Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩


অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৩ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)

শুভ্র শাড়িটা কিনে শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে নেহার পাশে এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই। নেহা এক প্রকার ছোঁ মেরে সেটা শুভ্রের হাত থেকে কেড়ে নিল। তার চোখেমুখে কৌতূহল। সে ভ্রু নাচিয়ে বলল।

“হোয়াটস ইন দিস ব্যাগ? এটাতে কী আছে?”

শুভ্র অপ্রস্তুত হয়ে নেহার হাত থেকে ব্যাগটা আবার নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল।

“আরে না নেহা। এটা।”

কিন্তু শুভ্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই নেহা সজোরে সরে গেল এবং তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে শাড়িটা বের করে ফেলল। সেই গাঢ় নীল রঙের জমকালো শাড়িটা দেখে নেহার চোখ জোড়া লোভে আর খুশিতে চিকচিক করে উঠল। সে উত্তেজনায় বলে উঠল।

“ওয়াও। দিস শাড়ি ইজ জাস্ট গর্জাস। এটা আমার জন্য তাই না শুভ্র? আমার চয়েস তুমি দারুণ বোঝো।”

শুভ্র নিজের ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা রাগটা কোনোমতে কন্ট্রোল করে শান্ত গলায় বলতে চাইল।

“নো নেহা। লিসেন টু মি। এটা তোমার জন্য নয়। এটা আসলে।”

কিন্তু সত্যটা বলার সুযোগ সে পেল না। ঠিক তখনই নেহার মা সানজিদা খান হাজির হলেন। মেয়ের হাতে দামী শাড়িটা দেখে তিনি বেশ তৃপ্তির হাসি দিয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে গদগদ হয়ে বললেন।

“আরে বাহ। শাড়িটা তো দারুণ। কে দিল? শুভ্র বাবা দিয়েছে বুঝি?”

নেহা মুহূর্তেই শাড়িটা নিজের কাঁধের ওপর মেলে ধরল এবং আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে অত্যন্ত লজ্জা মাখা গলায় আদুরে স্বরে বলল।

“হুম মম। তোমার জামাই আমার জন্য এটা সারপ্রাইজ হিসেবে নিয়ে এসেছে।”

সানজিদা খান শাড়িটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। কাপড়ের কারুকাজ আর জমকালো পারের দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে তিনি শুভ্রের দিকে ফিরে তৃপ্তির হাসি দিলেন।

“যাই বলো শুভ্র। তোমার চয়েস আছে মানতেই হবে। শাড়িটা একদম রাজকীয় হয়েছে।”

শুভ্রর ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলতে। এই শাড়িটা ওর জন্য নয়। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে সে নিজের ভেতরের প্রবল বিরক্তি চেপে রাখল। রাগে তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। গলার রগগুলো টানটান হয়ে উঠল। নেহা তখন শাড়িটা আঁকড়ে ধরে উত্তেজনায় টইটম্বুর হয়ে শুভ্রকে বলল।

“শুভ্র। তুমি জাস্ট দু মিনিট এখানে দাঁড়াও। আই অ্যাম কামিং ইন আ ফ্লাশ। আমি শাড়িটা আমার বেস্টিদের দেখিয়ে আসি। ওরা নিশ্চয়ই ওই শোরুমে আছে। দেখলেই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।”

বলেই নেহা কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে ওদিকে দৌড়ে চলে গেল। সানজিদা খানও মেয়ের আনন্দ দেখে হাসিমুখে তার পিছু পিছু চলে গেলেন। পুরো জায়গাটা এখন ফাঁকা। শুভ্র একা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে ফুটে উঠছে তীব্র ঘৃণা আর বিরক্তি। সে দাঁতে দাঁত চেপে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল।

“লাইক মাদার। লাইক ডটার। যেমন মা। তেমন তার মেয়ে। অসহ্য।”

শুভ্র রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আবার সেই শাড়ির শোরুমে ঢুকে পড়ল। তার চেহারার যা অবস্থা। মনে হচ্ছে সামনে যাকে পাবে তাকেই কাঁচা গিলে খাবে। সেই কর্মচারী শুভ্রকে ওভাবে ঝড়ের বেগে আসতে দেখে ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে ভাবল নির্ঘাত শাড়িতে কোনো বড় সমস্যা বা রিজেক্ট ধরা পড়েছে। নয়তো লোকটা এভাবে তেড়ে আসবে কেন। কর্মচারীটা ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় শুভ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“স্যার। ইজ দেয়ার এনি প্রবলেম? শাড়িতে কি কোনো রকম রিজেক্ট ধরা পড়েছে স্যার?”

শুভ্র তার দিকে লাল চোখে তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে বলল।

“নো। ওই একই রকম শাড়ি আমার আবার চাই। প্যাক ইট রাইট নাউ। ফাস্ট।”

কর্মচারীটা বুক থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে হাসি মুখে বলল।

“শিওর স্যার। আপনি একটু দাঁড়ান। আমি এখনই দিচ্ছি।”

বেচারা পুরো শোরুম তন্নতন্ন করে খুঁজল। সব আলমারি। কিন্তু দুঃখের বিষয় সব র‍্যাক ওলটপালট করেও সে শাড়িটা পেল না।মানে কালেকশন টা পেল না। শেষ হয়ে গিয়েছে। মুহুর্তে কর্মচারীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু হয়ে শুভ্রের সামনে এসে দাঁড়াল।

“সরি স্যার। আসলে ওই কালেকশনটা শেষ হয়ে গেছে। ওই একটাই পিস ছিল। আপনি চাইলে আমি আপনাকে এর থেকেও ভালো শাড়ি দেখাতে পারি স্যার?”

শুভ্রর মাথায় তখন রক্ত চড়ে গেছে। মাথা ঠিক রাখতে না পেরে সে কাউন্টারের কাঁচের ওপর সজোরে এক থাপ্পড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল।

“আই সেড নো। আমার ওই নীল শাড়িটাই চাই। এখনই ব্যবস্থা করে দিবি। নাহলে তোদের এই পুরো শোরুম আমি উড়িয়ে দেব।”

শুভ্রের অগ্নিমূর্তি দেখে কর্মচারীটার গলার শব্দ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে ভয়ে তোতলামি করতে করতে বড় বড় ঢোক গিলে বলল।

“স। স। স্যার। জাস্ট ওয়ান মিনিট। আমি আমাদের অন্য সব আউটলেটে খবর নিচ্ছি। কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।”

শুভ্র হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

“ডু ইট ফাস্ট। আমার হাতে একদম সময় নেই।”

কর্মচারীটা হন্যে হয়ে একেক জায়গায় ফোন দিতে শুরু করল। সে শাড়িটার ছবি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাল। বারংবার তাগাদা দিল। কিন্তু প্রথম কয়েকটা দোকান থেকে না উত্তর এলো৷ যা শুনে শুভ্রের মেজাজ সপ্তমে। শুভ্রের মেজাজ যখন সপ্তমে ঠিক তখনই শেষ জায়গা থেকে একটা আশার আলো দেখা গেল। কল কেটে কর্মচারীটা কিছুটা ইতস্তত করে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।

“স্যার। শাড়িটা পাওয়া গেছে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের ডেলিভারি দেওয়ার মতো কোনো লোক এখন খালি নেই যে এসে দিয়ে যাবে। আপনি কি কষ্ট করে নিজে গিয়ে নিয়ে আসতে পারবেন? আমি আপনাকে ঠিকানাটা দিয়ে দিচ্ছি।”

শুভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে ফোন থেকে নাম্বার বের করে কর্মচারীর সামনে ধরল। তার চোখে এখন একটা জেদ যে নীল শাড়িটা রিদির পাওনা। সেটা সে রিদির হাতেই তুলে দেবে। সে গম্ভীর গলায় বলল।

“গিভ মি দ্য অ্যাড্রেস। ঠিকানাটা এখনই আমার ফোনে মেসেজ করেন।”

কর্মচারী তড়িঘড়ি করে লোকেশনটা শুভ্রের ফোনে পাঠিয়ে দিল। ঠিকানায় চোখ বুলিয়ে শুভ্র নিজের ভেতরে একটু লজ্জিত বোধ করল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল।

“আসলে। আই অ্যাম রিয়েলি সরি আপনার সাথে এভাবে বিহেভ করার জন্য।”

কর্মচারীটি বিনীতভাবে হেসে বলল।

“আরে না না স্যার। কিছু মনে করি নাই। এই লাইনে কত মানুষ রাগ দেখায়। ওসব আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে স্যার ডোন্ট মাইন্ড শাড়িটা নিশ্চয়ই আপনার খুব স্পেশাল কারো জন্য। নাহলে এই সামান্য একটা শাড়ির জন্য কেউ এতটা পাগলামি করতে পারে। তা আগে কখনো দেখিনি।”

শুভ্র তার কথার কোনো উত্তর দিল না। কর্মচারীর কথাটা যেন তীরের মতো গিয়ে তার বুকে বিঁধল। সে কি সত্যিই রিদির জন্য পাগলামি করছে? শুভ্র এক পলক লোকটার দিকে তাকিয়ে গাম্ভীর্য বজায় রেখে সোজা শপিং মল থেকে বেরিয়ে গেল।


২ ঘণ্টার দীর্ঘ লড়াই শেষে শুভ্র সেই কাঙ্ক্ষিত শাড়িটা নিয়ে শপিং মলে হাজির হলো। তবে এবার সে আর ভুল করল না। শাড়িটা খুব সাবধানে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রেখে লক করে দিল। সে জানে। এই শাড়িটা নেহার চোখে পড়া মানেই আবার নতুন কোনো ঝড়। তারপর শুভ্র শপিং মলের ভেতরে ঢুকল। নেহা তখন রাগে আর বিরক্তি নিয়ে ডানে-বামে পায়চারি করছিল। শুভ্রকে দেখামাত্রই সে তেড়ে এসে বলল।

“দিস ইজ টু মাচ শুভ্র। কোথায় গিয়েছিলে তুমি এতক্ষণ? আমাকে এভাবে একা ফেলে রেখে যাওয়াটা কি তোমার কাছে খুব জরুরি ছিল?”

শুভ্র তার হাতটা পকেটে পুরে অত্যন্ত শীতল আর রুক্ষ গলায় বলল।

“লিসেন নেহা। আই অ্যাম নট অবলাইজড টু আনসার অল ইয়োর কোয়েশ্চেনস। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি তোমার কাছে বাধ্য নই। আর শোনো। আমার ওপর এমন অধিকার ফলাবে না একদম। আমার এসব আদিখ্যেতা মোটেও পছন্দ না।”

নেহা শুভ্রের এমন সরাসরি আর কঠিন কথা শুনে কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে চড়া গলায় বলল।

“কিন্তু শুভ্র। আমি তোমার হতে যাওয়া ওয়াইফ। আমার জানার পূর্ণ অধিকার আছে তুমি কোথায় যাও আর কী করো?”

শুভ্র এক পা এগিয়ে এসে নেহার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল।

“ইউ আর নট মাই ওয়াইফ ইয়েট। হওনি এখনো তুমি আমার স্ত্রী। আর হবে কি না। সেটাও সময়ের ওপর ছেড়ে দাও। সো। নিজের সীমার মধ্যে থাকো।”

শুভ্রের কথায় শেষ হতেই নেহার মুখে বাঁকা হাসি ফটল। সে জেদ মেশানো গলায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলল।

“সিন্স আই অ্যাম গোয়িং টু বি। আই উইল মেক ইট হ্যাপেন। দ্যাটস আ চ্যালেঞ্জ। যেহেতু হতে যাচ্ছি। সেহেতু হয়েই ছাড়ব। দেখে নিও।”

শুভ্র আর একটা শব্দও খরচ করল না। সে খুব ভালো করেই জানে। নেহার মতো একটা মেয়ের সাথে কথা বাড়ানো মানে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করা আর নিজেকে আরও বেশি বিরক্ত করা। ও শুধু নিজের স্বার্থটাই বোঝে। শুভ্র পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে একপলক তাকিয়ে সেখান থেকে সরে গেল।


শপিং শেষ করতে করতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সারা দিনের খাটাখাটনিতে সবার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চৌধুরী বাড়ির সবাই দুই হাত ভর্তি ব্যাগ নিয়ে গাড়ির কাছে এসে জড়ো হলো। নেহারাও বিদায় নিয়ে তাদের গাড়িতে করে চলে গেছে। রিদি কোনোমতে নিজেকে টেনে নিয়ে গাড়ির কাছে আসতেই তার চারপাশটা হঠাৎ দুলতে শুরু করল। মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল তার। সারাদিন পেটে এক দানাও পড়েনি। দুপুরে সবাই যখন রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছিল। রিদি তখন এক টুকরো খাবারও মুখে তোলেনি। সবার চোখের আড়ালে সব খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল সে।দীর্ঘ সময়ের মানসিক যন্ত্রণা আর শরীরের ওপর এই চরম অবহেলা। সব মিলিয়ে রিদির শরীর আর সায় দিল না। হঠাৎ প্রচণ্ড মাথা ঘুরে সে নির্জীবের মতো তপ্ত পিচঢালা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

সবাই তখন গাড়িতে উঠে পড়েছে। শুভ্র গাড়ির ডোর খুলে সবে উঠতে যাবে। ঠিক তখনই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন কু ডাক দিয়ে উঠল। সে কি মনে করে একবার পিছন ফিরে তাকাল আর সাথে সাথে তার কলিজা যেন শুকিয়ে গেল। রিদি মাটিতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। শুভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে পাগলের মতো দৌড়ে এসে রিদির নিথর দেহটা আগলে ধরল। সে রিদির মাথাটা নিজের হাঁটুর ওপর রেখে তার ফ্যাকাশে গালে হালকা থাপ্পড় দিয়ে অস্থির গলায় বলে উঠল।

“এই রিদি। রিদি। কী হয়েছে তোর? ওপেন ইয়োর আইজ। চোখ খোল রিদি।”

শুভ্রের গলার আওয়াজ শুনে গাড়ির ভেতর থেকে সাহেরা চৌধুরী আর রাবেয়া এহসান চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন। শুভ্রের হাত কাঁপছে। রিদির শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বড়দের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল।

“সবাই হা করে তাকিয়ে আছেন কেন? ব্রিং সাম ওয়াটার। দ্রুত পানি আনুন।”

ইকবাল এহসান এক প্রকার দৌড়েই গাড়ি থেকে নেমে আসলেন। সাহেরা চৌধুরী দ্রুত পানির বোতল এনে শুভ্রের হাতে দিতেই সে তড়িঘড়ি করে রিদির ফ্যাকাশে মুখে আর চোখের পাতায় পানির ঝাপটা দিল। ঠান্ডা পানির ঝাপটায় রিদির অবশ হয়ে আসা স্নায়ুগুলো একটু সজাগ হলো। সে খুব ধীরে ধীরে চোখের পলক ফেলল। ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে দেখল। তাকে ঘিরে পুরো পরিবারের সবাই চরম অস্থিরতা নিয়ে তাকিয়ে আছেন। রিদির শরীরটা তখনো নিস্তেজ। নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও নেই। ইকবাল এহসান মেয়ের কপালে আর গলায় হাত দিয়ে ব্যাকুল হয়ে বললেন।

“কী হয়েছে মা তোর? হঠাৎ এভাবে পড়ে গেলি কেন? শরীর কি খুব খারাপ লাগছে তোর?”

রিদি ঘোর কাটতেই অনুভব করল। সে শুভ্রের হাঁটুর ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। শুভ্রের হাতের স্পর্শ তখনো তার গালে লেগে আছে। মুহূর্তের মধ্যে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল তার শরীরে। সে তাড়াতাড়ি মাথা উঁচু করে মাটিতে হাত দিয়ে কোনোমতে ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। তার বাবার দিকে তাকিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বলল।

“জানি না আব্বু। আমি নিজেও জানি না আমি হঠাৎ করে পড়লাম কীভাবে।”

শুভ্র তখনও রিদির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল। তার চোখেমুখে তখন এক ভয়ংকর রাগ আর উৎকণ্ঠা খেলা করছে। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর রুক্ষ গলায় বলল।

“তুই আজকে সারাদিন কিছু খাসনি। তাই না? কারণ তোর শরীর দুর্বল হলেই তুই জ্ঞান হারাস।”

রিদি বিস্ময়ে পাথর হয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখদুটো যেন কপাল ছুঁই ছুঁই। সে মনে মনে ভাবল। শুভ্র ভাইয়া কীভাবে জানল? আমার এই পার্সোনাল সমস্যার কথা তো শুধু আম্মু। আব্বু আর ইমন জানে। আমি তো জানি আমি যদি বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকি তবে আমার প্রেশার একদম লো হয়ে যায়। শরীর মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল হয়ে আমি সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কিন্তু এই গোপন কথাটি বাইরের কেউ জানে না। তবে শুভ্র ভাইয়া এটা জানল কীভাবে?

রিদিকে ওভাবে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে শুভ্রের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে সবার সামনেই সিংহগর্জনে চিৎকার করে উঠল।

“কী বলছি শুনতে পাসনি?তুই জানিসই তুই না খেয়ে থাকলে তোর শরীরের পেশার লো হয়ে যায় আর তুই জ্ঞান হারাস” তাহলে জানা সত্যেও এত কেয়ারলেস কেন তুই?

সোহান চৌধুরী শুভ্রের কথা শুনে চরম বিস্ময় নিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে বললেন।

“কিরে রিদি। কিছু খাসনি মানে? শুভ্র এসব কী বলছে? তুই না দুপুরে আমাদের সাথেই খেতে বসলি?”

রিদি মাটির ওপর বসে কাঁপছে। সে অপরাধবোধ আর লজ্জা লুকাতে কাঁপা কাঁপা গলায় মিথ্যা বলার চেষ্টা করল।

“না না। আমি খেয়েছি। শ।”

বাকিটুকু বলার আগেই শুভ্র সবার সামনে প্রচণ্ড রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল রিদির নরম গালে। পুরো শপিং মলের পার্কিং এরিয়া যেন এক মুহূর্তের জন্য নিথর হয়ে গেল। বাড়ির সবাই স্তম্ভিত। কারো মুখে কোনো কথা নেই। রিদি যন্ত্রণায় আর অপমানে গালে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। শুভ্র আবার সিংহগর্জনে ধমক দিয়ে বলল।

“চুপ। একদম চুপ। আবার মিথ্যা বলিস? লজ্জা করে না বড়দের সামনে এভাবে অনর্গল মিথ্যা বলতে? হাউ ডেয়ার ইউ লাই টু আস? তুই কি ভেবেছিস তোর এই ন্যাকামি আমি ধরতে পারব না?”

রিদি গালে হাত দিয়ে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে। তার কান্না যেন থামার নাম নেই। সোহান চৌধুরী পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শুভ্রের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বললেন।

“শুভ্র। থাক। রিদিকে আর কিছু বলিস না। ছোট মানুষ ভুল করেছে। অনেক ঝামেলা হয়েছে। এখন রাত হয়ে যাচ্ছে। সবাই বাড়ি চল।”

শুভ্র আর কোনো কথা না বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাড়ির বড়রাও একে একে গাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। রিদি দুহাতে মাটির ওপর ভর দিয়ে টলমল পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। কিন্তু শরীর এতটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে যে ভারসাম্য রাখতে না পেরে সে আবার পড়ে গেল। শুভ্র বিষয়টি লক্ষ্য করল। সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বজ্রগতিতে নিচু হয়ে এক ঝটকায় রিদিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। রিদি এই আকস্মিকতায় ভীষণ অবাক হয়ে গেল। নিজেকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অবচেতনভাবেই শুভ্রের গলা জড়িয়ে ধরল। রিদির অশ্রুভেজা নোনা চোখদুটো শুভ্রের পাথরের মতো শক্ত আর গম্ভীর মুখের দিকে স্থির হয়ে রইল। শুভ্র কোনো দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় পায়ে সামনের গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। তার বাহুবন্ধন অনেক শক্ত। যেন রিদিকে সে এক চুলও ছাড়বে না। রিদি শুভ্রের বুকের ধুকপুকানি অনুভব করতে পারছে। সে তার অশ্রুমাখা চোখে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে মনে মনে করুণ সুরে বলল।

“আপনি শুধু আমার শরীরের ক্লান্তি আর উপরের কষ্টটাই দেখলেন শুভ্র ভাইয়া। অথচ আমার ভেতরের রক্তক্ষরণটা একবারও দেখলেন না। আমার ভেতরটা যে আপনাকে অন্য কারো সাথে দেখার যন্ত্রণায় আর আপনাকে না পাওয়ার শোকে তিল তিল করে মারা যাচ্ছে। সেই কষ্টটা কেন আপনার চোখে পড়ছে না? কেন আপনি আমার হৃদয়ের হাহাকার বুঝতে পারছেন না?”

শুভ্র ধীরে ধীরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রিদিকে গাড়ির সিটে বসিয়ে দিল। এরপর কোনো কথা না বলে নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। পুরোটা রাস্তা শুভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে রইল। একবারের জন্যও সে রিদির দিকে তাকাল না।


সবাই ধকল সামলে বাড়ির ভেতরে এসে সোফায় গা এলিয়ে দিল। রাবেয়া এহসান এক মুহূর্ত দেরি না করে তাড়াতাড়ি রিদির জন্য রান্নাঘর থেকে খাবার আনতে গেলেন। রিদি তখনো শরীরের ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। সে ধীরে ধীরে সোফায় এসে বসল। হঠাৎ শুভ্র ড্রয়িংরুমে এল। তার হাতে একটা শপিং ব্যাগ। সে সরাসরি রিদির সামনে এসে ব্যাগটা রিদির পাশে রেখে শীতল গলায় বলল।

“দিস ইজ ফর ইউ। এটা তোর।”

বলেই সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। কারো কোনো প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে সোজা বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে গেল। রিদি প্রচণ্ড অবাক হয়ে শপিং ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। রিদির কাজিন মিহি পাশ থেকে কিছুটা ভ্রু নাচিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল।

“কিরে। খুলে দেখ। শুভ্র ভাইয়া আমাদের কাউকে কিছু দিল না। অথচ তোকে স্পেশালি গিফট দিল। দেখি তো। কী দিল?”

রিদি কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগটা নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। তার বুকটা তখন প্রবল বেগে ধড়ফড় করছে। সে ব্যাগের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কাপড়টা বের করল আর মুহূর্তেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এটা তো সেই শাড়ি। সেই নিখুঁত নকশার রাজকীয় শাড়িটা। যেটা সকালে সে তৃষ্ণার্ত চোখে পছন্দ করেছিল। কিন্তু এই শাড়ি শুভ্র ভাইয়া কোথায় পেল? সে তো তখন নেহার সাথে ব্যস্ত ছিল।

শাড়িটা দেখে মিহি চোখ কপালে তুলে বিস্ময় নিয়ে বলল।

“ওয়াও শাড়ি।”

বলেই মিহি এক প্রকার ছোঁ মেরে রিদির হাত থেকে শাড়িটা নিল। শাড়ির ওপরের নিখুঁত কারুকাজ আর রাজকীয় আভিজাত্য দেখে সবার পাগল হওয়ার মতো দশা। পাখি অবাক হয়ে শাড়ির জমিনে হাত বুলিয়ে বলল।

“শুভ্র ভাইয়া তোকে এত দামী আর সুন্দর শাড়ি গিফট করল অথচ আমাদের জন্য কিছুই আনল না। চলবে না চলবে না। আমরা এখনই শুভ্র ভাইকে গিয়ে ধরব এইটা কোন ধরনের বিচার।”

কিন্তু রিদি তখন অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে। এই শুভ্র মানুষটাকে সে কোনোভাবেই মেলাতে পারছে না। যে মানুষটা একটু আগে সবার সামনে তাকে চড় মারল সেই মানুষটাই আবার এত যত্ন করে তার পছন্দের শাড়িটা কিনে আনল। শাড়িটি যে তার খুব পছন্দ হয়েছে এইটা শুভ্র কীভাবে জানল। আর সে না খেয়ে থাকলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এই অতি গোপন খবরটাই বা শুভ্র জানল কীভাবে। রিদির মনে হচ্ছে শুভ্র মানুষটা যেন এক গভীর রহস্যের সমুদ্র যেখানে ডুব দিলেও কোনো কূল পাওয়া যায় না।


রাত বারোটা। শুভ্রের চোখে ঘুম নেই। সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার স্থির দৃষ্টি দূরের নিকষ কালো আকাশের দিকে। হঠাৎ শুভ্র কী মনে করে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনের গ্যালারি স্ক্রল করে একটা ছবি বের করল সে। ছবিটা দেখা মাত্রই শুভ্রের পাথরের মতো শক্ত মুখে এক চিলতে মায়া মাখানো হাসি ফুটল। সে ছবিটির দিকে অপলক তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল।

“নীল আকাশের মতো তুমি সুন্দর। তোমার ওই ডাগর ডাগর চোখ কেড়ে নিয়েছে বহু কালে আমার এই মন। তোমার মুখে রয়েছে অদ্ভুত এক মায়া। যে মায়া দেখলে কেটে যায় আমার সকল ক্লান্তির ছায়া।”

কথাগুলো বলেই শুভ্র ফোনটা পকেটে রেখে ধীরলয়ে চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করতেই মুহূর্তের মধ্যে ফোনের স্ক্রিনে থাকা ওই মায়াবী মুখটা তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠল। শীতল বাতাসের ঝাপটায় শুভ্র যেন সেই গায়ের সুবাস অনুভব করতে পারল। সে গভীর এক আবেশে বিড়বিড় করে বলল।

“আমার নীল আকাশ তুমি।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply