কাছেআসারমৌসুম__(৫৮)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
আইরিনের ১০৩° জ্বর। ঠোঁটদুটো শুকিয়ে নীল হয়ে গেছে। সাথে লালের তোড়ে টকটক করছে মুখ। একমাত্র নাতনির এই অবস্থায় ভীষণ ক্ষেপেছেন রোকসানার শাশুড়ী। পার্টির সব কথা মেয়ের কুদরতে কানে এসেছে ওনার। সেই থেকে ছেলে,ছেলের বউকে গজগজ করে বকাবকি করছেন। আইরিনের বংশে ও একাই মেয়ে। দাদির খুব আদরের,সেজন্যে উৎকণ্ঠাও বেশি। নাসীরও বিমুখ। কেন তার আদুরে মেয়েকে এভাবে ঠেলে পানিতে ফেলা হলো, এ নিয়ে কাল রাতটাই রোকসানার ওপর গাইগুই করেছেন তিনি। আইরিনের জ্বর বাড়ল শেষ রাতে। সকাল সকাল ডাক্তার এলেন।
বললেন, জ্বর এর বেশি বাড়লে,বা কমার নাম বা নিলে হাসপাতালে নিতে হবে। আপাতত ওষুধ দিয়ে বিদায় নিলেন তিনি।
রোকসানা সার্ভেন্ট দিয়ে এক বাটি স্যুপ করে আনালেন। মেয়েকে বললেন,
“ কিউটি, ওঠো তো একটু। স্যুপটা খাইয়ে দিই।”
ব্যথায় ভারি মাথা নিয়ে একটু আধশোয়া হয়ে বসল আইরিন। হাঁচি দিলো মাঝে। নাক-চোখ দুই জায়গায়ই জলে টইটম্বুর অবস্থা। রোকসানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ আমি আগেই বলেছিলাম,সার্থ খুব এগ্রেসিভ একটা ছেলে। ওর কথাবার্তা, ওর চালচলনে সব কেমন অতিরিক্ত অহংকারীদের মতো। এজন্যেই বলেছিলাম ওকে নিয়ে বেশি কিছু ভাবা বাদ দিতে। দেখলে তো? আজ ওর জন্যেই তোমার এই অবস্থা হলো না?”
আইরিন চুপ করে স্যুপের চামচে চুমুক দিলো।
রোকসানা বলেই গেলেন,
“ আমি তোমার কথা অনেক শুনেছি, তোমার কথা ভেবেই আমি বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কালকের ঐ ঘটনার পরে আর সম্ভব না কিউটি। আমি ও বাড়ি ফোন করে বলে দিয়েছি,তোমাদের বিয়ে হবে না।”
আঁতকে চাইল আইরিন। স্তম্ভিত আওড়াল,
“ মাম্মাম,কী বলছো?”
“ ঠিকই বলেছি। আর এটা আমার একার সিদ্ধান্ত নয়। তোমার পাপা,তোমার দিদা,ফুপি সবাই একই কথা বলছেন। একে তো আমার বাবার বাড়ির লোক,সাথে পেলো একটা ছুঁতো। এখন এ নিয়ে কতদিন কথা শুনব কে জানে! সার্থর যে এত অধঃপতন হয়েছে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। সেই ছোট্ট বয়স থেকে ভাইজানের সাথে কথা বলে না। এত গুরুজন এত ভাবে বোঝাল,নাহ কারো কথা শোনেনি। ওর এত উদ্ধ্বত! কী করে পারল এই ঠান্ডার মধ্যে তোমাকে পানিতে ফেলে দিতে?”
আইরিন ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
“ মাম্মাম,প্লিজ মাম্মাম বিয়েটা ভেঙো না। আমি অনেক কষ্টে এই অবধি এসেছি। এখন আমি…”
রোকসানা এবার রেগে গেলেন। স্যুপের বাটিটা দুম করে রাখলেন ট্রেতে। সেই শব্দেই আইরিনের কথা থেমে গেল। ভদ্রমহিলা কড়া কণ্ঠে বললেন,
“ তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারোনি আইরিন? বিয়ে হবে না,মানে হবে না, ব্যস। এ নিয়ে বেশি কথা বাড়ালে আমার খারাপ রূপটা দেখবে এবার।”
আইরিন কেঁদে ফেলল,
“ মাম্মাম!”
“ নাকে কেঁদে কোনো লাভ হবে না। ওই অভদ্র ছেলের আশেপাশেও তোমাকে আমি আর দেখতে চাই না। ওর সামনে দিয়ে তোমাকে আমি একটা হিরের টুকরো খুঁজে দেবো। এখন খাও চুপ করে।”
মুখের সামনে চামচ ধরলেও আইরিন থমকে বসে রইল।
রোকসানা ধমকে বললেন,
“ খাও।”
মা সহজে বকে না। তাই এই ধমকে ভয় পেলো মেয়েটা। খেল চুপচাপ। কিন্তু তার চোখের কোণে জমে থাকা চিকচিকে জলটা স্পষ্ট দেখলেন রোকসানা। নরম হলেন ফের। গাল ছুঁয়ে বললেন,
“ কেঁদো না মাম্মাম। ভালোবাসো জানি। কিন্তু সেই মানুষটা ভালো কিনা সেটা সবার আগে দেখতে হয়। ও যদি বিয়ের আগেই তোমার সাথে এত রুড হয়,বিয়ের পরে কী করবে? এরা কখনো ভালোবাসতে পারে না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাধু পুরুষও বিয়ের পর রূপ বদলে ফেলে। সেখানে ও তো সব কিছুর উর্ধ্বে। কত অভদ্র হলে মানুষ একটা মেয়েকে ওইভাবে ধাক্কা দিতে পারে। যাক গে, ওকে নিয়ে আর ভেবো না। আর না!”
আইরিনের বিমর্ষ মুখ পাল্টাল না। একইরকম নেতিয়ে রইল দৃষ্টি। সার্থর সাথে ওর বিয়ে হবে না? তাহলে যে ও সব দিক থেকে হেরে যাবে। ভালোবাসার কাছে,চাওয়ার কাছে, পাওয়ার কাছে। আর সব থেকে যে পরাজয়ের গুলিটা ওর পাঁজর ছিদ্র করে দেবে, সেটা হলো তুশির কাছে হেরে যাওয়া। অথচ এই একটা কারণেই সেদিন সার্থর সব শর্ত মেনে ও হ্যাঁ বলেছিল। সেইদিন,যেদিন ওদের বিয়ের কথা উঠল আর সার্থ বলল – আমার আইরিনের সাথে আলাদা কথা আছে। ওই বন্ধ ঘরের ভেতর ওদের কী কথা হয়েছিল কেউ এখনো জানে না। কিন্তু আইরিন জানে, সার্থ ওর কাছে কোনো লুকোচুরি রাখেনি, কিচ্ছু লুকায়নি। কার্নিশের জল ফেলার মাঝেই সেই পুরানো দৃশ্য আইরিনের চোখে ভেসে উঠল ফের।
সার্থ দোর আটকে চেয়ার টেনে এগিয়ে দিলো,
“ বসো।”
কিন্তু আইরিন বসতে পারল না। খুশিতে,আনন্দে- উত্তেজনায় বুক কাঁপছে ওর। ছটফটিয়ে বলল,
“ আমি ভাবতেও পারিনি, আপনি বিয়েতে রাজি হয়ে যাবেন। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না জানেন। আজ আমি খুব খুব খুব খুশি।”
সার্থ বসল কাউচে। ভ্রুয়ের ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে বলল,
“ বোসো আগে।”
শরীর গুছিয়ে বসল আইরিন।
সোজাসুজি কথা ধরল সার্থ,
“ এত খুশি হওয়ার দরকার নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করছি না।”
চমকে উঠল মেয়েটা,
“ মানে!”
“ বাংলায়ই বললাম। ইংলিশে বলব,বুঝবে তাহলে? আই ও’ন্ট ম্যারি ইউ।”
আইরিনের মাথায় বাজ পড়ল। হতবাক হয়ে বলল,
“ তাহলে, তাহলে যে একটু আগে সবার সামনে বললেন আপনি বিয়েতে রাজি।”
“ সেটা তুশিকে শোনাতে বলেছি। সের্ফ ওকে কষ্ট দেয়ার জন্যে।”
আইরিন তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেল,
“ কীহ! মানে কী এসবের? কী বলছেন এসব? আমি,আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“ রিল্যাক্স,আগে আমার পুরো কথা শোনো। বোসো। বোসো…”
মেয়েটা ছটফটিয়ে বসল।
সার্থ নরম গলায় বলল,
“ দেখো আইরিন, সেদিন তুমি আমার পাশে বসাতে তুশি খুব রিয়্যাক্ট করেছিল। আমি সেদিনই বুঝেছিলাম ও তোমাকে আমার কাছাকাছি মেনে নিতে পারে না। আর তাই আজ যখন তোমার সাথেই বিয়ের কথা উঠল,আমি ওকে পোড়ানোর এই চান্স মিস করতে চাইনি। এখন আমি চাইলে আমার মন মাফিক বিয়েটা নিয়ে একটা নাটক করতে পারতাম। ধরো বিয়ে ঠিক হয়েছে,কথাবার্তা শেষ । তুমিও ধরে নিলে আমাদের বিয়ে হবে; কিন্তু ঠিক ঐ দিনই আমি চাইলে বলতে পারতাম, এই বিয়ে হবে না। কিংবা কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও-ও হতে পারতাম। তুমি নিশ্চয়ই জানো,আমাকে কেউ জোর করে বিয়ে করানোর মতো নেই। আগেরবার শুধুমাত্র তোমার বড়ো মামির চোখের পানি আর ইমোশোনাল কথাবার্তায় রাজি হলেও,এবার কিন্তু তা হতো না। কারণ আমি তোমাকে বিয়ে করতাম না,কোনোভাবেই না।”
কষ্টে আইরিনের চোখদুটো ভিজে উঠল এবার। মর্মাহতের ন্যায় বলল,
“ তাহলে আপনার এই নাটকের কী মানে,সার্থ ভাই?”
“ ঐ যে বললাম তুশিকে কষ্ট দিতে।”
“ তুশি? আজকাল ঐ চোর মেয়েও আপনার কাছে এতটা মানে রাখে? “
সার্থ চোখ বুজে কপালে আঙুল ঘষতে ঘষতে বলল,
“ আইরিন, ওকে চোর বলবে না।”
“ চোরকে চোর বলব না?”
সার্থ গর্যে উঠল অমনি,
“ না বলবে না। তুশিকে যা করার, যা বলার এই পৃথিবীতে শুধু আমি বলব। আর কেউ না। বলিনি একদিন? বলেছি তো।”
তপ্ত কণ্ঠে আইরিন চোখ নুইয়ে নিলো। সার্থ মাথা ঠান্ডা করে বলল,
“ শোনো আইরিন,বিয়ের কিছু রুলস রেগ্যিউলেশান’স আছে। দুজনেরই দুজনকে পছন্দ করতে হয়। এখানে এক তরফা কিছু হয় না। তোমার কী মনে হয়, তুমি যে আমাকে পছন্দ করো এটা আমি আজ প্রথম শুনলাম?”
আইরিন ঝট করে চাইল। দৃষ্টিতে বিস্ময় মাখা।
সার্থ বলল,
“ না। আমি আরো আগে থেকে জানি। আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না,আইরিন। কিন্তু আমি ধরা দিতে চাইনি। কারণ এই ব্যাপারটা আমার কাছে যেমন অস্বস্তির তেমন বিব্রতকর। তাও তোমাকে আমি সমান ভাবে ইগ্নোর করে বুঝিয়েছি,আই নেভার লাইকড ইউ। কোনোদিন কোনো কথা,হাবভাবেও আমি তোমাকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিইনি। তুমি যেখানে দাঁড়িয়েছ তার পাশ অবধি মাড়াইনি। একবার দেখা হয়ে গেলেও দ্বিতীয় বার ঘুরে দেখিনি কখনো। কারণ তুমি আমার চোখে শুধুই ফুপির মেয়ে, আমার আত্মীয়, নাথিং এলস!”
আইরিন ভেজা গলায় বলল,
“ কিন্তু কেন সার্থ ভাই,কেন আপনার আমাকে পছন্দ না? আমি কি দেখতে সুন্দরী নই? আমার আসল কমতি-টা কোথায়?”
সার্থ হেসে বলল,
“ সুন্দরী হলেই সৈয়দ সার্থ আবরারের চোখে পড়া যায় না। তার চোখে পড়তে হলে বিশেষ হতে হয়। সুন্দর চেহারার চেয়েও বেশি সুন্দর একটা মন থাকতে হয়। যেটা তোমার নেই।”
আইরিনের চেহারা আঁধারে ডুবে গেল। ও ফের বলল,
“ শুরুতে তোমাকে আমি ইউশার মতোই স্নেহ করতাম। কিন্তু তুমি যবে থেকে আমাকে অন্য চোখে দেখা শুরু করলে,আমার একটা বিশদ অস্বস্তির কারণ হলে তুমি। আমি তাও তোমাকে কিছু বলিনি। ভেবেছিলাম প্রশ্রয় না দিলে নিজেই শুধরে যাবে। কিন্তু তুমি কী করলে? শুধুমাত্র আমার সাথে বিয়ে হয়েছে বলে,তুমি তুশির পেছনে পড়ে গেলে। কখনো ওর পা ভেঙে, কখনো চোর বানিয়ে আর ওকে করা ছোটো ছোটো অপমান তো আছেই। তুমি নিজেই বলো তো,এত হিংস্র মানসিকতার মানুষকে আদৌ কি পছন্দ করা যায়?”
“ আপনি কি আমাকে অপমান করতে ডেকেছেন?”
সার্থ উঠে দাঁড়াল এবার। দুটো হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে বলল,
“ না। আমি কিছু কথা বলব, তুমি শুনবে। তারপর ডিসাইড করবে তুমি কী চাও?”
আইরিন ভেজা চোখ তুলে চাইল ওর মুখের দিকে। সার্থর সাবলীল চেহারা হুট করেই বদলে গেল এবার। চিবুক ফুটিয়ে কটমট করে বলল,
“ ওই চোর আমার সাথে বেয়াদবি করেছে। মুখের ওপর অস্বীকার করেছে আমাকে। এর রিভেঞ্জ তো আমি নেবোই। ওর সব থেকে দূর্বল জায়গাকে পুঁজি করে নেবো। তুশি যেহেতু তোমাকে আমার পাশে মেনে নিতে পারে না, তাই ওর সামনে আমি বিয়েতে হ্যাঁ বলেছি,শুধুমাত্র যাতে ও ছটফট করে,কষ্ট পায়। আর তারপর ও ছুটতে ছুটতে আমার কাছে আসবে, স্বীকার করবে কাল ও যা যা বলেছে সব ভুল বলেছে। ক্ষমা চাইবে, সরি বলবে আমাকে। আর তাই আমার তোমার থেকে সাহায্য দরকার,আইরিন। বেশি কিছু না,যাস্ট আমার হ্যাঁ তে হ্যাঁ, আর না-তে না বলতে হবে। তবে এতে কোনো জোর নেই। সবটা তোমার নিজের ওপর। শুধু তুমি জেনে রাখবে এটা একটা গেম। বিয়ে-টিয়ে কিচ্ছু হবে না। আমি শুধুমাত্র তুশিকে দেখাব,বিয়ে হবে। কিন্তু তুমি- আমি জানব বিয়ে হবে না।”
“ কী বেয়াদবি করেছে ও?”
“ সেটা তোমার না জানলেও চলবে।”
আইরিন মুখ শক্ত করে বলল,
“ আর আমি যদি রাজি না হই, তাহলে কী করবেন?”
সার্থ কাঁধ উঁচাল,
“ তাহলে অন্য কিছু ভাবব।”
ওর কণ্ঠে উদ্বেগ,
“ কিন্তু আপনি তো বাইরে বললেন রাজি। সবাইকে কীভাবে ম্যানেজ করবেন তাহলে?” .
“ সেসব আমার ব্যাপার। যেভাবে হ্যাঁ বলেছি, না-টাও সেভাবেই বলব। কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও থাকব। দুদিন গেলে মা, দিদুন ছোটো মা সবাই এমনিই ফোন করে ডাকবে। যাক গে, এগুলো তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি রাজি হলে আমি কৃতজ্ঞ হই, দ্যাটস ইট। এখন তুমি ভাবো। আমি তোমাকে কোনো মিথ্যে আশ্বাস দিতে চাইনি বলেই সবার মধ্যে থেকে এখানে আলাদা কথা বলার জন্যে এনেছি।”
সার্থ হাতঘড়িতে সময় ধরল।
“ দু মিনিট দিলাম,ভাবো। বন্ধ ঘরে বেশি দেরি করলে তুশি আমার ক্যারেক্টর নিয়ে সন্দেহ করতে পারে।”
আইরিনের রাগে মাথা জ্বলে গেল। ক্ষুব্ধ চিত্তে হাঁসফাঁস করল বেচারি। এইত একটু আগেই ও আনন্দে উড়ছিল সার্থকে বিয়ে করবে ভেবে। তুশির সামনে দিয়ে মানুষটাকে জিতে নিয়েছে মনে করে। ইস,সব এভাবে ডুবল? এইভাবে?
না না,এটা তো হতে দেয়া যাবে না। তুশিকে জব্দ করার এমন চমৎকার উপায় ও আর পাবে না কখনো।
সার্থ যে ইনিয়েবিনিয়ে তুশির প্রেমে মজেছে,বেশ বুঝেছে আইরিন। আর এটাই সুযোগ ওদের দুজনকে আলাদা করার। ওকে এখন এই অভিনয় চালিয়ে যেতে হবে। আরো বেশি বেশি এই নাটকের মাত্রা বাড়িয়ে তুশিকে পুরোপুরি ভেতর থেকে ভেঙে দিতে হবে। আর একবার তুশি দূরে গেলে,সার্থ ওর দিকে ফিরতে কতক্ষণ? ও জিভে ঠোঁট চুবিয়ে বলল,
“ আমি রাজি।”
সার্থ ভ্রু নাঁচাল,
“ আর ইউ শিয়র? পরে এ নিয়ে গল্প বানাতে পারবে না।”
“ না না। আমি এমনিই রাজি হলাম। আপনি এই প্রথম আমার কাছে হেল্প চেয়েছেন আমি করব না? করব,নিশ্চয়ই করব।”
“ আবার জিজ্ঞেস করছি, শিয়র তো? আমাকে নিয়ে কিন্তু কোনো এক্সপেকটেশান’স রাখতে পারবে না।”
আইরিন হেসে বলল,
“ রাখব না।”
সার্থ নিজেও হাসল। হাতটা বাড়িয়ে বলল,
“ থ্যাংক ইউ আইরিন। থ্যাংকিউ সো মাচ।”
আইরিন হাত মেলাল। হাসল। অথচ তপ্ত চোখে ভাবল,
“ থ্যাংক ইউটা পরে নেবো, সার্থ ভাই। আগে আপনার নিজের জালে, আপনাকে জড়িয়ে ফেলতে দিন। এমন শিকল পরাব আপনার পায়ে,বিয়ের দিন উধাও তো দূর,নড়তেও পারবেন না।”
নিজের এই ব্যর্থতা ভেবে আইরিনের বুক মুচড়ে উঠল। দুহাতে মুখ চেপে হুহু করে কেঁদে ফেলল সে। ওর সব প্ল্যান,সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। কিচ্ছু হলো না,কিচ্ছু না। কালকের পার্টিটাও তো ওর বুদ্ধিতেই তো রেখেছিল মাম্মাম। যাতে সবার সামনে বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হয়। প্রকৃতিও ওর জয় চাইছিল। সেজন্যেই তো অয়নের সাথে তুশির বিয়ের কথা উঠল। আর একবার ওদের বিয়ে হয়ে গেলেই, সার্থকে ওর থেকে কেউ নিতে পারতো না। বিয়ের দিন যে করেই হোক,কোনো একটা ড্রামা করে আইরিন ঠিক আটকে ফেলতো তাকে। কিন্তু এখন কী হবে?
মেয়ের কান্না দেখে রোকসানা ব্যস্ত হয়ে বললেন,
“ এভাবে কাঁদছো কেন কিউটি?”
“ মাম্মা আমি হারব না মাম্মা,আমি হারতে চাই না। এত কিছুর পরে এই বিয়ে তুমি ভেঙে দিও না।”
ডাক্তারকে এগিয়ে দিয়ে নাসীর মাত্রই ফিরলেন। ঘরে ঢুকতেই কানে এলো কথাটা। সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“ কেঁদে কোনো লাভ নেই। তোমার মায়ের কথায় আর কিছু হবে না। আমি তো চাই-ই না, আর এবার তোমার দিদাও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন,এই সম্পর্ক নিয়ে না এগোতে। তুমি তোমার মায়ের কথার বিরুদ্ধে যেতে চাইলেও,আমি কিন্তু আজ অবধি যাইনি। আমার কাছে আমার পরিবারই সব। তাই আগে কী হয়েছে সব এখানেই ভুলে যাও।”
আইরিনের চোখের জলে গাল ভেসে গেল। রোকসানা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ তুমি অনেক ভালো কাউকে পাবে, বেটা। ডোন্ট ও্যরি।”
বাড়ির দ্বিতীয় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে অয়ন। আহত সাপ ছোটার সময় যেমন ছোটো ঘাস নুইয়ে দিয়ে যায়? অমন করে কালচে পিচের রাস্তা পিষে দিচ্ছে সে। কাঠের মতো শক্ত চোয়ালে, দপদপ করছে চোখ। বুকের ওঠানামা শ্বাসেও এক বিস্তর আগুন বইছে তার। এক হাতে ফোন কানে ধরে আরেক হাত দিয়ে গাড়ি টানছে অয়ন। লাগাতার কল যাচ্ছে সার্থর ফোনে। কিন্তু নাহ,ওপাশে কোনো জবাব নেই। সার্থ না রিসিভ করল,না লাইন কাটল। এই নীরব অবজ্ঞা আর অপমানে রেগেমেগে ফোনটাকে পাশের সীটে ছুড়ে ফেলল ও। ক্ষিপ্ত চিত্তে বলল,
“ দিস ইজ নট ফেয়ার ভাইয়া। দিস ইজ নট ফেয়ার। এমন তো কথা ছিল না,তোমার সাথে। এমন কথা হয়নি আমাদের।”
“ তুমি এইভাবে নিজের মর্জিমাফিক কাজ করতে পারো না। আমার তুশিকে, আমার থেকে এভাবে নিয়ে যেতে পারো না তুমি। আই লাভ, তুশি। আই লাভ হার ভাইয়া। ও আমার,শুধু আমার, আমার শুধু আমার।”
বলতে বলতে স্টিয়ারিং-এ এলোপাথাড়ি বাড়ি মারল অয়ন। দু একবার হর্ন বাজল তাতে। অয়ন খুব জোরে গাড়িতে ব্রেক কষল। ক্লান্ত,বিধ্বস্তের মতো কপাল হেলে দিলো স্টিয়ারিং ধরে রাখা দুহাতের ওপর। চোখের পর্দায় তুশির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা ভাসল তক্ষুনি। প্রথম বার ওর রুমে কফি খেতে বসে সেই খিলখিল হাসি! সেই লাল শাড়ি পরা অপরূপা মেয়ে। আর এই মেয়েটাকে পাওয়ার জন্যে অয়ন কত কী করেছে! কত স্বার্থপর হয়েছে। সব জেনেবুঝেও না জানার ভান করেছে। দিনের পর দিন তুশির মনে সার্থর জন্যে উদ্বেগ,সার্থর প্রতি অগাধ প্রেম দেখেও, মেয়েটার দু চোখ ছাপানো বিমোহ দেখেও অয়নকে না দেখার অভিনয় করতে হয়েছে। কেন? শুধুমাত্র তুশিকে পাওয়ার জন্যেই তো ওসব। খাবার টেবিলে আইরিনের সাথে সার্থর বিয়ের ঘোষণায় তুশির দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কি অয়ন বোঝেনি? বুঝেছে। ওকে বিয়ে করার ব্যাপারে তুশির আপত্তি,ওর অনিচ্ছায় মোড়ানো দৃষ্টি কি অয়ন দেখেনি? দেখেছে। তাও ও চুপ ছিল কেন? কেবল তুশিকে নিজের করার জন্যে। এই সেদিন রাতেও, সার্থ যখন তুশির দরজা ধাক্কাল কথা বলার জন্যে, অয়ন ইচ্ছে করে কফির ছুঁতোয় হাজির হয়েছিল সেখানে। যাতে ওদের কথা না হয়। ওরা কাছাকাছি না থাকতে পারে। এরকম অয়ন বহুবার করেছে। কতবার আটকেছে,বাঁধা দিয়েছে ওদের এক হওয়া থেকে। সেই হাসপাতালে বাবা অসুস্থ হওয়ার দিন থেকে সার্থ- তুশিকে দূরে রাখার লড়াইটা নিঃশব্দে চালিয়েছে ও। অথচ আজ,আজ এই ভাবে ভাইয়া পাশা উলটে ফেলল? এটা তো হতে দেয়া যায় না। অয়ন মাথা তুলল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ আই’ল নট স্পেয়ার ইউ, ভাইয়া। ইউ হ্যাভ টু বিয়ার দিস।”
গাড়ি থেমেছে একটা বড়ো শপিং-মলের সামনে। সেই একই মল এটা। পার্টির কেনাকাটার জন্যে ওরা সবাই এসেছিল যেখানে। কিন্তু এখানে কী কাজ?
তুশি তাও কিচ্ছু জিজ্ঞেস করল না। ঠোঁট গোজ করে কপাল কুঁচকে রাখল। সার্থর সাথে ওর কোনো কথা বলার ইচ্ছে নেই। থাকবেও বা কেন? ওদিকে আইরিনের সাথে বিয়ে ঠিক করে, এখন তার সাথে ঘুরতে আসা হচ্ছে। চরিত্রহীন লোক! অথচ তুশি ভেবেছিল লোকটা যাই হোক,যেমনই হোক চরিত্র ভালো। কিন্তু এসব কী?
সার্থ তক্ষুনি ওর পাশের দরজা টেনে খুলল। কেমন ত্যারাব্যাঁকা প্রশ্ন ছুড়ল,
“ নিজে নামবে, না কোলে করে নামাব?”
দাঁত খিটমিট করে নামল তুশি। গজগজ করে শুধাল,
“ এখানে কেন এসেছি?”
সার্থ উত্তর দেয় না। চট করে ওর হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল। ঐ লম্বা লম্বা কদমে তাল মেলাতে তুশি থুবড়ে পড়তে ধরল দু-বার। একটা বড়ো শো রুমের ভেতরে ঢুকল সার্থ। অমনি সেলসগার্ল এগিয়ে এলো।
“ ইয়েস স্যার,কী দেখতে চাইছেন? পার্টি বা ক্লাসিক কিছু?”
ও বলল,
“ আমি দেখছি।”
“ শিয়র স্যার।”
সার্থ এক হাতে তুশিকে ধরে রাখে,অন্য হাতে একেকটা হ্যাঙারের জামা ধরে ধরে সেলস গার্লের কাছে দেয়।
তুশি ভীষণ তাজ্জব হয়ে পড়ল৷ বিটকেলটা কার জন্যে কিনছে এসব!
ওদিকে সেই মেয়েটা জামায় ঢেকে গেছে। চোখ ঝাপটে ঝাপটে দেখছে সে। এত জামা কিনবে,নাকি শুধু দেখার জন্যে নিলো?
সার্থ তুশিকে বলল
“ যাও,সবগুলো ট্রায়াল দিয়ে এসো।”
ও অবাক হয়ে বলল,
“ আমি! আমি কেন যাব?”
“ তোমার জন্যে কিনছি, তুমি যাবে না?”
“ কীহ? আমার, আমার জন্য এত কাপড় কিনতে কে বলেছে আপনাকে?”
“ কে বলবে?
গতবার যখন এসেছিলাম তখন দেখেছি। মনে হয়েছে তোমাকে মানাবে। যাও পরে এসো।”
তুশি তেতে উঠল,
“ ফাজলামো নাকি। বললেই হলো? আমি..”
সার্থ ঝট করে কানের পাশে এসে ফিসফিস করে বলল,
“ তোমার গায়ের জামা ভেজা। আমাকে খ্যাপালে কিন্তু ব্লেজার নিয়ে যাব। তখন কী করবে?”
তুশি রেগে রেগে বলল,
“ দূর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন?”
“ কীসের সুযোগ নিচ্ছি,সেটা সময় বলবে। এখন যাও?”
সেলসগার্ল বলল,
“ ম্যাম, আপনি আমার সাথে আসুন।”
তুশি মেজাজ খারাপ করে চলে গেল। সার্থ বসল ওয়েটিং জোনে।
দু মিনিটের মাথায় বেরিয়ে এলো মেয়েটা। একটা কালো জামা গায়ে গোমড়ামুখ করে দাঁড়াল। সার্থ ওর পা থেকে মাথা অবধি দেখল বাঁকা চোখে। পরপর উঠে গিয়ে দাঁড়াল সামনে। ফট করে তুশির ঝুটি বাঁধা চুলগুলো খুলে দিলো টেনে। বলল – নাউ ইউ লুকস বেটার!”
তুশি চোখ পাঁকায়। জেদ নিয়ে হাত তুলল খোপা করতে,সার্থ কব্জি চেপে ধরল অমনি।
“ চুল বাঁধবে না। খবর আছে তাহলে।”
তুশি হাতটা মুচড়াল
“ ছাড়ুন। দেখছে সবাই।”
সার্থ হাত ছাড়ে।
পেছন থেকে মেয়েটি বলল,
“ স্যার, ম্যাম শুধু একটা ড্রেস ট্রায়াল দিয়েছে। বাকিগুলো দিতে চাইছে না।”
ফোস করে শ্বাস ফেলল সে।
জোর করল না। বলল,
“ আচ্ছা, আপনি সবগুলো প্যাক করে দিন।”
তুশির ঠোঁট হাঁ হয়ে গেল। সব গুলো? এখানে তো প্রায় বিশটার মতো জামা। এত জামা দিয়ে ও কী করবে? হড়বড় করে বলল – না শুনুন,এত জামা,আমি শুনুন…”
মেয়েটি ওর কথা শুনল না। নিজের মতো ব্যস্ত হলো শপিংব্যাগ নিয়ে। সার্থ ততক্ষণে বিল মিটিয়ে ফেলেছে। সেই আবার তুশির হাতটা ধরে,অন্য হাতে প্যাকেট তুলে বেরিয়ে এলো সে। কিন্তু মেয়েটা এই বিস্ময় থেকে বের হতে পারল না। খুব আশ্চর্য চোখে বলল,
“ কেন কিনলেন এগুলো? এতগুলো জামা দিয়ে আমি কী করব?”
“ পরবে।”
“ আমি আপনার কিনে দেয়া কিচ্ছু নেবো না।”
“ আচ্ছা? তাই! ”
“ হ্যাঁ, তাই।”
“ দেখা যাবে।”
সার্থ গায়েই নিলো না। হাঁটল একইরকম প্রতাপি পায়ে। আগের মতোই হোচট খেতে খেতে সাথে ছুটল তুশি। সার্থ এবার মোবাইলের শো-রুমে ঢুকল। বলল,
“ এ্যাপলের লেটেস্ট মডেলটা দিন।”
কমলা রঙের ফোনটা দেখেই তুশির চোখ বেরিয়ে এলো। এই ফোন তো অয়ন,আইরিন,এমনকি সার্থর কাছেও দেখেছে। ফুপির কাছেও এই ফোন। খুব দামি নিশ্চয়ই! উনি কি এটাও ওর জন্যে কিনছেন?
সার্থ ফোনের সব কিছু ঘেটে দেখল।
পরপর তুশির কাঁধ প্যাঁচিয়ে টেনে নিলো বুকের কাছে। একটা সেলফির ফ্ল্যাশ মুখে এসে পড়তেই,আরো আশ্চর্য হয়ে গেল মেয়েটা। ওর ভড়কে থাকা মুখখানা উঠে গেল ছবিতে। ভীষণ হতভম্ভ হয়ে পড়ল তুশি। কিন্তু সার্থ নিজের মতো ব্যস্ত। ফোনের চার্জার থেকে সিম অবধি কিনল সে। তুশি শুধু অবাক হয়ে দেখে গেল ওসব। কেনাকাটার পাঠ চুকিয়ে ওরা গ্রাউন্ড ফ্লোরে এলো। সার্থর এক হাতে ব্যাগ বেশি হয়ে গেছে। তারওপর তুশির হাতও ধরা। কিছু ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ এগুলো নিয়ে গেইটের সামনে দাঁড়াও। আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।”
মেয়েটা রুক্ষ স্বরে বলল,
“ এই ফোন কার জন্যে কিনেছেন?”
“ এটা একটা প্রশ্ন? তোমার জন্যে।”
তুশি রেগেমেগে বলল,
“ আপনি কি এসব দিয়ে আমাকে হাত করতে চাইছেন?”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ তোমার তাই মনে হচ্ছে?”
“ আমার যাই মনে হোক। আপনি একটা কথা জেনে রাখবেন তুশি লোভি নয়। আমি আপনার কিনে দেয়া কিচ্ছু নেবো না। পার্টিতে আপনার ঐ গাউন পরার মরমেই মরে যাচ্ছি এখনো, আবার এসব শুরু করেছেন! আপনার এই
ড্রেসটাও আমি বাসায় গিয়ে খুলে দিয়ে দেব।”
“ ওহ,তারপর সেটা কি আমি পরব?”
“ কেন,আপনার আইরিনকে দেবেন। যার সাথে আপনার দুইদিন পর বিয়ে। মাখোমাখো প্রেম। আচ্ছা আপনার লজ্জা করছে না, ওকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে আমাকে নিয়ে ঘুরছেন? আবার লাখ লাখ টাকা দিয়ে কেনাকাটা করে দিচ্ছেন।”
“ না। তোমার লজ্জা করছে?”
“ হ্যাঁ করছে। ঘেন্না লাগছে আমার। আমার হাতটা ছাড়ুন আপনি। আপনাকে আমার সহ্য হচ্ছে না।”
“ কিন্তু তোমার আমাকেই সহ্য করতে হবে। আমি আর সেই সার্থ নেই যাকে উল্টোপালটা বলবে, আর সেও রেগেমেগে কিছু করে আসবে। কালকের পর তো ওসব আরো হবে না।”
তুশি হাত মুচড়াল। দাদি বলতেন ওর গায়ে অনেক জোর। অথচ এই লোকটার সাথে ও কিচ্ছু পারে না। এই তো, হাতটাও পারল না ছোটাতে। মেয়েটা ক্লান্ত চোখে বলল,
“ আপনি চাইছেন কী আসলে?”
সার্থ সোজাসুজি বলে দিলো,
“ তুমি অয়নের সাথে বিয়েটা ভাঙবে আপাতত এটাই চাই।”
“ আপনার কথায়!”
ছেলেটা একটু নরম হলো এবার,বলল
“ দেখো তুশি, যা হয়েছে হয়ে গেছে। শুধু শুধু অয়নকে আশা দিয়ে রেখো না। ও তোমাকে নিয়ে আরো ডিপ হওয়ার আগে বিয়েটা ভেঙে দাও। ও আমার ছোটো ভাই, আমি নিজে ওকে কিছু বলতেও পারছি না। আমি বললে ও অনেক উল্টোপাল্টা ভাববে। এটা সম্পূর্ন তোমার হাতে। নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কাউকে বিয়ে করা অন্যায়।”
তুশি বিদ্রুপ করে বলল,
“ অন্যায়ের কথা আপনি বলছেন? তাহলে নিজের হবু বউ রেখে এখন যা করছেন সেসব কী?”
“ আমার কথা না ভেবে, তুমি নিজের ভুল শুধরাও। আই ন্যো ইউ লাইকস মি!”
“ না। আপনার মতো একটা দজ্জাল লোককে আমি কেন, কোনো মেয়েই পছন্দ করতে পারে না।”
“ আচ্ছা? এজন্যেই আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে? একা একা ব্লাশ করতে?”
তুশি থ বনে বলল,
“ আপনি কী করে জানলেন?”
“ তুমি জানো আমার চোখ কয়টা?”
হোয়াটেভার,ধরো, কখন থেকে বাড়িয়ে আছি।”
তুশির গলায় অটল জেদ। ব্যাগ ঠেলে দিয়ে বলল,
“ নেবো না বলেছি যখন, নেবো না।”
“ নেবে না?”
“ না।”
“ শিয়র?”
“ হ্যাঁ।”
সার্থ চোখ বুজে শ্বাস ঝাড়ল। হাতটা ছাড়ল তুশির। মেয়েটা দম ফেলার আগেই ঝট করে ওর সরু কোমর ধরে টেনে নিলো কাছে। তুশি চমকে যায়। ছ্যাৎ করে কেঁপে ওঠে বুক।
পরপরই এদিক-ওদিক দেখে হাঁসফাঁস করে বলল,“ ক,ক কী অসভ্যতা এসব? মানুষ, মানুষ দেখ দেখছে। এটা পাব্লিক…”
“ আই নো ইটস আ পাব্লিক প্লেস। এটুকু ধরছি তাতেই লোকজন তাকাচ্ছে। আর যদি কালকের মত কিছু করি, কীভাবে তাকাবে সবাই?”
তুশি স্তব্ধ হয়ে বলল,
“ মা,মানে.”
“ তুশি,আমি পুলিশ অফিসার।
ভালো পার্ফমেন্সের জন্যে খুব তাড়াতাড়ি আমার র্যাংক এই অবধি এসেছে। রুহানকে ধরার জন্যে সামনে আবারও প্রমোশান পাচ্ছি।
আর আমার পার্ফমেন্স শুধু কাজেই না,বাকি সব কিছুতে ভালো। কাল একটু হলেও নিশ্চয়ই বুঝেছ?”
তুশি বিহ্বল হয়ে বলল,
“ আপনার মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেছে?”
“ হ্যাঁ, তুমি খারাপ করে দিচ্ছ। এমনিতেও আমি ছোটোদের থেকে বেয়াদবি নিতে পারি না। অথচ তুমি কন্টিনিউয়াস্লি আমার সাথে তর্ক করে যাচ্ছ। আমি কিন্তু লোকজন মানব না,তুশি। কথার অবাধ্য হলে খারাপ কিছু ঘটিয়ে ফেলব এখানে। সেটা না চাইলে,এগুলো ধরো।”
সার্থ ছাড়ল। প্যাকেটগুলো দিলো বাড়িয়ে। অনীহায়, গাল ফুলিয়ে মেয়েটা ধরল এবার। মলের পার্কিং লট বাইরের ডান দিকে পড়ে। সার্থ সামনে, তুশি ওর পেছনে খরগোশের পায়ে আসছে তখন। গেইট পেড়িয়ে লনের দিকে সার্থ এক পা বাড়াল, হঠাৎ গাড়ির চাবি হাত ফস্কে পড়ে গেল মাটিতে। ও ঝুঁকল চাবি তুলতে,একটা বিকট শব্দ বাতাস চিড়ে বেরিয়ে গেল অমনি। সাথে প্রবল ঝাঁকুনিতে দুলে উঠল জমিন। আকাশ কাঁপানো ওই শব্দে বিদ্যুতের তারে বসা পাখিগুলো ধড়ফড় করে উড়ে গেল কোথাও। সাই বেগে একটা মোটরবাইক ছুটে হাওয়া হয়ে গেল। তুশির দুহাতে রাখা শপিংব্যাগ খসে পড়ল পায়ের কাছে। একটা তীক্ষ্ণ গুঙানির শব্দে হুড়মুড়িয়ে পিছু ফিরল সার্থ। সঙ্গে সঙ্গে নিস্তেজের ন্যায় গায়ের ওপর ঢলে পড়ল মেয়েটা। সার্থ আঁতকে উঠল, ওকে ধরল ধড়ফড়িয়ে। তুশির গলার শিরা ভেসে আছে। রক্তিম চোখে জল। ফ্যাসফ্যাসে শ্বাস টানতে টানতে একবার হাত তুলে সার্থর গাল ছুঁতে চাইল, অথচ ঠকঠক করতে করতে পড়ে গেল সেটা। শক্ত বাহুডোরে শরীর ছেড়ে মূহুর্তের মাঝে নিথর হয়ে গেল ও। সার্থর বুক কেঁপে ওঠে, পায়ের মাটি সরে যায়।
উৎকণ্ঠায় নিঃশ্বাস আটকে ডাকে,
“ তু,তুশি? তুশি? এই!”
পরপর টের পেলো বুকের কাছে ওর শার্ট ভিজে যাচ্ছে। পায়ের কাছে কিছু একটা পড়ছে চুইয়ে। রক্ত! থমকে গেল সার্থ। পিঠ ছুঁয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নামার সাথে, ফরসা মুখ ভয়ের বিষে নীল হলো তার।
ততক্ষণে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসছে। চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে বলছে,
“ মেয়েটার গুলি লেগেছে,মেয়েটার গুলি লেগেছে।” কিন্তু সার্থর কানে কোনো কথা গেল না। তার পুরো দুনিয়া টলছে, নড়বড়ে হয়েছে বুকের শক্ত ওই ভিত। শূন্য চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে সেই মুখ পানে চেয়ে রইল সে,যে মুখ দেখে একদিন ভিন্ন অনুভূতির তালে দুলেছিল হৃদয়!
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
হেই সুইটহার্ট গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৭
-
সমুদ্রকথন পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৮(ক+খ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯