Golpo romantic golpo ওরা মনের গোপন চেনে না

ওরা মনের গোপন চেনে না অন্তিম পর্ব [৩২]


ওরামনেরগোপনচেনেনা

অন্তিম_পর্ব [৩২]

[ পর্বটা অনেক বড়। ফেসবুক মেইন অ্যাপ থেকে পড়তে হবে। ]

হুড তোলা রিকশায় পাশাপাশি বসে আছে আফিম আর মৃত্তিকা। বাতাসের দাপটে আঁচল উড়ছে মৃত্তিকার। আফিমের বাহুর সাথে তার বাহুর ঘর্ষণে মৃত্তিকা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। মৃত্তিকা আবদার করেছিল সে রিকশায় আফিমের সাথে ঘুরবে। আফিম সে কথা রেখেছে। সন্ধ্যার হালকা আলোয় প্রিয়তমার সাথে বেরিয়েছে৷ মৃত্তিকা সিল্কের নীল শাড়ি পড়েছে। আফিম ম্যাচিং করে নীল শার্ট আর কালো স্যুট পড়েছে। দুজনকে একসাথে সুন্দর লাগছে খুবই। আশপাশের কিছু মানুষ হা করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে বাঁকা নজরে। মৃত্তিকার মনটা আজ উড়ু উড়ু। আফিমের পাশে বসে থাকতে তার ভালো লাগছে, আরাম লাগছে।

ধানমন্ডি লেকের সামনে এসেছে মৃত্তিকা আর আফিম। একটি গাছের গুড়িতে বসে বাদাম চিবোচ্ছে মৃত্তিকা। আফিম টলটলে পানির দিকে চেয়ে আছে। মৃত্তিকা বাদামের খোসা ছাড়িয়ে হাতে নিল কয়েকটা। ফু দিয়ে বাদামের পাতলা আবরণ সরিয়ে আফিমের দিকে বাড়িয়ে দিল।

“- ধরুন”।

আফিম মৃত্তিকার দিকে চেয়ে বলল,
“- তুমি খাও”।

মৃত্তিকা রাগ করে। বলে,
“- আমি দিচ্ছি, আপনার নিতে কি সমস্যা”?,

আফিম আর বারণ করার সুযোগ পেল না। বাদাম গুলো নিল। মৃত্তিকা আবারও একই কাজ করায় আফিম থামাল তাকে। বলল,

“- মৃত্ত”।

“- হু”?

“- তুমি খাও, আমার জন্য কষ্ট করতে হবে না বোকা”।

“- কষ্টের কি আছে”?

“- খাও তুমি। আরো কিছু আনবো? তুমি খেলেই আমার শান্তি”।

মৃত্তিকার মনে পরল তার বাবার কথা। আতিকুর রহমান সবসময় বলতেন আমার মেয়ে খেলেই আমি খুশি। ও খেলেই আমার খাওয়া হয়ে যায়। বাবার পর মৃত্তিকাকে আফিমের মতো আর কেউ ভরসা দিতে পারেনি। মৃত্তিকার হৃদয়ে আফিম তার স্থান পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে। এ হৃদয়ে আফিম ছাড়া অন্যকারো প্রবেশ নিষিদ্ধ।

আজ ওরা হাঁটল অনেকক্ষণ। মৃত্তিকা আবদর জুড়েছিল একসাথে হাঁটবে রাস্তার কিনারা ঘেঁষে। হাতে হাত ধরে হাঁটতে গিয়ে মৃত্তিকা অনুভব করল আফিম তাকে বশ করেছে। বশ না করলে এত দ্রুত মানুষটাকে মন দিল কেন মৃত্তিকা, কেন এত পাগল হলো মানুষটার জন্য? ভাঙা হৃদয়ে প্রেমের নীল নদ গড়ে তুলল কিভাবে? মৃত্তিকা জিজ্ঞেস ও করল। বলল,

“- আপনি কালো যাদু জানেন আফিম”?

আফিম মৃত্তিকার বোকা বোকা কথায় মুখ কুঁচকে ফেলল। বলল,
“- এসব কি বলো মৃত্ত? কথা বলার আর টপিক নেই”?

“- আমার মনে হয় আপনি আমাকে বশ করেছেন। সেজন্যই আপনাকে ছাড়া কিছু বুঝি না আমি”।

আফিম মুচকি হাসে। তার হাসিটার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে থাকে মৃত্তিকা। নিজেও হাসে সে। আফিম ঘাড় বাঁকিয়ে তার পানে চেয়ে বলে,

“- ভালোবাসা দিয়েছি, এতটুকুই যথেষ্ট। বশীকরণ অনেক প্যারা”।

“- আজীবন ভালোবাসবেন”?

“- শেষ নিঃশ্বাস অব্দি ভালোবাসবো তোমায়।”


আফিম তৈরি হচ্ছে। রাতে একটা অপারেশন আছে। ওটা শেষ হলেই সে ফিরবে। মৃত্তিকা বাইরে বেরিয়ে এগিয়ে দেয় আফিমকে। বলে,

“- তাড়াতাড়ি ফিরবেন কিন্তু”।

আফিম শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বলে,
“- চেষ্টা করবো পাখি। তুমি খেয়ে ঘুমিও। রাত জেগো না”।

মৃত্তিকা বলল,
“- আপনি যতক্ষণ না ফিরবেন আমার দুশ্চিন্তা হবে। দুশ্চিন্তায় ঘুম হবে না”।

মৃত্তিকার মাথায় হাত রাখে আফিম। তার চুলের উপরিভাবে চুমু খায় গভীর ভাবে। মৃত্তিকা আঁকড়ে ধরে শক্ত পিঠটা। মুখ গলিয়ে দেয় বুকে। আফিম হেসে ফেলে মৃত্তিকার বাচ্চামোতে। গা দুলিয়ে হেসে সে বলে,

“- আমাকে সিডিউস করছো? ছিঃ! তোমার এত অধঃপতন হয়েছে মৃত্ত”?

মৃত্তিকা আফিমের গাল থেকে মাথা তুলে বলল,
“- স্বামীকে সিডিউস করাই যায়। অন্য কাউকে তো করছি না। আপনি বাগড়া দেওয়ার কে মশাই? আমার জামাইকে আমি সিডিউস করবো নাকি আদর করবো তা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি নাক গলান কেন”?

আফিম ফের হাসে। আজ বড্ড হাসতে ইচ্ছে করছে। মৃত্তিকার কথাবার্তা শুনে আফিমের যেতে ইচ্ছে করছে না কোথাও। মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে পুরো রাত শেষ কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। সে মৃত্তিকার দু বাহু টেনে বলে,

“- আপনার জামাইকে যে এবার যেতে হবে, এভাবে লেগে থাকলে তো তার কাজে মন বসবে না”।

মৃত্তিকা হাসল। ছেড়ে দিল আফিমকে। বলল,
“- ঠিক আছে, আসার পথে আমার জন্য অসংখ্য চুমু, আর আকাশ সমান ভালোবাসা নিয়ে আসবেন কেমন”?

মৃত্তিকার গাল টেনে দিল আফিম। বলল,
“- আরো বেশি আনবো, চিন্তা করো না।”

আফিম চলে গেল। ফিল্ড রুমে বসে প্রস্তুতি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এলো সে। চোখের লেন্স বদলে নিল, বুটের তলায়, প্যান্ট ও বেল্টের মাঝে পিস্তল নিল। পুলিশ ফোর্সকে নির্দেশ দিতেই ওরা চট্টগ্রাম বন্দরে এলার্ট জারি করে দিল। সার্চ করতে শুরু করল প্রতিটি কন্টেইনার। একে একে পুরো বন্দরের প্রত্যেকটি জাহাজে তল্লাশি শুরু করল পুলিশরা। আফিম আড়ালে লুকিয়ে রইল। দূর থেকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রটা দিয়ে পুলিশের কার্যক্রম দেখতে লাগল। কোনোভাবেই যেন ওরা কাজে গড়িমসি না করে সেজন্যই আফিম নিজে এখানে এসেছে।

বেশ কিছুক্ষণ পুরো বন্দর তল্লাশি চালিয়ে পুলিশের একজন সিনিয়র এলো আফিমের কাছে। বলল,

“- এজেন্ট”।

আফিম অণুবীক্ষণ যন্ত্র রেখে বলল,
“- কিছু হয়েছে”?

পুলিশটি ফিসফিসিয়ে বলল,
“- বেআইনি অস্ত্র, মাদক দ্রব্য পাওয়া গেছে।”

“-, ধরেছেন ওদের? মাল গুলোকে থানায় রাখুন”।

লোকটি আরো ফিসফিস করে বলল,
“- উপর মহল থেকে নির্দেশ আছে, মাল গুলোকে পৌঁছে দিতে হবে।”

আফিম অবাক হলো খুব। বলল,
-” কি বলছেন”?

“- স্যার এসব অনেক আগে থেকেই পাঠানো হচ্ছে অন্য দেশে। কেউ কিছু বলে না কারণ স্বয়ং দেশের ক্ষমতাধর মন্ত্রীরা এর সাথে জড়িত। আপনি-আমি এখানে চুনোপুঁটি। এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।”

আফিম রেগে গেল। ধমকে বলল,
“- লাভ নেই মানে? আজগুবি কথা বলেন কেন? অবৈধ অস্ত্র পাচার করা হচ্ছে, দেখেও আপনারা তাদের আটক করছেন না? ভয় পাচ্ছেন”?

“-, স্যার, আমাদের উপর হামলা করা হতে পারে। এসবে আমি থাকতে পারবো না”।

আফিম রেগে বলে,
“- আপনারা না-ই করতে পারেন। আমি ধরবো ওদের।”

আফিম বন্দরের জাহাজগুলোর কাছে গেল। একে একে সমস্ত কন্টেইনার বের করল। সবাই নিষেধ করল, হুমকি দিল। আফিম কারো কথাই গায়ে মাখল না। জেটির লোকজন হিংস্র হয়ে উঠল। বলল,

“- আপনি এসবে হাত দিচ্ছেন কেন? স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর নির্দেশে এই অস্ত্র গুলো চালান করা হয়। আপনার কথায় হবে? এগুলোকে যেতে দিন। নইলে আপনার পাশাপাশি আমাদের ও বিপদ হবে”।

আফিম হেসে বলে,
“- জনগন কি জানে ক্ষমতাসীন এই মন্ত্রীরা তাদের চোখের আড়ালে তাদের থেকে অর্থ নিয়ে অন্য দেশে অস্ত্র পাচার করছে? জানলে কি হবে জানেন? স্বয়ং মন্ত্রীরাই যিদ হয় দেশের শত্রু, তাহলে দেশকে সুরক্ষা দেবে কে? আমি আফিম মির্জা অন্যায়ের সাথে কোনোদিন আপোষ করিনি, করবোও না। আমি এর একটা বিহিত করবোই”।

জোর দেখিয়ে পুলিশদের দিয়ে সবগুলো লোককে আটক করল আফিম। আফিম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জাহাজের লোকগুলোকে সেলে ভরল। একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ল। আঘাত করল লোক গুলোর পিঠে, পায়ে। প্রশ্ন আর মারের তোপে পড়ে সবটা স্বীকার করতে বাধ্য হলো ওরা। আফিম বুঝতে পারল অনেক আগে থেকেই এমনটা হয়ে আসছে। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রাণ হারাবে, এই ভয়ে কেউ আওয়াজ তোলে নি। সবাই এ সত্যটা গোপন করে, করবেও। আফিম সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সব জানতে পারে। খবরটা পৌঁছে যায় আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কানে। থানা থেকে বের হবার মুখে কনস্টেবল আফিমকে সাবধান করে। বলে,

“- আপনি এবং আপনার পরিবারকে সাবধানে থাকতে বলবেন। ওরা যা খুশি করে ফেলতে পারে। সাপের লেজে পা দিয়েছেন, ছোবল খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন”।


বাড়ি ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল আফিম। খাওয়াদাওয়া করেই জব্বর একটি ঘুম দিল। ঘুম ভাঙল ফোনের রিংটোনে। নম্বরটা অপরিচিত হলেও পার্সেনাল ফোনে কল আসায় আফিম কলটা তুলল। ওপাশ থেকে আইনমন্ত্রী নিজে বলে উঠল,

“- শাফায়াত আফিম মির্জা”?

“- জি, কে বলছেন”?

“- আইনমন্ত্রী ইলিয়াস বলছি। দেখা করতে পারবে একটু”?

“- হ্যাঁ অবশ্যই, কেন নয়”?

“- আমার ভবনে চলে এসো তাহলে। আমি অপেক্ষায় থাকবো। ওইদিন তোমার সাথে ভালো করে কথাই হলো না। এসো, বসে কথা বলি”।

আফিমের আর ঘুম হলো না। তার এই আমন্ত্রণ ঠিক কিসের জন্য, তা আফিম জানে। তার তুখোড় মস্তিষ্ক সবটাই জানান দিয়েছে তাকে। মৃত্তিকাকে জানিয়ে সে বের হলো বাড়ি থেকে। যাবার সময় কি মনে করে একটি ছোট্ট পেনড্রাইভ মৃত্তিকার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“- এটা কাছে রাখো। কোনোভাবেই এটা হারাবে না, ঠিক আছে”?

মৃত্তিকা না বুঝে বলল,
“- কি আছে এতে”?

“- জানতে হবে না তোমায়। এটা গোপনে রেখো, গুরত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস আছে। আর শোনো, আমি না আসা অব্ধি বাইরে যাবে না। আজ টিউশনে যেতে হবে না”।

“- কিন্তু কেন”?

“- আমি বলেছি যখন কারণ আছে বলেই বলেছি। কয়েকদিন তুমি বাড়ি থেকে বের হবে না। শত্রুরা ওত পেতে আছে, কখন কিভাবে আক্রমণ করে বলা যায় না।”

“- কারা আপনার শত্রু”?

“- পরে বলবো, এখন যেতে হবে। বাবা ফিরেছে না”?

“- হ্যাঁ, সকালেই ফিরেছে”।

“- আচ্ছা আমি দেখা করে আসি তাহলে”।

আশরাফ মির্জাকে আফিমের পরিচয় জানিয়ে দিয়েছে মৃত্তিকা। উত্তেজনায় চুপ থাকতে পারেনি সে। আশরাফ মির্জা বাড়ি ফেরার সাথে সাথে মৃত্তিকা গড়গড় করে সব বলে দিয়েছে। ছেলের এই কাজে তিনি বাকরুদ্ধ। কিছুতেই এসব বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। মৃত্তিকা সব ঘটনা জানিয়েছে। জানার পর অভিমানে বুক পুড়েছে তার। এমন একটা ভালো ছেলেকে সে কতই না বকেছে, কতই না কষ্ট দিয়েছে। আর আফিম? আফিমও সমান ভাবে তাকে কষ্ট দিয়েছে, মিথ্যে বলেছে দিনের পর দিন। বাবাকে একটুও ভরসা করেনি ছেলেটা। আফিম ফেরার পরেও তিনি কথা বলেননি। চুপচাপ বসে আছেন ঘরে।

আফিম গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে বাবার ঘরে। বলে,

“- কেমন আছেন”?

অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলেন আশরাফ মির্জা। বললেন,
“- ভালোই তো থাকবো”।

আফিম বাবার অভিমানে বুদ হওয়া মুখ দেখে হেসে বলে,
“- এ বয়সে আপনাকে এমন নাটক মানায় না”।

“- যার ছেলে পাক্কা অভিনেতা, তার বাবা একটু আধটু নাটক করবে না”?

“- দোয়া করুন, কাজে যাচ্ছি”।

“- দোয়া যদি চাইতে, আগেই জানাতে”।

আফিম ধীর পায়ে এগিয়ে এলো আশরাফ মির্জার কাছে। সহসা সে জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে। আকস্মিক জড়িয়ে ধরায় আশরাফ মির্জা হতভম্ব হয়ে গেল। চোখে পানি জমে তার। তিনিও শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরলেন ছেলের পিঠ। কিছু সময় এভাবেই অতিবাহিত হলে শব্দ করে কেঁদে ফেলেন আশরাফ মির্জা। বলেন,

“- তুমি আমার আদর্শ ছেলে। আগে কেন বলোনি আমাকে? কত গালমন্দ করেছি তোমাকে। একটিবারও কি আমাকে জানানো যেত না”?

আফিমের চোখেও পানি জমে। বলে,
“- আপনি তো এই পেশাটাকে পছন্দ করেন না”।

“- বখাটেগিরিও তো পছন্দ করি না। তবুও তাতে জড়িয়েছো”।

“- এটা আমার কাজেরই অংশ বাবা”।

“- একবার জানালে কি হতো”?

“- আপনার শাসন গুলো হারিয়ে যেতো”।

“- কবে এসবে জড়ালে”?

“- বছর চারেক হয়েছে। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, অনেক অপারেশনে শামিল হতে হয়েছে। আর আজ, আমি এখানে”।

আশরাফ মির্জা ছেলের পিঠ চাপড়ে দিলেন। খুশিতে তারচোখ মুখ মাত্রাতিরিক্ত সতেজ দেখায়। গর্বিত ভঙ্গিতে বলেন,

“- কাজ শেষে তাড়াতাড়ি ফিরবে। একসাথে রাতের খাবার খাবো, মুভি দেখবো।”

“- ঠিক আছে”।


আইনমন্ত্রীর সরকারি বাস ভবনের সামনে এসেছে আফিম। আফিমকে দেখে গার্ডরা গেট খুলে দিল। তবে ওরা আফিমের পুরো বডি সার্চ করল প্রথমে। এরপরই আফিমকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। আফিম সেখানে ঢুকতেই আইনমন্ত্রী ইলিয়াস এগিয়ে এলেন। তিনি খুব আয়োজন করে আফিমকে নিজ ঘরে প্রবেশ করালেন, ফুল দিয়ে স্বাগত জানালেন। প্রথমেই আফিমের খোঁজ খবর নিলেন তিনি, কলাকুশল বিনিময় করলেন। একটু পরই ভবনটিতে প্রবেশ করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আফিম এবার তার আমন্ত্রণের কারণটি বুঝে গেল সবটা পরিস্কারভাবে। দুজন ক্ষমতাধর মানু্ষের মুখোমুখি বসে সে বলল,

“- হঠাৎ ডেকে পাঠালেন”?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষিপ্ত সুরে বললেন,
“- তুমি আমাদের মাল আটক করেছো কোন সাহসে”?

আফিম হেসে বলে,
“- ভুল তো করিনি। সরকারি কর্মচারী আমরা, দেশের জন্য কাজ করি। দেশের সুরক্ষায় লড়তে হলে আমাদের সাহস বরাবরই বেশি থাকতে হয়”।

আইনমন্ত্রী নিচু কণ্ঠে বললেন,
“- জীবন হারানোর ভয় নেই তোমার? এখন যদি তোমাকে মেরে ফেলি, কেউ জানবে না। তোমাদের মতো পিঁপড়াকে পায়ে পিষে মেরে ফেললেও কেউ উচ্চবাচ্য করবে না”।

ঠাণ্ডা মাথায় ইলিয়াস আফিমকে থ্রেড দিল। আফিম বুঝল সবই। সেও ঠাণ্ডা মাথায় প্রত্যুত্তরে বলল,
“- আমার সৌভাগ্য, আপনাদের মতো ষাঁড় আমার মতো পিঁপড়াকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ ধরণের ভাগ্য কজনের হয় বলুন”?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন,
“- এসব থেকে সরে আসো। যা চাও, তাই পাবে। আমাদের হয়ে কাজ করো, তোমার মেধা আমাদের জন্য খাটাও। জীবনে কোনোদিন কোনোকিছুর অভাব হবে না”।

আফিম হেসে উঠে দাঁড়ায় সোফা থেকে। বলে,
“- স্যরি বাট, আপনাদের এই দুর্দান্ত প্রস্তাব আমাকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। আমি আফিম মির্জা ন্যায়ের জন্য লড়ি। অন্যায়কে কখনোই সমর্থন করি না। আপনারা যেই হোন না কেন, আমি পিছু হটবো না”।

“- ভালো করে ভেবে দেখো। যতটা সহজ ভাবছো, জীবন তোমার ততটা সহজ হবে না। আমার লোকদের আটক করেছো, ভাবছো ছাড় পাবে”?,

“- না, ভুল করেও ছাড় পাওয়ার কথা ভাবছি না। বিষাক্ত বিষ ছড়িয়ে দেয়া সাপের লেজে পা রেখেছি, বিষের তোপে তো পড়তেই হবে”।

আফিম কথায় কথায় অপমান করল দুজনকে। ওরা রেগে গেল খুব। আফিম উঠে গেল। দুজন ক্ষমতাশালী, তুখোড় নেতা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকিয়ে রইল আফিমের দিকে। আফিম বেরিয়ে যেতেই একযোগে হেসেও উঠল ওরা।


আজ রাতের ঝুম বৃষ্টি মৃত্তিকার হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়েছে। ঘরের সফেদ পর্দা গুলো বারংবার উড়ে ধাক্কা খাচ্ছে দেয়ালের সাথে। মৃত্তিকার খুবই ঘুম পেয়েছে। আফিম হয়তো আজ ফিরবে না৷ তার কি সব কাজ আছে, শেষ করে তবেই ফিরবে।

মৃত্তিকা কম্ফোর্টার টেনে আরামে চোখ বুজে নিল। আফিমের অবয়ব ভেসে উঠল চোখের পাতায়। তার অত্যাধিক সুন্দর মুখ খানা মৃত্তিকা চোখ বুজেও স্পষ্ট দেখল। মিটিমিটি হাসল সে৷ পরক্ষণেই উঠে গিয়ে কাবার্ড থেকে আফিমের ব্যবহৃত কালো শার্টটা আঙুলের মুঠোয় নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। চুমুও খেল কি মনে করে। শার্টটা নাকের কাছে টেনে শুকে নিল কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ, পুরুষালি দেহের মাতাল করা সুগন্ধি।

একটু খানি সময় গড়াতেই বাড়ির বাইরে থেকে আওয়াজ শুনতে পায় মৃত্তিকা। শব্দ গুলো বেশ জোরালো। মৃত্তিকা বেলকনিতে এসে নিচে ঝুঁকে দেখল দারোয়ান চাচা চেঁচামিচি করছে। একটি বড়সড় অ্যাম্বুলেন্স এসে থেমেছে তাদের বাড়ির সামনে। বেশ কিছুজন লোক কথা বলছে চাচার সাথে। চাচা আশরাফ মির্জাকে ডাকছে, মৃত্তিকাকেও ডাকছে। খুব জোরে, কেঁদে কেঁদে হাঁক ছুড়ছে। মৃত্তিকার মস্তিষ্ক হঠাৎই খারাপ সংবাদের আগাম লক্ষণ ছুঁড়ে দিল। বা চোখ লাফাচ্ছে মৃত্তিকার। যদিও মৃত্তিকা বা চোখ লাফালে বিপদ হয় এমন কুসংস্কার বিশ্বাস করে না। তবুও বুকটা ধরফর করে উঠল ওর। শাড়ির কুঁচি উঁচু করে ছুট লাগাল গেটের দিকে। সিঁড়ি বেয়ে নিচ তলায় এসে দৌড়ে সে গেটের বাইরে গেল। লোহার গেটের সামনেই গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। চাচা সমানে কেঁদে চলেছে মাথায় হাত দিয়ে। তাকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। গাড়িটির কাছাকাছি এসে মৃত্তিকার পায়ের গতি কমে। বুক ভার হয়ে আসে অজানা কারণে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে।

আশরাফ মির্জাও ছুটে এলেন। চাচাকে জিজ্ঞেস করলেন কাঁদার কারণ। চাচা বলতে পারলেন না। বরং মৃত্তিকা আর আশরাফ মির্জাকে দেখে আরো উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলেন। মৃত্তিকার মনের মাঝে ভয় ঢুকে গেল। কয়েকজন সুঠাম দেহের লোক আশরাফ মির্জার কাছে এসে দাঁড়াল। একটু সময় নিয়ে, মাথা নত, নিচু কণ্ঠে বলল,

“- আমরা অত্যন্ত দুঃখিত, এ ধরণের সংবাদ নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কিছু করার নেই, আপনাদের খবরটা জানাতেই হতো”।

আশরাফ মির্জা আঁতকে উঠলেন। ওরা কি বলতে চায় তিনি ভেবে পেলেন না। বললেন,

“- কি বলছো? ভালো করে বলো”?

একজন লোক মাথা নত করে বলল,

“- আপনার ছেলে শাফায়াত আফিম মির্জা আর বেঁচে নেই। মিশনে প্রতিপক্ষের গোলাগুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন”।

লোকটির বলা কথা বিস্ফোরণের মতো প্রকট আওয়াজ তুলল গগনে। হতভম্ব হয়ে গেলেন আশরাফ মির্জা। হা করে তাকিয়ে রইলেন সকলের দিকে। বিশ্বাস করতে পারলেন না কথাগুলো। মৃত্তিকা এগিয়ে এলো। বলল,

-” কাকে খুঁজছেন আপনারা”?

একজন বলল,
“- আমরা আফিম মির্জার লাশ তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে এসেছি”।

কথাটা শোনামাত্রই মৃত্তিকা আকাশ পাতাল এক করে গগনবিহারী চিৎকার করে উঠল। মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে এলে ওর। কোনো প্রশ্ন করার পূর্বেই কয়েকজন লোক পিকআপ থেকে সাদা কাফনে মোড়ানো একটি লম্বাটে লাশ নামাল বাড়ির দুয়ারে। মৃত্তিকার হাত পা কাঁপছে। চোখ পানিতে টইটুম্বুর। দাঁড়ানোর শক্তি পায় না সে, হাত-পা কাপে থরথর করে। শরীরের রক্ত চলাচল কিছু সময়ের জন্য স্থির হয়ে পড়ে। আশরাফ মির্জা সঙ্গে সঙ্গে লাশটির মুখ খুলে ফেলেন। সাদা কাপড়ে মোড়ানো রক্তাক্ত দেহটায় চোখ বুলিয়ে চট করে লাশের মুখের উপর থেকে সাদা কাফন সরিয়ে ফেলে। সাদা কাপড়টা সরানোর সাথে সাথে ফ্যাকাসে, ধবধবে ফর্সা একটি নিষ্পাপ মুখ প্রতীয়মান হয়। আশরাফ মির্জা এক ঝটকায় কাপড়টা ফেলে কিছুটা দুরে লাফ দিয়ে বসে পড়েন। আফিম, আফিমের লাশ। নিষ্পাপ মুখ, সুন্দর অবয়ব। শক্তপোক্ত দেহটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো, তার ছেলে শুয়ে আছে লাশ হয়ে। সে বেঁচে নেই, আফিম আর বাবা বলে ডাকবে না আশরাফ মির্জাকে। কথায় কথায় বিয়ে করো বিয়ে করো বলপ বিরক্ত করবে না আর। আফিম কোনোদিন উঠবে না, ডাকবে না, তাকে ছোঁয়া যাবে না, দেখা যাবে না।

আশরাফ মির্জা “আফিইইইইইম” বলে এক চিৎকারে লুটিয়ে পড়েন ধুলোবালি জমা সিমেন্টের রাস্তায়। বুকে হাত চেপে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে হাউমাউ করে। বলে,

“- ওরে আমার বাপ রে, ওরে আমার আফিম। আমার ছেলে, আমার এক মাত্র মানিক, আমার কলিজা রে। বাবার বুকটা শুন্য করে দিলি আফিম। আমার বুকের ধন, আমার জীবন। আমাকে রেখে চলে গেলি, ওরে বাআআআপ। আমায় এই মরণ যন্ত্রণা দিলি আফিইইইম”।

বলতে বলতে তিনি চাপড় দেন রাস্তায়। এক নাগারে রাস্তায় নিজের হাত দ্বারা আঘাত করেন। হাত পা ছোড়াছুড়ি করে কাঁদেন।
মৃত্তিকা ঠায় দাঁড়িয়ে। পা চলছে না। আশরাফ মির্জার চিৎকারে তার শরীর দুলে ওঠে। বিশ্বাস হয় না তার কথা। দুরুদুরু বুকে সে এগিয়ে যায় লাশের দিকে। ঝাপসা চোখে মুখটা অস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় তার চোখে। মৃত্তিকা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। আরেকটু কাছে গিয়ে লাশটার দিকে ভালো করে নজর ফেলতেই মৃত্তিকার হৃদপিণ্ড ঝলসে ওঠে। অস্ফুটে বলে ওঠে,

“- আফিইইইম”।

মৃত্তিকা হামলে পড়ে লাশের দিকে। সাদা কাপড়টা সরিয়ে উন্মাদের মতো আঁকড়ে ধরে বলিষ্ঠ দেহটাকে। বুকের মাঝে টেনে উদভ্রান্তের মতো চুমু খায় মৃত মুখে। আফিমের হাত-পা মাত্রাতিরিক্ত ঠাণ্ডা। আফিম হাত-পা ছেড়ে দিয়েছে, ফর্সা শরীরটায় যেন রক্ত নেই, ধবধবে দেখাচ্ছে দেহটা। মৃত্তিকা আফিমের মুখ দু হাতে ধরে। চোখ থেকে পানি পড়ছে মেয়েটার। গলা, বুক ভেসে যাচ্ছে নোনা পানিতে। আশরাফ মির্জা জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছে। দারোয়ান চাচা আফিমের বন্ধুদের কল করেছে। ওদিকে মৃত্তিকার খেয়াল নেই। আফিমের লাশটার দিকে সে অবুঝের মতো তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে,

‘- আপনি এভাবে রাস্তায় শুয়ে আছেন কেন আফিম?, ওরা আপনাকে এভাবে সাদা কাপড়ে পেঁচিয়েছে কেন? আফিম, আফিম। আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি, আমি মৃত্তিকা। কথা বলুন”।

আফিম সাড়া দেয় না। সে মৃত একটি লাশ। তার জ্ঞান নাই, প্রাণ নাই। সে উঠবে না কখনো, কথা বলবে না। তার অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে মুছে গেছে। সে গভীর ঘুমে তলিয়েছে, এ ঘুম আর কখখনো ভাঙবে না। মৃত্তিকার হুঁশ ফেরে আফিমের লাশ বয়ে আনা টিমের সদস্যদের কথায়। একজন বলে,

“- মিশনে গোলাগুলির সময় প্রতিপক্ষের বুলেটে স্যার আহত হন। হাসপাতালে নেয়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন”।

কথাটা শোনা মাত্রই মৃত্তিকা চিৎকার করে ওঠে। এতটাই প্রকট শব্দ যে কণ্ঠনালি ছিঁড়ে যাওয়ার মতে ভয়ঙ্কর শব্দে আশপাশ কেঁপে ওঠে। মৃত্তিকার মাথা কাজ করে না। প্রিয়জনকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে তার শরীর অকেজো, অসাড় হয়ে আসছে। সে চোখ, গাল মুছে বলে,
“- কি বলছেন এসব? আফিম বলেছিল ও আসবে। আমাকে বলেছিল শাড়ি পড়ে সেজেগুজে বসে থাকতে। আমাকে না দেখে ও কোথায় যাবে? আশ্চর্য! আপনারা এসব বলছেন কেন? আফিম উঠবে।

মৃত্তিকা আফিমকে ডাকে। আফিম সাড়া দেয় না। মৃত্তিজা উন্মাদ হয়ে ওঠে। খামচে একাকার করে দেয় মৃত দেহটাকে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না এসব। রুহ বেরিয়ে আসছে। আফিমকে ছাড়া মৃত্তিকা অচল, এই মানুষটাকে ছাড়া মৃত্তিকা বাঁচবে কি করে? এ হতে পারে না। মৃত্তিকা আফিমের গালে থাপ্পর দেয়। মৃত শরীর ঝাকায়। বারবার ডাকে,

“- আফিম উঠুন, আফিম। আমি কাঁদছি আফিম। আমার গাল মুছে দিন না। আফিম আমার চোখের কাজল লেপ্টে গেছে, ঠিক করে দিন না। আপনি কথা বলছেন না কেন? রাগ করেছেন নাকি অভিমান? বাবাও কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে আফিম। আপনি উঠুন।”

আফিম উঠছে না। তার দেহ আরো শীতল হচ্ছে। মৃত্তিকা আহাজারি শুরু করে দিয়েছে। তার আর্তনাদ কান্না দেখে বাকিদের চোখে পানি জমছে। আশরাফ মির্জা আধো আধো চেয়ে দুর্বল কণ্ঠে ডাকে,

“- আফিম, বাবা৷ আমার বুকে আয়। আর তোকে বকবো না। আমি তোকে ছাড়া কিভাবে থাকবো বাবা? আমার কলিজা, আমার একমাত্র সন্তান, আমার কাছে ফিরে আয় বাবা। বাবা তোকে ভালোবাসে আফিম। ওই মেয়েটাকে কাঁদাস না আর”।

মৃত্তিকা আফিমের লাশ বুকে আঁকড়ে ধরে শক্ত করে। বুকের মাঝে মিশিয়ে নেয় আফিমের বুক। সে মরে গেছে। শ্বাস চলছে না, মৃত্তিকার বাহুডোরে আটকে সে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে না। জীবনের মায়া সে ত্যাগ করেছে। মৃত্তিকার কান্না আফিম শুনছে না। মৃত্তিকা হাউমাউ করে দাপিয়ে কাঁদে। আফিমের চুলগুলোকে টেনে ধরে। আর্তনাদ করে বলে,

“- আমাকে ছেড়ে যাবেন না আফিম। আমি বাঁচবো না। আমার কেউ নেই আফিম। আমি আপনাকে ভালোবাসি আফিম। আপনি শুনতে চেয়েছিলেন না? শুনুন, আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি আপনাকে। আপনি আমায় ধোঁকা দিয়েন না আফিম। আমি মরে যাবো। আমার বুক পুড়ছে, আমি দম নিতে পারছি না। আমার কষ্ট হচ্ছে আফিম। কষ্টে আমার বুকের পাঁজর ভেঙে যাচ্ছে। দয়া করে উঠুন, আমার কথা শুনুন”।

মৃত্তিকা আর আশরাফ মির্জার আর্তনাদে আশপাশের মানুষ ছুটে এসেছে। সবাই কাঁদছে আফিমকে দেখে। মৃত্তিকা সবাইকে দেখে হেসে বলে,

“- আপনারা বলতেন না আফিম গুণ্ডা, বখাটে, মাস্তান? আফিম কিন্তু ওসব না। আফিম, আফিম একজন সরকারি কর্মকর্তা। সরকারের গুপ্তচর। ও ভালো কাজ করে, ন্যায়ের জন্য লড়াই করে। আপনারা ওকে আর বকবেন না কেমন? আমার আফিম খুব ভালো। ওকে বকবেন না, ও সহ্য করতে পারবে না”।

বলেই হু হু করে কেঁদে উঠল মৃত্তিকা। তার কথা সবার বিশ্বাস হলো না। মুহুর্তের মাঝে সাংবাদিকরা এসে ভিড় জমাল। একের ওর এক প্রশ্ন করে গেল। সরকারের অন্যান্য সদস্যরা উত্তর দিল। আফিমের পরিচয় প্রকাশ করল প্রথমবার। সকলেই হতভম্ব। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই সাক্ষাৎকার ছড়িয়ে পড়ল। কোটি কোটি মানুষ আফিমের পরিচয় জেনে থ বনে গেল। সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি চ্যানেল, রেডিওতে আফিমের ছবি সহ তার কাজবাজ নিয়ে কথা উঠল, টিমের সদস্যদের ভয়েস ক্লিপ ছড়িয়ে দেয়া হলো। যারা আফিমকে দেখেনি, চেনে না। তারাও আফিমের জীবনযাপন দেখে অবাক হলো।

মৃত্তিকা কাঁদতে কাঁদতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। শরীরে তার বল নেই। আফিমের শরীরটা প্রচণ্ড ভার। মৃত্তিকা তাকে কোলে চেপে বসে আছে। আফিমের গালের সাথে গাল মিশিয়ে বিড়বিড় করে বলছে কিছু। তার শরীর দুলছে, হাত পা কাঁপছে। আফিমকে ঘন ঘন চুমু খাচ্ছে মৃত্তিকা। বুকের মাঝে এমন ভাবে আগলে রেখেছে যেন আফিমকে সে কিছুতেই ছারবে না। আফিমকে কোথাও যেতে দেবে না। সে কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করে বলে,

“- আফিম, উঠুন। আমার ভালো লাগছে না। আমি মরে যাবো। আমার ভয় করছে, আমাকে আপনি ছেড়ে যেতে পারেন না। আমি আপনাকে যেতে দিবো না।”

পাড়া প্রতিবেশী সবাই এসেছে। লাশ ধরে আহাজারি শুরু করেছে মৃত্তিকা। শান্ত, রায়ান, রূপক আফিমের মৃত দেহ দেখে থমকে গেল। সবাই মিলে হামলে পড়ল আফিমের মৃতদেহের উপর। এক নাগারে কাঁদতে লাগল ভাই সম বন্ধুরা। শান্ত চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আফিমের বুক থাপড়ে বলল,

“- আফিম, ভাই আমার। তুই ছাড়া আমাদের কে আছে? কে আমাদের প্রটেক্ট করবে? তুই ফিরে আয়। তোকে ছাড়া আমরা ভালো থাকবো না”।

মরা বাড়িতে পরিণত হয় মির্জা ভবন৷ একে একে মৃত্তিকার পরিবারের লোকজন আসে। মৃত আফিমকে ঘিরে কান্নার রোল পড়ে যায়। মৃত্তিকার খিঁচুনি ওঠে, অজ্ঞান হয়ে যায় কয়েকবার। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে ভেঙেচুড়ে যায় আতিকুর রহমান ও মনোয়ারার হৃদয়। তারাও সমান তালে কাঁদতে থাকে। রাত পেরিয়ে যায়, কান্নার শব্দ কমে এলেও তা গভীর হয়। সবাই মিলে আফিমের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা করে বড় মসজিদের পাশের কবরস্থানে। মৃত্তিকা অজ্ঞান হলে সবাই সুযোগ বুঝে আফিমের মৃত দেহটাকে গোসল করিয়ে নিয়ে যায় কবরস্থানে। আফিমের পেশা জানার পর দেশের লাখ লাখ লোক আফিমের জানাজায় ছুটে আসে। সবাই শোক প্রদর্শন করে। আশরাফ মির্জা কাঁদতে কাঁদতে দিশেহারা। তিনি বারবার বলেন,

“- আমার ছেলে সোনার টুকরা। সে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমার ছেলে শহীদ। আমার ছেলের জন্য আমি গর্বিত, আমি একজন গর্বিত পিতা। আমার ছেলে দেশের জন্য মরেছে, শুনেছো তোমরা? আমার ছেলে সরকারি কর্মকর্তা।”

তার আর্তনাদে দেশ বিদেশের মানুষ ও দাপিয়ে কাঁদে। ছেলেকে কবর দিয়ে কবরের মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকেন তিনি, শুয়ে পড়েন সেখানেই। মাটিতে মুখ ঠেকিয়ে বিরবির করে বলে,

“- বাবা, বাবারে, কষ্ট হয় একা? আমি আছি বাবা। আমি থাকবো তোর সাথে”।

মৃত্তিকার জ্ঞান ফিরলে আফিমকে সে পায়না। সে উন্মাদ হয়ে ওঠে। সব কিছু ভেঙেচুরে ফেলে। নিজের ক্ষতি করতে দু বার ভাবে না মেয়েটা। ওকে ইনজেকশন পুশ করে ঘুম পাড়ানো হয়। আফিমের মৃত্যু, আফিমের জীবন নিয়ে চর্চা হয়। লাখ লাখ মানুষ আফিমের জীবন সম্পর্কে জেনে কাঁদে। তার ন্যায়, তার নিষ্ঠা, কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা দেখে মানুষ আফিমকে কুর্নিশ জানায়। আফিমের ছেলেপেলেরা এতিম শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের ভালোমন্দ খাওয়ায় রোজ। আফিমের পরকালীন শান্তি কামনায় সব রকম ভালো কাজে ঢুকে পড়ে তারা। মৃত্তিকার অবস্থার অবনতি ঘটে দিনকে দিন। সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। হুঁশ-জ্ঞান নেই তার।


আফিম মারা গিয়েছে আজ দুদিন। মির্জা ভবন খালি। কারো ছুটোছুটি নেই, কারো চেঁচামিচি নেই। মৃত বাড়িতে পরিণত হয়েছে বাড়িটা। মৃত্তিকা ঘরের এক কোণে হাঁটু গেঁড়ে পড়ে থাকে। খায় না, গোসল দেয় না। এক নাগারে শব্দহীন কাঁদে, রাত হলে কান্নার শব্দ বাড়ে মৃত্তিকার। ফ্লোর চাপড়ে, দাপিয়ে কাঁদে। তার কান্নার তীব্র শব্দরা ঘরটাকে আরো ভয়ঙ্কর করে তোলে। মৃত্তিকার পাশে তার মা থাকে। কখন মেয়েটা কি করে বসবে এই ভয়ে সে ঘুমায় না ভালো করে। মেয়েকে জাপ্টে ধরে রাখে সবসময়।

আফিম, যাকে গুণ্ডা, বখাটে বলে মানুষ তিরস্কার করতো। আজ তার নাম জপে সকলে। আজ আফিমের গুণ, আফিমের দায়িত্ববোধ, দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখে সবাই বাহবা দেয়, প্রশংসা করে। আফিমের ছবি পোস্টার আকারে দেয়ালে দেয়ালে কারা যেন টানিয়েছে সম্মান প্রদর্শনের জন্য। শহর জুড়ে সবচে আলোচিত ব্যক্তির নাম আফিম মির্জা। অথচ বেঁচে থাকা কালীন তাকে কজনই বা চিনতো? আফিমের গণ্ডী এই ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর আজ? দেশ-বিদেশের মানুষ আফিমকে চেনে, জানে। তার কাজের জন্য তার প্রতি সম্মান, ভক্তি, শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছে সবার। এত এত আলোচনা, এত এত প্রশংসা মানুষটা বেঁচে থাকতে পায়নি। আফিম যদি আজ বেঁচে থাকতো, কতই না খুশি হতো।

মনোয়ারা ঘুমিয়েছে। মৃত্তিকা এখনও সজাগ। দুটো দিন ধরে সে ঘুমায় না। এর মাঝে প্রায় দশবার কবরে গিয়ে মাটি ধরে কেঁদেছে। পাগলের মতো কবরের মাটি খুঁড়ে লাশটা বের করার চেষ্টা করেছে। তাকে আটকানো হয়েছ বারবার। আফিমের মৃত্যুটা মৃত্তিকার কাছে রহস্যজনক। আফিমের তো সেদিন কোনো মিশনে যাওয়ার কথা ছিল না? মৃত্যুর আগের দিনই তো সে মিশনে গিয়ে একদল সন্ত্রাসীদের ধরেছে বন্দর থেকে। ওদের থানায় পাঠিয়ে দিয়েছে। যেদিন আফিম মারা গেল, সেদিন তো বলেছিল কারো সাথে দেখা করতে যাবে। হ্যাঁ, মনে পরেছে মৃত্তিকার। আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেখা করার কথা ছিল আফিমের। যাবার আগে এটাই সে বলে বেরিয়েছিল। এমনকি মিশনের পর থেকেই আফিম মৃত্তিকাকে সাবধানে থাকতে সতর্ক করেছিল। বাড়ি থেকে বের হতে না করেছিল, এ বাড়ি, ও বাড়িতে গার্ড আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। সবাইকে রক্ষা করতে গিয়ে মানুষটা নিজের প্রাণ হারাল। মিশনে কি এমন হয়েছিল? কেন লোকটা চিন্তিত ছিল সবার জন্য?

মৃত্তিকা কাবার্ড এলোমেলো করে ফেলে। কিছু একটা খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে সে। মনে পড়ে যায় পেনড্রাইভের কথা। আফিম ওটা দিয়েছিল তাকে কেথায় পেনড্রাইভটা?

মৃত্তিকা খুঁজে বের করে সেই পেন ড্রাইভ। তখনই সে ফোন করে শান্তকে। আইটি ডিপার্টমেন্টের লোক শান্ত। এসব খুব ভালো বুঝবে। শান্ত তড়িঘড়ি করে আফিমের বাসায় ঢোকে। পেনড্রাইভটা অন করতেই সবটা পরিষ্কার হয়ে তাদের চোখে ধরা দেয়। মৃত্তিকা হু হু করে কেঁদে ওঠে। সাথে শান্ত নিঃশব্দে কাঁদে। কান্নার দাপটে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে।


শাহবাগ মোড়ে টানা দু মাস আন্দোলন করেছে আফিমের ছেলেপেলেরা। প্রমাণ লোপাট করা হয়েছিল। মিশনে আটক হওয়া সব লোকদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, অবৈধ অস্ত্র, মাদকদ্রব্য সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। পেনড্রাইভে আটক হওয়া সকলের জবানবন্দি এবং পই রাতের মিশনের সমস্ত ঘটনা ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। মিছিল, আন্দোলন, রাস্তা অবরোধের মাধ্যমে শেষমেশ আফিমের মৃত্যুর রহস্য সবার সামনে এসেছে এবং বিচার হয়েছে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। ওদের ক্ষমতাচ্যুত করে সেলে আটকে রাখা হয়েছে। জনগন ওদের উপর ক্ষুব্ধ। ওদের পেলেই যেন জনগন ছিঁড়ে খাবে, রাস্তায় পায়ের তলায় পিষবে। জনগন ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। ওদেরকে ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। ওদের ফাঁসি চেয়ে জনগন আন্দোলন গড়ে তুলেছে। আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করে ফেরার পথেই আফিমকে গুলি করে মেরেছিল আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লোক। আফিমকে নিষ্ঠুরভাবে মেরেছে ওরা। একের পর এক গুলি ছুঁড়ে বুক ঝাঁঝরা করে ক্ষতবিক্ষত করেছিল আফিমকে। বেঁচে যাওয়ার কোনো সুযোগ দেয়নি ওরা। বাইক থেকে ধপ করে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল আফিম। পিচঢালা রাস্তায় রক্তে হামাগুড়ি খেয়েছিল সে। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে ওরা আফিমের জীবন কেড়ে নিয়েছে। একটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।

আজ মৃত্তিকা নীল রঙের শাড়ি পড়েছে৷ হাতে নীল চুড়ি। চোখে মোটা করে কাজল টেনেছে সে। অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মৃত্তিকা পিছন ফিরে বলে,

“- আমাকে কেমন লাগছে আফিম”?

পেছন থেকে আফিম হেসে উত্তর দেয়,
“- আমার বউ বউ লাগছে।”

লাজে থতমত খায় মৃত্তিকা। বলে,
“- আপনি আমায় আর আগের মতো ভালোবাসেন না”।

আফিম মেয়েটির অভিযোগ শোনে। মৃত্তিকা মুখ ফোলায়। ঝরঝর করে কাঁদে। এত ছোট বিষয়ে কেউ কি করে কাঁদে আফিমের জানা নেই। সে দেয়াল ঘেঁষে দাড়িয়ে বলে,

“- আহা, কাঁদছো কেন”?

মৃত্তিকা টলটলে চোখে বলে,
“- আপনি এত দুরে দুরে থাকেন কেন? আপনাকে আমার ছুঁতে মন চায়”।

আফিমের মুখটা খানিক ফ্যাকাসে হয়ে আসে। মলিন সুরে সে বলে,

“- আমি তোমায় ছোঁয়ার ক্ষমতা হারিয়েছি। আমি যে আর নেই মৃত্ত। পৃথিবীর কোথাও আমি নেই, আমি তোমার ভ্রম, তোমার কল্পনা। বাস্তবে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই মৃত্ত।”

মৃত্তিকা ঢুকরে কেঁদে ফেলল আবারও। বলল,
“- একদম বাজে কথা বলবেন না। খালি আমাকে কাঁদাতে চান তাইনা? একটুও মায়াদয়া নেই আপনার। আপনি আছেন। ওই তো, সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার কিছু হয়নি, আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিবো না। আপনি সুস্থ আছেন, আমার কাছে আসেন। একদম ছল করবেন না”।

আশরাফ মির্জা এসেছিলেন মৃত্তিকার ঘরে। বরাবরের মতো মৃত্তিকাকে একা একা কথা বলতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। আফিমের মৃত্যুর দু মাস পরেও মৃত্তিকা স্বাভাবিক হতে পারেনি। সে এখন অস্বাভাবিক আচরণ করে। কখনো তাকে মাঝ রাতে রান্নাঘরে দেখা যায়। আশরাফ মির্জা যদি জিজ্ঞেস করেন এত রাতে সে কি করছে? মৃত্তিকা গাল ভরে হেসে উত্তর দেয়,

“- আপনার ছেলে মারপিট করে এসেছে। বলল চিংড়ি মাছ খাবে। না রেঁধে উপায় আছে বলুন”?

কখনো আবার মৃত্তিকা মাঝ রাতে উচ্চস্বরে গান গেয়ে ওঠে। আশরাফ মির্জা বারণ করলে লাজুক হেসে বলে,

“- আফিম গান শুনতে চায় বাবা। তার কণ্ঠে নাকি সুর নেই। খুব মন খারাপ করে থাকে এই বিষয়টা নিয়ে। তাই আমি গান গেয়ে ওর মন ভালো করে দিই”।

মৃত্তিকা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে হাওয়ার সাথে কথা বলে। তার কল্পনায় একটা আফিম আছে। সে বিশ্বাস করে না যে আফিম নেই। সর্বক্ষণ সে আফিমের সাথে কথা বলে। যে এ পৃথিবীতে নেই, তার সাথে কিভাবে কথা বলা যায়? সে কখনো হাসে, কখনো কাঁদে। তার মতিগতি বোঝা দায়। মৃত্তিকার বাবার বাড়ির লোকজন তাকে নিতে এলে সে যেতে চায় না মির্জা ভবন থেকে। বলে,

“- ও বাড়িতে যাওয়া আফিম একদম পছন্দ করে না। ও বলেছে এখানেই থাকতে, নইলে বন চটকানা দেবে। আমার তো রাগ হয়, কিন্তু কি করবো? সে যদি পালিয়ে যায়? তাই তো আমি কোথাও যাই না। ওর তো খুব রাগ। আমাকে বাড়িতে না পেলে খুব কষ্ট পাবে”।

মৃত্তিকা তার কল্পনায় সুখী। এই সুখটুকু কেউ কেড়ে নিতে চায় না। আফিম নেই। তার দেহটা কবরে পচে গলে গিয়েছে। কেউ এখন মৃত্ত বলে ডাকে না, ভালোবাসে না, আদর করে না। মৃত্তিকা অভিমানে, রাগে কত গালিগালাজ করে, বিলাপ করে, কাঁদে। তবুও নিষ্ঠুর আফিম পুরোপুরি ধরা দেয় না। সে দুরে দুরে থাকে, মৃত্তিকার কাছে আসে না, গান গায় না। বড় আক্ষেপের সুরে আফিম বারবার বলে,

“- আমি হারিয়েছি সেখানে, যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না। আমি আমার মৃত্তর সান্নিধ্য হারিয়েছি। আমার ক্ষমতা নেই মৃত্তকে ছোঁয়ার, ভালোবাসার। আমি দুর থেকে তোমাকে ভালোবাসি মৃত্ত, খুব গভীর ভাবে ভালোবাসি।

মৃত্তিকা আহাজারি করে কাঁদে উন্মাদের মতো। ক্রন্দনরত ভাঙা কণ্ঠে অভিযোগ ছোঁড়ে,

“- দূরত্ব এত যন্ত্রণাদায়ক কেন? আমার আফিম, তাকে কেউ দেখে না কেন? সে আছে, সত্যিই আছে। সে আমার পাশে বসে থাকে। তার এখন কোনো কাজ থাকে না, সে এখন আর পালায় না, মারপিট করে না। সে এখন আমার কাছে এসে থাকে। তবুও মনে হয় সে অনেক দূরে। আফিম, পুণর্জন্ম বলে কিছু নেই। যদি থাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার অনুরোধ, পরের জন্মে তিনি যেন আমাকে আপনার ভাগ্যে রাখেন। আমি যেন আপনারই হই। শুধু আর শুধুমাত্র আপনার”।

এরপর আবার হাসে মৃত্তিকা, আবার কাঁদে। কখন হাসে কখন কাঁদে বোঝা দায়। ঘরের এক কোণে বসে কতশত আলাপ করে আফিমের সাথে। তার মানসিক অবস্থা ভেঙে দেয় আশরাফ মির্জাকেও। এই গল্পের সমাপ্তি কোথায়? মৃত্তিকা আজীবন এই দুঃখ বয়ে বেড়াবে? মাত্র তিন মাসের সংসার জীবন তাকে এমন ভাবে আটকেছে, সে চাইলেও এ সংসার থেকে বের হতে পারে না। সে সাধ্যি তার নেই। আফিম মির্জাকে ঘিরে তার একটি ছোট্ট সংসার গড়ে উঠেছে কল্পনায়। কিন্তু এই ভ্রমের মেয়াদকাল কতদিন?

ঘর থেকে আবারও মৃত্তিকার কথা ভেসে আসে। এখন সে কল্পণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এরকমটাই হয়। সে কখনো ভ্রমে আটকে থাকে, আবার কখনো তার চেতনা ফেরে। যখন কল্পনায় থাকে তখন হাসে, আর ভ্রম কেটে যেতেই চিৎকার করে দাপিয়ে কাঁদে। এখন বাস্তবতা বুঝতে পেরে মৃত্তিকা কাঁদছে। তার দুর্বল কণ্ঠ ভেসে আসছে,

“- মাত্র তিন মাসের সম্পর্কে আপনি আমায় এমন ভাবে বাঁধলেন কেন? কেন আমায় নরক যন্ত্রণা দিলেন? আমি আর পারি না। আবার দুঃখে বুক ফেটে যায়, মরে যেতে ইচ্ছে করে। আমি পারি না আর। আফিম, আসুন না। আমাকে ডাকুন একবার। আমার কষ্ট হয় আফিম, আমি মরে যাচ্ছি আফিম। আপনি বলেছিলেন আমার কান্না আপনার ভালো লাগে, তবে তা হতে হবে সুখের কান্না। আজ আমি অনেক কষ্টে হাউমাউ করে কাঁদছি, আপনি আমায় একটু জড়িয়ে ধরুন না, একটু শান্ত করুন না আমার হৃদয়টাকে। আমার যে বুকটা পোড়ে। এত দহন, আমি সইতে পারি না আফিম”।

একটু পরই সে আফিমকে কল্পনা করে আবার ফিক করে হেসে ওঠে। গল্প জুড়ে দেয় কল্পনায় বসবাসরত আফিমের সাথে। আফিম শোনে সকল আবদার, অভিযোগ। যা লুটিয়ে আছে মাটির নিচে।

  ~সমাপ্ত

[নোটঃ আপনারা আজ খুব কাঁদবেন তাইনা? টানা দুদিন আমিও কেঁদেছি। এন্ডিং গল্পের শুরুতেই ভেবে রেখেছিলাম। তবে এত দ্রুত এন্ডিং টানবো ভাবিনি। আমি খুব দয়ালু। আরো কয়েকটা পর্বে আফিমকে জাঁকজমকভাবে উপস্থাপন করে শেষে এই দুঃখটা দিতে পারিনি। আজ সবার সব অভিযোগ, কান্না শুনবো আমি। আমাকে আনফলো করবেন তো? করুন। আমি কোনো অভিযোগ করবো না। আর আফিম মির্জা বইয়ে আসবে। সেখানে হ্যাপি এন্ডিং পাবেন, আফিম আর মৃত্তকে আরো সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করবো, আপনারা তৃপ্ত হবেন ইনশাআল্লাহ্❤️]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply