Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জ’স বিলাভড পর্ব ২৮


‘আদিল মির্জ’স বিলাভড’
— ২৮

স্কুলের বিস্তৃত সদরদরজা খোলা হয়েছে দু-ধার দিয়ে। সদরদরজার বাইরে দুটো গাড়ি অপেক্ষারত অনেকটা সময় যাবতই। ধ্রুব সহ আরও কয়েকটি বডিগার্ড গাড়ি দুটোর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের মতো। তাদের গম্ভীরমুখের কড়া দৃষ্টিতে স্কুলের দারোয়ান দুটো না চাইতেও মিইয়ে যাচ্ছে। এযাত্রায় সদরদরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো কালো রঙের বিশাল আকৃতির একটা গাড়ি। গাড়িটা বেরিয়ে সোজা ধরল মেইনরোড। ধ্রুব বাকিদের নিয়ে গাড়ি দুটোতে মিলেমিশে উঠে বসেছে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে, শান্ত গতিতে অনুসরণ করছে বড়ো গাড়িটা। দুটো গাড়ির স্থান বড়ো গাড়িটার পাশাপাশিতেই। কঠিন পাহারায় রাখা হয়েছে। বড়ো গাড়িটার সবগুলো জানালার কাঁচ ওঠানো। ভেতরের কিছুই বাইরে থেকে দেখার সুযোগ নেই।

রোযার অসহায় চোখ দুটো দেখল এই গাড়ি অনুসরণ করা গাড়িগুলোকে। নিজেকে তার সেলিব্রিটি বলেই মনে হচ্ছে। সেলিব্রিটি বললেও বড়ো ভুল হয়। সেলিব্রিটিরাও বোধহয় এতো গার্ড, গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করে না। দৃষ্টি ফিরিয়ে অসহায় চোখে দেখল তার শরীরে সাথে লেপ্টে থাকা বিড়ালছানার মতন পিটপিট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা হৃদিকে। গাল ফুলিয়ে চেয়ে আছে। কাঁদোকাঁদো চোখমুখের অবস্থা। আষ্ঠেপৃষ্ঠে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। বারবার আওড়াচ্ছে, রোযার সাথে যাবেই যাবে। রোযার একটা কথাও শুনতে রাজি না। এইতো মাত্রই ওর প্যারেন্টস মিটিং সেরে বেরিয়েছে। চেয়েছে হৃদিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে রোযা নিজের বাড়িতে যাবে। অথচ বাচ্চাটা নারাজ এতে। ও নিজেও যাবে রোযার সাওকে মানানোই যাচ্ছে না। এযাত্রায় রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকাল শান্তর দিকে। শান্ত ড্রাইভারের পাশে বসে। কানে ব্লুটুথ। কাকে একটা নির্দেশনা দিচ্ছে। রোযা ভোঁতা মুখেই বলল –

‘আপনাদের বসকে কল করুন। জানান তাকে যে —হৃদি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে যেতে চাচ্ছে। যেতে পারবে? নেবো?’

শান্ত তখুনি আদিলের নাম্বারে ডায়াল করল। সে যতটুকু জানে, বস মিটিংয়ে আছে। ক্লায়েন্ট চায়নার। বেশ সময় নিয়ে হলেও কল রিসিভ হলো শেষমেশ। স্পিকারে রেখে শান্ত বলে –

‘বস, ম্যাডাম আপনাকে জানাতে বলেছেন যে প্রিন্সেস ম্যাডামের সাথে ম্যাডামের বাড়িতে যেতে চাচ্ছে। ম্যাডাম কী সাথে নেবে?’

ওপাশটার আলাপ-আলোচনার গুঞ্জন থেমে নামল পিনপতন নীরবতা। থমথমে এক কণ্ঠের প্রশ্ন এলো –

‘ম্যাডামের বাড়ি?’

প্রশ্ন শুনে রোযার চোখমুখ কুঁচকে এলো। তার বাড়ি কী বাড়ি না? আশ্চর্য! শান্ত মুখ খুলে জবাব দিতে পারল না। পরমুহূর্তেই আদিলের বাকি কথাগুলো কানে এলো –

‘এই মির্জা বাড়িই তার বাড়ি। যেখানে যেতে চাচ্ছে ওটা অস্থায়ী। তার বাবার বাড়ি। যেতে চাচ্ছে যেহেতু নিয়ে যাওয়া হোক। দুপুরের ভেতর ফেরা চাই।’

পরক্ষনেই কল কেটে গেলো। রোযার মুখে আঁধার নামল। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে থাকল শান্ত হাতের ফোন স্ক্রিনের দিকে। যেন দৃষ্টি দিয়ে ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ আগে কথা বলা আদিলকে গু লি করছে শ-খানেক। কথার ধরন দেখো! হুকুম করা হচ্ছে কেমন! দুপুরের ভেতর ফেরা চাই! অ্যাহ! মগের মুল্লুক? রোযা কী তার কেনা গোলাম? রোযার গোমড়া মুখ ছোটো দু-হাতে ধরল হৃদি। মিষ্টি করে প্রশ্ন করল –

‘কী হয়েছে, মম? আর ইউ আপসেট উইদ ড্যাড?’

রোযা নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইল। তাকাল হৃদির উচ্ছ্বসিত মুখের দিকে। যেতে পারবে শুনে মেয়েটা ভীষণ আনন্দিত। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। রোযার অসন্তুষ্ট অনুভূতি মিলিয়ে গেলো ফানুশের মতো। হৃদিকে কোলে নিয়ে মাথার কিছু এলোমেলো চুল ঠিক করে দিতে নিয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল –

‘আগে বলো কোথায় যেতে চাচ্ছো আমার সাথে?’

হৃদি ভাবল। ইতস্ততভাবে আড়েআড়ে দু-বার তাকাল রোযার মুখের দিকে। রোযা আশ্বস্ত করল চওড়া হেসে। অনেকটা সময় ভেবে একপর্সাবধানী ভঙ্গিতে ছোটো গলায় আওড়াল মেয়েটা –

‘নানুবাড়ি?’

রোযা চমকায় সামান্য। পরমুহূর্তেই প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে হেসে ফেলল। হৃদির টমেটোর মতো লাল দু-গালে চুমু খেলো। বুকে জড়িয়ে চাপা গলায় বলল –

‘হু, তোমার নানুবাড়ি যাচ্ছি।’

হৃদির ধূসর চোখের মণিতে ঝলমলে তারা ভাসে। দু-গাল ভরে হেসে তাকিয়ে থাকে কেমন! যেন নানু বাড়ি যেতে পারাটা ভীষণ চমৎকার কিছু, আনন্দের বিষয়। রোযার হৃদয় গলে হাওয়াই মিঠাইয়ের মিতো মিশে যায়। সে যে চেয়েছিল বাড়ির সবাইকে ভালোভাবে হৃদির সম্পর্কে বুঝিয়ে তারপর ওকে নিতে। বাবা-মাকে জানাতে চেয়েছিল, হৃদি তার মেয়ের মতো না। তারই মেয়ে। নিজের নাতি ভেবে যেন আদর করে, কাছে টানে, ভালোবাসে। অথচ সেই সুযোগ তো হলো না। না জানিয়েই সাথে নিতে হচ্ছে। তবে রোযার মন জানে, তার বাবা-মা কোন ধরনের মানুষ। কেমন তাদের হৃদয়। নিশ্চয়ই কাছে টানবে হৃদিকে। এতটুকু ভরসা আছে বলেইতো সাহস করছে সে। রোযা চায় না হৃদির মনে এতটুকু কষ্টের আঁচ লাগুক। ওর এই উচ্ছ্বাস যেন পালাক্রমে বেড়ে হিমালয় ছোঁয়। মোটেও, একবিন্দুও যেন না কমে। রোযা কখনো মানতেই পারবে না। হতেই দেবে না।

.

রাজু সতর্ক হলো। তাড়াহুড়ো কদমে বাড়ির ভেতর ঢুকল। ছুটতে ছুটতে ডাকতে থাকল ষাঁড়ের মতো, ‘মা…’

নিপা বেগম চোখমুখ কুঁচকে ফেললেন। রান্নাঘরে তখন তিনি ব্যস্ত হাতে ভাতের মাড় ফেলছেন। হাতের কাজ শেষ করে তবেই ফিরলেন –

‘কী হয়েছে? চ্যাঁচাচ্ছিস কেনো?’

রাজু হাঁপাচ্ছে সমানে। আঙুল দরজার দিকে তাঁক করে বলল, ‘অনেকগুলো গাড়ি আসছে আমাদের বাড়ির দিকে।’

ওর বলা শেষ হয়নি। অমনি গাড়ির শব্দে তালুকদার বাড়ির ভূমি কেঁপে উঠল। ক্রাচে ভর দিয়ে দ্রুতো ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আজিজুল সাহেব। ইতোমধ্যে নিপা বেগম চটজলদি ছুটে এলেন দরজার কাছে। পেছন পেছন আজিজুল সাহেব আর রাজুও এসে দাঁড়াল। তাদের সতর্ক দৃষ্টি আপাতত তাদের বাড়ির ভেতরে ঢোকা গাড়িগুলোর ওপর। দরজার সামনেই এসে থেমেছে যে গাড়িটা, সে গাড়ি থেকে রোযা হাওয়ার বেগে বেরিয়ে এলো। ততক্ষণে বেরিয়ে এসে পুরো বাড়িটা ঘেরাও করেছে বডিগার্ডস। ধ্রুব, শান্ত ওর তখনো গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে।

রোযাকে দেখেই নিপা বেগম চিৎকার করে উঠলেন। দু-চোখ ভিজে উঠল একমুহূর্তে। ঝর্নার মতো ঝরছে চোখের জল। কাঁদতে কাঁদতে নগ্ন পায়েই তিনি ছুটছেন মেয়ের দিকে। শান্ত নেই রোযাও। দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিপা বেগমের বুকে। বুকে মাথা রাখতেই স্বস্তিতে ওর প্রাণ ভরে এলো।

‘আমার রোযা! তুই কেমন আছিস, মা? সব ঠিক আছে তো? দেখি!’

বলতে বলতে নিপা বেগম মেয়ের মুখটা দু-হাতে তুলে নিয়ে ভালোভাবে দেখলেন। সহিসালামত মেয়েকে দেখে বুকের পাথর সরল। রোযা মৃদু হাসল রক্তিম চোখ নিয়েই। আওড়াল –

‘ভালো আছি। শান্ত হও তুমি।’

আজিজুল সাহেবের ভেজা চোখজোড়া কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেয়ের দিকে। রোযা মাকে ছেড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল খুঁড়ে খুঁড়ে ছুটে আসতে চাওয়া বাবাকে। আজিজুল সাহেবের গলার স্বর ভেঙে আসে –

‘কেমন আছিস, মা?’

রোযা হাসে। বাবার বৃদ্ধ মুখের দিকে চেয়ে আশ্বস্ত করে দৃঢ়, নরম গলায়, ‘ভালো আছি। ভালো আছি, বাবা। এতো চিন্তা করো না।’

বলতে বলতে ভেজা চোখ দুটো মুছে দেয়। তাকায় আজিজুল সাহেবের পেছন মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটো ভাইয়ের দিকে। রোযা এগুলো দু-পা। মনে হচ্ছে, কত বছর পর দেখা পরিবারের সাথে। রাজু ভেজা চোখমুখ তুলে তাকাল। নিঃশব্দে কেঁদে চোখমুখ ভিজিয়ে ফেলেছে। এযাত্রায় হামলে পড়ল বড়ো বোনের বুকে। দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রোযা। মাথা বুলিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।

‘বাবাহ, কাঁদতেও দেখি পারিস। কে যেনো বলতো ছেলেরা বীর। তারা কাঁদে না।’

রাজু লজ্জা পেলো। তবে ছাড়ল না। জড়িয়ে রাখল না অনেকটা সময়। আজিজুল সাহেব হাসেন মেয়ে-ছেলের দিকে চেয়ে। কিছু বলবেন তখুনি বাচ্চাবাচ্চা কণ্ঠে ডাক পড়ল –

‘মম, মম…ক্যান আই কাম আউট?’

চমকে ওঠেন নিপা বেগম। আজিজুল সাহেব তাকালেন গাড়ির দিকে। পরপর বেয়াকুবের মতন তাকান মেয়ের দিকে। গাড়ির দরজাটা খোলা তখনো। ওখানে শান্ত দাঁড়িয়ে আছে। ওই ডাকে রোযা হাসে সামান্য। দ্রুতো কদমে ছোটে গাড়ির দিকে। মাথাটা নুইয়ে তাকাতেই দেখল লক্ষ্মীর মতো হৃদি বসে আছে। আগ্রহী চোখে চেয়ে আছে এদিকেই। রোযা দু-হাত বাড়িয়ে দিতেই ঝাপিয়ে কোলে চলে এলো।
হৃদিকে নিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে আসতেই দরজাটা লাগাল শান্ত। নিপা বেগম, আজিজু সাহেব, রাজু তারা দেখতে পেলো রোযার কোলে থাকা হৃদিকে। দু-হাতে রোযার গলা জড়িয়ে বড়ো বড়ো চোখে তাদেরই দেখছে। নিপা বেগম, আজিজুল সাহেব একবার বাচ্চাটাকে দেখছেন আরেকবার রোযার দিকে। রোযা হেসে ফেলল। এগিয়ে এলো তাদের সামনে। হৃদি পিটপিট চোখে অনেকক্ষণ আজিজুল সাহেবের দিকে চেয়ে থাকল। আজিজুল সাহেবও হতবিহ্বল ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন। এযাত্রায় হৃদি ফিসফিস করে বলল –

‘মম, নানুভাই লুকস আ লিটল লাইক ইউ।’

থমকালেন আজিজুল সাহেব। রোযা হেসে ফেলল শব্দ করে। মেয়ের নাক ছুঁয়ে আওড়াল, ‘তাই? সালাম দাও, নানু-নানাভাইকে।’

হৃদি তাকাল দুজানার দিকে। পাখির মতো কিচিরমিচির করে বলল, ‘হাই, নানাভাই। তুমি কী ভালো আছো? হাই, নানু। তুমিও কী ভালো আছো?’

আজিজুল সাহেব একপলক মেয়ের দিকে তাকালেন। হঠাৎ ওমন এক উচ্চবংশীয় পরিবারের বাচ্চার নানুভাই হওয়ায় থতমত খেয়ে আছেন। নিপা বেগমের মুখে হাসি ধরছে না। ভদ্রমহিলা মেয়ের আশ্বস্ত দৃষ্টি দেখে মুহুর্তে দু-হাত সাবধানের সাথে বাড়িয়ে দিলেন। হৃদি খুব সহজেই কোলে এলো। জড়িয়ে ধরল নিপা বেগমের গলা। পুতুলের মতো চেয়ে আছে নিপা বেগমের মুখের দিকে। মিটিমিটি হাসছে। নিপা বেগমের অন্তর হিমেল বাতাসে দুলে উঠল যেন। তিনি মুগ্ধ চোখে চেয়ে আওড়ালেন –

‘ভালো আছি, নানুভাই। তুমি কেমন আছো?’

হৃদি বিজ্ঞের মতো বলে, ‘মম কাছে থাকলে আমি সবসময় ভালো থাকি।’

নিপা বেগম দেখলেন বাচ্চাবাচ্চা মুখটা। কথা বলতে বলতে বাচ্চাটা সেই রোযার দিকেই তাকাচ্ছে। নিপা বেগম তাকালেন মেয়ের দিকে। এইমুহূর্তে রোযাকে এক গর্ববোধ করা মা মনে হচ্ছে। নিপা বেগমের হৃদয় নদীর জলের মতো শান্ত হয়ে গেলো। আর কোনো দুঃশ্চিন্তাই রইল না। তিনি হৃদিকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বললেন –

‘বাইরে আর কতো? ভেতরে আসো।’

হৃদির মুখে চেয়ে হেসে হেসে প্রশ্ন করলেন, ‘কী খাবে আমার নানুভাই? তুমি নানুকে বলো, নানু তোমার জন্য তাই রান্না করবে।’

হৃদি উচ্ছ্বাস নিয়ে জানাল, ‘গ্র্যান্ডমা, আই’ল ইট হোয়াটএভার ইউ মেইক।’

নিপা বেগম ভড়কে গেলেন। থেমে গেলো তার কদম। হৃদি তখনো চেয়ে আছে মিষ্টি করে হেসে। খুব কাছে থাকা রাজু মাকে বোঝাতে বলল –

‘বলেছে, তুমি যা বানাবে তাই খাবে।’

নিপা বেগম মুহুর্তে মুগ্ধতায় ভেসে গেলেন। কী মিষ্টি বাচ্চা! তার তো চুমু খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না। যদি অপছন্দ করে? হৃদি তখন চারিপাশটা দেখছে আগ্রহ নিয়ে। হঠাৎ পেছনে চেয়ে ডাকল –

‘মা… মা!’

রোযা বাবাকে ধরে এনে বসিয়েছে ড্রয়িংরুমের সোফায়। ডাকে সাড়া দিলো ওখান থেকেই, ‘বলো, মা।’

‘তুমি কোথায় থাকতে? আমি ওই রুমে যাবো।’

রোযা হাসল। রাজু দ্রুতো বলল, ‘আমি নিয়ে যাই। আসো বাবু।’

হৃদি তাকাল রাজুর দিকে। দৃষ্টিতে প্রশ্ন। রোযা এসে পরিচয় করিয়ে দিলো, ‘এটা তোমার মামা। আমার ছোটো ভাই।’

হৃদি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘হাই, মামা।’

রাজু এমনভাবে হাসল যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছে। মায়ের থেকে একরকম কেড়ে নিজের কোলে নিলো। বুক ফুলিয়ে ভীষণ গদগদ ভঙ্গিতে বলল –

‘আসো, মামা তোমাকে রুম দেখাব। দেখবে?’

হৃদি মাথা দোলাল। বড়ো বাধ্য, ‘হু। আই ওয়ান্ট টু, মামা।’

প্রত্যেকটা মামা ডাকে রাজু হেসে কুল পাচ্ছে না। নিপা বেগম, রোযা ওই দৃশ্যে হেসে ফেললেন। আজিজুল সাহেব নরম দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন। ওরা দৃষ্টির বাইরে যেতেই ডাকলেন মেয়েকে –

‘আয় বোস, মা।’

রোযা গিয়ে বসল বাবার পাশে। পাশে এসে বসলেন নিপা বেগমও। ইতস্তত করেই সতর্ক চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন –

‘তোকে মা ডাকে? ওর বাবা জানে?’

রোযা আদিল মির্জার কথা শুনেই চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। নাক ফুলিয়ে আওড়াল, ‘জানবে না? উনিই তো শিখিয়ে দিয়েছে।’

নিপা বেগম আরও সতর্ক হয়ে জিজ্ঞেস করে গেলেন, ‘কেমন ব্যবহার করে? সব ঠিকঠাক তো?’

রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কীভাবে কী বলে বোঝাবে বুঝছে না! খুব যে ভালো ওই লোক তাও না। আবার যে ভীষণ খারাপ তাও না। গতকালই পিস্ত ল মাথায় ধরে রাখল। কথায় কথায় হুমকি, হুকুম! একপর্যায়েদৌড়ে আসতে থাকা হৃদিকে দেখে ছোটো করে শুধু বলল –

‘সব ঠিক। চিন্তা করো না।’

আজিজুল সাহেব বললেন, ‘আজ থেকে যা, মা?’

রোযা মাথা নাড়াল। জলদস্যুর কণ্ঠ এখনো ভাসছে। আবার সাথে হৃদি আছে। ফেরাই উত্তম। বলল, ‘আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে এসেছি। ফিরতে হবে।’

নিপা বেগমের চোখজোড়া পুনরায় ভিজে এলো। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে উঠে পড়লেন। নিজেই কদম বাড়ালেন রোযার রুমের দিকে। সব গুছিয়ে দেবেন। তার মেয়েটা আর তার নেই। এখন এই বাড়ির সদস্য মাত্র। ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠছে।

হৃদি ছুটছে। পেছনে রাজু। দুজানার ছোটাছুটির একপর্যায়ে দৌড়ে এসে মিশে গেলো রোযার সাথে। পিছু দৌড়ে এসে থামল রাজুও। দুজন হাসছে সমানে। হৃদি প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল –

‘মম, মামা ইজ সো ফানিইই। আই লাইক হিম।’

রাজু ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসি থামাল। আনন্দে ওর পুরো অস্তিত্ব জ্বলজ্বল করছে। মামা হতে পেরে ভীষণ গর্ববোধ করছে বোঝাই যাচ্ছে। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রোযা হেসে বলে –

‘মা গোসল করব। তাহলে তুমি মামার সাথে খেলো, হুঁ?’

‘আচ্ছা।’

হৃদি কোল থেকে নেমে এসে ধরল রাজুর হাত। যেনো কতো বছরের পরিচয় ওদের! যুগযুগ ধরে চেনাজানা।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এক চাপা গুঞ্জন। ‘আদিল মির্জা বিয়ে করেছে। মেয়েটা তাদের মধ্যের কেউ না। অজানা একজন। জগতের বাইরের কেউ। কে সে? কী তার পরিচয়?’ এমন এক গুঞ্জনে কেউ হতবাক তো কেউ-বা নির্বিকার আবার কারও তুখোড় মস্তিষ্ক, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কোনো এক সুযোগের সন্ধানে ব্যস্ত। ব্যস্ত আজকের জন্য তীব্র এলার্ট জারী করা শহরের বুকে লুকোনো এই জায়গাটিও। তীব্র বৃষ্টির ভেতরে, সাগরের স্রোতের মতো নামিদামি গাড়ির সারি পুরো এরিয়া জুড়ে। রাজত্ব জুড়েছে বিশালদেহী সব বডিগার্ডস। তাদের হাতে ছাতা। বাংলোর ভেতরটা উজ্জ্বল, যতটা উজ্জ্বল হওয়া সম্ভব। একেকটা সাদা ঝাড়বাতির আলোয় ডায়মন্ডের মতোই চকচক করছে সবকিছু। সে-সবকিছুর আয়োজন করা হয়েছে আইন মন্ত্রী আব্দুল মান্নানের পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষে। এখানে উপস্থিত সব এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী লোক। সেই একদল লোকের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আইন মন্ত্রী আব্দুল মান্নান। ড্রিংকের গ্লাসে ঠোঁট ছুঁইয়ে সখ্যতায় ব্যস্ত তিনি। তার পাশের বডিগার্ডস ব্যস্ত হাতে উপহার গুলো নিচ্ছে অতিথিদের হাত থেকে। প্রভাবশালী লোকদের ঘিরে আছে অল্পবয়সী সব সুন্দরী রমণী। ভীষণ ছিলো পোশাকে ওরা ড্রিংক সার্ভ করছে। ওদের শরীর যেন বাজারের সবজি। যে-কেউ সকলের সামনেই শক্ত করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। প্রত্যুত্তরে রমণী গুলো নিজেদের মিশিয়ে দিচ্ছে প্রভাবশালীদের শরীরের সাথে।

আব্দুল মান্নান সাহেবের পাশের জন সুবিশাল দেহি। গায়ে অন্যদের মতন স্যুট নেই। খোলামেলা একটা শার্ট পরনে। ও কায়সার আহমেদের ভাগ্নে, সিয়াম চৌধুরী। কায়সার আহমেদ বাংলাদেশ পুলিশ আইজিপি। সিয়ামের বাহুতে এক নারী। পরনে শর্ট ড্রেস। যা মিশে আছে। ওপরের, নিচের অনেকটা অংশই সকলের চোখের সামনে। হুটহাট সবার চোখের সামনে আপত্তিকর জায়গা ছুঁয়ে দিচ্ছে সিয়াম। এতে তার পাশের জন হাসল শব্দ করে। হাত বাড়াতে বাড়াতে বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল –

‘ ভাগ্নে, একা আর কতো? দাও না এক রাতের জন্য। সেই মাল।’

সিয়াম হাসল শব্দ করে। কৌতুক করে নারীটির মেকআপে সাজানো সুন্দর মুখে চুমু খেয়ে বলল –

‘এই বয়সে কচি মালের জন্য এতো পিপাসা? ভালা হবা না, না?’

মুখে এক বললেও ইতোমধ্যে নারীটিকে ঠেলে দিয়েছে ভদ্রলোকের কোলে। লোভাতুর লোকটা অমনি দু-হাতে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে নারীর শরীর। ওই নারীর মুখে ভাসল কিঞ্চিৎ ভয়, অনিচ্ছুকতা। ওই দৃশ্যে খ্যাকখ্যাক করে হাসল অনেকেই। মান্নান সাহেবের কানে তখন এক বডিগার্ড ফিসফিস করে কিছু বলল। মান্নান সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হয় মুহূর্তে। ড্রিংকের গ্লাস রেখে ছোটেন দরজার দিকে। সিয়াম ডাকে –

‘কী মন্ত্রী সাহেব, জন্য এতো তাড়া, হ্যাঁ?’

মান্নান সাহেব বেরিয়ে যেতে যেতে বলেন, ‘আদিল আসছে।’

সাথে সাথে একেকজনের আশ্চর্যের প্রশ্ন পড়ল –

‘আদিল মির্জ?’

‘আদিল মির্জা আসছে!’

‘আরেহ আদিইল…?.’

.

বৃষ্টির শব্দ মাড়িয়ে ড্রাইভওয়ে পিষে এসে থেমেছে বেশ কয়েকটা গাড়িটা। মুহুর্তে বেরিয়ে আসে এলেন, ক্লান্ত, স্বপন। ক্লান্ত মেলে ধরেছে বড়ো কালো ছাতাটা। শান্ত এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়াল। ওখানে ছাতাটা বাড়িয়ে ধরল ক্লান্ত। একজোড়া চকচকে কালো জুতো নামল বৃষ্টির জলে শব্দ তুলে। দরজায় যেই হাতটা পড়ল তা কালো গ্লোভসে আবৃত। পুরো শরীরটা পেরিয়ে এলো পরপর। আদিলের স্যুট রাতের আঁধারের চেয়েও কালো। কালো চোখমুখের ভঙ্গি। মান্নান সাহেব হাসতে হাসতে
আসছেন –

‘আইছো, তুমি!! কক্ষনো তো আনা যায় না তোমারে, বাপজান।’

আদিলের চোখমুখ গম্ভীর। স্বপন ব্রিফকেসটা এগিয়ে দিলো। আদিল হাঁটা অব্যাহত রেখে বলল –

‘জন্মদিনের শুভেচ্ছা মন্ত্রী সাহেব।’

ব্রিফকেস খুলতেই হাসি গাঢ় হলো ভদ্রলোকের। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন। নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিয়ে ব্রিফকেসটা পাশের বডিগার্ডের হাতে দিয়ে আদেশ ছুঁড়লেন –

‘সাবধানে রাখ।’

তারপর আদিলে সাথে বাংলোর ভেতর ঢুকলেন। ক্ষণিকের জন্য বয়ে গেলো তীব্র নীরবতা। পরপরই কেউ উচ্ছ্বাস নিয়ে কাছে এলো তো কেউ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। আদিল অবশ্য ওসবে কখনো ধার ধারেনি। সামনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা ডিল আছে তার। আইন মন্ত্রীর সাহায্য লাগবে। কাজটা ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন করতেই আজ এই প্রোগ্রামে আসা। আদিল সোজা এলো ড্রিংক বারের কাছে। পায়ের ওপর পা তুলে বসল পাশের সোফায়। পিছু পিছু এসে বসলেন মান্নান সাহেবও। দিকপাল চ্যাটার্জি হাসতে হাসতে এলেন দুটো ড্রিংকের গ্লাস হাতে। একটা আদিলের হাতে অন্যটায় নিজে ঠোঁট ছুঁয়ে অপজিটে বসে উৎফুল্ল গলায় বললেন –

‘সারপ্রাইজ দিলা ভালোই। দেখা তো পাওয়াই যায় না।’

আদিল ড্রিংকের গ্লাসে ঠোঁট ছুঁইয়েছে। একটানে শেষ করল। আরেক গ্লাস নিতে নিতে বলে, দিনকাল কেমন যাচ্ছে?’

মান্নান সাহেব বললেন, ‘তা আমরা জিজ্ঞেস করব, তাই না দিকপাল চ্যাটার্জি?’

‘একদম। নতুন বিয়া করছো শুনলাম? আনো নাই কেনো সাথে? দেখা করাবা না?’

আদিলের হাত থামল না। কয়েক গ্লাস গলায় ঢেলে সিগারেট ইতোমধ্যে ঠোঁটে স্থান পেয়েছে। একটান দিয়ে ধোঁয়া ছুড়ল। একফাঁকে গলায় ঢালল আরেক গ্লাস। পাল্লা দিয়ে ড্রিংক করছে দিকপাল চ্যাটার্জিও। তাদের ভেতর যেন কম্পিটিশন চলছে। মান্নান সাহেবের বয়স হয়েছে। ওত খেতে পারেন না। তারপরও বেশ কয়েক গ্লাস গিলেছেন। মাথাটা চক্কর দিলো। নেশ ধরেছে প্রায়। সিয়াম এসে দাঁড়াল তখুনি। ভিন্ন একটি মেয়ে ওর বাহুতে। ওই মেয়েকে নিয়েই বসল অপজিটে, দিকপাল চ্যাটার্জির পাশে। ভ্রু দুলিয়ে বলল –

‘শুনলাম খুব রূপসী দেখতে। ওমন রূপসী একা একা দেখলে হবে?’

আদিল গ্লাসের মদ টুকু গিলে র ক্তিম চোখ তুলে তাকাল তৎক্ষণাৎ। ওই ধূসর রঙের দৃঢ় দৃষ্টিতে সিয়ামের ভেতরটা সামান্য কাঁপলেও দেখাল না ওপরে। মান্নান সাহেব সতর্ক হলেন। থামাতে চাইলেন, কিন্তু ভীষণ সাহস দেখাতে সিয়াম বলে গেলো –

‘আনা হোক সামনে। আমরা দেখি, একটু টেস….’

চোখের পলকে, হাওয়ার গতিতে আদিলে ঝুঁকে হাতের ড্রিংকের গ্লাস দিয়ে বাড়ি বসাল সিয়ামের মাথায়। আদিলের হাত, সিয়ামের মাথা ফেটে র ক্তে ভেসে গেলো সবটা। মান্নান সাহেব চিৎকার করেন –

‘আদিল!!’

আদিল থামল না। র ক্তাক্ত, কাঁটা হাত দিয়েই চেপে ধরল সিয়ামের গলা। ওকে উড়িয়ে আছড়ে ফেলল জমিনে।

‘খান কি* পোলা, কলিজা ছিঁড়ে কুত্তা রে খাওয়াব। তোর মুখে আমি মু * ব।’

মান্নান সাহেব এসে দ্রুতো টেনে ধরলেন আদিলের হাত। সিয়াম ততক্ষণে অজ্ঞান। ওর বডিগার্ড সব আদিলের বডিগার্ডের সাথে হাতাহাতিতে ব্যস্ত। মান্নান সাহেব বিষণ্ণ গলায় আদেশ ছুঁড়লেন –

‘তাড়াতাড়ি ওরে ওঠা। ডাক্তার সামুকে ডাক।’

গান শুনতে শুনতে রোযার চোখ গুলো লেগে এসেছে। ও ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে। টেলিভিশন অন। পরনে শুভ্র রঙের নাইট ড্রেস। ওপরে অংশ চাদর দিয়ে ঢাকা। হৃদি রুমে ঘুমাচ্ছে। রোযা এখনো না ঘুমিয়ে বসে আছে ওর ফোনটার জন্য। ফোন নাকি আদিল মির্জার কাছে। লোকটাকে কিছু কথা আজ রোযা শোনাবেই। ওর ফোনে অনেককিছু আছে। একজন মেয়েমানুষের ফোন কেনো ধরবে? রোযা চোখ বুজে বিড়বিড় করে –

‘কোনো ভদ্রতা নেই।’

আওরাতে আওড়াতে লেগে আসে চোখজোড়া।

মির্জা বাড়ির ড্রাইভওয়ে পিষে কয়েকটি গাড়ি ঢোকে তখুনি। এসে থামল বাড়ির সামনে। বৃষ্টি তখনো নামছে। শান্ত বেরিয়ে ছাতা মেলে ধরল। আদিল দুলতে দুলতে বেরিয়ে এলো। দুহাতের গ্লোভস তখনো র ক্তে ভেজা। সে অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে গ্লোভস খুলে ছুঁড়ে মারল। দুয়ারের কাছে এসে খুলল র ক্তাক্ত জুতো। গায়ের কোট খুলতে খুলতে প্রবেশ করল ভেতরে। দুয়ারের কাছে থামল শান্ত। আর ভেতরে গেলো না রোযার অস্তিত্ব দেখে। ওখানেই দাঁড়াল তবে ঘুরে।

আদিল একেকটা দৃঢ় তবে এলোমেলো কদমে সমানে এগুচ্ছে। কোটটা পড়ে আছে ফ্লোরে। তার ধূসর চোখের দৃষ্টিরা ঝাপসা। ভারি শরীরটা বোধহয় মৃদু দুলছেও। ফিসফিসিয়ে গান তখনো চলছে টেলিভিশন থেকে। ঝুলন্ত ঝাড়বাতিটার হলদে আলোয় দেখা মেলে রোযার। সোফায় বসা অবস্থায় মাথাটা সোফার শেষপ্রান্তের হাতলে এলিয়ে দেয়া। আদিল এসে দাঁড়াল রোযার ঠিক সামনে। ঝাপসা দৃষ্টিতে ওই ঘুমন্ত মুখটা দেখতে মিছুটা অসুবিধে হয়। এতে অসন্তুষ্ট হয় সে। সামান্য ঝুঁকতে চায়। কিন্তু পারে না… থুবড়ে পড়তে নিলে নিজেকে সোফার হাতল ধরে সামলে নিলো। রোযার ঘুমন্ত মুখটা দেখতে দেখতে কেমন শব্দ করে দু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সেই শব্দে চমকে চোখ মেলে তাকাল রোযা। নিজের খুব কাছে আদিলকে দেখে রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমুঢ়! হাঁটু গেড়ে বসা আদিলের চোখমুখ অবুঝের মতো দেখাল। আদিল একধ্যানে শুধু চেয়েই থাকল। ম দের তীব্র গন্ধে রোযা নাকমুখ কুঁচকে ফেলল। তাকাল শান্ত, এলেনের দিকে। ওরা একটা শব্দও করছে না। রোযা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। কতোটা ড্রিংক করেছে, এতোটা ড্রাংক হওয়ার জন্য? রোযা আস্তে করে প্রশ্ন করে –

‘এভাবে বসেছেন কেনো? রুমে যাচ্ছেন না যে?’

আদিল জবাবে নির্নিমেষ চেয়েই রইলো কেমন। ওমন গাঢ়, দৃঢ়, গভীর দৃষ্টির সামনে রোযা অপ্রস্তুত, বড়ো ছন্নছাড়া। দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। উঠতে চাইলে কিছু একটা অনুভব করে ঘাবড়ে ওঠে। কেঁপে ওঠে অন্তর। আদিল ভীষণ আলগোছে মাথাটা রেখেছে থম মে রে থাকা রোযার কোলে। কেমন কল্পনায় বসবাস করা এক মানব কণ্ঠে মিনমিন করে আওড়ায় –

‘মা- মাথা বুলিয়ে দাও রোজ। যেভাবে আমিরার করো। আমার হেডএক হচ্ছে।’

রোযার হৃদয়ে কেমন শিরশিরে এক অনুভূতি হয়। নিভুনিভু, বাচ্চাসুলভ ওই কণ্ঠে অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। মিইয়ে যায় তার শরীর। এই আদিল মির্জা ও চেনেই না। আদিল তাকানোর চেষ্টা করে অস্পষ্ট ভাসা ভাসা চোখে –

‘কী হলো? করো না।’

রোযা চমকে চেয়ে রয় মুখের সামনে থাকা আদিলের অবুঝ চোখমুখে। হুবহু হৃদির মতো মুখ, চোখ। আবদারও ওর মতো। রোযার হাত কাঁপে সামান্য। কণ্ঠনালি আঁটকে আসে। আদিল আওড়ায় ফের। রোযা অবশেষে অত্যন্ত ধীরে এগিয়ে নেয় ডান হাতটা। নরম, ফর্সা, লম্বা পাঁচ আঙুল পাঁচটা ডুবে যায় তার কোলে রাখা মথার কালো সিল্কি চুলে্র গভীরে। মুহূর্তে আদিল কেমন শব্দ করে স্বস্তির শ্বাস নেয়। আরও গভীর এলিয়ে যায় কোলের মধ্যে। রোযার পেটের কাছে প্রায় ছুঁইছুঁই হয়। টেলিভিশনে তখনো ফিসফিস করে গান বেজে যাচ্ছিল –

‘Maula Mere, Maula Mere..
Maula Mere, Maula Mere…’


চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।

[ রাত দুটো ত্রিশ। বেশ বড়ো একটা পর্ব। লেখায় ভুলত্রুটি পাবেন। রি-চেক সম্ভব হয়নি। আপনারা অপেক্ষায় যে। দ্রুতো দিয়ে দিচ্ছি। বুঝে নিয়েন কেমন? ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply