অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৫ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
শুভ্রের সেই শীতল কণ্ঠের হুঁশিয়ারি শুনে রিদির বুকটা ধক করে উঠল। সে অনেক কষ্টে নিজের শরীরের কাঁপুনি দমন করার চেষ্টা করে অত্যন্ত জড়োসড়ো হয়ে মেহেদির কোণটা ধরল। তার ফর্সা আঙুলগুলো কাঁপছে। ঠিকমতো নকশা ফুটে উঠছে না। রিদির কেবলই মনে হচ্ছে সামান্য এদিক-ওদিক হলেই শুভ্র সবার সামনে আবার সেই অপমানজনক ধমকটা দেবে। এক বুক আতঙ্ক আর মনের গভীরের একরাশ চাপা কষ্ট নিয়ে সে কোনোদিকে না তাকিয়ে কেবল যান্ত্রিকভাবে নকশা করে চলল। ধীরে ধীরে মেহেদি দেওয়া শেষ হলো। শুভ্র নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাকই হলো। অগোছালো মনের কাজ হলেও নকশাটা বেশ শৈল্পিক আর নিখুঁত হয়েছে। শুভ্র প্রশংসাসূচক কিছু একটা বলে আসন ছেড়ে উঠতে যাবে ঠিক তখনই শুভ্রা পেছন থেকে বাজপাখির মতো শুভ্রের কাঁধ চেপে ধরে দুষ্টুমি করে বলল।
“কই যাও ভাইয়া? মেহেদি যেহেতু দিয়েই ফেলেছ তাহলে হবু ভাবির নামটাও লিখে রাখো! এটাই তো নিয়ম।”
শুভ্র হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কড়া গলায় বলল।
“ছাড় আমায়। ইটস টোটালি ইউজলেস। ওসব নাম টাম লেখার কোনো প্রয়োজন আমি দেখছি না।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা। শুভ্রা নাছোড়বান্দার মতো শুভ্রের হাতটা টেনে ধরে আবার রিদির সামনে পেতে ধরল। তারপর রিদির দিকে তাকিয়ে হাতের তালুর একটা নির্দিষ্ট খালি জায়গা দেখিয়ে হুকুম দিল।
“এই রিদি। এখানে একদম সুন্দর করে ‘নেহা’ নামটা লিখে দে তো।”
মুহূর্তের মধ্যে রিদির পৃথিবীটা যেন থমকে গেল। তার মনে হলো বাতাসের অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে। যাকে সে শৈশব থেকে মনে মনে নিজের ধ্রুবতারা মেনে ভালোবেসে এসেছে যার শাসন আর বারণকেই জীবনের সবকিছু ভেবেছে আজ নিজের কাঁপাকাঁপা হাতে সেই পরম প্রিয় মানুষটার গায়ে অন্য কোনো নারীর নাম খোদাই করতে হবে। এই যন্ত্রণা কতটা তীব্র তা কেবল রিদির দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মনটাই জানে। রিদি আবারো শুভ্রের সেই তপ্ত হাতটা নিজের হাতের ওপর তুলে নিল। চোখের নোনা জল অনেক কষ্টে চোখের কোণেই আটকে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে সে অতি কষ্টে যখনই ‘N’ অক্ষরটা লিখতে শুরু করল ঠিক তখনই ঘটল কাণ্ড। তুর্য হঠাৎ এক বিশাল লাফ দিয়ে শুভ্রকে জাপটে ধরে আর্তনাদ করে উঠল। সেই আচমকা ধাক্কায় শুভ্রের পুরো হাতটা রিদির হাতের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে হাতের তালুর সব মেহেদি লেপ্টে একাকার হয়ে গেল। শুভ্রের অসম্পূর্ণ নাম আর রিদির হাতের তালু দুটোই এখন কালচে রঙে মাখামাখি। রিদি ধড়ফড়িয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল। শুভ্র নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে তুর্যের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল।
“হোয়াট দ্য হেল ডিড ইউ জাস্ট ডু। এইটা কী করলি তুই?”
তুর্য নিজের পাজায় হাত বুলিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল।
“আই অ্যাম রিয়েলি সরি ম্যান। আমি বুঝতে পারছি না কী হলো আমার মনে হলো কেউ আমার পাজায় একদম জ্যান্ত কোনো চিমটি কেটেছে। আর আমি সেই যন্ত্রণায় নিজেকে সামলাতে না পেরে তোকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছি।”
রিফাত একদম আকাশ থেকে পড়ার ভান করে কপালে ভাঁজ ফেলে বেশ অবাক হয়ে বলল।
“চিমটি? তোকে আবার এই ভিড়ের মধ্যে কে চিমটি কাটল? সবাই তো যে যার মতো ব্যস্ত।”
তুর্য চোরের মতো আশেপাশে তাকাতে তাকাতে আর নিজের পাজা ঘষতে ঘষতে বলল।
“সেটাই তো বুঝতে পারছি না। কে কাটল? কিন্তু আমি একদম হলফ করে বলতে পারি কেউ আমাকে জ্যান্ত একটা চিমটি কেটেছে। আমার পাজায় এখনো মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে।”
পাশ থেকে পাখি বড় বড় চোখ করে তুর্যের দিকে তাকিয়ে বলল।
“কিন্তু আমরা তো কেউ আপনার ধারেকাছেও যাইনি। তাহলে হঠাৎ আপনাকে চিমটি মারার শখ কার জাগবে? এই ভরদুপুরে আপনার ওপর জীন-পরী আছর করল নাকি?”
শুভ্র আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার ধৈর্য বজায় রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে। সে সবার দিকে একপলক তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিরক্তির সাথে বলল।
“তোরা জাস্ট ডিসগাস্টিং। তোদের এই সস্তা ফাজলামির কোনো সীমা নেই। হাতের তালুতে এই নোংরা মেহেদি লেগে না থাকলে এখনই তোদের সব কয়টার গালে থাপ্পড় দিয়ে দাঁতগুলো হাতে ধরিয়ে দিতাম।”
বলেই শুভ্র ভিড় ঠেলে ঝড়ের বেগে বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। রিফাত তুর্য আর বাকি সবাই একদম পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে শুভ্রের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তুর্য এখনো হতভম্ব তার মাথায় কাজ করছে না যে আসামীটা আসলে কে। সে নিশ্চিত কেউ একজন তাকে একদম মোক্ষম সময়েই চিমটিটা কেটেছে। কিন্তু আসামীটা কে সেইটা সে ধরতে পারছে না। রিদি এখনো ড্রয়িংরুমের সেই কোণায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতের তালুতে শুভ্রের হাতের সেই তপ্ত মেহেদি লেপ্টে একাকার হয়ে আছে। তার বুকের ভেতর তখনো এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
শুভ্র নিজের রুমে ঢুকেই রাগে গজগজ করতে করতে সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকল। পানি ছেড়ে সে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে হাতের তালুটা ধুতে লাগল। কিন্তু মেহেদির গাঢ় রঙ ততক্ষণে চামড়ার গভীরে জেদ ধরে বসেছে। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর শুভ্র বুঝল এই দাগ এখনই উঠবে না অন্তত কয়েকটা দিন তাকে এই চিহ্ন বয়ে বেড়াতে হবে।
সন্ধ্যা নামতেই চৌধুরী বাড়িটা যেন এক আলোময় স্বপ্নপুরীতে পরিণত হলো। প্রকাণ্ড বক্সের গানের তালে তালে পুরো বাড়ির দেয়ালগুলো পর্যন্ত কেঁপে কাঁপছে। বাড়ির সামনের বিশাল খোলা জায়গায় গায়ে হলুদের এক রাজকীয় স্টেজ বানানো হয়েছে। চারপাশ রঙিন আলো আর কাঁচা ফুলের গন্ধে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন বাস্তবের মাটিতে কোনো এক পরী রাজ্য নেমে এসেছে। শুভ্রা থেকে শুরু করে বাড়ির সব মেয়েরা আজ হলুদ-সবুজ কম্বিনেশনের সিল্কের শাড়ি পরেছে। প্রত্যেকের গলায় আর কানে হাতে বানানো গাঁদা ফুল আর কাঁচা হলুদের গয়না। পার্লার থেকে আসা রূপটান শিল্পীরা তাদের ঘষে-মেজে একেকজন অপার্থিব সুন্দরী বানিয়ে দিয়েছে। পুরো বাড়িতে হাসির রোল। আনন্দের হিল্লোল। কিন্তু এই মহোৎসবের মাঝেও একজন নিজেকে একদম আড়ালে করে রেখেছে। সে রিদি। সবাই রঙের উৎসবে মেতেছে। রিদি তার ঘর অন্ধকার করে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে সাজেনি। গায়ের হলুদের ওই উজ্জ্বল হলুদ রঙটা পরার সাহস তার হয়নি। সে শরীর জড়িয়েছে এক গাঢ় নেভি ব্লু রঙের সাধারণ গাউনে। চুলে কোনো ফুলের মালা নেই। মুখে নেই কোনো প্রসাধনীর ছোঁয়া। নিজেকে যতটুকু সম্ভব সাদাসিধাভাবে গুছিয়ে নিয়েছে সে। সাজবে কী করে। রিদিই তো এই বাড়ির সেই অভাগী মেয়ে। যে ছোটবেলা থেকে তিল তিল করে যাকে ভালোবেসে নিজের অস্তিত্বে গেঁথেছে। আজ তারই বিয়ের দাওয়াত খেতে হচ্ছে তাকে। কাল সকালে এই একই মানুষের পাশে সে অন্য এক নারীকে আসীন দেখবে। অন্য কারো হাতের ওপর হাত রেখে শুভ্র কবুল বলবে। খোদা। এই দৃশ্য কল্পনা করাটাও যে কতটা যন্ত্রণার। তা রিদির বুকের ভেতর ধকধক করতে থাকা কলিজাটা প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছে। শুভ্রা রিদিকে কোথাও না পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে তার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখল ভেতরটা একদম ঘুটঘুট অন্ধকার। উৎসবের বাড়ির এত আলো যেন এই একটি দরজায় এসেই থমকে গেছে। শুভ্রা অবাক হয়ে তড়িঘড়ি করে রুমে এসে রুমের লাইট অন করে দিল। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে রিদি চোখ দুটো ছোট করে ফেলল। সামনে শুভ্রাকে দেখে সে বেশ চমকে উঠল। শুভ্রা রিদির এই হতশ্রী দশা দেখে কোমরে হাত দিয়ে শাসন করার ভঙ্গিতে বলল।
“তুই এখনো এভাবে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস? নিচে সব শুরু হয়ে গেছে। তুই কি রেডি হবি না?”
রিদি নিজের ভেতরের হাহাকারটুকু আড়াল করতে একটা ম্লান হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে শুভ্রাকে ভালো করে দেখল। শুভ্রার হলুদ-সবুজ শাড়ি আর ফুলের গয়নায় তাকে ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে। রিদি দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল।
“আমি তো রেডিই হয়েছি রে। তোকে কিন্তু আজ অনেক সুন্দর লাগছে।”
শুভ্রা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না। সে নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে রিদিকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
“রেডি হয়েছিস মানে? তোর কি মাথা সত্যি পাগল হয়ে গেছে? এই গায়ে হলুদে কেউ এমন ম্যাড়মেড়ে নেভি ব্লু গাউন পরে? পাগল নাকি তুই?”
রিদি নিজেকে শান্ত রেখে খুব নিচু গলায় বলল।
“আরে না। আসলে আজ আমার কেন জানি একদম সাজতে ইচ্ছে করছে না। তাই ভাবলাম এভাবেই সাদাসিধে ভাবে চলে যাই।”
শুভ্রা কোনো অজুহাত শোনার পাত্রীই নয়। সে ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে রিদির হাত খপ করে ধরে ফেলল। জেদি গলায় বলল।
“উহু। আমরা পরমু শাড়ি আর তুই পরবি গাউন? তা আমরা কিছুতেই হতে দিমু না। আমরা যেহেতু শাড়ি পরেছি। তোকেও শাড়ি পরতে হবে। এইটাই ফাইনাল কথা।”
রিদি কিছু একটা বলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে চাইল। কিন্তু তার আগেই শুভ্রা তাকে হেঁচকা টানে রুম থেকে বের করে করিডোরে এসে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে মিহি আর পাখিদের ডাক দিল। রিদির ওই সাদামাটা রূপ দেখে মিহি আর পাখিও যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তারা সবাই মিলে রিদিকে ঘিরে ধরল। রিদি বার বার বলছে যে সে শাড়ি পরবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তারা জোর করে টেনে হিঁচড়েই রিদিকে সাজানো রুমে নিয়ে গেল। আসলে মুহূর্তটা এমনই। যখন কাজিনরা সবাই নানি বাড়ি এক হয়। তখন কে কী পরবে আর কে সাজবে না। তাকে জোর করে সাজিয়ে নিজের মতো করে তোলাটাই তো কাজিনদের আসল পরিচয়। রিদিকে এক প্রকার জবরদস্তি করেই সবাই মিলে শাড়ি পরিয়ে দিল। অনেক যত্ন করে তারা রিদির অগোছালো রূপটাকে নিখুঁতভাবে সাজাল। রিদির সারা শরীর তাজা গাঁদা আর গোলাপ ফুলের গয়নায় একদম মুড়ে দেওয়া হলো। পার্লারের মহিলা যখন গাঢ় মেকআপ করতে চাইলেন। রিদি চোখভর্তি জল নিয়ে মিনতি করল যেন তাকে বেশি গর্জিয়াস সাজানো না হয়। রিদির করুণ মুখ দেখে আর্টিস্ট খুব হালকা সাজের এক মায়াবী ছোঁয়া দিলেন তার মুখে। চুলগুলো ব্রাশ করে আলগাভাবে ফুলিয়ে তুলে গাঁদা আর গোলাপ ফুলের মাঝখানে তিন পরতের একটা টিকলি বসিয়ে দিলেন। সবটুকু সাজ শেষ হওয়ার পর যখন রিদি সবার সামনে দাঁড়াল। সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ জাস্ট হাঁ হয়ে গেল। সাদা ধবধবে ফর্সা শরীরে সবুজ পাড়ের গাঢ় হলুদ শাড়ি। তাতে লাল তাজা গোলাপ আর গাঁদা ফুলের মালায় রিদিকে যেন স্বর্গের কোনো এক চ্যুত অপ্সরা মনে হচ্ছে। তার মায়াবী চোখের বিষণ্ণতা সেই রূপকে যেন আরও অপার্থিব করে তুলেছে। শুভ্রা তো উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল।
“ওয়াও রিদি। আমি জাস্ট থ হয়ে গেছি। আজ তোর ওপর থেকে আমিই চোখ ফেরাতে পারছি না রে। বিশ্বাস কর। যদি আমি ছেলে হইতাম। তবে এখনই তোরে কাজী ডেকে বিয়ে করে ফেলতাম।”
শুভ্রার এমন সরাসরি প্রশংসায় রিদি লজ্জায় আর অস্বস্তিতে নুইয়ে পড়ল। জীবনের এই প্রথম সে শাড়ি পরল। এর আগে কখনো তার এই অঙ্গে শাড়ি ওঠেনি। রিদি ম্লান চোখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল আয়নায় এক অচেনা রাজকন্যা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সুন্দর। সত্যিই অনেক সুন্দর লাগছে তাকে। কিন্তু এই সৌন্দর্য রিদির চোখে ধরা পড়ছে না। পড়বেই বা কী করে। যার আত্মার ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তার কাছে বাইরের এই উজ্জ্বল রঙগুলো আজ বড় বেশি বেমানান। এই অপরূপ সাজ তার কাছে আজ নীল বিষের মতো মনে হচ্ছে। রিদিকে মাঝখানে রেখে পাহারা দেওয়ার মতো করে শুভ্রা মিহি আর পাখি বাইরে নিয়ে আসল। বাইরে পা রাখতেই উৎসবের চড়া আলোয় রিদি যেন আরও বেশি ফুটে উঠল। সেখানে উপস্থিত অনেক ছেলের চোখ মুহূর্তেই স্থির হয়ে আটকে গেল রিদির ওপর। তারা মুগ্ধ হয়ে রিদিকে দেখছে আর একে অপরের কানে কানে কী যেন বলছে। রিদির প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুভ্রা আর বাকিরা সবাই তখন সেলফি তোলা আর হাসি-ঠাট্টায় ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু রিদির কাছে ওই অচেনা ছেলেদের লোলুপ চাহনিগুলো তীরের মতো বিঁধছে। সে ভীষণ অস্বস্তি আর বিরক্তি অনুভব করতে লাগল। এক মুহূর্ত সেখানে থাকা তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। সে কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি বড় বড় পা ফেলে ভিড় ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। রিদিকে দেখে সাহেরা চৌধুরী মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইলেন। তার চোখেমুখে একরাশ মমতা ঝরে পড়ল। তিনি আলতো করে রিদির চিবুক ছুঁয়ে বললেন।
“বাহ। আমার রিদি মা’কে তো আজ বড্ড সুন্দর লাগছে। একদম পরীর মতো লাগছে রে।”
রিদি ম্লান মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল। ঠিক তখনি সোহান চৌধুরী বেশ তাগাদা দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। তার চোখেমুখে কিছুটা অস্থিরতা। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সাহেরা চৌধুরীকে বললেন।
“কী গো সাহেরা। শুভ্র কই? নেহাদের বাড়ি থেকে তো মেহমানরা চলেই আসলো। তোমার ছেলের কি এখনো রুম থেকে বের হওয়ার সময় হয়নি? ওকে নিচে আসতে বলো।”
সাহেরা চৌধুরী কপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলেন। ব্যস্ত গলায় বললেন।
“ওমা। তাই তো। আমিও না ছেলেটা আমার। একটু আগেই কফি চেয়েছিল। আমি মেহমান সামলাতে গিয়ে একদম ভুলেই গিয়েছিলাম। ও তো না পেলে রেগে আগুন হয়ে যাবে।”
বলেই তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিদির দিকে ফিরলেন। এক প্রকার অনুরোধের সুরে বললেন।
“রিদি। তুই একটু যা তো মা। গিয়ে তোর ভাইয়াকে ডাক দিয়ে নিচে নিয়ে আয়। আমি চট করে কফিটা বসিয়ে দিই। ছেলেটা আমার কফি না পেয়ে এতক্ষণে বোধহয় রাগে বোম হয়ে আছে।”
সাহেরা চৌধুরী আর উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। এক প্রকার দৌড়েই রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। রিদির বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করতে শুরু করেছে। প্রথমবার শাড়ি পরা। তার ওপর এমন সাজ। এই অবস্থায় শুভ্রের সামনে যাবে। সে তো লজ্জায় একদম কুঁকড়ে যাবে। কিন্তু সাহেরা চৌধুরীর কথা সে কোনোদিন অমান্য করতে পারেনি। তাই বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে খুব ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে শুরু করল। শুভ্রের রুমের দরজার সামনে আসতেই রিদির পা দুটো থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার মনে হচ্ছে হার্টবিট যেন কোনো এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। রিদি কাঁপাকাঁপা হাত দিয়ে দরজায় সামান্য একটু ধাক্কা দিতেই সেটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। দরজাটা আটকানো ছিল না। শুধু ভিড়ানো ছিল। রিদি অতি সন্তর্পণে চোরের মতো পা ফেলে রুমে প্রবেশ করল। রুমের পরিবেশটা একদম নিস্তব্ধ গম্ভীর। ঠিক শুভ্রের ব্যক্তিত্বের মতো। কিন্তু শুভ্রকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রিদি সারা ঘরে চোখ বুলাল কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ রিদি ভাবল শুভ্র হয়তো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। সে পা বাড়াতে যাবে ঠিক তখনি বিছানার এক কোণায় পড়ে থাকা শুভ্রের ফোনটা গান গেয়ে উঠল। সেই নিস্তব্ধ ঘরে ফোনের রিংটোনটা যেন বোমার মতো ফাটল। রিদির কলিজাটা একবার ধক করে উঠল। সে হকচকিয়ে ফোনের দিকে তাকাল। ডিসপ্লেতে কারো নাম ভাসছে আর ফোনের রিংটোনে ইমরানের সেই মায়াবী গানটা বাজছে।
“~তোকে প্রাণের চেয়ে বড় বেশি ভালোবাসি~”
রিদি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যেন এক জীবন্ত পাথরে পরিণত হলো। শুভ্রের মতো একজন কাঠখোট্টা গম্ভীর মানুষের ফোনে এমন রোমান্টিক রিংটোন। রিদি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। ইমরানের দরাজ গলার ওই সুরটা পুরো রুমে গমগম করছে। তোকে প্রাণের চেয়ে বড় বেশি ভালোবাসি। রিদির মনে হচ্ছে এই গানের প্রতিটি কথা যেন শুভ্র স্বয়ং তার কানের কাছে এসে বলছে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে সেই গানের রেশটুকু অনুভব করতে লাগল। রিদি যেন এই রোমান্টিক গানের আবেশে মোহগ্রস্ত হয়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন সব ভুলে গেল। কিন্তু সেই ঘোর বেশি ক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ কারো ভারী আর গম্ভীর পায়ের আওয়াজে পুরো ঘরটা যেন থমকে গেল। সেই চেনা অথচ গম্ভীর পদশব্দটা কানে পৌঁছাতেই রিদির শরীরের ভেতর দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। রিদি খুব ধীরে ধীরে তার ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার আত্মাটা এক পলকে ছ্যাত করে উঠল। মুহূর্তেই মনে হলো বড় বড় বক্সগুলো বুঝি আর বাইরে বাজছে না ওগুলো এখন সরাসরি রিদির বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছে। বুকের ধড়ফড়ানিটা এতই তীব্র আর উচ্চ শব্দে হচ্ছে যে রিদির মনে হচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাও বোধহয় তার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি কম্পন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। রিদি পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের মণি কাঁপছে ঠোঁট দুটো ভয়ে আর বিস্ময়ে সামান্য ফাঁক হয়ে গেছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মানুষটার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি যেন রিদির অস্তিত্বকে ভেদ করে চলে যাচ্ছে। এই মানুষটি সামনে আসলেই যেন তার আগমনে রিদির সারা পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়।
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬