Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩০


আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩০

‘সওদাগর সাহেব, আপনি জানেন কে আছে চৌধুরীদের পেছনে এখন? সোবহান চৌধুরী তো চিরতরে চোখ বুজছে। ওর পোলাপান এখনো দুধের শিশু। এমন হাড্ডি-হাড্ডি লড়াই আপনার সাথে কেম্নে লড়তেছে এখনো বোঝেন নাই?’

আলমগীর সওদাগরের চোখমুখ মুহূর্তে সচেতন হয়। চকিতে তাকায় প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে। বিপরীতে রেওয়াজ পুকুরের জলের মতো শান্ত। হাতের মদের গ্লাসটা সানন্দে নাড়াতে নাড়াতে বলে –

‘আপনার এক্স মেয়েজামাই, আদিললল মির্জা। আদিল আছে পেছনে।’

আলমগীর সওদাগরের চোখমুখে একমুহূর্তের জন্য তীব্র অবিশ্বাসের ছাপ দেখা গেলেও পরমুহূর্তে তিনি আঁতকে বলেন, ‘কোনোভাবে কী জানতে পেরেছে?’

রেওয়াজ ভেতরে বিরক্তই বুড়োটার এমন বলদা মস্তিষ্কের জন্য। নিজের স্বার্থের জন্য বিরক্তি লুকিয়ে রাখে ভীষণ যত্নের সাথে। খোলামেলা আলোচনা চালিয়ে যায় –

‘নাদিমকে ধরছে না? কী মনে হয়? কিছু খুঁজে পায় নাই? ওর তো শকুনের নাক। ওর বিপক্ষে গিয়ে কেউ আজ পর্যন্ত টিকছে?’

আলমগীর সওদাগরের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট –

‘নাদিমকে তো সোজা অর্ডার আমার লোকেরা দেয় নাই। এখানে অনেকের হাত আছে। আমি ঢুকাইছি। তাইলে?’

রেওয়াজ নিজেও কিছুটা বিচলিত, আশ্চর্য বটে –

‘তা তো আমিও বুঝতে পারছি না। ও যদি কিছুর খোঁজ না পায় তাইলে হঠাৎ আপনার পেছনে লাগল কেনো? সাথে আইনমন্ত্রীরে লাগাইয়া দিছে। কোর্টের পজিটিভিটি কিন্তু ওদের দখলে। একটা কানাকড়িও মনে হয় না আপনার কপালে জুটব সওদাগর সাহেব। পরিস্থিতি হাতের বাইরে। আদিল যদি আমার ধারণা মতে সত্যিই জেনে যায় ওর জানের টুকরো মাইয়ার আক্র মণের পেছনে আমরা আছি, খেল পুরাই খতম।’

আলমগীর সাহেবের প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে বোধহয়। বুকের ওঠানামার গতি অস্বাভাবিক আর দ্রুতো। তিনি হাপিত্যেশ করে ওঠেন –

‘এখন? হাত গুটিয়ে বসে থাকা তো যাইব না, রেওয়াজ। জানা লাগব তো। কী করমু? বুদ্ধি দাও। আমার কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট এখানে। ওই কোম্পানি আমার লাগবোই, লাগব।’

রেওয়াজ গ্লাসে চুমুক বসাল। সিলভার রঙের পাওয়ার গ্লাসে ঢাকা চোখদুটোর দৃষ্টি গভীর হলো। আওড়াল –

‘খবরে জানলাম বিয়া করছে, আদিল মির্জা। সাধারণ তো মনে হইতেছে না। লাভশাবের ব্যাপার আছে এখানে। বউরে হেব্বি টাইট সিকিউরিটির ভেতর তো রাখেই সাথে শশুর বাড়ির ওপরও। লোক পাঠাইছিলাম, ওর বডিগার্ডস চতুর্দিকে। কিছু বুঝছেন?’

আলমগীর সাহেব খানিকটা অবিশ্বাস্য নিয়েই বললেন, ‘দুদিনের এক মাইয়ার জন্য রিস্ক নিবো? আদিল? আদিল মির্জা? ওরে চেনো তুমি? আমার মাইয়ারে তো দিছিলাম ওর সাথে বিয়া। ভাবছিলাম, মাইয়ারে দিয়া বাঁধতে পারমু আমার সাথে। ঋণার প্রতি যদি ওর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট থাকতো তাইলেই ওরে আমি টাইনা ধরতাম, কসম। অথচ এতো বছরের একটা বন্ধন থেকে যখন ঋণারে আনলাম চোখের পলকও ফেলে নাই হালারপুতে। আটকানোর কোনো চেষ্টা তো নাই, উল্টা ঋণার দ্বিতীয় বিয়েতে আমার জন্য পাঠাইছে ইতালির সিগারেট। থু!’

ভদ্রলোকের মুখ তেতো হয়ে এলো। বিড়বিড় করলেন বাকিটা, ‘দেখা যাইব আমার সময়, পরিশ্রম, টাকা সব নষ্ট!’

রেওয়াজ ভাবুক ভাবে মাথা দোলাল। ভীষণ দৃঢ়ভাবে বলল, ‘কাহিনী আছে এখানে সওদাগর সাহেব। আমার অনুমান সত্য হওয়ার সম্ভাবনা দারুণ। আদিল মির্জার গুরুতর উইকনেস আছে ওর বর্তমান বউয়ের ওপর। ধারণার বাইরেও হতে পারে। কোন পর্যায়ে গেলে ও ওর বউয়ের পাশাপাশি বউয়ের বাপের বাড়িতে গার্ডস রাখে? তাও অবলা, যেইসেই গার্ডস না। ওর ডেনের গার্ডস। ওর পার্সোনাল গার্ডস সব।’

আলমগীর সাহেবের চোখ তীক্ষ্ণ হয়। থমথমে ওই মুখে চেয়ে রেওয়াজ গলা নামিয়ে বলে ফিসফিস করে –

‘একটা রিস্ক নেবেন নাকি সওদাগর সাহেব? হালারে টলাইতে পারলে চৌধুরীদের সামলানো সহজ হয়ে যাইব।’

আলমগীর সাহেব ভাবুক। মাথা দুলিয়ে কোনোরকমে আওড়ালেন, ‘সময় দাও। আমি ভাবি।’

রেওয়াজ উঠে দাঁড়াল, ‘তাহলে আসি। আমাকে জানিয়েন। দেরি করা যাইব না কিন্তু।’

গম্ভীরমুখে শুধু মাথা দোলালেন আলমগীর সাহেব। রেওয়াজ ব্রিফকেস হাতে বেরিয়ে গেলো। টি-টেবিলের ওপরে রাখা দামি গ্লাসের ভেতরটা মদে ভরতি ছিলো। ওটা ওভাবেই তুলে ছুঁড়ে মারলেন তিনি। গ্লাসটা স্পর্শ করেছে আকাশী রঙের টি-টেবিল। মুহূর্তে দুটো মিলেমিশে ভাঙচুরের শব্দে গোটা লিভিংরুম ভরে গেলো। এতে বিন্দুমাত্র কাঁপল না আলমগীর সওদাগরের পাশেই দাঁড়ানো নৈবদ্যর শরীর। পড়ল না চোখের পাপড়ি। ওর গম্ভীরমুখ একইরকম রইল বসের তীব্র ক্রোধের সামনে। আলমগীর সাহেব রেগেমেগে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করে যাচ্ছেন। কণ্ঠ থেকে ঝড়ে পড়ছে আগুনের ফুলকি –

‘একটা অবাধ্য পয়দা করছি। কাজের কাজ কিচ্ছু হয় না। কতো টাকা খরচ করছি এই অজাতকুজাত মাইয়ার পেছনে, হ্যাঁ? ওর আইডিয়া আছে কতো টাকার ইনভেস্টমেন্ট এখানে যুক্ত? ওয় এখন পেমের ভণ্ডামি দেহায় আমারে! ওর মায়ের মতন ওরেও আমি মাটির তলে গাইড়া ফেলমু। বান্দির বাচ্চা, চেনে আমারে? বারবার করে বলছি আজকে ওর থাকা লাগব। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। ওই বান্দির পুতেরা তো এক কানাও ছাড়ত নারাজ। আমি এতোগুলো বছর অপেক্ষা করছি কী খালি থালা হাতে ফেরার জন্য?’

আলমগীর সাহেব থামলেন। হুংকার তুলে আদেশ ছুঁড়লে ননৈবদ্যের –

‘লাগলে ওর হাত-পা বাইন্ধা আমার কাছে নিয়া আয়। আমার শ ত্রু, আমার জানের পেছনে লাগা কু ত্তার *** জন্য ও কাঁদে? আমার বিপক্ষে যায়? অবাধ্য হয়? ওরে আমি মে রে ফেলব।’

নৈবদ্য বাধ্যভাবে মাথা দুলায়। ওর পাশে দাঁড়ানো শাহাদাত সামান্য অসন্তুষ্ট হয়। বছর ধরে বস নৈবেদ্যকে অতিমাত্রায় লাই দিচ্ছে। যা ওর পছন্দ হচ্ছে না। বডিগার্ডসদের মধ্যে শাহাদাত আলমগীর সওদাগরের কাছের, নিজের পালিত। নৈবেদ্য আউটসাইডার। একটা আউটসাইডারকে এতো ভরসা করা কী ঠিক? পরমুহূর্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভরসা করবে নাই বা কেনো? সেবার নৈবেদ্য নিজে বুক পেতে গু লি খেয়েছিল আলমগীর সওদাগরের জন্য। এরপর থেকেই অন্ধ বিশ্বাস করেন আলমগীর সওদাগর। অথচ শাহাদাত পারে না কেন যেন পুরোপুরি বিশ্বাস করতে। একটা খচখচে সন্দেহ থেকে যায়।

আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো মেঘের মতো ধোয়াটে সেই স্মৃতি। আবছা আবছা তবে সুখের চাদরে জড়ানো, তুলোর মতো নরম। বিশাল লিভিংরুমের সোফায় খুব সুন্দরী একজন নারী বসে আছেন। পরনে সিল্কের দামি শাড়ি। কালো ভীষণ বড়ো চুলগুলো্তে পরিপাটি এক খোঁপা করা। কী সুন্দর সেই নারীর চোখমুখ, গায়ের রং। হাসলে মনে হয় পদ্মফুল ফুটেছে। নিপুণ দৃষ্টিতে চেয়ে যখন কথা বলল, কী নরম শোনাল। মন চাইল শুনেই যেতে –

‘বাবা, এইযে আমার লক্ষ্মী বাবাটা, সোনা বাবাটা…আপনার দুষ্টু বাবার মতন মোটেও দুষ্টু হবেন না কেমন? খুব খারাপ লোক সে। ভীষণ, ভীষণ খারাপ। তার মতো হওয়া যাবে না কিন্তু। আপনি পড়াশোনা করবেন, সৎ হবেন। মানুষের মতো মানুষ হবেন। জীবনে চমৎকার কিছু হবেন। আপনার নানার মতো। জানেন তো আপনার নানাকে? সৎ, সাহসী যোদ্ধা সে। ওমন হবেন, বুঝেছেন?’

খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সামনে দাঁড়ানো হাফপ্যান্ট পরা সুন্দর দেখতে ছেলেটা। ছেলেটার চেহারায় সেই নারীর চোখমুখের প্রতিচ্ছবি আছে। ছেলেটা হেসে লুটোপুটি খেলো নারীর কোলের ভেতরে। সেই হাসির শব্দে রাঙিয়ে উঠল মির্জাদেয়ালে দেয়ালে ভেসে বেড়াল। সাথে হাসল সেই সুন্দর দেখতে নারীটিও। মুখ নামিয়ে সন্তানের মুখে চুমুর ঝড় তুলল। তখুনি দুয়ার থেকে ভেসে এলো এক পুরুষালি কণ্ঠ। যেই কণ্ঠে একরকম অদেখা শক্তি আছে, আছে গাম্ভীর্যের প্রভাব। তারপরও কেমন অসহায় শোনাল একমুহূর্তে –

‘গুলনাহায়ার…এই কিন্তু ঠিক হচ্ছে না! দিস ইজ মাই সান! এই ওসমান মির্জা্র ছেলে।’

.

দেয়ালের বিশাল ঘড়ির কাটা ঘুরছে তিনটা ঊনিশে। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, নিষ্প্রাণ। সোফার হাতলে মাথা এলিয়ে দেওয়া আদিলের চোখজোড়া বন্ধ। কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমেছে। বুকের ওঠানামার গতি দ্রুতো, অস্বাভাবিক। ঘোরের ভেতর থাকা তার চোখজোড়া বন্ধ থেকেও অনবরত নড়ছে। চোখের কোণ বেয়ে গড়াল একফোঁটা চোখের জল। ঠোঁট নড়তে চাচ্ছে তবে পুরোপুরি নড়ছে না। নীরবতা ভাঙল অনেকটা সময় পর। একটি শব্দের ডাক ভেসে বেড়াল ঘরের দেয়ালে দেয়ালে –

‘মা…মা…মা!’

দরজায় টোকা পড়ল তখুনি। একের পরে এক। শান্ত ডাকল, ‘বস?’

আদিলের ঘোর ভাঙে। চায় অস্পষ্ট, ভাসা চোখে। ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছে শান্ত। ঘরের বাতি জ্বালিয়েছে। বসের এমন অবস্থা দেখে ও অবাক হয় না। তবে ভীষণ দ্রততার সাথে একগ্লাস পানি এনে রাখে সামনে। আদিলের ঘোর কেটেছে। একফোঁটা চোখের জলের দাগ তখনো বিদ্যমান। চোখমুখে সেই অসহায়ত্বের ছিঁটেফোঁটা আর নেই। বরাবরের মতোই নির্বিকার, চূড়ান্ত গম্ভীর। পানির বদলে একগ্লাস মদ ঢেলে গিলে ফেলল একটানে। গ্লাসটা শব্দ করে রেখে ব্যান্ডেজ করা হাতে একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল –

‘এসেছে?’

এলেন এসে দাঁড়িয়েছে শান্তর পাশে। বলে, ‘বাংলোতে।’

আদিল উঠে দাঁড়াল। তার উদোম পেশিবহুল শরীর ঘামে চিকচিক করছে। একেকটা মাংশপেশী ফুলেফেঁপে উঠছে। সতেজ হয়ে আছে কাঁধের বাজপাখিটা। কী রুক্ষ, সতেজ আর কালো দেখাল ওটাকে। হিংস্রতাকে আরও গাঢ়ভাবে সম্বোধন জানাল যেন। আদিল হাতে তুলে নিলো পিস্ত লটা। প্যান্টের পেছনে ঢোকাল ওটাকে। বেল্টটা, যেটা ফ্লোরে ছুঁড়ে মেরেছিল..ওটা তুলে হাঁটা ধরল। এলেনও পিছু পিছু বেরুচ্ছে। শান্ত দ্রুতো একটা শার্ট নিয়ে বসের পেছনে ছুটল। পুরো বাড়ি নীরব। আদিলের পাজোড়া থামল দোতলায় এসে। তখনো পাকাপোক্ত হাতটা বেল্ট বাঁধছে। ওভাবেই এগিয়ে এলো হৃদির রুমের সামনে। ঠেলা দিয়ে বুঝল, ডোর লকড। আদিল হাত বাড়াতেই এলেন চাবিটা দিলো। আদিল দরজা খুলে নিঃশব্দে ঢুকল ভেতরে। বেডের পাশের নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলোয় স্পষ্ট রোযার মুখ। মিষ্টি ঘুমে আবদ্ধ ও। ওর বুকে বিড়ালছানার মতো লেপ্টে আছে হৃদি। আদিল কয়েক কদম এগিয়ে গেলো। এসে দাঁড়াল সামনে। তার ছায়ায় ঢেকে গেলো রোযার উজ্জ্বল মুখ। আদিল ঝুঁকল। নির্নিমেষ দেখল রোযার ঘুমন্ত চোখমুখ। মুখ নামাল, ঠোঁট ডোবাল রোযার নরম গালে। এতে মেয়েটা নড়ে উঠল। গোঙাল। আদিল তাকায় মেয়ের দিকে। মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে অবশেষে বেরিয়ে আসে। আর ফিরে তাকাল না।

শান্ত এগিয়ে দিলো কালো রঙের শার্টটা। আদিল হাঁটতে হাঁটতেই শার্টটা গায়ে জড়াচ্ছে। থেমে থেমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করছে, বিপরীতে শুনছেও শান্তর অনুমান। ইতোমধ্যে গাড়ির দরজা খুলে ধরেছে স্বপণ। আদিল উঠে বসল। সামনে বসল শান্ত, এলেন। ছয়টা গাড়ি এই অন্ধকারে বেরিয়ে এলো মির্জা বাড়ি ছেড়ে। নীরব, সুনশান ভেজা রাস্তা জুড়ে ছয়টা গাড়ির অধিপত্য জুড়ল। দ্রুতো গতিতে ছুটে চলল গন্তব্যে উদ্দেশ্যে। যখন গন্তব্যে এসে থামল ততক্ষণে মৃদু আলো ফুটতে শুরু করেছে পৃথিবীর বুকে। পিনপতন নীরবতায় ঢেকে থাকা এই বাংলোটা আড়াল, আবছায়ায় জড়ানো। দরজা খুলে ধরতেই আদিল গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। সোজা ঢুকল ভেতরে। বাংলোর ভেতরটা অনেকটা গোডাউনের মতো। পদেপদে র হস্যের বেড়াজাল। বাংলোর বেশ ভেতরে একটা পুরনো দেয়াল, অথচ ওটা ঠেলতেই দরজার মতো খুলে গেলো। প্রবেশ করে আদিল, পেছনে শান্ত আর এলেনও। মধ্যেই একটা বড়ো বোর্ড পাতা। বোর্ডের মধ্যে মোটা দড়িতে বেঁধে রাখা হয়েছে যাকে, সে নাদিম। চোখমুখ দিয়ে র ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। উলঙ্গ শরীরে সহস্র ক্ষ ত। ক্ষ ত বি ক্ষত শরীরের দিকে আদিল তাকাল না। শোনার প্রয়োজন বোধ করল না দুর্বল গলায় বলতে চাওয়া নাদিমের একটা কথাও। আদিল সোজা এসে বসল কালো লেদারের সোফাটায়। একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে তাকাল বোর্ডের পাশে দাঁড়ানো শরীরের ওপর। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে থাকা লোকটা যন্ত্রের মতো নড়ল। খুলল মুখের মাস্ক, সাদা নকল চুল। যাকে দেখে থমকাল নাদিমের র ক্তাক্ত চোখ। বোবার মতো ও শব্দ করতে চাইল। নিজেকে ছদ্মবেশে সাজিয়ে রাখা লোকটার চোখমুখ তখনো নামানো। সোজা এসে দাঁড়াল আদিলের সামনে। হাঁটু ভেঙে বসল। ডাকল –

‘বস!’

আদিলের চোখমুখে তৃপ্তির ছোঁয়া। সহসা সাব্বাশের তাগিদে চাপড়ে দেয় লোকটার কাঁধ। গর্ব নিয়ে বলে –

‘মাই বয়! ইউ ডিড এন এক্সিলেন্ট জব। প্রাউড অব ইউ মাই টাইগার।’

লোকটা মাথা তুলল। চোখমুখে দৃঢ়তা, শ্রদ্ধা। একরমের ভক্তি। আদিল ডাকল –

‘নৈবদ্য।’

নৈবদ্যের চোখমুখ শক্ত।

‘জি বস! আদেশ করুন।’

সূর্যের প্রথম কিরণ জানালার কাঁচে ঝিলমিল করছিল তখনো। সোনালি রঙের পর্দা উড়ছে হালকা বাতাসের স্পর্শে। কিরণ এসে সোজা ছুঁয়েছে হৃদির চোখমুখ। বাচ্চাটা তখুনি আরও গভীর করে মিশল রোযার শরীরের সাথে। মাথাটা গুঁজে দিলো রোযার বুকের ভেতর। অস্পষ্ট কিছু শব্দ করে বোঝাল, ভারি বিরক্ত ও। এই সূর্যের স্পর্শ ওকে বিরক্ত করছে। রোযা হাত বাড়াল। হাতের ছায়া ফেলে সূর্যের কিরণ থেকে আড়াল করল মিষ্টি, বাচ্চা মুখখানি। এতে বাচ্চাটা সন্তুষ্ট। স্বস্তিতে নাকমুখ দিয়ে এমন শব্দ করল যে মুহুর্তে ওর গা কাটা দিয়ে ওঠে। মনে পড়ে গতকাল রাতের ঘটনা। আদিল তো এভাবেই অদ্ভুত শব্দ করছিল ওর কোলের ভেতর মিশে গিয়ে! সাথে সাথে মেয়েটা দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে অবাধ্য ভাবনা গুলো সরিয়ে ফেলল। ঘড়ির কাটা ঘুরছে ছটায়। হৃদিকে আর ডাকতে ইচ্ছে করল না রোযার। ওকে সাবধানে বুক থেকে সরিয়ে উঠতে চাইলেই হৃদির ঘুম ভেঙে যায়। ভাসা ভাসা ধূসর রঙা চোখে অসন্তুষ্টি –

‘মম…’

রোযা মুখ নামিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল কপালে, ‘ঘুমাও তুমি, মা। আমি ওয়াশরুম হয়ে আসছি।’

হৃদি ঘুম ঘুম চোখে বোকার মতো হেসে রোযাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আওড়ায়, ‘আমিও যাব ওয়াশরুম।’

রোযা ওকে কোলে নিয়েই ওয়াশরুম এলো। দুজন একসাথে দাঁত ব্রাশ করল, হাতমুখ ধুলো। পরিশেষে হৃদিকে তৈরি করে নেমে এলো নিচে। ব্রেকফাস্ট করতে। খেয়াল করল বাড়িতে আদিল মির্জা নেই। নেই তার কাছের বডিগার্ডস। অগত্যা ভীষণ আরামের সাথে হৃদিকে নিয়ে খেতে বসল। নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছিল। ওসময় হৃদি খেতে খেতে ছোটো ছোটো চোখ করে আদুরে ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল –

‘ড্যাড কোথায়, মম?’

রোযার হাত থামল। তাকাল মরিয়ম বেগমের দিকে। ভদ্রমহিলা খাবার পরিবেশন করতে ব্যস্ত। তাকালেনও না। রোযা কীভাবে জানবে না ওই জলদস্যু কোথায়? গতকাল ওকে কী জ্বালানোটাই না জ্বালিয়েছে। অথচ ওসব তো আর বাচ্চাটাকে বোঝানো যাবে না! অগত্যা অসহায় লুকিয়ে বলে –

‘কাজে বেরিয়েছে। দ্রুতো ফিরবে।’

হৃদি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে, ‘খেয়ে কল করো ড্যাডকে। আমরা কথা বলব।’

রোযার মুখ কুঁচকে আসতে চাইলো। ও তো মোটেও কথা বলতে চায় না। একদমই না। অগত্যা মেয়েটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখেছে সারাটা সকাল জুড়ে।
দুপুরের দিকে একটা শপের ম্যানেজার এলো শপিং বুকলেট নিয়ে। রোযার ইচ্ছে করল পুরো শপের জিনিসপত্র কিনে জলদস্যুর টাকার পাহাড় কমাতে। কিন্তু তা করতে ওর বিবেকে বাঁধল। ও তো আর অমানবিক না।

.

বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে মিশছে মির্জা বাড়ির গায়ে। থোর-তিতানের ঘেউঘেউয়ের শব্দে পাখিরা দলবল বেঁধে উড়ে পালানোর শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে। ড্রাইভওয়ের রাস্তা দখল করে রেখেছে ছয়টা কালো রঙের গাড়ি। সবগুলো মাত্রই প্রবেশ করেছে। আদিল মাত্রই বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বাড়ির সামনে। থোর, তিতান তার দু-পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো কিছুক্ষণ আগে, তবে এখন ছিটকে সরে গেছে। গার্ডেনার ইলিয়াস উদ্দিন চাচাও যন্ত্রের মতো শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন। সবগুলো বডিগার্ড বাগান জুড়ে থমকে আছে, ওদের গলায় শ্বাস আটকে আছে। শান্ত হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে আদিলের দিকে। যার গা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ওপর থেকে ফেলা পানি তখনো ঝর্নার মতো আদিলের গায়ের ওপরেই পড়ছে। দোতলায় দাঁড়ানো রোযা থতমত খেলো। মরিয়ম বেগমের দু-পা এমনভাবে কাঁপছে যে ভদ্রমহিলা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। সকলের ওমন হতভম্ব অবস্থা দেখে রোযাও অনুশোচনায় ভুগল। মরিয়ম বেগম পানি নিয়ে এসেছিল বারান্দার টব গুলোতে পানি দিতে। রোযা পাশে দাঁড়িয়ে দেখলছিল। তখুনি দেখতে পেলো সারাদিন পরে আদিলকে ফিরতে দলবল নিয়ে। একদম হাতের নিচে থাকায় শয়তান ধরল ওকে। ওমনি মরিয়ম বেগমের হাত কাত করে সবটা পানি আদিলের ওপরে ঢেলে দিয়েছে।

আদিল তখন মাথা তুলে তাকিয়েছে দোতালায়। রোযার মুখে পড়েছে মিঠা রোদ্দুরের ঝলক। ঝলমল করছে। রোযা দুর্বল হেসে কোনোরকমে সাফাই গাওয়ার সুরে গলা উঁচিয়ে বলে –

‘হাত ফসকে পড়ে….’

ও কথা শেষ করতে পারেনি। আদিল আদেশ ছোড়ে, ‘শান্ত, স্যুট নিয়ে আয়।’

শান্ত তখুনি ভেতরে প্রবেশ করল ঝটপট। রোযা আটকে রাখা শ্বাস ফেলল। স্বস্তিতে চোখ বুজল। যাক, কিছু বলেনি। জলদস্যুর ওমন চেহারা দেখে ওর গলাটা শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল। দ্রুতো সরে এলো ওখান থেকে। দেখল না আদিলের বড়ো কদমে বাড়িতে ঢোকার দৃশ্য। রোযা এসে বসল বিছানার এককোণে। হৃদির কাপড়চোপড় গুলো ভাঁজ করতে শুরু করল। মেয়েটা লিভিংরুমে কার্টুন দেখছে। কাপড় ভাঁজ করে রোযা নামবে। তখুনি অল্পখোলা দরজাটা ভীষণ শব্দ করে মেলা হলো। ধড়ফড়িয়ে ওঠে রোযা। দরজার দিকে তাকাতেই ওর গলা শুকিয়ে আসে। আদিল ইতোমধ্যে দরজাটা লক করেছে। তার ভেজা চুলগুলো কপালে মিশে আছে। পেটানো শরীরে লেপ্টে আছে ভেজা শার্টটা। হাতে ছাই রঙের থ্রি-পিস স্যুট। রোযা হতবিহ্বল ভঙ্গিতে বলে –

‘কী করছেন?’

আদিল প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। তবে বাতাসের গতিতে এলো রোযার সামনে। একহাতে সোজাসাপটা শার্ট খুলতে শুরু করল। এতে বেচারি হতবিহ্বল! কথা নেই বার্তা নেই, এই লোক শুধু উলঙ্গ হতে চায় কেনো? মাথাটা ঘুরিয়ে ও এলোমেলো ভাবে আওড়াল –

‘আপনি পাগল? আপনার সমস্যাটা কী?’

আদিলের কাটকাট জবাব, ‘আম চেঞ্জিং।’

কিংকর্তব্যবিমুঢ় রোযা বড়ো করে তাকাতেই আদিল পুনরায় বলে, ‘ইন ফ্রন্ট অব ইউ। সুযোগে আপনি ভালোমতোন আপনার ভবিষ্যৎ দেখে নিতে পারেন মিসেস, আদিল।’

রোযা আতঙ্কে বাকরুদ্ধ। ও দ্রুতো সরে যেতে চাইলেও, পারল না। আদিল ওকে বিছানা আর দেয়ালের সাথে এককোণে করে আটকে রেখে ভেজা শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলেছে কোথাও একটা। এরপর ছুঁয়েছে প্যান্ট। প্যান্ট খুলতে দেখে রোযার মুখ নীল হয়ে এলো। দ্রুতো ঘুরে গেলো। আদিল অবশ্য ওকে ঘাঁটায় না। সে ওখানে রোযার সামনে দাঁড়িয়ে প্যান্ট খুলে। নতুন স্যুটটা অনেকটা সময় নিয়ে পরে এক এক করে। রোযা পুরোটা সময়ে বিড়ালের মতো চোখমুখ বুজে লেপ্টে ছিলো দেয়ালের সাথে। ও কল্পনায় আনতে পারে না একটা পুরুষমানুষ এতটা বেলেহাজও হতে পারে! স্যুট পরিবর্তন করে আদিল অবশ্য দাঁড়ায়নি। বেরিয়ে গিয়েছে। রোযা প্রাণভরে শ্বাস নিলো। ওর দমবন্ধ হয়ে এসেছিল প্রায়। তাকাল দরজার দিকে। এরপর ফ্লোরে। সবকিছু ফ্লোরে ফেলে গিয়েছে। রোযা ওসবে হাত দিলো না। চোখমুখ কালো করে থাকল। নিচ থেকে তখন হৃদির ডাক পড়ছে। আওয়াজ করে সমানে ডাকছে। রোযা অবশেষে বেরুলো। করিডোরে দাঁড়াতেই দেখল হৃদি কোলে আদিলের। আদিল দাঁড়িয়ে আছে বডিগার্ডসদের মধ্যে। শান্ত তখন অপ্রস্তুত ভাবে মুখ খুলছে আর বন্ধ করছে। আদিল অবাক। আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল –

‘কী বলবি?’

এলেন, স্বপণ, ক্লান্ত, ধ্রুব সহ সবগুলো ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখেছে। চোখমুখে রহস্য। শান্ত তোতলায় –

‘ব– বস আই…’

আদিল ভ্রু তুলে, ‘ইউ?’

‘আ..আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি।

আদিল থমকাল, পরমুহূর্তেই বাম হাত রাখল শান্তর কাঁধে। আশ্বস্ত করে বলল,

‘তা তো জানি।’

শান্ত তখনো মিনমিন করে যাচ্ছে, ‘ব..বস…মানে!’

‘হুম?’

শান্ত চোখমুখ খিঁচে, চোখজোড়া শক্ত করে বন্ধ করে উচ্চকণ্ঠে অনুরোধের সুরে বলে, ‘বস, আমার গ্রামে, আমার বিয়ে খেতে আসুন, প্লিজ।’

পিনপতন নীরবতা বইল খানিকক্ষণের। শান্ত শ্বাস বন্ধ করে আছে। বাকিদেরও একই অবস্থা। নীরবতা ভাঙে আদিলের সংক্ষিপ্ত জবাবে –

‘তোর বিয়ে আর আমি থাকব না?’

শান্ত চমকে ওঠে। দ্রুতো যখন মাথা তুলে তাকায় দেখতে পায় বসের শান্ত দৃষ্টি। আনন্দে চিৎকার করে ওঠে এলেন। দু-হাতে জাপ্টে ধরে পেছন থেকে শান্তর কাঁধ। চেঁচায় –

‘বস যাচ্ছে।’

শান্ত তখনো অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে আছে। যখন মস্তিষ্ক কাজ করে, ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। আনন্দে ভেসে যায় ভেতরটা। ততক্ষণে লিভিংরুমে জুড়ে একটা উচ্ছ্বাস বয়ে গেছে। সবার হৈ-হুল্লোড় দেখে নিজের অজান্তেই রোযার ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হয়। শান্ত ততক্ষণে বসের চারিপাশ ঘুরে একটা এলোমেলো ডান্সের স্টেপ দিতে দিতে গলা তুলে একটা গানের কিছু লাইন গেয়ে উঠেছে ওর পাশাপাশি এলেন, স্বপণ, ক্লান্ত ওরাও ঘুরছে –

‘সর্প দংশনে মারিয়া আবার, ওঝা হও কেমনে…
নিশিতে যাবো-রে ফুলব্নে,
আমার মালকা বানু দিন গুনে….’


চলবে ~~~
® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply