Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৪


ওরামনেরগোপনচেনেনা

পর্ব সংখ্যা [১৪]

ঘুম কিছুটা হালকা হতেই কারো দৃঢ় বাহু বন্ধনে নিজেকে আবিষ্কার করে মৃত্তিকা। শক্ত-পোক্ত, দানবীয় দেহের মাঝে তার নাজুক, ছোট্ট দেহটা পিষে যাচ্ছে। শ্বাস নিতেও বেগ পেতে হচ্ছে। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে পুরুষালি দেহ, নড়বার সুযোগ নেই। এতটাই দৃঢ় তার বন্ধন, মৃত্তিকা শ্বাস ফেলার সুযোগটুকু পাচ্ছে না। দু হাতে মৃত্তিকাকে বুকের মাঝে মিশিয়ে নিয়েছে লোকটা, তার নিঃশ্বাস আছড়ে পরছে মৃত্তিকার মুখে। ধরফর করে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। আতঙ্কে শ্বাস ভারি হয়ে ওঠে। ছাড়া পেতে মরিয়া হয়ে পরে মৃত্তিকা। সর্বস্ব শক্তি খাটিয়ে দূরে ঠেলে দিতে চায় লোকটিকে, বাঁধনহারা করে নিতে চায় মেয়েলি কোমল দেহ। কিন্তু আফিমের সাথে সে জোর খাটিয়ে কোনোদিন কায়দা করে উঠতে পারেনি মৃত্তিকা। আজও পারে না মেয়েটি, ছটফট করে বারবার। ছাড়া পেতে ব্যাকুল হয়ে ধাক্কাতে থাকে, গলার কাছে গলিয়ে দেওয়া হাতটা ওঠাতে চায়।

মৃত্তিকার নড়চড়ে খানিক বিরক্ত হয় আফিম। ঘুম পাতলা হয়ে আসে। ঘুমুঘুমু কণ্ঠে সে বলে,
“- আহ্ মৃত্ত, সবে ঘুমিয়েছি”।

মৃত্তিকা রাগী কণ্ঠে বলে,
“- আপনি বলেছিলেন আপনি আমাকে ছোঁবেন না। এখন এসব কি করছেন, জড়িয়ে ধরেছেন কেন?, ছাড়ুন, আমি ব্যথা পাচ্ছি।”

আফিম একটু খানি হাসে ঘুমের মাঝেও। বলে,
“- তুমি আমাকে বিশ্বাস করে নিলে? ছ্যাহ্! আমার নিজের উপর নিজেরই বিশ্বাস নেই, আর তুমি আমাকে বিশ্বাস করে বসে আছো”।

মৃত্তিকা গর্জে ওঠে,
“- যারা কথা দিয়ে কথা রাখতে পারে না তাদের কি বলে জানেন? মিথ্যেবাদী”।

“- আরেকটু ঘুমোবো, তারপর তোমার রাগ দেখবো”।

“- আমি ঘুমবো না, ছাড়বেন আমায় নাকি চেঁচাবো? ঘুমোতে দেবো না কিন্তু”।

মৃত্তিকাকে ছেড়ে দেয় আফিম। মুক্ত হয়ে সাথে সাথে বিছানা ছেড়ে নেমে পরে মৃত্তিকা। গায়ের ওড়নাটা এখনও গলায় লেগে আছে। ওড়নাটা ঠিক করে সে দেয়াল ঘড়িতে চোখ বুলায় মৃত্তিকা। দশটা বেজে গেছে। মৃত্তিকার ফোনটা ইশার হাতে ছিল, আসার সময় আর নেওয়া হয়নি। খিদে পেয়েছে প্রচণ্ড। কিছু না খেলে মাথা কাজ করবে না। মৃত্তিকা ঘর ছেড়ে বের হয়। সিঁড়ির কাছে এসে নিচে উঁকি দিতেই আফিমের বাবাকে দেখতে পায়। তিনি খাবার টেবিলে বসে আছেন। মুখটা মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর। মেয়েটা ভড়কায় খুব। তড়িঘড়ি করে লুকোনোর চেষ্টা করতেই আশরাফ মির্জা দেখে ফেলে ওকে। স্তব্ধ বনে যায় বয়স্ক লোকটি। উঁচু কণ্ঠে ডাকে,

“- এইযে, তুমি এখানে, কখন এসেছো”?

মৃত্তিকা দেয়ালের আড়ালে লুকোতে চেয়েছিল। ধরা পরে গিয়ে ঘাবড়ে যায় মেয়েটা। মাথার ওড়না ভালো করে টেনে সিঁড়ি বেয়ে নামে। অস্বস্তিকর কণ্ঠে সালাম জানায় সে। উত্তর দেয়,

“- আমি কাল রাতে এসেছি”।

আশরাফ মির্জা বুঝতে পারেন না কিছুই। বলেন,
“- এ বাড়িতে কি করতে এসেছো? আফিমকে খুঁজতে? রাতে এসেছো, এখনো বাড়ি ফিরোনি”?

মৃত্তিকা কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ায়। কি করে বলবে সে তার ছেলের বউ। গ্রামবাসীরা জোর করে তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এ কথা বলাটা কতটা লজ্জাজনক তা কেবল মৃত্তিকাই বোঝে। আইঢাই করে সে বলে,

“- আসলে, গতকাল রাতে আমি আপনাদের এখানে আশ্রয় নিতে এসেছিলাম”।

কথার মাঝে সেসময় আফিমকে দেখা যায় সিঁড়ির কাছের সমান্তরাল অংশে। আফিমের হাতে টুথ ব্রাশ, চুলগুলো অগোছালো। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর সাদা প্যান্ট। পেশিবহুল শরীর উন্মুক্ত। নত হয় মৃত্তিকা। আফিম গ্রিলে দু হাত রেখে উঁকি দিয়ে বলে,

“- আমরা গতকাল বিয়ে করেছি”।

বিস্ফোরক ঘটে বৈঠকখানায়। হতভম্ব হয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলেন আশরাফ মির্জা। ধপ করে বসে পরেন ডাইনিং চেয়ারে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

“- আমি বুঝতে পারি না, তোমরা ভালো মেয়েগুলো কেন এরকম গুণ্ডাদের ফাঁদে জড়িয়ে যাও? পৃথিবীতে ভালো ছেলের কি এতই অভাব যে এই বেয়াদবটাকে বিয়ে করতে হবে”?

মৃত্তিকা অবাক চোখে তাকায়। বাবা হয়ে ছেলের নামে বদনাম করছে? এও হয় এই যুগে? মৃত্তিকা ভেবেছিল বিয়ের কথা শুনে আশরাফ মির্জা ছেলের হয়ে সাফাই গাইবেন।

বাবার কথা শুনে আফিম ভ্রু কুঁচকে হুংকার ছেড়ে বলে,
“- একদম আউলফাউল কথা বলবেন না। বিয়ে হয়েছে চব্বিশ ঘন্টা হয়নি, এরই মধ্যে ডিভোর্স করানোর ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছেন”।

“- মেয়েটার কপাল পুড়েছে তোমার মতো ছেলেকে বিয়ে করে”।

মৃত্তিকা দোনামনা করে বলে ওঠে,
“- আমি এ বিয়ে করতে চাইনি। বিশ্বাস করুন আঙ্কেল, আমার কোনো ইচ্ছে ছিল না আপনার ছেলেকে বিয়ে করার”।

আশরাফ মির্জা বললেন,
“- তোমার বাবা-মা জানে? তোমার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল”।

এ পর্যায়ে আফিম সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলে,
“- কট খেয়ে বিয়ে করেছি। আপনি বুঝবেন না”।

মৃত্তিকা বলে,
“- গ্রামবাসীরা ভুল বুঝে আমাদের ধরে-বেঁধে…

আর কিছু বলার রুচি হয় না মৃত্তিকার। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে মেয়েটার। চোখ ছলছল করে ওঠে। কতই না নোংরা কথা বলেছে ওরা, নোংরা চোখে দেখেছে মৃত্তিকাকে। এই তিক্ত ঘটনা কি কোনোদিন মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে মৃত্তিকা? আজীবন এর দাগ বয়ে বেড়াতে হবে না? বুকটা হাহাকার করে ওঠে মৃত্তিকার। চোখের পানি লুকাতে নত হয় সে। থুতনি চিবুকে পৌঁছায়। আশরাফ মির্জা রেগে তাকান ছেলের দিকে। জানতে চান সবকিছু। আফিম অনর্গল সত্য বলে দেয়। সবটা শুনে ভীষণ ব্যথিত হন আশরাফ মির্জা। তার ছেলেটা এত বেয়াদব যে একটা মেয়ের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। সব দোষ আফিমের। ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে গিয়ে মৃত্তিকাকে উত্যক্ত করতে কে বলেছিল? সহজ-সরল মেয়েটাকে আফিমের জন্য দুঃখ ভোগ করতে হচ্ছে, সবার সামনে ছোট হয়েছে মেয়েটা। ভাবতেই আফিমকে কষে চড় লাগাতে ইচ্ছে করছে আশরাফ মির্জার। সে অনুতাপ কণ্ঠে বলে,

“- শোনো মা, তুমি আমার ছেলের নামে থানায় কেস করতে পারো। আমি তোমার হয়ে ওর বিরুদ্ধে লড়বো।”

মৃত্তিকা তাচ্ছিল্য করে হাসে। জবাব দেয়,
“- এতে আমার কি কোনো লাভ হবে আঙ্কেল? যে কলঙ্ক লেগে গেছে, তা শুকিয়ে ঝরে গেলেও দাগ রেখে যাবে।”

আফিম এগিয়ে আসে মৃত্তিকার নিকট। মোলায়েম কণ্ঠে বলে,
“- মুছে দেবো গ্লানিবোধটুকু, রেখে দেবো তোমায়”।

আশরাফ মির্জা ছেলের দিকে চোখ পাকিয়ে মৃত্তিকাকে জিজ্ঞেস করেন,
“- কিছু খেয়েছো? ব্রেকফাস্ট করো, এসো”।

মৃত্তিকার পেটে খিদে থাকায় আর না করে না। তবে আশরাফ মির্জা তখনই বলে বসেন,
“- আমি তোমার জন্য পায়েস বানিয়ে আনছি। নতুন বউ, এ বাড়িতে প্রথম এসেছো, একটু মিষ্টি বানাতেই হয়”।

মৃত্তিকা ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“- লাগবে না আঙ্কেল, আপনি কষ্ট করবেন না”।

আফিম বলে,
“- খালা আছে, আপনি কেন যাচ্ছেন রান্নাঘরে”?

আশরাফ মির্জা বলে,
“- বেয়াদব, একটা কথাও তুমি বলবে না। আমার মেয়ের জন্য আমি যা খুশি করবো, তুমি কি খাবে তা ভাবো। একটা অপদার্থ জন্ম দিয়েছি”।

গালাগাল করতে করতে আশরাফ মির্জা চলে যান কিচেনে। আফিম ফিক করে হাসে। তাকে হাসতে দেখে গা জ্বলে যায় মৃত্তিকার। বাজখাঁই গলায় বলে,

“- লজ্জাও করে না বলুন? আঙ্কেল বকছে আর আপনি দাঁত বের করে হাসছেন? অভদ্র ব্যাটা”।


গত বিশ মিনিট ধরে আফিমের ঘরের এটাচ রুমের ওয়াশরুম দখল করে আছে মৃত্তিকা। অনলাইনে একটি শাড়ির অর্ডার করেছিল আফিম। একটু আগেই ডেলিভারি ম্যান এসে দিয়ে গেছে। মৃত্তিকা এখন গিয়েছে গোসল করতে। আফিম নিজেও গোসল করবে। এদিকে মৃত্তিকার বের হওয়ার নাম গন্ধ নেই। এতে বেজায় চটে যায় ছেলেটা। ওয়াশরুমের দরজায় কষাঘাত করে বলে,

“- মৃত্ত, ফ্রেশ হতে এত সময় লাগে”?

মৃত্তিকা উত্তর দেয় না। মিনিট দুয়েক বাদে খয়েরি রঙের সিল্কের শাড়িটি পড়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। তাকে দেখে থমকে তাকায় আফিম। ফর্সা শরীরে খয়েরি রঙের শাড়িটা দারুণ মানিয়েছে। একদম স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে মৃত্তিকাকে। তবে মৃত্তিকার মুখটা বড্ড ফ্যাকাসে, মলিন। চোখ, নাক আর গাল লাল হয়ে আছে। চোখ ফুলেও গেছে কিছুটা। আফিমের বুঝতে বাকি থাকে না। মেয়েটা যে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে তা সে ভালোই বুঝতে পারছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে হেসে বলে,

“- লুকিয়ে কান্নাকাটি করতে হবে কেন? তোমার কান্না দেখতে আমার ভালোই লাগে। আবার শুরু করো, আমি দেখবো”।

মাথায় বেঁধে রাখা টাওয়ালটা ঝট করে টেনে খোলে মৃত্তিকা। আশরাফ মির্জা চমৎকার একজন মানুষ। তিনি মৃত্তিকাকে বাড়ির বউ নয়, মেয়ের মতো আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। এমনকি নিজ হাতে পায়েস রান্না করে মৃত্তিকার মুখে তুলে দিয়েছেন। তাকে দেখে মৃত্তিকা আরো বেশি ভেঙে পরেছে। আতিকুর রাহমানের কথা খুব মনে পরছে। পায়েস খাওয়ার সময় না চাইতেও ওর চোখ বেয়ে রক্ত ঝরেছে। আফিম তাকে দেখে মজা লুটবে বুঝতে পেরে ওয়াশরুমের ট্যাপ ছেড়ে হাউমাউ করে কান্না করেছে মৃত্তিকা। এখন প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে, গলা দেবে গেছে, শরীরটাও ভালো লাগছে না।

আফিমের এহেন মশকরা শুনে দাঁতে দাঁত খিঁচে শক্ত কণ্ঠে মৃত্তিকা বলে,

“-, দুর্বলতা জেনে যারা মজা ওড়ায়, তাদের সামনে দুর্বল হতে নেই।”

আফিম নড়েচড়ে দাঁড়ায়। আলতো হেসে বলে,
“- আমি তোমার কান্না দেখবো বলেই তো এতদিন পিছু পিছু ঘুরলাম। এখন তুমি বলছো কাঁদবে না? ছ্যাঁহ্ মৃত্ত, তুমি প্রতারণা করলে আমার সাথে? এত বড় বেইমানি?”

বোকা বনে যায় মৃত্তিকা। তেজ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে,
“- ভালো হয়ে যান। নইলে আঙ্কেলকে বলে আপনাকে রিমান্ডে নেবার ব্যবস্থা করবো”।

আফিম সরে যায়। কাবার্ড থেকে কিছু একটা বের করে মৃত্তিকার দিকে ফিরে আসে। হাতে থাকা এক হাজার টাকার দুটো বান্ডিল মৃত্তিকার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে,

“- মোহরানা, দু লাখ করা হয়েছিল। এখানে এক লাখ আছে, বাকিটা ধীরে-সুস্থে দিয়ে দেবো”।

এতগুলো টাকা মৃত্তিকার হাতে দেয়ায় মৃত্তিকা চমকায় ভীষণ। অস্বস্তি হয় প্রচণ্ড। এই টাকা আফিম কোথায় পেয়েছে? নিশ্চয়ই আঙ্কেল দিয়েছে, আফিম তো কাজবাজ করে না। বন্ধুদের থেকে টাকা ধার করে সিগারেট খায়। এই লোক এত টাকা কিভাবে দেবে তাকে?

“- টাকা গুলো লাগবে না আমার। আঙ্কেলকে ফেরত দিয়ে আসুন’।

আফিম ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে
“- টাকা গুলো তোমার আঙ্কেলের না।”

“- যারই হোক, আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই”।

“- মাফ করে দিচ্ছো? মোহরানা পরিশোধ না করলে স্ত্রীকে ছোঁয়া যায় না।”

“- আমি চাই না আপনি আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করুন”।

মৃত্তিকা আফিমের কথা না শুনেই বেরিয়ে আসতে পা বাড়ায়। সহসা পা বাড়াতে নিতেই আটকে যায় তার দেহ। শাড়ির আঁচলে টান পরে মৃত্তিকার। থমকে যায় সে। আফিম শাড়ির আঁচল ধরে টানছে। এ বাড়িতে কোনো মেয়ে নেই বলে মেয়েলি সরঞ্জাম ও নেই। সেফটিপিন ছাড়াই গায়ে শাড়ি জড়িয়েছে মৃত্তিকা। কিন্তু আফিমের এই অসভ্যতায় আঁচল বুক থেকে সরে যাচ্ছে। যদিও আফিম সামনে নেই, দেখতে পাচ্ছে না তাকে। সে পেছন থেকে আঁচল টেনে নিজের হাতে পেঁচিয়ে নিচ্ছে। মৃত্তিকার গা বিরক্তিতে রি রি করে ওঠে। পিছু না ফিরে বলে,
“- আপনি বাড়াবাড়ি করছেন আফিম”।

আফিম মৃত্তিকাকে হেঁচকা টানে নিয়ে আসে কাছে। মৃত্তিকার ডান হাত চেপে ধরে অনামিকা আঙুল থেকে টেনে খুলে নেয় সোনার আংটি। আংটিটার দিকে নজর পরতেই মৃত্তিকার সাকিবের কথা মনে পরে। ছেলেটা দায়িত্ব নিয়ে আংটিটা পরিয়েছিল মৃত্তিকাকে। বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি করেছিল। কিন্তু মৃত্তিকা তার জমিয়ে রাখা আমানত রক্ষা করতে পারেনি। এই আংটির এখন আর কোনো মূল্যই নেই। আফিম আংটিটা ছুড়ে দেয় ফ্লোরে। মৃত্তিকা তেজ দেখিয়ে বলে,

“- আংটিটা ফেললেন কেন? ওটা ফেরত দিতে হবে আমাকে। হারিয়ে গেলে আংটিটা পাবো কোথায়”?

আফিম তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া মেলে অতিরিক্ত শান্ত কণ্ঠে বলে,
“- আংটিটা তোমার অনেক আগেই খুলে ফেলা উচিত ছিল মৃত্ত”।

“- মনে ছিল না এটার কথা”।

“- এরকম ভুল বারবার হলে আমি ক্ষমা করবো না মৃত্ত”।

শান্ত কণ্ঠে শাসিয়ে আফিম ওয়াশরুমে ঢুকে পরে। দরজা আটকানোর আগ মুহুর্তে বলে,
“- কাবার্ডের থার্ড ড্রয়ারে আংটি আছে, এখনই পড়বে। আমি এসে দেখবো”।

আয়মৃত্তিকা বোকা, অবুঝের ন্যায় কিছুক্ষণ চেয়ে রয় দরজার পানে। ধীর পায়ে ড্রয়ার টেনে খোলে। লাল রঙের ছোট্ট বক্সটার ফিতে খুলে, ঢাকনা উঁচু করতেই একটি আংটি দেখতে পায় মৃত্তিকা। সে কখনো সরাসরি হীরে দেখেনি। তবে আংটির ধারাল ভাব, চকচকে সাদা পাথরটা তার মস্তিষ্ককে জানান দেয় যে এটা হীরে। মৃত্তিকা তব্দা বনে যায়। আংটিটা পড়তে ইচ্ছে করছে না। হারিয়ে গেলে তখন কি হবে? তাছাড়া রাস্তাঘাটে দামী অলংকার পড়ে বের হওয়াও রিস্ক। মৃত্তিকা রেখে দেয় আংটিটা আগের জায়গায়। আয়নায় দাঁড়িয়ে লম্বা চুলগুলো আঁচড়ে নেয়। শাড়ির আঁচল উঠিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে দেখে নিজেকে। আজ নিজের বাড়িতে ফিরে যাবে মৃত্তিকা। সে জানে না ওখানকার আবহাওয়া কেমন, তাকে ঘিরে সবার মনোভাবই বা কি? জানতে হলে ও বাড়িতে যেতেই হবে। আশরাফ মির্জা মৃত্তিকার এ সিদ্ধান্তে সহমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন পরিবারের সাথে মৃত্তিকাকে একবার হলেও দেখা করতে। যদি ফিরতে মন সায় না দেয়, তবে মৃত্তিকা ওখানেই থাকতে পারবে। এতে তার কোনো আপত্তি নেই।

আফিমকে কিছুই জানানোর প্রয়োজন বোধ করে না মৃত্তিকা। ফ্লোর থেকে সাকিবের দেয়া আংটিটা তুলে নেয় সে। আশরাফ মির্জা তার গাড়িতে করে মৃত্তিকাকে পাঠান। ড্রাইভার ঠিক ভাবেই তার দায়িত্ব পালন করে মৃত্তিকাকে পৌঁছে দেয়। সময়টা দুপুর। বিকেল হতে দেরি নেই খুব একটা। এ সময় আতিকুর রহমান ও বাড়িতে থাকে। মৃত্তিকা গাড়ি থেকে নামতেই প্রতিবেশীরা অদ্ভুত চোখে দেখে ওকে। হয়তো বিদ্রুপ করে মনে মনে, হাসে মৃত্তিকার করুণ পরিণতি দেখে। একজন তো কাছে এসে বলেই বসে,

“- এত ভালো মেয়ে তুমি, শেষে একটা মাস্তানের সাথে বিয়ে বসলে? বাপের টাকায় ফুটানি করা ছেলেরা জীবনেও শোধরায় না।”

মৃত্তিকা শোনে, বলে না কিছুই। আগে পরিবারকে সামলাতে হবে। তার পরে নাহয় প্রতিবেশীদের কথার জবাব দেবে। মৃত্তিকা সিঁড়ি বেয়ে দু তলায় উঠে খুব আতঙ্কিত হয়ে কলিং বেল চাপে। প্রথম বারেই দরজা খুলে দেয় মৃত্তিকার ভাবি জাহানারা। মৃত্তিকাকে দেখে চেঁচিয়ে জাহানারা ডাকে সবাইকে। বলে,,

“- এইযে, আপনাদের মেয়ে ঘরে ফিরেছে”।

জাহানারা সরে দাঁড়ায় দরজা থেকে। মৃত্তিকা ভীতু চোখে তাকায়। মৃত্তিকার বাবা-মা উভয়েই উপস্থিত হয় সেখানে। মেহমেতকে দেখে আরো বেশি ভয় চেপে ধরে মৃত্তিকাকে। নত হয়ে পরে সে। মৃত্তিকার বাবা খুব গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,

“- না আসলেও তো পারতে”।

মৃত্তিকা মাথা উঁচু করে বাবার কথায়। চট করে এক ফোটা পানি গালে লেগে মেঝেতে পরে যায়। কাজল লেপ্টে যায় মৃত্তিকার। জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে সে বলে,

“- তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে?”

মেহমেত গর্জে ওঠে। বলে,
“- তোর জন্য সাকিবের বাবা-মা আমাদের কথা শুনিয়ে গেছে, অপমান করে গেছে। তুই এরকম ভাবে আমাদের সম্মান নষ্ট করবি যদি জানতাম, তোকে বোন হিসেবেই পরিচয় দিতাম না”।

তার সাথে তাল মিলিয়ে জাহানারা বলে,
“- শুধু তোমরা অপমানিত হওনি। আমার মা-বাবাও অপমানিত হয়েছে। গ্রামের সবাই আমাদের চেনে। সবাই বলে বেড়াচ্ছে জাহানারার ননদ কুকর্ম করতে গিয়ে ধরা পরেছে”।

মৃত্তিকার গা গুলিয়ে আসে কথাগুলো শুনে। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায় মেয়েটার। বুক, পিঠ জ্বলে ওঠে আচমকা। হু হু করে কেঁপে ওঠে বুক। নাক টেনে মৃত্তিকা বলে ওঠে,

“- তোমরা আমাকে বিশ্বাস করছো না? ও মা, তুমিও আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না? আমি কি অমন মেয়ে বলো? তোমার কি তাই মনে হয়”?

জাহানারা বলে ওঠে,
“- তুমি কেমন মেয়ে তা কারো বুঝতে বাকি নেই। ইয়াসিনের সাথে প্রেম করলে দুই বছর, আবার দুদিনের প্রেমে ধরা পরে বিয়ে করে ফেললে। এগুলোকে ভালোবাসা বলে?”

জাহানারার কথা বলার ভঙ্গি খুবই কুৎসিত। তার নোংরা অপবাদ শুনে মৃত্তিকার গা শিউড়ে ওঠে। ঘন নেত্রপল্লব চুইয়ে নোনা পানি গড়ায়। মৃত্তিকার বাবা গর্জে উঠে মেহমেতকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“- জাহানারাকে থামতে বলো মেহমেত। আমার সামনে আমার মেয়েকে অপমান করবে, আমি কিন্তু চুপ করে সব শুনবো না”।

মেহমেত বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
“- জাহান তো ঠিকই বলছে। পাড়ায় ওদের মান সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেছে। সবাই কত কথা বলছে জানো তুমি?”

মৃত্তিকার মা বলে ওঠে,
“- আমার মেয়ে ভালো হলেও আমার, খারাপ হলেও আমারই। যা বলার আমরা বলবো, তুমি একটা কথাও বলবে না জাহানারা”।

জাহানারা হিংস্র কণ্ঠে বলে,
“- কেন? গায়ে লাগছে? আমি বারবার বলেছি মৃত্তিকাকে বিয়ে দিন, আপনারা দেননি। একুশ বছরের মেয়েকে ঘরে রেখে পড়াশোনা করাচ্ছেন এই দিনটা দেখবেন বলে”?

মৃত্তিকা ঢুকড়ে কেঁদে ওঠে। মৃত্তিকার মা মৃত্তিকাকে নিয়ে যায় ঘরে। এতটুকুতে মৃত্তিকা শান্তি পায় যে অন্তত তার মা-বাবা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তারা রেগে আছে মৃত্তিকার উপর, কিন্তু মৃত্তিকাকে তারা একা করে দিচ্ছে না। কিছুটা হলেও মৃত্তিকার উপর তাদের মায়া আছে।


খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে মৃত্তিকা। মৃত্তিকার বাবা সামনের পুরোনো সোফায় বসে আছে। খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে মৃত্তিকার বাবাকে। তিনি কিছুতেই এসব মেনে নিতে পারছেন না। ওই রকম একটা ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছে, এটা ভাবতেই বুক ভার হয়ে আসছে। আফিম বড়লোক বাড়ির বিগড়ে যাওয়া ছেলে। বেকার, ভবঘুরে মাস্তান সে। সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া আর সিগারেট খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই ছেলেটার। আফিমের বন্ধুদের জন্য মেয়েরা রাস্তায় বের হতে ভয় পায়। সারাদিন মারামারি, গ্যাঞ্জাম করাই ওদের কাজ। এই ধরণের ছেলেরা কোনোদিন শোধরায় না। নেশা ছাড়তে পারে না এরা, মাস্তানি থামাতে পারে না। এদের জীবন চলে যায় বাইকের নিচে পিষে।

মৃত্তিকা ভালো মেয়ে। কোনোদিন ঝামেলায় জড়ায়নি মেয়েটা, স্কুল-কলেজ থেকে কখনো কোনো বিচার ও আসেনি। মেয়েটা ভীতু হলেও স্বাধীনচেতা, স্বনির্ভরশীল। মৃত্তিকা নিজে আয় করে। সেখানে তার স্বামী ঘুরে বেড়াবে, মাস্তানি করবে এসব কি আদৌ মেনে নেয়া যায়? সমাজ কি বলবে? বউ কাজ করে বর সিগারেট ফুঁকে, ঘুরে বেড়ায়? এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কি হতে পারে? দেখা যাবে মৃত্তিকার রোজগারের টাকা দিয়ে জুয়া খেলবে, মদ খেয়ে বেড়াবে। নেশা যারা করে তাদের হুঁশ থাকে না। মৃত্তিকার গায়ে যদি হাত তুলে বসে?, কোথায় গিয়ে বিচার চাইবে? আফিমদের ধারের কাছেও তারা নেই।

আতিকুর রহমান অনেক ভেবে বলে,
“- তুমি ছল করে হলেও সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে এসো। তালাকনামার ব্যবস্থা আমি করবো”

মৃত্তিকা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় বাবার দিকে। আঁতকে ওঠে মৃত্তিকার মা। জোর খাটিয়ে বলে,

“- এসব কি বলো? বিয়ে হয়েছে একদিন, এখনই তালাকের কথা বলছো? বাপ হয়ে মেয়ের সংসার ভাঙবে”?

আতিকুর রহমান গর্জে ওঠে বলেন,
“- কি বলবো আমি? ওই মাতালের সাথে সংসার করতে বলবো? কাজ করে না, সারাদিন মারপিট করে। কবে কোথায় মরে পড়ে থাকবে, আমার মেয়ের কি হবে? মেয়ে আমার কাজ করবে, ওই ছেলে ঘরে বসে মেয়ের গায়ে হাত তুলবে। এটাই চাও তুমি”?

“- আগে কয়েকদিন দেখবে তো, ছেলেটা যদি মৃত্তিকাকে ভালোবাসে? বিয়ের প্রস্তাব তো ওরা এনেছিল। খারাপ হলে কি প্রস্তাব নিয়ে আসতো”?

“- আমার মেয়ে খাটি সোনা, আমি ওর জীবন শেষ হতে দেবো না”।

মৃত্তিকা ঢুকড়ে কেঁদে ওঠে। বলে,
“- আমি কি করবো আম্মু? উনি কেন গোপালগঞ্জে গেলেন আমাকে খুঁজতে? সবাই ভুল বুঝে আমাদের জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে”।

মৃত্তিকার বাবা ঘর ছেড়ে যেতেই মৃত্তিকার মা বলে,
“- মৃত্তি, বিয়ে ভাঙা অত সহজ নয় রে মা। বিয়ে ভাঙা যে বড় পাপ। তোর বাবার কথা শুনিস না। তুই যার ঘরেই যাবি, সেই ঘরই আলোকিত করে রাখতে পারবি।”

মৃত্তিকা দুর্বল দেহ টেনে নিয়ে যায় রান্নাঘরে। জাহানারা রান্না করছে। ইরহাম মৃত্তিকাকে দেখে ছুটে আসে। ছেলেটা জড়িয়ে ধরে মৃত্তিকাকে। মনি মনি বলে কান্না জুড়ে দেয়। আলতো কণ্ঠে বলে,
“- তুমি কোথায় যাও মনি? আমি তোমাকে এত্ত মিস করছি”।

মৃত্তিকা হাসে। ছেলেটার গাল দুটো টেনে তার গালে গাল ঘষে বলে,
“- আমিও তোকে খুব মিস করেছি”।

ইরহামকে নিয়ে সোফায় গা গলিয়ে দিতেই কলিংবেলের কর্কশ আওয়াজে উঠে পরে মৃত্তিকা। বাবা বাড়ি নেই, দোকানে গেছেন। আবার ফিরে এসেছে ভেবে দরজা খুলতেই দরজার ওপ্রান্তে আফিমকে দেখতে পায় সে। ছলকে ওঠে হৃদয়। রাগে দরজা আটকে দেয়ার আগেই ছেলেটা ঢুকে পরে ভেতরে। ক্রুদ্ধ হয়ে বলে,
“- তুমি আমায় না জানিয়ে চলে এসেছো কেন? “

মৃত্তিকা ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দেয়,
“- আমি আপনার সাথে থাকবো না। যে সম্পর্কে কোনো মতের মিল নেই, ভালোবাসা নেই সেই সম্পর্ককে টেনে-হিচড়ে দীর্ঘ করার প্রয়োজন ও নেই”।

আফিম কিছু বলতে নিলেই জাহানার এগিয়ে এসে আফিমকে দেখে মুখ বাঁকা করে চলে যায়। মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস টেনে বলে,
“- আপনি চলে যান। আব্বু আপনাকে দেখলে রাগারাগি করবে”।

হাসে আফিম চঞ্চল কণ্ঠে বলে,
“- আমার সাথে রাগ করলে তোমার কি মৃত্ত? আমাকে কেউ বকলে তোমার খারাপ লাগবে”?

আফিমের পরনে আয়রন করা সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। ফোলা বুক, বাহুতে শার্ট এঁটে আছে ফিটফাট হয়ে। হাতের ঘড়িটি বেশ চকচকে, চুলগুলো সেট করে রাখা। রাস্তাঘাটে আফিম এত ফিটফাট হয়ে, শার্ট ইন করে ভদ্রলোক সেজে থাকে না। কোনোরকমে কুঁচকানো শার্ট, প্যান্ট পড়ে চলে আসে। চুলগুলো কাকের বাসা হয়ে থাকে। অথচ এই আফিমের সৌন্দর্য কতটা নিখুঁত, তা যদি সে জানতো।

মৃত্তিকা আফিমের চোখের দিকে তাকাতেই ভড়কে যায়। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে শুধোয়,
“- আপনার চোখের মণি কালো কেন? রঙ কি করে বদলে গেল”?

আফিম মৃত্তিকাদের সোফায় বসে গা এলিয়ে দেয়। বলে,
“- লেন্স লাগিয়েছি মৃত্ত, সবাই অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে।”

মৃত্তিকা বুঝতে পেরে মাথা নাড়ায়। বলে,
“- এখন চলে যান”।

“- তোমাকে না নিয়ে যাচ্ছি না”।

“- আমি যাবো না”।

“- সমস্যা নেই, আমি ঘরজামাই হতে রাজি”।

রেগে ওঠে মৃত্তিকা। বলে,
“- আমার মেজাজ খারাপ করবেন না। ভাইয়া ঘরে আছে। আপনি এসেছেন জানলে কথা শোনাবে আমায়”।

আফিম হাত দিয়ে সোফায় থাপ্পড় মেড়ে চট করে উঠে দাঁড়ায়। মৃত্তিকার দিকে তেড়ে এসে রাগী কণ্ঠে বলে,
“- আমি তোমায় আংটি পড়তে বলেছিলাম মৃত্ত। তুমি শোনোনি আমার কথা। বিয়ে করা বউ তুমি আমার। তোমাকে দেখে কেন বোঝা যাচ্ছে না তুমি বিবাহিত”?

“- আপনাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে? সব নিয়মনীতি কেন মেয়েদেরকেই মানতে হবে? আপনার ঘরে বউ আছে সেটা কি বোঝা যাচ্ছে”?

আফিম তীক্ষ্ণ নজরে দেখে মৃত্তিকাকে। তার তাকানোর ভঙ্গি দেখে মৃত্তিকা ভয় পায় খানিক। আফিম আশেপাশে শান্ত চোখে তাকিয়ে সহসা এগিয়ে আসে সে। ভড়কে যায় মৃত্তিকা। দু পা পেছাতেই তাকে আগলে ধরে আফিম। মেয়েটার কোমর পেঁচিয়ে বলে,

“- চুমু খাই মৃত্ত? একবার”?

চোখ বড় বড় করে ফেলে মৃত্তিকা। সতর্ক হয়ে আশপাশ দেখে। আফিমের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে,
“- আপনি বলেছিলেন আপনি আমায় জোর করবেন না”।

আফিম মৃত্তিকার গালে নিজের গাল ছোঁয়ায়। তাতে কেঁপে ওঠে মৃত্তিকা। মসৃণ ত্বকে অন্য মুখের ছোঁয়া লাগতেই নড়েচড়ে ওঠে সে। আফিম ফিচেল হেসে বলে,

“- ভালোবেসে কেউ কিছু দিলে তা নিতে হয়, জানো না”?

বজ্রপাত ঘটে মৃত্তিকার হৃদয়ে। আফিম সরে আসে। ছেড়ে দেয় কোমল দেহখানা। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে সেই আংটিটা। মৃত্তিকার হাত ধরে খুব যত্ন করে পরিয়ে দেয় আঙুলে। মৃত্তিকা আংটির দিকে চেয়ে থেকে বলে,

“- আপনি কেন বোঝেন না, এ সম্পর্ক স্থায়ী হবার নয়”।

আফিম আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে,
“- তুই থেকে যা মৃত্ত, তোকে ভালোবেসে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার”।

মৃত্তিকার দেহ-মন পুলকিত হয় আফিমের মোহগ্রস্ত কণ্ঠে। থেমে যায় বিস্ফোরণ।
মেহমেতকে আসতে দেখে থামে আফিম। দু পকেটে হাত গুঁজে নেয়। মেহমেত এসেই আফিমকে দেখে রেগে আগুন হয়ে ওঠে। হুংকার ছেড়ে বলে,
“- এ বাড়ি থেকে এখনই বের হও, গুণ্ডা, মাস্তান এ বাড়িতে পা রাখে কিভাবে? তুমি আমার বোনকে ডিভোর্স দেবে আজকের মধ্যেই”।

আফিম ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্রূর হেসে বলে,
“- এ জন্মে আপনার বোনকে ছাড়ছি না”।

মেহমেত রেগে মৃত্তিকাকে বলে,
“- তুই কার সাথে থাকবি ভেবে বল মৃত্তিকা। আর ওর সাথে গেলে এ বাড়িতে কোনোদিন তোর জায়গা হবে না।”

মৃত্তিকা অস্থির হয়ে ওঠে। বলে,
“- এরকম করে বলছো কেন ভাইয়া?”

“- তোর জন্য আমরা অনেক অপমানিত হয়েছি। আর কত বলতো? আমাদের একটু সুখে থাকতে দে”।

মৃত্তিকা স্তব্ধ হয়ে তাকায় ভাইয়ের দিকে। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে মুখে। মেহমেত ফের জিজ্ঞেস করে,

“- এখানে থাকবি মৃত্তিকা। কাল আমরা উকিলের কাছে যাবো।”

মৃত্তিকা আলস্য, বিপর্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“- আমি চলে যাবো ভাইয়া। আমি মন দিয়ে সংসার করবো। আমার কপালে যা আছে, তাই হবে। তোমাদের কারো ঘাড়ে আমি বোঝা হয়ে থাকবো না ভাইয়া। আমি তোমাদের শান্তি দেবো।”

আফিমের দিকে ফিরে সে পুনরায় বলে ওঠে,
“- আমি আপনার সাথে যাবো। আমার খুব অস্থির অস্থির লাগছে আফিম। বুক জ্বলছে, নিঃশ্বাস আটকে আসছে। দয়া করে আমাকে নিয়ে চলুন।”

বলতে দেরি হলো, এক হাতে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিতে আফিম দেরি করল না মোটেও। চট করে মেয়েটাকে পাজোকোলে তুলে নিল দক্ষ হাতে। দরজা দিয়ে বের হতে হতে তীক্ষ্ণ স্বরে মেহমেতের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

“- শুধু শুধু সময় নষ্ট করে বিয়েটা ভাঙার চেষ্টা করবেন না। আমি আফিম সম্পর্কের পরোয়া করি না। আপনার পা ভেঙে দিতে আমার একটুও কষ্ট হবে না”।

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

[নোটঃ রি-চেইক দিইনি। কাল আরেকটা পর্ব আসবে। রেসপন্স করবেন একটু]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply