Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৮


অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৮(❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)

নাচার মাঝেই হঠাৎ রিদির মনে পড়ে গেল শুভ্র তাকে নিজের রুমে ডেকেছিল। ভাবতেই তার বাঁধভাঙা খুশি মুহূর্তেই প্রচণ্ড আতঙ্কে পরিণত হলো। হঠাৎ শুভ্র তাকে কেন ডাকল। রিদির ধারণা অনুযায়ী শুভ্র আগে যখনই কথা বলত সরাসরি সামনেই বলে দিত। তবে এমন কী প্রয়োজন হলো যে তাকে আলাদা করে রুমে ডাকতে হলো। রিদি অনেক কষ্টে নিজের ভয় সামলে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর রুম থেকে বের হয়ে সোজা শুভ্রর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। রুমের দরজাটা খোলাই ছিল। কিন্তু রিদির হার্টবিট যেন মুহূর্তে শতগুণ বেড়ে গেল। সে কোনো রকমে দরজায় আলতো করে কড়া নেড়ে কাঁপা গলায় বলল।

“ভা-ভাইয়া আসবো?”

ভেতর থেকে শুভ্রর সেই অতি পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।

“কাম ইন।”

রিদি পা টিপে টিপে রুমে প্রবেশ করল। কিন্তু রুমে ঢোকা মাত্রই তার চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেল। তার পুরো শরীর যেন এক পলকে পাথর হয়ে গেল। কারণ সোফায় এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে আয়েশ করে বসে শুভ্র একটা ডায়েরি পড়ছে। আর সেই ডায়েরিটা অন্য কারো নয় স্বয়ং রিদির। যে ডায়েরিতে সে তার জীবনের সব গোপন কথা আর শুভ্রর প্রতি তার জমানো ভালোবাসার কথা লিখে রেখেছিল।

রিদির নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। এই ডায়েরি শুভ্র কোথায় পেল। শুভ্রর চোখেমুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাচ্ছে আর বিড়বিড় করে পড়ছে। রিদি আতঙ্কে তার জামার দুই পাশ শক্ত করে খামচে ধরল। তার মনে হচ্ছে পায়ের তলার মাটি এখনই সরে যাবে। বেশ কিছুক্ষণ পর শুভ্র ধীরে ধীরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শুভ্রর উঠে আসা দেখে রিদির বুকটা ধক করে উঠল। শুভ্র সরাসরি রিদির একদম সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা না বলে কেবল রিদির মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রিদি ভয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। তার হাঁটু কাঁপছে। এভাবে অনেকটা সময় কেটে গেল। তারপর শুভ্র একদম নিচু স্বরে কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল।

“ভালোবাসিস আমাকে?”

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো চমকে উঠল রিদি। তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে শুভ্র সবকিছু জেনে গেছে। আর জানবেই না কেন। ওই ডায়েরিটা তো আগাগোড়া শুভ্রকে নিয়েই লেখা। যে কেউ ডায়েরিটা পড়লে মুহূর্তেই সব জেনে যাবে। রিদি চোখ বন্ধ করে ঘনঘন শ্বাস নিতে লাগল। সে ভাবল শুভ্র যেহেতু জেনেই গেছে আর সেও যেহেতু শুভ্রকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তবে আজ আর লুকাবে কেন। এই শেষবেলা নিখুঁত সত্যিটা সামনে আসাই ভালো। কথাগুলো ভেবেই রিদি নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে হুট করে চোখ খুলে সরাসরি শুভ্রর চোখের দিকে তাকাল। তারপর বেশ উঁচু গলায় স্বীকার করল।

“হ্যাঁ।”

শুভ্র আর কোনো কথা বলল না। সে পাথরকুঁদা মূর্তির মতো একদৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্রর চোখের ভাষা রিদি ঠিক বুঝতে পারছে না। সে শুধু দেখছে শুভ্র খুব গভীর আর রহস্যময় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে দিল। অনেকটা সময় পর শুভ্র সোফায় রাখা ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। রিদি এক মুহূর্তের জন্য ভাবল শুভ্র হয়তো ডায়েরিটা তাকে ফেরত দেবে। কিন্তু না। শুভ্র ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে কয়েকটা পাতা টান দিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। তারপর পকেট থেকে লাইটার বের করে এক ঝটকায় ডায়েরির শেষ কোণায় আগুন ধরিয়ে দিল।

ডায়েরিটা দাউ দাউ করে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়তে লাগল। মুহূর্তে রিদির চোখ যেন কপালে উঠে গেল। তার চোখের সামনে শুভ্রকে নিয়ে লেখা হাজারো স্মৃতি শত শত নির্ঘুম রাতের জমানো অনুভূতিগুলো ছাই হয়ে যাচ্ছে। রিদির মনে হলো শুধু ডায়েরি নয় শুভ্র যেন তার কলিজাটাকেই পুড়িয়ে দিচ্ছে। শুভ্র অত্যন্ত নির্লিপ্ত মুখে সেই আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এক পরম তৃপ্তিতে সে রিদির অস্তিত্বকে পুড়িয়ে ধ্বংস করছে।

অগ্নিশিখার লালচে আভা রিদির ফ্যাকাশে মুখে এসে পড়ছে। মেঝেতে পড়ে থাকা ডায়েরিটার শেষ অংশটুকু ধীরে ধীরে ছাই হয়ে যাচ্ছে। শুভ্র পকেটে হাত দিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কণ্ঠস্বর হিমশীতল বাতাসের মতো ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে বলল।

“দেখ রিদি। আমি সাধারণ মানুষের মতো নাটক করে বলবো না যে তোকে ভালোবাসি না কিংবা তুই আমার যোগ্য নোস। আমি জাস্ট তোকে শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিচ্ছি। এসব আদিখ্যেতা যেন আমি আর কখনো না দেখি। স্টপ দিস ম্যাডনেস রাইট হেয়ার।”

শুভ্রর এই অবজ্ঞা রিদির বুকের গভীরে তীরের মতো বিঁধল। সে যেন নিজের বোধশক্তি হারিয়ে ধপ করে সেই জ্বলন্ত ডায়েরিটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আগুনের তাপে রিদির চোখে জল এলেও সে পলক ফেলল না। অবাধ্য দৃষ্টিতে পুড়তে থাকা কাগজের টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বলতে লাগল।

“শুভ্র ভাই। এই ডায়েরিটা তো স্রেফ কয়েকটা সাধারণ কাগজ ছিল। কিন্তু আপনার নামটা যে আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে খোদাই করা। এখন কি এই জীবন্ত হৃদয়টাকেও এই ডায়েরির মতো পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারবেন। আপনার অস্তিত্ব যে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে মিশে গেছে। এখন কি এই কাগজের মতো আমার মনটাকেও ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দিতে পারবেন। শুনুন শুভ্র ভাই। আমি এই ছাই হয়ে যাওয়া ডায়েরি দেখে রাগে বা অভিমানে দাঁড়িয়ে এটা বলবো না যে আপনাকে আর বিরক্ত করবো না। আপনাকে ভুলে যাবো এমন মিথ্যে প্রতিশ্রুতিও দেবো না। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যিই ভালোবাসার মতো হয় তবে তাকে উপড়ে ফেলার সাধ্য কারো নেই। আপনি যেদিন এই ডায়েরির মতো আমার শরীরটাকে পুড়িয়ে কয়লা করে দিতে পারবেন আর আমার মনটাকে একদম নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবেন সেদিনই হয়তো আপনি আমার থেকে মুক্তি পাবেন। আমি জানি আপনি সেটা পারবেন না। কারণ ডায়েরির প্রাণ নেই। তার কোনো অনুভূতি নেই। কিন্তু আমার আছে। আর আমাকে ওসব শেষ করে দিলে আমিই তো আর এই পৃথিবীতে থাকবো না। তাই আমার এই মাটির দেহটা মিশে যাওয়ার আগে এই অস্তিত্ব জুড়ে শুধু একটা নামই ধ্বনিত হবে। আর সেই নামটা হলো সাইফান শুভ্র চৌধুরী।”

শুভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে যেন নিজের অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল। রিদির গলার স্বরে এমন এক অদ্ভুত তেজ আর হাহাকার ছিল যা শুভ্রকে মুহূর্তের জন্য দিশেহারা করে দিল। সে অবজ্ঞার হাসি হাসার চেষ্টা করে বলল।

“ভালোবাসা মানে কী সেটা বোঝার বয়স কি তোর হয়েছে। এই যে এত লম্বা চওড়া কথা বললি এসবের মানে জানিস?”

রিদি এবার ভিজে চোখে কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে শুভ্রর চোখের গভীরে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন দহনের তীব্রতা।

“ভালোবাসা কী তার কোনো অভিধানিক মানে আমার কাছে নেই। তবে আমার কাছে ভালোবাসা মানে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। আপনাকে দেখলে আমার হৃৎপিণ্ডটা অবাধ্য হয়ে ওঠে। আপনার সামনে দাঁড়ালে ভয়ে শরীর কাঁপলেও হৃদয়ের কোনো এক কোণায় অদ্ভুত প্রশান্তি নামে। কিন্তু যখন দেখি অন্য কোনো নারী আপনার বাহুলগ্নে হতে চাইছে তখন আমার এই কলিজাটা পুড়ে খাক হয়ে যায়। জানেন কেমন কষ্ট হয় সেটা। একটা ডুবন্ত মানুষ অক্সিজেন ছাড়া যেমন একটুখানি নিশ্বাসের জন্য ছটফট করে ঠিক তেমনটাই আমার অবস্থা হয়। এই তীব্র দহনকে লোকে কী বলে আমার জানা নেই। তবে আমি এই দহনটাকেই আমার ভালোবাসা মনে করি। আর সেই ভালোবাসাটাই শুধু আপনার জন্য।”

রিদির এই পাগলামি আর তার চোখের ওই অবাধ্য সত্যের দিকে তাকিয়ে শুভ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে বুঝতে পারছে এই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তার দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা পাথরের দেয়ালটা ধসে পড়বে। সে যে এই মায়ায় আটকে যেতে চায় না। কিন্তু এই মুহূর্তে রিদির সান্নিধ্য তার ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা তৈরি করছে। শুভ্র চোখ বন্ধ করে নিজের হাতের মুঠো শক্ত করল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল।

“বেরিয়ে যা আমার রুম থেকে। আজ থেকে আমার সামনে কখনো আসবি না তুই।”

শুভ্রর এই কর্কশ কণ্ঠস্বরে রিদি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার বদলে যেন আরও সাহসী হয়ে উঠল। তার বছরের পর বছর জমানো আবেগগুলো আজ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে এক ঝটকায় এগিয়ে গিয়ে শুভ্রর শার্টের কলারটা খামচে ধরল। শুভ্র চমকে গেল। রিদি তখন কাঁপছে কিন্তু তার চোখে তখন জেদ। সে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল।

“আমাকে ভালোবাসলে কী হবে আপনার। কোনো দিক দিয়ে কি কম পড়বে আপনার। জানেন শুভ্র ভাই আপনি আমার কৈশোরী জীবনের সেই পুরুষ যাকে সেই কাল থেকেই আমি এই হৃদয়টা দিয়ে বসে আছি। আমি এতদিন চুপচাপ সব সহ্য করেছি কারণ আপনি বরাবরই গাম্ভীর্য নিয়ে থাকতেন। আমি ভয় পেতাম। মনে মনে ভেবেছিলাম একদিন ঠিক সাহস করে বলবো। কিন্তু হঠাৎ আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমার সব সাহস নিমিষেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আপনার যদি সত্যিই আজ বিয়ে হয়ে যেত তবে এই রিদি নামক মেয়েটা নির্ঘাত পাগল হয়ে যেত। কোনো একদিন হয়তো আপনি আমাকে রাস্তার ধারে পাগল বেশে দেখতে পেতেন। আমি মিথ্যে বলছি না শুভ্র ভাই। আ- আমি সত্যি আপনাকে ভালোবাসি।”

রিদির কথা শুনে শুভ্রর ভেতরের সেই বাঁধটা যেন মুহূর্তেই মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। সে যে দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখার জন্য এতদিন পাথরের দেয়াল তুলেছিল রিদি যেন ঠিক সেই দেয়ালেই বারবার আছড়ে পড়ছে। তবু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ভেতরের অস্থিরতা এবার এক অদ্ভুত হিংস্র রূপ নিয়ে এল। সে এক ঝটকায় রিদিকে সজোরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। রিদি অপ্রস্তুত অবস্থায় মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। শুভ্র রাগের চোটে হাঁপাচ্ছে। তার বুকের পাটা দ্রুত ওঠানামা করছে। সে রক্তচক্ষু নিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল।

“অনেক বলেছিস তুই। বড্ড বেশি বেড়ে গেছিস। দুদিন একটু সহজভাবে কথা বলেছি দেখে তুই মাথায় চড়তে চাইছিস। দেখ রিদি। আমার তর্ক করা একদম পছন্দ না। বের হ আমার রুম থেকে তোকে জাস্ট আমার সহ্য হচ্ছে না।”

রিদি ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও মুহূর্তেই মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন অশ্রু আর জেদ মিলেমিশে একাকার। সে আবারও শুভ্রর একদম সামনে এসে চোখে চোখ রেখে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত কাঁপন কিন্তু কথাগুলো আগুনের মতো উত্তপ্ত। সে বলতে লাগল।

“মানুষ তাড়াতে পারবেন শুভ্র ভাই। কিন্তু এই হৃদয়ে যে আপনি রাজত্ব করছেন তাকে কীভাবে আলাদা করবেন। একটা মানুষ অন্য কোনো সাধারণ জায়গায় থাকে না যে তাকে তাড়িয়ে দিলেই সে চলে যাবে আর সব শেষ হয়ে যাবে। একটা মানুষ হৃদয়ে থাকে। আর সেই হৃদয়টাই তো মানুষের ভিতরে বুকের পাজরে থাকে। তাহলে আমি চলে গেলে সেই হৃদয়টা তো আমার সাথেই যাবে। আর ওই হৃদয়েই তো আপনি আছেন। তাহলে কীভাবে আপনার কথা না বলে থাকবো। হৃদয় যেখানে আপনার জন্য উথালপাথাল করে সেখানে কীভাবে নিজেকে ঠিক রাখবো। পারবো না আমি। হৃদয় আছে তাই ভালোবাসবো। মন আছে তাই মনে রাখবো চিরজীবন। মুখ আছে তাই বলবো আপনাকে নিয়ে এসব কথা। ইউ ক্যান কিক মি আউট অফ মাই রুম শুভ্র ভাই। বাট ইউ ক্যান নেভার কিক ইওরসেলফ আউট অফ মাই হার্ট।”

কথাগুলো বলেই রিদি আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। চোখের জল আড়াল করার জন্য সে ঝড়ের বেগে শুভ্রর রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পর পুরো ঘরে এক গুমোট স্তব্ধতা নেমে এল।

শুভ্র চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে লাগল। তার উত্তাল বুকটা তখনো দ্রুত ওঠানামা করছে। রিদির কলার চেপে ধরা সেই স্পর্শ আর তার চোখের ওই অবাধ্য আগুনের তেজ শুভ্রর শরীরের প্রতিটি রক্তকণায় যেন এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে গেছে। সে ধীর পায়ে মেঝেতে পড়ে থাকা সেই পুড়ে যাওয়া ডায়েরিটার ছাইয়ের স্তূপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ সে নিস্পলক চেয়ে রইল সেই কালচে অবশেষের দিকে। তারপর তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় আর বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে একাধারে অবজ্ঞা আর এক গভীর মোহের মিশ্রণ। শুভ্র বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলে উঠল।

“ক্ষমা করিস মনোমোহিনী। অজান্তেই তোকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম। হয়তো সামনে আরও দেবো। শুধু একটু সয়ে নিস। তবু এইভাবেই আমাকে ভালোবেসে চলিস। কথা দিচ্ছি সময় হলে সেই সব কষ্ট এক সমুদ্র ভালোবাসা দিয়ে ডুবিয়ে দেবো।”

শুভ্র হাঁটু গেড়ে বসে আধপোড়া ডায়েরির এক টুকরো কাগজ তুলে চোখের সামনে ধরল। আর সেই আধপোড়া ডায়েরি কাগজের দিকে তাকিয়ে মনে করতে থাকল কাল রাতের ঘটনা।

ফ্ল্যাশব্যাক_

কাল রাতে শুভ্র রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির সবাই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। শুভ্র নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল সকালে দেখা সেই রিদির শাড়ি পরা রূপকন্যা চেহারাটা। সে বারবার কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে এপাশ-ওপাশ করছিল। কিন্তু না। ঘুমের লেশমাত্র নেই। চোখ বন্ধ করলেই সেই মায়াবী মুখটা ভেসে উঠছে।

শুভ্র এক সময় বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রুম থেকে বেরিয়ে সে নিজের অজান্তেই রিদির রুমের সামনে এসে হাজির হলো। শুভ্র নিজেও জানে না যে সে এই মাঝরাতে একটা মেয়ের রুমে কেন আসছে। সে আলতো করে দরজাটা ধাক্কা দিল। মুহূর্তে দরজাটা খুলে গেল। তার মানে রিদি দরজা বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুভ্র ধীর পায়ে সেই অন্ধকার রুমে প্রবেশ করল। ডিম লাইটের হালকা নীলচে আলোয় বিছানায় শুয়ে থাকা রিদির নিষ্পাপ মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। শুভ্রর হার্টবিট যেন এক লাফে বেড়ে গেল। এই অনুভূতি শুভ্রর কাছে একদমই নতুন নয়। বরং বড্ড চেনা। শুভ্র ধীরে ধীরে রিদির বিছানার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। রিদি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরে শুধু তার ছন্দময় বড় বড় নিশ্বাস নেওয়ার মৃদু শব্দ হচ্ছে। শুভ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রিদির দিকে।

রিদির অবাধ্য কিছু চুল তার কপালে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। শুভ্রর খুব ইচ্ছে করছে সেই অবাধ্য অলকগুলো খুব যত্ন করে কানের পিঠে গুঁজে দিতে। ইচ্ছে যখন জেগেছে তখন তাকে অপূর্ণ রাখা শুভ্রর স্বভাববিরুদ্ধ। সে অতি সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে পরম মমতায় রিদির কপালে আসা চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে গেয়ে উঠল।

~Mere Khawab~
~Mere khayalo~
~kiraani~
~kisi din Banegi~
~Humari kahani~

~Ae Mere Dekhudi~
~Yeh Kasam Meneli~
~Pyaar Mein Ak Pal~
~Mere Jaan Tujhe Hai Paana~

~Oh Oh Jaane Jaana~
~Dhoonde Tujhe Deewana~
~Sapno Mein Roz Aaye~
~ Aa Zindagi Mein Aana~

শুভ্রর সেই বরফশীতল হাতের স্পর্শ কপালে পেতেই রিদি ঘুমের ঘোরেই তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। এক অজানা শিহরণ যেন মুহূর্তেই তার সারা শরীরে বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো বয়ে গেল। শুভ্র চমকে হাতটা সরিয়ে নিতে চেয়েও পারল না সে দেখল রিদি একটু নড়েচড়ে নিলেও তার গাঢ় ঘুমটা ভাঙল না। শুভ্র অপলক দৃষ্টিতে রিদির সেই চাঁদপানা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

বেশ কিছুক্ষণ পর শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই প্রথম সে নিজের ভেতরের কঠিন দেয়ালটা ভেঙে পড়তে দেখল। যে শুভ্র সবার কাছে পাথরের মতো শক্ত আর গম্ভীর সেই শুভ্র আজ মাঝরাতে একটা সাধারণ মেয়ের পাশে বসে হিন্দি গানের কলি গাইছে। ঘটনার রেশ ধরে শুভ্রর মনের ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে গেল। সে নিজের অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে টের পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শুভ্রর মতো কঠিন মানুষের জন্য এই মায়া বড্ড বেমানান কিন্তু যার মায়া এত ভয়ংকর তার থেকে দূরে থাকা কি এতটাই সোজা। যতোই সে নিজেকে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রাখুক না কেন এই অদৃশ্য মায়ার টান তাকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে ছাড়ছে।

শুভ্র আবারও বিছানায় শুয়ে থাকা রিদির দিকে তাকাল। ডিম লাইটের হালকা আলোয় মেয়েটাকে কোনো এক অপার্থিব রূপকথার রাজকন্যার মতো নিষ্পাপ লাগছে। শুভ্র ঝুঁকে এসে রিদির কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশালো এক তপ্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল।

“আমার ঘুম হারাম করে দিয়ে নিজে দিব্যি কত শান্তিতে ঘুমাচ্ছিস তুই তাই না। ঘুমিয়ে নে রিদি এই সুযোগ আর বেশিদিন পাবি না। আমার সময়টাও খুব তাড়াতাড়ি চলে আসছে। যেদিন তোকে নিজের করে নেব সেদিন একটা রাতও তোকে শান্তিতে ঘুমাতে দেবো না। একদম বুকের সাথে পিষে ফেলব তোকে।”

কথাগুলো বলার সময় শুভ্রর গলায় এক অদ্ভুত আদিম নেশা খেলা করছে। তার নিজের নিশ্বাসের তাপ রিদির গলায় গিয়ে আছড়ে পড়ছে। শুভ্র উঠতে যাবে ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল রিদির বালিশের পাশে রাখা একটা ডায়েরির ওপর। সে অতি সাবধানে অত্যন্ত সন্তর্পণে ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। হালকা আলোয় সবটা স্পষ্ট না হলেও ডায়েরির জীর্ণ দশা দেখে সে বুঝতে পারল এটা রিদির অতি যত্নে রাখা কোনো জীবন খাতা।

শুভ্রর ব্যক্তিত্বে অন্যের ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়ার মতো অভ্যাস কোনোদিন ছিল না। কিন্তু আজকের এই রাতটা যেন সব নিয়ম ভাঙার। শুভ্র মনে মনে নিজেকে শাসন করল ঠিকই কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল। অন্যের বেলা যেটা অপরাধ রিদির বেলা সেটা তার অধিকার। রিদির জীবনের গোপন কথাগুলো জানতে সে প্রয়োজনে এমন হাজার হাজার অপরাধ করতে রাজি। শুভ্র আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ডায়েরিটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে সে নিঃশব্দে রিদির রুম থেকে বেরিয়ে নিজের অন্ধকার করিডোর ধরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

রুমে ফিরে শুভ্রর ভেতরের অস্থিরতা যেন চরমে পৌঁছালো। সে বিছানায় বসে ডায়েরিটা হাতে নিল কিন্তু সেটি খোলার সাহস পাচ্ছিল না। তার হাত দুটো মৃদু কাঁপছে। বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা। যদি তার এই মনোমোহিনীর জীবনে অন্য কারো ছায়া থাকে। যদি এই ডায়েরির পাতায় অন্য কোনো পুরুষের নাম লেখা থাকে। এই ভয়টা শুভ্রর মতো আত্মবিশ্বাসী মানুষকেও মুহূর্তেই কুঁকড়ে দিচ্ছে।

অবশেষে একরাশ দ্বিধা নিয়ে শুভ্র ডায়েরিটা খুলল। প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই তার চোখ আটকে গেল। অনেক সুন্দর করে ডিজাইন করা একটি বড় নাম সেখানে জ্বলজ্বল করছে।

~আমার প্রিয়দর্শন পুরুষ শুভ্র ভাই~

নামটা দেখেই শুভ্রর হাত থেকে ডায়েরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে সে নামটার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের নামটা যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অপরিচিত শব্দ মনে হতে লাগল। সে কি সত্যিই নিজের নাম দেখছে। নাকি শুভ্র নামে তার মনোমোহিনীর নীল আকাশের জীবনে অন্য কেউ আছে। এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই শুভ্রর বুকে এক চিনচিন ব্যথার অনুভূতি হলো। সে দুই দুইবার ঢোক গিলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর ধীরে ধীরে পৃষ্ঠা উল্টে একদম প্রথম থেকে পড়তে শুরু করল।

আজ রবিবার তারিখ ০৬/৩/২০২০

লিখতে শুরু করেছি আমি আজ প্রথম একটি মানুষকে নিয়ে। আর সেই মানুষটি হলো আমার মামাতো ভাই সাইফান শুভ্র চৌধুরী। যদিও আমার লেখার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে ছিল না তবুও এই অবাধ্য হৃদয়টা নিজেকে সামলাতে পারল না। তার জমানো অনুভূতিগুলো আজ কলমের কালি দিয়ে কাগজের বুকে প্রকাশ করতে চাইল। আমার কেমন জানি লাগে শুভ্র ভাইকে দেখলে। তাকে দেখলে আমার হার্টবিট বেড়ে যায় বড্ড ভয় লাগে কিন্তু ঠিক পরক্ষণেই কোথাও যেন এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাই। এই অনুভূতিকে কি ভালোবাসা বলে। আমি বেশ কিছু দিন ধরে শুভ্র ভাইকে দেখলে এমন অনুভব করছি। আচ্ছা এই অনুভূতির কী নাম দেওয়া যায়। যেহেতু আমার শুভ্র ভাইকে অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে তাই প্রথম নামটাই তাকে আমার পছন্দের সাথে মিলিয়ে রাখলাম। আমার প্রিয়দর্শন পুরুষ শুভ্র ভাই।

এইভাবেই শুভ্র একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়তে লাগল। সময় যেন থমকে গেছে। যতোই পড়ছে ততোই পড়ার তৃষ্ণা বাড়ছে। দীর্ঘক্ষণ পর ডায়েরিটা শেষ করে শুভ্র একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে যেন এই পৃথিবীর বাস্তবতার বাইরে কোনো এক গভীর কল্পনা জগতে হারিয়ে গেল।

যাকে পাওয়ার জন্য সে নিজেকে এতদিন যোজন যোজন দূরে সরিয়ে রেখেছে অবাধ্য মনটাকে পাথরের মতো শক্ত করে শাসন করেছে। সেই মানুষটাই কি না গোপনে তাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুনেছে। তাকে ঘিরেই রিদির নীল আকাশের সবটা রং সাজানো। রিদির প্রতিটা নিশ্বাসে যে শুভ্রর নাম মিশে আছে সেটা আজ এই কাগজগুলো চিৎকার করে বলছে। শুভ্রর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই ডায়েরিটা পরম মমতায় বুকের সাথে চেপে ধরল। কিন্তু সেই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কয়েকবার লম্বা শ্বাস নিতেই শুভ্রর মনে এক তীব্র আতঙ্ক দানা বেঁধে উঠল। রিদির এই পাগলামি যদি জানাজানি হয়ে যায় তবে তো সব শেষ হয়ে যাবে।

সোহান চৌধুরী আত্মীয়দের মধ্যে আত্মীয়তা একদমই পছন্দ করেন না। তার ওপর তিনি রাবেয়া এহসানকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন। রিদির এই গোপন ভালোবাসার কথা জানলে সোহান চৌধুরী নিশ্চিতভাবে তার আদরের ফুপিকে ভুল বুঝবেন। দুই পরিবারের এই মধুর সম্পর্কে বিষ মিশে যাবে। আর এই ঝড়ের মাঝখানে পড়ে শুভ্র হয়তো চিরকালের জন্য রিদিকে হারিয়ে ফেলবে।

কথাগুলো ভাবতেই শুভ্রর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে বিছানা থেকে উঠে দেয়ালের ওপর দুই হাত ভর দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে নিজেকে শাসাতে লাগল।

“না না আমি রিদিকে হারাতে পারবো না। ওকে পাওয়ার জন্য আমাকে যতোটা কঠোর হতে হয় আমি হবো। এভাবে আমাকে দুর্বল হলে চলবে না শক্ত হতে হবে। শুভ্র প্লিজ… জাস্ট কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ। ডোন্ট লেট দিস ইমোশনস উইকেন ইউ।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply