অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৯
[❌অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ❌]
বর্তমান_
কল্পনা জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো শুভ্র। ডায়েরির শেষ অংশ পাতাটুক হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে সে আপনমনেই হেসে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা সেই হাসিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর ভালোবাসা মাখানো। সে বিড়বিড় করে বলল।
“পাগলি একটা।”
শুভ্র আলমারির গোপন ড্রয়ার থেকে অতি যত্নে রাখা ডায়েরিটা বের করল। শুভ্র যে ডায়েরিটা রিদির সামনে পুড়িয়েছে সেটা আসল ছিল না। শুভ্র কাল রাতেই ঠিক রিদির ডায়েরির মতো একই রকম একটা ডায়েরি জোগাড় করেছিল। সারারাত জেগে সে রিদির হাতের লেখা নকল করে ডায়েরির কিছু অংশ কপি করেছিল যাতে ডায়েরিটা পোড়ানোর সময় রিদি দূর থেকেও ধরতে না পারে যে ওটা নকল।
শুভ্র আসল ডায়েরিটার ওপর পরম মমতায় হাত বুলালো। ডায়েরির প্রতিটি ভাঁজে যেন রিদির জমানো দীর্ঘশ্বাস আর ভালোবাসার ঘ্রাণ লেগে আছে। শুভ্র ডায়েরিটার দিকে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে গভীর আবেগে বলল।
“আমি এই ডায়েরিটা কীভাবে পুড়াবো? এই ডায়েরিটা পুড়ালে তো মনে হবে ডায়েরি পুড়ছে না নিজেকে পুড়াচ্ছি। তোর প্রতিটি অক্ষরে যে আমার নাম লেখা রিদি। তোকে পোড়ানোর সাধ্য যেমন আমার নেই তোর দেওয়া এই অনুভূতিগুলো ছাই করার ক্ষমতাও এই শুভ্রর নেই।”
শুভ্র ডায়েরিটা আবার ড্রয়ারের একদম গভীরে লুকিয়ে রাখল। সে জানে এই নিষ্ঠুর নাটকটা না করলে রিদির এই পাগলামি এখন থামানো যাবে না। যদি সে প্রশ্রয় দেয় তবে রিদি আরো পাগলামি শুরু করবে। আর রিদির এই অবাধ্য প্রেম যদি লোকজানে প্রকাশ পেয়ে যায় তবে সম্পর্কের যে জটিলতা তৈরি হবে তাতে শুভ্রর রিদিকে হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি।
শুভ্র আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পরনের শার্টের কলারটা এখনো কুঁচকে আছে। ঠিক যেখানটায় রিদি তার অধিকার নিয়ে খামচে ধরেছিল। শুভ্র আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসল। তার চোখ বলছে আজ রিদির চোখে যে আগুনের ফুলকি সে দেখেছে সেই আগুনই একদিন তাদের দুজনকে এক করবে। কিন্তু তার আগে এই বিরহ আর নিষ্ঠুরতার খেলা তাকে খেলতেই হবে।
রিদি রুমে এসে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। নিজের দুই হাত বিছানায় ভর দিয়ে মাথা নিচু করে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল। শুভ্র তার সাথে অবজ্ঞা করেছে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে এতে রিদির খুব একটা খারাপ লাগছে না। কারণ শুভ্র ভাই তো এমনই। কিন্তু ওই ডায়েরিটা। ওটা তো স্রেফ একটা খাতা ছিল না ওটা ছিল রিদির গত কয়েক বছরের নির্ঘুম রাতের সঙ্গী তার জীবনের অর্ধেকটা অংশ। ডায়েরিটা না হয় শুভ্রকে নিয়েই লেখা ছিল কিন্তু অনুভূতিগুলো তো একান্তই রিদির ছিল। শুভ্রর রক্তমাংসের হাত দুটো কীভাবে পারল আরেকজনের পবিত্র অনুভূতিগুলো এভাবে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে?
রিদি হেঁচকি তুলে চোখের পানি মুছল। আগুনের সেই লেলিহান শিখা যেন এখনো তার চোখের মণি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“খুব খারাপ লাগছে জানেন শুভ্র ভাই? আপনি আজ ডায়েরি না আমাকে পুড়ালেন। কিন্তু আমি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও সেই ছাইয়ে আপনাকেও নিয়ে পুড়বো। আমার ভালোবাসার আগুনে আপনাকেও পুড়াবো।”
অন্যদিকে নির্ভানের কথা শুনে নেহার রাগ মুহূর্তে ভয়ে রূপ নিল। তার মনে হলো পায়ের তলার মাটি দুলছে। শরীরটা যেন মুহূর্তেই হিমশীতল হয়ে এলো। নির্ভানের রাগী চেহারা আর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে নেহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। বোনের এমন অসহায় কান্না দেখে নির্ভানের কলিজায় যেন কেউ মোচড় দিয়ে ধরল। সে সোফা থেকে বিদ্যুদ্বেগে উঠে এসে নেহার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকিয়ে বলল।
“নেহা? পিউর ডল? কাঁদছিস কেন? বল আমায় কী হয়েছে? শুভ্র তোর সাথে কী করেছে? কোনো খারাপ কিছু করেছে ও? তুই একবার বল ওই কুত্তার বাচ্চাকে আমি জ্যান্ত মেরে ফেলবো? আরহাম খান নির্ভানের বোনের দিকে চোখ তুলে তাকাবে আর সে জীবিত থাকতে পারবে এমন কোনো ছেলে এই দুনিয়ায় আজও জন্মায়নি? বল ও কী করেছে?”
নেহা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে আর নির্ভানের চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। সে ভাঙা গলায় বলল।
“না ভাইয়া শুভ্র কিছু করেনি। সব আমি করে ফেলেছি ভাইয়া। শুভ্র আমার গোপন ভিডিও বের করে ফেলেছে।”
নির্ভানের যেন কথাটার মানে বুঝতে কিছুটা সময় লাগল। সে ভ্রু কুঁচকে কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যা সে শুনল। সে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
“গোপন ভিডিও মানে? কী বলছিস এসব নেহা? ক্লিয়ারলি বল।”
নেহা মাথা নিচু করে কান্নাভেজা কণ্ঠে পুরো কাহিনীটা বলতে শুরু করল।
ফ্ল্যাশব্যাক__
ঈশানের ফোনের স্ক্রিনে ভিডিওটা দেখা মাত্রই নেহার সারা শরীর অবশ হয়ে এল। সে দুই পা পিছিয়ে গেল তার হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে চলে এসেছে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় ঈশানের দিকে তাকিয়ে বলল।
“ঈশান তুমি… তুমি এই ভিডিও পেলে কোথায়?”
ঈশান তখন শুভ্রর দিকে তাকিয়ে একবার তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। তারপর নেহার দিকে ফিরে বলল।
“ম্যাম মানুষটা হিন্দু হতে পারি কিন্তু আপনাদের এসব নষ্টামি ধরতে বসের বুদ্ধি আর ঈশানের কেরামতিই যথেষ্ট।”
বলাই হয়নি ঈশান হিন্দু। আর এই হিন্দু ছেলেটা শুভ্রর মতো একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানের সাথে কীভাবে এমন অটুট বন্ধুত্ব আর বিশ্বস্ততায় জড়িয়ে গেল তা সময়ের সাথে সাথে জানা যাবে। ঈশানের কথা শুনে নেহা মরিয়া হয়ে শুভ্রর দিকে তাকাল। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল।
“বিশ্বাস করো শুভ্র আমি… আমি এটা ইচ্ছে করে করিনি। আসলে একটা পার্টি ছিল। ও আমার ফ্রেন্ড ফারহান। সেদিন আমরা দুজনেই অনেক বেশি ড্রিংক করে ফেলেছিলাম। আমাদের মধ্যে যে কী হয়ে গিয়েছিল আমরা নিজেরাও জানি না।”
শুভ্রর চোখে তখন কোনো মায়া ছিল না ছিল কেবল চরম অবজ্ঞা। সে পকেটে হাত দিয়ে খুব নিস্পৃহ গলায় বলল।
“আমার বিশ্বাসে তোমার কী যায় আসে নেহা? আই ডোন্ট কেয়ার। কিন্তু তোমার কি নিজের রুচি বলে কিছু নেই? এই সস্তা ক্যারেক্টার নিয়ে ভাবলে কী করে যে তোমার মতো একটা মেয়েকে আমি বিয়ে করব? না মানে আমার কি ভাতের অভাব নাকি বাড়ির অভাব যে তোমাকেই বিয়ে করতে হবে?”
নেহা তখন তার শেষ অস্ত্রটা ছাড়ল। সে চোখ রুখে দাঁড়িয়ে হুমকি দিয়ে বলল।
“কিন্তু তুমি আমাকে বিয়ে না করলে তোমাদের পরিবার রাস্তায় নামবে? ভুলে যেও না। ইউর ফ্যামিলি উইল বি অন দ্য স্ট্রিটস।”
শুভ্রর ঠোঁটের কোণে তখন সেই চেনা বিষাক্ত আর বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে এক পা এগিয়ে খুব শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল।
“আর আমরা রাস্তায় নামলে তোমাদের পরিবারের সবার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে নেহা। জাস্ট থিঙ্ক অ্যাবাউট ইট। আমরা না হয় রাস্তার কোনো এক কোণায় মাথা গুঁজে থাকতে পারব কিন্তু তোমার ফ্যামিলির কপালে তো জুতোর বাড়ি ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। দ্যাট উইল বি এ রিয়াল ডিজেস্টার।”
নেহা ভ্রু কুঁচকে আতঙ্কে অস্থির হয়ে বলল।
“মানে? কী বলতে চাইছো তুমি? ক্লিয়ারলি বলো।”
ঈশান তখন শয়তানি হাসি দিয়ে ফোনের স্ক্রিনটা নেহার চোখের সামনে আরও একটু উঁচিয়ে ধরল। তারপর বাঁকা স্বরে বলল।
“মানে খুব সহজ ম্যাম। আপনার আর আপনার ওই ফুলের মতো পবিত্র ফ্রেন্ড ফারহানের ল্যাংটা… মানে থুক্কু। আসলে এই সুন্দর ভিডিওটা যখন পুরো পাবলিক দেখবে তখন লোকে কী বিউটিফুল সব কমেন্ট আর লাইক করবে? ইসস বস কত ভালো চিন্তা করুন তো নেহা ম্যামকে কোনো কষ্ট ছাড়াই ভাইরাল করে দিতে চাইছে।”
নেহার সারা শরীর মুহূর্তেই ছ্যাঁত করে উঠল। মেরুদণ্ড দিয়ে যেন একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। এই ভিডিও যদি সত্যি সত্যি ইন্টারনেটে চলে যায় তবে তার জীবনটা ধুলোয় মিশে যাবে। নেহা বড় বড় চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল।
“দে-দেখো শুভ্র এটা কিন্তু একদম ভালো হচ্ছে না। ইউ আর ব্ল্যাকমেইলিং মি? তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো না এটা ক্রাইম।”
শুভ্র ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে সে ধারালো গলায় বলল।
“সো হোয়াট? তুমি করতে পারলে আমি কেন পারবো না? এইটা কি কোনো স্ক্রিপ্টে লেখা আছে যে শুধু তোমরাই গেম খেলবে? তুমি কি জানো না নেহা সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকাতে হয়। কথা সত্যি কি না জানি না তবে পয়জন দিয়েই কিন্তু পয়জন কাটতে হয়। ইউ ডিজার্ভ দিস।”
নেহা এবার মাথা নিচু করে ফেলল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। শুভ্র যে এতটা শার্প আর চালবাজ হতে পারে সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু তার মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। শুভ্র এই ভিডিওটা পেল কোথায়? এই ভিডিওর কথা তো সে আর ফারহান ছাড়া আর কারো জানার কথা ছিল না। নেহার অস্তিত্ব এখন সংকটের মুখে। সে কোনো রকমে নিজের গলা পরিষ্কার করে বলল।
“তুমি… তুমি এখন আমার কাছ থেকে ঠিক কী চাও?”
শুভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে বাজখাঁই গলায় আদেশ দিল।
“ক্যানসেল দিস ম্যারেজ। আজকেই এই বিয়েটা ক্যানসেল করো। আই ওয়ান্ট টু বি ফ্রি।”
নেহা এবার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শুভ্রর পা জড়িয়ে ধরল। রেস্টুরেন্টের মেঝেতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে আকুতি করতে লাগল।
“শুভ্র প্লিজ বিশ্বাস করো আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি প্লিজ আমার ইমোশন নিয়ে খেলো না। দেখো আমি যা করেছি সেটা ভুল ছিল আই নো। কিন্তু সেই ভুলের জন্য তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আই রিয়েলি লাভ ইউ সো মাচ শুভ্র তোমাকে ছাড়া আমি শেষ হয়ে যাবো।”
শুভ্রর চোখেমুখে প্রচণ্ড বিরক্তি আর ঘৃণা। সে নিজের পা জড়িয়ে থাকা নেহার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে কিন্তু কঠোরভাবে বলল।
“গু খাও তুমি।”
বলেই শুভ্র এক ঝটকায় নিজের পা ছাড়িয়ে নিল। সে নিজের দামী হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নেহার উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিয়ে গেল।
“সময় আজ রাতটুকু। ইউ হ্যাভ অনলি ওয়ান নাইট। এখন তুমি ভাবো কী করবে। বিয়েটা ক্যানসেল করবে নাকি নিজেকে ইন্টারনেটে দেখবে? চয়েস ইজ ইয়োরস।”
বর্তমান__
নেহার কাহিনি বলা শেষ হতে না হতেই নির্ভান সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল নেহার গালে। থাপ্পড়ের তীব্রতায় নেহা ছিটকে সোফার ওপর গিয়ে পড়ল। সে গালে হাত দিয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। নির্ভানের শরীর রাগে রি রি করছে তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। নির্ভান ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলল।
“ছিহ নেহা ছিহ। তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস? আমি ভাবতাম তুই জাস্ট একটু মডার্ন ছেলে ফ্রেন্ডদের সাথে ঘুরিস পার্টি করিস। কিন্তু তাদের সাথে এসব? ছিহ। আমার নিজের বোন হিসেবে তোকে পরিচয় দিতেও এখন ঘৃণা লাগছে। ইউ আর এ ডিসগ্রেস টু আওয়ার ফ্যামিলি।”
নেহা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সে নির্ভানের পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল।
“ভাইয়া বিলিভ মি ওইদিন আমি আর ফারহান কেউ কারো সেন্সে ছিলাম না। কী থেকে কী হয়ে গেছে আমরা নিজেরাও জানি না। ফারহান আমাকে বারবার প্রমিস করেছিল যে এসব কথা ও কাউকে বলবে না। কিন্তু আমাদের ভিডিও কে করল আর শুভ্রর হাতেই বা সেটা কীভাবে গেল আমি কিচ্ছু জানি না ভাইয়া।”
নির্ভান কিছুক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথায় এখন হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে কিছুটা শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে লম্বা শ্বাস নিল। তারপর খুব ঠান্ডা আর হিমশীতল গলায় জিজ্ঞেস করল।
“তোর ওই সো-কলড ফ্রেন্ড ফারহান এখন কোথায়? হোয়্যার ইজ হি?”
নেহা মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় উত্তর দিল।
“আমি ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না ভাইয়া। ওর ফোন সোশ্যাল মিডিয়া সব বন্ধ।”
নির্ভান ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত আর বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। তার চোখের মণি এখন শিকারি বাঘের মতো জ্বলছে। সে হাতের মুঠো শক্ত করে বলল।
“তোর ক্ষতি করে সে এত সহজে পার পেয়ে যাবে? হাউ ইজ ইট পসিবল। ফারহান যদি মাটির নিচেও লুকিয়ে থাকে আরহাম খান নির্ভান তাকে টেনে বের করবে। ডোন্ট ওয়ারি নেহা ওই ফারহানকে আগে আমি দেখে নেবো তারপর আসবো ওই শুভ্রর কাছে। ও তোকে ব্ল্যাকমেইল করার সাহস দেখিয়েছে? আই উইল মেক হিম পে ফর দিস।”
বিকেলবেলা ঈশান বাইক চালিয়ে সোজা শুভ্রদের বাড়ির সামনে এসে থামল। শুভ্রদের বাড়ির সামনে বাইকটা থামিয়ে হেলমেটটা খুলতেই ওপরতলার ব্যালকনি থেকে নজর পড়ল শুভ্রার। ঈশানকে এতদিন পর বাড়িতে আসতে দেখে শুভ্রার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল তবে সেই খুশিতে মিশে ছিল পাহাড় সমান দুষ্টুমি। সে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে দ্রুত নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এল।
ঈশান বাড়ির ভেতরে পা দিতেই দেখল সোফায় বসে ইকবাল এহসান আর সোহান চৌধুরী খুব গম্ভীর কোনো আলোচনায় মগ্ন। ঈশানকে দেখা মাত্রই সোহান চৌধুরীর কপালে ভাঁজ পড়ল মুখটা হয়ে গেল মেঘলা দিনের মতো থমথমে। ঈশান তাঁর মনের অবস্থা আঁচ করতে পেরেও সৌজন্যের খাতিরে বলল।
“আঙ্কেল কেমন আছেন?”
সোহান চৌধুরী নিউজপেপার থেকে চোখ না সরিয়েই খুব নির্লিপ্ত গলায় বললেন।
“ভালো। তুমি?”
“জি আঙ্কেল ভালো আছি।”
ঈশান আর কথা বাড়াল না। সে জানে এই বাড়িতে তার উপস্থিতি সোহান চৌধুরীর কাছে খুব একটা সুখকর নয়। কারণ ঈশান হিন্দু আর সোহান চৌধুরী কোনোভাবেই মানতে পারেন না যে তাঁর ছেলে একজন হিন্দু ছেলের সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকবে। ঈশান তাই যথাসম্ভব তাঁকে এড়িয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। ঈশান শুভ্রের রুমের দিকে সপাটে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ পায়ের নিচে কী যেন একটা প্রচণ্ড পিচ্ছিল কিছু লাগল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপাস। মেঝের সাথে আছাড় খেয়ে ঈশান ছিটকে পড়ল। কোমরে আর পিঠে প্রচণ্ড চোট পেয়ে তার মুখ দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল। আহহহ। মা গো।
যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে ঈশান নিজের জুতার দিকে তাকাল দেখল দুটো কলার খোসা থেঁতলে তার জুতোর তলায় লেগে আছে। সে হতভম্ব হয়ে ভাবছে এই দোতলার করিডোরে কলার খোসা কোত্থেকে এল। তখনই পাশের দেয়ালের আড়াল থেকে এক চিলতে খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এল।
ঈশান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দেয়ালের আড়াল থেকে শুভ্রা তার মাথাটা বের করে দাঁত বের করে হাসছে। কলার খোসার রহস্যটা বুঝতে ঈশানের আর এক মুহূর্তও লাগল না। শুভ্রা নিজের হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসি সামলানোর বৃথা চেষ্টা করে ভ্রু নাচিয়ে বলল।
“ইসস। খুব বেশি ব্যথা লেগেছে বুঝি ঈশান ভাইয়া? খুব মায়া লাগছে আমার।”
ঈশান কোনোমতে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পাজা ঝাড়ল। তারপর এক লাফে গিয়ে শুভ্রার কানটা সজোরে মুচড়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“আমি তো জানি কাজটা তুমিই করেছো। আচ্ছা শুভ্রা আমার সাথে তোমার কোন জন্মের শত্রুতা শুনি? তোমাদের বাড়িতে আসলেই কেন আমার সাথে একটা না একটা শয়তানি করো তুমি?”
শুভ্রা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে গাল ফুলিয়ে বলল।
“আহহ। লাগছে তো ছাড়েন ঈশান ভাইয়া। আর শুনুন আপনার সাথে দুষ্টুমি করতে আমার জাস্ট ফাটাফাটি লাগে। আমার খুব ভালো লাগে আপনাকে পচাতে।”
ঈশান কানটা আরও একটু ঘুরিয়ে দিয়ে বলল।
“তাই? এই বাঁদরামি আর কতদিন চলবে? এখন যে বড় হচ্ছো এইটুকু কাণ্ডজ্ঞান কি মাথায় ঢোকে না তোমার?”
শুভ্রা নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে ঘাড় ত্যাড়া করে বলল।
“নাহ ঢোকে না। এখন দুষ্টুমি করছি যতদিন জান আছে ততদিনই করে যাব। তাতে কার কী?”
“তাই নাকি। তুমি আমার সাথে যা খুশি করবা আর আমি কি মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব? শোনো শুভ্রা বড় হয়েছো এখন এইসব বাচ্চামো অন্তত আমার সাথে করা বন্ধ করো।”
বলেই ঈশান কান ছেড়ে দিল। শুভ্রা এবার নিজের কান ডলতে ডলতে চোখের মণি নাচিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে বলল।
“এই যে নাকের নিচে যে বাতাসটা আসে সেই বাতাস বন্ধ হওয়ার আগে এই শুভ্রা চৌধুরী কখনো আপনার পিছু ছাড়বে না। ছায়ার মতো পিছে লেগে থাকবে ভূতের মতো ঘাড়ে চেপে বসে থাকবে। কথাগুলো মনে রাইখেন ঈশান ভাইয়া।”
বলেই শুভ্রা একটা মুখভঙ্গি করে কোমর দুলিয়ে চলে গেল যেন কোনো সিনেমার নামী নায়িকা স্টেজ থেকে বিদায় নিচ্ছে। ঈশান শুভ্রার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট গোল করে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। এই মেয়েটার তেজ আর পাগলামি যেন দিন দিন বাড়ছেই। ঈশান নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা শুভ্রর রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজায় আলতো করে টোকা দিয়ে বলল।
“বস আসবো?”
ভেতর থেকে শুভ্রর সেই গম্ভীর আর পাথুরে কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“না বাইরে থাকো। যখন ‘ভাইয়া’ বলে ডাকতে পারবে তখন ভেতরে এসো।”
ঈশান একদম থতমত খেয়ে গেল। বসের মেজাজ আজ ভালো ঠেকছে না। তবে সে আর পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না জানত শুভ্রর এই রাগ সাময়িক। সে সোজা রুমে ঢুকে দেখল শুভ্র ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা করছে। স্ক্রিনের আলো শুভ্রর চোয়ালে আছড়ে পড়ছে সেখানে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। শুভ্র ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই আড়চোখে ঈশানের দিকে একবার তাকাল। তারপর কি-বোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে বলল।
“বসো।”
ঈশান সোফায় আরাম করে বসে সিরিয়াস গলায় কাজের কথা শুরু করল।
“বস আমি সব ডেটা চেক করেছি। এভরিথিং ইজ পারফেক্ট। আর নাঈম খান স্যার জানিয়েছেন তিনি ডিল ক্যানসেল করবেন না। হিজ রেডি টু মুভ ফরোয়ার্ড।”
শুভ্রর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিষাক্ত আর বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে খুব শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল।
“ক্যানসেল করবেই বা কীভাবে? খান গ্রুপ যদি ডালে ডালে চলে তবে আমি চলি পাতায় পাতায়। দে হ্যাভ নো আদার অপশন ঈশান। আই অলরেডি হ্যাভ দেম ইন মাই পকেট।”
শুভ্র আর ঈশান এরপর অফিসের বেশ কিছু জটিল আর সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করল। ঘরের গুমোট স্তব্ধতা ছাপিয়ে কেবল তাদের প্রফেশনাল আলাপচারিতা আর শুভ্রর গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
রিদি নিজের ওড়নার দুই প্রান্ত দুই হাতে জড়িয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ছাদে উঠে এল। কাল তারা সবাই নিজেদের বাড়িতে চলে যাবে—এই কথাটা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠছে। এই বাড়ি এই পরিবেশ আর বিশেষ করে শুভ্র ভাইয়ের অস্তিত্ব থেকে দূরে যাওয়াটা যেন তার কাছে মৃত্যুর সমান। সে ছাদের গ্রিলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বিকেলের হিমেল বাতাসে তার অবাধ্য চুলগুলো অবিরত মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। রিদির নিষ্পাপ আর বিষণ্ণ দৃষ্টি আকাশের এক কোণে স্থির হয়ে রইল।
ঠিক তখনই কথা বলতে বলতে শুভ্র আর ঈশানও ছাদে উঠে এল। ঈশান রিদিকে ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একগাল হেসে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ গলায় এগিয়ে এসে বলল।
“হাই রিদি। কেমন আছো? অনেক দিন পর তোমার সাথে দেখা হলো তো।”
রিদি হঠাৎ কথায় চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল ঈশান ভাইয়া। সে তাকে আগে থেকেই চেনে। রিদি এবার ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের দিকে তাকাতেই দেখল শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র পকেট থেকে ফোন বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিন চাপছে যেন আশেপাশে কী হচ্ছে বা কে দাঁড়িয়ে আছে তাতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। রিদি এবার ঈশানের দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হেসে বলল।
“জি ভাইয়া ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“এই তো চলছে। তা এই ভরসন্ধ্যায় ছাদে একা কী করছো?”
“এমনিই একটু হালকা হাওয়া খেতে আসলাম।”
“ওহ আচ্ছা। তো তোমরা কবে যাচ্ছো নিজেদের বাসায়?”
“কাল চলে যাবো। কলেজ আছে অলরেডি চারদিন মিস হয়ে গেছে।”
রিদির এই কথা শেষ হতে না হতেই শুভ্র ফোন থেকে মুখ তুলল। সে সরু চোখে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আর রহস্যময় দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
“শুনলাম তোদের কলেজে নাকি নিউ প্রফেসর আসছে? ডু ইউ নো হিম?”
রিদি এবার জেদ করে মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল। তার কণ্ঠে তখন অভিমানের সুর স্পষ্ট।
“তাতে কী? নিউ প্রফেসর আসুক কিংবা উগান্ডার প্রধানমন্ত্রী আসুক তাতে আপনার কী? আপনার ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র দরকার নেই।”
রিদির এমন ত্যাড়া কথা শুনে শুভ্র হাতের ফোনটা ধীরেসুস্থে পকেটে রাখল। তারপর দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে রিদির আপাদমস্তক একবার পরখ করে নিল। তার চোখেমুখে এখন গভীর গাম্ভীর্য। সে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
“বাহ। তোর মুখ তো দেখি রোবটের থেকেও স্পিড। তা এত কথা বলিস কীভাবে রে তুই? মাঝেমধ্যে মনে হয় তোর গলায় কোনো পাওয়ারফুল ইঞ্জিন লাগানো আছে।”
রিদি এবার যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। অভিমানে তার বুকটা ধকধক করছে। সে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সরাসরি শুভ্রর একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শুভ্রর চোখের গভীরে চোখ রেখে নিজের ঠোঁট ফুলিয়ে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে জেদের সাথে বলল।
“এই যে দেখছেন? এই ঠোঁট আর এই জিভ নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলি। দেখেছেন? নাকি আরও কাছে এসে বুঝিয়ে দিতে হবে কীভাবে কথা বলি? আই থিঙ্ক আপনার ব্রেনটা একটু স্লো কাজ করছে শুভ্র ভাই?”
রিদির এই দুঃসাহস আর চোখের আগুনের তেজ দেখে শুভ্র মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মেয়েটা যে এখনো রাগে অভিমানে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আছে সেটা শুভ্র স্পষ্ট বুঝতে পারছে। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল।
“তোর সাথে কথা বলা আর পাবনার পাগলদের গণিত বোঝানো একই কথা। জাস্ট ডিজগাস্টিং। আই হ্যাভ নো টাইম ফর দিস ননসেন্স।”
বলেই শুভ্র আর এক সেকেন্ড সেখানে দাঁড়াল না। গটগট করে ছাদ থেকে নেমে গেল। রিদি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে তখন যেন আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে অভিমানে মনে মনে বলল।
“হ্যাঁ আমি একটা বিরক্তিকর আর অসহ্য মেয়ে দরকার পরলে আরও অসহ্য হবো। তাতে আপনার কী?”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৪