‘আদিল মির্জা’স বিলাভড’
— ২৫
থমথমে, নিস্তব্ধ আবহাওয়া চিড়ল গাড়িগুলোর কর্কশ শব্দ। মার্বেলের ড্রাইভওয়ে পিষে এসে থেমেছে সারিবদ্ধ ভাবে। গাড়ি থামতে দেরি শান্তর চটজলদি বেরুতে দেরি হলো না। ও দ্রুতো দক্ষ হাতে মেলে ধরল গাড়ির পেসেঞ্জার সিটের দরজা। দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তিতান-থোর। ঘেউঘেউ করছে সমানে। আদিল নেমে এলো তখুনি। ওরা এতে আরও উৎসাহিত হয়। পায়ের সাথে মিশতে চেয়ে আরও জোরালোভাবে শব্দ তুলে ডেকে ওঠে। আদিল ঝুঁকল, ওদের গায়ের মসৃন পশম বুলিয়ে দিলো। সেভাবেই ফিরে তাকাল গাড়ির ভেতরে। রোযা এককোণে এখনো সেঁটে আছে। বেরুনোর লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে। চোখের ওই কঠিন দৃষ্টি আদিম অগ্রাহ্য করল। বেরুনোর জন্য বলল না। তাগাদা দিলো না। বসের নির্বিকার ভাব দেখে শান্তও নড়ল না। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকল স্ট্যাচুর মতো। সরল থোর আর তিতানের ঘেউঘেউ ব্যতীত আর কোনো শব্দ শোনা গেলো না কিছুটা সময়।
সেইমুহূর্তেই অদূর থেকেই বাচ্চাবাচ্চা এক কণ্ঠের ভীষণ হৃদয়বিদারক কান্নার সুর ভেসে এলো। আদিল সতর্ক চোখে তাকাতেই এলেন ছুটল দুয়ারপথের সোনালি রঙের ছয়টা সিঁড়ির কাছে। হৃদি দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে কাঁদতে কাঁদতে। ওখান থেকেই ডাকছে সমানে –
‘ড্যাড! ড্যাড।’
র ক্ত বর্ণ ছোটোখাটো মুখটা চোখের জলে ভেজা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা। এলোমেলো হয়ে আছে মাথার চুল। কুকড়ে আসা ফ্রোকটা বাতাসে উড়ছে। আদিল মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকল শুধু। একটা কথাও বলল না। বসল দু-পায়ের পাতায় ভর দিয়ে। দু-হাত অল্প মেলে দিতেই তার বাহুতে হাওয়ার বেগে এসে ঝাপিয়ে পড়ল বাচ্চাটা। ছোটো দুটো হাতে গলা জড়িয়ে সমানে কাঁদতে থাকল। কান্নার একফাঁকে শুধু একনাগাড়ে ডেকে গেলো –
‘ড্যাড, ড্যাড…ড্যাড!’
আদিল মেয়ের কান্না থামানোর চেষ্টা করে না। শুধু মেয়ের পিঠ বুলিয়ে দেয়। আড়চোখে লক্ষ্য করে গাড়ির ভেতরে থাকা শরীরটার ছটফটে অঙ্গভঙ্গী। রোযা চোখমুখ বুজে আছে। হৃৎপিণ্ড কাঁপছে। হৃদি কাঁদতে কাঁদতে ব্যাকুল হয়ে বলে গেলো –
‘ড্যাডি, স্নো-হোয়াইট কি আর আসবে না? শি ডাজন’ট ওয়ান্ট মি এনিমোর।’
রোযা আর বসে থাকতে পারল না। সম্ভব হলো না বসে বসে হৃদির ওমন কান্না শোনার। ওর ভেতরটা এমনভাবে মুষড়ে যাচ্ছে যা অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য নেই। হুড়মুড়িয়ে বেরুতেই বাচ্চাটার চোখ গেলো রোযার ওপর। মুহূর্তেই কেমন ঠোঁট ভেঙে শব্দ করে ফোঁপাল। বাবাকে ছেড়ে ছুটল রোযার দিকে। রোযা দু-হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। বাহুতে ঝাপিয়ে পড়া এইটুকুন শরীরটা যত্নের সাথে বুকের ভেতর মিশিয়ে নিলো। দু-হাতে পাগলের মতো এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে আওড়াল –
‘এমনভাবে কেনো কাঁদছো, সোনা? শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। থামো, কান্না থামাও।’
হৃদি থামল না। এমনভাবে বুকে মিশে থাকল, গলা জড়িয়ে রাখল যেনো ও ছেড়ে দিলেই রোযা পুনরায় চলে যাবে। হারিয়ে যাবে ওর জীবন থেকে। বাচ্চাটার করুণ স্বরের কান্নায় সব স্তম্ভিত। নিজের অজান্তেই রোযার বাম চোখের কোণ থেকে একফোঁটা জল গড়াল গাল বেয়ে। দু-হাতে হৃদির কান্নারত মুখটা আগলে নিয়ে চোখ দুটো মুছিয়ে দিলো। লাভের লাভ কিছু হলো না। পরমুহূর্তেই পুনরায় চোখের জলে ভেসে গেলো বাচ্চার র ক্তিম ফুলোফুলো গাল দুটো। রোযা অসহায় হয়ে মাথাটা বুলিয়ে শান্ত করতে চাইল ক্রমান্বয়ে। চাপাস্বরে কতোকিছু বলতে থাকল, তাতেও কাজ হলো না। হৃদি কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছে না। ওকে শান্তই করা যাচ্ছে না। উল্টো রোযাই কেঁদে ফেলেছে। অসহায় হয়ে পড়েছে। ছলছলে, ভাসাভাসা দৃষ্টি তুলে অবশেষে যখন তাকাল, একজোড়া ধূসরদৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। আদিল নীরবে চেয়েছিল মাত্র। এবারে মুখ খুলল। ওমন গভীর কণ্ঠে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলা শব্দগুলো শুনে মিইয়ে গেলো রোযা। তার বুকে মিশে অঝোরে কান্না করা হৃদিও থমকে গেলো।
‘ইউ শুড স্টপ ক্রায়িং। আর কোথাও যাবে না তোমার মাম্মাম। তোমার সাথেই থাকবে।’
হৃদির কান্নারত লালিত চোখজোড়া হতভম্ব হলো। বড়ো বড়ো চোখে অবুঝের মতো তাকাল রোযার মুখের দিকে। তারপর বাবার দিকে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে আওড়াল –
‘মাম্মাম?’
আদিল তাকিয়ে আছে রোযার ঘাবড়ানো চোখ বুজে থাকা মুখের দিকে। ওই মুখপানে চেয়ে থেকেই বলে, ‘আমার স্ত্রী তোমার কী হবে?’
হৃদি অস্থির হয়ে পড়ে। ঝাপসা চোখে রোযার ইতস্তত মুখ দেখে পরপর বাবার দিকে চেয়ে চুপসানো কণ্ঠে বলে –
‘মম?’
‘শি ইজ মাই ওয়াইফ, ইউর মম। উই গট ম্যারিড।’
বাচ্চা মেয়েটা স্তব্ধ চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকটা সময়। ওর চোখে ওমন অবিশ্বাস দেখে আদিল নীরবে মাথা নাড়িয়ে মেয়েকে আশ্বস্ত করল। হৃদি হতভম্ব চোখে অবশেষে তাকাল রোযার দিকে। জবাবে রোযা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করেও পারল না। হৃদির বাচ্চা বাচ্চা আঙুল গুলো কাঁপল যখন রোযার চোখের জল মুছতে হাত বাড়াল। অস্পষ্ট, দ্বিধাদ্বন্দে জড়ানো সুরে আওড়ে ডাকল –
‘স্নো-হোয়াইট?’
রোযা শান্ত থাকতে চাইল, ‘হুম।’
‘স্নো-হোয়াইট….’
‘হুম…’
হৃদির সাহস বাড়ল। ও নিগূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে ফিসফিস করল –
‘মম?’
রোযার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। একটা সম্বোধন মাত্র! অথচ ওর জগৎটা কেমন এলোমেলো লাগছে। চোখজোড়া ঝাপসা হয়। জবাব দিতে নিলে গলা ধরে আসে –
‘হুম।’
হৃদি ঝাপিয়ে পড়ে তখুনি, ‘মা…মা…মা….’
‘হুম!’
‘তুমি আমার মা, স্নো-হোয়াইট। ইউ আর মাই মাদার। মাই মাদার। তুমি আর কোথাও যেতে পারবে না। সারাজীবন আমার সাথে থাকবে। তাই না? বলো…বলো…বলো না?’
রোযা নীরবে শুধু জাপ্টে রাখে ছোটো শরীরটা। বন্ধ চোখের পাতায় ভাসে নিজের ফেলে আসা পরিবারের মুখ গুলো। সাথে চোখের জলে ভেসে যায় পুরো মুখ। অস্পষ্ট গলায় বলে –
‘থাকব।’
আদিল স্পষ্ট শোনে শব্দটি। নড়ে এবারে। একপলক চেয়ে কদম বাড়ায় বাড়ির দিকে। বসের সাথে সাথে কদম বাড়াল শান্ত, এলেনও। খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শান্তর র ক্তিম চোখজোড়া। এলেনের মুখের অভিব্যক্তিও কিছুটা অন্যরকম। দুজানাই মুখ লুকোতে ব্যস্ত একে অপরের থেকে। বাকি সবগুলো বডিগার্ডসও সরে দাঁড়িয়েছে অনেকটা দূরে। যেমন তাদের অস্তিত্বই নেই।
.
মরিয়ম বেগম, শাপলা বেগম সহ আরও দুজন কাজের লোক উপস্থিত আছেন। একসাথে তারা তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কী বলবেন বা করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না! দেবেন নাকি একটা বড়ো সালাম? বাড়ির মালকিন যে! তাদের ওমন দৃষ্টির সামনেই রোযা ইতস্ততভাবে হৃদিকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ইতস্তত হবে না বুঝি? আগে তো তাদের মতোন এক সামান্য কাজের লোক হিসেবেই প্রবেশ করতো। কিন্তু এখন? একমুহূর্তে সবটা কেমন পরিবর্তন হয়ে গেলো। রোযা আর কাজের লোকটি নেই! হৃদি তখনো দু-হাতে শক্ত করে রোযার গলা জড়িয়ে রেখেছে। একটু পর পর ডাকছে মিষ্টি করে –
‘মা!’
প্রত্যেকটা ডাকে রোযার ভেতরটা মমের মতন গলে যাচ্ছে। বুক ভরে আসছে আনন্দে। প্রত্যেকটা ডাকেই ও সাড়া দিচ্ছে, ‘হুম! কী?
হৃদি দু-গাল ভরে হাসল। এরপর খিলখিল করে। রোযার গালে গাল ঘষে পুনরায় ডাকল –
‘মা!’
রোযা অল্প হাসে। মাথা বুলিয়ে দেয়। বলে, ‘বলো…’
মরিয়ম বেগম এযাত্রায় সাহস করলেন কদম বাড়ানোর। গতকাল থেকে তিনি আঠার মতো লেগেছিলেন হৃদির। বাচ্চাটা গতকাল থেকে মনমরা হয়েছিল। কিচ্ছুটি খায়নি, গোসল করেনি। অসহায়ের মতো শুধু বসেছিল। আর আজ সকাল থেকে দেদারসে কাঁদছিল। তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, কতটা পাগল রোযার জন্য। আজ এমন সংবাদ শুনে তিনি আশ্চর্যের পাশাপাশি আনন্দিত। রোযা ভীষণ ভালো! এতোগুলো বছর তারা একসাথে কাজ করেছে। সচক্ষে দেখেছে কতটা ভালোবাসে ও হৃদিকে। বাচ্চাটা এভাবেইতো আর ওর ভক্ত হয়নি। মরিয়ম বেগমের একটুও দ্বিধা হয়নি নতুন সম্বোধন উচ্চারণ করতে।
এমনভাবে ডাকলেন যেনো যুগযুগ ধরে ডেকে আসছেন –
‘ম্যাডাম, আপনার জন্য সেই গতকাল থেকে কাঁদছে। কিচ্ছুটি খায়নি। জোরপূর্বকও খাওয়ানো গেলো না। দেখেছেন তার কী অবস্থা? গোসল তো দূরের বিষয়! মাথায়ও হাত ছোঁয়াতে দেয়নি। গায়ের কাপড়চোপড় সেই পরশু দিনের!’
রোযা আঁতকে ওঠে। ভালোভাবে তাকায় ওর উষ্কখুষ্ক মাথার দিকে, পরনের ফ্রোকের দিকে। মুখটা এইটুকুন হয়ে আছে শুকিয়ে। রোযা আর দাঁড়াল না ফার্স্ট ফ্লোরে। সিঁড়ি ধরল হৃদিকে কোলে নিয়েই। মরিয়ম বেগম দ্রুতো বললেন –
‘ম্যাডাম, আমি খাবার নিয়ে আসছি।’
রোযা ওই সম্বোধনে অপ্রস্তুত হলেও প্রত্যুত্তরে মাথা দোলাল। উঠে এলো দোতলায় হৃদিকে নিয়ে। ওর রুমে পৌঁছে দ্রুতো ওয়াশরু্মে ঢোকে। মাথায় শ্যাম্পু করে, ডলেডলে গোসল করিয়ে, শরীরে বাথরোব জড়িয়ে বেরিয়ে আসে কোলে করে নিয়েই। সদ্য গোসল করানো মেয়েটাকে দাঁড় করাতে চাইল ডিভানে। ও দাঁড়াবে না। রোযাকেই আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। রোযা অসহায় হয়ে আর কোল থেকে নামাতে চাইল না। ওকে কোলে নিয়েই বসল। শুভ্র রঙা তোয়ালে দিয়ে নরম ভাবে মুছতে শুরু করল পিঠ সমান চুলগুলো। হৃদি চেয়েই আছে মুগ্ধ চোখে। বোকা বোকা ভাবে শব্দহীন হাসছে কেমন। রোযা ওর নাক ছুঁয়ে বলে –
‘কী? এতো হাসছো কেনো?’
হৃদি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে, ‘আম সো হ্যাপি রাইট নাউ। আই এম দ্য হ্যাপিয়েস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’
রোযার হাত থামে না। নিঃশব্দে হাসে। জেনেও চুল মুছতে মুছতেই আওড়ায়, ‘তা কেনো?’
‘কারণ এখন থেকে তুমি আমার মাম্মাম। আমার সাথে থাকবে সবসময়। কোথাও যাবে না। এটা তো এখন থেকে তোমারও বাড়ি।’
রোযার ব্যস্ত হাত দুটো থেমে যায়। দৃষ্টি পড়ে না অনেকটা সময়। হৃদি মিষ্টি করে ডাকতেই ওর ধ্যান ভাঙে। তোয়ালে রেখে হেয়ার ড্রায়ার চালিয়ে চুল শুকোতে ব্যস্ত হয়। হৃদি যেনো ওর হাতের পুতুল। যেভাবে নাচাচ্ছে, মেয়েটা সেভাবেই নাচছে। এতো বাধ্য! রোযা মাথা নুইয়ে টুপ করে গালে চুমু খেলো। চুল শুকিয়ে ওর মাথায় সুন্দর একটা হেয়ারস্টাইল করল সময় নিয়ে। এরপর একটা মিষ্টি রঙের ড্রেস পরাল। এরমধ্যে মরিয়ম বেগম খাবার নিয়ে এলেন। অনেকটা সময় নিয়ে ওকে খাওয়াল নিজ হাতে। খাওয়া শেষ করিয়ে ক্লান্ত ওর মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে বলল –
‘এবার চোখ বুজে ঘুমাও, হুম? চোখদুটো লাল হয়ে আছে।’
হৃদি কোলে মুখ গুঁজল ঠিক তবে চোখ বুজতে অপারগ। দ্বিধা জড়িত গলায় ফিসফিস করল –
‘ভয় হয়। আমাকে রেখে যদি তুমি চলে যাও আবার!’
রোযার হৃদয়টা যেনো কেউ খামচে ধরেছে। ও দ্রুতো বলল, ‘কোথাও যাবো না…মা! তুমি চোখ ঘুমাও। উঠে দেখবে আমি এখানেই আছি। তোমার কাছেই।’
হৃদির ধূসর চোখদুটোতে তারা ভাসল। ও চোখ বুজল। রোযার হাত ব্যস্ত। নরম গতিতে বুলিয়ে দিতে থাকল মাথার চুলগুলো। এতে ভীষণ আরামবোধ করে হৃদি। পেটে মুখ গুঁজে শব্দ করে। বড়ো করে শ্বাস টেনে নেয়। তার মা! হৃদির মা। শুধু হৃদির।
—
সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ আগ দিয়ে দরজায় করাঘাত করল শান্ত। সেই যে আদিল নিজের রুমে প্রবেশ করেছে আর বেরোয়নি। আদেশ ছুঁড়ে গিয়েছিল, তাকে অপ্রোয়জনে বিরক্ত করতে না। তাই সবগুলো বাধ্যভাবে নিজেদের সংযত রেখেছিল। কিন্তু এতক্ষণ কী আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা যায়? চিন্তা হয় না বুঝি? শান্ত দরজায় পুনরায় করাঘাত করল। ডাকল দু-দুবার। সাড়াশব্দ না পেয়ে আর অপেক্ষা করে না। দরজা খুলে প্রবেশ করে। পুরো রুম অন্ধকার হয়ে আছে। এলেন পিছুপিছু এসে বাতি জ্বালাল। আদিল সোফার হাতলে মাথা এলিয়ে রেখেছে। চোখ বোজা। কোনো নড়চড় নেই। শান্ত ডাকল –
‘বস?’
এযাত্রায় আদিল কাতর স্বরে গোঙাল। পুরুষালি সেই সুর রুক্ষ, জখ মিত শোনাল। অসুস্থতার সেই গোঙানোর সুরে পুরো ফ্লোর জুড়ে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। শান্ত হন্তদন্ত কদমে এসে ছুঁয়ে দেয় আদিলের দুর্বল মাথা। ছুঁয়ে ও ঘাবড়ে ওঠে। পুরো শরীর মনে হয় পুড়ে যাচ্ছে। ব্যস্ত গলায় ডাকে –
‘বস? বস!’
প্রত্যুত্তরে আদিল শুধুই গোঙাল কোনোরকমে। শান্ত দ্রুতো হাতে খোলে পরনের কোটে্র বোতামগুলো। কোট খুলে এরপর ভেস্টের বোতাম গুলো একএক করে খোলে। শার্টের দুটো বোতাম খুলে শুইয়ে দেয় সোফাতেই। এলেন ইতোমধ্যে ব্যস্ত হাতে ফোন বের করেছে। কল করল আদিল মির্জার ম্যানেজার আনোয়ার খন্দকারকে। কল রিসিভ হলো মুহূর্তে। এলেন দ্রুতো জানাল –
‘বসের মাইগ্রেনের ব্যথা উঠেছে সম্ভবত। গায়ে তীব্র জ্বর।’
আনোয়ার খন্দকার তখুনি বললেন, ‘আমি আসছি ডক্টর মোজাফফরকে নিয়ে।’
শান্ত তখন ব্যস্ত ভঙ্গিতে আদিলের কপালে নিজের রুক্ষ আঙুল গুলো ঘষতে ঘষতে ডাকল, ‘বস? বস!!’
জবাব এলো না। তবে আদিলের চোখজোড়া নড়ল। ঘনঘন শ্বাস ফেলছে। হিসহিস করছে খাঁচাবন্দী এক জখ মিত সিংহের মতো। এলেনের চোখ গেলো আদিলের মুঠোবন্দী হাতের দিকে। যা ঝুলে আছে সোফার বাইরে। নিচে পড়ে আছে মানিব্যাগটা। এলেন মানিব্যাগ তুলল। রাখল টি-টেবিলের ওপর। ঝুলে থাকা হাতটা সোফায় ওঠাতে যেয়ে খেয়াল করল আদিলের মুঠোয় কিছু আছে। এলেন চেষ্টা করল মুঠো খোলার। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরে একপর্যায়ে খুলে গেলো আপনা-আপনি।
পাতলা কাগজের মতো কিছু একটা উড়েউড়ে পড়ল জমিনে। সেটা তুলল এলেন। মুহুর্তে মুখের রং বদলে গেলো। ওর মুখের অবস্থা দেখে শান্তর হাত থামে। ও নিজেই এগিয়ে এসে হাত থেকে নিলো কাগজটা। থমকায় ওর দৃষ্টি।
কাগজ না! ছবি! খুবই পুরাতন একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি। ছবিতে থাকা মানুষটাকে চিনতে শান্তর কিছুটা সময়ই লাগল। এখনকার রোযার চেহারার সাথে হুবহু মিল নেই যে। কতো বছর আগের ছবি এটা? ছবিতে রোযা একটি ক্যাফের সামনে বসে আছে। খুবই ইয়ং দেখতে। গায়ে ওয়েট্রেসের অ্যাপ্রোন, মাথায় ক্যাপ। চুলগুলো পনিটেইলে বাঁধা। একটা বিড়ালের মাথা ছুঁয়ে হাসছে। ঢোক গিলল শান্ত।
পাসপোর্ট সাইজের ছবির মতোন সাদা কাগজটিও পাসপোর্ট সাইজেরই। পেছনের সাদা ফকফকে কাগজে ছোটো ছোটো অক্ষরে অনেককিছু লেখা। অনেকটা বায়োডাটার মতো। হাতের লেখা চিনল শান্ত। হাতের লেখাগুলো আদিল মির্জার ম্যানেজার আনোয়ার খন্দকারের। ওখানে রোযার নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম ধরে…রোযা আপাতত কী করছে, কীসে পড়ছে তাও লেখা। শেষে ছোটো করে লেখা, শি হ্যাজ আ বয়ফ্রেন্ড। ওই লাইনটাই কেটে দেয়া।
তারমানে কী দাঁড়ায়? মিস রোযা এখানে কাজে এসেছে কীভাবে? আদিল মির্জার আদেশে! এতোগুলো বছর এখানে কাজ করছেও তার ইশারায়। এইসব প্রি-প্প্ল্যান্ড করা ভাবতেই ও শিউরে ওঠে। শান্তর হাতটা পড়ে যায়। ওর শরীরে যেন রুহ নেই। এলেনের মুখের দিকে তাকাল। কথা বলতে চাইলে একটা শব্দও আসে না। এলেনের অবস্থা অবশ্য শান্তর থেকে বেশ ভালো। ও সেদিনই বুঝেছে জল অনেক গভীর। শান্তর কাঁধ ছুঁয়ে চোখের ইশারায় বোঝাল পরে বলবে! শান্ত ছবিটা রাখল আদিলের পাশে। আর একটা শব্দ উচ্চারণ করল না। পুনরায় গিয়ে বসের ভাঁজ পড়া কপাল মালিশ করতে থাকল।
ব্যস্ত, হকচকানো আনোয়ার খন্দকারের পেছন পেছন এসেছেন ডাক্তার মোজাফফর উদ্দিন। তাদের দুজানার পেছনে স্বপণ, ক্লান্ত, ধ্রুবও আছে। আনোয়ার সাহেব এসেই ছুঁলেন আদিলের মুখ। কেমন ভয়ার্ত গলায় ডাকলেন,
‘বস! বস! আদিইইল! আদিইইল!’
মোজাফফর সাহেব এসে সরিয়ে দিলেন চিন্তিত আধবুড়োটাকে। মুখ বেঁকিয়ে নিজে ছুঁলেন আদিলে কপাল। মুহূর্তে তিনি ব্যস্ত হলেন আদিলকে নিয়ে। দুজনকে ইশারা করলেন আদিলকে বিছানায় শুইয়ে দিতে। শান্ত আর এলেন বসকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলো। স্বপণ দ্রুতো খুলল পায়ের জুতো জোড়া, এরপর মোজা। গায়ে কম্ফোর্টার মেলে দিলো এলেন। পাশেই বসলেন মোজাফফর সাহেব।
.
মোজাফফর সাহেবের পেছন পেছন বেরিয়ে এসেছেন আনোয়ার সাহেব। তার পেছনে শান্ত, এলেন। স্বপণ আর ক্লান্ত তখনো থার্ডফ্লোরেই। মোজাফফর সাহেব বেজায় বিরক্ত এদের ওপর –
‘কী করিস তোরা? মনে তো হচ্ছে বস ঘুমায়নি ফর আ লং টাইম। মুখ নাই? রেস্ট করাতে পারিস নাই?’
আনোয়ার সাহেব ভ্রু নাচালেন অদ্ভুত ভাবে। বললেন, ‘এখন থেকে নেবে।’
মোজাফফর সাহেব থমথমে মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাড়ির দিকে চেয়ে বললেন, ‘শুনলাম বিয়ে করে নিয়ে এসেছে?’
আনোয়ার সাহেব মাথা দোলালেন। শান্ত আর এলেন চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকল। মোজাফফর সাহেব গাড়ির সামনে আসতেই দরজা মেলে ধরল। গাড়িটা মির্জা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো ধীরেসুস্থে। এযাত্রায় তাকাল শান্ত আনোয়ার সাহেবের দিকে। আনোয়ার সাহেব অবুঝ সাজলেন। এলেন ফটাফট জিজ্ঞেস করল –
‘বসের হাতের ওই ছবিটা! কতো বছর আগের? ত…তখন প্রিন্সেস…’
এলেন পুরো কথাটা শেষ করে না। আনোয়ার সাহেব হাঁটা ধরলেন বাড়ির ভেতরে। তার দু-পাশে শান্ত, এলেন। গার্ডেনার ইলিয়াস উদ্দীন তখন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন তিতান আর থোরকে নিয়ে। দুটো ঢুকেছিল ভেতরে। তাদের পাশ কাটালেন আনোয়ার সাহেব। থমথমে মুখে সিড়ি বাইতে বাইতে মুখ খুললেন –
‘প্রিন্সেসের বয়স তখন এক বছর দু-মাস।’
ব্যস! এতটুকুই। আনোয়ার সাহেব আর কিছু বললেন না। আর কথা বাড়াল না এলেন, শাান্তও। তারা বুদ্ধিমান। একে-দুইয়ে সবটা বুঝতে সময় লাগল না। ইট ওয়াজ আ লং জার্নিইই…..
.
ঘড়ির কাঁটা এগারোটা চল্লিশে। গ্লাস ওয়াল দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অর্ধখণ্ডিত চাঁদটা। অন্ধকার রুমে শুধুমাত্র চাঁদের আলো এসে পড়েছে। ওই আলোয় আবছা দেখা গেলো আদিলকে। বিছানা ছেড়ে উঠে এসে বসেছে সোফায়। উদোম শরীর। কোনোরকমে লুজ একটা ট্রাউজার কোমরে ঝুলে আছে।
সামনেই টি-টেবিলে ড্রিংকের গ্লাস। ও পিচ্চি গ্লাসটা ভরল। একটানে গলায় ঢেলে গোঙাল তেতো স্বাদে। একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে মাথাটা এলিয়ে দিলো হাতলে। জলন্ত সিগারেট যখন ঠোঁটে ছোঁয়াল মাথাটা ভার ভার লাগল। মনে হলো সব ডুবে যাচ্ছে। কোথাও একটা মিশে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আদিল অন্ধকার কোনো ব্ল্যাকহোলে একা দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, ওই অন্ধকার তাকে ডুবিয়ে নিচ্ছে ভীষণ অতলে। তখুনি চোখের পাতায় ভাসল সুন্দর একটা মুখ। ওই পুরো অন্ধকারের মধ্যে ওই মুখখানি চাঁদের মতোন উজ্জ্বল হয়ে আছে। তার অন্ধকার দুনিয়াটায় মুহূর্তে আলো জ্বলল যেনো। আদিলের হার্টবিট শান্ত হয়। অন্ধকার কাটতে থাকে। ভ্রমের মাঝে সে নীরবতা ভাঙে। বাতাসের মতো নরম স্বরে কেবলই বিড়বিড় করে –
‘ফের শিন লিখু, তেরে নিন্দ উড়ে,
যাব কাফ লিখু, তুঝে কুছকুছ হো….
ম্যে ইশক লিখু তুঝে হো যায়েএএএ..
ম্যে ইশক লিখু তুঝে হো যায়েএ…
ম্যে ইশক লিখু তুঝে হো যায়েএ…. ‘
চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।
[ টাইপিং মিস্টেকস থাকবে। রিচেক করা সম্ভব হয়নি। দ্রুতো শেষ করে আপলোড দিচ্ছি। ]
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৯
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২০