Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ২


অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ২ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)

পরের দিন সকালে পুরো বাড়ি আত্মীয়-স্বজনে ঠাসা। কাল গায়ে হলুদ আর মাত্র দুদিন পর বিয়ে। কাজিনরা সবাই চলে আসায় বাড়ি এখন রীতিমতো রণক্ষেত্র। আজকে চৌধুরী বাড়ির সবাই শপিংয়ে যাবে। রিদি মনের ভেতর একরাশ কষ্ট চেপে রেখে কোনোমতে রেডি হয়েছে। যদিও তার যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই কিন্তু তার কাজিনরা নাছোড়বান্দা।
সবাই নিচে রেডি হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু আসল মানুষটার খবর নেই। সেই যে সকালে খেয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে শুভ্র আর বের হওয়ার নাম নেই। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সোহান চৌধুরী শুভ্রের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজায় সজোরে করাঘাত করে বললেন।

“শুভ দরজা খোল। আমরা সবাই নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আর নেহা মা-ও বারবার কল করছে তুই মেয়েটার কলও ধরছিস না। সমস্যা কী তোর।”

সোহান চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই খট করে দরজা খুলে গেল। শুভ্র একদম ফিটফাট হয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে এল। তার এমন গাম্ভীর্যপূর্ণ উপস্থিতি দেখে সোহান চৌধুরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাড়ি থেকে সবাই এক এক করে বের হলো। শুভ্র তার গাড়িতে উঠে বসতেই সব কাজিনরা হুরমুর করে পেছনের সিটে উঠে পড়ল। কিন্তু রিদি একপাশে মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিদিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার খালাতো বোন পাখি বলে উঠল।

“কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন উঠবি না।”

রিদি কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চুপচাপ গাড়ির পেছনে উঠতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে শুভ্র গাড়ির স্টিয়ারিংটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। সে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় গর্জে উঠল।

“আমাকে কি তোদের সবার ড্রাইভার মনে হয় যে তোরা সব নবাবজাদির মতো পেছনে বসবি আর আমি ড্রাইভারের মতো গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাব। আর ইউ অল আউট অফ ইয়োর মাইন্ড।”

শুভ্রের সেই কর্কশ কণ্ঠস্বরে রিদি শিউরে উঠল। তার বুক ধক করে উঠল। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শুভ্রা রিদির দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে বলল।

“রিদি তুই গিয়ে সামনে বোস। তাছাড়া পেছনে অলরেডি চারজন বসে পড়েছি এমনিতেই এখানে কাচুমাচু হচ্ছে। এখন পাঁচজন বসলে সমস্যা হবে।”

রিদির বুক ধুকপুক করে উঠল। সামনে বসা তাও আবার শুভ্রের ঠিক পাশের সিটে। রিদি যেন নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে সে নড়তেও ভুলে গেল। রিদিকে ওভাবে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুভ্র স্টিয়ারিংয়ে এক হাত দিয়ে চাপ দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল।

“ওভাবে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে উঠবি নাকি আমি স্টার্ট দিয়ে চলে যাব। ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম।”

রিদি চমকে উঠে কোনো রকমে বুকের পাথর সরিয়ে সাহস সঞ্চয় করল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে সামনের দরজা খুলে শুভ্রের পাশের সিটে গিয়ে বসল। বসার সাথে সাথেই শুভ্রের শরীরের সেই তীব্র পারফিউমের ঘ্রাণ আর আভিজাত্য রিদির স্নায়ু অবশ করে দিল। শুভ্র এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে সাথে সাথে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিল। তার দুহাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে চেপে বসে আছে দৃষ্টি একদম সামনের রাস্তায় নিবদ্ধ। পুরো গাড়িতে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে কেবল ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর রিদির দ্রুতগামী হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছে এমন মনে হচ্ছে। শুভ্র অত্যন্ত ধীর স্থির অথচ এক অদ্ভুত গতিতে গাড়ি চালাতে লাগল।

গাড়ি সোজা শপিং মলের সামনে এসে থামল। যার সাথে শুভ্রের বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই সুরাইয়া নেহা আর তার পরিবারের সবাই শপিং মলের সামনে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। চৌধুরী বাড়ির বড়রা নেহার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। শুভ্রের গাড়ি থেকে সবাই নামল রিদিও নামল। শুভ্র গাড়ি থেকে নামামাত্রই নেহা দূর থেকে তাকে দেখে এক প্রকার দৌড়ে এল। সে সবার সামনেই শুভ্রকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল।

“ও ডিয়ার মিস ইউ সুইটহার্ট।”

এই দৃশ্য দেখে রিদির মনে হলো কেউ যেন এক ঝটকায় তার বুকে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। বুকটা চিরে এক অসহ্য যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে এল। যে মানুষটাকে সে নিজের অজান্তেই মনে ঠাঁই দিয়েছে তাকে অন্য কারো বাহুবলীতে দেখে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল।

শুভ্র বিরক্ত হয়ে নেহাকে ছাড়িয়ে বিরক্তি গলায় বলল।

“ক্যান উই জাস্ট গো ইনসাইড। এখানে দাঁড়িয়ে এসব ড্রামা করার কোনো মানে হয় না। আই ডোন্ট লাইক ইট।”

নেহা শুভ্রের বাহু আঁকড়ে ধরে কিছুটা অধিকার ফলানোর সুরেই অভিযোগ করল।

“তুমি কাল আমার ফোন ধরোনি কেন কতবার কল করেছি তোমাকে।”

শুভ্র নেহার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। শুভ্রর চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সে একদম শীতল গলায় বলল।

“এসব ফালতু প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত নই।”

নেহা একটু গাল ফুলিয়ে আদুরে গলায় বলল।

“আচ্ছা ঠিক আছে উত্তর দিতে হবে না তোমাকে। চলো ভেতরে যাই।”

বলেই নেহা এক প্রকার জোর করেই শুভ্রের হাত টেনে ধরে শপিং মলের ভেতরে নিয়ে গেল। শুভ্র প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছে কারো এভাবে গায়ে পড়া বা শরীর স্পর্শ করা সে একদমই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সামনে বড়রা থাকায় সে নিজেকে শান্ত রাখল এবং কোনোমতে বিরক্তি চেপে ভেতরে ঢুকল।

সবাই ভেতরে প্রবেশ করলেও রিদি তখনও প্রবেশপথের কাছে জড়োসড়ো হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেতরে এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তখন শুভ্রা খেয়াল করল রিদি পিছিয়ে আছে। সে এগিয়ে এসে রিদির হাত ধরে টান দিয়ে বলল।

“চল আমাদের সাথে।”


ভেতরে সবাই যার যার পছন্দের জিনিস কেনায় মত্ত। নেহা এক মুহূর্তের জন্যও শুভ্রকে চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না। সে এটা পছন্দ করছে ওটা ট্রায়াল দিচ্ছে আর বারবার শুভ্রকে দেখিয়ে মতামত চাইছে। শুভ্র কোনো আগ্রহ ছাড়াই শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে। তার পুরো মনটাই যেন অন্য কোথাও পড়ে আছে।

সবাই দুহাতে কেনাকাটা করলেও রিদি একপাশে মূর্তির মতো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নির্লিপ্ততা সাহেরা চৌধুরীর নজর এড়াল না। তিনি রিদির কাছে এসে মায়াভরা স্বরে বললেন।

“রিদি তুই ওভাবে চুপচাপ কেন। সবাই তো যার যা মন চাইছে কিনছে। তুইও দেখ তোর কোনটা ভালো লাগে সেটাই নে।”

রিদি কোনোমতে ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল।

“না না মামি তোমরা কেনাকাটা করো। আমার বাসায় পরার মতো অনেক কাপড় আছে আর নতুন কিছুর প্রয়োজন নেই।”

রিদির এমন অস্বাভাবিক কথা শুনে তার মা রাবেয়া এহসান কপালে ভাঁজ ফেলে বেশ অবাক হয়ে বললেন।

“সেকি কিছু লাগবে না মানে। শপিংয়ে এলে তো তুই আগে পুরো শপিং মল মাথায় তুলতিস। হাজারটা বায়নাক্কা করতিস আর আজ বলছিস কিছুই লাগবে না। তোর হয়েছেটা কী সত্যি করে বল তো।”

রিদি সাথে সাথে উত্তর দিল। তার গলায় জোর করে আনা এক ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল।

“আরে না আম্মু সত্যি আমার অনেক কিছু আছে। তাছাড়া এখন কিনলে ওগুলো তো আলমারিতেই পড়ে থাকবে নষ্ট হবে। তোমরা কেনো তো।”

বলেই রিদি আর সেখানে দাঁড়াল না। সে একটু দূরে গিয়ে একটা পিলারের আড়ালে একা দাঁড়াল। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার এই আলোকোজ্জ্বল শপিং মল হাসাহাসি মানুষের ভিড় সবই যেন বিষের মতো লাগছে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে ধরছে তীব্র এক যন্ত্রণা হচ্ছে। রিদি কাঁচের দেয়ালের ওপাশে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে মনে মনে ভাবল।

“আচ্ছা ভালোবাসা এত কষ্টের কেন। সবাই তো বলে মন থেকে কাউকে ভালোবাসলে নাকি তাকে পাওয়া যায়। আমি তো শুভ্রকে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। তবে তাকে পেলাম না কেন? কেন সে আজ অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে।”

রিদির টলমলে চোখ থেকে দুফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত হাত দিয়ে সেই নোনাজল মুছে ফেলল যাতে কেউ টের না পায়। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করে সে কাওকে কিছু না বলে ধীরপায়ে ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ করেই রিদির চোখ আটকে গেল ওপরের দিকে ঝোলানো একটি অপূর্ব শাড়ির ওপর। শাড়িটির নিখুঁত কারুকাজ আর রাজকীয় আভিজাত্য দেখে রিদি যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। শাড়িটা দেখা মাত্রই তার মনে হলো এটি যেন তারই জন্য তৈরি। কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করল। সে তো একটু আগেই সবাইকে বুক ফুলিয়ে বলেছে তার কিছু লাগবে না। এখন নিজে থেকে চাইলে সবাই কী ভাববে লোক হাসাহাসি হবে না। কিন্তু শাড়িটার দিক থেকে চোখ সরানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। রিদি এক বিষণ্ণ আর করুণ চাহনি নিয়ে শাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইল।

এদিকে শুভ্র নেহার ওপর মনে মনে ফুঁসছে। নেহা সবার সামনে বারবার তার গায়ের ওপর ঢলে পড়ছে যা শুভ্রের আভিজাত্যে চরমভাবে আঘাত করছে। হঠাৎই শুভ্রর ফোনটা বেজে ওঠল। ফোনটা বেজে উঠতেই সে যেন মুক্তির নিশ্বাস ফেলল। সে এক প্রকার জোর করেই নেহাকে সরিয়ে দিয়ে কথা বলতে বলতে কিছুটা সামনে এগিয়ে এল। ফোনের কথা শেষ করে শুভ্র যেই ঘুরে দাঁড়াতে যাবে অমনি তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো একটু দূরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা রিদির ওপর। সে খেয়াল করল রিদি ওপরের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। শুভ্র রিদির দৃষ্টি অনুসরণ করে সেই শাড়িটি দেখল। রিদির চোখের সেই তৃষ্ণা শুভ্রের চোখ এড়ালো না।

রিদিকে ওভাবে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে শপিং মলের একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে বিনীত স্বরে বলল।

“ম্যাম আপনার কি শাড়িটি পছন্দ হয়েছে আপনি বললে আমি ওটা নামিয়ে দেখাতে পারি।”

রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল।

“না না ভাইয়া আমি এমনিই দেখছিলাম। তবে হ্যাঁ শাড়িটা আসলেই খুব সুন্দর।”

কথাটা বলেই রিদি অপরাধীর মতো দ্রুতপায়ে সেখান থেকে সরে গেল। রিদি চলে যেতেই শুভ্র সেখানে এসে দাঁড়াল। তার চেহারায় এক অদ্ভুত কাঠিন্য। সে সরাসরি কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল।

“প্যাক দিস শাড়ি। ডু ইট ফাস্ট।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply