Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৮


ওরা মনের গোপন চেনে না

পর্ব সংখ্যা [১৮]
[ পর্বটি রোমাঞ্চকর🤭 ]

বসন্ত পেরিয়েছে। শীতটা তেমন ঝাঁপিয়ে বসেনি। এবারের শীতটা টের পাওয়া গেল কেবল রাতে। তন্বী আর মৃত্তিকা রাতে লুডু খেলতে বসেছিল। খেলা শেষ হতেই খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে শুতে গেছে যে যার ঘরে। আফিম নাকি আজ রাতে ফিরবে না। কোথায় যাবে তা বলে যায়নি। আজকাল আফিমকে নিয়ে বড্ড চিন্তা হয় মৃত্তিকার। খারাপ মানুষের শত্রুর শেষ নেই। তার ছেলেপেলে ছাড়া শহরের সব দল আফিমের শত্রু। তারা কখন কি করে বসে, বলা যায় না। আফিমের বিশ্বাস তাকে কেউ নিঃশেষ করতে পারবে না। কিন্তু মৃত্তিকা জানে, সবকিছুরই শেষ থাকে।

সকালে নাস্তা বানাতে গিয়ে মৃত্তিকা তন্বীকে রান্নাঘরে আবিষ্কার করে। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে মেয়েটা রান্না করছে। তাকে এত সকালে উঠতে দেখে মৃত্তিকা যতটা না অবাক হলো, তার চেয়ে বেশি বিস্মিত হলো তন্বীকে রান্না করতে দেখে। কথায় কথায় তন্বী জানিয়েছিল সে রান্না করতে পারে না, কোনোদিন রান্নাঘরের কাজ করেনি। তন্বীকে নব বধুই মনে হলো। মৃত্তিকার তন্বীকে বড্ড মিষ্টি লাগছে। হেসে সে এগিয়ে যায় রান্নাঘরে। তন্বীর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

“- কি তৈরি করছেন তন্বী আপু”?

তন্বী হাসিমুখে বলল,
“- ফ্রাইড রাইস। বেশি কিছু তো পারি না ভাবলাম এই সহজ রেসিপিটাই করি”।

মৃত্তিকা সংকোচে বলে,
“- আপনি এত কষ্ট করছেন কেন? আমাকে বললেই হতো”।

“- ভাবলাম তোমাকে একটু হেল্প করি”।

“- রায়ান ভাইয়া আসবে’?

তন্বী কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দেখল মৃত্তিকা। অতঃপর উদাস কণ্ঠে বলে উঠল,
“- আসবে”।


টিউশনি পড়াতে যাবার আগে সকাল নয়টায় আফিমের দেখা মিলল মৃত্তিকার। উষ্কখুষ্ক চুল, কুঁচকে যাওয়া মেরুন শার্ট, গুটিয়ে রাখা শার্টের হাতা দেখে মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে তাকাল আফিমের পানে। বলল,

“- আপনার এ অবস্থা কেন? সারারাত বাড়ি ফিরলেন না, কোথায় ছিলেন”?

আফিম মৃত্তিকার প্রশ্ন কানেই তুলল না। বলল,
‘- কোথায় যাচ্ছো মৃত্ত”?

“-, স্টুডেন্টের বাসায়”।

“- আসো আমি পৌঁছে দিই”।

মৃত্তিকা রাজি হলো না। বলল,
“ সারারাত বাহিরে ঘুরেছেন, বাড়ি গিয়ে রেস্ট করুন। আমি একাই যেতে পারবো”।

আফিম দুষ্টু হাসে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“- আমার জন্য চিন্তা করতে করতে শুকিয়ে গেছো মৃত্ত। এত স্বামী পাগল হলে চলে”?

মেজাজ টা গরম হয়ে গেল মৃত্তিকার। তিরিক্ষি মেজাজে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“- আপনি কোন আমলের নবাব, যে আপনার জন্য চিন্তা করবো?”

আফিম দূর্ভেদ্য হাসে। মৃত্তিকা শুকনো মুখে তাকিয়ে রয় ছেলেটার পানে। আফিম তাগাদা দিয়ে বলে,
“- আমি বাইকটা নিয়ে আসছি”।

মৃত্তিকা বাঁধ সাধে। বলে,
“- আপনার বাইকে চড়তে ভয় করে। রিকশা নিন”।

আফিম বাধ্য ছেলের ন্যায় সম্মতি জানাল। রাস্তায় উঠে হুড তোলা রিকশা নিল। রিকশার সাথে সেঁটে বসল মৃত্তিকা। পুরুষালী দেহের সাথে যেন কোনোরূপ সংঘর্ষন না হয় সেই প্রার্থনাই করল। উন্মুক্ত বাতাসে মৃত্তিকার ওড়না এলোমেলো হয়ে গেল। খোলা চুলগুলো এলোপাথাড়ি ভাবে মুখে লেগে রইল। আফিমের দেহ বড়, শক্ত। পা জোড়া ফাঁক করে রাখায় তার উরুর সাথে মৃত্তিকার পা লেগে যাচ্ছে। অস্বস্তিতে মেয়েটা নুইয়ে পড়ে। যথাসম্ভব রিকশার হুড ধরে চেপে যায় কোণায়। আফিম মেয়েটার অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে মনে হাসে। সহসা ঘাড় কাত করে সে ঝুঁকে আসে মৃত্তিকার দিকে। তার প্রগাঢ় উষ্ণ নিঃশ্বাসের তোপে কূল হারায় মৃত্তিকা। আরো দৃঢ় করে ধরে হুডের অংশ। আফিম ক্রূর হেসে বলে,

“- দূরে সরছো কেন মৃত্ত”?

বক্ষমাঝে তোলপাড়ের কল কল ধ্বনি মৃত্তিকা ছাড়া কেউ বুঝল না। শ্বাস নিতেও ভুলে গেল মেয়েটা। বলল,

“- সরে বসুন আফি..ফিম”।

আফিম সরল না। থোরাই মৃত্তিকার অস্বস্তিতে আমলে নিল। বলল,
“- কাঁপছো কেন? আমি তো তোমাকে ছুঁই নি”।

মৃত্তিকা থতমত খেয়ে বলল,
“- এটা রাস্তা, এভাবে বসেছেন কেন? লোকে মন্দ বলবে”।

আফিম মেয়েটার অস্বস্তিতে হাওয়ায় ওড়াতে সরে আসে ওর নিকট থেকে। বাতাসে সিল্কি চুলগুলো উড়ছে ছেলেটার। একটু পরই ঝরঝরে, উচ্চস্বরে পুরো শহরকে জানিয়ে গান ধরল আফিম। তার গানের সুর মৃত্তিকাকে লজ্জায় রাঙা করল। আফিম উঁচু আওয়াজে গেয়ে উঠল,

“- আমায় বলে বলুক লোকে মন্দ
বিরহে তার প্রান বাঁচে না,

আমায় বলে বলুক লোকে মন্দ
বিরহে তার প্রাণ বাঁচে না,
দেখেছি রুপ সাগরে
মনের মানুষ কাচা সোনা,
দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা।”

আশপাশের লোকজন তাকিয়ে আছে। খুব অদ্ভুত চোখে আফিমকে দেখছে। কয়েকজন ফোন ও হাতে তুলে নিয়েছে রেকর্ড করবে বলে। আফিম মারাত্মক গান গাইতে পারে, মৃত্তিকা সেটা আজ খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। ভারিক্কি, মোটা স্বরে লালন গীতি, রবীন্দ্রনাথের গান গুলো এত ভালো শোনায় আফিমের কণ্ঠে। কেবল শুনে যেতেই ইচ্ছে হয়। তার এই গুণ তার গুণ্ডামির আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। তার খারাপ দিকগুলোই বাকিদের সামনে উন্মুক্ত। ভালো দিক গুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে। রিকশাওয়ালা মামাও তার তারিফ করে বললেন,
“- ভাইগনা, গান সেরাআ হইছে। তোমার গলা ফ্যান্টাস্টিক”।

আফিমের মাঝে ভাবাবেগ না দেখে মৃত্তিকা মৃদু কণ্ঠে বলে,

“- আপনি আমায় বারবার অস্বস্তিতে ফেলেন”।

জড়সড় হয়ে কথাখানা বলল মৃত্তিকা। গন্তব্যে পৌঁছানোয় রিকশা থামল। আফিম নেমে যাওয়ার পূর্বে বলল,
“- আগেও বলেছি, আমি তোমার জন্য স্বস্তিকর কখনোই হবো না মৃত্ত। অসহ্যকর, বিরক্তিকর কিংবা অস্বস্তিকর হতে পারি”।

মৃত্তিকা কথা না বাড়িয়ে স্টুডেন্টদের ফ্ল্যাটে ঢুকে পরল। আফিম তাকে কিছুক্ষণ দেখে স্থান ত্যাগ করল। লিফটে করে তিন তলায় উঠে মৃত্তিকা আলিয়াদের ঘরের কলিংবেল প্রেস করল। আলিয়ার মা দরজাটা খুলে চলে গেলেন নিজের ঘরে। মৃত্তিকা আলিয়ার ঘরে গিয়ে পড়ার টেবিলের চেয়ার টেনে বসল। হ্যান্ড ব্যাগ রাখল পাশে। আলিয়া একটু পরেই ঘরে আসে বই খাতা সমেত। মৃত্তিকার সামনের চেয়ারটিতে বসে বই খাতা টেবিলে রাখে। আলিয়া এবার এসএসসি দেবে। পড়ার ভীষণ চাপ। নানা ঝামেলায় মৃত্তিকা গ্যাপ দিয়ে ফেলেছে অনেকটা। প্রতিজ্ঞা করেছে সবটা পুষিয়ে দেবে, শুক্র-শনি বার এসেও সময় দেবে। পড়ানোর ফাঁকে আলিয়ার মা আসেন। মাসের শেষ, তার হাতে বেতনের খাম। খামটা দেখেই মৃত্তিকার হৃদয় প্রশান্ত হয়। মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। বেতনের টাকাটা হাতে পেলেই নিজেকে স্বার্থক মনে হয়। কিন্তু আলিয়ার মা আজ মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর। হাতের খামটা তিনি মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“- কাল থেকে আর এসো না মৃত্তিকা। নতুন টিচার নিয়েছি আলিয়ার জন্য”।

হাত বাড়িয়ে খামটা নেয়ার পর কথাটা শোনার সাথে সাথে মৃত্তিকার প্রশান্ত হৃদয়ে তীব্র ঝড় উঠল। এমনটা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। প্রায় দু বছর ধরে পড়ায় আলিয়াকে। কোনোদিন আন্টি এভাবে কথা বলেনি তার সাথে।

“- কিন্তু আন্টি, আমি কী কোনো ভুল করেছি?”

আলিয়ার মা বললেন,
“- সামনে ওর টেস্ট, তারপর ফাইনাল। তুমি এ মাসে অনেক কামাই করেছো। এরকম করলে হয় না”।

মৃত্তিকা নুইয়ে পরল। কেউ জানে না মৃত্তিকার বিয়ে হয়েছে। এখন যদি মৃত্তিকা বলে বিয়ে হয়েছে এজন্য ঠিকমতো আসতে পারেনি, তাহলে বিয়ে নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠবে। যার উত্তর মোটেই ইতিবাচক হবে না। এমতাবস্থায় নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিই বা বলার থাকতে পারে?

“- আন্টি একটু পারিবারিক ঝামেলার কারণে আসতে পারিনি। আমি ভেবেছি শুক্র-শনিবারে এসে সিলেবাস শেষ করে দিবো”।

আলিয়ার মা একটু রয়েসয়ে বললেন,
“- এটা তোমার আগে বলা উচিত ছিল। আমি নতুন টিচারকে কাল থেকেই আসতে বলেছি।”

বলার মতো আর কিছুই রইল না মৃত্তিকার। তবে বুকটা ভার হয়ে আসল। এতদিনের সম্পর্ক এই পরিবারটির সাথে। অথচ এ সমস্যাটা একটু খোলামেলা আলোচনা করল না তারা, একটিবার জানতে চাইল না পড়াতে না আসার কারণ কী? মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আলতো হেসে বলল

“- ঠিক আছে আন্টি। সমস্যা নেই”।

একটু পর নাস্তা দেয়া হলো মৃত্তিকাকে। নাস্তাটা গলা দিয়ে নামল না মৃত্তিকার। হাত ছোঁয়াল না খাবারটায়। তিক্ততায় বুক-পিঠ পুড়ে উঠল। দুটো টিউশনি ছিল হাতে, একটি চলে গেল। এখন কি করবে? দেড় ঘন্টা কোনোমতো পড়িয়ে বের হবার সময় আলিয়া হুট করে কেঁদে ফেলল। চোখ ভিজে উঠল মৃত্তিকার ও। তবুও মনকে শক্ত করে বলল,

“- আরে, কাঁদছো কেন? নতুন ম্যাম আসবে, সেও তোমাকে ভালো পড়াবে। তার সাথেও ভালো সম্পর্ক রাখবে ঠিক আছে”?

আলিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে,
“- আমি আপনাকে ম্যাম ভাবিনি, সবসময় আপু ভেবেছি। আপনি আর আসবেন না”?

মৃত্তিকার মায়া হয় মেয়েটার জন্য। তার ও তো খারাপ লাগছে। টিউশনি চলে যাওয়ার চেয়ে এই আদুরে মেয়েটাকে চিরকালের জন্য বিদায় দিতে হচ্ছে এটা আরো বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে তাকে। মানুষ সামাজিক জীব। মায়া, দয়া, ভালোবাসা এসব তাদের সহজাত। একসাথে অনেকটা সময় কাটালে মানুষের প্রতি মানুষের টান সৃষ্টি হয়। মৃত্তিকা আলিয়াকে বুকে আগলে নিয়ে বলল,

“- মাঝে মাঝে আসবো, চিন্তা করো না। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। কেমন”?

আলিয়া মাথা নাড়ল। মৃত্তিকা দাঁড়াল না আর। যত দ্রুত সম্ভব পা চালিয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। খিদে পেয়েছে বড্ড। দোকান থেকে এক প্যাকেট বিস্কিট কিনল সে। ভাবল হেঁটেই বাড়ি ফিরবে। বিস্কিট চিবুতে চিবুতে রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটছিল মৃত্তিকা। কর্কশ কণ্ঠে তার ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। বিস্কিটের প্যাকেট মুড়িয়ে তা ব্যাগে ঢুকিয়ে হাত ঝেরে ফোনটা বের করে মৃত্তিকা। মৃত্তিকার মা ফোন করেছেন। সচরাচর ফোন করেন না। ও বাড়ির কেউ খুব একটা পছন্দ করে না মৃত্তিকাকে। আফিমের সাথে সে আছে, এটা ওরা পছন্দ করে না। তাই খোঁজ খবরও নেয় না তেমন। মায়ের ফোনটা তুলেই মৃত্তিকা সালাম জানাল।

“- কেমন আছো মা”?

“- ভালো আছি, তুই কেমন আছিস”।

মৃত্তিকার হঠাৎই কান্না পেল। নরম মন মায়ের উৎকণ্ঠায় গলে গেল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে কান্না নিবারণ করার চেষ্টা চালাল মৃত্তিকা। বলল,

“- আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো আছি। বাড়ির সবাই কেমন আছে”?

ওপাশ থেকে উত্তর আসল,
“- সবাই ভালো আছে। শোন না মৃত্তি, বাড়িতে আসবি আজ? তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে”।

মৃত্তিকা দুর্বল, ক্লান্ত ঠোঁটে হাসে। মায়ের কান্না গিলে ফেলার দৃশ্যটা ভেসে ওঠে মানসপটে। বলে,
“- ভাইয়া আর আব্বু যে রাগ করবে”।

“- ওরে, বাবা-মা সন্তানের খারাপ চায় না। তুই যদি একবার এসে তোর আব্বুর সামনে দাঁড়াস, তোর আব্বু তোকে ফেরাবে ভেবেছিস”?

মৃত্তিকার চোখ জোড়া উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মৃত্তিকা জানে, তার বাবা কতটা ভালো মানুষ। মৃত্তিকাকে অনেক ভালোবাসে আতিকুর রহমান। তার ভালোবাসায় কৃত্রিমতা নেই। অভিমানের আড়ালে সেই ভালোবাসা ধামাচাপা পড়লেও তার অস্তিত্ব ঠিকই আছে।

“- আমি তো যেতে চাই মা। অনেকদিন হলো তোমাদের দেখি না”।

“- তুই নেই বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তোর বাবার দোকান চলে না, মালামাল তুলতে হবে। ওদিকে হাজার হাজার টাকার জিনিসপত্র বেচে বাকির খাতা ভরাট করেছে। সেই টাকা চাইতে গেলে হুমকি দেয়। কি করবো কূলকিনারা পাই না।”

“-, আব্বুকে বারবার বলেছি বাকিতে কিছু বিক্রি করতে না”।

“-, তোর আব্বুর কয়েকদিন ধরে ইলিশ মাছ খেতে চায়। তোর ভাবি ইলিশ মাছের ঘ্রাণ সহ্য করতে পারে না। সে খাবে না বলে মেহমেত ও ইলিশ মাছ ঘরে আনে না। কয়েকবার বলেছি একটা মাছ আনতে, আমরা এখন বোঝা হয়ে গেছি”।

বুক ভার হয়ে আসে মৃত্তিকার। প্রতিনিয়ত জীবন তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। তার আব্বু এক টুকরো মাছ খেতে চেয়েছে, ভাইয়া তাও দিতে পারছে না। জাহানারাই হয়তো না করেছে মাছ আনতে। মৃত্তিকা ব্যাগে লুকায়িত খামটার দিকে চেয়ে বলে,

“-, আফিম আমাকে অনেকগুলো টাকা দিয়ে রেখেছে মা। বাজারে গিয়ে দু কেজি ইলিশ মাছ কিনবো, তোমার জন্য ফল কিনবো। তারপর যাবো”।

মৃত্তিকার মা বাঁধা দিল। বলল,
“- টাকাটা গুছিয়ে রাখ, খরচ করিস না।”

“- তুমি ভেব না। আফিইম আমাকে হাত খরচ দেয়”।

ফোনটা কেটে দেয় মৃত্তিকা। আজ বড়সড় একটা মিথ্যে বলল সে। আফিম বেকার, ভবঘুরে। তার আয় রোজগার নেই। নিজে কি খায় তারই ঠিক নেই। মৃত্তিকাকে আবার খরচ দেবে? দিলেও মৃত্তিকা নেবে কেন? সে স্বাবলম্বী, সৎ পথে রোজগার করছে। চাকরিও করবে এক সময়। আফিম গুণ্ডামি করে অনৈতিক উপায়ে টাকা হাসিল করবে, মৃত্তিকা সেসব ছুঁয়েও দেখবে না। কিন্তু নারীর একটা বিশেষ গুণ আছে। এরা স্বামীদেরকে কখনো ছোট হতে দেয় না। নিজের পরিবারের সামনে তারা স্বামীকে উঁচু স্থানে বসায়, স্বামীদের ইতিবাচক গুণগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করে। কখনো নিজেকে সুখী দেখাতে আর জীবনসঙ্গীকে ভালো প্রমাণ করতে মিথ্যেও বলে অনর্গল।

মৃত্তিকা বাজারে গিয়ে বড় দেখে দামী, টাটকা ইলিশ মাছ কেনে। মায়ের জন্য দু পদের ফল আর ইরহামের জন্য চিপস, চকলেট কেনে। আফিমকে না জানিয়েই নিজের বাড়ির দিকে রওনা হয় সে। পরিবারের মানুষগুলোকে দেখার, নিজের ঘরটাকে দেখার খুব ইচ্ছে জাগছে আজ। মন খারাপ কিছুটা কমেছে।


নিজের বাড়িতে পা রাখার পর হৃদয় দুলে উঠল মৃত্তিকার। দাপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল কিছুক্ষণ। মৃত্তিকার আব্বু মৃত্তিকাকে এক নজর দেখলেন। তেমন কোনো অভিব্যক্তি দেখালেন না। মৃত্তিকার মা মৃত্তিকাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মেহমেত অফিসে, জাহানারা ঘুমিয়েছে। ইরহাম মৃত্তিকাকে দেখার পর চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল মেয়েটার নরম গাল। আলতো আলতো স্বরে ছেলেটা বলল,

“- মনি তুমি খুব পচা। তুমি কেন আসো না? আমি তোমাকে মিসু করি”।

মৃত্তিকা হামি দেয় ছোট্ট গালটায়। ইরহামের হাতে খাবার তুলে দিতেই বাচ্চা ছেলেটা নেচে ওঠে। পর পর চুমু খায় মৃত্তিকার গালে। মৃত্তিকার বুকের মাঝে বিড়াল ছানায় ন্যায় মুখ গুঁজে বসে। বলে,
“- তোমাকে কোথাও যেতে দিবো না আর। তুমি আমার সাথে থাকবে”।

চোখে জল জমে মৃত্তিকার। আদুরে বাচ্চাটাকে বুকে চেপে বসে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। অতঃপর বাচ্চাটাকে নিয়ে রান্না ঘরে আসে। একটা পিড়িতে ইরহামকে বসিয়ে মৃত্তিকা ইলিশ মাছ ধুয়ে, কেটে নেয়। আজ সে নিজেই রান্না করবে। টমেটো দিয়ে ডাল আর ইলিশ মাছ হবে রাতের খাবার। ইরহামের হাতে নিজের ফোন তুলে দিয়ে মাছ কেটে ধুয়ে ফ্রিজে রাখে মৃত্তিকা। ফিরে আসে নিজের ঘরটায়। তার বিছানায় লম্বালম্বি ভাবে শুয়ে আছে জাহানারা। ইরহামের খেলনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে। মৃত্তিকা মেঝে থেকে সব খেলনা তুলে ঝুড়িতে রাখে। শব্দে নড়েচড়ে ওঠে জাহানারা। মৃত্তিকাকে দেখে সে চমকায় ভীষণ। বলে,

“- তুমি কখন এলে”?

মৃত্তিকার মনে কারো প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই। জাহানারার ওজন এ কদিনে অনেক বেড়েছে। ডেলিভারির ডেট খুব কাছেই। ভারী শরীরটা মুড়ে সে আবার প্রশ্ন করে,

“-, তুমি আসবে আগে জানাবে না? এ ঘরে তো এখন আমরা থাকি”।

মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। বলে,
“- মানে? এ ঘর তো আমার, আমি তো একেবারের জন্য চলে যাইনি”।

“- ওই ঘরে এত জিনিস আটে? গাদাগাদি করে সব রাখা। ইরহাম খেলতে পারে না ঠিকমতো। তাই তোমার ঘর ব্যবহার করি, তুমি তো আসবে না জানতাম”।

মৃত্তিকার রাগ হলেও কিছু বলে না। বরং বিনয়ী সুরে বলে,
“- এবার থেকে প্রায় আসবো ভাবি। এতকাল ওই ঘরে থাকতে পেরেছো, যেই আমি চলে গেছি। অমনি তোমার মনে হলো ইরহামের জন্য খেলার জায়গা দরকার”?

রেগে উঠল জাহানারা। বলল,
“- একদম খোঁচা মেরে কথা বলবে না”।

মৃত্তিকা ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চাইল। সে মুহুর্তে দরজায় আতিকুর রহমান এসে দাঁড়ালেন। গম্ভীর, ভারী কণ্ঠে জাহানারাকে বললেন,

“- মৃত্তিকার ঘর খালি করে দাও। এটা স্টোর রুম না। সব গুছিয়ে নিজের ঘরে ফিরে যাও”।


নটার দিকে বাড়ি ফিরে ড্রইংরুমের কাউচে বসে মৃত্তিকাকে ডাকছে আফিম। এক গ্লাস পানি চেয়ে কয়েকবার ডেকেও মেয়েটার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে সে।

“- অ্যাই মৃত্ত, শোনো না”।

মৃত্তিকা আসে না। মৃত্তিকার পরিবর্তে আফিমের ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে গ্লাস ভরে পানি নিয়ে আসে তন্বী। গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আফিম তন্বীর দিকে তাকায়। তন্বীর পরনে হলুদ শাড়ি। কপালে টিপ। স্বচ্ছ চোখ জোড়া আফিমের দিকে নিবদ্ধ। তাকে দেখে কপালের ভাজ দৃঢ় হয় আফিমের। বলে,

“- মৃত্তিকা কোথায়, তুমি আনতে গেলে কেন”?

তন্বী বলে,
“- আগে খাও তারপর বলছি”।

আফিম কলার ঝেরে বলল,
“- লাগবে না ”।

তন্বী আশ্চর্যিত সুরে বলল,
“- ও মা, এখনই তো পানির জন্য চেঁচামিচি করছিলে। পানি পান না করেই পিপাসা মিটে গেল”?

আফিম শার্টের হাতে গুটিয়ে কাউচে গা এলিয়ে বলল,
“- তুমি বুঝবে না তন্বী। পানির পিপাসা পায়নি আমার। একটা আদুরে মেয়েকে দেখার পিপাসা পেয়েছে। পানি একটা ছুতো মাত্র”।

তন্বী হাসল। বলল,
“-, বাহ্, এত প্রেম? কে যেন বলেছিল মেয়েদের বিশ্বাস করি না”?

আফিম একই সুরে উত্তর দিল,
“- মৃত্তিকা ব্যতিত কাউকেই বিশ্বাস করি না।”

“-, আমাকেও না”?,

“-, না”।

আফিমের অকপট স্বীকারোক্তিতে তন্বীর মুখ খানা মলিন হয়ে উঠল। ভালো না বাসুক, ভালোবাসা সে চায় ও না। তবে পছন্দের পুরুষের মুখে এমন কথা শুনতে কার ভালো লাগে? এভাবে মুখের উপর কথাটা না বললে কোনো ক্ষতি হতো কী? এতদিনের জানাশোনায় কখনো তন্বীকে আফিমের ভালো মেয়ে বলে মনে হয়নি?

“-, এতটা ভালোবাসার কারণ? মৃত্তিকার মাঝে বিশেষ কী পেয়েছো তুমি? যা অন্যান্য মেয়েদের থেকে মৃত্তিকাকে আলাদা করে”?

“- মৃত্তর চোখ, মৃত্তর কান্না। ওর কান্নায় কৃত্রিমতা নেই, নাটুকেপনা নেই। ওর কান্না ওর মতোই স্বচ্ছ, পবিত্র”।

তন্বী ফিক করে হেসে বলল,
“- কেবল এ কারণে মৃত্তিকাকে অন্যান্য মেয়েদের থেকে আলাদা চোখে দেখো?, পবিত্রটা তো অনেক মেয়ের মাঝেই আছে”।

“- উঁহু, মৃত্তিকা নিখুঁত।”

“- ভুল বললে, পৃথিবীর কেউই সব দিক থেকে পার্ফেক্ট হতে পারে না।”

“- এ পৃথিবীর সবাই আমাকে চেয়েছে। কিন্তু আমি মৃত্তকেই চেয়েছি। যা সহজে পাওয়া যায়, তা আফিম মির্জা গ্রহণ করে না।”

“-, সহজ ছিলাম, সহজলভ্য ভেবেছো”?

আফিম নিজের ললাটে আঙুল ঘষে স্ফীত হেসে বলে,
“- মনে আছে, তুমি বলেছিলে স্বচ্ছ, পবিত্র ভালোবাসা আমার মতো বখাটেদের জন্য নয়? দেহ, ছোঁয়া, নগ্নতাই আমাকে বশীভূত করতে পারে। চেষ্টাও তো করেছিলে কয়েকবার। মৃত্তিকার আর তোমার পার্থক্য এ অর্থেই বোঝা যায়”।

লাজ, অপমানে নতজানু হয় তন্বী। অবিলম্বে কটুক্তি মেনে নিতে বড্ড কষ্ট হয় মেয়েটার। তবুও হেসে বলে,
“- বয়স কম ছিল, ভালোবাসার অতল গহীনে তলিয়ে গিয়েছিলাম। তখন মান-মর্যাদা, ভুল-পাপ কোনো কিছুই বেমাসাল প্রেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তখন ভালোবাসাই মূখ্য, ভালোবাসাই প্রাধান্য ছিল। যদি আমার চোখ দিয়ে দেখতে, বুঝতে কতটা বেহায়া হয়েছিলাম আমি”।

“- মৃত্তিকাকে আমার স্রেফ পছন্দ না, বাড়াবাড়ি রকমের পছন্দ। তাই ওর খুঁত আমার চোখে পড়ে না”।

“- তুমি ভাবছো তোমার কাছে আমার দাবি আছে? না, অভিযোগ আছে গুটিয়েক, অভিমান আছে পাহাড়সম। দাবি-দাওয়া কিচ্ছুটি নেই।”

আফিম তির্যক হেসে বলে,
“-, রায়ান পাগলের মতো ভালোবাসে তোমাকে। ওর সাথে প্রতারণা করার চেষ্টা করলে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব এ কথা ভেব না।”

“- রায়ানকে ঠকানোর কথা আমি ভাবতেও পারি না।

মৃদু শাসিয়ে আফিম চলে যায় সিঁড়ি মাড়িয়ে। তন্বী তখন বলে,

“- মৃত্তিকা বাড়িতে নেই”।

থেমে যায় আফিমের পা। হাত ঘড়ির দিকে নজর বুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে সে,

“- বাড়ি নেই”?

“- না, টিউশন পড়াতো গিয়েছিল। আর ফেরেনি”।

হতভম্ব হয়ে পড়ে আফিম। মৃত্তিকা তো রাতে কোথাও যায় না। তৎক্ষণাৎ রেগে গিয়ে আফিম বলে ওঠে,
“-, তুমি আমায় একবার জানাবে না? সারাটাদিন মৃত্ত বাড়িতে নেই, এ কথা আগে বলবে না আমাকে? ফাউল প্যাঁচাল না পেরে এ কথাটা তোমার আগে জানানো উচিত ছিল”।

তন্বী বলে,
“- কিভাবে জানাবো? তুমি আমায় ব্লক করে রেখেছো। আর রায়ান ব্যস্ত, আজ কথা হয়নি। আমি ভেবেছিলাম তোমার একসাথে আছো”।

আর কিছু শোনার মতো ধৈর্য হলো না আফিমের তড়িৎ বেগে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো দ্রুত। দরজার দিকে অগ্রসর হতে হতে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে কল দিল মৃত্তিকার নম্বরে। আশ্চর্যজনক ভাবে মৃত্তিকার ফোন বন্ধ। চিন্তার ভাঁজ দেখা দিল মৃত্তিকার ললাটে। দ্রুত বাইকটা বের করল গ্যারেজ থেকে। তীব্র বেগে, ধুলো উড়িয়ে শাই শাই করে পিচঢালা রাস্তায় ছুটে চলল আফিমের বাইকটি। চোখের পলকে সীমানা ছাড়িয়ে উড়ে গেল হাওয়ার মতো। গতি এতটাই বেশি যে শব্দ তুলছে। আফিমের শার্ট বুকে বারি খাচ্ছে বারবার। হেলমেটের আড়ালে সবুজাভ চোখ তীক্ষ্ণ, সুচালো হয়ে উঠেছে। আফিম বারবার কল দেয় মৃত্তিকার নম্বরে। ফোনটা সুইচড অফ দেখাচ্ছে।

আশপাশে কয়েকবার চক্কর কেটে আফিম সোজা চলে যায় মৃত্তিকাদের বাসায়। মৃত্তিকা তখন রান্নাঘরে মন দিয়ে কাজ করছে। ইরহামের হাতে ফোন দিয়েছিল। ছেলেটা গেইম খেলতে খেলতে ফোন অফ করে ফেলেছে। ফোন চার্জে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু চার্জ বাড়ছে না। ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে। রান্নাবান্না শেষ করেই আশরাফ মির্জাকে কল করবে ভেবেছিল মৃত্তিকা। কিন্তু কাজের চাপে বেমালুম ভুলে গিয়েছে নিজের সংসারের কথা। পরিবারকে পেয়ে উৎফুল্ল মন ভুলে বসেছে সব। টেবিলে খাবার গুলো সাজিয়ে মৃত্তিকা সবাইকে ডাকে,

“- আব্বু, আসো খেয়ে নাও”।

টিভি দেখতে দেখতে জাহানারা বলে,
“- যা সহ্য করতে পারি না, তাই করতে হবে তোমাদের? ইলিশ মাছের গন্ধ আমার সহ্য হয় না জানো না”?

মৃত্তিকা হেসে বলে,
“- তোমার পছন্দ না হলেও বাকিদের পছন্দ। একজনের জন্য বাকিরা সাফার করবে? আমি তোমার জন্য ডাল আর শুটকি ভর্তা করে রেখেছি”।

আর কিছু বলল না জাহানারা। ইরহামের জন্য মাছ আলাদা ভেজে তুলে রেখেছিল। সবাই খেতে বসলে প্লেটে ভাজা মাছ তুলে ইরহামের মুখে তুলে দেয় মৃত্তিকা। কার্টুন দেখতে দেখতে ইরহাম আনন্দ করে খাবারটুকু খেতে থাকে। আতিকুর রহমানের মেজাজ কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছে। তিনি বললেন,

“- মাছ আরো আছে? ভালো রেঁধেছ। তোমার মায়ের রান্না মুখে তোলাই যায় না। অনেকদিন পর তৃপ্তি করে খাচ্ছি”।

মৃত্তিকা হেসে উঠল। ভালো লাগায় ছেয়ে গেল হৃদয়। বলল,
“- আছে, দাঁড়াও দিচ্ছি”।

উঠে এসে বাবার পাতে আরো এক টুকরো মাছ তুলে দেয় মৃত্তিকা। মেহমেত খেতে খেতে বলে,

“- মৃত্তি, কয়েকটা দিন এখানে থাক। তোর ভাবি অসুস্থ থাকে, ইরহামকে সামলানো কঠিন হয়ে যায়। এসময় কাছে কেউ থাকলে, মন-মেজাজ ও ভালো থাকে”।

ভাতের লোকমা ইরহামের হাতে তুলে দিয়ে মৃত্তিকা বলে,
“-, এভাবে বলছো কেন? সমস্যা হলে আমি থেকে যাবো। নতুন সদস্য আসবে, আমি খুব খুশি”।

খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই সকলে শুতে যায়। মৃত্তিকা এ সুযোগে ফোনটা হাতে নিতেই দরজায় কড়াঘাত করে কেউ। ওড়নার কোণা মাথায় তুলে দরজা খোলে মৃত্তিকা। দরজা মেলতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে আফিম। ক্রোধে লোকটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। মৃত্তিকা কিছু বলার পূর্বেই আফিম তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘরে। মৃত্তিকার ঘরে এসে দরজা আটকে এবার সে প্রচণ্ড শান্ত স্বরে বলে,

“- ফোন কোথায় তোমার”?

মৃত্তিকা থতমত খেয়ে বলে,
“- অফ হয়ে গেছে। চার্জ উঠছে না”।

“- ফোনটা দাও”।

মৃত্তিকা ভাবে আফিম তার কথা বিশ্বাস করছে না। তাই স্বাভাবিক ভাবেই নিজের ফোন খানা এগিয়ে দেয় মৃত্তিকা। ফোনটা হাতে নিয়েই সজোরে তা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে আফিম। তার প্রবল শক্তির দরূন মুঠোফোন মেঝেতে পরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। কাচ ছড়িয়ে পড়ে ঘর জুড়ে। বিকট শব্দে ভয় পেয়ে যায় মৃত্তিকা। আফিম তীব্র ক্ষোভে ফেটে যায়। বলে,

“- বাড়ি চলো”।

মৃত্তিকা গাইগুই করে বলে,
“- আমি এখানে কিছুদিন থাকবো”।

আফিম গর্জন করে বলে,
“- আমি রেগে যাচ্ছি মৃত্তিকা, আমার অবাধ্য হবে না”।

মৃত্তিকার ভয় হয় আফিমকে। তবুও বলে,
“- বোঝার চেষ্টা করুন, ভাবী অসুস্থ, আমাকে থাকতে হবে”।

রাগে দিগবিদিক হারায় আফিম। একে তো তাকে না বলে মৃত্তিকা তার বাবার বাড়ি এসেছে তার উপর আফিমকে ফোন করে জানায়নি সে। বাড়ি ফেরার পর মৃত্তিকাকে না পেয়ে কতটা ভয় পেয়েছিল আফিম, তা কী মৃত্তিকা জানে?বোঝে? এ বাড়িতে না সে নিজে থাকবে আর না মৃত্তিকাকে থাকতে দেবে।

“- তুমি এখনই আমার সাথে যাবে”।

“- না, আমি যাবো না”।

“- যাবে না?”

“- না”?

“- ভেবে বলছো”?

“- ভেবে বলছি”।

“- তুমি আমার অবাধ্য হলে আমিও বাঁধ মানবো না মৃত্তিকা”।

মৃত্তিকা বুঝল না। বলল,
“- কিসের বাঁধ”?

আচমকা মৃত্তিকার দেহ টেনে নিল আফিম। মৃত্তিকার ছোট্ট, মোলায়েম শরীরটা নিজ শরীরের মাঝে মিশিয়ে নিয়ে ঘন ঘন দম ফেলল ছেলেটা। মৃত্তিকার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল, কেঁপে উঠল কোমল কায়া, হৃদপিণ্ডে ঝংকার শুরু হলো। অবিলম্ব মৃত্তিকার পুরো মুখে একের পর এক ক্রমাগত শব্দ করে চুমু খেল আফিম। তার চুমুর তোপে নরম গাল দেবে গেল মৃত্তিকার। মৃত্তিকার গালের ফোলা অংশ হা করে মুখে পুড়ে নিয়ে চুষে নিল আফিম। মেয়েটার রক্তিম হয়ে উঠল ফর্সা গাল, দাঁতের ঘর্ষণ পড়ল মুখে। নাজুক দেহ অসাড় হয়ে উঠল। আঁকড়ে ধরল আফিমের পিঠ। ধরফর করে আকুতি করে বলল,

“- ছেড়ে দিন না”।

আফিম শুনল না মোটেই। থুতনিতে সজোরে
কামড় বসাল। মৃদু চিৎকার করে উঠল মৃত্তিকা। দু হাতের ভাঁজে আফিম এমন ভাবে তার শরীরটা আবদ্ধ করেছে যে পালানোর ফাঁকফোকর নেই। মৃত্তিকা ফের অনুনয় করে বলে,

“- আমি যাবো আপনার সাথে, অবাধ্য হবো না একটুও। এবার ছাড়ুন”।

থেমে গেল আফিম। তার ঠোঁট জোড়াও স্থির হলো মৃত্তিকার গালে। বলল,

“- আচ্ছা এটাই শেষ”।

বলে মৃত্তিকার ঠোঁটের কোণে শব্দ করে, ছোট্ট চুমু বসাল আফিম। মৃত্তিকার দু গাল আঙুল দিয়ে চেপে ধরল। আঙুলের চাপে অধরজোড়া ফুলে উঠল মেয়েটার। সেই অধরে সবুজাভ চোখ বুলিয়ে আফিম নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,

“- মনে আছে? তোমার ঠোঁটে আমার প্রথম চুমু পড়েছিল এ ঘরে থাকতেই। অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্খিত চুম্বন ঘটেছিল। তুমি অসুস্থ ছিলে, হুঁশ ছিল না। না চাইতেও ওই মুহুর্তটা তুমি উপভোগ করেছিলে। করো নি বলো”?

মৃত্তিকা হাঁসফাঁস করে। দানবীয় বুকে মিশে আছে সে। আফিমের পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়েছে। তবুও তার উচ্চতা নেহাৎই কম। আফিমের এক হাত তার কোমর আঁকড়ে ধরেছে। অন্য হাত গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে। লজ্জা, অস্বস্তিতে চোখ তোলার সাহসটুকুও নেই মেয়েটার। আফিমের এহেন মোহগ্রস্ত কণ্ঠে নুইয়ে পরল মেয়েটা। আফিম পুনরায় একই সুরে ডাকল,

“- নেশা”।

নড়ে উঠল মৃত্তিকা। তবুও মুখ তুলল না। আফিম ডাকল আবারও,

“-, অ্যাই নেশাআআআ। নেশা জাতীয় পদার্থ আমি, অথচ নেশা ধরিয়ে দাও তুমি।”

আফিম মৃত্তিকার ঘাড়ের কাছে মুখ এনে শুকে নেয় মেয়েলি শরীরের ঘ্রাণ। তির তির করে কেঁপে ওঠে মৃত্তিকা। হাড়-গোড় সব বেঁকে আসে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে মেয়েটা। জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় বারবার। নিঃশ্বাসের তোপে বুকের ওঠানামা বাড়ে।

“- এমন করছেন কেন”?

“-, তুমি এমন করছো কেন”?

“-, কেমন করছি”?

“-, আমাকে না বলে এসেছো কেন”?

“-, আমি একটু পরই বলতাম”।

মৃত্তিকার চোখে পানি। আফিম ঠোঁটে আঙুল বুলাতেই ভাসমান চোখ জোড়া থেকে জলপ্রপাতের ন্যায় পানিধারা বয়ে যায় গাল বেয়ে। আফিম বলে,

“- মেরেছি তোমাকে? দেখেছো কতটা ধৈর্যবান আমি? আগের আমি হলে এতক্ষণে তোমাকে বন চটকানা মেরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতাম। আমি কি তা করেছি? ভালো ভাবে বোঝাচ্ছি”।

মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয় আফিমের পানে। মানুষটা উন্মাদ। কখন কি করে বোঝা যায় না। রাগ দেখাতে এসে কত কিছু করে ফেলল। একটুও অনুশোচনা নেই মানুষটার মাঝে।

“- কাঁদছো কেন? ভালোবাসলে কেউ কাঁদে”?

নরম সুর। আফিমের এত মোলায়েম সুর মৃত্তিকাকে দোলাচালে ফেলে। সংশয় চেপে বলে,

“- অনেকদিন পর এসেছি। ভাইয়াকে কথা দিয়ে ফেলেছি। বলেছি কয়েকদিন থাকবো। এভাবে চলে যাওয়া যায় না”।

আফিম ছেড়ে দেয় মৃত্তিকাকে। বলে,
“- আমি তোমাকে এখানে রাখবো না। আমার বাড়িতে, আমার ঘরে, আমার সাথে থাকবে তুমি।”

মৃত্তিকা কেঁদে ফেলল। বলল,
“-, থাকি না? আমার এখানে ভালো লাগছে”।

আফিম দু কোমরে হাত চেপে মুখ গোল করে শ্বাস ফেলে বলে,

“-, ঠিক আছে, আজকের রাতটুকু থাকবে, কাল নিতে আসবো আমি”।

আফিম দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে নিলে মৃত্তিকা এক অপ্রত্যাশিত আবদার করে বসল। জ্ঞান-হুশ হারিয়ে মেয়েটা বলে উঠল,

“-, আপনি থেকে যান না এখানে”।

আফিম থমকাল। মৃত্তিকা অতশত ভেবে বলেনি। বিয়ের পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার এ বাড়িতে এসেছে আফিম। প্রতিবারই রেগে ফিরে গিয়েছে। আজও চলে গেলে কেমন দেখায়। মা জানলেও রাগ করবে। একজন বাড়িতে এলে তাকে এভাবে যেতে দেয়া অনুচিত। আফিম সন্দেহী সুরে চোখ ছোট ছোট করে বলে,

“- ভেবে বলছো”?

মৃত্তিকা হাস ফাঁস করে বলে,
“- ভদ্র হয়ে থাকবেন? দুষ্টুমি করবেন না তো”?

ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে আফিম। বলে,
“- ভয় পাচ্ছো”?

ওড়নায় আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে মৃত্তিকা বলে,
“- একটু সভ্য হলে কি হয়?”

“- আমি অসভ্য”?

“-, মাত্রাতিরিক্ত”।

আফিম দু হাত বুকে গুঁজে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বলে,
“-, তোমাকে দেখলে আমার প্রেম প্রেম পায়। এটা কি আমার দোষ”?

মৃত্তিকা রাগ দেখিয়ে বলে,

“- প্রেম প্রেম আবার কিভাবে পায়? আমি কি আপনার প্রেমিকা”?

“- উঁহু, প্রিয়তমা”।

মৃত্তিকা ভয় পায় এবার। বলে,
“- আপনি কি ওইসব খেয়েছেন”?

“- কোনসব”?

“- এমন ভাবে কথা বলছেন কেন”?

“- তুমি নিজেই নেশা, তোমাকে পান করেই মাতাল হতে চাই”।

থেমে গেল মৃত্তিকা। কথা ঘুরিয়ে বলল,
“- ভাত খাবেন”?

“-, না”।

“- খেয়ে এসেছেন বাড়ি থেকে”?

“- না”।

“- তাহলে”?

“- কে রান্না করেছে”?

“- আমি করেছি”।

“- খাবারটা ঘরে আনবে”।

বলেই চট করে বিছানায় উঠে বসল আফিম। মৃত্তিকা মেঝেতে পরে থাকা ফোনের দিকে তাকাল। মুহুর্তেই মন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল মেয়েটার। রাগ দেখিয়ে বলল,

“-, আপনি আমার ফোনটা ভাঙলেন কেন? জানেন ফোনটা আমার কত শখের ছিল?”

আফিম তোয়াক্কা না করে বলল,
“- তুমি ফোন তোলোনি। দোষটা তোমার”।

“- ফোন তুলিনি বলে ফোনটাই ভেঙে ফেলবেন? এখন আমি ফোন পাবো কোথায়”?

“- নতুন কিনে দেবো”।

“-, টাকা কোথায় পাবেন”?

“- তোমাকে ভাবতে হবে না”।

“- মাস্তানি করে, চাঁদা তুলে আমার জন্য ফোন কিনবেন না। এর চেয়ে ভালো আমি ফোনই ব্যবহার করবো না”।

চলবে?

[নোটঃ রি-চেইক হয়নি। সুন্দর সুন্দর মন্তব্য না পেলে পরের পর্ব দিতে লেট হবে। আর অবশ্যই ২.৫কে করে দিবেন।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply