যদি ডাকাতদল তুলে নিয়ে যেয়ে থাকেন। তাহলে তোমার মায়ের তো সেই হিসেবে অক্ষত থাকার কথা। “

কাজরী স্মিত হাসলো। ইশানের পাশ থেকে উঠে জানালার কার্নিশে দাঁড়ালো। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তোমার মনে আছে আমি কী বলেছিলাম? তারা ভুল করে আল্পনার মা আয়েশা আহমেদ কে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের টার্গেট ভুল ছিলো। “

“তোমার মা টার্গেট ছিলো! তোমার মা’কে পেয়ে তারা আল্পনার মা’কে ফিরিয়ে দিয়েছিল?”

“একদম সঠিক অনুমান করেছ ইশান। “

ইশান উঠে এসে কাজরীর পাশে দাঁড়ালো। বলল,

“তোমার উদ্দেশ্য কী এখন? ঠিক কী উদ্দেশ্যে চৌধুরী প্যালেসে এসেছ তুমি? রিভেঞ্জ!”

কাজরী হেসে ফেলল। বলল,

“সেটা কী স্বাভাবিক নয়? “

“স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে অন্য কোনো গোলমেলে ব্যাপার তো নিশ্চয়ই আছে। আমি আমার বাবা ওয়াজেদ চৌধুরীকে চিনি, তিনি আমার শর্ত মেনে নিয়ে একটুও অবাক করেন নি। জানতাম তার মাথায় অন্যকিছু চলছে। পলিটিক্সে তিনি দেরি করে নাম লেখালেও তার পুরো শরীর জুড়ে পলিটিক্স আছে। তিনি কী তোমাকে স্বীকৃতি দেবার জন্য এতসব করেছেন? সেটাও আমার মনে হয় না। অবশ্য আরেকটা ব্যাপার হতে পারে। তিনি ইমেজ কনশাস। তাদের বংশের মান, সম্মানের জন্য তিনি অনেক কিছু করতে পারেন। “

“ইশান আমার উদ্দেশ্য ছিলো চৌধুরী প্যালেসে সগৌরবে পদার্পণ করা। কারণ আমার মা’কে একদিন ওই পরিবার থেকে মাথানিচু করে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। আমি অনেক কিছু শুনেছি, কিন্তু সেগুলোর যথাযথ যুক্তি খুঁজে পাই নি। চৌদ্দই নভেম্বর এর পর আমার মা যখন তার শ্বশুর বাড়িতে পা রাখে তখন সেই বাড়ির মানুষজনের ভেতর তার জন্য দয়া, করুনা ছাড়াও প্রচন্ড ঘৃনা ছিলো। আমার চেয়ে বেশী তুমি তোমার পরিবার কে জেনে থাকবে। “

ইশান চুপ থাকলেও ব্যাপার টা বুঝতে পারলো। ঘরের বউ ডাকাতদের কবলে পড়ে ফিরে এসেছে আর শ্বশুরবাড়ির লোক তাকে কলঙ্কিনী ভেবে ঘৃনার চোখে দেখেছে। চৌধুরীরা কেউই প্রগতিশীল না। ছেলেরা যা খুশি করুক কিন্তু বউকে সব সামলে সতী থাকতে হবে যে করেই হোক। ওর নিজের মা এতো শিক্ষিত হওয়া সত্যেও আলাদা করে কোনো আইডেন্টিটি তৈরী করতে পারে নি, কারণ তাকে করতে দেয়া হয় নি। ডক্টর শিরিন নাজির থেকে শিরিন চৌধুরী নামের ভার নিতে তাকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে।

ইশান শীতল গলায় বলল,

“তুমি কী চাও কাজরী?”

“তোমার কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই ইশান। শত্রু শত্রু খেলা আমার তোমার সঙ্গে নয়। তোমার বাবা কিংবা মা দুজনের কেউ একজন। আমি আসলে খুঁজে বের করতে চাই আসলে কে আমার শত্রু। “

ইশান জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। কাজরী আবারও বলল,

“আমি নিশ্চিত ওইদিনের ডাকাতদলের হামলা সম্পর্কে তোমার বাবা, মায়ের কেউ একজন আগে থেকেই জানতো। তারা চেয়েছিলেন কোমল কে বদনাম করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আখতারউজ্জামান এর পরিবার এই বদনামের ভাগিদার হয়। আখতারউজ্জামান তার কাছের বন্ধু ইফতেখার চৌধুরীর দাওয়াতে নিজের স্ত্রী, কন্যাকে নিয়ে গিয়ে বিপদে পড়েছে। একটা স্বাভাবিক আন্তরিকতা গ্রহনের পরিনাম যে কতো ভয়ংকর হতে পারে সেটা এখনো পর্যন্ত তারা ভোগ করছে। আমি আসল সত্যিটা জানতে চাই, সেই সঙ্গে আমার অধিকারও চাই। আমার মা তার অধিকার ছেড়ে গেছেন বলে আমিও সেটা ছেড়ে দেব এমন তো হতে পারে না। “

কথার মাঝখানে ইশানের ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো। ইশান স্ক্রিনে মায়ের নাম্বার দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেললেও বাইরে চলে এলো।

কাজরী স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল। বুকের উপর চেপে থাকা পর্বত সমান ভারী পাথর নেমে যেতেই নিশ্চিন্ত হলো। ইশানকে সব বলে শান্তি পেয়েছে। শিরিন চৌধুরী যে গুটিগুলো সাজানোর চেষ্টা করেছেন কাজরী সেই গুটিগুলো দিয়ে চাল চালবে। ইশানের মনে একটা গভীর ক্ষত আছে। খেয়াল করেছে কাজরী। এখনো পর্যন্ত চৌধুরী প্যালেসে সবচেয়ে বেশী টাইম, এনার্জি ইনভেস্ট করেছে ইশানকে জানার জন্য। ভাই, বাবা, মা কাউকে বিশ্বাস, ভরসা করে না। যেদিন কাজরীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে ইশান মা’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল সেদিন ই ও মনে মনে ছক কষে ফেলেছিল। শত্রু নয়, বরং ইশান কে সঙ্গে নিয়েই ও সামনে আগাবে। সেই ভাবনাকে ডালপালা মেলতে দিয়েছিলো। তাড়াহুড়ো করে নি, কিন্তু শিরিন চৌধুরী বুদ্ধির চালে বাজিমাৎ করে যাবে তা তো হতে দেয়া যায় না।

কাজরী ইশানকে যা বলেছে তার প্রতিটি বর্ন হয়তো সত্যি নয়। আল্পনার মায়ের ভালোবাসা পাবার জন্য প্রবল তৃষ্ণায় কখনো ম*রে যায় নি। এটুকু মিথ্যে ও’কে বলতেই হতো নিজেকে ভালোবাসার কাঙাল প্রমাণ করতে। তবেই না ইশান নিজের সঙ্গে রিলেট করতে পারবে! ওরও যে চাইল্ডহুড ট্রমা আছে। তবে আল্পনার বাবার স্নেহটুকুও ও অস্বীকার করে গেছে। বাকী দশজন মানুষ কিংবা মেয়ের মতো আবেগ, ভালোবাসা ওর মধ্যে নেই বলেই আখতারউজ্জামান এর স্নেহ কে ওর করুনা মনে হয়েছে। আল্পনার মা যতটা ঘৃনা ও’কে করেছে সমপরিমাণ ঘৃনা তার জন্যও ওর ছিলো। ওই মহিলার প্রাণ বাঁচাতে ওর মা আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। কিছু অন্তত কৃতজ্ঞতা থেকে হলেও কাজরীর জন্য তিনি মায়া দেখাতে পারতেন৷ কিংবা পারতেন অবহেলা, অবজ্ঞা না করেই দূরে সরিয়ে রাখতে।

বাকী রইলো আল্পনা। মেয়েটা জেনেও না জানার ভান করে কাজরীকে ভালোবাসতে চেয়েছিল। ও সেটা প্রত্যাখ্যান করেছে সবসময়। এদের ভালোবাসা ওর কাছে করুনার বিষ মনে হয়েছে। সেই বিষপান করবে না বলেই দূরে থেকেছে। তবুও নিজের পরিচয়ে তাদের নাম বহন করতে হয়েছে। এরচেয়ে বেশী অনুগ্রহ কাজরীর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আল্পনার কাছে ওর একটা ঋন আছে। ধার বাকী রাখতে চায় না বলেই আল্পনাকে নিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভাবে। ভাবতে বাধ্য হয়।


“তুমি ঠিক আছ ইশান?”

ইশান মায়ের প্রশ্নে বিরক্ত হলো। বলল,

“আই এম অ্যাবসুলেটলি ফাইন। “

“সেদিন পার্টিতে কী কোনো গন্ডগোল হয়েছিল? তোমার নাকি জ্বর? “

“স্পাই তো লাগিয়ে রেখেছ তাই না? তবুও প্রশ্ন করে নিজের সময় নষ্ট কেন করছ?”

শিরিন বিচলিত হলেন না। নি:শব্দে হাসলেন। আশ্চর্য হলেও সত্যি ইশানের সঙ্গে এই খেলায় তিনি ভারী মজা পাচ্ছেন।

“ওকে মাই বয়, আর ডিস্টার্ব করব না। তোমরা এনজয় করো। “

“আমরা খুব এনজয় করছি। দুজন দুজনকে জানতে পারছি। আচ্ছা এখন রাখছি তবে…. ও একটা কথা কাজরীর কাছে শুনলাম ওর বাবা নাকি চাচ্চুর ফ্যামিলি ফ্রেন্ড ছিলো? এটা কী সত্যি? তুমি বলো নি তো। “

শিরিন ফোন কানে নিয়েই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কানের ভেতর গরম অনুভব করছেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামও জমেছে।

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply