Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬১


কাছে আসার মৌসুম

পর্ব ৬১

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

ইউশার চোখে পানি নেই। কোটর জোড়া মরুর চেয়েও শুকনো। তবে ফ্যাকাশে মেদুর মুখখানা দেখে অয়নের কেমন যেন লাগে। অস্বস্তি হয়।
তারওপর এই গান! জিজ্ঞেস করেই ফেলল সে,
“ এরকম একটা গান গাইলি কেন, ইউশা?”
মনের ব্যথায় বিবশ মেয়েটা নড়ে উঠল অমনি। চাইল ধ্যান ভেঙে,
“ হুঁ, কী?”
অয়ন কিছু বলার আগেই, চৌকাঠ ছাপিয়ে মেঝের ওপর একটা লম্বা দেহের ছায়া এসে পড়ল। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল সার্থ। দুজনার মনোযোগ একইসাথে বর্তাল সেদিকে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল অয়ন। অবাক হয়ে বলল,
“ তুমি এখন!”
সার্থর চেহারায় ক্লান্তি। চোখদুটো বসে গেছে! যেন বহুযুগ ঘুম হয়নি ওর। পোক্ত মুখটা কোমল বেশ। এক বার ইউশার বিভ্রান্ত চেহারায় দেখল সে। বলল নরম সুরে,
“ তুই ঘরে যা।”
বাধ্য মেয়েটা মাথা নুইয়ে যেতে নিলো, অয়ন হাতটা টেনে ধরল ওর। চড়া কণ্ঠে বলল,
“ ও কেন যাবে? তোমার কিছু বলার থাকলে ওর সামনেই বলো।”
“ ও যাবে,কারণ ও ছোটো। বড়োদের সব ব্যাপারে ছোটোদের রাখতে নেই।”
ইউশা বলল,
“ সমস্যা নেই অয়ন ভাই। আমি যাই এখন।”
“ না। দাঁড়া তুই। আচ্ছা ভাইয়া, ইউশা ছোটো? আর যাকে নিয়ে আমার সাথে হাঙ্গামা করছো, লড়াইয়ে নেমেছ, হিসেব করলে সে তো ইউশারও ছোটো। তাহলে?”

ইউশার ভ্রু গুছিয়ে এলো। গাঢ় হলো কৌতূহল। দুটো বিস্মিত চোখ মেলে দুজনকে দেখল একেকবার। ওরা কি তুশিকে নিয়ে কিছু বলছে?”
চোখ বুজে পরাস্ত শ্বাস ফেলল সার্থ। বুঝল, অয়ন কথা শুনবে না। সোজাসাপটা বলল,
“ না আমি তোর সাথে হাঙ্গামা করছি, আর না কোনো লড়াই। আমি সেটাই বলছি যেটা সবার জন্যে ভালো।”
অয়নের কথায় বিদ্রুপের সুর,
“ আচ্ছা, তাই নাকি!”
সার্থ একইরকম কোমল গলায় বলল,
“ দেখ অয়ন,তুই আমার ছোটো ভাই। তোর সাথে এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। কিন্তু আম হেল্পলেস!
ফর গড শেইক, তুশিকে বিয়েটা তুই করিস না।”
হেসে ফেলল অয়ন। ও জানতো ভাইয়ের থেকে এমন কিছুই শুনবে। কিন্তু ইউশা ভীষণ আশ্চর্য বনে বলল,
“ কেন ভাইয়া, বিয়ে করবে না কেন?”
অয়ন বলল,
“ কেন আবার! ভাইয়া তুশিকে আশ্রয় দিতে এ বাড়ি এনেছিল। সেজন্যে এখন সেই আশ্রিতা মেয়েটা ভালো থাকা মেনে নিতে পারছে না। খুব বেশি ইগোতে লেগেছে ভাইয়া?”
সার্থর মুখটা কঠিন হয়ে গেল।
“ ফালতু কথা বন্ধ কর, অয়ন।”
“ কীসের ফালতু কথা? তুমি আসলে চাইছোটা কী? তোমার কথায় আমি কেন বিয়ে ভাঙব,হু আর ইউ?”
সার্থ দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ হু আই এ্যাম? বাহ,তোর দেখছি দারুণ উন্নতি হচ্ছে। বড়ো হয়ে গেছিস অনেক?”
অয়ন বলল,
“ ভাইয়া, তোমার সাথে এভাবে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু তুমি নিজের সীমায় থাকো! বারবার আমার আর তুশির মাঝে ইন্টারফেয়ার করতে আসছো কেন?”

“ তোর আর তুশির মাঝে! অয়ন তুশি তোকে আদৌ পছন্দ করে কিনা জানিস? কখনো শুনেছিস,ও কী চায়? ও আদৌ কাকে ভালোবাসে, বলেছে কখনো?”
অয়ন সাথে সাথেই বলল,
“ আমাকে বাসে।”
“ ও বলেছে?”
অয়নের মিথ্যে গর্ব সামান্য নিভে গেল অমনি। কমলো তার চকচকে মুখ। সার্থ বাঁকা হেসে বলল,
“ তুই নিজেও জানিস,ও তোকে ভালোবাসে না। তাই এই বিয়ে হলে, না ও ভালো থাকবে,আর না তুই। তাহলে এরকম বাচ্চামো করছিস কেন?”
অয়ন মুখ শক্ত করে বলল,
“ ভাইয়া, আমি এ ব্যাপারে তোমার সাথে আর একটা কথাও বলব না। তুমি এখন এসো।”
“ এর মানে তুই আমার কথা শুনবি না?”
“ না।”
সার্থ দু সেকেন্ড চেয়ে রইল। নিঃশব্দে,নিস্পন্দ চোখে। ফোস করে শ্বাস ফেলল । পরপর ভাইয়ের এক গাল চাপড়ে মুচকি হেসে বলল,
“ দেন আ-ম অলসো সরি অয়ন।”
ছেলেটা অবাক হয়। তবে কীসের সরি,কেনই বা সরি বলা, এসব ফিরতি প্রশ্নের আগেই
বেরিয়ে গেল সে । অয়নের মেজাজ দফারফা করে সোজা নিজের ঘরের পথ ধরল। তখনো স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল ইউশা। প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসায় তার মাথার নিউরনেরা জট পাঁকিয়ে ফেলেছে। মেজো ভাইয়া কেন বিয়ে ভাঙতে বলছে? কেন, কীসের এত তোড়জোড় তার?
ও হড়বড়িয়ে বলল,
“ অয়ন ভাই,মেজো ভাইয়া কি এখন তুশিকে ভালোবাসে?”
“ ইগোবাজদের আবার ভালোবাসা! তুশিকে নিজের আশ্রিতা বানিয়ে এনেছিল, ও রানী হোক তা চাইবে কখনো! নিজের বিয়ে ভেঙেছে,এখন আমারটাও ভাঙতে উঠেপড়ে লেগেছে।”

ইউশার মনে খটকা লাগল তাও। না, কোথাও ওর সার্থকে ঠিক লাগেনি আজ। তখন বসার ঘরেও এক অন্যরকম ভাইয়াকে দেখেছে সে। আবার দেখল এক্ষুনি। ভাইয়ার মতো পাথুরে মানুষ, কখনো কাউকে গুণতেও দেখেনি যাকে, সে আজ নিজের ছোটো ভাইয়ের কাছে অনুনয় করল বিয়ে না করতে! আবার তুশি কাকে ভালোবাসে সে নিয়ে এত জোর ভাইয়া কোথায় পেলো? ইউশার মাথা খারাপ হয়ে গেল চিন্তার তোড়ে। হায়হায়,একটা বিয়ের জন্যে তুশিকে জোর করে ও আবার তিনটে জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে না-তো!


“ অয়ন ভাই,
আমি কখনো চাইনি আপনার আর আমার মাঝে এরকম দিন কখনো আসুক। ভাবিওনি কোনোদিন। অথচ এসেছে! হয়ত সৃষ্টিকর্তা চাইছিলেন, তাই। কিন্তু সত্যি বলতে আমার কিছু করার ছিল না। করতে হলো,শুধু আর শুধু ইউশার ভালোর জন্যে,ওর জন্যে! শুরুতে ক্ষমা চাইব আপনার থেকে এতদিন সব লুকোনোর কারণে। সব জেনেবুঝেও সত্যিটা চেপে রাখতে আমি নিরূপায় ছিলাম।
আমি জানি,আপনি এখনো জানেন না আমি কী চাই! কিংবা আপনার ধারণাও নেই,তুশি অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারে! অয়ন ভাই,আমার জীবনের একটা অমোঘ সত্য,একটা প্রিয় সত্য হলো আমি আপনার ভাইকে ভীষণ ভালোবাসি! আমার এই ছোট্ট হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে উনিই একমাত্র পুরুষ। যাকে ভালোবাসতে বাসতে,আমি আমার অনুভূতিদের পুড়িয়ে দিচ্ছি,পুড়ছি নিজেও। নতুন করে সেই পোড়া অনুভূতি আপনার কাছে নিয়ে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই। আমি আপনাকে ভালোবাসা তো দূর, আমার জীবনে আর কাউকেই কোনোদিন জড়াতে পারব না। না পারব আপনাকে ঐ চোখে দেখতে। এর একটা কারণ যেমন আমি নিজে,দ্বিতীয় কারণ ইউশা। আমার বোন!
আপনি জানেন,ওই মেয়েটা আপনাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে? এক দিন নয়, দুদিন নয়,সেই ভালোবাসার সময় সীমা বহু বছরের অয়ন ভাই। অথচ ও যখনই জেনেছে আপনি আমাকে পছন্দ করেন,বিনা দ্বিধায় আপনার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল। আমাকে রাজি করাল এই বিয়েতে,যাতে আপনি সুখী হন,আর আপনাকে পেয়ে আমি!
কিন্তু তুশি স্বার্থপর নয়। সে কারো সুখ কেড়ে নিতে শেখেনি। আমি সেদিন নামে মাত্র রাজি হয়েছিলাম, যাতে ইউশার জীবনে আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি। ইউশার নিষেধ ছিল আপনাকে কিছু না জানানোর। তাছাড়া, হয়ত আমি আপনাকে সব বলে দিলেও, আপনি ইউশাকে বিয়ে করতে রাজি হতেন না। বা,আপনি চাইতেন না ইউশাকে নিজের জীবনে জড়াতে। কিন্তু ইউশা আপনাকে ছাড়া শেষ হয়ে যেত। একটু একটু করে ধ্বংস হতো মেয়েটা। বোন হয়ে আমি তা কী করে সইতাম বলুন! তাই ওর ভালোর জন্যে আপনার প্রতি আমাকে অন্যায় করতে হয়েছে। এটুকু নিষ্ঠুর আমাকে হতেই হলো অয়ন ভাই। আমি জানি,ইউশার ভালোবাসায় আপনি ঠিক একদিন সব ভুলে যাবেন। ভুলে যাবেন কদিনের ভালো লাগা তুশিকেও। আর সেজন্যেই আমাকে এই নাটকটুকু করতে হলো। আমি ক্ষমা চাই,আপনাকে বিয়ের আশা দেখানোর জন্যে।
কিন্তু একটা কথা তো সত্যি বলুন হাবভাবে হোক বা মুখে, তুশি কোনোদিন আপনাকে বলেনি তার আপনাকে পছন্দ। বরং আমি আপনাকে যথেষ্ট এড়িয়ে চলেছি। আমার কাছে আমি ততটা পরিষ্কার যতটা আল্লাহর কাছে পরিষ্কার থাকা দরকার।
হয়ত আমার সাথে আপনার আজই শেষ দেখা,তাই চিঠিটা আপনাকে দিয়ে গেলাম। ইউশাকে নিয়ে আপনি সুখী হন। দোয়া রইল!”

তুশি দাড়ি টানলো লেখায়। ঝরঝরে লেখার এই চিঠিতে হাজারটা বানান ভুল আছে। ও এখনো অত ভালো,নির্ভুল লেখা জানে না। কিন্তু মনে হচ্ছে অয়ন পড়লেই বুঝবে ও কী বলতে চেয়েছে! চিঠিটা তুশি দু- ভাঁজ করল। বালিশের তলায় রেখে একবার ঘড়িতে চাইল তারপর। তিনটা বাজে প্রায়। ভোর তো পাঁচটায় হওয়ার কথা। কেউ সজাগ হওয়ার আগেই, প্রথমে চিঠিটা অয়নের ঘরে রেখে আসবে। আর তারপর সারাজীবনের মতো এই সৈয়দ বাড়ি থেকে বিদায় নেবে তুশি।

কিন্তু পরিকল্পনা মাফিক কিছু হলো না। অপেক্ষা করতে কর‍তে কখন যে তুশির চোখ লেগে গেল,টেরও পায়নি। যখন শরীরটা নড়ল,ভাঙল ঘুম, তখন বাইরে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তুশি ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। মাথায় হাত পড়েছে। এখন আলো ফুটবে ফুটবে ভাব। মা, বড়োমা খুব সকালেই ওঠেন। ওকে তাড়াতাড়ি বের হতে হবে!
সেই মাঝারি কালো ব্যাগটা তুলে ছুটল তুশি। প্রথমে থামল এসে অয়নের ঘরের সামনে। অয়ন কখনো দোর আটকে ঘুমায় না। ভেজানো থাকে, অল্প!
তবে সারাঘর এখনো অন্ধকার। ঢিপঢিপ করা বুক নিয়ে তুশি খুব আস্তে ঢুকল ভেতরে। বিছানায় চোখ যেতেই দেখল অয়ন খাটে নেই। টের পেলো ওয়াশরুমের ট্যাপ খোলা,জলের আওয়াজ আসছে। হায় হায়, উনি এত তাড়াতাড়ি উঠে গিয়েছেন?
ও চিঠি কোথায় রাখবে বুঝল না। হন্যে চোখে দেখল চারিপাশ। এমন কোথাও রাখতে হবে যাতে এক্ষুনি ওনার হাতে না পড়ে। বিয়ের পরে পাক!
ওয়াশরুমের ট্যাপ বন্ধ হলো সেসময়। হয়ত এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে অয়ন। তুশি তাড়াহুড়ো করে শেল্ফ থেকে একটা বই নামাল, একদম মাঝে রেখে দিলো চিঠিটা। তারপর বেরিয়ে গেল ঝড়ের গতিতে। অয়ন বাইরে এসে দেখল চাপানো দরজাটা নড়ছে,নড়ছে পর্দাও। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে। কেউ কি এসেছিল নাকি!

তুশি চপল পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েও থামে। মনের রাশ ছাপিয়ে আর কদম চালাতে পারে না। বুকের কোথাও টলমল করে খুব। প্রেমের তরীতে টান পড়তেই, ঘাড় ফিরিয়ে চাইল সে। তাকাল সোজা সার্থর ঘরের দরজার দিকে। তারপর একটা বড়ো শ্বাস নিলো তুশি। আবার হাঁটতে নেয়, থামে আবার।
যেতে পারে না তুশি, পারে না এগোতে। যাওয়ার আগে একটা বারও কি মানুষটাকে দেখবে না? তুশি নির্লজ্জের মতো শরীর ঘুরিয়ে ওই ঘরের দিকে এগোলো। ভেবেছিল, দরজা বন্ধ থাকবে। অয়ন যেমন খোলা রাখে, সার্থ তার উলটো। সবেতে তার প্রাইভেসী চাই! কিন্তু তাও তুশি এসেছিল, যদি খোলা থাকে! কোনাভাবে যদি! হলোও তাই। পর্দা সরাতেই দেখল গোটা দরজাই হাঁ করে খোলা। রকিং চেয়ারে বসেছিল সার্থ। ঘুমোচ্ছে,মাথাটা একদিকে হেলে আছে কিছুটা। পরনে এখনো কালকের শার্ট। তুশি আশ্চর্য হয়! উনি এভাবে, এখানে ঘুমোচ্ছেন কেন?
মেয়েটা নিঃশব্দে ভেতরে এলো। যাতে মেঝেটাও শব্দ না পায়। সার্থর বুজে থাকা চোখের ওপর হাতটা নাড়ল একবার। পরোখ করল ও সজাগ কিনা। কিন্তু না,নড়ল না সার্থ। যেমন ছিল,ঘুমোচ্ছে অমন।
তুশি আস্তে করে দুই হাঁটু মুড়ে সার্থর পায়ের কাছে দুরুত্ব রেখে বসল। কিছুক্ষণ চুপ করে চেয়ে রইল মানুষটার মুখের দিকে। চোখ জোড়া ভীষণ যাতনায় টলটল করে উঠল সহসা। বুকের কোণ ভরে গেল ব্যথায়। কী হতো,জন্ম থেকে তুশি এই বাড়িতে থাকলে! তখন ও পড়াশোনা জানতো,সমাজে চলতে পারতো তাল মিলিয়ে। তখন নিশ্চয়ই উনি অযোগ্য, চোর বলে ওকে দূরে সরিতে দিতো না। কিংবা কী হতো, যদি ওর সার্থর সাথে কোনোদিন দেখাই না হতো! ভালো থাকতো তুশি, খুব ভালো থাকতো।
মেয়েটা বিচ্ছেদের এই বিরহ আর চাইল না বাড়াতে। চোখ মুছে বেরিয়ে গেল শব্দহীন। অমনি তড়াক করে চোখ মেলল সার্থ। দূর্বোধ্য নজর মেলে চেয়ে রইল চোরের মতো পালিয়ে যাওয়া মেয়েটার দিকে।


“ দাদি,ও দাদি, ওঠো দাদিইই…” ফিসফিসে শব্দে আঁতকে তাকালেন হাসনা। ঘুম চুবানো চোখ জোড়া চমকাল তার। ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বললেন,
“ কেডা কেডা?”
“ শশশ! আস্তে আস্তে…”
সামনে তুশিকে দেখে চোখদুটো বড়বড় করে ফেললেন তিনি। অবাক হয়ে বললেন,
“ বু,তুই এয়েনে কী করোস? ও আল্লাহ, তুই ব্যাগ লইয়া কই যাস?”
তুশি কণ্ঠ চেপে বলল,
“ দাদি, আমি পালিয়ে যাচ্ছি।”
হাসনার মাথায় বোম পড়ল। আর্তনাদ করে বললেন,
“ কীইইইই…”
তুশি ধড়ফড় করে দাদির মুখ চেপে ধরল।
“ খোদা,সবাই শুনে ফেলবে। আস্তে কথা বলো না!”
হাসনা ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললেন,
“ বু,তুই কী পাগল হইছস? আইজ তোর বিয়া!”
“ সেজন্যেই তো পালাচ্ছি দাদি।”
“ বু,বিয়া না করলে সবাইরে কইয়া দে। ক্যান পলান লাগব?”
“ বলা যাবে না দাদি। তাহলে যা চাই তা হবে না। আমাকে যেতেই হবে।”
হাসনা হাত দুটো ধরলেন ওর। ভেজা গলায় বললেন,
“ যাইস না বু। তোরে ছাড়া আমি ক্যামনে থাকমু?”
তুশি দরজার বাইরে আরেকবার দেখল। ফিসফিস করে বলল,
“ দাদি, আমি যা বলছি আগে ভালো করে শোনো। তুমি ভান করবে আমার কথা কিছু জানো না। বাড়ির সবাই যখন আমাকে খুঁজবে,আর মেহমানরাও চলে আসবে, ঠিক সেই সময় তুমি ইনিয়েবিনিয়ে দিদুন কে বলবে যে বাড়ির মান-সম্মান নষ্ট হচ্ছে। সম্মান বাঁচাতে ওরা যেন ইউশাকে অয়ন ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়।”
হাসনা হতবাক হয়ে বললেন,
“ কী কস, ইউশা ক্যান…”
“ দাদি এত কথা বলার সময় নেই। আমি যা বলছি তাই করবে। দিদুনকে যত ভাবে পারো, যেভাবে পারো তোমাকে বোঝাতেই হবে। জোর দিতে হবে ওদের বিয়ে নিয়ে।”
“ না বু, এইডা হয় না।”
“ কেন হয় না দাদি? তোমার মনে নেই,আমাদের বস্তিতে বিয়ের দিন মুন্নি পালিয়ে গেল আর ওর বদলে তিন্নির বিয়ে দিলো সবাই? আর আমার বেলাতেও তো এমন হলো দাদি। এক তুশি পালিয়ে যাওয়াতেই তো আরেক তুশি বউ হয়েছিল।”
হাসনা বললেন,
“ তোর কথা আলেদা। তুই ট্যাকার লোভে পইরা নিজে বিয়াত বইছিলি। কিন্তু তিন্নিরা তো গরিব রে বু। ওরা যা করে,বড়োলোকরা তা করে না।”
“ করে দাদি। বড়োলোকদের সম্মানের ভয় আরো বেশি থাকে। যাক গে, ওসব ছাড়ো। আমি যা বললাম, তাই কোরো দাদি! আমি তোমার পায়ে পড়ি,যেভাবেই হোক ইউশার সাথে অয়ন ভাইয়ের বিয়েটা দিয়ে দেয়া চাই।”
“ আর আমি আমার কী হইব? তুই ছাড়া আমি কই যামু?”
তুশি হাসল। দাদির গাল ছুঁয়ে বলল,
“ আমি তো তোমাকে নিয়েই যাব দাদি। এই দুনিয়ায় তুমিই আমার সব চেয়ে আপন। তোমার মতো আমাকে কেউ বোঝে না। শোনো, আমি এখান থেকে সোজা রেলস্টেশন যাব। তুমি এদিকের কাজ শেষ করে যখন দেখবে সবাই ব্যস্ত বিয়ে নিয়ে,তখন চুপিচুপি বেরিয়ে যাবে।
তারপর আমরা দুজন এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব দাদি। আবার আমরা একসাথে থাকব। তবে এবার আর তুশি চোর হবে না,তুশি এবার খেটে খাবে। তোমাকেও খাওয়াবে।”
হাসনার চোখ ভিজে যায়।
“ বু…সব বুইঝা করতাছস তো?”
তুশি মাথা নাড়ল। ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ আমি যাই দাদি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
মেয়েটার প্রস্থান দেখে দেখে হাসনার চোখের জল নামল কপোলে। তার আদরের নাতনিটার জীবনে দূর্ভোগের শেষ কেন হচ্ছে না? সুখ কি ওর ভাগে লেখা নেই!

ভোরের আলো স্পষ্ট এখন। সূর্য উঠেছে কিছুক্ষণ হবে। তুশি একটা সি-এনজিতে উঠেছে। কালো ব্যাগটা বুকের মধ্যে চেপে রাখা। এটাতে কিছু টাকা,আর সার্থর দেয়া সেই সাদা গাউনটা এনেছে ও। এটাতে যে ওনার স্পর্শ আছে। আছে তার প্রথম ভালোবাসার ছোঁয়া। এটাকে তো ও কাছ ছাড়া করতে পারে না। এছাড়া বাড়ির বাকিদের দেয়া সব জিনিস রুমেই রেখে এসেছে তুশি।
ভোর ভোর হওয়ায় রাস্তায় জ্যাম- জট নেই। হাতেগোণা দু একটা যানবাহন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। সি এনজির ছোটো ছোটো ফাঁকা দিয়ে তুশি রাস্তায় চেয়ে রইল। বুকের চারিধার কেবল মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। আজ যদি অয়ন ইউশার বিয়ে হয় ও খুব খুশি হবে! কিন্তু, সার্থ? তুশি শুনেছে ফুপি রাগ করে বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন। ও জানে, রাগ পড়ে গেলে ওই সম্পর্ক আবার জোড়া লাগবে। আইরিন তো সার্থ বলতে পাগল! সার্থও নিশ্চয়ই একটা সময় ভুলে যাবে ওকে। চোখের আড়াল হতে হতে মনের আড়ালে রয়ে যাবে ও। একটা বস্তির চোরকে কেই বা মনে রাখে!
তুশির চোখ জ্বলল ভীষন কান্নায়। ভেঙে এলো রাঙা ঠোঁট। কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়লও গালে। কেন যে ভালোবাসতে গেল! আগে সার্থর জন্যে ওর কিচ্ছু যায় আসতো না। আর এখন, এই যে একটু দূর যাচ্ছে এতেই যেন ভেতরটা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।

সি এনজি চালক খুব জোরে ব্রেক কষলেন তখনই। বেখেয়ালে মেয়েটা হকচকিয়ে ঝুঁকে
গেল। ভড়কে বলল,
“ কী হলো, মামা?”
ভদ্রলোক সামনে চেয়ে চ্যাঁচালেন,
“ ওই ব্যাটা ওই, অন্ধ নাকি? এমনে সামনে আইসা খাড়াইছস হালারপুত। চোক্ষে দেহোস না?”
সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে গেল। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা বলিষ্ঠ দেহের মানুষটাকে দেখে মিইয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
কিন্তু তুশির বুকটা ছ্যাৎ করে লাফিয়ে উঠল অমনি। সবেগে কাঁপল দুটো চোখ। সার্থ এসে সি এনজির পাশে দাঁড়াল। মাথা ঝুঁকিয়ে এক পল দেখল তুশির ফ্যাকাশে মুখটার দিকে। চালককে ইশারায় বোঝাল, ছিটকিনি টানতে।
সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক দরজা খুলে দিলেন। তুরন্ত, নিস্তব্ধ মেয়েটার হাতটা খপ করে চেপে ধরল সার্থ। এক টান মেরে নামিয়ে আনল বাইরে। চালক অবাক হয়ে বললেন,
“ কিছু হইছে স্যার? এই মাইয়া কি সন্ত্রাসী? জঙ্গী?”
সার্থ বলল,
“ না,চোর।”
লোকটা চোখ বড়ো করে লুঙ্গির গিটে হাত দিলেন। দেখলেন টাকা-পয়সা ঠিক আছে নাকি। রাগের কাছে তুশির বিস্ময় উবে গেল সহসা। ফুঁসে বলল,
“ এই, আমি চোর? আমি চোর নই।”
সার্থ চালককে ইশারা করল, চলে যেতে। অমনি ইঞ্জিনে এক টান মেরে বিদেয় নিলেন তিনি। তুশি হাত ধরে মুচড়াল। ছুড়ে ছুড়ে বলল,
“ এসবের মানে কী? কেন এসছেন এখানে? চাইছেন টা কী?”

“ স্বভাব কখনো যায় না? চোর,চোরের মতোই পালাচ্ছিলে!”
“ আবার চোর বলছেন! আর, আপনি আপনি কী করে জানলেন আমি পালাচ্ছি?”
সার্থ সামনে পা বাড়ায়। হাত ধরে
টানতেই, ও বলল
“ কোথায়, কোথায় নিয়ে যাবেন?”
সার্থ পুরু স্বরে বলল,
“ চুপ!”
তুশি রেগেমেগে বলল,
“ কীসের চুপ? আমি কথা বলব, একশো বার বলব। হাত ছাড়ুন, ছাড়ুন হাত৷”
“ যদি না ছাড়ি?”
তুশি চারপাশে চেয়ে চিৎকার করে উঠল,
“ বাঁচাও বাঁচাও,কে আছো বাঁচাও।”
সার্থ নির্বোধ বনে গেল। নাক ফুলিয়ে হুঙ্কার ছুড়ল,
“ অ্যাই চোর,বেশি হচ্ছে কিন্তু।”
তুশি কানে নিলো না। চারদিকে চেয়ে চ্যাঁচাল,
“ কে আছো বাঁচাও। এই পুলিশ আমাকে মেরে ফেলল!”
সার্থ চোখ বুজে শ্বাস টানে। হাতটা ছেড়ে দেয় অমনি। তুশি মুক্ত হয়েই ভাবল,এক্ষুনি ছুটবে…
অথচ দম নেয়ার আগেই ঝট করে ওকে কোলে তুলে ফেলল ছেলেটা। চমকে গেল তুশি। হতভম্বতায় গলার শিরা ভেসে উঠল সব। আর্তনাদ করে বলল,
“ এ কীইইইই! কী হচ্ছে এসব? নামান আমাকে…. আয়ায়া…”
গাড়ির দরজা খোলা ছিল। সার্থ ওর শরীরটা ছুড়ে মারল সিটে। তুশি ব্যথা পেলো। নাকমুখ কুঁচকে
বলল
“ আল্লাহ, আপনি পুলিশ না গুণ্ডা?”
সার্থর উত্তর শান্ত,
“ ইউনিফর্ম দেখছো না? আজ মনেপ্রাণে ডিউটি করতে এসেছি। আর পুলিশ হিসেবে একটা পলাতক চোরকে ধরা তো আমার সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব।”

“ আমি, আমি আপনাকে…”
তুশির হম্বিতম্বির আগেই সার্থ গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন চালু হতেই ও ছটফটিয়ে বলল,
“ আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? আমি আপনার সাথে যাব না। মেরে ফেললেও আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না।”
মেয়েটা চলন্ত গাড়ির দরজা ঠেলতে যায়। সার্থ হাত বাড়ায় লকের দিকে। অমনি ও গর্জে বলল,
“ পুরুষ হয়ে থাকলে গাড়ি লক করবেন না।”
সার্থর আঙুল ফেরত এলো। তুশি জানলার কাচ ধরে ধাক্কায়,খোলার চেষ্টা করে। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ আমি লাফ দেব,মরব। তাও আপনার মতো বিটকেলের সাথে যাব না,যাব না যাব না।”

দু ফুট সাইজের মেয়ের এত জেদ! এ সহজে দমবে না।
সার্থ বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়ল। ব্রেক কষল হঠাৎ। তুশি ভাবল,ওর তেজ কাজে দিয়েছে। অথচ কিছু বোঝার আগেই
পেছনের সিট থেকে হ্যান্ডকাফটা এনেই থাবা মেরে ওর হাতজোড়া ধরল সার্থ। হ্যান্ডকাফের গোল অংশে দুই হাত ভরে,বাকি গোল অংশটা ঝুলিয়ে দিলো জানলার রডে। প্রচণ্ড বিস্ময়ে আহাম্মক বনে গেল তুশি। হাঁ করে বলল,
“ এটা কী করলেন?”
“ এখন ছটফট করো। দেখি, গায়ে কত জোর! আমার ঘুম হারাম করে পালাচ্ছিল,সাহস কত। চোর একটা! “
তুশি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে,
“ আপনি একটা অসভ্য! আপনার কোনো অনুভূতি নেই। সেদিন যখন আমাকে অপমান করেছিলেন, তখন কিছু মনে হয়নি আপনার? এখন আমাকে এভাবে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন! কিন…নেপ..”
সার্থ শুধরে দেয়,
“ কিডন্যাপ।”
“ হ্যাঁ ওটাই।
কোথায় নিচ্ছেন বলুন!”
“ জাহান্নামে।”
“ জানি তো। আপনি তো আর ভালো জায়গা চিনবেন না। আগেরবার জোরজবরদস্তি করে নিয়ে গিয়ে গুলি খাইয়ে ছিলেন, এবার কী খাওয়াবেন? বোমা মারবেন মাথায়?”
সার্থর মেজাজ চটে গেল।
তাকাল চোখ রাঙিয়ে৷ ও মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল,
“ কী? ক-কী দেখছেন? আমি এখন আপনাকে একটুও ভয় পাই না।”
সার্থ কিছু বলল না। তুশি আরো চেতে বলল,
“ কথা বলছেন না কেন? উত্তর দিন! আপনার লজ্জা করে না, একটা মেয়েকে এভাবে জোর করে তুলে আনলেন? এর শাস্তি হবে আপনার! আমি আপনাকে দেখে নেব! আমার সাথে যা করলেন, তার জন্য আপনাকে আমি জীবনেও ক্ষমা করব না! আপনি শুনছেন আমার কথা? এই পুলিশগিরি আমি ছুটিয়ে দেব। আমি কিন্তু কিছু ভুলিনি।”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে ড্যাশবোর্ডের থেকে একটা স্কচটেপের রোল বের করল। তুশির ঠোঁট দুটো যখন অনর্গল চলছে ফট করে মেয়েটার মুখের ওপর ঐ ছেড়া স্কচটেপ গলিয়ে দিলো ও। রীতিমতো ঠোঁট আর মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে দিলো স্কচটেপ দিয়ে।
চোখ প্রকট করে ফেলল তুশি। হাত-মুখ সব বন্দি হওয়ায় মুচড়ে উঠল শরীরটা। অনেক কিছু বলল সে,শাসাল সার্থকে। কিন্তু সব শোনাল,
“ হুউউ… হু হুহুউউউ হু…..
সার্থ ক্রুর হাসল এবার। গালের ভেতর জিভ নাড়ানো সেই দূর্বোধ্য হাসিটা তার সুন্দর চেহারায় মানাল খুব। তুশির ছটফট করার মাঝে, ঝুঁকে গিয়েই দুম করে ওর নাকের ডগায় একটা চুমু খেয়ে ফেলল। তুরন্ত, বরফের মতো জমে এলো মেয়েটা। থেমে গেল সেই মূহুর্তে। তার হতবিহ্বল দৃষ্টিতে সার্থ মজা পায়। এখন থাকুক ফ্রিজ হয়ে,নাহলে গাড়ি চালাতে ভীষণ জ্বালাবে। নিশ্চিন্ত মনে ফের গাড়ি স্টার্ট দেয় ও।
পথে আর একটা কথাও বলল না কেউ। শুধু হিঁসহিঁস করে ছুটল গাড়িটা।
কিছুক্ষণের মাঝেই থামল সেই গতি। চাকায় টান পড়ল, সম্বিৎ ফিরল তুশির।
সার্থকে সিটবেল্ট খুলতে দেখেই বুঝল,গন্তব্য হাজির। অমনি পাশ ফিরে চাইল সে। আশেপাশের সব ছাপিয়ে দৃষ্টি গিয়ে বিঁধল একটা সাইনবোর্ডের ওপর। অমনি নিঃশ্বাসটা তুশির গলায় এসে দাঁড়াল।
গোটা গোটা অক্ষরে লেখা :
“ কাজী অফিস……..”

চলবে..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply