Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১৭


ওরামনেরগোপনচেনেনা

পর্ব সংখ্যা [১৭]

বৃষ্টি পরবেই। বাতাস আসছে, মেঘ ডাকছে। বজ্রধ্বনিতে কখনো কান ঝা ঝা করে উঠছে। আফিম দু পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে ব্যথার ছাপ নেই ছেলেটার। গা-ছাড়া ভাব নিয়েই থাকে সর্বক্ষণ। বৃষ্টি আসবে, আফিমের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। বাতাসের ঝাপটায় তার চুলগুলো ললাটে এসে ভিড় করছে, হাওয়ার দাপটে পাতলা ফিনফিনে শার্ট বুকের উপরিভাগ থেকে সরে যাচ্ছে। উন্মুক্ত হচ্ছে চওড়া, প্রশস্ত বুক।

মৃত্তিকা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। তার সতর্ক চোখে আশপাশটাও দেখে নেয়। মৃত্তিকা আফিমকে সাহায্য করছে জানলে আশরাফ মির্জা ভীষণ রেগে যাবেন। তাই এত সতর্কতা অবলম্বন করছে মেয়েটা। ধীর পায়ে সে বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরের বিশাল আকারের উদ্যানে। ছোট ছোট ঘাস গুলো পায়ে মাড়িয়ে আসে আফিমের নিকট। বাতাসের দাপটে ওড়না, কামিজের কাটা অংশ উড়ে যাচ্ছে। অবিন্যস্ত চুলগুলো মুখে ধাক্কা খাচ্ছে। মৃত্তিকা বের হতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিকণা ধরণীতে শীতল করে তুলল। বর্ষাকাল শেষের পথে। তবুও বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে নেই। আচমকা তারা ভিজিয়ে দেয় সব। মৃত্তিকা এগিয়ে এসে ছাতাটা মেলে আফিমের মাথায়। দানবীয়, লম্বাটে দেহের উপরে ছাতা ধরতে মেয়েটা হাত উঁচু করে খানিক। তার ব্যস্ত চাহনি আফিমকে বড্ড টানে। এলোমেলো করে দেয় বেঁধে রাখা দৃঢ়তাটুকু। স্বচ্ছ চোখে চেয়ে রয় কোমল নারীটির দিকে। মৃত্তিকা খানিক চিন্তিত স্বরে বলে,

“- বৃষ্টি আসছে, ঘরে চলুন”।

আফিম গা ঝাড়া দিয়ে বলে,
“- ওই বাড়িতে আর ফিরবো না।”

ঠোঁট বাঁকায় মৃত্তিকা। ছাতার হাতল আরো শক্ত করে চেপে বিদ্রুপাত্মক স্বরে বলে,
“- মনে হয় বাবার কথা খুব শোনেন? খুব মানেন? আপনার বাবাকে আপনি পাত্তা দেন? সে বামে বললে আপনি চলে যান ডানে। দাঁড়াতে বললে বসেন, বসতে বলে হেঁটে চলে যান। এখন বাবার বাধ্যগত সন্তান হবার নাটক করতে হবে না”।

আফিম শোনে না। তার ঘাড়ের রগ বুঝি ত্যারা। পকেট থেকে হুট করে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সে। বিরক্তিতে গা রি রি করে মৃত্তিকার। বলে,
“- লজ্জা-শরম কি আল্লাহ্ আপনাকে একটু কম দিয়েছে? মেয়ে মানুষের সামনে বিষাক্ত ধোঁয়া উড়িয়ে খুব গর্বিত বোধ করেন?”

আফিম হাসে নিঃশব্দে। বলে,
“- সকাল থেকে কিছু খাইনি। ব্রেইন কাজ করছে না। এখন এটা না ধরালে মাথা হ্যাং হয়ে থাকবে”।

আফিমের সরল উত্তরে থমকায় মৃত্তিকা। সে ঘুমের ঔষধ খেয়েছিল। তবু ঘুম হলো না কেন? আফিমের চিন্তায়? রান্না করা খাবার গুলো ফ্রিজে রাখা। পর পর তিনদিন একই খাবার রান্না করেছে মৃত্তিকা, আফিম ফিরবে বলে। অথচ আফিম অনাহারে রয়েছে, খায়নি কিছুই। মৃত্তিকা নম্র কণ্ঠে বলে,
“- চলুন, খাবার বেড়ে দেই”।

আফিম শোনে না কিছুই। মৃত্তিকার চোখ পরে বাড়ির দরজার দিকে। দরজার সামনের সিমেন্টের ঢালাইয়ের উপর সাদা পাঞ্জাবি পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন আশরাফ মির্জা। চোখে চশমা লোকটার। মাথার উপরে ছাতা ধরে আছেন। অন্য হাতে আরো একটি বুঁজিয়ে রাখা ছাতা ধরে আছেন। এদিকেই এগিয়ে আসছিলেন তিনি। মৃত্তিকাদের দেখেই বোধহয় থামলেন। ছেলে আর ছেলের বউকে একসাথে দেখে আর এগোলেন না। আশরাফ মির্জাকে দেখতে মৃত্তিকা চমকায়। বাবা যতই আফিমের প্রতি রাগ দেখাক, মনে মনে ঠিকই তিনি আফিমের জন্য চিন্তিত। বৃষ্টি আসছে, ওদিকে আফিম বাড়ির বাইরে। এতগুলো দিন পর বাড়ি ফিরে তার ছেলেটা যে কোথাও যাবে না, এ কথা তিনি জানেন। তাই ছাতা নিয়ে প্রাণপ্রিয় ছেলেকে খুঁজতে বের হয়েছেন। ভেবেই মৃত্তিকা গাল ভরে হাসে। প্রশান্তি পায় খুব। আফিমের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে,

“- দেখুন, বাবা দাঁড়িয়ে আছে। বাবার হাতে বাড়তি ছাতাও আছে। বাবা যতই আপনার উপর রাগ দেখাক, আপনাকে কিন্তু বাবা খুব ভালোবাসেন। তাই আপনাকে বের করে দিয়ে তিনি নিজেও স্বস্তিতে ঘুমোতে পারেননি।”

আফিম বৃষ্টিকে ভেদ করে তার কঠোর চোখ নিক্ষেপ করে বাবার দিকে। তার বুকে প্রগাঢ় হাওয়া বয়। অক্ষিকোটর নির্লিপ্ত অথচ বুকে ঝড়। চোখ নামিয়ে নেয় ছেলেটা। তপ্ত আগুনের ন্যায় জ্বলে ওঠে চোখজোড়া। আশরাফ মির্জা ফিরে আসেন নিজ ঘরে। মৃত্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“- এবার তো চলুন”।

বৃষ্টির আওয়াজ আরো প্রকট হলো। ঝমঝম করে শব্দ তুলল। আফিম সেঁটে দাঁড়াল মৃত্তিকার বাহু ঘেঁষে। মৃত্তিকার হাতের উপরে হাত রেখে ছাতাট ধরল। কোমল সুরে বলল,

“- চলো”।


ঘড়ির কাটা ছটায় পৌঁছাতেই ঘুম ভেঙেছে মৃত্তিকার। আশরাফ মির্জা অফিসে যাবেন, তার লাঞ্চ রেডি করে দিতে হবে। সকালের নাস্তাও মৃত্তিকাই তৈরি করে। বাড়ির বুয়ারা বাকি সব কাজ করলেও মৃত্তিকা রান্নাবান্নার দায়িত্বটা নিয়েছে। একটু সকালে উঠেই পরোটা আর ডিম ভাজা, সালাদ আর গরুর কালা ভুণা করেছে। টিফিনবক্সে আশরাফ মির্জার লাঞ্চ প্যাক করে দিয়েছে। আটটার দিকে আশরাফ মির্জা বেরিয়ে গেছেন কাজে।

রান্নাঘর সাফ করার সময় বাড়ির সদর দরজার কলিং বেল বেজে ওঠে। মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দেখে রায়ান দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্তিকাকে দেখেই ছেলেটা সালাম জানায়। সালামের প্রত্যুত্তর করে মৃত্তিকা বলে,

“- তন্বীকে আপনি বিয়ে করেছেন”?

রায়ান মুচকি হাসে। তাকে এভাবে লাজুক ভঙিতে হাসতে দেখে অপ্রস্তুত হয় মৃত্তিকা। সে জানতো আফিমের বন্ধু গুলো আফিমের মতোই লজ্জাহীন। কোনো কিছুতে তারা অপ্রস্তুত কিংবা লজ্জিত হয় না। একেকটা বেয়াদব ছাড়া কিছুই না। আফিম তবুও মেয়ে দেখলে সংযম ধরে রাখে। বাকিরা ওড়না ধরে টানাটানি, ফিসফিসানি শুরু করে দেয়। রায়ানকে এমন লাজুক হাসতে দেখে মৃত্তিকা বলে,

“- তন্বী ঘরে আছে। আপনি যেতে পারেন”।

রায়ান শুধোয়,
“- আফিম উঠেছে”?

“- না, ঘুমোচ্ছে”।

“- আমি তাহলে আগে আফিমের সাথে দেখা করে আসি”।

মৃত্তিকা হেসে বলে,
“- এত সকাল সকাল যার জন্য এসেছেন, তার কাছেই আগে গিয়ে দেখা করে আসুন। আফিম মির্জা যে এত সকালে ওঠে না, তা আপনারা ছাড়া আর কে ভালো জানে বলুন”?

মৃত্তিকার হাসি মুখে এমন খোঁচা দেওয়া কথা শুনে তব্দা খায় রায়ান। বেকায়দায় পরে ছেলেটা। দোনামনা করে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। মৃত্তিকা গলা উঁচিয়ে বলে,

“- ৬ নম্বর রুমে আছে”।

রায়ান মৃত্তিকার থেকে আড়াল হতেই দৌড়ে যায় তন্বীর ঘরে। তন্বী ঘুমোচ্ছিল। রায়ানের তর সইল না। ধপ করে লাফ মেরে উঠে বসল নরম তুলতুলে খাটে। ঘুমের ঘোরেও হকচকিয়ে উঠল তন্বী। রায়ান মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরল অবিলম্বে। এমন ভাবে আষ্টেপৃষ্টে বক্ষমাঝে চেপে ধরল যে তন্বীর ঘুম ভেঙে গেল সাথে সাথে। সাত সকালে ঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় মেয়েটা রেগে উঠল। চোখ বুজেই বলল,

“- কোন খাটাশ রে? মেরে ফেলবি নাকি বোকাচো*দা।

তন্বীর গালি শুনে থ বনে যায় রায়ান। দাঁত দিয়ে জিভ চেপে ধরে। তন্বী নড়েচড়ে উঠতেই রায়ান ছেড়ে দেয় মেয়েটাকে। চোখ মেলে পাশে রায়ানকে দেখে তন্বী চেতে বলে,

“- চিপকাচিপকি করতে আসছো? হনুমান একটা, নিজের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মুরোদ নাই। আবার বউ দেখতে আসছে”।

রায়ান তন্বীর অভিযোগ শুনল না মোটেই। বরং গদগদ কণ্ঠে বলল,
“- এই তন্বী, তোমাকে মারাত্মক লাগছে”।

তন্বী ভেংচি কেটে বলল,
“- লাগবে না? নাইট ক্রিম মেখে ঘুমিয়েছি। দাম কত জানো? পাঁচ হাজার প্লাস”।

রায়ান খুক খুক করে কেশে ওঠে। এই মেয়েকে পাওয়ার জন্য কত পাগলামো করেছে। আর আজ পেয়ে বুঝতে পারছে বউয়ের কি ঝামেলা। তাকে কিছু বলতে না দেখে উঠে বসে তন্বী। আড়মোড়া ভেঙে বলে,
“- বিয়ে করেছি ঠিক আছে। লদকালদকি করতে পারবো না।”

রায়ানও উঠে বসল। জিজ্ঞেস করল,
“- এমন ভাবে বলছো যেন আমিই তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছি। তুমি কিছুই করোনি”।

তন্বী ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“- অচেনা কাউকে বিয়ে করার চেয়ে চেনাজানা কাউকে বিয়ে করলে অন্তত অস্বস্তিটা কম লাগে। তুমি আমাকে চেনো, আমিও তোমাকে চিনি। এডজাস্ট করতে অসুবিধে হবে না বলেই তো বিয়েটা করলাম”।

“- এটা তোমার এডজাস্ট করার নমুনা”?

“- রুকো, আগে ভালো করে মেনে নিই তুমি আমার বর, তারপর সব হবে”।

মৃত্তিকা সব গুছিয়ে তন্বীদের ঘরের সামনে আসে। দরজায় কষাঘাত করে বলে,

“- আপনাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করেছি। নিচে আসুন”।

মৃত্তিকা চলে আসার পর তন্বী চলে আসে নিচে। রায়ান যায় আফিমের ঘরে। তন্বী মেয়েটা সুন্দর। হলদে গায়ের রং, লালচে চুল, নজরকাড়া দেহের গড়ন। মেয়েটির মাঝে আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে। পরণের বেনারসী শাড়িটা অতিরিক্ত ভারি। মেয়েটা শাড়ি সামলাতে পারে না। কুচি খসে পরছে, তবুও সে নির্লিপ্ত। শাড়ি তুলে তন্বী কিচেনে আসে। মৃত্তিকা প্লেট ধুয়ে রাখছিল। তাকে দেখে তন্বী বলে ওঠে,

“-, তোমার নাম মৃত্তিকা”?

মৃত্তিকা মাথা নেড়ে জবাব দেয়।

“- জি”।

“- রায়ানের মুখে তোমার কথা শুনেছি। একটা কথা জিজ্ঞেস করবো”?

“- বলুন না”?

আশপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায় তন্বী। মৃত্তিকার কাছে এসে উৎসুক হয়ে বলে,

“- আফিম ভাইয়ের সাথে তোমার সম্পর্ক কতদিনের ছিল”?

মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকায় তন্বীর দিকে। বলে,

“- সম্পর্ক? আমাদের মাঝে সেরকম কোনো সম্পর্ক ছিল না”।

তন্বী চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে রয় মৃত্তিকার দিকে। আফিম আর রায়ানকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখা যায়। দুজন ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসে। টিভি অন করে ক্রিকেট ম্যাচ দেখে দুজন। ওদের দিকে চেয়ে তন্বী ফিসফিস করে মৃত্তিকাকে বলে,

“- একটা সিক্রেট বলবো। তুমি কিছু মনে করবে না তো”?

তন্বীর কথাবার্তায় রহস্য আছে বলে মনে হয় মৃত্তিকার। বাচনভঙ্গি তন্বীর চমৎকার। ভীষণ হাসিখুশি একটা মেয়ে। প্রাণোচ্ছল আর সাবলীল। মৃত্তিকা হেসে বলে,

“- বলুন আপু, আমি কিছুই মনে করবো না”।

তন্বী হাসে গাল ভরে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে বলে ওঠে,

“- আফিম ভাইকে আমি প্রায় ছয় বছর ধরে ভালোবাসি। জানো এটা? বলেছে তোমায় রাতে”?

মৃত্তিকা চমকায় ভীষণ। নড়েচড়ে দাঁড়ায়। গতরাতে বাইরে থেকে আসার পর আফিমকে খাবার বেড়ে দিয়েছে মৃত্তিকা। অভুক্ত থাকায় ছেলেটা কোনোদিকে না তাকিয়েই গোগ্রাসে গিলেছে খাবারটুকু। খাবার খাওয়ার পরই আফিম শুয়ে পরেছে। শরীর ক্লান্ত হওয়ায় বিছানায় গা মেলে দেয়ার সাথে সাথে ঘুমে তলিয়ে গেছে। গত সাতদিনের রহস্যজনক, লোমহর্ষক কথাগুলো মৃত্তিকার জানা হয়নি। সুযোগ হয়নি সব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ শোনার। এ মুহুর্তে তন্বীর মুখে এ কথা শুনে মৃত্তিকা শূন্য দৃষ্টিতে আড়চোখে দেখে আফিমকে। রায়ানের সাথে হাসিঠাট্টায় ব্যস্ত সে। থাই গ্লাসের ভেতর থেকে আফিমকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মৃত্তিকার মলিন মুখ দেখে তন্বী ফিক করে হেসে দেয়। বলে,

“-, চিন্তা করো না, আফিম ভাই আমাকে পছন্দ করে না”।

এরপর একটু থেমে তন্বী নিজেই বলা শুরু করে,

“- আফিম ভাই আমাদের ভার্সিটির সিনিয়র ছিলেন। উনি ছিলেন থার্ড ইয়ারে আর আমি এডমিশন দিয়ে সবে ঢুকেছি। প্রথম দিন ক্লাসে ঢোকার আগে আফিম ভাই আমাকে র‍্যাগ দেয়। কি র‍্যাগ দিয়েছিল জানো? বলেছিল “ভার্সিটিতে যতগুলো ওয়াশরুম আছে, সবগুলোর বদনা গুনতে হবে। লাল বদনা কতগুলো আর নীল বদনা কতগুলো তা ভাইয়াকে এসে জানাতে হবে”। তখন আমি খুব বোকা ছিলাম। ভেবেছিলাম এক ঘন্টা পর এসে নিজের ইচ্ছে মতো একটা সংখ্যা বলে দিব। করলাম ও তাই। রায়ান, শান্ত, রূপক আর আফিম ভাইয়ের কাছে এসে একটা সংখ্যা বলে ফেললাম। কিন্তু ওইযে, কপাল খারাপ। ওরা ধরে ফেলে আমার ছলচাতুরী। মিথ্যা বলায় আফিম ভাই খুব রেগে যায়। সাথে সাথে আফিম ভাই আমাকে আরো একটা ডেয়ার দেয়। বলে “ রাত দশটা থেকে দুটো পর্যন্ত হলের বাইরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে”। এই ডেয়ার শুনে আমি রুমমেটদের জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। এতগুলো ঘন্টা, কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবো হলের বাইরে, বিষয়টা কত লজ্জার বুঝতে পারছো? ওই বিপদটা থেকে আমাকে উদ্ধার করে রায়ান ভাই। এগারোটার পর পরই আফিম ভাইয়াকে বলে রায়ান আমার শাস্তি মওকুফ করে দেয়। এইযে আফিম ভাই আমাকে শাস্তি দিল, খারাপ ব্যবহার করল আমার সাথে, আমার উচিত ছিল তাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করা। কিন্তু আমি তা পারলাম না। প্রথমে দিনই আমি মন দিয়ে বসলাম তাকে। এত সুদর্শন একজন পুরুষ, অন্যরকম চোখ, ভার্সিটিতে তার রাজত্ব চলছো তখন। সবাই খুব পছন্দ করতো আফিম ভাইকে। তখন তো আফিম ভাই এত বড়সড় মাস্তান ছিল না। পড়াশোনা ঠিকঠাক ভাবে করতো।”

কথাটুকু বলে থামল তন্বী। মৃত্তিকা মনোযোগী শ্রোতার ন্যায় শুনে যাচ্ছে সব। তার চাহনিতে আগ্রহ মিশে আছে। তন্বী থামতেই মৃত্তিকা বলল,

“- তারপর কি হলো”?

হেসে তন্বী বলে,
“- আমি ভাইয়ার পিছু পিছু ঘুরতাম। কিন্তু কোনো এক বিশেষ কারণে আফিম ভাই মেয়েদেরকে দেখতে পারতো না। আমাকে সহ্যই করতে পারতো না। দু বছরে আমি প্রায় বিশ-পঁচিশটা চড় খেয়েছি তার হাতে। এর মধ্যে রায়ান আমাকে পছন্দ করতে শুরু করে। আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। আমি সবসময় রায়ানকে ইগনোর করতাম। বারবার বলে দিতাম আমি আফিম ভাইকে ভালোবাসি। বারবার রিজেক্ট হওয়ায় রায়ান আর ভালোবাসার কথা বলতো না। বাবার চট্টগ্রামে ট্রান্সফার হওয়ায় আমরা চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় চলে যাই। যাবার আগে শেষবারের মতো আফিম ভাইকে বলেছিলাম “ ভালোবাসলে কি হয় আমাকে? পথের ধুলো যেভাবে অবজ্ঞায়, অবহেলায় আটকে থাকে জুতোর তলায়। সেভাবেই না হয় রেখে দিও আমায়। আমি পিষে যাবো, তবুও আটকে রবো”। সেদিনও আফিম ভাই আমাকে পাত্তা দেয়নি। এরপর চট্টগ্রাম চলে যাবার পর রায়ান প্রায় কল করতো। টুকটাক কথা হতো। বুঝতাম রায়ান এখনো আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু ওইযে, আমি আফিম ভাইয়ে আটকে ছিলাম। এখন আমার বয়স কত জানো? পঁচিশ। প্রাইভেট কলেজের টিচার আমি। বিয়ে করবো না করবো না বলে অনেক অজুহাত দিয়েছি। শেষমেশ বাবার কড়াকড়িতে আর টিকতে পারিনি। একেবারে অপরিচিত, অচেনা একটা ছেলের সাথে বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে। আমি মেনে নিতে পারছিলাম না বিয়েটা। বিয়ের দিন অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিই সংসার যদি করি চেনাজানা কারো সাথে করবো। যার সাথে মতের মিল হবে, ভাবনা চিন্তা মিলবে, যার সাথে মানিয়ে নিতে আমার কষ্ট হবে না, যে আমার অতীত জেনেও আমাকে চাইবে, তাকেই বিয়ে করবো। অগত্যা কল করলাম রায়ানকে। রায়ান একা আসেনি, আফিম ভাই আর বাকিদের নিয়ে গিয়েছিল। বাবা বুঝতে পারেনি আমার মতো মেয়ে পালিয়ে যাবে। আফিম ভাইয়ার কথা বাবা জানতো। অমন বখাটে, ভবঘুরে ছেলের সাথে বিয়ে দিতে নারাজ ছিল বাবা। ভেবেছিল বুঝদার আমি এবার সবটা গুছিয়ে নেব। আর এই সুযোগে আমি পালিয়ে আসি। তবে শহর থেকে বের হতে পারিনি এক সপ্তাহে। এখানে-ওখানে ঘুরেছি, হোটেলে রুম ভাড়া করে লুকিয়ে লুকিয়ে থেকেছি বাবার ভয়ে। এক সপ্তাহ পর যখন পুলিশের কড়া নিরাপত্তা ঢিলে হয়ে আসে, তখন সুযোগ বুঝে আফিম ভাই আর বাকিরা আমাকে নিয়ে পালিয়ে আসে ঢাকায়।”

বলতে বলতে তন্বীর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আসে। মলিন দেখায় তাকে। চোখ দুটো চিকচিক করে, অথচ মুখে প্রগাঢ় হাসি। মৃত্তিকা চট করে ধরে ফেলে সামনের মেয়েটির দৃঢ়তা। মনে একজনকে রেখে আরেকজনের সাথে সংসার করা যে কতটা কষ্টকর তা মৃত্তিকা বোঝে। কিন্তু ইয়াসিনের প্রতি তার ভালোবাসাটা এখন নেই বলে সবকিছু খানিকটা সহজ হয়েছে। ইয়াসিনকে ভাবতেও এখন আর ভালো লাগে না তার। কিন্তু তন্বী? তন্বী তো আফিমের সবটা জেনেও তাকে ভালোবাসে। জেনেবুঝে বিষ পান করতে রাজিও ছিল মেয়েটা। তবে তার কেন এত নিঠুর পরিণতি হলো? একেই কী তবে ভাগ্য বলে? মৃত্তিকা পুনরায় উঁকি মেরে আফিমকে দেখে। লোকটা মনোযোগ দিয়ে ম্যাচ দেখছে। হেসেও উঠছে। মৃত্তিকা নিচু স্বরে বলে,

“- আপনার বাবা খুব কষ্ট পেয়েছেন। এমনটা করা কি ঠিক হয়েছে”?

আলতো হেসে তন্বী বলে,

“- ভালোবাসার মানুষটিকে না পাওয়ার যন্ত্রণা আমি বুঝি মৃত্তিকা। আমি যাকে ভালোবেসেছি, তাকে পাইনি। তাই আমি চাইনি রায়ানও সেই একই যন্ত্রণা ভোগ করুক। কারো পূর্ণতার কারণ আমি হতে পারলে, আমার জন্য তা সৌভাগ্যের হবে”।

তন্বীর কথাবার্তায় দৃঢ়তা আছে। অনায়াসে নিজের ব্যর্থতা টুকু মেয়েটা মেলে ধরেছে অবলীলায়। মৃত্তিকাকে তো দুদিন আগেও চিনতো না। তবু কেন সব কথা অনর্গল বলে গেল? দোটানায় পড়ে মৃত্তিকা। এখন তার কি বলা উচিত? সান্ত্বনা দেওয়া উচিত নাকি রাগ করা উচিত? তার এই দোটানা তন্বী ধরে ফেলে বোধহয়। মৃত্তিকার গালে হাত রেখে বড়দের ন্যায় বিজ্ঞ কণ্ঠে বলে,

“- ভয় পেও না। আমি তোমার সংসার ভাঙতে আসিনি। সেই ক্ষমতাও আমার নেই। আমি আফিম ভাইকে ভুলে যেতে চাই। একমাত্র রায়ানই পারবে আমাকে ভুল পথ থেকে টেনে আনতে। দেখছো না রায়ান ভাইকে আমি রায়ান বলা শিখে গিয়েছি। দেখো মৃত্তিকা, আমি ঠিক আমার সংসারটা গুছিয়ে নেব। মনোযোগ, আগ্রহ নিয়ে সংসার করবো রায়ানের সাথে। ভুলে যাবো সকল পিছুটান, মোহ। তুমি ভয় পেও না।”

মৃত্তিকা জড়তা মেখে বলে,
“- রায়ান ভাইয়াকে তো আপনি চেনেন। চেষ্টা করবেন তাকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার”।

“- রায়ান বলেছে, আমাকে পেলে এসব থেকে বেরিয়ে আসবে। আর কোনো মেয়েকে রায়ান টিজ করবে না, মারামারিও করবে না। আদর্শ স্বামী হয়ে দেখিয়ে দেবে”।

মৃত্তিকা হাসে। ভালো লাগে তন্বীর কথাটা। বলে,
“- আপনাদের জন্য শুভকামনা রইল। আপনাদের সংসারটা সুখে ভরে উঠুক”।

তন্বী হেসে বলে,
“- চলো একটা টেস্ট হয়ে যাক। দেখি রায়ান বদলেছে কিনা।”

মৃত্তিকা বলল,
“- টেস্ট? কিভাবে”?

তন্বী উচ্চস্বরে ডাকে,

“- রায়াআআআন, রায়াআআআন”।

মৃত্তিকা বোঝে না কিছুই তন্বী মিটিমিটি হেসে বলে,
“- রায়ান ক্রিকেটের ফ্যান। আশপাশে যাই হয়ে যাক ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ও টিভি বা ফোন রাখে না। দেখা যাক আমার ডাক শুনে কি করে”?

রায়ান হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
“- কি হয়েছে তন্বী”?

রায়ান কিচেনে ঢুকে পরে। তন্বীকে কিচেন আইল্যান্ডে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
“-, কি হয়েছে”?

তন্বী মিছে অভিনয় করে বলে,
“- মাথা ব্যথা করছে”।

ভ্রু কুঁচকে ফেলে রায়ান। বলে,
“- রাতে ঘুম ভালোমতো হয়নি এজন্য। ঘরে গিয়ে রেস্ট নেবে একটু? আমি মাথা টিপে দিই”?

মৃত্তিকা লজ্জায় পরল। স্বামী-স্ত্রীর এই কথোপকথন শোনা তার উচিত নয়। ওদেরকে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া উচিড। মৃত্তিকা বেরিয়ে যেতে নিলে আলগোছে তার হাত টেনে ধরেতন্বী। মৃত্তিকা বোঝে তন্বী তাকে যেতে দেবে না। রায়ান ফের ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“- বেশি ব্যথা করছে? আমি বাম নিয়ে আসবো”?

তন্বী বলে,
“- আমি তাকাতেই পারছি না”।

রায়ান কিছু একটা ভাবে মৃত্তিকাকে দেখে খুব লজ্জা পেলেও সহসা পাজোকোলে তুলে নেয় তন্বীকে। তন্বী আঁকড়ে ধরে রায়ানের শার্ট। রায়ান বলে ওঠে,

“- ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নেবে। তুমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আজ থাকবো”।

ওদের চলে যেতে দেখে মৃত্তিকা। বলে,
“- আমি আপনাদের খাবার ঘরে পাঠিয়ে দেবো”।

ওরা চলে যেতেই মৃত্তিকার মাথা ঘুরতে লাগল। কত কষ্টে তন্বীর কথাগুলো হজম করছিল তা কেবল মৃত্তিকাই জানে। তন্বীর মাথা ব্যথার ব্যাপারটা সত্য কিনা মৃত্তিকা জানে না। তবে এ মুহুর্তে ওর মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। তোলপাড় হচ্ছে বক্ষমাঝে। আফিম টিভি দেখছে। এদিকে একটুও নজর নেই লোকটার। আচ্ছা সে বললে কি আফিম ভালো হয়ে যাবে?


রায়ানের বাবা-মাকে কনভিন্স করতে আরো কিছু সময় লাগবে। ততদিন তন্বী এ বাড়িতেই থাকবে। মৃত্তিকার হুট করেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। কোনোকিছুই ভালো লাগছে না। বিষাক্ত ঠেকছে সব কিছু। বেলকনির দোলনায় উদাস ভঙ্গিতে বসে ছিল মৃত্তিকা। পর পর পায়ের শব্দ পেয়েও সে নড়ল না বিন্দুমাত্র। একইভাবে বসে রইল। আফিম মির্জা খসখসে পায়ে এগিয়ে এলো মৃত্তিকার নিকট। তার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে চেয়ে রইল ক্লান্ত পথের দিকে। আফিম দেয়ালে বাহু ঠেকিয়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়াল। মৃত্তিকার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করল। ভারিক্কি স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“- মৃত্ত, মন খারাপ”?

মৃত্তিকা পিছু ফিরল না। নজর সরাল না। জড় বস্তুর ন্যায় নির্জীব দেখাল মেয়েটাকে। আফিমের কপাল কুঁচকে এলো। ফের জিজ্ঞেস করল,

“- অ্যাই মৃত্ত, রাগ”?

মৃত্তিকা প্রত্যুত্তর করল না। আফিম একই ভাবে আওড়াল,

“- অভিমান”?

মৃত্তিকা কেঁপে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে দুর্বল কণ্ঠে মেয়েটা বলে ওঠে,

“- তন্বীকে আপনি কেন ভালোবাসেননি আফিম? যে মেয়েটা পরিত্যক্ত ধুলোর ন্যায় জুতোর তলায় পিষে থাকতে চেয়েছিল, তার প্রতি একটুখানি করুণা করতে পারলেন না? যে মেয়েটা আপনার আদ্যপ্রান্ত জেনেও অবলীলায় বিষ গিলে নিতে চেয়েছিল তাকে কিভাবে উপেক্ষা করেছিলেন আপনি”?

মৃত্তিকার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। ভাঙা ভাঙা শোনাল। কান্না গিলে যেভাবো আহত কণ্ঠ বের হয়, ঠিক সেরকম গভীর, নিখাঁদ কণ্ঠ। আফিম বুকে গুঁজে রাখা হাত দুটো নামিয়ে ফেলল। অভিব্যক্তি বদলে গেল ছেলেটার। ক্ষোভ আর রাগে অগ্নিমূর্তির ন্যায় রূপ ধারণ করল। চোয়াল শক্ত করে দূর্ভেদ্য কণ্ঠে বলল,

“- এসব কে বলেছে তোমাকে”?

মৃত্তিকা জবাব দেয় না। উৎসুক চোখ জোড়া চেয়ে রয় আফিমের সবুজাভ চোখে। শুনতে চায় কাঙ্ক্ষিত উত্তর। আফিম রেগে বলে,

“- আমি যাচ্ছি, ওর নাটুকেপনা ছোটাবো”।

আফিম শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বেরিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে পিছু ফেরে। মৃত্তিকা তড়িৎ বেগে আঁকড়ে ধরে আফিমের মোটা বাহু। আফিম ঘাড় বাঁকিয়ে পিছিয়ে মৃত্তিকার নরম, ছোট হাত নিজের বাহুতে দেখে থমকায়। মৃত্তিকা শুকনো হেসে বলে,

“- মেয়েটাকে বহুবার চড় মেরেছেন। এখন থামুন”।

আফিমের রাগ কমে না। গলার রগ ফুলে উঠছে। সে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে,
“- ও তোমাকে এসব বলেছে? কত্ত বড় বুকের পাটা”।

মৃত্তিকা হাসে। তার মাথায় ওড়না নেই। পরনে লাল সাদামাটা থ্রিপিস। চুলগুলো বাঁধা নেই। উন্মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে আছে পিঠে। মৃত্তিকা ঘন দম ফেলে বলে,

“- যে মেয়ে আপনার মতো বখাটেকে ভালোবেসে দীর্ঘ পাঁচ বছর একা থাকতে পারে, তার কত বড় বুকের পাটা তা আলাদা করে বলতে হবে”?

“- রায়ানকে বিয়ে করেও এসব কথা শোনাচ্ছে? চায় কী ও”?

“- সংসার। রায়ান ভাইয়ার সাথে তন্বী সংসার করবে।”

“- আর কি কি বলেছে”?

মৃত্তিকা হাসল। বেলকনিতে একটি টুল পাতা আছে। ইশারায় ওখানটায় বসতে বলল আফিমকে। হাত টেনে বসাল সেথায়। টুলের সামনের দোলনায় বসে পরল সে। বলল,
“- এক তরফা ভালোবাসা গুলো অসহ্যকর। তন্বীর চোখে আমি আপনার জন্য ভালোবাসা দেখেছি। এত ভালোবাসা পায়ে ঠেলে দিলেন? এত দুঃসাহস”?

“-, ফালতু কথা বলবে না মৃত্ত। স্ত্রী হয়ে স্বামীকে পরনারীর কথা শোনাচ্ছো”?

মৃত্তিকা ফিক করে হেসে ফেলল সশব্দে। হাসতে হাসতে দোলনার দড়িতে মাথা রেখে হালকা দুলে এবার কেঁদে ফেলল। কি মর্মান্তিক! এইতো হাসছিল দাঁত বের করে, এখন ঝরঝর করে কাঁদছে। আফিম টুল পায়ে ঠেলে এগিয়ে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসল মৃত্তিকার সামনে। ভিজে যাওয়া জবজবে মুখটা দু হাতে আগলে নিয়ে বলল,

“- কাঁদছো কেন? তন্বী বাজে কিছু বলেছে”?

মৃত্তিকা মাথা নাড়ে দু পাশে। অসহায় কণ্ঠে বলে,
“- আমি কেন আপনাকে ভালোবাসতে পারি না? কেন? আমি কেন অতীত ভুলতে পারি না? তন্বী আপনাকে ভুলে রায়ান ভাইয়াকে ভালোবাসছে, সময় কাটাচ্ছে। আর আমি? আমি বের হতে পারছি না”।

ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। বলে,
“- এজন্য কাঁদছো”?

নাক টেনে উপর-নিচ নাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝায় মৃত্তিকা। আফিম প্রগাঢ় হেসে বলে,
“- সময় দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমি মরে যাচ্ছি না”।

“- একটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন”?

“- বলো”।

“- আপনি মেয়েদের তেমন একটা পছন্দ করতেন না। এর কারণ কী? কেন আপনার মেয়েদের প্রতি অনিহা ছিল”?

এমন প্রশ্ন আশা করেনি আফিম। রয়েসয়ে সে বলে উঠল,

“- আমার বয়স যখন দশ-এগারো, আমার আম্মু তখন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এমনকি বাবা বাসায় না থাকলে আম্মু অপরিচিত একজন লোককে বাড়িতে ঢোকাতেন। দরজা আটকে রাখতেন। আমি তখন থেকেই বুঝতাম পরকীয়া কি। কিন্তু বাবাকে বলার সাহস পেতাম না। বাবা আম্মুকে প্রচণ্ড বিশ্বাস করতো। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি আম্মু কোথাও নেই। বাবার অর্জিত সব সম্পদের দলিল, নগদ টাকা নিয়ে আম্মু তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গেছেন। বাবার মাথায় হাত পড়ে, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না এসব। চিঠি পড়েও তার মধ্যে আম্মুর জন্য কোনো ঘৃণা ছিল না, না ছিল কোনো ক্ষোভ। আম্মু পালিয়ে যাবার পর ও বাবা তার জন্য অপেক্ষা করতো। ভাবতো প্রতারিত হয়ে আম্মু আবারও ফিরে আসবে বাবার কাছে। এই আশায় আশায় বাবা বিয়েও করেনি। আরো একটা কারণ ছিল, আমাকে তার নতুন স্ত্রী ভালোবাসবে না এ ভেবেও বাবা পিছিয়ে যেতো। আমি বারবার বাবাকে বলতাম বিয়ে করতে। তখন থেকেই বাবাকে নতুন বিয়ে করার জন্য জোর করতাম। এইযে এখন, এখন আমি বড় হয়েছি। তবুও তার মাঝে দ্বিতীয় বিয়ে করার লক্ষণ নেই। বাবা আম্মুর জন্য এখনো অপেক্ষা করে। তার কোনো রাগ নেই, অভিযোগ নেই। অন্ধ ভালোবাসে যাকে বলে। বাবা আম্মুকে এখনো ভালোবাসে, এটা ভাবলেই আমার বাবার উপর রাগ হয়। ছলনাময়ী, অপবিত্র একজন নারীর জন্য সে কেন কাঁদবে? কেন চিরকাল একা থাকবে? আম্মুকে দেখে আমার নারী জাতির উপর থেকে রুচি উঠে গিয়েছিল। কাউকেই বিশ্বাস হতো না, ভরসা হতো না”।

মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। সে ভেবেছিল আফিমের আম্মু মারা গেছে। এজন্য তাকে নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেনি মৃত্তিকা। আজ তার আম্মুর এ ভয়াবহ অতীত শুনে থমকায় মৃত্তিকা। প্রশ্ন করে বসে,

“- তাহলে আমায় বিয়ে করতে চাইলেন কেন? আমার পিছু নিলেন কেন”?

আফিম মৃত্তিকার গালে হালকা টোকা দিয়ে বলে,
“- একটা প্রশ্নের উত্তর চেয়েছিলে।”

মৃত্তিকা দমে বলে,
“- আমিও তো পবিত্র নই। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসতাম, অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্নও দেখেছি। আমার অতীত বড্ড কুৎসিত।”

“- তোমার অতীতকেও সমানভাবে আঁকড়ে ধরেছি। পুরোনো স্মৃতি মুছে দেবার দায় মাথা পেতে নিয়েছি”।

“- আমি অন্য কাউকে ভালোবেসেছি। আপনার আমাকে ভালোবাসা উচিত হয়নি”।

আফিম মৃত্তিকার গালে আঙুল ঘষে জবাব দেয়,
“- এখন তুমি পুরোপুরি আমার”।

মৃত্তিকা ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,
“- আমার তো কেউ নেই আফিম। কেউ নেই। সব হারিয়ে নিঃস্ব আমি। আমার বুকে প্রতিনিয়ত ঝড় বয়। পুরোনো ক্ষত শুকিয়ে গেলেও দাগ রয়ে গেছে। সে দাগ আমাকে বারবার আতঙ্কিত করে। এ পৃথিবীটা এমন কেন? ওরা কেন ঠকায়? ওদের রুহ্ কাঁপে না? ভয় করে না অন্যকে ঠকাতে”?

আফিম চট করে উঠে দাঁড়াল। দোলনার দু পাশের দড়ি ধরে মাথা নুইয়ে ঝুঁকে এলো মৃত্তিকার দিকে। মেয়েটার মাথার তালুতে শব্দ করে শুষ্ক চুমু একে বলল,
“- আফিম মির্জা পুরোটাই তোমার। তার মন, দেহ সবকিছুতে তোমার অধিকার। এমনকি তার ইস্পাতের ন্যায় শক্ত, কাচের ন্যায় ধারাল হৃদপিণ্ড তোমার নামে স্পন্দিত হয়। আমি আছি সর্বক্ষণ”।

মৃত্তিকা জমে গেল বরফের মতো। দু হাতে ধরে রাখা দোলনার দড়ি থেকে হাত খসে পরল। তাজ্জ্বব বনে গিয়ে তাকিয়ে রইল অবুঝের মতো। বিস্মিত স্বরে শুধাল,

“- কবে এত ভালোবাসলেন”?

আফিম মৃত্তর কাছে পাশে এসে বসে বলল,
“- সেদিন থেকে, যেদিন তুমি সাহায্যের জন্য আমার কাছে আশ্রয় খুঁজছিলে।”

“- কিন্তু আমি আপনাকে পছন্দ করি না। আপনি খারাপ মানুষ। বখাটে, মাস্তান। ছেড়ে দিন না এসব”।

আফিম ত্যাছড়া হাসে। মৃত্তিকার নাক টেনে বলে,
“- এত আশা ভালো না। একটু ভালোবেসেছি তাতেই এত বড় আবদার? আমি এসব কোনোদিনই ছাড়বো না। দরকার হলে জামাই-বউ দুজন মিলে মাস্তানি করবো”।

মৃত্তিকা রেগে উঠল। বলল,
“- বখাটে কোথাকার। ভালো হবেন না”?

“- বললাম তো, বয়স পেরিয়ে গেছে”।

“- আপনার সন্তানরা আপনার থেকে কি শিখবে বলুন তো?”
চোখ বড় বড় হয়ে উঠল আফিমের। সাথে সাথে মৃত্তিকার কোমর চেপে ধরে বলল,
“- এই, তুমি বাচ্চাকাচ্চার প্ল্যান করছো?”

মৃত্তিকা অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলল,
“- আমি কি তাই বলেছি? কথার কথা বলেছি”।

“- আমার বাচ্চারা তারা মায়ের মতো হবে। একদম আদুরে, ভালো বাচ্চা।”

মৃত্তিকা তাকিয়ে রইল আফিমের দিকে। এই মাস্তান আদৌ কোনোদিন শোধরাবে? নাকি তার পাপের ফল, তার কাজের ফল মৃত্তিকাকে ভোগাবে?

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

[ অনেকদিন পর লিখলাম। আবারও লিখতে বসবো পরের পর্ব। দোয়ায় রাখবেন। আমার লেখা নিয়ে পারলে আলোচনা-সমালোচনা করবেন। পাঠকের কাছে পৌঁছাতে সহযোগিতা করবেন প্লিজ🥺]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply