ওরা মনের গোপন চেনে না
পর্ব সংখ্যা [৩০] [ সত্য প্রকাশ]
[ মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত ]
এদিকটা খানিক গ্রামের মতোই। পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ আসছে। মোরগ ডেকে যাচ্ছে। একটি নির্ঘুম রাত কেটেছে সবার। মৃত বাড়িটা ভীষণ ভয়ঙ্কর লাগছে। গুনগুন করে কান্নার আওয়াজ রাতে আরো ভয়ানক শোনায়। আফিম ঘুমায়নি। সে বিড়াল ছানার ন্যায় পেটে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। চোখ, মুখ মলিন দেখাচ্ছে তার। সকালের স্বচ্ছ আলো মুখে এসে পড়তেই আফিম বলে,
“- কয়েক বছর আগেই আমি মাম্মার খোঁজ পেয়েছি। কিন্তু কখনো তার সামনে যাইনি আমি। কখনো তাকে দেখার ইচ্ছেও জাগেনি। ঘৃণা হতো, রাগ হতো। এখন কেন সেই রাগ, ঘৃনা আমার চোখের পানিকে অবরুদ্ধ করতে পারছে না মৃত্ত”?
মৃত্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“- কারণ মানুষটা আর নেই। আপনার রাগ, ঘৃণা সব নিয়ে পালিয়েছে”।
“- শেষবেলায় তিনি অনুতপ্ত ছিলেন মৃত্ত”।
“- কিভাবে বুঝলেন”?
“- লিজা মাস ছয়েক আগে আমার সাথে দেখা করে নিজের পরিচয় জানায়। লিজা আমার সৎ বোন। ওকে দেখার পর আমি কোনো প্রকার সিমপ্যাথি দেখাইনি। বরং ওকে আমি টোটালি ইগনোর করে, রাগ দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। দলের একজনের কাছ থেকে লিজা আমার নম্বর জোগাড় করেছিল। বারবার আমাকে ফোন করে বলতো মাম্মা অনুতপ্ত। বেশিদিন বাঁচবেন না, অসুস্থ থাকছেন সবসময়। অনুতাপে পুড়তে পুড়তে শেষ হয়ে যাচ্ছেন তিনি। লজ্জায় আমার সাথে দেখাও করতে পারেননা। লিজা জানায় শেষবেলায় এসে তিনি আমাকে নিজের পাশে চান। সব শুনেও আমি তার প্রতি আগ্রহ দেখাইনি মৃত্ত, তার ডাক শুনিনি। লিজা প্রায়ই ফোন করে আমার খবর জানতে চাইতো। আমি বুঝতাম, ফোনটা লিজা করেনি, করেছেন উনি। আমার খোঁজ নিতে উনি লিজাকে ব্যবহার করেছেন। আমিও বারবার লিজাকে রাগ দেখিয়েছি। বোন বলে কোনোরকম মায়া দেখাইনি। মাম্মাকে যেখানে আমি ঘৃণা করি, সেখানে তার মেয়ের প্রতি কিভাবে আমার মায়া কাজ করবে? আমি লিজাকে অপমান করেছি বারবার, তবুও ও আমাকে ভাই বলে ডেকেছে। আমি এসবের জন্য অনুতপ্ত নই, এখনো আমি লিজাকে ভালোভাবে দেখছি না। আমি মাম্মাকেও ক্ষমা করবো না। যেই সময়টায় শিশুরা মায়ের আঁচলের নিচে বড় হয়, আমি সেসময় একা থেকেছি। বাবাকে নিঃশব্দে কাঁদতে দেখেছি। এসব কি মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব? আমি মাম্মাকে নিজের চোখে অন্য কারো সাথে ঘনিষ্ঠ হতে দেখেছি। ওই ঘটনা গুলে আমি কখখনো ভুলবো না। আমার তার প্রতি মায়া কাজ করে না। কিন্তু আজ চোখ অবাধ্য হচ্ছে”।
মৃত্তিকা আফিমের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কেঁপে ওঠে। মানুষটার মনে তবে যন্ত্রণারা বাসা বেঁধেছে? একটুও টের পেতে দেয় না কাউকে। বাইরে থেকে মনে হয় মানুষটা শক্ত, জটিল অথচ ভেতরটা সহজ। মৃত্তিকা বলে,
“- বাবাকে জানালেন না”?
“- না, কষ্ট পাবে। কয়েক দিন যাক, জানাবো”।
“- আজ থাকবেন এখানে”?
“- উঁহু, একটু পরই চলে যাবো”।
আফিম সত্যিই কোনো পিছুটান না রেখে কিছুক্ষণ পরই বেরিয়ে এলো। কাউকে বলল না তার চলে যাবার কথা। যেভাবে নিজে থেকে এসেছিল, সেভাবেই মৃত্তিকাকে নিয়ে ফিরল। এ ঘটনার পর গত দুদিন ধরে আফিম খুব চুপচাপ। তেমন একটা কথা বলছে না কারো সাথে। বাড়িতেও থাকছে না বেশিক্ষণ। মৃত্তিকা কাজে ফিরেছে। স্টুডেন্টদের পড়াশোনা নিয়ে সেও ব্যস্ত। তবুও আফিমকে ছাড়া তার ভালো লাগে না। সর্বক্ষণ আফিমই তার মাথায় ঘুরপাক খায়। কিছুক্ষণ আগেই আফিম মৃত্তিকাকে স্টুডেন্টের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে। মাত্র তেইশ মিনিট হয়েছে সে বাচ্চা পড়াচ্ছে। এর মধ্যেই তার অস্থির অস্থির লাগছে। আফিমকে এই মুহুর্তে দেখতে ইচ্ছে করছে মৃত্তিকার। মানুষটাকে না দেখলে হাঁসফাৃস লাগে, চোখ আরাম পায় না।
মৃত্তিকা শরীর খারাপের বাহানা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তার কাছে ফোন নেই। ঠিক সময়ে আফিম চলে আসবে বলেছে, ফোন দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। মৃত্তিকা এগিয়ে একটু সামনে যেতেই আফিমের দলের ছেলেপেলেদের দেখতে পায়। মৃত্তিকা তাদের কাছে যাওয়ার আগে ওরাই ছুটে আসে। ওরা লম্বা সালাম জানায় বিনয়ে সুরে। একটা ছেলে বলে,
“- ভাবি? কোথায় যাচ্ছেন? গাড়ি ঠিক করে দিবো”?
মৃত্তিকা মৃদু হেসে বলে,
“- লাগবে না ভাইয়া”।
আরেকটি ছেলে বলে,
“- ভাবি কিছু খাবেন? এনে দিই”?
মৃত্তিকা তাদের আচরণে বিব্রত হয়। ওরা মৃত্তিকাকে দেখলে এভাবেই এগিয়ে আসে, সালাম দেয়, ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে। তখন মৃত্তিকার মনে হয় সে কোনো ভিআইপির বউ। ওরা খুবই সম্মান প্রদর্শন করে, উপকার করতে চায়। আফিমদের দেখলেও ওরা বিরাট সালাম দেয়, ভাই বলে সম্বোধন করে। ওরা আফিমকে প্রচণ্ড ভালোবাসে, বিশ্বাস করে এবং ভাই মানে। কোনো সমস্যায় পড়লেই আফিমকে ডাকে ওরা। ওদের কাছে আফিমই সব। তাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলতে পারে না। বললেই শত শত ছেলেপেলে খাবলে ধরে।
মৃত্তিকা বলে,
“- আমার কিছু লাগবে না, আপনারা ব্যতিব্যস্ত হবেন না। আপনাদের ভাইকে একটু কল করবেন? আমার কাছে ফোন নেই।”
সাথে সাথে একটি ছেলে আফিমকে কল দেয়। আফিম কল তোলে। নতুন একটা কেসের ডকুমেন্ট পৌঁছে দেবার কথা আগামীকাল। তা নিয়েই একটু দৌড়ঝাঁপ চলছে। মৃত্তিকাকে পৌঁছে দিয়ে দোকানে ঢুকেছে। গরম ধোঁয়া ওঠা চা এক হাতে তুলে বেঞ্চে বসেছে। এরই মাঝে দলের ছোট ভাইয়ের কল আসে।
“- বল”?
“- ভাই, ভাবি আমাদের সামনে। আপনার সাথে কথা বলবে”।
আফিম চিন্তায় পরে যায়। মেয়েটাকে মাত্র রেখে আসল। রাস্তায় কি করছে? কিছু হলো নাকি? ছেলেটা মৃত্তিকার দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয়। মৃত্তিকা ফোন কানে চেপে জিজ্ঞেস করে,
“- আফিম, কোথায় আছেন আপনি”?
আফিম তৎক্ষনাৎ কাঁধ দিয়ে কানে ফোন আটকে চায়ের বিল মিটিয়ে ওয়ালেট প্যান্টের পকেটে রাখতে রাখতে উত্তেজিত হয়ে উত্তর দেয়,
“- তুমি কোথায় আছো? কি হয়েছে তোমার? এত চালু বেরিয়ে পড়েছো? লোকেশন জানাও আমাকে”।
আফিম অধৈর্য্য ভঙ্গিতে বলে যায়। বলতে বলতে পা বাড়িয়ে দোকান থেকে দ্রুত বাইকের কাছেও ছুটে আসে। মৃত্তিকা ঠিকানা জানালেই সে চলে যাবে। মৃত্তিকা বুঝতে পারে লোকটার চিন্তিত স্বর। তাকে শান্ত করতে বলে,
“- কিছু হয়নি। আপনি স্ট্যান্ডের কাছে আসুন, আমি ওখানেই আছি। তাড়াতাড়ি আসবেন প্লিজ”।
“- শরীর খারাপ করছে তোমার? কণ্ঠ এমন লাগছে কেন”?
মৃত্তিকা অবুঝের ন্যায় বলে,
“- হু, আমার ভালো লাগছে না। আপনি আসুন”।
মৃত্তিকা কল কাটে। ফোনটা ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খানিক হেঁটে স্ট্যান্ডের দিকে আসে। অপেক্ষা করে আফিমের জন্য। দু মিনিট পরই আফিম আসে চলন্ত বাইক ছুটিয়ে। মৃত্তিকার কাছে এসে ব্রেক কষে। তাকে দেখে মৃত্তিকার মলিন মুখটায় হাসি ফেরে। আফিম বাইক থেকে নেমে কাছে এসে দুশ্চিন্তা গ্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“- কি হয়েছে? ফোন করেছিলে। আর পড়াবে না, শরীর খারাপ লাগছে?’
মৃত্তিকা উত্তর দেয় না। চেয়ে রয় আফিমের মুখ পানে। তার মুগ্ধ চাহনি হৃদয় কাঁপিয়ে তোলে আফিমের। মৃত্তিকা কম্পিত সুরে বলে,
“- কিছু হয়নি৷ আপনাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে দেখি না। খুব হাঁসফাঁস লাগছিল।”
মৃত্তিকার সরল কথাগুলোয় তব্দা খেল আফিম। মেয়েটার ভাবভঙ্গি বোঝা দায়। এইতো আধঘন্টা আগেই মৃত্তিকার সাথে দেখা হলো। এরই মাঝে মেয়েটা তাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠেছে? তার চোখ জোড়াই বলে দিচ্ছে আফিমকে দেখতে না পেরে তারা কতটা বিষন্ন, কতটা অস্পষ্ট।
মৃত্তিকা পুনরায় বলে ওঠে,
“- আপনি একটু নিচু হন না। ভালোভাবে দেখতে পারছি না। আপনাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, চোখ সরাতে ইচ্ছে করছে না”।
সরল আবদারে আফিমের ললাটের ভাঁজ দৃঢ় হলো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল ছেলেটা। মৃত্তিকার পেলব গালে আঙুল বলল,
“- কোনো কিছু নিয়ে ভয় পেয়েছো তুমি”?
মৃত্তিকা কেঁদে দেবে এমন অবস্থা। আফিমের এত এত প্রশ্ন তার পছন্দ হচ্ছে না। তার নড়াচড়ার দরুন ঠিক করে দেখতেও পাচ্ছে না ভালো করে। আফিমের পরনে আজ কালো শার্ট আর কালো প্যান্ট। ফর্সা গায়ে কালো রঙটা খুব মানাচ্ছে। অবিন্যস্ত চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে। প্রেমে পড়ার মতো সুন্দর দেখাচ্ছে ছেলেটাকে। মৃত্তিকার চোখ আরাম খুঁজে পায়। তৃপ্ত হয় তারা। মৃত্তিকা উত্তেজিত, অস্থির সুরে বলে,
“- আপনাকে এক মুহুর্ত না দেখলে আমার অস্থির লাগে। এইযে কিছুক্ষণ কাছে ছিলেন না, আমি এক মুহুর্তের জন্য স্থির হতে পারিনি”।
আফিম আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে মৃত্তিকাকে। আকাশি রঙের কামিজের সাথে সাদা সালোয়ার আর ওড়না পড়েছে। শুভ্র পরী মনে হচ্ছে সামনের মেয়েটিকে। তার বলার ভঙ্গি খুব সরল। আফিম বুঝতে পারে মৃত্তিকা তাকে নিয়ে চিন্তিত। মায়ের মৃত্যুর পর সন্তানের দিন কেমন যেতে পারে তা মৃত্তিকা জানে। সে হয়তো ভাবছে আফিম কষ্টে আছে। আর সেজন্যই এত দুশ্চিন্তা করছে। আফিম ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“- আমি ঠিক আছি তো বোকা। এত চিন্তা করছো কেন”?
মৃত্তিকা সাথে সাথে জবাব দেয়,
“- কিন্তু আমি ঠিক নেই। আমার সত্যিই অস্থির অস্থির লাগে আপনাকে না দেখলে। পড়াতে পারছি না আমি, মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখতে পারছি না। আপনাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট ছটফট করছে”।
মৃত্তিকার কথাগুলো বাচ্চাদের মতোই শোনাল। সদ্য প্রেমে পড়লে বুঝি মানুষ এভাবে বদলায়? তখন বুঝি স্থান, কাল সবকিছুর উর্ধ্বে ভালোবাসার মানুষটি স্থান পায়? নব্য প্রেমে পড়া মানুষগুলোর কোনোকিছুতেই মন বসে না, ভালো লাগে না কোনোকিছু। কেবল প্রিয় মানুষকে নিয়েই ভাবতে ইচ্ছে করে। সকল প্রয়োজনীয়তা হার মানে। মৃত্তিকাকে দেখে মনে হচ্ছে সে টিনেজ। তার আচরণ এখন তেমনই লাগছে। প্রেমে পড়ে অবুঝ হয়ে গেছে মেয়েটা, পাগলামো করছে। বদলে গেছে তার ব্যক্তিত্ব। আফিম ছাড়া সে আর কিছুই বোঝে না। তার মন মস্তিষ্কে সর্বদা আফিমের বিচরণ চলে।
আফিম বলে,
“-, বসো, যাবে না”?
মৃত্তিকা চোখ সরায় না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে,
“- দেখতে দিন আপনাকে। আমার হৃদয়কে শান্ত হতে দিন”।
আফিম হাসল নিঃশব্দে। তার হাসার ধরণ দেখেও মৃত্তিকা চোখ ফেরাল না। তার কোনো তাড়া নেই বাড়ি ফেরার। মুগ্ধ চোখ জোড়া অপলক মানুষটির মুখে নজর বুলায়। সহসা মৃত্তিকা একটি আবদার করে বসে। বলে,
“- আপনার বুকে মাথা রাখি”?
আফিম হতভম্ব। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মৃত্তিকার এমন আবদার তার কাছে খুবই অন্যরকম ঠেকল। বলল,
“- এখনই”?
“- এই মুহুর্তে”।
বিপরীতে চটপটে কণ্ঠে উত্তর দিল মৃত্তিকা। লাজ, লজ্জা ভুলে বসল সে। কোনো কিছুই তার অনুভুতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে আফিমের বুকে মাথা না রাখলে সে শ্বাস আটকে মারা যাবে। আফিম বুক উজার করে দিল। মৃত্তিকা দিশা হারিয়ে মুখ থুবড়ে পরল মানুষটির বুকে। বুকে মুখ গুঁজে ডাকল,
“- আফিম”।
আফিম প্রত্যুত্তর করল ,
“- হুম”।
মৃত্তিকা আবার ডাকল,
“- আফিম?
এবারেও আফিম সাড়া দিল,
“- বলো”।
পরপর আবারও ডাকল মৃত্তিকা,
“- আফিম”।
“- শুনছি তো”।
এবার কয়েকবার একসাথে নামটি আওড়াল মেয়েটা,
“- আফিম, আফিম, আফিম”।
আফিমের হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ল। অধৈর্য হয়ে তড়াক বেগে মেয়েটির মাথা বুক থেকে তুলল। বলল,
“- কিছু বলছো না কেন”?
মৃত্তিকা গাল ভরে হাসল। বলল,
“- আপনাকে ডাকতে ভালো লাগছে”।
“- পাগলামি করছো কেন? এভাবে তোমাকে মানাচ্ছে না। আমার তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না মৃত্ত।”
“- কিভাবে ভালো লাগে”?
“- দুরে থাকো। তুমি নিজেও পাগল হচ্ছো, আমাকেও পাগল বানাচ্ছো। আমায় ভালোবাসো মৃত্ত”?,
“- জানি না। কিন্তু আগে আপনার উপস্থিতিতে যে অস্বস্তি হতো, আড়ষ্টভাব চলে আসতো সেটা আর হয় না। বরং আপনি পাশে থাকলে স্বস্তি পাই, দুঃখ গুলো উধাও হয়ে যায়”।
আশপাশে মানুষ আছে বুঝতে পেরে মৃত্তিকা নিজেই আফিমের কাছ থেকে সরে এলো। আফিম সবটা দেখল। বলল না কিছুই। বাইকে উঠে বসল দুজনই। আফিম আর মৃত্ত দুজনই হেলমেট পরে নিল। আফিমের চোখ দুটোই দেখা গেল বাইকের আয়নায়। বাইক স্টার্ট দেয়ার কিছুক্ষণ পরেই মৃত্তিকার পাগলামি বাড়ল ফের। আফিমকে বাইক থামানোর জন্য আদেশ দিল। আফিম দ্রুত বেগে চলা বাইক থামাল। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাল। বলল,
“- কি হলো”?
“- আপনি ভিসরটা নামান। আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না, মুখ খুলুন”।
আফিম এবার রীতিমতো ভড়কে গেল। মেয়েটার মাথায় সমস্যা দেখা দিল? কয়েকদিন আগেও তাকে দেখতে পারতো না। আর এখন? এখন তাকে না দেখে থাকতে পারছে না। মৃত্তিকার এত মনোযোগ আফিমের হজম হয় না। সে মৃত্তিকাকে ভালোবাসে এ কথা সত্য। কিন্তু মৃত্তিকার থেকে বাড়াবাড়ি রকমের মনোযোগ, আগ্রহ সে চায়নি। মৃত্তিকা লজ্জা পেতো, দূরে সরাতো, ঘৃণা করতো এসবেই অভ্যস্ত ছিল আফিম। বখাটেদের প্রতি মৃত্তিকার ধারণা, মৃত্তিকার মনোভাব সব কেমন বদলে যাচ্ছে। মেয়েটা তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, ভাবতেই ঘাম ঝরছে আফিমের গা বেয়ে। সহ্য হচ্ছে না এসব।
“- মৃত্ত”?
“- কি”?
“ এমন করো না”।
“- কেমন”?
“- এভাবে তাকাবে না”।
“- আমার চোখ গুলো বড্ড অবাধ্য। ওরা শোনে না তো”।
আফিম ধমকে ওঠে। বলে,
“- মাইর খাবো তুমি?”
“- আপনি যখন আমায় দেখেন, আমি কিছু বলি”?
আফিম গম্ভীর থেকেই বলে,
“- এটা ছেলেদের সহজাত। সুন্দরী মেয়ে বলেই তাকিয়ে থাকি। তুমি তাকাবে কেন?”
“- আপনিও তো সুন্দর”।
“- তাই বলে লাজ-লজ্জা ভুলে তাকিয়ে থাকবে”?
“- বিশ্বাস করুন আমার প্রচণ্ড লজ্জা লাগছে, কিন্তু সেই লজ্জার চাইতেও প্রাধান্য পাচ্ছে চোখের শান্তি”।
মৃত্তিকা আজ আফিমকে যেতে দিল না কোথাও। আফিমের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পুরোটা দিন। তার নজর সরে না। সঙ্কোচহীন, অবিলম্বে, নির্বিঘ্নে মেয়েটা দেখে আফিমকে। আফিম বোঝে মৃত্তিকার এই গাঢ় অনুভুতির মাত্রা। তারও তো প্রথমে এমন হতো। এখনও হয়, কিন্তু সে আত্মসংযম হারায় না। মৃত্তিকাকে সময় দেয়, তার পাশে থাকে। যেন মেয়েটাই নিজেকে আফিমের নিকট সমর্পণ করে।
এখন মৃত্তিকা যখন তাকে ভালোবাসছে, কাছে আসার ইচ্ছে পোষণ করছে, তখন আফিমের ভয় বাড়ছে। এতটা ভালোবাসা কি তার ভাগ্যে আছে? মৃত্তিকা নামক আগুন সুন্দরীর মন জয় করার মতো বিরাট কারবার তার দ্বারা হলো? সে ভেবেছিল মৃত্তিকা তাকে ভালোবাসতে পারবে না, যদি না সে ভালো হয়। অথচ আফিম ভালো না হলেও মৃত্তিকা তার মন প্রাণ উজার করে দিয়েছে। এতে অবশ্য আফিম নিশ্চিত হয়েছে যে মৃত্তিকা তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে। তার পদমর্যাদা, তার রোজগার এসবকে মৃত্তিকা পরোয়া করে না।
মৃত্তিকা আজও শাড়ি পড়েছে। ইদানীং সে ঘন ঘন শাড়ি পড়ছে। আফিমের সামনে এসে ঘুরঘুর করছে। আফিম চেয়েও নজর ফেরাতে পারে না। দৃষ্টি থমকে যায়, দম আটকে আসে। মৃত্তিকা কি সেই অবাধ্য কামনা বোঝে? বুঝলে এমন দুষ্টুমি করতো?
গলদা চিংড়ি রান্না করেছে মৃত্তিকা। খাবার টেবিলে আফিম বসে আছে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মৃত্তিকা। আফিম মৃত্তিকাকে দেখে বলল,
“- তুমি খেয়েছো”?
মৃত্তিকা মাথা নাড়ে। বলে,
“- পরে খাবো”।
“- হাতের ব্যথা কমেছে? দেখি”?
আফিম ভাত মাখাতে মাখাতেই মৃত্তিকার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা দেখল। হাতের চামড়া উঠে নতুন চামড়া উঁকি দিচ্ছে। কালো হাতটা এখন কিছুটা আসল রূপে ফিরেছে। আফিম মৃত্তিকাকে পাশের চেয়ারে বসাল। লোকমা তুলে ধরল মৃত্তিকার মুখের সামনে। মৃত্তিকা খাবার গিলে বলল,
“- রান্না কেমন হয়েছে, বললেন না তো”?
এর আগেও মৃত্তিকার হাতের রান্না খেয়েছে আফিম। চেটেপুটে খেয়েছে মৃত্তিকার দক্ষ হাতের খাবার। সেভাবে তারিফ না করলেও ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়েছে খাবার ভালো হয়েছে। মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করে না এসব। আজ মেয়েটা সত্যিই পাগল হয়ে গেছে।
“- ভালো হয়েছে”।
“- আরেকটু দিবো”?
আফিম ধমকে উঠল। ত্যক্ত সুরে বলল,
“- বাড়াবাড়ি করছো মৃত্ত, তুমি তোমার নিজস্বতা হারাচ্ছো”।
মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“- আপনার তাই মনে হচ্ছে”?
আফিম হতাশ সুরে বলে,
“- আমি আমার মৃত্তকে চাই। তোমাকে আমার অচেনা লাগছে”।
ন
“- এতদিন আপনি দুরত্ব কমাতে চাইতেন। আমি ঠেলে দিতাম, পালিয়ে বেড়াতাম। আজ আমি যখন আপনার কাছে আসছি, আপনার খেয়াল রাখছি, তখন আপনি দুরত্ব বাড়াতে চাইছেন?”
আফিম মৃত্তিকার মুখে লোকমা তুলে দিয়ে বলে,
“- আমার মনে হচ্ছে তুমি জোর করে সবটা মানিয়ে নেবার চেষ্টা করছো। করুণা করছো আমাকে”।
মৃত্তিকা শুনল। টলমলে হয়ে উঠল তার আঁখি জোড়া। ভাঙা কণ্ঠে মৃত্তিকা বলল,
“- আমার চোখের দিকে তাকান, আপনার মনে হয় আমার চোখে মিথ্যে আছে, করুণা আছে”?
আফিম দেখল মেয়েটার টলটলে চোখ জোড়া। চেয়ে রইল ক্ষণকাল। হাত বাড়িয়ে চোখে বুড়ো আঙুল চেপে ধরতেই জলপ্রপাত বয়ে গেল। আফিম কিছু বলার আগেই মৃত্তিকা উঠে গেল।
মৃত্তিকা ঘুমিয়েছে। রাত আড়াইটা বাজে। চারপাশ নিশ্চুপ। মৃত্তিকার ভারী শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বুকের ওঠানামায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে গভীর নিদ্রায় তলিয়েছে। আফিম খুব ধীরে, নিঃশব্দে উঠল বিছানা ছেড়ে। কাবার্ডের নির্দিষ্ট স্থান থেকে পিস্তল বের করল সে। সিল্ক শার্টের উপর ডিপ ব্লু স্যুট পড়ল, হাতে ব্র্যান্ডের দামী ঘড়ি পড়ে জেল দিয়ে চুলগুলো সেট করে নিল নিখুঁত ভাবে। ধারাল ছুড়িটি গুজে নিল বেল্টের ফাঁকে। বুট পড়ে মৃত্তিকার কাছে এলো, তার চুলগুলোকে গুছিয়ে দিল সযত্নে। অতঃপর সতর্ক হয়ে পা বাড়াল ঘর ছেড়ে। দুর্ভাগ্যবশত আফিমের ফোনে দেয়া এলার্মের শব্দে চেতনা ফেরে মৃত্তিকার। আফিম তাড়াহুড়ো করে এলার্ম বন্ধ করে। একটু নড়েচড়ে ওঠে মৃত্তিকা। ফের ঘুমানোর জন্য মস্তিস্ককে স্থির করতেই আফিমের বুটের শব্দে ঘুমের গভীরতা কেটে যায়। আরো কয়েকবার শব্দ হতেই চোখ মেলে মৃত্তিকা। বিছানা হাতরে আফিমকে খোঁজে। আফিমের শক্ত-পোক্ত দেহটাকে না ছুঁতে পেয়ে উঠে পড়ে মৃত্তিকা। লাইট জ্বালিয়ে বেলকনিতে ছুটে যায় সে। ভাবে আফিম হয়তো সিগারেট খেতে বেলকনিতে গিয়েছে। কিন্তু সেখানে আফিমের অস্তিত্ব নেই।
মৃত্তিকা গ্রিলে হাত রেখে নিচে ঝুঁকে। তখনই পরিপাটি, চিরচেনা আফিমকে নজরে পড়ে তার। ললাটে ভাঁজ দেখা দেয় মৃত্তিকার। কুঁচি তুলে দৌড়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। আফিম হেঁটে পার্কিং লটে গিয়ে বাইক বের করে। মৃত্তিকা লুকিয়ে দেখে তাকে, বুঝতে চায় আফিমের পরবর্তী পদক্ষেপ। তার মনে অজানা আশঙ্কা ভর করে। আফিম আড্ডা দিতে যাচ্ছে? তাও এত রাতে? সে তো বলেছিল আর রাতে আড্ডা দিতে যাবে না। মৃত্তিকাকে মিথ্যে বলেছে আফিম? অভ্যেস বদলাতে পারেনি সে? রাগ হয় মৃত্তিকার। শপথ করে আজ আফিমের পিছু পিছু যাবে সে। তার আড্ডার জায়গাটা দেখবে। আফিম কেবলই আড্ডা দিতে ছুটে যায় নাকি নেশাদ্রব্য পান করে সেটাও দেখবে।
আফিমদের বাড়ির ড্রাইভারটা রাতে কিচেনের পাশের ছোট্ট রুমটায় ঘুমায়। লোকটার পরিবার নেই। দিন ও রাত তার আফিমদের বাড়িতেই কাটে। মৃত্তিকা প্রথমবার তার ঘরের সামনে আসে। নিচু সুরে কাকাকে ডেকে তোলে। অতঃপর বলে,
“- আফিম কোথাও যাচ্ছে কাকা, আমি ওর পিছু নিতে চাই। আমাকে একটু পৌঁছে দেবেন”?
ড্রাইভার কাকা মালিকের হুকুম মানতে বাধ্য ঘুম ঝেরে ফেলে সে গাড়ির দিকে আসে। আফিম বের হতেই সে মৃত্তিকাকে গাড়িতে বসিয়ে পিছু পিছু অনুসরণ করে। আফিম ধীরে সুস্থে বাইক চালাচ্ছে। রাত গভীর বলে রাস্তায় যানবাহন নেই, রাস্তা ফাঁকা। একটি বাইক ও একটি গাড়ি ছুটে যাচ্ছে পিচঢালা রাস্তায়। মৃত্তিকার কেমন যেন লাগছে। আফিমকে কি সে সন্দেহ করছে? এটা করা ঠিক হচ্ছে? আফিম জানলে নিশ্চয়ই রাগ করবে, এত রাতে নিরাপত্তাহীন ভাবে ঘোরাফেরা করায় চোটপাট করবে। মৃত্তিকা নিজের কৌতুহলী মনকে দমায় না। বড় শ্বাস টেনে এগিয়ে যায়।
একটি বড়সড় মাঠের সামনে এসে আফিম বাইক থামায়। নেমে হেঁটে যায় কিছুদূর। মৃত্তিকাও কাকাকে রেখে শাড়ির কুচি তুলে এগিয়ে যায় আফিমের পিছনে। আফিম খুব দ্রুত যাচ্ছে। মৃত্তিকাও ছুটছে তার পিছু। আফিমের কানে এয়ারপিস বলে শব্দ শুনছে না।
চারদিকের উচু প্রাচীর, গোডাউনের মতো বিরাট ঘরটাকে ঢেকে রেখেছে। প্রাচীরের চারপাশে কয়েকটা স্বাস্থ্যবান, লম্বাটে দেহের পুরুষ পিস্তল হাতে নিয় দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দৃষ্টি তির্যক। আফিমকে দেখেই তারা পা উঁচু কর শব্দ করে, হাত কপালে ঠেকিয়ে সালাম জানাল। আফিমকে দেখে ওড়া লোহার গেটটা খুলে দিল। আফিম মাথা নেড়ে সালামের উত্তর দিল। সে প্রাচীরের ভিতরটায় ঢুকে পড়তেই ওরা গেট লাগিয়ে দিল। বিষয়টায় ভারী অবাক হলো মৃত্তিকা। আফিমকে আর দেখা গেল না। মৃত্তিকা আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল, আশপাশ পরখ করল। বিশাল বড়, জনমানবহীন মাঠটার একেবারে মাঝখানে কেবল একটি বড়সড় ঘর। প্রাচীর দেয়া পুরোটা ঘেরা। চারদিকে বেশ কয়েকজন পুরুষ বড় পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটি কাক পক্ষীর দেখা পাওয়া গেল না। মৃত্তিকার ভয় বাড়ল। দাঁড়িয়ে রইল আফিমের ফেরার অপেক্ষায়।
আফিম ফিল্ড রুমের ফ্লোরের নিচের সিক্রেট রুমটায় ঢুকেছে। আইটি সেক্টরের মানুষদের সাথে তার মিটিং আছে। এই সিক্রেট রুমটায় আইটির সকল কাজ সম্পাদন হয়। এখানে আসার অনেক আগেই আফিম ফোন অফ রেখেছে। তার দুটো ফোন, একটি ফোনের নম্বর, আইডি কাউকে দেয়া হয়নি। ফ্লোরের উপরে বাকিসব জুনিয়ররা কাজবাজ করছে।
মৃত্তিকা অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও আফিমের হদিশ পেল না। বিরক্তি আর আশঙ্কায় সে একসময় না পেরে প্রাচীরের কাছে এলো। সরাসরি লোকগুলোকে বলল,
“- আমি ভেতরে ঢুকতে চাই”।
গেটের কাছের লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকাল। মাঝ রাতে এই সরকারের সিক্রেট রুমে একজন সাধারণ নারীকে দেখে তারা রেগে উঠল। বলল,
“- কি চাই”?
মৃত্তিকা দোনামনা করে বলল,
“- শাফায়াত আফিম মির্জাকে খুঁজছি। তিনি ভেতরে আছেন”।
লোকগুলো ভয় পেল। এই গভীর রাতে সাধারণ নারূর আগমন মোটেই সহজ কোনো বিষয় নয়। মেয়েটা কি দেশের শত্রু? আফিম মির্জাকে ফলো করে সরকারি কার্যক্রম গুলোর সন্ধান করছে? সিক্রেট এজেন্টদের পরিচয় খুঁজে বের করছে? ওরা ভাবে না এক মুহুর্ত। কিছু একটা স্প্রে করে বাতাসে। সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যায় মৃত্তিকা।
মৃত্তিকাকে টেনে হিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে আসে ওরা। সবটাই জানায় বসকে। ওরা সন্দেহ করে মৃত্তিকাকে। অপরাধী ভেবে ভুল করে। ফিমেল এজেন্ট আজ নেই। মেয়েটার বডি চেক করতে হবে। কোনো প্রকার বেআইনি অস্ত্র, গোপন ক্যামেরা আছে কিনা জানতে হবে। নইলে খুব সহজেই এখানকার সকল এজেন্টের মুখোশ খুলে যাবে। নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হবে, দেশের শত্রুরা জেনে যাবে সবার পরিচয়। তাদের গোপন কার্যক্রম গুলো সম্পর্কে জেনে সতর্ক হয়ে যাবে। দেশের অপরাধীদের আর ধরা যাবে না।
বসের কথামতো ছেলে গুলো মৃত্তিকার জ্ঞান ফেরায়। তার আগে মৃত্তিকার হাত-পা বাঁধে। মুখে টেপ লাগিয়ে দেয়। মৃত্তিকা সবাইকে দেখে খুব ভয় পায়। ঠকঠক করে কাঁপে তার ছোট্ট দেহ। আতঙ্ক চোখে পানি জমে মেয়েটার। ছটফট করে সে। বস বলে ওঠে,
“- চেক করো। হয়তো সাধারণ মানুষ সেজে আমাদের খোঁজ করছে।”
ছেলেগুলো এগিয়ে আসতে নিলে মৃত্তিকা আরো ঘাবড়ায়। ছটফট করে সে। হাত পা মোচড়ায়, ছোটার চেষ্টা করে। মুখ দিয়ে অস্ফুটে শব্দ করে। তার শব্দ পৌঁছে যায় নিচের সিক্রেট রুমে। আফিমের কানে শব্দ আসতেই সে ছোট ছোট সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসে। ফ্লোরের টাইলস উঁচু করে বেরিয়ে আসে। আর তখনই মৃত্তিকাড ভয়ার্ত চেহারা দেখতে পায় আফিম। মৃত্তিকাও আফিমকে দেখে নড়চড় বন্ধ করে, স্থির হয়ে যায় সে। তাকিয়ে রয় রুদ্ধ চোখে। বাঁচার ক্ষীণ আশা খুঁজে পায়। ছেলেগুলো আফিমের কোমরের দিকটায় হাত বাড়াতেই আফিম চেঁচিয়ে ওঠে। বলে,
“- স্টপ, ডোন্ট টাচ হার”।
ওরা থেমে গেলেও ওদের বস রেগে বলে,
“- এই মেয়েটা এত রাতে এখানে এসেছে তোমাকে ফলো করে। ওকে মেরে ফেলতে হবে”।
ঘরের কোণগুলোয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহারাদার গুলো বন্দুক তাক করে তৈরি হয়ে নিল খুব দ্রুত। মৃত্তিকা ভয়ে ঘামছে। হাঁপাচ্ছে সে। আফিম চোক পাকিয়ে কড়া, স্পষ্ট সুরে দুই প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে বলে,
“- ডোন্ট শ্যুট হার, শি ইজ মাইন”।
মৃত্তিকার অর্ধচেতন দেহটাকে পাজোকোলে তুলে মাঠ দিয়ে হেঁটে চলছে আফিম। মৃত্তিকার ওজন কম, তাকে নিয়ে এত বড় মাঠটা পাড়ি দিতে একটুও কষ্ট হলো না আফিমের। বরং সযত্নে, নরম ভাবে ধরে রাখল মেয়েটাকে। মৃত্তিকার জ্ঞান আছে, হুঁশ আছে। তবে মুক থেকে কথা বের হচ্ছে না। ঘোরে আছে সে, কিছুই বুঝতে পারছে না। আধবোজা চোখে অস্পষ্ট দৃষ্টি মেলে আফিমের তীক্ষ্ণ চোয়াল দেখে মৃত্তিকা। শুষ্ক ঢোগ গিলে খুব আস্তে বলে ওঠে,
“- পানি খাবো। আফিম, পিপাসা পেয়েছে”।
আফিম শুনল। পায়ের গতি বাড়াল। ছুটে এলো বাইরে। দেখল বাড়ির গাড়িটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। বুঝল মৃত্তিকার আসার বাহন এটি। কাকাকে বলে এক বোতল পানি আনল আফিম। মৃত্তিকাকে ব্যাক সিটে শুইয়ে তার চোখে মুখে পানি ছেটাল। কিছুটা পানি খাইয়েও দিল। বেশ কিছুক্ষণ পর মৃত্তিকার পুরোপুরি সম্বিত ফেরে। হুঁশ আসতেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আফিমের বুকে। ভীত স্বরে বলে,
“- আপনি না এলে ওরা আমাকে মেরে ফেলতো।”
আফিম স্বাভাবিক সুরে বলল,
“- কিছু হয়নি, শান্ত হও।”
মৃত্তিকা খানিক সময় নিল শান্ত হতে। ঠকঠক করে কাঁপছে সে। প্রথমবার এতগুলো মানুষের তোপের মুখে পড়ায়, বন্দুকের নল তার দিকে তাক করায় সে ঘাবড়ে গিয়েছে। এখনও শরীর কাঁপছে। কাকাকে তাকাতে দেখে আফিম বলল,
“- আপনি একটু বাইরে যান কাকা। মৃত্তিকার সাথে আমার একটু কথা আছে। আপনি দেখুন দোকান খোলা আছে কিনা। থাকলে কিছু খেয়ে আসুন”।
কাকা চলে গেল। মৃত্তিকাকে বুকের মাঝে আবদ্ধ করল আফিম। ধীরে ধীরে মৃত্তিকার কাঁপুনি থেমে গেল। ফোঁপানো বন্ধ হলো। মৃত্তিকা রয়েসয়ে বলল,
“- আপনি, আপনি আমায় ঠকিয়েছেন।”
আফিম কিছুই বলল না। শান্ত হয়ে মৃত্তিকার মুখ পানে চেয়ে রইল। মৃত্তিকা ফের বলল,
“- আপনি খুব বাজে, খুব বাজে আপনি। আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছেন, ঠকিয়েছেন আমাকে। আমায় ভুল বুঝিয়েছেন, ভুল দেখিয়েছেন”।
মৃত্তিকা কথা বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে সে জেনে গেছে আফিমের পরিচয়। আফিম নিজেই বলেছে সে আন্ডারকভার এজেন্ট, ফিল্ড অপারেটিভ। সরকারের হয়ে কাজ করে পরিচয় গোপন রেখে। ব্যাস, এতটুকু শুনেই জ্ঞান হারিয়েছিল মৃত্তিকা। শরীরের ভর ছেড়ে দিয়েছিল।
মৃত্তিকা আফিমের বুকে ক্রমাগত কিল বসিয়ে কেঁদে বলে,
“- আপনাকে আমি মানতে পারছি না। সহ্য হচ্ছে না আপনাকে। আমি..আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আপনি আমায় জানাননি, মিথ্যে পরিচয় দিয়েছেন।”
বলেই ঢুকরে কেঁদে ওঠে মৃত্তিকা। আফিম বলে,
“- আমাকে বলতে দাও মৃত্ত”।
“- কি বলবেন আপনি? আমায় একটিবার জানালেন না কেন? কেন আমায় মিথ্যের মায়াজালে ডুবিয়ে রাখলেন”?
আফিম ফোঁস করে শ্বাস টানে। শরীরে আটকে রাখা অস্ত্র গুলো একে একে বের করে। মৃত্তিকা সেসব দেখে গুটিয়ে যায়। আফিম পুরোরা ব্যাখ্যা করে। তার পরিচয় কাউকেই জানানোর নিয়ম নেই পরিবার ব্যতিত। আফিম তার বাবাকে জানায়নি, কারণ এই পেশা আশরাফ মির্জার পছন্দ নয়। কোনোকালেই ছিল না। আফিম বখাটে সেজেছে, তাতেও আশরাফ মির্জা অসন্তুষ্ট। আফিম চেয়েছিল বাবার মনে এই বখাটে পরিচয়টাকে উপস্থাপন করবে। যেই এই পরিচয়টায় লোকটার ঘৃণা চলে আসবে, অমনি আসল পরিচয়টার কথা জানাবে। তাতে অন্তত বাবা কিছুটা সন্তুষ্ট হবে। বখাটে পরিচয় থেকে এজেন্টের পরিচয়টা তার ভালো লাগবে, সে মেনে নেবে। এছাড়া মাস্তানি করাটাও আফিমের প্রিয় হয়ে উঠেছে। দলের লোকদের সে ভালোবাসে, তাদের সাথে আফিম মিলেমিশে থাকে। এখন ওদের ছাড়া আফিমের যেমন চলে না, আফিমকে ছাড়াও ওরা অচল। এই দলটা গড়ে তুলতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এই পরিচয়টা তাকে শান্তি দেয়। আফিমের সাথে আশরাফ মির্জার সম্পর্ক ভালো না। আফিম চেয়েছিল সময় সুযোগ বুঝে বলবে। মৃত্তিকাকেও বলতে চেয়েছে। কিন্তু আফিম চেয়েছিল মৃত্তিকা বখাটে প্রেমিককেই ভালোবাসুক। কোনো স্বার্থ ছাড়াই আফিমকে কাছে টানুক।
মৃত্তিকা সব শোনে, বোঝে। থ বনে যায় সে। আফিম মৃত্তিকার দু হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ছোঁয়ায় মেয়েটার হাতের পিঠে। নরম সুরে বলে,
“- একা, এভাবে কেউ আসে? ভয় নেই তোমার”?
মৃত্তিকা নাক টানে। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলে,
“- যার বর মাস্তান, তার আবার ভয় কিসের”?
“- স্যরি মৃত্ত”।
মৃত্তিকা মুখ ফিরিয়ে নিল। বলল,
“- আমি আপনাকে মাফ করবো না”।
আফিম সিটে গা এলিয়ে দিল। দুজনেই চুপ রইল। আফিম চোখ বুজে নিল। হার মেনে নিল বোধহয়। মৃত্তিকা কিছুক্ষণ আফিমের ক্লান্ত মুখে চেয়ে থেকে দুরত্ন কমাল। আফিমের গালে এক হাত রাখল সে। তার শীতল হাতের স্পর্শে আফিম চোখ মেলল। মৃত্তিকা নিখাঁদ কণ্ঠে বলল,
“- আপনি আমায় ভালোবাসেন না, তাইনা”?
“- বাসি তো”।
‘- কতটা”?
“- ভালোবাসা পরিমাপের যন্ত্র নেই, ভালোবাসার ওজন মাপা যায় না”।
“- কিন্তু অনুভব তো করানো যায়”।
আফিম বুঝল না। মৃত্তিকা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“- আপনাকে ছোঁয়া যাবে আফিম”?
আফিম নিঃশব্দে সামান্য হাসল। ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো। মৃত্তিকা তার পাতলা ঠোঁট জোড়া এগিয়ে এনে আফিমের গাল ছুঁয়ে দিল। ছুঁয়ে দিল খাঁড়া নাকটাও। অতঃপর দু হাতে আফিমের মুখ তুলে আফিমের গালে মুখ ডুবিয়ে রাখল অনেকক্ষণ। গাড়িটার ভেতর কেবল দুজনের ভারী শ্বাসের শব্দ শোনা গেল। আফিম মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“- রাগ কমেছে”?
“- উঁহু”।
“- আপনার রাগ কমানোর জন্য আমি কি আমার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি”?
মৃত্তিকা মাথা নত করে লাজুক হাসল। আফিম। গাঢ় হেসে মেয়েটির থুতনি চেপে ধরে লাজে রাঙা মুখটা তুলল। মৃত্তিকার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল খুব গভীর ভাবে। কেঁপে উঠল মৃত্তিকা। তার কোমরটাকে নিজ দেহে টেনে আফিম ফিসফিসিয়ে বলল,
“- মৃত্ত আমার, তার দেহ, মন, মস্তিষ্ক সবই আমার। আমার, আমার আর কেবলই আমার”।
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[ নোটঃ রি-চেইক দিইনি ]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৭
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৫